Home Blog Page 74

ইরানের পাল্টা খুব বেশি কিছু করার সক্ষমতা নেই : মোজাম্মেল হোসাইন, তোহালিবিয়া প্রবাসী বিশ্লেষক

“… আমেরিকা-ইসরায়েল সব সময়ই ইরানের সাথে যুদ্ধাবস্থায় ছিল। একের পর এক ইরানের পরমাণু বিজ্ঞানীদের হত্যা করেছে। কঠোর অবরোধ দিয়ে ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিয়েছে। একাধিক ঘটনায় ইরানের ভেতরে জনগণকে উস্কে সরকার পতন ঘটানোর চেষ্টা করেছে।

মুখে হুমকি-ধামকি দিলেও সরাসরি হামলা যে এত বছর করেনি, তার কারণটাও একেবারে বেসিক কারণ। এত বছর দুই পক্ষের মধ্যে মিনিমাম একটা ব্যালেন্স অব পাওয়ার ছিল।

ইরান কখনও ইসরায়েলের উপর হামলা করেনি, কারণ তাদের হামলার জবাবে পাল্টা যে ভয়াবহ হামলা হবে, তাদেরকে যে ধ্বংস করে দেওয়া হবে, সেটা ঠেকানোর মতো শক্তি তাদের কখনোই ছিল না। সুতরাং আগ বাড়িয়ে নিজেদের ধ্বংস টেনে আনার কোনো যুক্তি তাদের ছিল না।

অন্যদিকে আমেরিকা-ইসরায়েল হামলা করেনি, কারণ ইরানের যদিও ইসরায়েলকে ধ্বংস করার মতো শক্তি ছিল না, কিন্তু তার প্রক্সিদেরকে দিয়ে আক্রমণ করিয়ে ইসরায়েলের, এবং সেই সাথে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করার সক্ষমতা ইরানের ছিল।

এখন যে হামলা করেছে, তার প্রধান কারণ হচ্ছে, গত এক বছরে সেই ব্যালেন্স অব পাওয়ার ধ্বসে পড়েছে। গাযাকে ডিফেন্ড করতে গিয়ে প্রথমে হেজবুল্লাহ’র পতন এবং এরপর সেই ধারাবাহিকতায় সিরিয়ার পতন ইরানকে গত অন্তত দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল এবং ভালনারেবল করে তুলেছে।

ইরানের প্রক্সিদের যে ভয় এত বছর আমেরিকা-ইসরায়েলের ছিল, সেটা এখন নাই বললেই চলে। ফলে এটাই ছিল ইরানের উপর হামলা করার সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। নতুন করে ইরানকে শক্তিশালী হতে দেওয়ার আগেই। ইসরায়েল সেটাই করেছে।

ইরানের কি পাল্টা কিছু করার আছে? আমার মনে হয় না। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো একে অন্যের বিরুদ্ধেই যুদ্ধে করতে পারে। কিন্তু ইসরায়েলের তুলনায় তাদের ইন্টেলিজেন্স এত দুর্বল, আর আমেরিকার তুলনায় তাদের সামরিক সক্ষমতা এত দুর্বল, হম্বিতম্বি আর শো অব ফোর্স ছাড়া বাস্তবে তাদের খুব বেশি কিছুর সক্ষমতা নাই।

ইরানও সেটাই পারবে। সিম্বলিক কিছু হামলা করতে পারবে। সেটা তারা অবশ্যই করবে। তাদেরকে করতে হবে। ইসরায়েলের উপর বড় আকারের কোনো হামলা করার বা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করার সক্ষমতাও অবশ্য ইরানের আছে, সেটা তারা এর আগে দেখিয়েছে; কিন্তু সেটার প্রতিক্রিয়ায় নিজেদের পুরোপুরি ধ্বংস টেনে আনার মতো বোকামি তারা করবে বলে মনে করি না।

হ্যাঁ, আমেরিকা-ইসরায়েল কোনো দেশ দখল করে লংটার্মে সেখানে জিততে পারে না। কোনো দেশই পারে না। কিন্তু উপর থেকে বোমা ফেলে সব তামা তামা করে দেওয়ার ব্যাপারে তাদের এখনও কোনো জুড়ি নাই। আমেরিকার শক্তিমত্তা কমে আসছে, কিন্তু এখনও যে তারা একক সুপারপাওয়ার, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নাই। সেটা না হলে গাযার গণহত্যা এতদিন চলতে পারত না। এই হামলার মধ্য দিয়ে মোসাদ আবারও তাদের সক্ষমতা প্রমাণ করল। …”

ডুমসডে ফিশ : অশুভ ইঙ্গিত নাকি অন্যকিছু ?

