শহরের দেয়াল, সিঁড়ি, ট্রেনের বগি কিংবা সেতুর পিলারে দেখা রংধনুর নানা রঙে আঁকা বা লেখাগুলোকে আমরা গ্রাফিতি হিসেবে চিনি। এটি শুধু রং ও ছবি নয়, বরং মানুষের চুপচাপ প্রতিবাদের ভাষা, সামাজিক বার্তা ও সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। আজকের দিনে গ্রাফিতি বিশ্বব্যাপী একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এর ইতিহাস শুরু হয় অনেক পুরোনো যুগ থেকে।
গ্রাফিতির সূচনা প্রাচীনকাল থেকে। রোমান সাম্রাজ্যের Pompeii শহরের দেয়ালে পাওয়া বিভিন্ন লেখা ছিল সাধারণ মানুষের অপ্রকাশিত অনুভূতি ও দৈনন্দিন জীবনধারার একটি প্রতিফলন। ঐ লেখাগুলো ছিল প্রেমের কবিতা, রাজনৈতিক সমালোচনা এবং সামাজিক ব্যঙ্গের মতো। এগুলো ছিল এক ধরনের জনগণের কণ্ঠস্বর যা রাজা-রাজাদের চোখের বাইরে থেকে সমাজের নানা দিক ফুটিয়ে তুলত।
তবে গ্রাফিতি শুধু রোমেই সীমাবদ্ধ ছিল না, মিশরীয় পিরামিড ও গ্রীক মন্দিরের দেয়ালে পাওয়া যেত নানা লেখা ও চিত্র, যেগুলো ছিল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান অথবা সামাজিক নিয়মের প্রতীক। এসব লেখালিপি মূলত পাথরের উপর ছিল, আর তা ছিল স্থায়ী এবং বিশাল শিল্পকর্মের অংশ।
আধুনিক অর্থে গ্রাফিতির ধারণা এসেছে ১৯৬০-৭০-এর দশকে আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরের ব্রঙ্কস ও হারলেম অঞ্চলে। এখানে তরুণরা ট্রেনের বগিতে বা দেয়ালে নিজেদের নাম, ট্যাগ (tag) লিখত যাকে ‘ট্যাগিং’ বলা হয়। এটি ছিল একটি পরিচয় প্রকাশের মাধ্যম, একরকম শহুরে প্রতিপত্তি অর্জনের প্রচেষ্টা। এই ট্যাগিং-এর পথিকৃতরা ছিলেন Taki 183 ও Phase 2-এর মতো শিল্পী যারা শহরের দেওয়ালে নিজের সিগনেচার রেখেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।
এই সময়ই হিপ-হপ কালচার গড়ে উঠতে শুরু করে, যেখানে গ্রাফিতি ছিল চারটি মূল উপাদানের মধ্যে অন্যতম। গ্রাফিতি তখন হয়ে ওঠে শহুরে তরুণদের নিজেদের বাস্তবতা, আশা, হতাশা ও স্বপ্ন প্রকাশের একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
গ্রাফিতি শুধু ব্যক্তিগত সত্ত্বার প্রকাশ নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিবাদের হাতিয়ার। ইতিহাস সাক্ষী যে, অনেক সময় যুদ্ধ, নিপীড়ন ও অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা গ্রাফিতির মধ্য দিয়ে উচ্চারিত হয়েছে।
বার্লিন ওয়ালের পূর্ব পাশে ‘East Side Gallery’ তৈরি হয়েছিল গ্রাফিতির মাধ্যমে, যা ছিল কমিউনিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে মুক্তির প্রতীক। আরব বসন্তের সময় কায়রোর দেয়ালে জনসাধারণের বিক্ষোভের প্রকাশ হিসেবে রাজনৈতিক স্লোগান ও প্রতিবাদের ছবি তৈরি হয়েছিল।
বাংলাদেশেও গ্রাফিতি রাজনৈতিক আন্দোলনের একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়াল, শাহবাগসহ বিভিন্ন স্থানে ছাত্রছাত্রী এবং সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক বার্তা ও সমাজ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ফুটে উঠেছে গ্রাফিতির মাধ্যমে।
Banksy-এর মতো গোপনীয়তা ও বুদ্ধিদীপ্ত রাজনৈতিক বার্তা বহনকারী শিল্পীদের কারণে আধুনিক গ্রাফিতি আজ অনেক বড় শিল্প আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। ব্যাংকসির কাজ শুধু রাস্তার দেয়াল নয়, মিউজিয়াম ও গ্যালারিতেও প্রদর্শিত হয়, যা গ্রাফিতিকে বাণিজ্যিক শিল্পেরও মর্যাদা দিয়েছে।
কিন্তু এর ফলে প্রশ্ন উঠে, গ্রাফিতি কি এখনো সেই বিদ্রোহী এবং স্বাধীনতা মেলে ধরে? নাকি এটি বাজারের একটি পণ্য হয়ে গেছে?অনেকেই মনে করেন গ্রাফিতি যখন পুঁজি ও বাজারের শিকার হয়, তখন তার সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তি কমে যায়।
বাংলাদেশে স্ট্রিট আর্ট ও গ্রাফিতি সম্প্রতি বেশ জনপ্রিয় হয়েছে শহুরে তরুণ সমাজের মধ্যে। বিভিন্ন সমাজসেবা ও মানবাধিকার কর্মী গ্রাফিতিকে ব্যবহার করছেন নারী নির্যাতন, পরিবেশ সচেতনতা, ও রাজনৈতিক অবিচারের বিরুদ্ধে বার্তা জানানোর জন্য।
এই ধরনের গ্রাফিতি অনেক সময় সরাসরি মঞ্চ বা বক্তৃতার চাইতে বেশি শক্তিশালী প্রভাব ফেলে। কারণ এটি সবার চোখের সামনে, শহরের প্রাণকেন্দ্রে থেকে সরাসরি মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে।
গ্রাফিতি এককথায় বলতে গেলে সামাজিক ইতিহাস। এটি সময়ের সাথে পাল্টে যায়, তবুও মানুষের কণ্ঠস্বরের বহুমাত্রিক প্রকাশ থাকে।সেন্সরশিপের যুগে যেখানে স্বাধীন মতপ্রকাশ চ্যালেঞ্জের মুখে, সেখানে গ্রাফিতি হয়তো আরও প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে।


