Home Blog Page 71

রুমির জগতে আমরা কারা?

মেটাফিজিক্সের মূল দাবি, বাস্তবতা কেবল ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয়, বরং আরও গভীর কিছু—এই ধারণা বহুদিন ধরেই দর্শনের জগতে প্রশ্নবিদ্ধ। অ্যারিস্টটল এই শাখাকে বিজ্ঞানচর্চার সর্বোচ্চ স্তরে স্থান দিলেও, বিশ্লেষণধর্মী আধুনিক দার্শনিকদের অনেকেই মেটাফিজিক্সকে কেবল অলীক রোমান্টিসিজম হিসেবে উড়িয়ে দিয়েছেন।

তবুও মেটাফিজিক্স টিকে আছে। কেন? কারণ মানুষ যুক্তি দিয়ে তর্ক করলেও মৃত্যু নিয়ে ভাবা থামায়নি। এই চিরন্তন ভাবনার ভেতরেই এসে দাঁড়ান একজন কবি জালালুদ্দিন রুমি। যিনি মৃত্যুকে দেখেন জন্মের মতো এক নতুন শুরু, আর ঈশ্বরকে শুধুই উপাসনার বস্তু নয়, বরং নিজস্ব অস্তিত্বের অভ্যন্তরীণ প্রতিচ্ছবি।

রুমিকে নিয়ে বিস্ময়কর দ্বিমত দেখা যায়। পশ্চিমা বিশ্বে তিনি প্রায়ই আধ্যাত্মিক লাভ গুরু, যিনি সমস্ত বিভাজনকে প্রেমের জোয়ারে ভাসিয়ে দেন।ইনস্টাগ্রাম-বান্ধব উক্তিতে “love is the bridge between you and everything” জাতীয় বাক্য তাঁর জনপ্রিয়তাকে ঝালিয়ে তোলে।

অন্যদিকে প্রাচ্য ও ইসলামি দার্শনিকেরা রুমিকে দেখেন রহস্যময় ঐশ্বরিক সংকেত প্রেরক হিসেবে, যাঁর প্রতিটি শব্দ ঈশ্বরতাত্ত্বিক নীরব সংকেত।কিন্তু একজন সমালোচকের চোখে প্রশ্ন উঠতেই পারে, রুমির ভাষ্য কি সত্যিই গভীর? নাকি কেবল শব্দচিত্রের মধ্য দিয়ে আধ্যাত্মিকতার লুকোচুরি?

রুমির অন্যতম মূল দর্শন “Wahdat al-Wujud” বা ঐক্যের তত্ত্ব, যেখানে স্রষ্টা ও সৃষ্টি আলাদা নয়। সবকিছুই একই ঈশ্বরীয় বাস্তবতার রূপ। তবে এ ধারণা কি যুক্তিসঙ্গতভাবে প্রতিষ্ঠিত, নাকি নিছক অভিজ্ঞতা ও কল্পনার আশ্রয়ে গড়া? এখানে একজন দর্শন পাঠক ইবনে রুশদের যুক্তিবাদী দ্বিধা অনুভব করেন। ইবনে রুশদের মতো চিন্তাবিদেরা “ঐক্য”কে যুক্তির অপমান বলেই গণ্য করতেন।বিশ্ব জটিল, বহুস্তরীয় ও কারণসম্পন্ন একে একসূত্রে ফেলা ঈশ্বরতত্ত্বের একরৈখিকতা বরং বাস্তবতাকে সরলীকরণ করে।

রুমি যখন বলেন “I am you, you are me”, তখন একজন সমালোচক প্রশ্ন করতে পারেন “এই তুমি কে?” এই ‘আমি’ কি আত্মনিষ্ঠ চেতনার অস্বীকার? এরকম বক্তব্য ব্যক্তিসত্তার স্বাতন্ত্র্যকে অস্বীকার করে আত্মমোহকে প্রতিষ্ঠা করতে পারে, যা প্লেটো বা হেগেলের ‘সমগ্রতাবাদ’-এর সঙ্গেও মেলে, কিন্তু তাতে ব্যক্তি-ভোগান্তির অস্তিত্ব মুছে যায়।

আবার রুমি আত্মার পুনর্জন্ম ও চক্রাকারে পরিক্রমার কথা বলেন—“I died as mineral and became a plant… then died as plant and became animal…”। এই ধারার অনুরণন পাওয়া যায় প্লেটো, হিন্দু দর্শন, এমনকি কিছু এগনস্টিক ধারণার মধ্যেও। প্রশ্ন হলো রুমি কি মৌলিক কিছু বলছেন, নাকি পূর্বসূরিদের চেতনারই কাব্যিক পুনরুত্তর করছেন?

এমনকি আত্মার অনন্ত যাত্রা কি মুক্তির প্রতিশ্রুতি দেয়, নাকি মানুষকে জীবনের তীব্র বাস্তবতা থেকে বিচ্যুত করে? যখন রুমি বলেন “Why do you stay in prison when the door is wide open?”, একজন সমালোচক প্রতিপ্রশ্ন তুলতে পারেন,’কারাগার’ই যদি বাস্তবতা হয়, তবে সেখানে একটা ‘উন্মুক্ত দরজা’ কেবল কল্পনা না?

রুমির ভাষা চিত্রকল্পে পূর্ণ, প্রতীকী ও রহস্যময়। কিন্তু এ ভাষা কি কখনো কখনো দর্শনের শূন্যতাকে ঢেকে দেয় না? তাঁর অত্যন্ত আবেগঘন “reed flute” রূপক। কিন্তু দর্শনের মাপকাঠিতে এই ব্যাখ্যা কি পর্যালোচনাযোগ্য, নাকি এটি একটি নান্দনিক সান্ত্বনামাত্র?

রুমি বারবার বলেন—“Silence is the language of God.” একজন বিশ্লেষক তখন প্রশ্ন তুলতেই পারেন তবে তিনি নিজে এত শব্দ কেন ব্যবহার করলেন? এই নীরবতা কি ঈশ্বরের গূঢ় ভাষা, না কি মানব অক্ষমতার কাব্যিক রূপান্তর?

রুমির দর্শনের বর্তমান বিশ্বজোড়া জনপ্রিয়তা আমাদের জানায় মানুষ এখনও ঈশ্বর, আত্মা, প্রেম ও অস্তিত্ব নিয়ে ভাবতে চায়। কিন্তু এখানেও প্রশ্ন হলো রুমির দর্শন কি আসলে বদল আনে, না কি কেবল আধুনিক জীবনের ক্লান্ত ও উদ্বিগ্ন মনকে একটি নরম আশ্রয় দেয়?