নভেম্বর, ২০২৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার এনসিনিটাস উপকূলে ভেসে উঠল এক অদ্ভুত মাছ। নয় ফুট দৈর্ঘ্যের এই রুপালি দানবটি দেখে প্রথমে স্থানীয়রা ভেবেছিলেন, এটি কোনো মৃত ডলফিন কিংবা অজানা সামুদ্রিক সাপ। কিন্তু পরে জানা গেল, এটি বিশ্বের দীর্ঘতম হাড়যুক্ত মাছ ওয়ারফিশ। স্থানীয়ভাবে একে ডাকা হয় ‘ডুমসডে ফিশ’, অর্থাৎ প্রলয়ের দূত। আর তার এই উপস্থিতি ঘিরেই ঘনীভূত হচ্ছে রহস্য, আতঙ্ক এবং বহু পুরনো কুসংস্কারের ছায়া।

ওয়ারফিশ সাধারণত গভীর সমুদ্রের অন্ধকার জগতে বাস করে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩,০০০ ফুট নিচে এদের উপস্থিতি। এরা দেখতে ফিতার মতো লম্বা, রুপালি বর্ণের, আর মাথার ওপর লাল কাঁটার মতো স্পাইন থাকে, যা একে করে তোলে আরো রহস্যময়। ৩০ ফুট দৈর্ঘ্য একে বিশ্বের দীর্ঘতম অস্থিযুক্ত মাছের মর্যাদা দিয়েছে।

জাপানি সংস্কৃতিতে ওয়ারফিশের উপস্থিতিকে ধরা হয় ভূমিকম্প বা সুনামির পূর্বাভাস হিসেবে। এদের বলা হয় “রিউগু নোৎসুকাই” বা “ড্রাগন রাজ্যের দূত”। এমন বিশ্বাস যে, সমুদ্রের তলদেশে ভয়ংকর কিছু ঘটতে যাচ্ছে, তার পূর্বঘোষক হিসেবেই এই মাছ উঠে আসে উপকূলে।

২০১১ সালের ভয়াবহ ফুকুশিমা ভূমিকম্প ও সুনামির আগে জাপানের উপকূলে একাধিক ওয়ারফিশ ধরা পড়েছিল। এরপর থেকেই এই মাছের সাথে দুর্যোগের সম্পর্ক ঘিরে গুজব আরও গভীর হয়। শুধু জাপানেই নয়, ক্যালিফোর্নিয়াতেও এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। ওয়ারফিশ পাওয়ার পরপরই আশেপাশের এলাকায় মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ফলে স্থানীয় জনগণের মধ্যে আতঙ্কের ছায়া ঘনিয়ে আসে।

তবে বিজ্ঞানীরা এসব কুসংস্কার মানতে নারাজ। তাঁদের মতে, ওয়ারফিশ মূলত খুব সংবেদনশীল প্রাণী। সমুদ্রের তলদেশে তাপমাত্রা হঠাৎ পরিবর্তন, জেলিফিশ বা বড় শিকারির আক্রমণ, দূষণ বা স্রোতের পরিবর্তনের কারণে এরা দিকভ্রান্ত হয়ে উপরে চলে আসে।

“এটি ভূমিকম্পের পূর্বাভাস নয়, বরং সমুদ্রের পরিবেশগত সংকেত,”— বলেন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক জীববিদ ড. এলিসা মর্গান। তিনি আরও বলেন, “গভীর সমুদ্রের বাসিন্দাদের আচরণ পরিবর্তন থেকে আমরা বরং জলবায়ু ও সমুদ্রপ্রবাহের পরিবর্তন সম্পর্কে জানতে পারি।”

বিজ্ঞানীদের মতে, এখন পর্যন্ত কোনো গবেষণায় এমন প্রমাণ মেলেনি যে ওয়ারফিশ পূর্বাভাস দিতে পারে। বরং তাদের উপস্থিতি আমাদের জানান দেয়, গভীর সমুদ্রে হয়তো কিছু অজানা পরিবেশগত অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

২০২৪ সালের এই সর্বশেষ ওয়ারফিশ ছিল গত তিন মাসে ক্যালিফোর্নিয়ায় ধরা পড়া তৃতীয় এবং শতাব্দীর মধ্যে ২২তম উদাহরণ। গবেষকরা মাছটির নমুনা সংগ্রহ করেছেন এবং মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণ করছেন। এটি অসুস্থ ছিল, না কি পরিবেশের কারণে উপরে উঠে এসেছে, তা নির্ধারণ করাই এখন গবেষণার মূল লক্ষ্য।

পুরুষদের মৃত্যু-ঝুঁকি বাড়াচ্ছে ‘ব্রোকেন হার্ট সিনড্রোম’

সমাজে আমরা প্রায়ই হৃদরোগকে শুধুই বয়স্কদের বা শারীরিক দুর্বলতার প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখি। তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে এক ভিন্ন ও উদ্বেগজনক চিত্র, পুরুষরা নারীদের তুলনায় “ব্রোকেন হার্ট সিনড্রোম”-এ দ্বিগুণ হারে মারা যাচ্ছেন। এটি শুধুই কোনো আবেগপ্রবণ বাক্য নয়, এর পেছনে আছে কঠিন বৈজ্ঞানিক তথ্য ও বিশ্লেষণ।

“ব্রোকেন হার্ট সিনড্রোম”, যার বৈজ্ঞানিক নাম Takotsubo Cardiomyopathy (TC), মূলত একটি হঠাৎ ঘটে যাওয়া হৃদযন্ত্র দুর্বলতার অবস্থা।কোনো চরম আবেগজনক ঘটনা, মানসিক আঘাত, বা শারীরিক চাপ—যেমন বড় অপারেশন, ইনফেকশন বা দুর্ঘটনা হৃদপেশিকে দুর্বল করে দেয়। এতে বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দেয়, যা হার্ট অ্যাটাকের মতোই মনে হয় কিন্তু আসলে এটি ভিন্ন ও জটিল এক অবস্থা।

অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় প্রায় ২ লক্ষ রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নারীরা সংখ্যায় বেশি আক্রান্ত হলেও TC-তে পুরুষদের মধ্যে মৃত্যুহার অনেক বেশি—প্রায় ১১%, যেখানে নারীদের মধ্যে তা ৫.৫%। গবেষকেরা মনে করেন, পুরুষদের ক্ষেত্রে শারীরিক চাপজনিত ট্রিগার বেশি কাজ করে, ফলে তাদের শরীর এই আঘাত সামাল দিতে পারে না।

এর পেছনে হরমোনগত পার্থক্যও দায়ী হতে পারে। নারীদের শরীরে থাকা ইস্ট্রোজেন হরমোন হয়তো এই অবস্থা থেকে কিছুটা সুরক্ষা দেয়, যা পুরুষদের দেহে অনুপস্থিত। এছাড়া পুরুষেরা সাধারণত মানসিক চাপ বা আবেগ প্রকাশে বেশি সংযত, যা ভেতরে জমে থাকা চাপকে আরও মারাত্মক করে তোলে।

এই সিনড্রোম শুধু দুঃখজনক ঘটনার জন্যই নয়, অত্যন্ত খুশির মুহূর্তেও ঘটতে পারে, যাকে বলা হয় “হ্যাপি হার্ট সিনড্রোম”—যেমন লটারি জেতা, হঠাৎ সারপ্রাইজ বা প্রোমোশন পাওয়া। ফলে এই অসুখের মূলকথা একটাই: হৃদয় হঠাৎ ও প্রবল আবেগে সাড়া দেয় এবং তা কখনো কখনো বিপজ্জনক হতে পারে।

চিকিৎসকেরা বলছেন, প্রাথমিক শনাক্তকরণ ও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রে ব্লাড থিনার ব্যবহার এই মৃত্যুঝুঁকি অনেকটা কমাতে পারে। তাই বিশেষ করে পুরুষদের যারা শারীরিক বা মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তাদের জন্য সচেতনতা ও মানসিক সহায়তা এখন সময়ের দাবি।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট- বৈষম্যহীন অর্থনীতি সংকোচনমূলক কৌশল ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ

২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটটি পেশ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা, যা এই সরকারের প্রথম বাজেটও বটে। এটি উপস্থাপিত হয়েছে অনেকটাই আনুষ্ঠানিকতা ও রাজনৈতিক উন্মাদনাবিহীনভাবে একটি “উত্তাপহীন বাজেট”। বাজেটের আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ৭ হাজার কোটি টাকা কম হলেও সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ৬ দশমিক ১৮ শতাংশ বেশি। এটি জিডিপির ১২ দশমিক ৭ শতাংশের সমান।

এবারের বাজেট অনেকটাই সংকোচনমূলক। অতীতের মতো উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ না করে ব্যয় সংকোচন ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মূল্যস্ফীতির হার ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ, যদিও বাস্তবে তা ৯-১০ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে। রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে এনবিআরের অংশ ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। এটি অর্জনের জন্য অতিরিক্ত কর আহরণ, কর ছাড় কমানো এবং করের আওতা বাড়ানো হবে, ফলে সাধারণ জনগণের ওপর আর্থিক চাপ বাড়বে। বর্তমানে কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৭ শতাংশ, যা এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন।

বাজেট ঘাটতি নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা (জিডিপির ৩.৬ শতাংশ)। এটি কম হওয়ায় বিদেশী ঋণের ওপর নির্ভরতা হ্রাসের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে বাজেট বাস্তবায়নের গুণগত মান নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে না। গত অর্থবছরের সংশোধিত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৫.২৫ শতাংশ, যদিও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ৩.৩-৩.৯ শতাংশ প্রাক্কলন করেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা ৫.৫ শতাংশ ধরা হয়েছে।

উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৩১ শতাংশ। অপরদিকে পরিচালন ব্যয় ৪ লাখ ৯৮ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ ৬৯ শতাংশ। সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি এই খাতে ব্যয় বাড়ার প্রধান কারণ। যদিও বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য কোনো প্রণোদনার কথা বলা হয়নি, যা সমাজে বৈষম্যের অনুভূতি বাড়াতে পারে।

কৃষিখাতে বরাদ্দ কমেছে। মোট বাজেটের মাত্র ৫.৮৬ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে কৃষিসংশ্লিষ্ট পাঁচটি মন্ত্রণালয়কে। ২০১১-১২ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১০.৬৫ শতাংশ। কৃষি ভর্তুকিও হ্রাস পেয়েছে, যা উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে এবং খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ ২৫.৩৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং খাদ্যগুদাম ধারণক্ষমতা বাড়ানোর অঙ্গীকার করা হয়েছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বেড়েছে সামান্য। শিক্ষা খাতে মোট বাজেটের ১২ দশমিক ১ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হলেও, প্রয়োজনীয় রূপান্তরের তুলনায় তা অপর্যাপ্ত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সার্বিকভাবে প্রস্তাবিত বাজেটটি একদিকে সংকোচন ও আর্থিক শৃঙ্খলার দিকে এগোলেও, কৃষি, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান খাতে কাঙ্ক্ষিত বরাদ্দ না থাকায় এটি একটি ভারসাম্যহীন অথচ প্রয়োজনভিত্তিক বাজেট হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বাস্তবায়নের দক্ষতা ও জনগণের ওপর আরোপিত চাপ কমানোর কৌশলই ঠিক করবে এই বাজেটের সফলতা।

