Home Blog Page 72

২০২৫-২৬ অর্থবছরের স্বাস্থ্যখাতে বাজেট নিয়ে আশাবাদ ও সংশয়

বাংলাদেশের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ পেয়েছে ৪১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা। চলতি বছরের তুলনায় মাত্র ৫০১ কোটি টাকা বাড়লেও, দেশের স্বাস্থ্য খাতের বিশাল চাহিদার তুলনায় এই বরাদ্দ ‘খুবই অপ্রতুল’ বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ। তিনি মনে করেন বাজেটে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবায়ন নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েছে।

স্বাস্থ্য বাজেটের সামগ্রিক মূল্যায়ন করতে গিয়ে ড. হামিদ বলেন, “জাতীয় বাজেট শুধু একটি আর্থিক দলিল নয়, এটি রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার, নীতি-পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ রূপরেখার প্রতিফলন।” তার মতে, স্বাস্থ্য খাতে বাজেটের এই সামান্য বৃদ্ধি কিছুটা স্বস্তি দিলেও, দেশের বাস্তব চাহিদার তুলনায় তা যথেষ্ট নয়। তিনি বলেন, “গত বছরও বাজেটের প্রায় অর্ধেক অব্যবহৃত থেকে গেছে। ফলে এবারের বাজেট কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হবে, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে”।

বাজেটের গঠন ও অগ্রাধিকার নিয়ে বিশ্লেষণে উঠে আসে, উন্নয়ন বাজেটের তুলনায় পরিচালন বাজেটে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ হিসেবে বলা হয়, জনবল সংকট এখন স্বাস্থ্য খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা। হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট সব স্তরেই শূন্য পদ রয়েছে। বাজেটে বিশেষ বিসিএস ও জরুরি নিয়োগের উদ্যোগকে ইতিবাচক বলে উল্লেখ করেন ড. হামিদ, তবে বাস্তবায়নের গতি ও দক্ষতা নিয়ে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন।

নতুন প্রকল্প গ্রহণে স্থবিরতা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিনিয়োগের ঘাটতির কথাও উঠে আসে তার বক্তব্যে। রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো চলমান প্রকল্পে বরাদ্দ অব্যাহত থাকলেও, নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন ছিল বলে তিনি মনে করেন।

জাতীয় স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সুপারিশে বাজেটের কতটা প্রতিফলন ঘটেছে এ প্রশ্নে ড. হামিদ বলেন, কমিশন স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ ও মোট বাজেটের ১৫ শতাংশ বরাদ্দের সুপারিশ করেছিল। কিন্তু বাজেট তৈরির সময়ের কারণে এসব সুপারিশ পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি। তবে জনবল সংকট নিরসনে দ্রুত নিয়োগের উদ্যোগকে কমিশনের সুপারিশের আংশিক প্রতিফলন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

স্বাস্থ্য বাজেট বাস্তবায়নের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে আসে প্রশাসনিক জটিলতা, অদক্ষ ব্যবস্থাপনা, অনুপযোগী ক্রয়নীতি, অডিট ভীতি, বিপুল শূন্য পদ, প্রকল্প পরিচালনায় দক্ষতার অভাব ও দুর্নীতি। এসব কারণে বাজেটের বড় অংশ অব্যবহৃত থেকে যায় এবং কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যায় না।

সমাধান হিসেবে ড. হামিদ স্বাস্থ্য খাতের জন্য আলাদা সার্ভিস গঠন, ম্যানেজারিয়াল দক্ষতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য উপযোগী ক্রয়নীতি ও নমনীয় অডিট ব্যবস্থা, স্থায়ী জনবল নিয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে বাজেটের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হলে স্বাস্থ্যসেবা সর্বজনীন হবে এবং উন্নত চিকিৎসা সবার কাছে পৌঁছাবে। শেষ পর্যন্ত বাজেট যেন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে জনগণের সেবায় বাস্তবায়িত হয়, এটাই সবার প্রত্যাশা।

ফরেন পলিসির নিবন্ধ : ইরান-ইসরায়েল সংঘাত যেভাবে শেষ হতে পারে

ইসরায়েলের লক্ষ্য হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি দুর্বল করা এবং দেশটির সামরিক ক্ষমতাকে ধ্বংস করা। বেশ কয়েকটি বিকল্প আছে, যেভাবে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত শেষ হতে পারে।

প্রথমত, ইরান ইসরায়েলে বেশ কয়েকটি বড় আকারের সামরিক হামলা চালাবে। এরপর নিজ জনগণের কাছে দাবি করবে যে তারা পাল্টা জবাব দিয়েছে এবং ইসরায়েলিদের ক্ষতি করেছে। এরপর দ্রুতই যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যুদ্ধবিরতির চেষ্টায় তারা সম্মতি দেবে। সংক্ষেপে, এটি হবে মুখ বাঁচানোর লক্ষ্যে ‘একটি কৌশলগত আত্মসমর্পণ’।

মূলত, লেবাননভিত্তিক হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের অভিযানের পর একই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছিল। ইসরায়েলের বর্তমান ইরান হামলা হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে চালানো অভিযানের সঙ্গেই সাদৃশ্যপূর্ণ—সামরিক অবকাঠামোতে ব্যাপক হামলা এবং অসংখ্য গুপ্তহত্যার মাধ্যমে শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়া। এই বিষয়টি ইরানের নিরাপত্তা পরিষেবায় ইসরায়েলের গভীর অনুপ্রবেশের প্রমাণ দেয়।

ইসরায়েলে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা খুব বেশি ক্ষতি করতে পারেনি। ইরানের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের চালানো বিধ্বংসী হামলা ইরানের নেতৃত্বকে বিশৃঙ্খল করে দিতে পারে। ইসরায়েল সম্ভবত নতুন কমান্ডার এবং তাদের স্থলাভিষিক্তদের ওপরও হামলা চালাবে।

ইরান অবশ্যই যুদ্ধের মধ্যে আত্মসমর্পণ করতে চায় না, কিন্তু তারা হয়তো ক্রমাগত হামলা সহ্য না করে ভবিষ্যতের জন্য টিকে থাকার পথ বেছে নেবে।দ্বিতীয় সম্ভাবনা হলো, ইরান টিকে থাকবে এবং ইসরায়েলের ওপর কিছু আঘাত হানবে। এটি প্রক্সি গোষ্ঠী ব্যবহার করে গেরিলা কৌশলে আঘাত হানা, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ভেদ করে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা বা অন্য কোনো উপায়েও হতে পারে। ইরানের নাতাঞ্জ ও অন্যান্য পারমাণবিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ইরান তুলনামূলকভাবে দ্রুত তা মেরামত করতে পারবে।

