বিশ্বজুড়ে আয়রন ঘাটতি একটি বড় স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ২৫ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে আয়রন ঘাটতির শিকার। বিশেষ করে নারীরা এই সমস্যায় বেশি ভোগেন। আয়রন ঘাটতির কারণে ক্লান্তি, দুর্বলতা, মনোযোগের অভাব এবং দৈহিক সক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো নানা সমস্যা দেখা দেয়। সম্প্রতি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের Nutrition Reviews-এ প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণা পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, নিয়মিত লাল মাংস খাওয়া আয়রন ঘাটতি পূরণে কিছুটা হলেও সাহায্য করতে পারে।
গবেষণার পেছনের গল্প
ডাবলিন সিটি ইউনিভার্সিটির গবেষক দল, যার নেতৃত্বে ছিলেন পিএইচডি গবেষক লরা ম্যাকম্যানাস, ভিনিসিয়াস ফারিয়া এবং ড. ক্যাথারিন ভেরাস, ড. মিকা মানিনেন ও ড. ব্রেন্ডান ইগান—তারা ১০টি ইন্টারভেনশন স্টাডির তথ্য বিশ্লেষণ করেন। এসব গবেষণায় মোট ৩৯৭ জন অংশগ্রহণকারী ছিলেন, যাদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন আয়রন ঘাটতিগ্রস্ত প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও পুরুষ। গবেষণাগুলোতে অংশগ্রহণকারীদের সপ্তাহে ২৫৫ গ্রাম থেকে ১.৮ কেজি পর্যন্ত লাল মাংস খাওয়ানো হয় এবং এই ইন্টারভেনশন ৮ থেকে ৫২ সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হয়।
কী পাওয়া গেল গবেষণায়?
গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, নিয়মিত লাল মাংস খেলে রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কিছুটা বেড়ে যায়। হিমোগ্লোবিন হচ্ছে রক্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন পরিবহন করে। আয়রন ঘাটতির কারণে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কমে গেলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, নারীরা এই ইন্টারভেনশন থেকে পুরুষদের তুলনায় বেশি উপকৃত হন। এর কারণ হিসেবে গবেষকরা মনে করেন, নারীদের আয়রনের চাহিদা বেশি এবং তাদের শরীর আয়রন তুলনামূলক বেশি শোষণ করতে পারে।
তবে শুধু হিমোগ্লোবিন নয়, গবেষকরা ফেরিটিন নামক আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকও বিশ্লেষণ করেন। ফেরিটিন হচ্ছে শরীরে আয়রনের মজুদ বোঝাতে ব্যবহৃত একটি প্রোটিন। গবেষণায় দেখা গেছে, ৮ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে লাল মাংস খাওয়ালে ফেরিটিনের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। আর ১৬ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে খেলে ফেরিটিনের মাত্রা প্রায় তিনগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।
গবেষকরা অবশ্য সতর্ক করে বলেছেন, শুধু লাল মাংস খাওয়া আয়রন ঘাটতি পুরোপুরি দূর করতে যথেষ্ট নয়। কারণ আয়রন সাপ্লিমেন্ট বা ট্যাবলেট অনেক দ্রুত এবং কার্যকরভাবে আয়রনের ঘাটতি পূরণ করতে পারে। তবে যারা নিয়মিত সাপ্লিমেন্ট নিতে চান না বা নিতে পারেন না, তাদের জন্য নিয়মিত লাল মাংস খাওয়া একটি সহায়ক উপায় হতে পারে। বিশেষ করে সন্তান ধারণক্ষম নারীদের জন্য এটি উপকারী।
স্বাস্থ্যকর ডায়েটের অংশ হিসেবে লাল মাংস
লাল মাংস ছাড়াও ডিম, মাছ, পালং শাক, ডাল, ছোলা ইত্যাদি খাবার থেকেও আয়রন পাওয়া যায়। তবে লাল মাংসে থাকা হিম-আয়রন শরীর সবচেয়ে সহজে শোষণ করতে পারে, যা উদ্ভিজ্জ উৎসের তুলনায় বেশি কার্যকর। তাই স্বাস্থ্যকর ডায়েটের অংশ হিসেবে পরিমিত পরিমাণে লাল মাংস রাখা যেতে পারে।
নতুন গবেষণাটি দেখিয়েছে, নিয়মিত ও দীর্ঘমেয়াদে লাল মাংস খাওয়া আয়রন ঘাটতি পূরণে সহায়ক হতে পারে, বিশেষ করে নারীদের জন্য। তবে এটি একমাত্র সমাধান নয়—প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে আয়রন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত। স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রেখে আয়রন ঘাটতি প্রতিরোধ করা সম্ভব।