মহাকাশে শক্তিশালী বিস্ফোরণের খোঁজ

মহাবিশ্ব একটি বিস্ময়। সেই বিস্ময়ের সূচনা হয়েছিল প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে এক মহা-বিস্ফোরণে, যাকে আমরা ‘বিগ ব্যাং’ নামে জানি। সেই মুহূর্ত থেকেই মহাকাশে শুরু হয়েছে শূন্যতা, শক্তি, পদার্থ ও সময়ের অপূর্ব খেলা। কিন্তু সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা এমন এক বিস্ফোরণের সন্ধান পেয়েছেন, যা বিগ ব্যাংয়ের পর মহাবিশ্বে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি কোনো সাধারণ সুপারনোভা নয়, বরং এক নতুন ধরনের বিস্ফোরণ, যাকে বলা হচ্ছে Extreme Nuclear Transient (ENT) বা চরম পারমাণবিক ক্ষণস্থায়ী মুহূর্ত।

এই বিস্ফোরণের খোঁজ পাওয়া গেছে যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের গবেষণায়। ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা জানান, এই মহাজাগতিক বিস্ফোরণ সাধারণ সুপারনোভার চেয়েও বহু গুণ শক্তিশালী। ENT বিস্ফোরণের সময় এক বছরে যে পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়, তা প্রায় ১০০টি সূর্যের সমগ্র জীবদ্দশায় উৎপাদিত শক্তির সমতুল্য।

কিভাবে আবিষ্কৃত হলো এই ENT?

জ্যোতির্বিজ্ঞানী হিংকল এই বিস্ফোরণের প্রথম আলামত খুঁজে পান যখন তিনি দূরবর্তী এক ছায়াপথের কেন্দ্রে দীর্ঘস্থায়ী আলোচঞ্চলা বা অগ্নিতরঙ্গ পর্যবেক্ষণ করছিলেন। আগে থেকে জানা ছিল, সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল বা ‘সুপারভারসীম কৃষ্ণগহ্বর’ কোনো বিশাল নক্ষত্রকে টেনে নিয়ে গেলে সেখানে বিস্ফোরণ ঘটে। কিন্তু এবার দেখা গেল ENT টাইপের বিস্ফোরণ এতোটা শক্তিশালী যে একে সাধারণ নিয়মে ব্যাখ্যা করা যায় না।

হিংকল বলেন, “আমরা এক দশকের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন সুপারনোভা বা নক্ষত্র ধ্বংসের দৃশ্য দেখেছি। কিন্তু ENT যেন অন্য কিছু, এটা ছিল ১০ গুণ বেশি উজ্জ্বল এবং বছরের পর বছর ধরে এর আলোকিত প্রভাব টিকে থাকে।”

এই ENT বিস্ফোরণের একটি নির্দিষ্ট ঘটনা চিহ্নিত করা হয়েছে যার নাম Gaia18cdj। এটি একটি বিশেষ নক্ষত্রীয় বিস্ফোরণ যা আমাদের সূর্যের চেয়ে প্রায় ২৫ গুণ বেশি শক্তি নির্গত করেছে। Gaia স্পেস টেলিস্কোপের মাধ্যমে এই বিস্ফোরণের আলোর উপস্থিতি ধরা পড়ে। বিস্ফোরণটি এতই শক্তিশালী ছিল যে গবেষকেরা বলছেন, এটি পরিচিত সবচেয়ে উজ্জ্বল সুপারনোভার থেকেও ২৫ গুণ বেশি শক্তি ছড়িয়েছে।

সাধারণত একটি সুপারনোভা এক বছরে সূর্যের ১০ বিলিয়ন বছরের সমান শক্তি নিঃসরণ করে। কিন্তু Gaia18cdj সেই সময়েই ১০০টি সূর্যের সমান শক্তি মুক্ত করেছে।

কেন এত শক্তিশালী?

বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, এই বিস্ফোরণের পেছনে রয়েছে একটি অতি-দৈত্যাকৃতি কৃষ্ণগহ্বর। কোনো একটি নক্ষত্র যখন এ ধরনের কৃষ্ণগহ্বরের খুব কাছে চলে আসে, তখন তার উপর ভয়াবহ আকর্ষণ বল প্রয়োগ হয়। একে বলে tidal disruption event (TDE)—নক্ষত্রকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলার প্রক্রিয়া। এই ENT হলো TDE-এরই একটি চরম রূপ, যেখানে আকর্ষণ বল এত বেশি হয় যে নক্ষত্র একেবারে পারমাণবিক স্তরে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং সেই সঙ্গে সৃষ্ট হয় ভয়াবহ তাপ, চাপ ও বিকিরণ।

এই বিকিরণের ফলে গামা রশ্মি, এক্স-রে ও দৃশ্যমান আলোর তীব্র তরঙ্গমালা সৃষ্টি হয়, যা আমাদের দূরবর্তী টেলিস্কোপে ধরা পড়ে। এই ENT বিস্ফোরণকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়া শক্তি এবং আলো মহাবিশ্বের কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূর থেকেও ধরা যায়।

