Home Blog Page 73

ফিনফ্লুয়েন্সারদের আর্থিক পরামর্শে ঝুঁকি ও নিয়ন্ত্রণ

সোশ্যাল মিডিয়া আজকের ডিজিটাল যুগে শুধু সামাজিক সংযোগের মাধ্যম নয়, বরং অর্থনৈতিক লেনদেন ও বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্রও হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ‘ফিনফ্লুয়েন্সার’ (Financial Influencer) হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিরা—যারা আর্থিক পরামর্শ, বিনিয়োগের দিকনির্দেশনা, ক্রিপ্টোকারেন্সি, স্টক মার্কেট, ব্যাংকিং পণ্য ও সঞ্চয়-ব্যয় সম্পর্কিত কন্টেন্ট তৈরি করেন তাদের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই ফিনফ্লুয়েন্সাররা তাদের বিশাল ফলোয়ার বেজের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করে সাধারণ মানুষকে বিনিয়োগ ও অর্থ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রভাবিত করছেন। কিন্তু এই নতুন ধারাটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বড় ধরনের ঝুঁকি, অসঙ্গতি ও নিয়ন্ত্রণের অভাব, যা বিভিন্ন দেশের সরকারের নজরে এসেছে।

ফিনফ্লুয়েন্সাররা সোশ্যাল মিডিয়ায় বিনিয়োগ ও আর্থিক সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সহজবোধ্য ও আকর্ষণীয় উপস্থাপনা করে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করেন।অনেক সময় তারা স্টক মার্কেট, ক্রিপ্টোকারেন্সি, মিউচুয়াল ফান্ড, বীমা বা ঋণ পণ্যের প্রতি উৎসাহ দিয়ে থাকে। তাদের প্রভাব এমনকি অনেক সময় প্রচলিত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও পরামর্শদাতাদের থেকেও বেশি হতে পারে। তরুণ প্রজন্ম ও অর্থনৈতিক শিক্ষায় কম পারদর্শী জনগোষ্ঠী তাদের কথায় সহজেই প্রভাবিত হয়, যা অর্থনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিপদের কারণও হয়ে দাঁড়াতে পারে।

তবে ফিনফ্লুয়েন্সারদের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হলো তাদের তথ্য ও পরামর্শের সত্যতা যাচাই করা কঠিন। অনেক ক্ষেত্রেই তারা বিনিয়োগের ঝুঁকি বা ক্ষতির সম্ভাবনা স্পষ্ট করে তুলে ধরেন না। এছাড়া কিছু ফিনফ্লুয়েন্সার নিজের লাভের জন্য ভুয়া তথ্য বা প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে দেন, যা সাধারণ বিনিয়োগকারীকে ভুল পথে পরিচালিত করতে পারে। ক্রিপ্টোকারেন্সি বা নতুন আর্থিক পণ্যের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি অনেক বেশি।

বিশেষ করে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অল্প জ্ঞান থাকা মানুষেরা সহজেই লোভ বা আকর্ষণীয় প্রমোশনে আড়াল হয়ে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারেন। এর ফলে ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিপন্ন হয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

এইসব ঝুঁকি ও অপব্যবহারের কারণেই বিভিন্ন দেশ সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো ফিনফ্লুয়েন্সারদের ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করছে। যুক্তরাজ্যের ফাইন্যান্সিয়াল কনডাক্ট অথরিটি (FCA) \ যারা সোশ্যাল মিডিয়ায় বিনিয়োগ ও আর্থিক পরামর্শ দেয়ার মাধ্যমে ভুয়া বা ভুল তথ্য ছড়াচ্ছেন তাদের বিরুদ্ধে নজর দিয়েছে। তারা ফিনফ্লুয়েন্সারদের রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করতে চায় এবং কঠোর শৃঙ্খলা প্রয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

FCA জানিয়েছে, যারা ফিনফ্লুয়েন্সার তারা অবশ্যই বিনিয়োগের ঝুঁকি, খরচ ও লাভ-ক্ষতির সম্ভাবনা স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। আর্থিক পরামর্শ দিতে হলে তাদের অবশ্যই আইনসম্মত লাইসেন্স থাকতে হবে। অন্যথায় তারা দণ্ডনীয় অপরাধে পতিত হবে। এর ফলে ফিনফ্লুয়েন্সারদের ভূমিকা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার আওতায় আসবে।

বাংলাদেশে ফিনফ্লুয়েন্সারদের কার্যক্রম তেমন নিয়ন্ত্রিত না থাকলেও সম্প্রতি বিভিন্ন আর্থিক প্রতারণার ঘটনা এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির ঝুঁকির কারণে সচেতনতা বাড়ছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো সোশ্যাল মিডিয়ায় আর্থিক পরামর্শ প্রদানে সতর্কতা জারি করেছে এবং বিনিয়োগকারীদের সচেতন হতে বলেছে।

ফিনফ্লুয়েন্সাররা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অর্থনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে তাদের তথ্য ও পরামর্শের বিশ্বাসযোগ্যতা ও সততার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বর্পূণ। বিনিয়োগকারীদের উচিত সোশ্যাল মিডিয়া থেকে প্রাপ্ত তথ্যকে কেবল উৎস হিসেবে ব্যবহার করে পেশাদার পরামর্শদাতাদের সঙ্গে আলোচনা করা। একই সঙ্গে সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর উচিত সোশ্যাল মিডিয়ার এই অর্থনৈতিক দুনিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা, যাতে সাধারণ মানুষের আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত হয়। সোশ্যাল মিডিয়ার এই নতুন অর্থনৈতিক প্রভাবের জগতে সতর্কতা, জ্ঞান আর দায়িত্বশীলতার সমন্বয়ে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।

বায়ুমণ্ডলে কার্বনের ভয়াবহ বৃদ্ধি, সময় এসেছে পরিবর্তনের

২০২৫ সালের মে মাসে হাওয়াইয়ের মাউনা লোয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂)–এর ঘনত্ব ৪৩০.২ পার্টস পার মিলিয়ন (PPM) ছুঁয়েছে, যা ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৪৩০ PPM ছাড়িয়েছে। এই মাত্রা আধুনিক যুগের সর্বোচ্চ এবং অন্তত দুই মিলিয়ন বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে এত উচ্চ CO₂ স্তর দেখা যায়নি। মাউনা লোয়া কেন্দ্র ১৯৫৮ সাল থেকে এই গ্যাসের মাত্রা নিয়মিত পরিমাপ করে আসছে এবং এই দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যানকে ‘কিলিং কার্ভ’ নামে ডাকা হয়, যা বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

গত কয়েক দশকে CO₂ স্তর দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৫৮ সালে মাত্রা ছিল ৩১৫ PPM, এটি আজকের তুলনায় অনেক কম। ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে মাত্রা প্রায় ৩.৫ PPM বেড়েছে, যা গত বছরের তুলনায় সামান্য কম হলেও এখনও IPCC–এর ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস গ্লোবাল ওয়ার্মিং সীমা রক্ষার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই দ্রুত বৃদ্ধির পেছনে প্রধান কারণ হলো জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো, বন উজাড় এবং ভূমির ব্যবহার পরিবর্তন। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এল নিনো থেকে লা নিনার পরিবর্তনের কারণে কিছুটা প্রাকৃতিক কার্বন শোষণ বৃদ্ধি পেয়েছে, তবুও তা CO₂ বৃদ্ধির গতি কমাতে পারছে না।