একই সময়ে, ইসরায়েলের ওপর যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে থাকবে। যদি ট্রাম্প নেতানিয়াহুর ওপর সত্যিকারের চাপ সৃষ্টি করেন, তাহলে ইসরায়েল তাদের অভিযান সংক্ষিপ্ত করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটি আলোচনার চুক্তির জন্য চাপ সৃষ্টি করেছিল। ট্রাম্প হামলার পর ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন। এই ধরনের আলোচনা তেহরানের জন্য আকর্ষণীয়—দেশটির অর্থনীতি বিপর্যস্ত এবং নিষেধাজ্ঞা কমানোর প্রতিশ্রুতি তাদের কাছে লোভনীয়।

তবে ইসরায়েলি হামলার মুখে এটি রাজনৈতিকভাবে আরও কঠিন। ট্রাম্প যেকোনো ছাড়কে নিজের বিজয় বলে ঘোষণা করবেন এবং ইরানকে চাপের মুখে নতি স্বীকার করা হয়েছে বলে মনে হবে।

তবে এমন ইতিবাচক পরিস্থিতির বিপরীতে অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিস্থিতিও সম্ভব এবং সম্ভবত এটিই ঘটার আশঙ্কা বেশি। বিপর্যয়কর পরিস্থিতিগুলোর মধ্যে একটি হলো ইরান-ইসরায়েল সংঘাত আঞ্চলিক যুদ্ধে পরিণত হতে পারে।

যদি তেহরান আলোচনাকে আড়াল হিসেবে দেখে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্থাপনাগুলো ইরানের ‘প্রতিশোধমূলক’ হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।যুক্তরাষ্ট্রও নিজ কারণে উত্তেজনা বাড়াতে পারে।

মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করতে পারেন, ইসরায়েল হামলার মাধ্যমে অর্ধেক কাজ করে ফেলেছে এবং এখন যুক্তরাষ্ট্র বাকি কাজ শেষ করতে পারে। আর তারা ইরানের ফোরদো পারমাণবিক কেন্দ্রে ভারী বাংকার বাস্টার দিয়ে হামলা চালাতে পারে এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে পরিবেশে পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ঘোরতর।

একটি চূড়ান্ত সম্ভাবনা হলো, যুদ্ধ কখনোই শেষ হবে না। অন্তত আনুষ্ঠানিক অর্থে নয়। যদিও ইসরায়েলের বিশাল আকারের হামলার ঢেউ হয়তো একসময় থামবে, কিন্তু নীচু মাত্রার সংঘাত আরও কয়েক মাস ধরে চলতে পারে।

ইসরায়েল হয়তো মাঝেমধ্যে ইরানে ক্ষেপণাস্ত্র বা বিমান হামলা চালাবে, পাশাপাশি ইরানে গুপ্তহত্যা ও অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড চালাবে। ইরানও মাঝেমধ্যে ইসরায়েলের দিকে হামলা চালাবে, সঙ্গে অন্যান্য উপায়েও পাল্টা আঘাতের চেষ্টা করবে।

ক্রমাগত পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যে, ইরান হয়তো পারমাণবিক অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শন ছাড়াই গোপন পারমাণবিক কর্মসূচি তৈরি করতে পারে এবং ইসরায়েলি হামলাকে এর ন্যায্যতা হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

আবার, বিভিন্ন সম্ভাবনার সমন্বয়ও সম্ভব। মার্কিন মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি একটি বৃহত্তর পারমাণবিক চুক্তির প্রথম ধাপ হতে পারে। ইরান হয়তো স্বল্প মেয়াদে ছাড় দেবে, কিন্তু বিশ্বাস করবে যে—প্রতিশোধ ঠান্ডা মাথায় নিতে হয় এবং আগামী মাসগুলোতে প্রক্সি হামলা চালাবে এবং প্রতিশোধের একটি রূপ হবে এটি। এভাবেই এটি একটি চিরস্থায়ী পাল্টাপাল্টি হামলার যুদ্ধে পরিণত হবে।

লোকসংগীত থেকে গণসঙ্গীত

“This land is your land, and this land is my land
From California to the New York Island
From the Redwood Forest to the Gulf Stream Waters
This land was made for you and me”

১৯৪০ সালে যখন আমেরিকা মাত্রই The Great Depression মহামন্দা থেকে উঠে আসে, লক্ষ লক্ষ মানুষ কাজ হারায়, ক্ষুধা, দারিদ্র্য আর ভাঙা স্বপ্ন ছড়িয়ে পড়ে শহর থেকে গ্রামে, তখনো ধনী ও ক্ষমতাশালীরা নিজেদের স্বার্থে নীতিনির্ধারণ করে চলছিলো। সে সময় Woody Guthrie নিজ চোখে আমেরিকার “land of opportunity” মিথ ভেঙে পড়তে দেখে এ গান রচনা করেন। সম্প্রতি গানটি আবার জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সে সময় থেকে এখন পর্যন্ত এটি আমেরিকার বঞ্চিতদের গান।

গণসঙ্গীত মানে শুধু সুর আর কথা নয়, এটি মানুষের প্রতিবাদের ভাষা, বিপ্লবের আত্মবিশ্বাস, আর বঞ্চিতদের কণ্ঠস্বর। বিশ্বজুড়ে গণসঙ্গীত বিভিন্ন সময়ে নানা আন্দোলনের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। চাষির অধিকার, শ্রমিকের দাবি, বর্ণবৈষম্য, উপনিবেশবিরোধিতা কিংবা নারীর স্বাধীনতাসহ সব ক্ষেত্রেই।

কিন্তু এই গণসঙ্গীতের সুর বা সংগীতধারা কীভাবে গড়ে উঠল? এটি কী নির্দিষ্ট কোনো ঐতিহ্য বা অঞ্চলের সংগীতের উপর নির্ভরশীল? নাকি সম্মিলিত সাংস্কৃতিক অভিযাত্রার ফল?

গণসঙ্গীতের সুর সাধারণত ঐতিহ্যবাহী লোকসঙ্গীত, নৃত্য সংগীত এবং জনপ্রিয় আনন্দের সুর থেকে নেওয়া হয়। আসামের আনন্দোচ্ছল প্রেমরসাত্মক নৃত্যের বিহু গানের সুর বহু গণসঙ্গীতের সুরের উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

লোকসংগীতের কণ্ঠে ভর করেই মূলত গণসঙ্গীতের জন্ম। লোকসঙ্গীত নিজেই জনগণের গান, খেটে খাওয়া মানুষের, চাষির, শ্রমিকের বা যাযাবর সমাজের সুর। গানগুলো সহজ ভাষায়, স্বল্পসংখ্যক বাদ্যযন্ত্র দিয়ে পরিবেশিত হয় এবং এর মধ্যে থাকে জীবনসংগ্রামের কাহিনি। যখনই সমাজের নির্দিষ্ট শ্রেণি নিপীড়নের শিকার হয়েছে, তখন এই লোকগানই তাদের রক্তচিৎকারের মতো গেয়ে উঠেছে।