রুমি বলেন ভালোবাসো, হারিয়ে যাও, এক হয়ে যাও। এখানেও যদি প্রশ্ন উঠে, এটা কি সমাজের বাস্তব দ্বন্দ্ব, নিপীড়ন, শ্রেণি-সংঘাত থেকে বিমুখ হওয়ার কৌশল নয়? এক ধরনের “spiritual bypassing”, যেখানে অস্তিত্বের গভীর প্রশ্নগুলো এড়িয়ে প্রেমের কুয়াশায় নিজেকে হারানো যায়?

রুমি বলেন “তুমি ঈশ্বরের অংশ”, কিন্তু কেউ যদি পাল্টা জিজ্ঞাসা করেন “তবে কেন সেই ঈশ্বরই কোটি মানুষের দুঃখ, যুদ্ধ, এবং অনাহারের সাক্ষী?”, তখন রুমির দর্শনের গভীরতা পরীক্ষা দিতে বাধ্য হয়। রুমির জগত প্রেমে পূর্ণ, অথচ বাস্তব পৃথিবী হিংসা ও শূন্যতায় ভরা, এই বৈপরীত্যে কি আমরা এক গূঢ় বৈকল্যের সাক্ষী হচ্ছি?

রুমি আধ্যাত্মিক কবি, এ নিয়ে দ্বিমত নেই। তাঁর ভাষা বহু মনকে শান্তি দিয়েছে। তাঁর দর্শন আত্মিক মুক্তির ইঙ্গিত দেয়, কিন্তু কখনো তা বাস্তবতা থেকে পরিশীলিত পলায়ন হিসেবেও দেখা দেয়।

তবুও স্বীকার করতেই হয় রুমি যে সাহসিকতায় মেটাফিজিক্সের অনন্ত প্রশ্নগুলো ধরে গেছেন সেগুলো এখনো ভাবতে বাধ্য করায় । কিন্তু তাঁর ভাষা, তার দর্শন, সবসময় কি উত্তর দেয়? নাকি আমাদের প্রশ্নগুলোকেই আরও আচ্ছন্ন করে ভুলিয়ে দেয়?

কিভাবে চীনের আমলাতন্ত্র টিকে গেলো হাজার বছর?

প্রাচীন চীনের ইতিহাসে ব্যুরোক্রেসি বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছিল অনন্য এক রাজনৈতিক যন্ত্র, যা হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে সম্রাটদের ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত ও সুসংগঠিত করে রেখেছিল। এই ব্যুরোক্রেসি শুধু প্রশাসনিক কাঠামো ছিল না, ছিলো জটিল রাজনৈতিক দর্শন ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, যা শাসনব্যবস্থার ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীলতার মূল চাবিকাঠি ছিল।

চীনের প্রাচীন শাসনব্যবস্থার সূচনা ঘটে সিয়া ও সাং রাজবংশের সময়। যদিও সিয়ার ইতিহাস নিয়ে কিছু বিতর্ক আছে, তবে সাং রাজবংশের সময় থেকে প্রশাসনিক কার্যক্রমের প্রমাণ পাওয়া যায়। তখনকার প্রশাসকরা ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বৈধতার জন্য ভাগ্যপরীক্ষার ওপর নির্ভর করত, এটি ছিল শাসনের প্রাথমিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। এই সময় থেকেই প্রশাসনিক কাজের নিয়ম ও রেকর্ড সংরক্ষণের প্রথা শুরু হয়।

চৌ রাজবংশের সময় ‘স্বর্গীয় ম্যান্ডেট’ বা স্বর্গের আদেশের মতবাদ চালু হয়, এ তত্ত্ব শাসকের ক্ষমতাকে ধর্মীয় ও নৈতিক বৈধতা প্রদান করে। এই মতবাদ রাজতন্ত্রের রাজনৈতিক শক্তিকে শক্তিশালী করে এবং বিদ্রোহকে অবৈধ ঘোষণা করে। ফলে রাজ্যের শাসন ধর্ম ও রাজনীতির এক অনন্য সমন্বয়ে পরিণত হয়।

প্রাচীন চীনের ব্যুরোক্রেসির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল মেধাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থা। প্রশাসক নির্বাচনের জন্য কঠোর সরকারি পরীক্ষা চালু ছিল, এটি যোগ্যতা, নৈতিকতা ও কনফুসিয়ান দর্শনের জ্ঞান যাচাই করত। এই পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ প্রথা ছিল ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও দুর্নীতি রোধের কার্যকর হাতিয়ার। হান রাজবংশের সময় প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি সরকারি কর্মকর্তা কাজ করত, এ সংখ্যা একই সময়ের রোমান সাম্রাজ্যের সংখ্যার প্রায় বিশ গুণ বেশি।

রাজ্যের বিভিন্ন স্তরে প্রশাসকরা সম্রাটের আদেশ বাস্তবায়ন করত। কর আদায়, বিচার কার্য, আইন প্রয়োগসহ প্রতিটি কাজ কঠোর নিয়ম ও নীতিমালা অনুসারে পরিচালিত হত। প্রশাসনিক লেনদেনের প্রতিটি ঘটনা লিখিত রেকর্ডে সংরক্ষিত হত, এটি পরবর্তীতে ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে সাহায্য করত।

সুই রাজবংশের সম্রাট ওয়েন প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে আরও সংগঠিত করে ‘তিন বিভাগ ও ছয় মন্ত্রণালয়’ ব্যবস্থা চালু করেন। তিন বিভাগ ছিল: শাংশু (রাজ্য বিষয়ক), ঝংশু (গোপনীয় নীতি নির্ধারণ) ও মেনসিয়া (পরীক্ষা ও যাচাই)। ছয় মন্ত্রণালয় ছিল: কর্মকর্তা নিয়োগ, কর আদায়, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, সামরিক, বিচার ও নির্মাণ কাজ।

এই কাঠামোতে ক্ষমতা বিভক্ত ছিল, এটি প্রধানমন্ত্রীদের ক্ষমতা সীমিত করে সম্রাটের ক্ষমতাকে শক্তিশালী করত। একদিকে বিভাগগুলো আলাদা কাজ করত, অন্যদিকে তারা একে অপরকে তদারকি করত। ফলে প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ত এবং কেন্দ্রীয় শাসনের ক্ষমতা দৃঢ় হত।