এই CO₂ বৃদ্ধির প্রভাব ইতোমধ্যেই পৃথিবীর জলবায়ুতে স্পষ্ট। গড় তাপমাত্রা প্রাক-শিল্প যুগের তুলনায় প্রায় ১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেছে এবং এই গতি অব্যাহত থাকলে ২০৪০ সালের মধ্যেই ১.৫ ডিগ্রি সীমা অতিক্রম করবে। এর ফলে তাপদাহ, ঘূর্ণিঝড়, খরা ও অতিবৃষ্টির মতো চরম আবহাওয়া ঘটনা আরও ঘন ঘন ও তীব্র হবে। মেরু অঞ্চলের বরফ গলতে থাকবে, যার কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়বে এবং উপকূলীয় এলাকা, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো নিম্নভূমি দেশগুলো মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।

বৈশ্বিক এই সংকট মোকাবেলায় বিজ্ঞানীরা দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে দ্রুত রূপান্তর, বন সংরক্ষণ, টেকসই কৃষি এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি গ্রহণ অপরিহার্য। কার্বন নিঃসরণ কমানো না হলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আরও ভয়াবহ হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পৃথিবী অনিরাপদ হয়ে উঠবে।

মাউনা লোয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, আমরা এখন এমন এক সংকটময় সময়ে দাঁড়িয়ে আছি যেখানে আমাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত পৃথিবীর ভবিষ্যত নির্ধারণ করবে। CO₂–এর এই দ্রুত বৃদ্ধি শুধু একটি গাণিতিক সংখ্যা নয়, এটি আমাদের গ্রহের স্বাস্থ্য ও মানুষের জীবনযাত্রার ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। সময় এসেছে সক্রিয়ভাবে পরিবর্তন আনার, নয়তো আমরা এমন এক পৃথিবীর মুখোমুখি হবো যেখানে চরম আবহাওয়া, খাদ্য নিরাপত্তা সংকট এবং জলবায়ু উদ্বাস্তুদের সংখ্যা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাবে।

সুতরাং এই CO₂–এর রেকর্ড বৃদ্ধি শুধু একটি বৈজ্ঞানিক তথ্য নয়, এটি আমাদের সকলের জন্য একটি সতর্কবার্তা, এখনই সময় পরিবর্তনের নয়তো আগামীর পৃথিবী হবে উষ্ণ, দুর্যোগপূর্ণ ও অনিরাপদ।

‘বটতলার বই’ বাংলার প্রকাশনা শিল্পের হারানো ঐতিহ্য

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ‘বটতলার বই’ একটি বিস্মৃত, তবুও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। ১৮শ ও ১৯শ শতকের কলকাতার বটতলা অঞ্চলে জন্ম নেওয়া এই সাহিত্যের ধারা একদিকে যেমন অল্প শিক্ষিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পাঠ–আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করেছিল, অন্যদিকে এটি ছিল বাংলার প্রাক-আধুনিক গণসাংস্কৃতিক চেতনার অন্যতম উজ্জ্বল প্রতিফলন। এক সময় যেসব বই তথাকথিত ‘চটুল’ কিংবা ‘অসুন্দর’ আখ্যায় অবমূল্যায়িত হয়েছিল, আজ তারাই গণসাহিত্যের সমাজ-মনস্তত্ত্ব ও উপনিবেশ-পরবর্তী পাঠব্যবস্থার মূল্যবান নিদর্শনে পরিণত হচ্ছে।

ঊনবিংশ শতকের গোড়ার দিকে কলকাতায় ইংরেজি শিক্ষার প্রসার, ছাপাখানার প্রতিষ্ঠা এবং কাগজের সহজলভ্যতা বাংলা ভাষায় এক নতুন সাহিত্যিক চর্চার জন্ম দেয়। এই সময় উচ্চশিক্ষিত সমাজ ‘আধুনিক সাহিত্য’ নির্মাণে মনোনিবেশ করলেও, নিম্নবর্গীয় জনগণের জন্য কোনো সাহিত্যধারা তখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বটতলা অঞ্চলের ছাপাখানাগুলো এই শূন্যস্থান পূরণ করে। সেখানে সস্তা কাগজে কাঠের ব্লকে ছাপা যেসব বই প্রকাশিত হতো, সেগুলোই পরিচিত হয় ‘বটতলার বই’ নামে।

তবে এই বইগুলোকে শুধুই বাণিজ্যিক পণ্যে পর্যবসিত ভাবলে ভুল হবে। এগুলো ছিল একধরনের “লোকপ্রিয় ছাপা সংস্কৃতি”—print popular culture—যা জনগণের মানসিক, ধর্মীয়, নৈতিক ও বিনোদন চাহিদার সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত।

বটতলার বইয়ের মূল বিষয় ছিল পৌরাণিক কাহিনি, অলৌকিক ঘটনা, ভূতপ্রেত, যাত্রানির্ভর নাট্যরূপ, রোমান্স, ধর্মীয় উপদেশ, সামাজিক অপরাধ, নারী-নিপীড়নের কাহিনি এবং প্রেম-প্রতারণা। যদিও এগুলোর বেশিরভাগই ‘আখ্যান’ ঘরানার, তবু সেগুলোর ভাষা ও গঠনচিত্রে প্রাচীন মঙ্গলকাব্য ও কাব্যনাট্যের ছায়া বিদ্যমান।

বইগুলিতে ‘ভয়’ ও ‘রহস্য’ উপাদানগুলোর আধিক্য দেখা যায়, যা পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখতে সহায়ক ছিল। অলৌকিকতার ব্যবহার জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাস ও কৌতূহলকে উত্তেজিত করত, আর নারীপ্রধান কাহিনিগুলো নারীর নির্যাতন ও প্রেম-দুঃখের সামাজিক অনুবৃত্তিকে উপজীব্য করত। এগুলোর ভাষা সাধারণত ছন্দময়, কাব্যগুণসম্পন্ন এবং গানের মতো সহজে উচ্চারণযোগ্য হতো।

বটতলার বই এককভাবে শুধু পাঠ্য বস্তু ছিল না; বরং এটি ছিল একটি পারফর্মেটিভ পাঠ–প্রক্রিয়া। বই বিক্রেতারা রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে বইয়ের অংশ পড়ে শুনাতেন, কখনও আবৃত্তি করে, কখনও অভিনয়ের ভঙ্গিতে। ফলে বইটি শুধুমাত্র ক্রেতার ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত হতো না, বরং শ্রোতারাও অংশীদার হতো।