বিজ্ঞানীরা বলছেন ENT আমাদের নক্ষত্রের জীবনচক্র এবং কৃষ্ণগহ্বরের আচরণ সম্পর্কে নতুন তথ্য দেবে। এমনকি এটা মহাবিশ্বে পদার্থ ও শক্তির চূড়ান্ত সীমা কোথায়, সে প্রশ্নও তুলছে। হিংকল ও তাঁর দল এখন পৃথিবীর বৃহত্তম টেলিস্কোপ ব্যবহার করে আরও এমন বিস্ফোরণের অনুসন্ধান চালাচ্ছেন। প্রতিটি নতুন ENT আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে আমরা মহাবিশ্বের গভীর, গোপন গঠন এবং শক্তির রহস্য উদ্ঘাটনের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাব।

আয়রন ঘাটতি পূরণে সহায়ক লাল মাংস

বিশ্বজুড়ে আয়রন ঘাটতি একটি বড় স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ২৫ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে আয়রন ঘাটতির শিকার। বিশেষ করে নারীরা এই সমস্যায় বেশি ভোগেন। আয়রন ঘাটতির কারণে ক্লান্তি, দুর্বলতা, মনোযোগের অভাব এবং দৈহিক সক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো নানা সমস্যা দেখা দেয়। সম্প্রতি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের Nutrition Reviews-এ প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণা পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, নিয়মিত লাল মাংস খাওয়া আয়রন ঘাটতি পূরণে কিছুটা হলেও সাহায্য করতে পারে।

গবেষণার পেছনের গল্প

ডাবলিন সিটি ইউনিভার্সিটির গবেষক দল, যার নেতৃত্বে ছিলেন পিএইচডি গবেষক লরা ম্যাকম্যানাস, ভিনিসিয়াস ফারিয়া এবং ড. ক্যাথারিন ভেরাস, ড. মিকা মানিনেন ও ড. ব্রেন্ডান ইগান—তারা ১০টি ইন্টারভেনশন স্টাডির তথ্য বিশ্লেষণ করেন। এসব গবেষণায় মোট ৩৯৭ জন অংশগ্রহণকারী ছিলেন, যাদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন আয়রন ঘাটতিগ্রস্ত প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও পুরুষ। গবেষণাগুলোতে অংশগ্রহণকারীদের সপ্তাহে ২৫৫ গ্রাম থেকে ১.৮ কেজি পর্যন্ত লাল মাংস খাওয়ানো হয় এবং এই ইন্টারভেনশন ৮ থেকে ৫২ সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হয়।

কী পাওয়া গেল গবেষণায়?

গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, নিয়মিত লাল মাংস খেলে রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কিছুটা বেড়ে যায়। হিমোগ্লোবিন হচ্ছে রক্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন পরিবহন করে। আয়রন ঘাটতির কারণে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কমে গেলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, নারীরা এই ইন্টারভেনশন থেকে পুরুষদের তুলনায় বেশি উপকৃত হন। এর কারণ হিসেবে গবেষকরা মনে করেন, নারীদের আয়রনের চাহিদা বেশি এবং তাদের শরীর আয়রন তুলনামূলক বেশি শোষণ করতে পারে।

তবে শুধু হিমোগ্লোবিন নয়, গবেষকরা ফেরিটিন নামক আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকও বিশ্লেষণ করেন। ফেরিটিন হচ্ছে শরীরে আয়রনের মজুদ বোঝাতে ব্যবহৃত একটি প্রোটিন। গবেষণায় দেখা গেছে, ৮ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে লাল মাংস খাওয়ালে ফেরিটিনের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। আর ১৬ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে খেলে ফেরিটিনের মাত্রা প্রায় তিনগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।

গবেষকরা অবশ্য সতর্ক করে বলেছেন, শুধু লাল মাংস খাওয়া আয়রন ঘাটতি পুরোপুরি দূর করতে যথেষ্ট নয়। কারণ আয়রন সাপ্লিমেন্ট বা ট্যাবলেট অনেক দ্রুত এবং কার্যকরভাবে আয়রনের ঘাটতি পূরণ করতে পারে। তবে যারা নিয়মিত সাপ্লিমেন্ট নিতে চান না বা নিতে পারেন না, তাদের জন্য নিয়মিত লাল মাংস খাওয়া একটি সহায়ক উপায় হতে পারে। বিশেষ করে সন্তান ধারণক্ষম নারীদের জন্য এটি উপকারী।

স্বাস্থ্যকর ডায়েটের অংশ হিসেবে লাল মাংস

লাল মাংস ছাড়াও ডিম, মাছ, পালং শাক, ডাল, ছোলা ইত্যাদি খাবার থেকেও আয়রন পাওয়া যায়। তবে লাল মাংসে থাকা হিম-আয়রন শরীর সবচেয়ে সহজে শোষণ করতে পারে, যা উদ্ভিজ্জ উৎসের তুলনায় বেশি কার্যকর। তাই স্বাস্থ্যকর ডায়েটের অংশ হিসেবে পরিমিত পরিমাণে লাল মাংস রাখা যেতে পারে।

নতুন গবেষণাটি দেখিয়েছে, নিয়মিত ও দীর্ঘমেয়াদে লাল মাংস খাওয়া আয়রন ঘাটতি পূরণে সহায়ক হতে পারে, বিশেষ করে নারীদের জন্য। তবে এটি একমাত্র সমাধান নয়—প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে আয়রন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত। স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রেখে আয়রন ঘাটতি প্রতিরোধ করা সম্ভব।

