নভেম্বর, ২০২৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার এনসিনিটাস উপকূলে ভেসে উঠল এক অদ্ভুত মাছ। নয় ফুট দৈর্ঘ্যের এই রুপালি দানবটি দেখে প্রথমে স্থানীয়রা ভেবেছিলেন, এটি কোনো মৃত ডলফিন কিংবা অজানা সামুদ্রিক সাপ। কিন্তু পরে জানা গেল, এটি বিশ্বের দীর্ঘতম হাড়যুক্ত মাছ ওয়ারফিশ। স্থানীয়ভাবে একে ডাকা হয় ‘ডুমসডে ফিশ’, অর্থাৎ প্রলয়ের দূত। আর তার এই উপস্থিতি ঘিরেই ঘনীভূত হচ্ছে রহস্য, আতঙ্ক এবং বহু পুরনো কুসংস্কারের ছায়া।
ওয়ারফিশ সাধারণত গভীর সমুদ্রের অন্ধকার জগতে বাস করে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩,০০০ ফুট নিচে এদের উপস্থিতি। এরা দেখতে ফিতার মতো লম্বা, রুপালি বর্ণের, আর মাথার ওপর লাল কাঁটার মতো স্পাইন থাকে, যা একে করে তোলে আরো রহস্যময়। ৩০ ফুট দৈর্ঘ্য একে বিশ্বের দীর্ঘতম অস্থিযুক্ত মাছের মর্যাদা দিয়েছে।
জাপানি সংস্কৃতিতে ওয়ারফিশের উপস্থিতিকে ধরা হয় ভূমিকম্প বা সুনামির পূর্বাভাস হিসেবে। এদের বলা হয় “রিউগু নোৎসুকাই” বা “ড্রাগন রাজ্যের দূত”। এমন বিশ্বাস যে, সমুদ্রের তলদেশে ভয়ংকর কিছু ঘটতে যাচ্ছে, তার পূর্বঘোষক হিসেবেই এই মাছ উঠে আসে উপকূলে।
২০১১ সালের ভয়াবহ ফুকুশিমা ভূমিকম্প ও সুনামির আগে জাপানের উপকূলে একাধিক ওয়ারফিশ ধরা পড়েছিল। এরপর থেকেই এই মাছের সাথে দুর্যোগের সম্পর্ক ঘিরে গুজব আরও গভীর হয়। শুধু জাপানেই নয়, ক্যালিফোর্নিয়াতেও এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। ওয়ারফিশ পাওয়ার পরপরই আশেপাশের এলাকায় মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ফলে স্থানীয় জনগণের মধ্যে আতঙ্কের ছায়া ঘনিয়ে আসে।
তবে বিজ্ঞানীরা এসব কুসংস্কার মানতে নারাজ। তাঁদের মতে, ওয়ারফিশ মূলত খুব সংবেদনশীল প্রাণী। সমুদ্রের তলদেশে তাপমাত্রা হঠাৎ পরিবর্তন, জেলিফিশ বা বড় শিকারির আক্রমণ, দূষণ বা স্রোতের পরিবর্তনের কারণে এরা দিকভ্রান্ত হয়ে উপরে চলে আসে।
“এটি ভূমিকম্পের পূর্বাভাস নয়, বরং সমুদ্রের পরিবেশগত সংকেত,”— বলেন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক জীববিদ ড. এলিসা মর্গান। তিনি আরও বলেন, “গভীর সমুদ্রের বাসিন্দাদের আচরণ পরিবর্তন থেকে আমরা বরং জলবায়ু ও সমুদ্রপ্রবাহের পরিবর্তন সম্পর্কে জানতে পারি।”
বিজ্ঞানীদের মতে, এখন পর্যন্ত কোনো গবেষণায় এমন প্রমাণ মেলেনি যে ওয়ারফিশ পূর্বাভাস দিতে পারে। বরং তাদের উপস্থিতি আমাদের জানান দেয়, গভীর সমুদ্রে হয়তো কিছু অজানা পরিবেশগত অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
২০২৪ সালের এই সর্বশেষ ওয়ারফিশ ছিল গত তিন মাসে ক্যালিফোর্নিয়ায় ধরা পড়া তৃতীয় এবং শতাব্দীর মধ্যে ২২তম উদাহরণ। গবেষকরা মাছটির নমুনা সংগ্রহ করেছেন এবং মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণ করছেন। এটি অসুস্থ ছিল, না কি পরিবেশের কারণে উপরে উঠে এসেছে, তা নির্ধারণ করাই এখন গবেষণার মূল লক্ষ্য।