এই চর্চা বোঝায় বটতলার বই একধরনের মৌখিক-ছাপা সংকর সংস্কৃতির প্রতিফলন ছিল। Pierre Bourdieu–র “cultural field” ধারণা অনুযায়ী, এখানে পাঠের ক্ষমতা কেবল উচ্চবর্গীয় একাডেমিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং সাধারণ জনগণের মধ্যেও একটি ‘স্বনির্মিত পাঠ-অভিজ্ঞতা’ গড়ে উঠেছিল।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সহ প্রমুখ বুদ্ধিজীবী এই সাহিত্যের ধারাকে ‘অশ্লীল’, ‘বাজে রুচির’ এবং ‘মূর্খ সমাজের সাহিত্য’ হিসেবে তিরস্কার করেন। বাংলা গদ্য ও কাব্যকে ‘ভদ্রলোক সংস্কৃতিতে’ রূপান্তরের এই প্রকল্পের ফলে, বটতলার সাহিত্য তথাকথিত ‘আধুনিকতা’র মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হয়।

এছাড়া ১৮৭৬ সালের “Vernacular Press Act” ও অন্যান্য সেন্সরশিপ আইন বটতলার বইয়ের ওপর কঠোর নজরদারি আরোপ করে। কিছু প্রকাশনী বন্ধ করে দেওয়া হয়, অনেক লেখক ও বিক্রেতা হয়রানির শিকার হন। ফলে ১৯শ শতকের শেষদিকে বটতলার বইয়ের প্রকাশনা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ে।

আজকের দিনে সাহিত্য, ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব ও লিঙ্গ অধ্যয়নের পাঠ্যক্রমে বটতলার বইয়ের গুরুত্ব নতুনভাবে আবিষ্কৃত হচ্ছে। এই বইগুলো উপনিবেশিক বাংলা সমাজের লিঙ্গ রাজনীতি, ধর্মীয় প্রতীক, যৌনতার চর্চা, শ্রেণি বিভাজন এবং পাঠ সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

বটতলার ‘নারী-আখ্যান’গুলো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় কিভাবে নারীশরীরকে কখনও পূজা, আবার কখনও ভয়ের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে যা ঔপনিবেশিক পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির দিক নির্দেশ করে। এছাড়াও,এই বইগুলো উপনিবেশিক বাংলার “popular unconscious”—অর্থাৎ অবচেতন সাংস্কৃতিক চেতনার একটি শক্তিশালী দলিল হিসেবে দেখা যায়।

বটতলার বই কোনো সাহিত্যিক ব্যতিক্রম নয় বরং এটি ছিল বাংলার প্রথম গণসাহিত্য আন্দোলন—যেখানে পাঠ ছিল সহজলভ্য, আকর্ষণীয় এবং সামাজিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক। উচ্চবর্গের আধুনিকতা বটতলার সাহিত্যের স্বীকৃতিকে দমিয়ে দিলেও আজকের পাঠপ্রবণ সমাজ ও গবেষণামুখী পরিবেশ এই ধারাকে পুনরুদ্ধার করছে।

ইসরায়েলি হামলায় কোণঠাসা, ইরানের শাসকগোষ্ঠীর ‘পতনের সূচনা’?

ইসরায়েলের বিমান হামলায় ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক নেতৃত্ব কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে, যার ফলে এক দুর্বল তেহরানের প্রতিশোধ নেওয়ার বিকল্প খুবই সীমিত হয়ে পড়েছে — যার মধ্যে রয়েছে একটি সর্বাত্মক যুদ্ধ, যা ইরান প্রস্তুত নয় এবং জেতার সম্ভাবনাও কম, এমনটাই রয়টার্সকে জানিয়েছেন চারজন আঞ্চলিক কর্মকর্তা।

আঞ্চলিক নিরাপত্তা সূত্রগুলো বলছে, তেহরান সম্ভবত একই ধরনের কার্যকর হামলা চালাতে পারবে না, কারণ হামাসের হামলার পর শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধের সময় থেকে ইসরায়েল তাদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক সামরিক নেটওয়ার্ক ব্যাপকভাবে দুর্বল করে দিয়েছে।

এই সূত্রগুলো বলছে, ইরানের নেতারা এখন পর্যুদস্ত এবং নিজেদের টিকে থাকার দুশ্চিন্তায় ব্যস্ত। ইসরায়েলি সামরিক চাপের মুখে নিজেদের দুর্বলতা স্বীকার করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এর ফলে আরও উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে — যার মধ্যে রয়েছে ইসরাইলের বিরুদ্ধে গোপন সন্ত্রাসবাদী হামলা কিংবা আরও বিপজ্জনক পথ, যেমন দ্রুত পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা।

গাজায় হামাস, লেবাননে হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনে হুতি এবং ইরাকে মিলিশিয়াদের ওপর ইসরায়েলি হামলা এবং ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র, সিরিয়ার স্বৈরশাসক বাশার আল-আসাদকে হটিয়ে দেওয়ার ফলে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব দুর্বল হয়ে গেছে।

এছাড়া, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের তেল রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দেশের অর্থনীতি চরম সংকটে পড়েছে — মুদ্রার দরপতন, অস্বাভাবিক মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ও পানির ঘাটতির মতো একাধিক সমস্যা দেখা দিয়েছে।

গালফ রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক আবদেলআজিজ আল-সাগের বলেন, ইরান এখন কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে এবং তাদের সামনে বিকল্প খুব কম। একটি সম্ভাব্য বিকল্প হতে পারে — গোপনে আশ্বাস দেওয়া যে তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও পারমাণবিক কার্যক্রম পরিত্যাগ করবে, কারণ জনসমক্ষে এমন ঘোষণা দিলে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে।

তিনি বলেন, আরেকটি বিকল্প হতে পারে সন্ত্রাসী হামলার পথে ফিরে যাওয়া — ১৯৮০’র দশকের আমেরিকান ও ইসরায়েলি দূতাবাস ও সামরিক স্থাপনায় বোমা হামলার মতো। তৃতীয় এবং সবচেয়ে বিপজ্জনক বিকল্পটি হলো — পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (NPT) থেকে বেরিয়ে গিয়ে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ত্বরান্বিত করা।

এ ধরণের পদক্ষেপ যুদ্ধ ঘোষণা বলেই গণ্য হবে এবং এতে কেবল ইসরায়েল নয়, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা শক্তিও কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাবে বলে সতর্ক করেছেন আল-সাগের। একজন উচ্চপদস্থ আঞ্চলিক কর্মকর্তা, যিনি ইরানি প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ, বলেন শুক্রবারের হামলাগুলো কেবল কৌশলগত ক্ষতি নয়, বরং ইরানের নেতৃত্বের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছে।

তিনি বলেন, ক্ষমতাসীন অভিজাত শ্রেণির মধ্যে এখন আত্মবিশ্বাসের জায়গায় উৎকণ্ঠা আর অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। পর্দার আড়ালে উদ্বেগ বাড়ছে কেবল বাইরের হুমকি নয়, বরং দেশের অভ্যন্তরেও তাদের নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা থেকে। “নেতৃত্বের মধ্যে আতঙ্ক বেড়ে গেছে,” বলেন ওই আঞ্চলিক কর্মকর্তা। “বাইরের হামলার ভয় ছাড়াও তাদের সবচেয়ে বড় ভয় — দেশীয় বিদ্রোহ।”