মশা ঠেকাতে দ্বিগুণ কীটনাশক ছিটাবে- ডিএনসিসি

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) মশকনিধনে দ্বিগুণ পরিমাণ কীটনাশক ছিটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গতকাল সকালে ডিএনসিসির এক জরুরি সভায় এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সভায় এডিস মশার বিস্তার রোধ, কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং করোনা প্রতিরোধ বিষয়ক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভাটি অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা ওয়াসার সম্মেলন কক্ষে।

ডিএনসিসির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ফগার মেশিনে প্রতি ফগারে ৩০ লিটারের পরিবর্তে ৬০ লিটার কীটনাশক ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই নতুন পদ্ধতি আগামী শনিবার থেকে কার্যকর করা হবে। এর মাধ্যমে মশার বিস্তার রোধে দ্রুত ও কার্যকর ফলাফল আশা করা হচ্ছে। ডিএসসিসি মশকনিধনে আরও কার্যকর ও ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।

ডিএসসিসি মশকনিধন কার্যক্রমে মনিটরিং ও তদারকির জন্য অঞ্চলভিত্তিক ডেঙ্গু মনিটরিং টিম গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই টিমের কাজ হবে মশকনিধন কর্মীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, কীটনাশকের সঠিক পরিমাণ যাচাই করা এবং অভিযান পরিচালনা করা। এছাড়া পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করাও টিমের অন্যতম দায়িত্ব। এই টিমের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাকে আহ্বায়ক এবং সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে সদস্য সচিব করা হয়েছে।

সভায় ডেঙ্গু ও করোনা প্রতিরোধ বিষয়ে ডিএনসিসির সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ফারিয়া ফয়েজকে ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। তিনি এই দুই রোগের বিরুদ্ধে করপোরেশনের কার্যক্রম সমন্বয় করবেন। করোনা মহামারির প্রেক্ষিতে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সচেতনতা বৃদ্ধি ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, চলতি মাসের মধ্যে কীটতত্ত্ববিদদের সমন্বয়ে নগর ভবনে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক একটি সেমিনার আয়োজন করা হবে। এই সেমিনারে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের আধুনিক পদ্ধতি, কীটনাশক ব্যবহারের সঠিক নিয়ম এবং সচেতনতা বৃদ্ধির উপায় নিয়ে আলোচনা হবে। এছাড়া ডিএসসিসির ওয়েবসাইটে প্রতিদিনের ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করা হবে, যা জনসাধারণের জন্য সহায়ক হবে।

ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমান, করপোরেশন সচিব মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম, প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মো. মাহাবুবুর রহমান তালুকদার এবং প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা নিশাত পারভীন এই জরুরি সভায় উপস্থিত ছিলেন। তারা মশকনিধন ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের গুরুত্ব তুলে ধরে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মশকনিধনে দ্বিগুণ কীটনাশক ব্যবহারের মাধ্যমে ডেঙ্গু ও মশাবাহিত রোগের বিস্তার রোধে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অঞ্চলভিত্তিক মনিটরিং টিম গঠন, সেমিনার আয়োজন এবং তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে করপোরেশন জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখার অঙ্গীকার করেছে। আশা করা যায়, এই উদ্যোগগুলো ডেঙ্গু ও করোনা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এবং ঢাকাবাসীর জন্য স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করবে।

AI এবং সিনেমা মেকিং এর ভবিষ্যত

আজকের প্রযুক্তির যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI সিনেমা নির্মাণের জগতে বিপ্লব ঘটাচ্ছে। ভাবুন, একসময় যেখানে সিনেমার প্রতিটি দৃশ্যের জন্য মানুষের প্রচুর শ্রম ও সময় লাগে, এখন AI সেই পুরো প্রক্রিয়াকে সহজ, দ্রুত ও সৃজনশীল করে তুলছে। এই পরিবর্তনের মাঝে কিছু বাস্তব উদাহরণ আমাদের ভবিষ্যতের সিনেমা নির্মাণের চিত্র স্পষ্ট করে।

নিউ ইয়র্কে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এআই ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ২০২৪-এ প্রায় ৬,০০০টি AI-চালিত শর্ট ফিল্ম জমা পড়ে, যা AI-র প্রতি নির্মাতাদের আগ্রহ ও সৃজনশীলতার প্রমাণ। এই উৎসবে শীর্ষ পুরস্কার জিতে নেয় “Total Pixel Space” নামে একটি ছবি, এখানে গণিতের ধারণা ব্যবহার করে ডিজিটাল ছবি মহাবিশ্বের অনুসন্ধান করে। এটি দেখায় কিভাবে AI শুধু গল্প বলার মাধ্যম নয়, বরং ভিজ্যুয়াল আর্টের নতুন মাত্রা সৃষ্টি করছে। এছাড়া “Jailbird” নামের একটি ছবি রঙিন ও অনুভূতিপূর্ণ কাকের দৃষ্টিকোণ থেকে হাস্যরসাত্মক গল্প বলেছে, যা AI-র মাধ্যমে কল্পনাকে জীবন্ত করে তোলার শক্তি প্রদর্শন করে। এই ধরনের উদাহরণগুলো প্রথাগত সিনেমাটোগ্রাফি ও আধুনিক প্রযুক্তির এক অনন্য সংমিশ্রণ তুলে ধরে।