প্রাচীন চীনে প্রশাসনিক যোগাযোগ ছিল অত্যন্ত নিয়মিত ও কাঠামোবদ্ধ। সম্রাট থেকে শুরু করে স্থানীয় প্রশাসক পর্যন্ত আদেশ, প্রতিবেদন ও অন্যান্য নথি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় চলত। গুরুত্বপূর্ণ আদেশগুলো কখনো কখনো জনসাধারণের জন্য পাথরের স্তম্ভে খোদাই করা হত এবং সেগুলো আইন হিসেবে কার্যকর হত।

প্রাচীন চীনা প্রশাসনের মূল ভিত্তি ছিল কনফুসিয়ান দর্শন, যে দর্শন নৈতিকতা, আদর্শ ও জনকল্যাণের ওপর জোর দেয়। প্রশাসকরা শুধু আইন প্রয়োগ করত না, সমাজে নৈতিক মূল্যবোধ প্রচার করত এবং বিচারক হিসেবেও কাজ করত।

তবে এই আদর্শ ব্যুরোক্রেসিও সবসময় নিখুঁত ছিল না। সময়ে সময়ে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্থানীয় স্বার্থপরতা চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে আসে। বিশেষ করে সাম্রাজ্যের দুর্বল সময়ে এসব সমস্যা প্রকট হয়ে ওঠে, যা রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিদ্রোহের কারণ হয়। তবে প্রশাসন নিজেকে পুনর্গঠনের মাধ্যমে কঠোর নিয়মাবলী প্রণয়ন করে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করত। যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ ও নিয়মিত তদারকি ছিল এর অন্যতম প্রতিকার।

প্রাচীন চীনা ব্যুরোক্রেসি ছিল একটি রাজনৈতিক শক্তি যা সম্রাটের ক্ষমতাকে সুসংহত করত এবং সাম্রাজ্যের দীর্ঘস্থায়ীত্ব নিশ্চিত করত। এটি দেখায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য দক্ষতা, নৈতিকতা ও নিয়মিততা ভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা অপরিহার্য। চীনের বিভিন্ন সাম্রাজ্য যেমন হান, তাং, সঙ এই ব্যুরোক্রেসিকে আরও পরিমার্জিত ও শক্তিশালী করেছিল।

বিশাল ভূখণ্ডে একরূপ শাসন বজায় রাখা, শাসনের ধর্মীয় ও নৈতিক বৈধতা, প্রশাসনিক নিয়মাবলী এবং মেধাভিত্তিক নিয়োগ এসব ছিল প্রাচীন চীনের শাসনব্যবস্থার সফলতার মূল চাবিকাঠি।

প্রাচীন চীনা ব্যুরোক্রেসি ছিল যুগান্তকারী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উদ্ভাবন, যা মেধা, নৈতিকতা ও কঠোর নিয়মের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল। এটি সম্রাটের ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত করেছিল, দুর্নীতি কমিয়েছিল এবং সাম্রাজ্যের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করেছিল।

গবেষণার মাধ্যমে দেখা যায়, প্রাচীন চীনা ব্যুরোক্রেসির নীতিমালা ও কাঠামো শুধু ইতিহাস নয়, দক্ষতা ও নৈতিকতার ওপর ভিত্তি করে শাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার আদর্শ একটি রাজনৈতিক দর্শন।

নজরদারির পুঁজিবাদ – কিভাবে কোথায় নিজেদের অজান্তেই আমরা বিক্রি হচ্ছি?

ধরুন আপনি বন্ধুর সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে চ্যাট করছেন, কথায় কথায় উঠে এলো “সফট ট্যুরিজম” শব্দটা। পরদিন ইন্সটাগ্রাম ও ফেসবুকে ঢুকতেই আপনার নিউজফিডে ভেসে উঠলো ‘সাস্টেইনেবল ট্রাভেল’ নিয়ে স্পনসর্ড পোস্ট। একি কাকতালীয়? নাকি পরিকল্পিত নজরদারি? এই নজরদারিরই এক পরিণতি হচ্ছে Surveillance Capitalism। এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে আমাদের ব্যক্তিগত জীবনই হয়ে উঠেছে বেচাকেনার পণ্য।

Surveillance Capitalism শব্দটি জনপ্রিয় করে তুলেছেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর Shoshana Zuboff। তাঁর মতে এই নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় কর্পোরেশনগুলো আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে, বিশ্লেষণ করে এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য আচরণ অনুমান করে ব্যবসায়িক লাভ করে।Google, Facebook, Amazon—এইসব কোম্পানি আমাদেরকে “ফ্রি” সেবা দেয় বলে মনে হলেও, আদতে আমরা নিজেরাই এই বিনিময়ের পণ্য। আমাদের প্রতিটি ক্লিক, টাইপ, ভিউ, এমনকি আমাদের অনলাইন নীরবতাও ট্র্যাক করা হয়।

Zuboff বলছেন এটা শুধু নজরদারি নয় এটা এক ধরণের চলমান আচরণীয় নিয়ন্ত্রণ। এই ব্যবস্থায় আমাদের আচরণ শুধুই পর্যবেক্ষণ করা হয় না, বরং নির্দিষ্টভাবে প্রভাবিতও করা হয়, যাতে আমরা নির্ধারিত পণ্যে বা মতাদর্শে প্রলুব্ধ হই।

একটা সাধারণ মোবাইল অ্যাপ ইনস্টল করতে গিয়ে আমরা কত তথ্য দিয়ে দিই। লোকেশন, কন্ট্যাক্ট, গ্যালারি অ্যাক্সেস, এমনকি আমাদের ফোনে আর কী অ্যাপ আছে সেটাও। এইসব তথ্য বিশ্লেষণ করে আমাদের সম্পর্কে বানানো হয় “consumer profile”।

অবাক হবেন, তথ্য ব্যবসা এখন তেল বা স্বর্ণের থেকেও লাভজনক। ২০২৩ সালের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ডেটা ইন্ডাস্ট্রির বাজারমূল্য প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার ছুঁয়েছে। অথচ এই বাজারে তথ্যদাতাদের অর্থাৎ আমাদের প্রায় কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। আমরা জানিই না কোন কোম্পানি আমাদের কী তথ্য নিচ্ছে, কিভাবে ব্যবহার করছে।

তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া এতটাই নিখুঁত এবং গোপন যে অনেকেই তা টেরই পান না। আপনি যখন অনলাইনে কিছু পড়ছেন, পেছনে চলতে থাকে ট্র্যাকিং কোড, স্ক্রিপ্ট, কুকিজ, যেগুলো আপনার মনোযোগের প্রতিটি পদক্ষেপকে ধরে রাখে।

এই তথ্যগুলো কেবল পণ্যের জন্য ব্যবহৃত হয় না, ব্যবহার হয় মানুষের মনোভাব পাল্টানোর জন্য। ধরুন আপনি কিছুদিন ধরে হতাশায় আছেন সার্চ হিস্টরি, ঘুমানোর টাইম, মোবাইল ব্যবহার সবই তা বলে দেবে। এবার বিজ্ঞাপনদাতা জানে আপনি কোন সময়ে কোন বার্তায় সবচেয়ে দুর্বল হবেন। এখানেই Surveillance Capitalism-এর আসল খেলা।

২০১৮ সালের মার্চ মাসে Cambridge Analytica কেলেঙ্কারির খবর ফাঁস হয়। এটি ছিল এক ব্রিটিশ ডেটা অ্যানালিটিক্স ফার্ম, যারা Facebook-এর প্রায় ৮৭ মিলিয়ন ব্যবহারকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করে “psychological profiling” তৈরি করেছিল।

তারা একটি ফেসবুক অ্যাপ ব্যবহার করেছিল যেটি ব্যবহারকারীদের “Personality Quiz” খেলার নামে তাদের তথ্য এবং তাদের ফ্রেন্ড লিস্ট থেকে ডেটা টেনে নিত। Cambridge Analytica দাবি করে তারা মানুষকে “manipulate” না করে “influence” করেছিল। কিন্তু এই প্রভাব এমনভাবে ছিল যে, তা ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং ব্রেক্সিট ভোটে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল বলেও অভিযোগ ওঠে।

Cambridge Analytica প্রমাণ করে দিয়েছে, আজকের দিনে তথ্য মানেই রাজনৈতিক শক্তি। আপনি যে খবরটা পড়লেন, যে পোস্টটা শেয়ার করলেন সবকিছুই কিন্তু নিয়ন্ত্রিত হতে পারে একটি অদৃশ্য কোম্পানির হাতে।

অনেকে ভাবেন Surveillance Capitalism কেবল আমেরিকা-ইউরোপে ঘটে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষত বাংলাদেশেও, এই প্রক্রিয়া গোপনে কাজ করছে। আপনি বিকাশ, নগদ বা অন্য কোনো ডিজিটাল সেবা ব্যবহার করেন? আপনি ফেসবুকে পণ্যের কমেন্টে আগ্রহ দেখান? সবকিছু advertising algorithm-এর রেকর্ডে যাচ্ছে।

আমাদের দেশে ডেটা প্রোটেকশন আইন এখনো অনেক দুর্বল। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো কীভাবে তথ্য ব্যবহার করছে, তা জানার বা বাধা দেওয়ার পর্যাপ্ত আইনি সুযোগ পর্যন্ত নেই।

এই বাস্তবতায় আমরা কী করতে পারি?

আমাদের জানতে হবে কোন অ্যাপ কী তথ্য নেয়, কেন নেয়। আমাদের দরকার ডেটা অধিকার আইন যেখানে ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত হলে, তাতে আমাদের সম্মতি প্রয়োজন হবে। বিনামূল্যে সবকিছু ব্যবহার মানেই হয়তো আমরা নিজেরাই বিক্রি হয়ে যাচ্ছি, এই উপলব্ধিটা জরুরি। বড় কর্পোরেশন ও সরকারের কাছে স্বচ্ছতা চাইতে হবে, তাদের Surveillance Practices কি ন্যায়সঙ্গত?

Surveillance Capitalism এখন এমন এক বাস্তবতা, যেখানে আমরা নিজেরাও বুঝি না আমরা পর্যবেক্ষণাধীন। Cambridge Analytica কেলেঙ্কারি ছিল এর একটি চূড়ান্ত প্রমাণ। তথ্য সংগ্রহ আজ আর নিরীহ প্রযুক্তি নয় এটা এক রাজনৈতিক অস্ত্র।

আমরা যদি গোপনীয়তার দাবি না তুলি, যদি আমাদের তথ্যের উপর আমাদের অধিকার স্বীকার না করি তবে ভবিষ্যতের নাগরিক সমাজ শুধু পর্যবেক্ষিত” হবে না, পরিচালিতও হবে। মনে রাখা দরকার এখানে এই গোপনীয়তা মানে লুকানো নয়, নিজের মতো নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকা।

এ বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা

0

ঢাকার হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর উপস্থিতি কম হলেও স্বস্তির সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে বিশেষজ্ঞরা। থেমে থেমে বৃষ্টি, মশা নিধনে জোর না দেওয়ার কারণে চলতি বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে বলে জানিয়েছেন তারা।

এডিস মশার বিস্তার শুরু হয় সাধারণত জুন মাসে। এসময় বৃষ্টিতে জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে লার্ভা জমে। বৃষ্টির পর তাপ বাড়লে এই পানিতে জমে থাকা এডিসের ডিম দ্রুত পূর্ণাঙ্গ মশায় রূপ নেয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এডিস রোধে যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে জুলাই-আগস্টে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

ডেঙ্গু পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল ২০২৩ সালে। ২০২৩ সালে সারা দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয় ৩,২১,১৭৯ জন এবং মৃত্যু হয় ১,৭০৫ জনের।

এ বছর ১৫ জুন পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫ হাজার ৯৮৮ জন ও মারা গেছেন ৩০ জন। ২০২৩ সালেও ১৫ জুন পর্যন্ত দেশের মোট ডেঙ্গু রোগী ছিলো ৩,১৪৮ জন এবং মৃত্যু ছিলো ২৪ জনের।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ ও মশাবাহিত রোগ নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করা ড. কবিরুল বাশার দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, ‘ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় আমাদের যে সার্ভে চলে সেখানে আমরা দেখেছি, গত বছরের এই সময়ের তুলনায় এ বছর মশার ঘনত্ব বেশি। আবার এ বছর রোগীও বেশি। একদিকে মশার ঘনত্ব বেশি, রোগী বেশি — এটা থেকে মনে হচ্ছে, এ বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার ঝুঁকি আছে।’

এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে ইশরাককে মেয়র হিসেবে শপথ পড়াতে চলা আন্দোলনের কারণে নগর ভবনে গত এক মাস ধরে তালা ঝুলছে। ফলে নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনেও মশক নিধন কার্যক্রম জোরালোভাবে চলছে না বলে বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া স্থানীয় সরকার ঢাকার বাহিরের পৌরসভা কিংবা উপশহরগুলোতে মশক নিধন জোরদার করতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশের চাকুরীতে সংখ্যালঘুর আনুপাতিক উপস্থিতি, জনসংখ্যার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ব্যতিক্রম সামরিক বাহিনী

বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি বহু খাত ও প্রতিষ্ঠানে সংখ্যালঘু কর্মকর্তাদের উপস্থিতির হার দেশের মোট জনসংখ্যায় তাদের ৯% অনুপাতের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ — এমনকি কিছু ক্ষেত্রে খানিকটা বেশিও। বাংলাদেশের জনপরিসরে জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে নেত্র নিউজের করা একটি বিশ্লেষণে এমন চিত্র উঠে এসেছে। এক্ষেত্রে, বাংলাদেশ স্পষ্টতই প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে ভালো করেছে।

তবে, সামরিক বাহিনী এখনও রয়ে গেছে সংখ্যালঘুদের নাগালের বাইরে। নেত্র নিউজের হাতে আসা বাংলাদেশ সেনা ও নৌবাহিনীতে সক্রিয় কর্মকর্তাদের অতি-গোপনীয় দুইটি তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নৌবাহিনীর কমিশন্ড কর্মকর্তাদের মধ্যে সংখ্যালঘুদের হার ১%-এর সামান্য বেশি। আর সেনাবাহিনীতে ১%-এর কম।

নেত্র নিউজের বিশ্লেষণে দেখা যায়, জনপ্রশাসনে সংখ্যালঘু কর্মকর্তাদের হার ১০.৫ শতাংশের বেশি, অধস্তন আদালতে ১০% ও পুলিশে ৯%। বাংলাদেশে প্রায় দেড় কোটি সংখ্যালঘুর বাস, যা মোট জনসংখ্যার ৯%।

সংখ্যালঘুদের এই আনুপাতিক অংশগ্রহণ শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের শীর্ষ বিদ্যাপীঠ ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী শিক্ষকদের মধ্যে সংখ্যালঘুদের হার ১০ শতাংশেরও বেশি।

এর বাইরে পেশাজীবি সংগঠনগুলোতেও আছে তাদের কমবেশি আনুপাতিক উপস্থিতি। যেমন, দেশের শীর্ষ আইনজীবীদের সংগঠন সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যদের ৮% ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) ৮.৫৭% হলেন সংখ্যালঘু।

জনসংখ্যা ছাড়াও বিভিন্ন মেধাতালিকার সঙ্গেও এই পরিসংখ্যানের সঙ্গতি রয়েছে। যেমন, ঢাকা বিভাগে ২০২৪ সালে এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে মেধাবৃত্তি পাওয়া ৩,২৩৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে সংখ্যালঘুদের হার ৯.৬০%।

কিন্তু এর মানে এই নয় যে, বেসামরিক সরকারের সকল পর্যায়ে বাংলাদেশ সংখ্যালঘুদের অংশগ্রহণ সমভাবে নিশ্চিত করতে পেরেছে। বরং, উপরের পদগুলোতে সংখ্যালঘুদের পদচারণা কমে যেতে থাকে।

বিচারিক আদালতের সর্বোচ্চ পদ জেলা জজ ও তদুর্ধ্ব পদে প্রায় ৯৬% মুসলিম, যদিও নিম্ন আদালতে বিচারকদের মধ্যে মুসলমানদের সামগ্রিক হার ৯০%-এর কম।

বেসামরিক প্রশাসনে এই ব্যবধান আরও তীব্র : ৭৪ জন শীর্ষ-স্তরের সচিবের মধ্যে মাত্র একজন অমুসলিম। পুলিশে নেতৃত্বের পদগুলোতেও একই প্রবণতার প্রতিফলন দেখা যায়। ৮১ জন ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল বা তার চেয়ে উচ্চতর পদে মাত্র ৫ জন সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নাগরিক রয়েছেন।

অপরদিকে ভারতের কেন্দ্রীয় সিভিল সার্ভিসে দেশটির প্রধান সংখ্যালঘু গোষ্ঠী মুসলমানদের অংশগ্রহণ মাত্র ৪%, যদিও তারা জাতীয় জনসংখ্যার ১৪%।

জনসংখ্যার অনুপাত সমন্বয় করে নিলে বাংলাদেশের সিভিল সার্ভিস ও পুলিশে কর্মকর্তা পর্যায়ে হিন্দুদের অংশগ্রহণ ভারতে মুসলমানদের অংশগ্রহণের ৩ থেকে ৪ গুণ।

সামরিক বাহিনীতে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের অংশগ্রহণ অনেকটা ভারতের মতোই। ২০১২ সালের একটি গবেষণা অনুযায়ী, ভারতে বৃহত্তম সংখ্যালঘু গোষ্ঠী মুসলমান সম্প্রদায় থেকে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর অফিসার কোরের সদস্য আছেন মাত্র ২%।

সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচকদের কারও কারও দাবি ছিল, দলটির আমলে প্রশাসন ও পুলিশের উচ্চতর পদে ব্যাপক আকারে হিন্দু কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হতো। নেত্র নিউজের বিশ্লেষণে ইঙ্গিত মিলছে যে, এই ধরণের দাবি অনেকটাই অতিরঞ্জিত।

বরং, বাংলাদেশে যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক কোনো গোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্য বা পক্ষপাত করা হয়ে থাকে, তার সব ধরণের লক্ষণ উপস্থিত সামরিক বাহিনীতে, যেখানে অমুসলিম কর্মকর্তাদের উপস্থিতি একেবারেই নগন্য।

রাজস্ব আয় কমলেও বাড়ছে ভর্তুকির বোঝা

আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারের ১ লাখ ২৫ হাজার ৭৪১ কোটি টাকার ভর্তুকি ও প্রণোদনার লক্ষ্যমাত্রা সংকটময় অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে রাজস্ব আদায়ের চাপ বাড়িয়ে দেবে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে মূল ভর্তুকি বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। তবে সংশোধিত বাজেটে তা দাঁড়ায় ১ লাখ ৪১ হাজার ৩৪ কোটি টাকা। অন্তর্বর্তী সরকার বিদ্যুৎসহ বেশ কয়েকটি খাতে বেশিরভাগ বকেয়া পরিশোধ মঞ্জুর করায় তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