যদি দেশজুড়ে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে এবং সরকার দমন-পীড়নের মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া দেখায়, তবে তা তাদের জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে — কারণ জনগণের ক্ষোভ দীর্ঘদিন ধরে জমে আছে, যার পেছনে রয়েছে পশ্চিমা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, মূল্যস্ফীতি এবং মতপ্রকাশের দমন।

হামলার পর এক ভিডিও ভাষণে নেতানিয়াহু ইরানে সরকার পরিবর্তনের ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং ইরানিদের উদ্দেশে বার্তা দেন। বিশ্লেষকদের মতে, সরকার পরিবর্তনের এই আশা থেকেই ইসরায়েল এত বেশি সংখ্যক শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তার ওপর হামলা চালিয়েছে, যার ফলে ইরানের নিরাপত্তা কাঠামো ভেঙে পড়েছে এবং ‘অপরাজেয়’ ভাবমূর্তির প্রতি সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে।

বিশ্লেষকরা আরও বলেন, এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে ট্রাম্প আবার ইরানকে পারমাণবিক আলোচনায় ফিরিয়ে আনতে পারেন — তবে এবার ইরান আরও নিঃসঙ্গ অবস্থায় থাকবে এবং বেশি ছাড় দিতে বাধ্য হতে পারে।

মাঝারি পর্যায়ের একজন প্রাক্তন ইরানি কর্মকর্তা বলেন, ২০২০ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানের বিপ্লবী গার্ডের বিদেশি শাখার প্রধান জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা করার ঘটনাই ইরানের দুর্বলতার সূচনা করেছিল। তারপর থেকেই ইসলামিক প্রজাতন্ত্রটি আঞ্চলিক প্রভাব পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেও সফল হয়নি। তিনি বলেন, “এই হামলা হয়তো তাদের পতনের শুরু হতে পারে।”

আফ্রিকার অদৃশ্য গ্রাম ‘কিদুনো’

কথিত আছে আফ্রিকার এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে একসময় ছিল এক গ্রাম, কিদুনো। তার নির্ভরযোগ্য কোনো মানচিত্র নেই, স্থির কোনো ভৌগোলিক অবস্থানও নেই। লোককথায় কেবল বলা হয়, একসময় সেখানে প্রাণ ছিল, মানুষ ছিল, ঘরবাড়ি ছিল। আর তারপর? হঠাৎ করেই জনপদটি উধাও হয়ে যায়।কেউ জানে না কীভাবে, কেউ জানে না কেন। কেউ বলে, কিদুনো সময়ের বাইরে চলে গিয়েছিল। কেউ বলে, এটি এক ‘অপঘাতক থ্রেশোল্ড’-এ পৌঁছে গিয়ে হারিয়ে যায় ইতিহাসের ছায়ায়।

এই গল্প শুনলে প্রথমেই মনে পড়ে যায় Roanoke কলোনি কিংবা কানাডার Anjikuni গ্রামের মতো রহস্যময় ঘটনাগুলো, যেখানে আস্ত একটি জনপদ নিখোঁজ হয়ে যায় অজানা কারণে। কিন্তু কিদুনোর রহস্য এতটাই অস্পষ্ট এবং তথ্যহীন যে এটি একধরনের লোককথা, লোকভয় কিংবা লোকমস্তিষ্কের কল্পনার দিকেও ইঙ্গিত করে।

আফ্রিকার পশ্চিমাঞ্চলের কিছু জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে আছে কিদুনোর নাম। মৌখিক সংস্কৃতির উপর নির্ভরশীল এই সমাজে প্রাচীন ইতিহাস রক্ষিত হয় গল্পের মাধ্যমে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। বলা হয়, কিদুনোর মানুষরা ছিল অত্যন্ত শান্তিপ্রিয়, প্রকৃতিপূজারী। তারা রাতের আকাশকে দেবতা মনে করত এবং নক্ষত্র দেখে ভাগ্য নির্ধারণ করত। কিন্তু একদিন হঠাৎ করেই, কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই, গ্রামটি অদৃশ্য হয়ে যায়।

বয়স্কদের মুখে শোনা যায় তারা নাকি মাঝেমধ্যে কিদুনোর নাম শোনে বাতাসে—যেন একটা হারিয়ে যাওয়া শব্দ হঠাৎ ফিরে আসে সময়ের ভাঁজ পেরিয়ে। কেউ কেউ বলে, তারা নির্জন রাতে বাঁশির মতো এক তীব্র আওয়াজ শুনেছেন, যেটি নাকি কিদুনোরই স্মৃতি।

এই গ্রামটি হয়তো বাস্তবিক অর্থে কখনও ছিল না, কিন্তু এটি একটি সমাজ-স্মৃতির প্রতীক হয়ে উঠেছে। নৃবিজ্ঞানীরা বলেন, যখন কোনো জনপদ হারিয়ে যায় বা ধ্বংস হয়ে যায়, তখন সেই ক্ষত রূপ নেয় লোককাহিনীতে। কিদুনো সেই হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের শূন্যস্থান পূরণ করে এক ধরনের কাল্পনিক শোকগাথা দিয়ে।

অনেক আফ্রিকান লোকবিশ্বাসে জনপদের অস্তিত্ব মাটির নিচেও চলতে পারে। তারা মনে করে, কিছু জনপদ ‘গভীর পৃথিবী’-তে চলে যায়—যেখানে মৃতেরা বাস করে, কিন্তু জীবিতদের ছায়ার মতো ঘুরে বেড়ায়। কিদুনোকে নিয়ে এমন ধারণাও আছে যে এটি কোনো আত্মার গ্রাম, যেটি পৃথিবীর ওপর স্তরে আর টিকে নেই, তবে তার ছায়া থেকে যায়।

আফ্রিকায় যুদ্ধ, মহামারি, খাদ্যসংকট কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো কারণেই অনেক জনপদ ফাঁকা হয়ে গিয়েছে। সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, দক্ষিণ সুদান বা মালির মতো দেশে স্থানীয় সহিংসতা এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ে বহু গ্রাম পরিত্যক্ত হয়। এই বাস্তবতার মধ্যে কিদুনোর গল্প হয়তো প্রতীক—মানুষের হারিয়ে যাওয়ার ভয়, অস্তিত্বের অনিশ্চয়তা এবং স্মৃতি মুছে যাওয়ার সম্ভাবনা।

এমনও হতে পারে, কিদুনো ছিল কোনো যাযাবর গোষ্ঠীর অস্থায়ী বসতি, যেটি নির্দিষ্ট নথিপত্র বা স্থাপত্য চিহ্ন রেখে যায়নি। আফ্রিকার বহু সংস্কৃতির মতো, এসব ইতিহাসও মৌখিক হওয়ায় হারিয়ে যেতে পারে কোনো বিপর্যয়ে। ইতিহাসবিদরা বলেন, মৌখিক ঐতিহ্যের উপর ভিত্তি করে নির্মিত কোনো জনপদের অস্তিত্বকে সরাসরি নাকচ করা যায় না।