AI কেবল গল্প বলাতেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি কল্পনা থেকে ছবি তৈরি করতেও সক্ষম। যেমন, OpenAI-এর DALL-E, Midjourney এবং Stable Diffusion-এর মত AI মডেলগুলো লেখকদের ও শিল্পীদের তাদের কল্পনাকে বাস্তব রূপ দিতে সাহায্য করছে।

ধরুন, আপনি একটি টেক্সট প্রম্পট দিলে, AI কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সেই বর্ণনা অনুযায়ী ছবি তৈরি করে দেবে। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘ঘিবলি স্টাইল’ AI-জেনারেটেড ছবি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে, যা জাপানি অ্যানিমেটর হায়াও মিয়াজাকিরের কাজের অনুপ্রেরণায় তৈরি।এই উদাহরণ দেখায় কিভাবে AI সিনেমার ভিজ্যুয়াল আর্টে নতুন ধারার সৃষ্টি করছে এবং শিল্পীদের সৃজনশীলতাকে প্রসারিত করছে।

ভিডিও এডিটিং ও ভিজ্যুয়াল ইফেক্টসেও AI-এর ব্যবহার নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। AI অটোমেশন প্রযুক্তি দ্রুত রঙ সংশোধন, কাটিং, এবং CGI তৈরিতে সাহায্য করছে, যা সিনেমার গুণগত মান বৃদ্ধি করছে এবং নির্মাণের সময় কমাচ্ছে। এই প্রযুক্তির সাহায্যে নির্মাতারা কম খরচে আরও জটিল ও মোহনীয় দৃশ্য তৈরি করতে পারছেন।

তবে AI প্রযুক্তির এই উন্নয়নের সঙ্গে কিছু চ্যালেঞ্জও জড়িত। যেমন, AI যতোই উন্নত হোক না কেন, মানুষের সৃজনশীলতা ও আবেগের গভীরতা পুরোপুরি অনুকরণ করতে পারে না। এছাড়া AI-চালিত সিনেমার কপিরাইট, নৈতিকতা এবং শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে জটিল প্রশ্ন উঠছে, যা শিল্পের ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সৃষ্টি করেছে।

এই বিষয়গুলো সমাধানের জন্য ন্যায্য নীতিমালা ও আইনি কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। AI এবং সিনেমা মেকিং-এর এই যুগান্তকারী মিশ্রণ আমাদের সামনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। AI-এর সাহায্যে নির্মাতারা গল্প বলার নতুন পদ্ধতি, ভিজ্যুয়াল আর্টের নতুন মাত্রা এবং দ্রুত ও দক্ষ প্রোডাকশন পদ্ধতি অর্জন করছেন। তবে এই প্রযুক্তিকে মানব সৃজনশীলতার সহায়ক হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করে নৈতিক ও আইনি দিকগুলো বিবেচনা করাই হবে ভবিষ্যতের সফল সিনেমা নির্মাণের চাবিকাঠি।

উল্লেখযোগ্য উদাহরণ:
“Total Pixel Space” (AI ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ২০২৪ এর শীর্ষ পুরস্কার বিজয়ী)
“Jailbird” (একটি হাস্যরসাত্মক ও অনুভূতিপূর্ণ AI-চালিত শর্ট ফিল্ম)
AI মডেল DALL-E, Midjourney, Stable Diffusion দ্বারা তৈরি ভিজ্যুয়াল আর্ট
সোশ্যাল মিডিয়ায় জনপ্রিয় ‘ঘিবলি স্টাইল’ AI-জেনারেটেড ছবি

এই উদাহরণগুলো প্রমাণ করে, AI কেবল প্রযুক্তি নয়, এটি সিনেমার সৃজনশীলতার নতুন সহচর, যা আমাদের চলচ্চিত্র নির্মাণের ভবিষ্যতকে উজ্জ্বল করছে।

বাংলাদেশে আবারও বাড়ছে করোনার সংক্রমণ

২০১৯ সালের শেষদিকে চীনে উদ্ভব হওয়া করোনাভাইরাস ২০২০ সালে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় ২০২০ সালের ৮ মার্চ। এরপর দেশে একাধিক দফায় সংক্রমণ ছড়ায়, মৃত্যু হয় হাজারো মানুষের। ২০২৪ সালে দেশে কেউ করোনায় মারা না গেলেও ২০২৫ সালের জুন মাসের শুরুতেই নতুন করে সংক্রমণ বাড়ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে দেশে ২৩ জন আক্রান্ত ছিল, মে মাসে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৬ জনে, আর জুনের প্রথম আট দিনে নতুন করে ৩৬ জন আক্রান্ত হন। ৫ জুন একজন মৃত্যুবরণও করেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে আগের সপ্তাহের তুলনায় সংক্রমণ হার ২ শতাংশের বেশি বেড়েছে, যদিও সংখ্যাটি এখনও তুলনামূলক কম। বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনার পুনরুত্থানের পেছনে মূল কারণ হলো ভাইরাসের নতুন সাব-ভ্যারিয়েন্ট ‘XFJ’ ও ‘XFC’, যা ওমিক্রন JN.১-এর উপশাখা। এগুলোর সংক্রমণ ক্ষমতা বেশি এবং বেশিরভাগ নমুনায় XFJ ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া পার্শ্ববর্তী ভারতেও ‘NB.1.8.1’ নামে নতুন ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হয়েছে, যা বাংলাদেশেও ছড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, জনসমাগম এড়িয়ে চলা এবং নিয়মিত হাত ধোয়ার মতো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষ করে বয়স্ক, গর্ভবতী নারী, কিডনি বা ক্যান্সার রোগী ও দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের অতিরিক্ত সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে দেশে টিকা মজুদের সংখ্যা প্রায় ৩১ লাখ হলেও, এর মধ্যে ১৭ লাখ টিকার মেয়াদ আগস্টের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। অথচ করোনার টিকা দেওয়ার কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে এবং সরকারি সিদ্ধান্তও এখনও ঝুলে আছে। এ অবস্থায় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি করোনা পরীক্ষার কিট সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন হাসপাতাল ইতোমধ্যে কিট সংকটে রয়েছে বলে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। ২০২০ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত দেশে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ২০ লাখ ৫১ হাজার ৭৩৯ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ২৯ হাজার ৫০০ জনের। সুতরাং, আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এখনই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে পরবর্তীতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগসমূহের উচিত অবিলম্বে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া। মাস্ক পরিধান বাধ্যতামূলক করা, স্ক্রিনিং কার্যক্রম জোরদার, হাসপাতালে প্রস্তুতি ও টিকাদান কর্মসূচি পুনরায় চালু করাই হতে পারে ভাইরাস মোকাবেলার কার্যকর পথ। করোনাকে হালকাভাবে নিলে তা আবার ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, তাই এখনই প্রয়োজন সক্রিয় ও দায়িত্বশীল উদ্যোগ।