নতুন ভর্তুকি বরাদ্দের বেশিরভাগই যাবে বিদ্যুৎ, সার ও খাদ্য খাতে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেশি খরচ, বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, দরিদ্রদের খাদ্য সহায়তা ও ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ভর্তুকি খরচ ক্রমাগত বেড়েছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাত ভর্তুকি হিসেবে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ পেতে পারে।

এলএনজি আমদানিতে ভর্তুকি আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৯ হাজার কোটি টাকা হবে।

দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ পেতে যাচ্ছে কৃষি খাত। সরকার খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার করতে সার ও আধুনিক যন্ত্রের ওপর জোর দিচ্ছে।

কম আয়ের পরিবারগুলোকে সহায়তার লক্ষ্যে আগামী অর্থবছরে খাদ্য ভর্তুকি ৩১% বাড়িয়ে ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা করার পরিকল্পনা আছে সরকারের।

রপ্তানি প্রণোদনা ৭ হাজার ৮২৫ কোটি ও রেমিট্যান্স প্রণোদনা ৬ হাজার ২০০ কোটি টাকা থাকতে পারে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ লুৎফর রহমান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘রপ্তানিমুখী শিল্পে বছরের পর বছর প্রণোদনা দেওয়া দেশীয় শিল্প রক্ষার কোনো কার্যকর উপায় নয়। প্রতিযোগিতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। ব্যবসার পরিচালন খরচ কমিয়ে সরকার অবদান রাখতে পারে।’

অধ্যাপক লুৎফর রহমানের মতে, রেমিট্যান্সের ওপর নগদ প্রণোদনা বছরের পর বছর চলমান রাখা যাবে না। বিশেষ করে বিনিময় হার এখন প্রায় বাজারভিত্তিক, তাই এগুলো এখন বাদ দেওয়া যেতে পারে।

Hollow Earth Theory : পৃথিবীর অভ্যন্তরে আরেকটি পৃথিবী?

আমরা বিশ্বাস করি পৃথিবী কঠিন গঠনে তৈরি। ভিতরে লোহা, ম্যাগমা আর শক্ত নিউক্লিয়াস। কিন্তু যদি বলা হয়, এই কঠিন পৃথিবীর ভেতরে লুকিয়ে আছে আরেকটি পৃথিবী? যেখানে আছে নিজস্ব সূর্য, অচেনা প্রাণী, আর উন্নত সভ্যতা, তাহলে কেমন হবে?

এটাই হোলো আর্থ থিওরি, বা “ফাঁপা পৃথিবী তত্ত্ব”। এটি এক অদ্ভুত ষড়যন্ত্রতত্ত্ব, যা বিজ্ঞানসম্মত না হলেও ইতিহাস, মিথ ও আধুনিক সংস্কৃতির ধারায় দারুণভাবে প্রভাব ফেলেছে।

হোলো আর্থ তত্ত্বের ছায়া প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ, উপকথা, লোককাহিনি ও দর্শনের নানা জায়গায় ছড়িয়ে আছে। হিন্দু ধর্মে পাতাললোক, বৌদ্ধ ধর্মে ‘অঘর্তি’ নামক গোপন স্থান, প্রাচীন গ্রীক উপকথায় হেডিস (Underworld)—এই সবকিছু যেন ইঙ্গিত দেয়, পৃথিবীর অভ্যন্তরে অন্য এক গোপন জগত আছে। তিব্বতের “শাম্বালা” নামক গুপ্ত রাজ্য ও মঙ্গোলিয়ান ধারণায় “আগর্থা”—দুটি ভিন্ন সম্প্রদায়ের কল্পিত আধ্যাত্মিক জগৎ, যার অবস্থান পৃথিবীর গভীরেই বলে বিবেচিত।

এই ধারণাকে আধুনিক সময়ে নিয়ে আসেন ১৭শ শতকের বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডমন্ড হ্যালি। তিনি ১৬৯২ সালে প্রস্তাব করেন, পৃথিবী একাধিক ঘূর্ণনশীল স্তরের ফাঁপা গোলকে তৈরি এবং এর কেন্দ্রেও হয়তো একটি সূর্য আছে। তিনি এই ধারণা দেন ভূমিকম্পের তরঙ্গ বিশ্লেষণের ভিত্তিতে। ১৮১৮ সালে জন ক্লিভস সাইমস উত্তর ও দক্ষিণ মেরুতে গহ্বরের (Polar Openings) অস্তিত্ব দাবি করে বলেন, মানুষ সেই পথ দিয়ে ভেতরের পৃথিবীতে প্রবেশ করতে পারবে। তিনি সরকারের কাছে অর্থ চেয়ে “সাইমস হোল” নামে পরিচিত অভিযানের পরিকল্পনাও করেন।

হোলো আর্থ তত্ত্ব অনুসারে ভেতরের জগতে এক উন্নত সভ্যতা বাস করে, যাদের বুদ্ধিবৃত্তি, প্রযুক্তি এবং আধ্যাত্মিকতা বাইরের মানবজাতির তুলনায় অনেক বেশি। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ একসময় মানবজাতির হয়েছে এমন দাবিও উঠে এসেছে অনেক ডায়েরি ও রহস্যময় লেখায়। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ১৯১৩ সালে মার্শাল বি. গার্ডনার তার বইতে বলেন, পৃথিবীর ভেতরে একটি সূর্য, বনাঞ্চল এবং এলিয়েনজাতীয় উন্নত মানব জাতি বসবাস করে। তিনি ছবি ও মানচিত্র দিয়ে তার তত্ত্ব সমর্থন করার চেষ্টা করেন।

নাজি জার্মানি হোলো আর্থ থিওরিকে একটি কার্যকর বিশ্বাসে পরিণত করে। বলা হয় হিটলারের কিছু ঘনিষ্ঠ বিজ্ঞানী বিশ্বাস করতেন, পৃথিবীর অভ্যন্তরে এক আদি আর্য জাতির উৎস রয়েছে। তারা এন্টার্কটিকায় অভিযান চালিয়ে সেখানে গোপন ঘাঁটি তৈরি করে এবং ভেতরের পৃথিবীতে প্রবেশের চেষ্টা করে। কিছু ষড়যন্ত্রতত্ত্বে দাবি করা হয় হিটলার আত্মহত্যা করেননি বরং সেই গোপন অভ্যন্তরীণ জগতে পালিয়ে যান।