বিজ্ঞান সময়চক্র বা টাইম-লুপ ধারণাকে আজও পরীক্ষা করছে। তবে লোকবিশ্বাসে সময়ের সীমানা ভেঙে কোনো বস্তু বা মানুষ হারিয়ে যেতে পারে।কিদুনোর এই ধারণা মূলত একধরনের ‘mythic trauma’-র প্রতিফলন—যেখানে সমাজ তাদের হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিকে রহস্যের ছায়ায় রক্ষা করে। আবার কেউ কেউ এও বলেন—কিদুনো ছিল এক নিষিদ্ধ গ্রামের নাম, যেখানে “সময়” অন্যভাবে প্রবাহিত হতো। কেউ একবার সেখানে গেলে আর কখনও ফিরতে পারত না। এটিকে টাইম-এনক্লেভ বা সময়-ফাঁদ বলেও অভিহিত করা হয়। গবেষণার প্রয়োজন এই ধরনের গল্পগুলো নিয়ে গবেষণা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নৃবিজ্ঞান, লোকবিদ্যা এবং ইতিহাসবিদরা যদি আফ্রিকার প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনুসন্ধান চালান, তবে হয়তো কিদুনোর মতো জনপদের পেছনের বাস্তব গল্প বেরিয়ে আসবে। হয়তো পাওয়া যাবে কোনো ধ্বংসপ্রাপ্ত বসতি, হয়তো কিছু অনুবর্তী জাতিগোষ্ঠীর স্মৃতিচিহ্ন, যেগুলো প্রমাণ করতে পারে যে কিদুনো একসময় সত্যিই ছিল। ইউনেস্কো এবং আফ্রিকার স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ ধরনের লোকশ্রুতি সংগ্রহ করে ভবিষ্যতের গবেষণার ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। কিদুনোর মতো গল্পগুলো তখনই বাস্তবতার সাথে মিশে যায়, যখন এগুলোর উৎসে পৌঁছানো যায়।

ধীরে ধীরে খাওয়ার স্বাস্থ্যগুণ

“আস্তে আস্তে খাও!”, “মন দিয়ে খাও”, “খাওয়ার মাঝে কথা বলতে হয় না” — এই কথাগুলো আমরা ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি। আজকের বৈজ্ঞানিক গবেষণার আলোকে দেখা যাচ্ছে, এই প্রবাদ বাক্যগুলো শুধুমাত্র শিষ্টাচার নয়, বরং স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

খাবার খাওয়ার সময় মনোযোগ দেওয়া এবং ধীরে ধীরে খাওয়া মস্তিষ্ক ও পেটের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ স্থাপন করে। খাদ্য ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞ লেসলি হেইনবার্গ দীর্ঘদিন ধরে দ্রুত খাওয়া ও ধীরে খাওয়ার স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছেন। তার গবেষণায় দেখা গেছে, খাবার খাওয়ার সময় যদি আমরা অন্তত ২০ মিনিট সময় নিই, তাহলে পেট ভরার সিগন্যাল মস্তিষ্কে পৌঁছাতে পারে এবং অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমে যায়।

দ্রুত খাওয়ার ফলে খাবার ভালোভাবে চিবানো হয় না, একবার গ্রাস নেওয়ার পর আরেকটি গ্রাস নেওয়ার মধ্যে বিরতি থাকে না। এতে পাকস্থলীতে বড় বড় টুকরো খাবার পৌঁছায়, যা হজমে সমস্যা সৃষ্টি করে। পুষ্টিবিদ তাসনিম চৌধুরী জানান, দ্রুত খাওয়ার ফলে পেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে এবং বিপাকীয় সমস্যা দেখা দেয়।

দ্রুত খাওয়ার আরেকটি বড় সমস্যা হলো ওজন বৃদ্ধি। হারবার্ট হেল্থ পাবলিকেশন্সের গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দ্রুত খান তারা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খেয়ে ফেলে, কারণ মস্তিষ্ক ২০ মিনিটের আগে বুঝতে পারে না যে পেট ভরে গেছে। ফলে শরীরে অতিরিক্ত ক্যালোরি জমে ওজন বাড়ে।

দ্রুত খাওয়ার ফলে হার্টবার্ন, অম্লভাব, গ্যাস, বদহজমের মতো সমস্যা দেখা দেয়। এছাড়া, পুষ্টি শোষণেও ঘাটতি হয়, যার ফলে শরীর পুষ্টির অভাবে ভোগে। টাইপ-২ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, পেটের চর্বি বৃদ্ধি এবং অস্বাভাবিক কোলেস্টেরল মাত্রার ঝুঁকি দ্রুত খাওয়ার কারণে অনেক বেশি। জাপানের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ১০ মিনিটের মধ্যে খাবার শেষ করেন তাদের রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়, যা টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। দ্রুত খাওয়ার ফলে ইনসুলিন নিঃসরণ কমে যায়, যা ডায়াবেটিসের অন্যতম কারণ।

ধীরে খাওয়ার জন্য কিছু সহজ কৌশল অনুসরণ করা যেতে পারে:

সময় দিন: খাবারের জন্য অন্তত ৩০ মিনিট সময় রাখুন। এতে পেট ভরা থাকার সিগন্যাল মস্তিষ্কে পৌঁছাতে পারে।
ভালো করে চিবান: প্রতিটি কামড় ১৫ থেকে ৩০ বার পর্যন্ত চিবিয়ে নিন। ডা. হেইনবার্গের পরামর্শ অনুযায়ী, মুখে খাবার রাখার সময় হাত বা চামচ নামিয়ে রাখুন, যাতে পরবর্তী কামড় নেওয়ার তাড়া না হয়।
মাইন্ডফুল ইটিং: খাবার খাওয়ার সময় মনোযোগ দিন, খাবারের গন্ধ, স্বাদ, রং, গঠন সবকিছু অনুভব করুন। টিভি, মোবাইল বা অন্য কোনো ডিভাইস থেকে মন সরিয়ে খাবারের প্রতি মনোযোগ দিন।

খাবার খাওয়ার সময় ধীরগতিতে মনোযোগ দিয়ে খাওয়া শুধু একটি শিষ্টাচার নয়, এটি আমাদের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য অপরিহার্য। দ্রুত খাওয়া নানা রকম স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়, যেমন ওজন বৃদ্ধি, হজমের সমস্যা, হার্টবার্ন, টাইপ-২ ডায়াবেটিস ইত্যাদি। তাই আসুন আমরা সবাই ধীরে ধীরে, মনোযোগ দিয়ে খাবার উপভোগ করি এবং সুস্থ জীবন যাপন করি।

এই ছোট্ট পরিবর্তনগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই আজ থেকেই শুরু করুন ধীরে খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং স্বাস্থ্যবান জীবনযাত্রার পথে এগিয়ে যান।

নতুন কোভিড উপধরন ‘অমিক্রন এক্সবিবি’