আমেরিকার ‘ব্লুজ’ এবং ‘স্পিরিচুয়ালস’ গান ছিল কৃষ্ণাঙ্গ দাসদের জীবনের প্রতিচ্ছবি। পরবর্তীতে এগুলিই রূপ নিয়েছিল আন্দোলনের সঙ্গীতে। ওডেটা, বব ডিলান বা উডি গাথরির গাণে আমরা এ প্রভাব দেখতে পাই। গাথরির “This Land Is Your Land” গানটি চট করেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বঞ্চিতদের গণসঙ্গীতে রূপান্তরিত হয়।

লাতিন আমেরিকার “Nueva Canción” আন্দোলন শুধু সুর আর প্রতিবাদ নয়, ছিলো সাংস্কৃতিক যুদ্ধ। ভিক্টর হারা, মার্সেডেস সোসা, এবং ইনতিল্লিমানির মতো শিল্পীরা লোকসুরের ওপর ভিত্তি করে গড়েছেন উপনিবেশবিরোধী, সাম্রাজ্যবিরোধী সংগীত। তাদের গান মূলত আদিবাসী মেলোডি, লোকবাজনা এবং স্প্যানিশ গীটারের সংমিশ্রণে তৈরি।

তাদের এই সংগীতধারা পরবর্তীতে হয়ে ওঠে এক নতুন ধারা। জন্ম দেয় আন্দোলন ভিত্তিক সাংস্কৃতিক একতা, যার মধ্যে লুকিয়ে ছিলো স্থানীয় ঐতিহ্য, রাজনৈতিক বার্তা এবং সাধারণ মানুষের হৃদয়ের আকুতি।

উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামে আফ্রিকার গণসঙ্গীত ছিলো রণতুর্য। নাইজেরিয়ার ফেলা কুতি ‘আফ্রো-Beat’ ব্যবহার করে সরাসরি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সুর তুলেছিলেন। তাঁর গানে ছিলো আফ্রিকান লোকবাদ্য, জ্যাজ এবং ইউরোপীয় হারমোনির মিল। গান হয়ে উঠেছিলো রাজনৈতিক ভাষ্য।

এছাড়াও দক্ষিণ আফ্রিকায় ‘টাউনশিপ জ্যাজ’ ও ‘মিবাগান’ ধারার গানগুলো বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের কেন্দ্রে দাঁড়িয়েছিল। গানগুলোতে ছিলো স্থানীয় ঐতিহ্য, ছন্দ এবং ইংরেজি ও স্থানীয় ভাষার সংমিশ্রণ।

ভারতে গণসঙ্গীতের সুর এসেছে মূলত দুটি জায়গা থেকে, ভক্তি ও বাউল ধারার সহজ ভাষার সুর ও আদিবাসী ও আঞ্চলিক লোকগান।

ভারতের তেলেঙ্গানা আন্দোলন থেকে শুরু করে নকশাল আন্দোলন পর্যন্ত নানা পর্বে গণসঙ্গীত অনেক ছিল প্রভাবশালী। কালজয়ী গান “হাম দেকে ঙ্গে আজাদি” বা গণনাট্য সংঘের গানগুলোর মূল ভিত্তিও ছিল লোকসংগীত থেকে অনুপ্রাণিত।

বাংলাদেশের গণসঙ্গীত প্রধানত এসেছে পল্লীগীতি, বাউল, ভাটিয়ালি ও লালনসংগীতের ঐতিহ্য থেকে। সালিল চৌধুরী, শম্ভু মিত্র, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, আর পরবর্তীকালে ফকির আলমগীর, সুফিয়া কামাল সহ সাম্প্রতিক সময়ের ‘জলের গান’-এর মতো দলগুলোর গান এই ধারার সমসাময়িক রূপ। ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধেও গণসঙ্গীতের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি” বা “পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে” গানগুলো হয়ে ওঠে আন্দোলনের অনুষঙ্গ।

ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের পর শ্রমিক শ্রেণির উদ্ভব গণসঙ্গীতের নতুন ধারা সৃষ্টি করে। ব্রিটেন ও ফ্রান্সে গণসঙ্গীতের সুর এসেছে পুরোনো ব্যালাড, ধর্মীয় স্তব ও ‘চ্যান্ট’ থেকে। ফরাসি বিপ্লবের গান “লা মার্সেইয়েজ” একদিকে জাতীয় সংগীত, অন্যদিকে গণসঙ্গীতের আদর্শ উদাহরণ।

আধুনিক ইউরোপীয় গণসঙ্গীতের মধ্যে পরিবেশবাদী আন্দোলন, ফেমিনিজম, LGBTQ অধিকার ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এই গানগুলোতে যেমন আছে ট্র্যাডিশনাল ফোকের ছোঁয়া, তেমনি আছে রক, র‍্যাপ, ইলেকট্রনিক সংগীতের আধুনিক প্রয়োগ।

বিশ্বায়নের ফলে গণসঙ্গীতের সুর এখন আর একটি অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আজকের গণসঙ্গীত হলো আন্তঃসাংস্কৃতিক রসায়ন। ইন্টারনেট, ইউটিউব এবং স্ট্রিমিং সার্ভিসের মাধ্যমে এক অঞ্চলের আন্দোলনের গান সহজেই ছড়িয়ে পড়ে অন্য অঞ্চলে। ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলনের গান “Alright” (কেন্ড্রিক লামার) এখন ল্যাটিন আমেরিকান বা আফ্রিকান আন্দোলনেও শোনা যাচ্ছে।

অন্যদিকে অনেক বিশ্বব্যাপী পরিচিত সুর ‘বেলা চাও’ ইতালির প্রতিরোধ আন্দোলনের গান হলেও আজ তা গাওয়া হয় হংকং থেকে ভারত-বাংলাদেশ পর্যন্ত সর্বত্র। আমরা দেখতে পাই বিশ্বব্যাপী জনমানুষের বঞ্চনার কন্ঠ কিভাবে ধীরে ধীরে হয়ে উঠে বৈশ্বিক সম্পদ।

গণসঙ্গীতের সুরের উৎস খুঁজতে গেলে আমরা দেখতে পাবো বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক ইতিহাস। প্রকৃত অর্থে এটি এসেছে লোকসংগীত থেকে, বঞ্চিতদের হৃদয়ের গভীরতম ব্যথা থেকে এবং কখনও কখনও গীর্জা বা মাজারের্র গলি থেকে।

গণসঙ্গীত কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল বা সংস্কৃতির কোনো একচেটিয়া সম্পদ না, এটি মানুষের স্বাধীন চেতনাবোধের সুর হয়ে কাল, স্থান ও সংস্কৃতি অতিক্রম করে সকল নিপীড়িতের হৃদয়ে আশ্রয় নেয়।

সুমেরীয়রা কি প্রথম সভ্যতা যারা জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জেনেটিক্স জানত?