১৯৪৭ সালে অ্যাডমিরাল রিচার্ড বার্ড ‘অপারেশন হাইজাম্প’ নামে এক অভিযান চালান দক্ষিণ মেরুতে। কিছু গোপন ডায়েরি অনুসারে তিনি জানান তিনি এক অজানা অঞ্চলে প্রবেশ করেন যেখানে সবুজ বন, বৃহদাকার পাখি এবং আলো ছড়ানো অভ্যন্তরীণ সূর্য রয়েছে। সেখানকার সভ্যতা শান্তিপূর্ণ ও উন্নত।যদিও এই ঘটনার কোনো প্রামাণ্য বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, তথাপি ষড়যন্ত্রবাদীরা একে হোলো আর্থ থিওরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বলে মনে করেন।

আজকের দিনে এই তত্ত্ব সিনেমা, টিভি সিরিজ, গেমস ও ইউটিউব ষড়যন্ত্রতত্ত্বে দারুণভাবে জনপ্রিয়। “Journey to the Center of the Earth” (জুল ভার্নের উপন্যাস), “Godzilla vs Kong” (২০২১), এবং Marvel-এর কিছু কাহিনিতে এই ধারণার ছায়া পড়েছে। ইন্টারনেটে বহু ব্যক্তি দাবি করেন NASA এবং শক্তিশালী সরকারসমূহ উত্তর-দক্ষিণ মেরুতে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দিয়েছে যাতে পৃথিবীর অভ্যন্তরের গোপনীয়তা টিকিয়ে রাখা যায়।

বিজ্ঞান কী বলে?
ভূমিকম্পের তরঙ্গ বিশ্লেষণ, গ্র্যাভিটেশনাল মডেল ও ভূ-তাত্ত্বিক পরীক্ষার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা বারবার প্রমাণ করেছেন, পৃথিবীর গভীরে রয়েছে কঠিন ও গলিত ধাতব স্তর, ম্যাগমা ও সলিড কোর। কোনো ফাঁপা জায়গা নেই। তবে হোলো আর্থ থিওরি বিশ্বাসীরা মনে করেন, এই প্রমাণপত্র ও তথ্য ‘মহা ষড়যন্ত্র’ এর অংশ। NASA এবং ক্ষমতাবান গোষ্ঠী সত্য লুকিয়ে রেখেছে। হোলো আর্থ তত্ত্ব কেবল একটি ষড়যন্ত্র নয় এটি এক আদিম মানবিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিচ্ছবি। অজানার খোঁজ, গোপন পৃথিবীর বাসিন্দা হওয়ার কল্পনা এবং এমন এক বাস্তবতা যেখানে সব কিছু আমাদের চেনা জগতের বাইরে।

গরমে স্বস্তি আনবে যেসব খাবার

তীব্র গরমে শরীর ও মন দুটোই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। রাস্তায় বেরোলেই ঘামে ভিজে একাকার অবস্থা। এই সময় শরীরকে ঠান্ডা ও হাইড্রেটেড রাখতে হলে প্রয়োজন সঠিক খাদ্যাভ্যাস। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন কিছু খাবার রয়েছে যা গরমে শরীরকে ঠান্ডা রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। প্রথমেই বলতেই হয়, পানিসমৃদ্ধ শাকসবজির কথা। যেমন—পালংশাক, লাউ, ঝিঙে, চিচিঙ্গে, পটল ইত্যাদি। এসব সবজিতে জলীয় অংশ বেশি থাকায় এগুলো শরীরের পানির ভারসাম্য রক্ষা করে এবং অস্বস্তি কমাতে সাহায্য করে। রান্না করে খাওয়া ছাড়াও এগুলোর অনেকটাই রায়তা বা স্যালাড হিসেবে খাওয়া যায়।

গ্রীষ্মের ফলের মধ্যেও আছে শরীর ঠান্ডা রাখার গুণ। তরমুজ, জাম, জামরুল, তালশাঁস, শসা—এসব ফলে জলীয় অংশ বেশি এবং এরা প্রাকৃতিকভাবে শরীরকে ঠান্ডা রাখতে পারে। প্রতিদিন খাদ্যতালিকায় অন্তত একটি ফল রাখার অভ্যাস করা উচিত। এছাড়া দই একটি প্রাকৃতিক কুলার হিসেবে কাজ করে।দই পেট ভালো রাখে, হজম শক্তি বাড়ায় এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এক গ্লাস ঘোল বা ঠান্ডা দইয়ের রায়তা গরমে স্বস্তির পরশ দিতে পারে।

ডাবের পানি বা পুদিনা পাতার শরবতও গরমের জন্য আদর্শ। ছাতু বা তেঁতুলের শরবত শরীর ঠান্ডা রাখে, ক্লান্তি দূর করে এবং হাইড্রেশন বজায় রাখে।অনেকেই গ্রীষ্মে পান্তা ভাত খেয়ে থাকেন, এটি প্রাচীনকাল থেকেই বাংলার গরমে জনপ্রিয়। এটি শরীর ঠান্ডা রাখে এবং সহজে হজম হয়। গরমে সুস্থ থাকতে হলে খাদ্যতালিকায় এই উপাদানগুলো নিয়মিত রাখার চেষ্টা করুন। সঠিক খাবারই হতে পারে আপনার গরমকালীন প্রতিরক্ষা।

কেন মনে হচ্ছে আপনার প্রতিটি পদক্ষেপই নজরদারিতে?

এমন একটা জায়গার কথা ভাবুন, যেখানে সবাই জানে কেউ তাকে সবসময় দেখছে, কিন্তু ঠিক কখন দেখছে সেটা কেউ জানে না। এই ভয়ের কারণে সবাই নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে বাধ্য হচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় মানুষের এই ধারণা প্যানোপটিকন সমাজ বলে পরিচিত।

প্যানোপটিকন শব্দটা এসেছে ১৮শ শতকের ব্রিটিশ দার্শনিক জেরেমি বেনথামের এক বিশেষ কারাগারের নকশা থেকে। তিনি এমন একটি ভবন কল্পনা করেছিলেন, যেখানে কেন্দ্রীয় একটি টাওয়ার থেকে কয়েদিদের ওপর নজরদারি করা হয়। কিন্তু কয়েদিরা কখনো বুঝতে পারে না কখন তাদের দেখা হচ্ছে আর কখন নয়। এই অনিশ্চয়তা তাদের মধ্যে এমন এক মানসিক অবস্থা তৈরি করে, যেখানে তারা সবসময় মনে করে কেউ তাদের দেখছে। ফলে সারাক্ষণ নিজেদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে রাখা ছাড়া তাদের কোনো উপায় থাকে না।