সম্প্রতি দেশে কোভিড-১৯ এর একটি নতুন উপধরন অমিক্রন এক্সবিবি শনাক্ত হয়েছে, যা পূর্ববর্তী রূপগুলোর তুলনায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এই উপধরনটি মূলত দুটি অমিক্রন স্ট্রেনের সংমিশ্রণে তৈরি একটি রিকম্বিন্যান্ট সাবভেরিয়েন্ট। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি আগের রূপগুলোর তুলনায় বেশি সংক্রামক হলেও মৃত্যুহারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত নয়।

এই নতুন রূপের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, এটি অনেক সময় প্রচলিত পরীক্ষায় ধরা পড়ে না, ফলে ফলস নেগেটিভ রিপোর্ট আসতে পারে। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে সাধারণ উপসর্গ যেমন জ্বর, কাশি দেখা যায় না। এর পরিবর্তে গিঁটে ব্যথা, মাথাব্যথা, গলাব্যথা, পিঠে ব্যথা, ক্ষুধামন্দা ও শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। এমনকি সিটি স্ক্যান বা এক্স-রেতে নিউমোনিয়ার সংক্রমণ ধরা পড়লেও নাকের সোয়াবে ভাইরাস পাওয়া না-ও যেতে পারে।

যদিও এটি অধিকাংশ সুস্থ ব্যক্তির জন্য মারাত্মক নয়, তবে বয়স্ক, দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থ বা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম এমন ব্যক্তিরা বেশি ঝুঁকিতে আছেন। তাই আবারো সতর্কতা অবলম্বনের সময় এসেছে।

সুরক্ষিত থাকার উপায়:
মাস্ক সঠিকভাবে পরা জরুরি, যাতে নাক-মুখ ঢাকা থাকে।
জনাকীর্ণ স্থান এড়িয়ে চলা উচিত।
নিয়মিত হাত ধোয়া ও স্যানিটাইজার ব্যবহার করুন।
অন্তত দেড় মিটার দূরত্ব বজায় রাখুন।
লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ভ্যাকসিন বা বুস্টার ডোজ না নিলে এখনই নেওয়া উচিত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, সিডিসি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা আইসিডিডিআরবি–এর তথ্য অনুসরণ করাই সর্বোত্তম। বিভ্রান্তিকর অনলাইন বার্তা এড়িয়ে চলুন। সতর্ক থাকুন, সুস্থ থাকুন।

গন্ধার শিল্প ও এশিয়ান সভ্যতা

গন্ধার ছিল প্রাচীন উত্তর-পশ্চিম দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সভ্যতা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, যা আধুনিক আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের কিছু অংশজুড়ে বিস্তৃত ছিল। এটি শুধু একটি ভূগোলিক অঞ্চলই নয়, বরং এক সেতুবন্ধন, যেখানে প্রাচ্যের আধ্যাত্মিকতা এবং পাশ্চাত্যের বাস্তববাদী শিল্প চিন্তা একত্রিত হয়ে গঠন করেছিল একটি অনন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। গন্ধারের ইতিহাস, শিল্প ও ধর্মীয় ভূমিকা আজকের দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার সাংস্কৃতিক পরিচয়ে গভীরভাবে ছায়া ফেলেছে।

গন্ধারের ইতিহাস প্রায় ৩০,০০০ বছর আগের প্রস্তর যুগ পর্যন্ত প্রসারিত। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে এখানকার গুহাচিত্র, পাথরের সরঞ্জাম ও বিভিন্ন প্রত্নবস্তুর মাধ্যমে বোঝা যায়, এটি প্রাচীন সভ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিল। ঋগ্বেদে গন্ধারের উল্লেখ পাওয়া যায়, যা এটিকে ইন্দো-আর্য সভ্যতার একটি শক্তিশালী অংশ হিসেবে চিহ্নিত করে। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে গন্ধার হাখমানেশী (আকেমেনিড) পারস্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। ৩২৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের অভিযানের সময় এটি গ্রিক জগতের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং পরবর্তী কালে মৌর্য ও কুশান সাম্রাজ্যের অংশে পরিণত হয়।

প্রথম থেকে পঞ্চম খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কুশান সাম্রাজ্যের শাসনামলে গন্ধার তার চূড়ান্ত বিকাশে পৌঁছায়। কুশানরা পেশোয়ারকে রাজধানী করে তুলেছিল এবং গন্ধারকে একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে পরিণত করে। এই সময়ে গন্ধার শিল্প ও ধর্মীয় সংস্কৃতি সিল্ক রোডের মাধ্যমে মধ্য এশিয়া থেকে শুরু করে পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। কুশান সম্রাট কানিষ্ক বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি বিশেষভাবে অনুরক্ত ছিলেন, যার ফলে গন্ধারে মহাযান বৌদ্ধ মতের বিস্তার ঘটে।

গন্ধার শিল্প বিশ্ব ইতিহাসে এক অনন্য স্থান অধিকার করে আছে। এটি শুধু বৌদ্ধধর্মীয় ভাবনা ও মূর্তিচর্চারই প্রতিফলন নয়, বরং শিল্পের মধ্য দিয়ে সাংস্কৃতিক সংলাপের একটি জীবন্ত নিদর্শন। এই শিল্পধারায় পারস্যের সূক্ষ্ম কারিগরী কৌশল, গ্রিক-রোমান বাস্তববাদ এবং ভারতীয় ধর্মীয় ভাবনার এক অভূতপূর্ব সংমিশ্রণ দেখা যায়। গন্ধারের বুদ্ধমূর্তিগুলিতে গ্রিকদের ভাস্কর্যশৈলীর প্রভাব স্পষ্ট। মাথায় কার্লি চুল, গ্রীক পোশাক, পায়ে স্যান্ডেল—এসব বৈশিষ্ট্য গন্ধার শিল্পকে এক ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।

বিশেষ করে বুদ্ধের মানবীয় মুখাবয়ব, শরীরের ভঙ্গিমা, কোমলতা এবং আবেগ প্রকাশে গন্ধার শিল্পে গ্রিক ‘হেলেনিস্টিক’ রীতির প্রভাব প্রকট। এই শিল্পশৈলী পরবর্তীতে চীনের ইউনগাং ও লংমেন গুহা, কোরিয়া ও জাপানের বৌদ্ধ ভাস্কর্য তৈরিতে আদর্শ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে বলা চলে গন্ধার ছিল সেই কেন্দ্রবিন্দু যেখান থেকে শিল্পের একটি বৃহৎ ধারা সমগ্র এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।

গন্ধার শুধু একটি শিল্প ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছিল না, বরং এটি ছিল বৌদ্ধ ধর্মের এক মহান তীর্থভূমি। মহাযান বৌদ্ধ ধর্মের বিকাশে গন্ধারের অবদান ছিল বিশাল। এখানকার বৌদ্ধ মঠ, স্তূপ এবং ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্রগুলো থেকে বহু ভিক্ষু ও শিক্ষার্থী সিল্ক রোড ধরে চীন, মধ্য এশিয়া, কোরিয়া এবং জাপানের দিকে যাত্রা করেন। তারা শুধু ধর্মই নয়, সঙ্গে নিয়ে যান গন্ধারের শিল্প, ভাষা ও চিন্তাধারাও।