মানব ইতিহাসের পাতায় সুমেরীয় সভ্যতার নাম এক আলাদা অধ্যায় হিসেবে লেখা। আজ থেকে প্রায় ছয় হাজার বছর আগে মেসোপটেমিয়ার উর্বর মাটিতে গড়ে ওঠা এই সভ্যতা ছিল পৃথিবীর প্রথম সংগঠিত সমাজ। তারা শুধু কৃষি, স্থাপত্য বা আইন-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় নয়, বরং জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞানের এমন কিছু রহস্য রেখে গিয়েছে যা আজও আমাদের বিস্ময়ে ফেলে দেয়। সুমেরীয়রা বর্তমান ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলে, টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিল। তাদের সভ্যতা খ্রিষ্টপূর্ব ৪৫০০ থেকে ১৯০০ অব্দ পর্যন্ত বিকশিত হয়। তারা প্রথমবারের মতো লেখালেখির পদ্ধতি আবিষ্কার করে, যা মানব ইতিহাসে তথ্য সংরক্ষণের এক বিপ্লবী ধাপ ছিল। কাদামাটির তৈরি ইট দিয়ে তারা মন্দির, বাসস্থান ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করত, যা স্থাপত্যকলার ইতিহাসে নতুন অধ্যায় সূচনা করেছিল।

তাদের কৃষিকাজে লাঙ্গল আবিষ্কার ও ব্যবহারের ফলে উৎপাদনশীলতা ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। নদীর পানি সেচের মাধ্যমে জমি চাষের উন্নতি ঘটিয়ে তারা স্থায়ীভাবে বসতি গড়ে তোলে। গণিত ও সময় পরিমাপের ক্ষেত্রে সুমেরীয়রা ৬০ ভিত্তিক সংখ্যা পদ্ধতি ও ৩৬০ ডিগ্রির বৃত্তের ধারণা প্রবর্তন করেছিল, যা আজকের জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণিতের ভিত্তি। সুমেরীয়দের সবচেয়ে বিস্ময়কর অবদান হলো তাদের জ্যোতির্বিজ্ঞান। তাদের মাটির ট্যাবলেট ও সীলনাগরিতে সূর্যকে কেন্দ্র করে গ্রহগুলোর অবস্থান চিত্রায়িত হয়েছে বলে দাবি করা হয়। এটি এমন একটি ধারণা, যা ইউরোপে কোপার্নিকাসের মাধ্যমে প্রায় ১৫০০ খ্রিষ্টাব্দে প্রচলিত হয়েছিল। কিন্তু সুমেরীয়রা হাজার বছর আগে থেকেই সূর্যকেন্দ্রিক সৌরজগতের ধারণা পোষণ করত বলে কিছু গবেষক মনে করেন।

তাদের ট্যাবলেটে এমন গ্রহের চিহ্ন পাওয়া যায় যা তখনকার সময়ে টেলিস্কোপ ছাড়া দেখা সম্ভব ছিল না, যেমন ইউরেনাস, নেপচুন ও প্লুটো। এই তথ্যগুলো রহস্যের জন্ম দেয়, কীভাবে তারা এত সূক্ষ্ম জ্ঞান পেয়েছিল? অনেক গবেষক অনুমান করেন, সুমেরীয়রা হয়তো আকাশের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও গণনায় এতদূর পৌঁছেছিল। তবে বিকল্প গবেষকরা বলেন, এটি সম্ভব নয় যে তারা শুধুমাত্র নিজস্ব পর্যবেক্ষণে এত উন্নত জ্ঞান অর্জন করেছিল। তারা মনে করেন, হয়তো কোনো প্রাচীন হারানো সভ্যতা থেকে এই জ্ঞান সুমেরীয়দের কাছে এসেছে, অথবা এমনকি বাইরের কোনো বুদ্ধিমান উৎস থেকে।

সুমেরীয় ধর্ম ও মিথোলজিতে আনুনাকি নামে দেবতাদের উল্লেখ পাওয়া যায়, যাদের চেহারা প্রায় মানবাকৃতির কিন্তু দৈত্যাকৃতির। এই দেবতাদের সঙ্গে জড়িত কিছু চিত্রে স্পাইরাল প্যাটার্ন ও ডাবল হেলিক্সের মতো চিহ্ন দেখা যায়, যা আধুনিক জেনেটিক্সের ডিএনএ স্ট্রাকচারের সঙ্গে মিল রয়েছে। কিছু গবেষক মনে করেন সুমেরীয়রা হয়তো জীববিজ্ঞানের প্রাথমিক ধারণা পেয়েছিল বা এমনকি জেনেটিক্সের কিছু জ্ঞান তাদের ছিল। তাদের চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও সিম্বলগুলো আধুনিক কেডুসিয়াসের মতো, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি তাদের চিকিৎসাবিজ্ঞানে অগ্রগামী থাকার প্রমাণ হতে পারে।

এই ধারণা অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হলেও, সুমেরীয়দের চিকিৎসা পদ্ধতি ও চিকিৎসক সমাজের গঠন দেখে বোঝা যায় তারা স্বাস্থ্য ও রোগ নিরাময়ে যথেষ্ট দক্ষ ছিল। তাদের ট্যাবলেটগুলোতে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা, হার্বাল মেডিসিন এবং সার্জিক্যাল পদ্ধতির উল্লেখ পাওয়া যায় ।মেইনস্ট্রিম ইতিহাসবিদরা সাধারণত সুমেরীয়দের এই জ্ঞানের ব্যাখ্যা পৌরাণিক বা প্রতীকী হিসেবে দেন। তাদের মতে সুমেরীয়রা প্রকৃতির পর্যবেক্ষণ ও কল্পনার মিশ্রণে এই ধারণাগুলো তৈরি করেছিল। কিন্তু বিকল্প গবেষকরা প্রশ্ন তোলেন এই জ্ঞান কি সত্যিই তাদের নিজস্ব বুদ্ধিমত্তার ফল, নাকি তারা কোনো হারানো প্রাচীন সভ্যতা থেকে এই জ্ঞান পেয়েছিল?

তাদের মতে সুমেরীয়দের ট্যাবলেট ও সীলনাগরিতে থাকা তথ্যগুলো আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অনেক আগেই মানুষের কাছে জ্ঞানের একটি স্তর ছিল, যা আমরা এখনও পুরোপুরি বুঝতে পারিনি। সুমেরীয় সভ্যতার আবিষ্কার ও উদ্ভাবন মানব ইতিহাসের অগ্রগতিতে এক বিশাল পদক্ষেপ। তারা প্রথমবারের মতো শহর রাষ্ট্র, আইন, ধর্ম, সাহিত্য ও বিজ্ঞানকে একত্রিত করে একটি সম্পূর্ণ সভ্যতার রূপ দিয়েছিল। তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ছিল বহু-ঈশ্বরবাদী, যেখানে মহাজাগতিক শক্তি ও প্রাকৃতিক ঘটনা দেবতাদের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হতো। মন্দির ও জিগুরাট নির্মাণে তারা স্থাপত্যকলায় নতুন দিগন্ত খুলেছিল।