এই ধারণা শুধু কারাগারে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো এই প্যানোপটিকনকে আধুনিক সমাজের শক্তি ও নিয়ন্ত্রণের প্রতীক হিসেবে দেখিয়েছেন। তার মতে আধুনিক সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, স্কুল, হাসপাতাল, অফিস, এমনকি সামাজিক মাধ্যমেও একই ধরনের নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা কাজ করে। আমরা সবাই যেনো এক অদৃশ্য চোখের নিচে বাস করছি, যেখানে কেউ জানে না কখন তাকে দেখা হচ্ছে, কিন্তু ভয়ের কারণে নিজেরাই নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করি।

আজকের ডিজিটাল যুগে প্যানোপটিকনের ধারণা আরও বিস্তৃত হয়েছে। ধরুন আপনি যখন ফেসবুকে কিছু পোস্ট করছেন, আপনি কিন্তু জানেন না ঠিক কতজন সে তথ্য দেখছে, কারা আপনার ছবি দেখে আপনাকে বিচার করছে। এই অদৃশ্য নজরদারির কারণে আপনি হয়তো নিজের কথাবার্তা, ছবি, এমনকি চিন্তাধারাও নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেছেন।

আমাদের দেশেও এই আধুনিক প্যানোপটিকনের ছায়া পড়েছে। শহরের রাস্তায় সিসিটিভি ক্যামেরা, স্মার্ট সিটি প্রকল্পের আওতায় নাগরিকদের ডেটা সংগ্রহ, মোবাইল ফোনের মাধ্যমে লোকেশন ট্র্যাকিং—সবই কিন্তু এক ধরনের আধুনিক নজরদারি। আমরা বুঝতে না পারলেও কিন্তু আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ নজরদারির আওতায়।

প্যানোপটিকন সমাজের অন্যতম বড় সমস্যা হলো ব্যক্তিগত গোপনীয়তার হ্রাস। যখন কেউ জানে তাকে নজরদারী করা হচ্ছে, তখন ব্যক্তির স্বাধীনতা সংকুচিত হয়। ফুকো বলেন, এটি শুধু শারীরিক বন্দিত্ব নয়, এটি মানসিক বন্দিত্ব। মানুষ নিজের মধ্যেই এমন এক ভয় তৈরি করে যেন তাকে সবসময় নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে সমাজে মানুষ নিজের মতামত প্রকাশ করতে ভয় পায়। সর্বদা নজরদারির মধ্যে থাকার কারণে মানসিক চাপ বেড়ে যায়। রাষ্ট্র নাগরিকদের ওপর নজরদারি বাড়িয়ে তাদের রাজনৈতিক মতামত দমন করে। তাই প্রশ্ন আসে, আমরা কি এই আধুনিক প্যানোপটিকনের জালে বন্দী হয়ে যাব? মুক্তির পথ আছে?

মিশেল ফুকো বলেছেন, ক্ষমতার এই জটিল জালে মুক্তির প্রথম ধাপ হলো সচেতনতা। আমাদের বুঝতে হবে এই নজরদারি কেমন কাজ করে, আমাদের ওপর কী প্রভাব ফেলে। এরপর দরকার প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহার ও শক্তিশালী গোপনীয়তা নীতিমালা। নাগরিকদের ডিজিটাল স্বাক্ষরতা বৃদ্ধি করাও জরুরি, যাতে তারা নিজের তথ্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

আমাদের প্রত্যেকেরই দায়িত্ব এই আধুনিক প্যানোপটিকনের জালে নিজেকে বন্দী না করে সচেতন ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে নিজেদের ভূমিকা পালন করা। প্যানোপটিকনের অদৃশ্য চোখ থেকে মুক্তি পেতে আমাদের একসঙ্গে সচেতন হতে হবে, প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, আর সর্বোপরি নিজেদের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে।

ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের প্রভাব : এলএনজি সরবরাহ সংকটে পড়তে পারে বাংলাদেশ

0

ইরান ও ইসরায়েলের সংঘর্ষে নতুন করে উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি। এর জেরে পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি দিয়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও জ্বালানি তেল সরবরাহে ব্যাপক ধাক্কা খাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। কেননা পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে পথটি বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা এসেছে তেহরানের পক্ষ থেকে।

যদি সত্যিই বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ এ সামুদ্রিক পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়, তবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি সারা বিশ্বের অর্থনীতির ওপরই পড়বে তীব্র নেতিবাচক প্রভাব।

বিশ্বজুড়ে নতুন করে বাড়িয়ে তুলতে পারে মূল্যস্ফীতি। এর আঁচ এড়াতে পারবে না বাংলাদেশও। কারণ কাতার থেকে কেবল হরমুজ প্রণালি দিয়েই এলএনজি আমদানি করতে হয়।

বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি। ইরানের উপকূল ঘেঁষা সরু এ চ্যানেল সংযুক্ত করেছে জ্বালানি তেলসমৃদ্ধ পারস্য উপসাগর ও আরব সাগরকে।

শুধু ইরানই নয়, পারস্য উপসাগরের তীরবর্তী সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও ইরানের জ্বালানি তেল রফতানির প্রায় পুরোটাই নির্ভর করে এ পথের ওপর।

ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী গুরুত্বপূর্ণ এ সামুদ্রিক পথ দিয়ে দৈনিক দেড় কোটি ঘনমিটারের মতো এলএনজি পরিবাহিত হয় বলে ইন্টারন্যাশনাল গ্যাস ইউনিয়নের (আইজিইউ) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার ও ওমান থেকে এলএনজি আমদানি করে, যার সিংহভাগই আসে এ পথে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) এক প্রতিবেদন অনুসারে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিবাহিত হয়, বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যের যা প্রায় ২১%। আর এলএনজি-র বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় ২০% পরিবাহিত হয় এ রুটে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘমেয়াদি অবরোধ হলে ব্যারেলপ্রতি জ্বালানি তেলের দাম ১০০ থেকে ১৩০ ডলার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। রয়টার্সের তথ্যানুসারে, ১২ জুন পর্যন্ত ব্যারেলপ্রতি অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ছিল ৭০ দশমিক ৪ ডলার। একদিনের ব্যবধানে তা ৭৮ দশমিক ৫ ডলারে উঠে গেছে।