গন্ধারের সাংস্কৃতিক জগতকে বুঝতে হলে তাদের ভাষা ও লিপির দিকে নজর দিতে হয়। গান্ধারী ভাষা ছিল একটি প্রাকৃত ভাষা, যা খরোষ্ঠী লিপিতে লেখা হত। এটি সংস্কৃত থেকে পৃথক হলেও ধর্মীয় ও প্রশাসনিক কাজের জন্য ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো। গান্ধারী ভাষায় রচিত বহু বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ, তালপাতার পুঁথি এবং প্রত্নলিপি গন্ধারের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এই ভাষার কিছু বৈশিষ্ট্য আজকের দার্দীয় ভাষাসমূহেও দেখা যায়, যা এ অঞ্চলের ভাষাগত ধারাবাহিকতাকে নির্দেশ করে।

গন্ধারের গুরুত্ব একমাত্র প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বা শিল্পকলায় সীমাবদ্ধ নয়। এটি ছিল সিল্ক রোডের একটি প্রধান কেন্দ্র, যার মাধ্যমে ভারত ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সংযোগ স্থাপিত হতো। গন্ধারের মাধ্যমে এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে যে সাংস্কৃতিক সংলাপ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা পরবর্তীতে সেসব অঞ্চলের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। বৌদ্ধ চিন্তার পাশাপাশি শিল্পকলা, সাহিত্য ও স্থাপত্যেও গন্ধারের ছাপ লক্ষ করা যায়।

গন্ধার ছিল এমন একটি সভ্যতা, যা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মিলনে তৈরি হয়েছিল। এর শিল্পশৈলী, ধর্মীয় চিন্তা, ভাষা ও সাংস্কৃতিক চর্চা এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আধুনিক সময়ে “সবদিকে বিকাশ: গন্ধার শিল্প ও এশিয়ান সভ্যতা” নামে যে প্রদর্শনী বা গবেষণাগুলো অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তা কেবল অতীতকে স্মরণ নয়, বরং এক ইতিহাস-নির্মাণের পুনর্ব্যাখ্যা। গন্ধার আমাদের শেখায়—সাংস্কৃতিক সংলাপ কেবল সভ্যতাকে সমৃদ্ধ করে না, তা একটি বৃহত্তর মানবিক পরিচয়ের জন্ম দেয়। এই পরিচয়ই আজকের এশিয়ার বহুধা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রাণশক্তি।

বাংলাদেশে পরিবহন ব্যয় ও অগ্রিম আয়কর বৃদ্ধি

২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বাংলাদেশে বাণিজ্যিক যানবাহনের উপর অগ্রিম কর (অ্যাডভান্স ট্যাক্স) বৃদ্ধি করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা ১৩টি বাণিজ্যিক মোটরযানের ক্ষেত্রে ৪ হাজার থেকে ৩৭,৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭ হাজার থেকে ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। এতে করে গাড়িভেদে ৮৮ শতাংশ পর্যন্ত কর বাড়বে। এই অগ্রিম কর বাস মালিকরা যাত্রীদের ওপর চাপিয়ে দেবেন, ফলে যাতায়াত ব্যয় বাড়বে এবং তা মূল্যস্ফীতিকে আরো উসকে দিতে পারে।

বাংলাদেশের মানুষ ইতোমধ্যেই আয় অনুপাতে অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় বহন করছে। একজন ব্যক্তির মোট আয়ের ১০ শতাংশের মধ্যে পরিবহন ব্যয় থাকা অর্থনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হলেও বাস্তবে তা অনেক বেশি। যানজট, দুর্বল পরিকল্পনা এবং চাঁদাবাজি পরিবহন খরচ বৃদ্ধির পেছনে দায়ী। রাস্তার অবকাঠামো উন্নয়ন হলেও কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না, যানজটও কমছে না। যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহনগুলোকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হয়, যার প্রভাব পড়ে পরিবহন খরচে। এ ছাড়াও রুটে রুটে চাঁদাবাজির কারণে একেকটি গাড়ি প্রতিদিন গুনছে বাড়তি মাশুল, যা চূড়ান্তভাবে পণ্যের দামে প্রতিফলিত হচ্ছে।

পরিবহন ব্যয়ের উপর জ্বালানি তেলের দামেরও প্রভাব রয়েছে। মূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভাড়া বাড়ানো হলেও, দাম কমলেও ভাড়া কমানো হয় না। ফলে একবার বাড়া ভাড়া স্থায়ী হয়ে পড়ে। ২০২৫ সালের মে মাসে তেলের দাম দুই দফা কমলেও পরিবহন ভাড়া অপরিবর্তিত থাকে।

এ অবস্থা শুধু জনজীবনে নয়, ব্যবসা-বাণিজ্যেও ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। বেশি পরিবহন ব্যয়ের কারণে আমদানি-রফতানি খরচ বাড়ছে, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, যার ফলে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে ও ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, পরিবহন ব্যয় কমানো গেলে রফতানি ২০ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব।

উন্নত দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও একটি আধুনিক, সমন্বিত ও টেকসই পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। শুধুমাত্র অবকাঠামো নয়, ভাড়া নির্ধারণের স্বচ্ছতা, চালকের দক্ষতা, দুর্ঘটনা রোধ, পরিষ্কার ও আরামদায়ক যানবাহন, সবার জন্য সাশ্রয়ী যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তোলাই উন্নত পরিবহন ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে অগ্রিম কর বৃদ্ধির ফলে মানুষের জীবনযাত্রা ব্যয় আরও বাড়বে। তাই পরিবহন খাতে অগ্রিম আয়কর সহনীয় পর্যায়ে রাখা, খাতটিতে সুশৃঙ্খলা আনা, মালিকদের দৌরাত্ম্য কমানো এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি বাড়ানো জরুরি। তা না হলে পরিবহন খরচের বোঝা মানুষ ও দেশের অর্থনীতিকে আরও সংকটে ফেলবে।

বাংলা কমিকসের এক অমর অধ্যায় ‘নন্টে ফন্টে’

বাংলা সাহিত্যের এক সুপ্ত কিন্তু শক্তিশালী শাখা হলো কমিকস, যা একই সঙ্গে চিত্র ও কাহিনির ছন্দময় মেলবন্ধন। এই ধারায় যারা বাংলা ভাষায় স্থায়ী ছাপ রেখে গেছেন, তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ নামটি নিঃসন্দেহে নারায়ণ দেবনাথ। তাঁর সৃষ্ট “নন্টে ফন্টে” কেবলমাত্র কমিক স্ট্রিপ নয়, বরং এটি বাঙালি শিশু-কিশোরদের মানসিক গঠনে, রসবোধে ও নৈতিক বিকাশে এক অনন্য ভূমিকা পালন করেছে।