তাঁদের সমাজে পুরোহিতদের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম, যারা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কাজের পাশাপাশি প্রশাসনিক কাজেও নিয়োজিত ছিলেন। নারীরা সমাজে তুলনামূলক উচ্চ মর্যাদা পেতেন এবং পরিবার পিতৃতান্ত্রিক হলেও নারীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আজকের আধুনিক বিজ্ঞান যখন মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচনে ব্যস্ত, তখন সুমেরীয়দের ট্যাবলেট ও সীলনাগরির তথ্যগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় মানব সভ্যতার জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার ইতিহাস কত গভীর। তাদের জ্ঞানের অনেক দিক এখনও গবেষণার অপেক্ষায়, যা ভবিষ্যতে আমাদের অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে।

তাদের রহস্যময় জ্ঞানের উৎস কী ছিল, তারা কীভাবে এত উন্নত জ্ঞান অর্জন করেছিল, এই প্রশ্নগুলো আজও ইতিহাসবিদ, বিজ্ঞানী ও গবেষকদের কৌতূহল জাগায়। হয়তো একদিন আমরা তাদের ট্যাবলেটের গোপন ভাষা পুরোপুরি বুঝতে পারব এবং মানব ইতিহাসের হারানো অধ্যায়গুলো উন্মোচন করব।

বিজ্ঞাপন আয় : প্রথাগত গণমাধ্যমকে ছাড়িয়ে যাবেন কনটেন্ট ক্রিয়েটররা

নতুন এক গবেষণার বরাতে দিয়ে দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, বিশ্বজুড়ে দর্শকদের অভ্যাস ও জীবনযাপনের ধরনে নাটকীয় পরিবর্তনের কারণে গণমাধ্যম জগতে বড়সড় সাংস্কৃতিক রূপান্তর ঘটছে।

গবেষণার তথ্যানুযায়ী — ২০২৫ সালে ইউটিউব, টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের মতো প্লাটফর্মে প্রচারিত কনটেন্ট প্রথাগত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের তৈরি কনটেন্টের চেয়ে বেশি বিজ্ঞাপন আনবে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট নির্মাতাদের ভিডিও, পডকাস্ট ও পোস্ট থেকে আয় টেলিভিশন চ্যানেল, সিনেমা হল ও সংবাদমাধ্যমের মতো পেশাদার সংস্থার তৈরি কনটেন্টের বিজ্ঞাপন আয়কে ছাড়িয়ে যাবে।

ডব্লিউপিপি মিডিয়ার ওই গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিজ্ঞাপন, ব্র্যান্ড চুক্তি ও স্পন্সরশিপ বাবদ কনটেন্ট নির্মাতাদের আয় বাড়বে ২০ শতাংশ। ২০৩০ সালের মধ্যে এ খাতে আয় দাঁড়াবে ৩৭ হাজার ৬৬০ কোটি ডলার, যা বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।

২০২৪ সালে গুগল, মেটা, টিকটকের প্যারেন্ট বাইটড্যান্স, অ্যামাজন ও চীনা ই-কমার্স জায়ান্ট আলিবাবা এ পাঁচটি কোম্পানি কনটেন্ট থেকে বিশ্বব্যাপী মোট আয়ের ৫৪ শতাংশ দখলে রেখেছিল।

অবশ্য ইদানীং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রথাগত গণমাধ্যমের কনটেন্টের মধ্যে পার্থক্য কমে আসছে। এখন অনেক নির্মাতাই উচ্চমানের পেশাদার কনটেন্ট তৈরি করে থাকেন। কনটেন্ট নির্মাতারা সাধারণত পেশাদার গণমাধ্যমকে খবরের উৎস হিসেবে ব্যবহার করলেও কনটেন্টে নিজস্ব রুচি ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটে।

টেলিভিশন, পডকাস্ট ও মিডিয়া খাতের একাধিক শীর্ষস্থানীয় নির্মাতা দ্য গার্ডিয়ানকে জানিয়েছেন, ইউটিউব এখন গোটা মিডিয়া জগতের কেন্দ্রীয় কেন্দ্র হয়ে উঠছে। বিজ্ঞাপননির্ভর প্রথাগত গণমাধ্যমগুলো একদিকে যেমন আয়ের উৎস ধরে রাখার লড়াই করছে, তেমনি বাধ্য হচ্ছে খরচ কমাতেও।পশ্চিমা দেশগুলোয় এরই মধ্যে অনেক টেলিভিশন চ্যানেল বিকল্প আয়ের পথ খুঁজছে। অনেকেই নিজেদের কনটেন্ট প্রচার করতে শুরু করেছে ইউটিউব ও টিকটকে।

অধ্যাপক ইউনূসের সমালোচনা : বিএনপি নেতারা আগের বক্তব্য এখন ভুলে যেতে চান

গত শুক্রবার লন্ডনে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বৈঠক হয়।বৈঠক শেষে যৌথ বিবৃতিতে আগামী রমজান শুরুর আগের সপ্তাহে, অর্থাৎ ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার ও সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূসের ব্যাপারে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের এত দিনের মনোভাবের ব্যাপক পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়।

যদিও লন্ডন বৈঠকে অধ্যাপক ইউনূস ও তারেক রহমানের একান্ত আলোচনায় নির্বাচনের সময় ছাড়া আর কী কী বিষয়ে কথা হয়েছে, তা নিয়ে সব মহলে কৌতূহল রয়েছে।

লন্ডন বৈঠক, বিএনপির প্রতিক্রিয়া ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, এ বৈঠকে নির্বাচনের নতুন সময় নির্ধারণ ছাড়াও ভবিষ্যতে জাতি গঠনের ব্যাপারেও দুই নেতার মধ্যে ঐকমত্য হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, ভবিষ্যতে বিএনপি নির্বাচনে জয়ী হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে অধ্যাপক ইউনূসের পরামর্শ ও সহায়তা চাইবে। এ ক্ষেত্রে তাঁর অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে বিএনপি।

১১ জুন লন্ডনের রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স বা চ্যাথাম হাউস আয়োজিত আলোচনায় অধ্যাপক ইউনূস ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক ভূমিকা গ্রহণের বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেন এবং গণভোটের ধারণাও নাকচ করে দেন।

এ ছাড়া এর আগে কোনো কোনো মহল প্রচারণার চেষ্টা হয়েছিল যে, অধ্যাপক ইউনূস নির্বাচন বিলম্বিত করতে চান বা তাঁর রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে। চ্যাথাম হাউসের আলোচনায় ইউনূস সেটাও নাকচ করে দেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, লন্ডনে অধ্যাপক ইউনূসের এমন খোলামেলা বক্তব্য এবং তারেক রহমানের সঙ্গে আন্তরিক আলোচনা বিএনপিকে আশ্বস্ত করে তোলে। নির্বাচন প্রশ্নে এত দিন অধ্যাপক ইউনূসের সমালোচনা করে বিএনপির নেতারা যেসব বক্তব্য দিয়েছেন, সেটা এখন তাঁরা ভুলে যেতে চান

রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন আলোচনাও আছে যে, বিএনপি কয়েক মাস ধরে নানা কারণে রাজনীতিতে অনেকটা চাপে পড়ে গিয়েছিল। লন্ডন বৈঠকের মধ্য দিয়ে অনেক দিন পর দলটি রাজনৈতিকভাবে একটা সুবিধাজনক অবস্থানে এল।

এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন আলোচনাও আছে যে নির্বাচন নিয়ে সমঝোতা হলেও গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার, জুলাই ঘোষণাপত্র প্রকাশ, জুলাই সনদ কার্যকর করা ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হত্যাযজ্ঞের জন্য আওয়ামী লীগের বিচারের দাবিকে কেন্দ্র করে রাজনীতিতে নতুন কোনো জটিলতা তৈরি হয় কি না।

সব মিলিয়ে এ বৈঠকের মধ্য দিয়ে নির্বাচন নিয়ে ‘পারস্পরিক সন্দেহ ও অবিশ্বাস’ দূর হয়েছে। নির্বাচনের পথ সুগম হয়েছে। বিএনপির দলীয় সূত্রগুলোও বলছে, তাদের দৃষ্টি এখন নির্বাচনের দিকে।

নক্ষত্রের ভাষা কি দেশভেদে বদলায়? জ্যোতিষের পূর্ব-পশ্চিম পার্থক্য

মানুষের আত্মপরিচয় ও ভবিষ্যৎ জানার আকাঙ্ক্ষা হাজার হাজার বছরের পুরনো। জ্যোতিষশাস্ত্র তারই এক উত্তরাধিকার। বিজ্ঞান এটাকে ছদ্মবিদ্যা বলে অবহেলা করলেও ইতিহাসের পৃষ্ঠায় ও মানুষের মনস্তত্ত্বে জ্যোতিষ এক অমোঘ জাদু। দুইটি প্রধান ধারায় এই শাস্ত্র বিশ্বজুড়ে প্রচলিত, ভারতীয় (বৈদিক) জ্যোতিষ এবং পশ্চিমা (Western) জ্যোতিষ। যদিও উভয় পদ্ধতির কেন্দ্রে আছে গ্রহ-নক্ষত্রের চলাচলের প্রতিফলন, তথাপি তাদের দার্শনিক ভিত্তি, জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও সাংস্কৃতিক প্রয়োগে বিস্তর পার্থক্য বিদ্যমান।

নক্ষত্র বনাম ঋতু

ভারতীয় জ্যোতিষশাস্ত্র একটি সিডেরিয়াল (sidereal) পদ্ধতি অনুসরণ করে, যেখানে বাস্তব তারা-পথ (constellations) অনুসারে রাশিচক্র নির্ধারিত হয়। অপরদিকে পশ্চিমা জ্যোতিষে ব্যবহৃত হয় ট্রপিকাল (tropical) পদ্ধতি, যেখানে বসন্ত বিষুব দিন (২১ মার্চ) থেকেই মেষ রাশির সূচনা ধরা হয়—যদিও বাস্তবে সে সময় সূর্য থাকে মীন রাশিতে।

এখানে “গ্রহীয় বিষুবচ্যুতি” বা precession of equinoxes একটি গুরুত্বপূর্ণ তফাৎ সৃষ্টি করে। এটি পৃথিবীর ঘূর্ণনের অক্ষের ধীর পরিবর্তন, যার ফলে প্রতি ৭২ বছরে ১ ডিগ্রি করে সিডেরিয়াল ও ট্রপিকাল জ্যোতিষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। বর্তমানে এই পার্থক্য প্রায় ২৪ ডিগ্রি। অর্থাৎ একজন ব্যক্তি পশ্চিমা হিসাবে মেষ হলেও, ভারতীয় হিসাবে তিনি হবেন মীন। এই পার্থক্য শুধু ব্যক্তিগত রাশিতে নয়, গোটা চার্টের ফলাফলে প্রভাব ফেলে।

দার্শনিক ভিত্তি ও ধর্মতাত্ত্বিক পার্থক্য

ভারতীয় জ্যোতিষশাস্ত্রের মূল ভিত্তি কর্মফল, পুনর্জন্ম এবং ধার্মিক জীবনের সঙ্গে জ্যোতিষের সমন্বয়। জন্মের সময় গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান ব্যক্তির পূর্বজন্মের কর্মফল বহন করে বলে মনে করা হয়। এই দর্শনে ভাগ্য নির্ধারিত, যদিও বিশেষ উপায়ে তা কিছুটা পরিবর্তনযোগ্য (যেমন: পুজো, দান, মন্ত্র ইত্যাদি)।

আধুনিক যুগে পশ্চিমা জ্যোতিষশাস্ত্র,অনেক বেশি মনোবৈজ্ঞানিক ও মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে। ২০শ শতকের মনোবিশ্লেষক কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং বিশ্বাস করতেন, জ্যোতিষ মানসিক গঠন, আত্ম-উন্নয়ন ও ‘collective unconscious’-এর প্রতিফলন। এর ফলে পশ্চিমা জ্যোতিষে আত্মপরিচয়, সম্পর্ক বিশ্লেষণ এবং মানসিক স্বাস্থ্যকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

গ্রহ, রাশি ও বিশ্লেষণ কাঠামো

ভারতীয় জ্যোতিষে ব্যবহৃত হয় ৯টি গ্রহ—সূর্য, চন্দ্র, মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র, শনি এবং ছায়া গ্রহ রাহু-কেতু। এর সঙ্গে ১২টি রাশি এবং ২৭টি নক্ষত্র নিয়ে তৈরি হয় জন্মছক। “দশা সিস্টেম” হলো একটি সময়চক্র, যার মাধ্যমে জীবনকাল বিভিন্ন গ্রহের প্রভাবে ভাগ করা হয়।

পশ্চিমা জ্যোতিষে ব্যবহৃত হয় ১০টি গ্রহ, যেখানে ইউরেনাস, নেপচুন ও প্লুটোকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এখানে বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে “অ্যাসপেক্ট” অর্থাৎ গ্রহগুলোর পারস্পরিক কোণীয় সম্পর্ক যেমন: conjunction (০°), opposition (১৮০°), square (৯০°) ইত্যাদি।

দুই পদ্ধতিই জীবনকে ১২টি ভাগে ভাগ করে, যাকে হাউস বলে। প্রতিটি হাউস জীবনের একেকটি ক্ষেত্র নির্দেশ করে, আর্থিক অবস্থা, স্বাস্থ্য, সম্পর্ক, মৃত্যু, খ্যাতি ইত্যাদি। ভারতীয় জ্যোতিষ সাধারণত Whole Sign House System ব্যবহার করে, যেখানে একটি রাশি পুরোপুরি একটি হাউস। অন্যদিকে পশ্চিমা পদ্ধতিতে Placidus, Koch, Equal, Whole Sign ইত্যাদি বিভিন্ন হাউস পদ্ধতি রয়েছে, যা কখনও রাশি ভেঙেও হাউস তৈরি করে। এটি ফলাফলে বৈচিত্র্য আনে।