জলবায়ু সম্মেলনের আগে ব্রাজিলের বিতর্কিত তেল ও মহাসড়ক প্রকল্প

ব্রাজিল সরকার সম্প্রতি অ্যামাজন অঞ্চলে একাধিক বিতর্কিত তেল অনুসন্ধান ও অবকাঠামো প্রকল্পে দ্রুত অনুমোদন দিয়েছে, যা পরিবেশবাদী মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এই সিদ্ধান্তগুলো এসেছে এমন এক সময়ে, যখন ব্রাজিল নিজেই ২০২৫ সালের শেষদিকে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন (COP-30) আয়োজন করতে যাচ্ছে এবং সেই সম্মেলনের মূল প্রতীকী কেন্দ্রবিন্দুই হচ্ছে অ্যামাজন।

অ্যামাজন পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্য অঞ্চল এবং একটি প্রধান “কার্বন সিঙ্ক”, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রশমনে মুখ্য ভূমিকা রাখে। কিন্তু ব্রাজিল সরকারের নতুন নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গি এই সংবেদনশীল অঞ্চলে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান এবং মহাসড়ক সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সরকারি সূত্র অনুযায়ী, উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্বার্থে এই প্রকল্পগুলো অপরিহার্য। বিশেষত উত্তর ব্রাজিলের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোর জন্য। তবে এই উন্নয়নের মূল্য যে পরিবেশকে চূড়ান্তভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।

নতুন অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো অ্যামাজনের উত্তরাঞ্চলে তেল অনুসন্ধানের জন্য পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রদান এবং BR-319 মহাসড়ক সংস্কার প্রকল্প। বিশেষজ্ঞদের মতে এই মহাসড়কটি পুনর্গঠন করা হলে, অ্যামাজনের গভীরতর অঞ্চলে প্রবেশ সহজ হবে এবং এতে অবৈধ বন উজাড়, আদিবাসীদের ভূমিতে অনুপ্রবেশ এবং জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের সম্ভাবনা বহুগুণে বেড়ে যাবে।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিবেশবিদেরা এই পদক্ষেপকে জলবায়ু সংকটের মুখে বিপজ্জনক বার্তা হিসেবে দেখছেন। তাদের ভাষায় যখন বিশ্ব নেতারা অ্যামাজনের সংরক্ষণ নিয়ে আলোচনায় বসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন আয়োজক দেশ নিজেই যদি তা ধ্বংসের পথে এগোয়, তা হলে বিশ্ববাসীর আস্থা কীভাবে স্থাপন করা সম্ভব?

বিশেষ করে ব্রাজিলের বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে ছিল অ্যামাজনের রক্ষা। তাঁর প্রশাসনের এ ধরনের সিদ্ধান্ত তাই রাজনৈতিকভাবে দ্বৈতনীতির উদাহরণ হিসেবেও আলোচিত হচ্ছে।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে একটি ‘সুষম সমঝোতা’ খুঁজে পাওয়াই তাদের লক্ষ্য। তারা আশ্বস্ত করছে যেকোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে যথাযথ পরিবেশগত মূল্যায়ন ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পরামর্শ গ্রহণ করা হবে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, অতীতে এমন অনেক প্রকল্পে পরিবেশগত মূল্যায়ন প্রক্রিয়া প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে এসেছে, এবং আদিবাসীদের কণ্ঠ বারবার উপেক্ষিত হয়েছে। তাই এই আশ্বাস অনেকের কাছেই বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না।

সার্বিকভাবে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনের আগেই এই প্রকল্পগুলো অনুমোদন ব্রাজিলের নৈতিক অবস্থান ও জলবায়ু নেতৃত্বের প্রশ্নে গভীর সন্দেহ তৈরি করছে। এই অবস্থায় বিশ্ববাসী এখন তাকিয়ে আছে অ্যামাজন কি উন্নয়নের নামে ধ্বংস হবে, না কি এটি হবে টেকসই নীতির নতুন প্রতীক?