“নন্টে ফন্টে” প্রথম আত্মপ্রকাশ করে ১৯৬৯ সালে পশ্চিম বাংলার জনপ্রিয় শিশু-কিশোর পত্রিকা কিশোর ভারতী-তে। এটি ছিল একটি ধারাবাহিক কমিক স্ট্রিপ, যেখানে কাহিনি চিত্রের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেত। নারায়ণ দেবনাথ মূলত ছিলেন বিজ্ঞাপন শিল্পী ও চিত্রকর, কিন্তু তাঁর কল্পনা ও শিশুমনের অন্তর্দৃষ্টি কমিকসের রূপে রূপান্তরিত হয়ে এক নতুন পাঠ সংস্কৃতি গড়ে তোলে।

নন্টে ও ফন্টে দুজন মিশুক, দুরন্ত এবং কখনও কখনও নিষ্পাপভাবে দুষ্টু। তারা পশ্চিম বাংলার একটি বোর্ডিং স্কুলে পড়ে। তাদের প্রতিদিনের দুষ্টুমি, বিভ্রান্তি ও ছোটখাটো সংঘর্ষগুলো কমিক স্ট্রিপের প্রাণ। নন্টে ও ফন্টের মধ্যে সামান্য বাহ্যিক পার্থক্য রয়েছে, নন্টের মাথায় একটি ছোট টিকি ও কমলা জামা, আর ফন্টে সাধারণ ছাঁটা চুল ও নীল শার্ট পরে। এই ভিজ্যুয়াল বৈচিত্র্য শুধু আলাদা চিহ্ন নয়, বরং পাঠকের মনে চরিত্র দুটি আলাদা রূপে গেঁথে যাওয়ার কৌশল।

গল্পের আরও একটি উল্লেখযোগ্য চরিত্র হলো কেল্টুদা, যিনি বয়সে বড়, কিন্তু বারবার ফেল করে এক ক্লাসেই পড়ে আছেন। তিনি একাধারে বিদ্রোহী, ফন্দিবাজ এবং হাস্যকর, যার কল্পিত বুদ্ধির ব্যর্থ প্রয়োগই বারবার পাঠককে আনন্দ দেয়। তার দুষ্টুমির ফাঁদে পড়ে বহুবার নন্টে ও ফন্টে বিপদে পড়ে যায়, কিন্তু শেষমেশ বুমেরাং হয়ে কেল্টুর দিকেই ঘুরে যায় ফন্দি। এই গাণিতিক পুনরাবৃত্তি গল্পে উত্তেজনার পাশাপাশি একটি মোরাল কাঠামো তৈরি করে।

বোর্ডিং স্কুলের সুপারিন্টেনডেন্ট স্যার, কড়া মেজাজের, সবসময় ছাত্রদের উপর নজর রাখেন। কিন্তু তাঁর চরিত্রেও আছে একটি মানবিক দুর্বলতা, যা কখনো ভুতুড়ে ভয়, কখনো কেল্টুর ধোকায় বিভ্রান্তি হিসেবে প্রকাশ পায়। “Sirer Vhoutik Chatro” গল্পে দেখা যায়, কেল্টুর তৈরি ভৌতিক নাটক স্যারকে এতটাই আতঙ্কিত করে যে তিনি বাস্তব ও কল্পনার পার্থক্য ভুলে যান। এই ধরনের কাহিনি শিশুদের মধ্যে কল্পনা ও বাস্তবতাবোধ গড়ে তোলে।

নারায়ণ দেবনাথের আরেকটি কৃতিত্ব হলো সহজ ভাষা ও কল্পনার জগতে নৈতিক বার্তা সন্নিবেশিত করা। তিনি জানতেন শিশুরা কেবল আদেশ-উপদেশে বিকশিত হয় না, তাদের দরকার গল্প, রসবোধ এবং চরিত্রের মাধ্যমে শেখা। তাই নন্টে ফন্টের প্রতিটি কাহিনিতে থাকে বন্ধুত্ব, বুদ্ধিমত্তা, ন্যায়বোধ, এবং একটি নৈতিক শিক্ষা যা কোনোদিনও কড়া শাসনের মাধ্যমে আরোপিত হয় না।

গল্পগুলোর হাস্যরস কেবল বাহ্যিক নয়, তা রূঢ় বাস্তবতার অন্তরালে সমাজের ছোটখাটো অসঙ্গতি বা মানসিক দুর্বলতার দিকেও ইঙ্গিত করে। যেমন কেল্টুর প্রতিটি ছলচাতুরী অবশেষে তার নিজস্ব অবিবেচনার কারণেই ধরা পড়ে। এটি শিশুদের শেখায় মিথ্যা বা প্রতারণা করে কেউ স্থায়ী সাফল্য পায় না।

“নন্টে ফন্টে” কেবল শহর বা মধ্যবিত্ত পাঠকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। গ্রামের চায়ের দোকান, লাইব্রেরি, বাসস্ট্যান্ডের ভাঁজে ভাঁজে ছড়িয়ে পড়েছিল এই কমিকস। শিশুরা যেমন অপেক্ষা করত পরবর্তী সংখ্যার জন্য, তেমনই অভিভাবকরা নিশ্চিন্ত হতেন এই গল্পের মধ্যে নেই অশ্লীলতা, নেই নেতিবাচক বার্তা, আছে কেবল নির্মল আনন্দ ও মূল্যবোধ।

২০০৩ সালে কমিকসটির রঙিন সংস্করণ প্রকাশিত হয়। পাশাপাশি এটি অ্যানিমেটেড ভিডিও সিরিজ হিসেবেও রূপ পায়, যা আকাশ বাংলা চ্যানেলে প্রচারিত হয়েছিল। এই ডিজিটাল রূপান্তর বাংলা কমিকসকে আধুনিক মাধ্যমে স্থান করে নিতে সহায়তা করে এবং শিশুদের পাঠাভ্যাসকে ধরে রাখতে সাহায্য করে।

আজ নারায়ণ দেবনাথের কীর্তি কেবল শিল্প নয়, এটি ইতিহাস। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি চিত্রকলার জগতে কমিকসের অবস্থানকে তিনি যে মর্যাদা দিয়েছেন, তা তুলনাহীন। “নন্টে ফন্টে” বাংলা শিশু-সাহিত্যকে একধাপে এগিয়ে নিয়ে যায়, যেখানে গল্প শুধু পড়ে শেষ হয় না, পাঠকের সঙ্গে একটি সম্পর্ক গড়ে তোলে।

এই কমিকস প্রজন্মের পর প্রজন্ম জুড়ে বাঙালি কিশোরদের হাসতে শিখিয়েছে, ভাবতে শিখিয়েছে এবং জীবনের সরলতায় বিশ্বাস রাখতে শিখিয়েছে।কমিকসের চরিত্রগুলো যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে পাঠকের মনে—নন্টের টিকি, ফন্টের নিরীহ মুখ, কেল্টুর পাঁজরভাঙা দুষ্টুমি, স্যারের কড়া চোখ,সবকিছু মিলে গড়ে উঠেছে এক অদ্ভুত শৈশব-জগত, যা আজও বহু বাঙালির স্মৃতির অংশ।