ভারতীয় সমাজে জ্যোতিষশাস্ত্র একটি ধর্মীয় ও সামাজিক প্রাতিষ্ঠানিকতা। জন্মপত্রিকা ছাড়া বিবাহ হয় না, সন্তানের নাম রাখা, গৃহপ্রবেশ, ব্যবসা শুরু সব কিছুতেই শুদ্ধ সময় (মুহূর্ত) নির্ধারণ করতে জ্যোতিষের শরণ নেওয়া হয়।

অপরদিকে পশ্চিমা দেশে জ্যোতিষ ব্যক্তিকেন্দ্রিক অনুশীলন। আত্ম-উন্নয়ন, প্রেম জীবনের বিশ্লেষণ, অথবা জীবনের পথনির্দেশ এই জায়গায় এটি বেশি প্রভাব ফেলে। তবে “horoscope” সংস্কৃতি এতটাই জনপ্রিয় যে সংবাদপত্র ও অ্যাপে রাশিফল নিয়মিত পড়া হয়।

দুই পদ্ধতিকেই আধুনিক বিজ্ঞান “pseudoscience” বা ছদ্মবিজ্ঞান হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছে, কারণ এর ভবিষ্যদ্বাণী পরীক্ষাযোগ্য নয় এবং পরীক্ষাগারে পুনরুৎপাদনযোগ্য নয়। তবে সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীরা এর সাংস্কৃতিক মানে ও মানসিক প্রভাবকে স্বীকার করেন। আজকের যুগে দু’ধারাই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিজেদের আধুনিকীকরণে ব্যস্ত। AI-চালিত জন্মছক তৈরি, কণ্ঠস্বরে পঠন, বা রিয়েলটাইম গ্রহচক্র বিশ্লেষণ। ভারতীয় জ্যোতিষ ইউটিউব ও মোবাইল অ্যাপ-ভিত্তিক, যেখানে পশ্চিমা পদ্ধতি আত্ম-উন্নয়ন অ্যাপ ও “astro-therapy”-র সাথে যুক্ত হয়েছে।

ভারতীয় ও পশ্চিমা জ্যোতিষশাস্ত্র উভয়ই মানুষের চিরন্তন প্রশ্ন “আমি কে?”, “আমার ভবিষ্যৎ কী?” এর উত্তর খুঁজতে চেয়েছে ভিন্ন ভিন্ন পথে।ভারতীয় পদ্ধতি ভাগ্যের ওপর ঈশ্বরনির্ধারিত নিয়ন্ত্রণের ব্যাখ্যা দেয়, আর অপরদিকে পশ্চিমা পদ্ধতি আত্মবিকাশের আয়না হিসেবে কাজ করে।বৈজ্ঞানিক সত্যতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় এদের গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। বরং এ দুটি ধারা একসাথে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় মানুষ আসলে কেবল ভবিষ্যৎ জানতে চায় না, সে নিজেকেও জানতে চায়।

চীন দেবে বিরল খনিজ, যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে পারবেন চীনা শিক্ষার্থীরা

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে একটি নতুন বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে বলে বুধবার (১১ জুন) জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চুক্তির আওতায়, বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রে চুম্বক ও বিরল খনিজ সরবরাহ করবে এবং চীনা শিক্ষার্থীদের যুক্তরাষ্ট্রের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সুযোগ দেওয়া হবে।

হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তা জানান, এ চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র চীনা পণ্যের ওপর সর্বমোট ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করতে পারবে। এর মধ্যে রয়েছে– ১০ শতাংশের একটি কাঠামোগত ‘পাল্টা’ শুল্ক, ফেন্টানিল পাচারের বিরুদ্ধে ২০ শতাংশ এবং পূর্বঘোষিত শুল্কের আওতায় আরও ২৫ শতাংশ শুল্ক। অপরদিকে, চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।

মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কর্মকর্তারা জানান, বিরল খনিজ রপ্তানিতে চীনের আরোপিত বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের বিষয়ে তারা একমত হয়েছেন। তবে দীর্ঘদিন ধরে চলমান বাণিজ্যিক বিরোধের স্থায়ী সমাধানের কোনো স্পষ্ট লক্ষণ এই আলোচনায় উঠে আসেনি।

লন্ডনে দুই দিনের টানা আলোচনার পর মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক সাংবাদিকদের বলেন, এই চুক্তি গত মাসে জেনেভায় যেটি নিয়ে প্রাথমিকভাবে একমত হয়েছিল দুই দেশ, সেটিকে এখন আরও পরিষ্কার ও বিস্তারিত করেছে। ওই সমঝোতার লক্ষ্য ছিল, একে অপরের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বেশি মাত্রার শুল্ক কিছুটা কমানো।

জেনেভায় হওয়া চুক্তিটি মূলত আটকে গিয়েছিল চীনের বিরল খনিজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞার কারণে। এর জবাবে ট্রাম্প প্রশাসনও পাল্টা ব্যবস্থা নেয়—চীনে সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন সফটওয়্যার, বিমান ও অন্যান্য পণ্যের রপ্তানি বন্ধ করে দেয় যুক্তরাষ্ট্র।

চাঁদে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ার পরিকল্পনা রাশিয়ার

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় মহাকাশ সংস্থা রসকসমস ঘোষণা করেছে, তারা চাঁদে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। বৃহৎ পরিসরের চন্দ্র অভিযানের অংশ হিসেবে এই প্রকল্পের কথা জানানো হয়েছে।

বৃহস্পতিবার টেলিগ্রামে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে রসকসমস প্রধান দিমিত্রি বাকানভ বলেন, “আমরা চাঁদে প্রথমবারের মতো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছি যা ভবিষ্যতের চন্দ্রঘাঁটির ভিত্তি হবে।” তিনি আরও যোগ করেন, “আমরা শুক্র গ্রহ অনুসন্ধানেও এগোব, কারণ আমরাই একমাত্র দেশ যারা সেখানে সফলভাবে নভোযান অবতরণ করাতে পেরেছি।”

প্রসঙ্গত, ১৯৭০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেনেরা মিশনই প্রথম এবং একমাত্র অভিযানে শুক্র গ্রহে প্রোব অবতরণ করাতে সক্ষম হয়েছিল। তিনি আরো জানান–রাশিয়া ইন্টারনেট গতি ও কাভারেজ বৃদ্ধির জন্য স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের পরবর্তী বিকল্প হিসেবে একটি নতুন রাশিয়ান কক্ষপথ স্টেশন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গত বছর আগস্টে রাশিয়ার পোস্ট-সোভিয়েত যুগের প্রথম চন্দ্রযান লুনা-২৫ অবতরণের আগে ধাক্কা খেয়ে চাঁদের বুকে বিধ্বস্ত হয়। এ মিশনটি ছিল বহুদিন পর মস্কোর মহাকাশ অভিযানে ফেরা এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতার পটভূমিতে রাশিয়ার নতুন করে নিজেকে প্রমাণের প্রচেষ্টা। রাশিয়া সর্বশেষ ১৯৭৬ সালে চাঁদে নভোযান অবতরণ করিয়েছিল। এরপর তারা মূলত শুক্র গ্রহ অনুসন্ধান ও মির মহাকাশ স্টেশন তৈরির দিকে মনোযোগ দেয়।

কৃত্রিম অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ভবিষ্যৎ কি মানুষের চেয়েও উন্নত?

মানব সভ্যতার অগ্রগতিতে প্রযুক্তির ভূমিকা অপরিসীম। বিশেষ করে কৃত্রিম অঙ্গপ্রত্যঙ্গ (prosthetics) প্রযুক্তির উন্নয়ন মানব জীবনের মান উন্নয়নে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা বা দুর্ঘটনার কারণে অঙ্গহীন ব্যক্তিদের জন্য কৃত্রিম অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেবল একটি প্রযুক্তিগত যন্ত্র নয়, এটি তাদের পুনর্বাসন, স্বনির্ভরতা এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

আধুনিক প্রযুক্তি যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), স্নায়ু-যন্ত্র ইন্টারফেস (neural-machine interfaces), থ্রিডি প্রিন্টিং এবং বায়োসেন্সর প্রযুক্তি কৃত্রিম অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে আরও কার্যকর, স্বাভাবিক এবং ব্যবহারবান্ধব করে তুলেছে।

গত দুই দশকে কৃত্রিম অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রযুক্তিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে বায়োনিক হাত ও পায়ের উন্নয়নে ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে, যা ব্যবহারকারীর স্নায়ু সংকেতের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে। ইতালির ইস্তিতুতো ইতালিয়ানো দি টেকনোলজিয়া এবং লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের গবেষকরা একটি সফট বায়োনিক হাত তৈরি করেছেন যা ব্যবহারকারীর মস্তিষ্ক থেকে আসা সংকেতের সাথে সঙ্গতি রেখে স্বাভাবিক হাতের মতো কাজ করতে সক্ষম । এই হাতের ডিজাইনটি স্নায়ু ও পেশির সংকেতের সমন্বয়ে তৈরি, যা ব্যবহারকারীর নড়াচড়ার নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলো স্নায়ু-যন্ত্র ইন্টারফেস প্রযুক্তি, এটি কৃত্রিম অঙ্গকে মানুষের স্নায়ুতন্ত্রের সাথে সংযুক্ত করে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যবহারকারী তার কৃত্রিম অঙ্গকে প্রায় স্বাভাবিক অঙ্গের মতো অনুভব ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ শিকাগোর গবেষকরা ব্রেন-কোম্পিউটার ইন্টারফেসের মাধ্যমে স্পর্শের অনুভূতি পুনরুদ্ধারের ওপর কাজ করছেন, যা কৃত্রিম হাতকে আরও বাস্তবসম্মত করে তোলে ।

থ্রিডি প্রিন্টিং প্রযুক্তি কৃত্রিম অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তৈরিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এটি দ্রুত, কম খরচে এবং ব্যক্তিগতকৃত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তৈরির সুযোগ দেয়। বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম অঙ্গ বাজারের আকার ২০২৫ সালের মধ্যেই ১.৪ গুণ বৃদ্ধি পাবে এবং বছরে প্রায় ৬% বৃদ্ধির হার থাকবে বলে গবেষণা বলছে।

কৃত্রিম অঙ্গপ্রত্যঙ্গের উন্নতিতে শুধু যান্ত্রিক দক্ষতা নয়, ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যবহারকারীরা তাদের কৃত্রিম অঙ্গকে “নিজস্ব” অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে পারলে তাদের মানসিক ও শারীরিক পুনর্বাসন দ্রুত হয়। Marasco et al. (2021) এর গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে স্পর্শ, কাইনেস্থেসিয়া (অঙ্গের অবস্থান ও গতি উপলব্ধি) এবং মোটর নিয়ন্ত্রণের সমন্বয় কৃত্রিম অঙ্গের কার্যকারিতা বাড়ায় এবং ব্যবহারকারীর আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে।

স্নায়ু-যন্ত্র ইন্টারফেসের মাধ্যমে কৃত্রিম অঙ্গের নিয়ন্ত্রণ আরও স্বাভাবিক ও সুনির্দিষ্ট হচ্ছে। Huang et al. (2024) এর পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এই প্রযুক্তি ব্যবহারকারীর ইচ্ছার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ গতিবিধি নিশ্চিত করে, যা দৈনন্দিন কাজকর্মে তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এর ফলে কৃত্রিম অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ব্যবহারকারীরা স্বনির্ভরতা অর্জন করে এবং সামাজিক জীবনে তাদের অংশগ্রহণ বাড়ে।

কৃত্রিম অঙ্গপ্রত্যঙ্গের উন্নয়ন কেবল প্রযুক্তিগত নয়, সামাজিক দিক থেকেও বিপ্লবী। অঙ্গহীন ব্যক্তিরা যখন তাদের দৈনন্দিন কাজ নিজেই করতে সক্ষম হন, তখন তাদের আত্মসম্মান ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। এটি তাদের মানসিক সুস্থতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং সমাজে তাদের অন্তর্ভুক্তি বাড়ায়।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে কৃত্রিম অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সহজলভ্যতা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ। সেপটেক্সের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বিনামূল্যে বা কম খরচে কৃত্রিম অঙ্গ প্রদান করে সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর ফলে প্রতিবন্ধীরা কর্মক্ষম হয়ে উঠছেন এবং সমাজে সমান সুযোগ পাচ্ছেন। তবে উচ্চ প্রযুক্তির কৃত্রিম অঙ্গের দাম অনেক বেশি হওয়ায় এটি সাধারণ মানুষের জন্য এখনও সীমাবদ্ধ। তাই প্রযুক্তির সাশ্রয়ীকরণ এবং প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা উন্নয়ন জরুরি। পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করে প্রতিবন্ধীদের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তোলা দরকার।

কৃত্রিম অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল। ProprioStim-এর মতো নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রোপ্রিওসেপশন (অঙ্গের অবস্থান ও গতি উপলব্ধি) পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে, যা কৃত্রিম অঙ্গকে আরও জীবন্ত করে তোলে। এছাড়া বায়োমিমেটিক ডিজাইন এবং সফট রোবোটিক্স প্রযুক্তি কৃত্রিম অঙ্গের কার্যকারিতা ও ব্যবহারযোগ্যতা বাড়াচ্ছে।

তবে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার, স্নায়ু ইন্টারফেসের স্থায়িত্ব এবং বায়ো-কমপ্যাটিবিলিটি (দেহের সাথে সামঞ্জস্য) এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে নিম্নাঙ্গের কৃত্রিম অঙ্গের ক্ষেত্রে ভারসাম্য ও চলাফেরার উন্নতি প্রয়োজন। গবেষকরা এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নতুন উপকরণ ও ডিজাইন নিয়ে কাজ করছেন।