১৬৪৫ খ্রিষ্টাব্দ, বঙ্গোপসাগরের উপকূলজুড়ে তখনো অশান্তি। মগ জলদস্যুরা নদীপথে, পর্তুগিজ নাবিকেরা বন্দরের দখল নিয়ে ব্যস্ত।ঠিক সে সময়, কক্সবাজার থেকে সামান্য দক্ষিণে আরাকানের রাজধানী ম্রাউক উ-তে বসে আছেন এক বৌদ্ধ রাজা রাজা থিরি তুদামা।সামনে তার বাংলা ভাষায় লেখা এক কাব্যের পাণ্ডুলিপি। লিখেছেন তাঁরই দরবারের কবি আলাওল। সে কাব্যের নাম পদ্মাবতী। এটাই সেই অধ্যায় যেটা আমরা হয়তো প্রায় ভুলেই গেছি, যেখানে বাংলা ভাষা ছিল রাজ্যর রাষ্ট্রভাষা, আর রাজা ছিলেন বাংলার কবিতার পৃষ্ঠপোষক।
আরাকান রাজ্য, যেটিকে এখন আমরা রাখাইন বলি, সেটি ছিল এক স্বাধীন ও শক্তিশালী উপকূলীয় রাজ্য। চন্দ্রবংশীয় রাজারা ত্রয়োদশ শতক থেকেই এই অঞ্চলে শাসন করতেন, তবে ষোড়শ শতকে এসে রাজনৈতিকভাবে এরা বাংলার আফগান ও মুসলিম শাসকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়। ১৪৩০ সালে বঙ্গদেশের সুলতান জালালউদ্দিন শাহ আরাকানের রাজা নরমেইককে পুনঃসিংহাসনে বসান এবং সে সম্পর্ক গভীর হতে হতে বাংলা ভাষার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে ম্রাউক উ-এর প্রাসাদেও।
১৫৩১ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত সময়কে বলা হয় আরাকান রাজ্যের “বাংলা যুগ”, এই সময়েই বাংলা ভাষা দরবারের মুখ্য ভাষায় পরিণত হয়। বাংলার দরবারচর্চা, কাব্য ও সংস্কৃতির অভিজ্ঞান ছড়িয়ে পড়ে রাজদরবার থেকে গ্রামীন কল্পলোকেও।
বাংলা ভাষাকে শুধুমাত্র দরবারে ব্যবহার করার পেছনে সাংস্কৃতিক বা নান্দনিক কারণই ছিল না, এটি ছিল এক কৌশলগত সিদ্ধান্তও।আরাকান রাজারা বুঝেছিলেন, পূর্ববঙ্গ তথা চট্টগ্রাম, সিলেট ও দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সংযোগ স্থাপন করতে হলে বাংলাকেই গ্রহণ করতে হবে।
১৫৭৫ সালে রাজা মিন ফালু যখন সুলতান আকবরের নামে মুদ্রা জারি করেন, তাতে ফারসি ও বাংলা দু’ভাষার সংমিশ্রণ ছিল। বাংলার প্রশাসনিক ভাষা তখন যেমন ফারসি ছিল, তেমনি আরাকানে বাংলা হয়ে উঠছিল দরবারি ভাষা। বাংলাভাষী মুসলমানদের বড় অংশ আরাকানে প্রশাসনিক কাজে নিযুক্ত ছিল, ফলে বাংলায় রাজনীতি, নীতিকথা, ধর্মীয় আখ্যান এবং প্রেম-ভাষ্য সবকিছুই সেই সময়কার সাংস্কৃতিক ছক হয়ে দাঁড়ায়।
আলাওলের জীবন কেবল কবিতা নয়, এটি এক অনন্য সাংস্কৃতিক পরিভ্রমণ। তিনি ছিলেন এক সৈনিক, পরে দাস, শেষে কবি। আরাকানের এক সেনাপতির শত্রুর হাতে বন্দি হয়ে পড়েন তিনি, কিন্তু তার সাহিত্য প্রতিভা তখনকার সেনাপতি মাগন ঠাকুরের নজরে পড়ে। তার পৃষ্ঠপোষকতায় আলাওল রচনা করেন তোহফা, সয়ফুল মুলুক, এবং অনুবাদ করেন মালিক মুহাম্মদের পদ্মাবতী।
এই অনুবাদ ছিল সরল নয় তাতে যোগ হয়েছিল বাংলার নিজস্ব সুর, মর্ম, সূফি ভাব, নারীর সম্মান ও অন্তর্জাগতিক প্রেমের প্রকাশ।রাজা থিরি তুদামা নিজে ছিলেন এই কাব্যচর্চার পৃষ্ঠপোষক। এই সহাবস্থান দেখায়, বাংলা ভাষা কেবল শাসনের ভাষা ছিল না, এটি হয়ে উঠেছিল রাজাদের আধ্যাত্মিক আশ্রয়ও।
আলাওলের পূর্বসূরি দৌলত কাজী আরাকান দরবারেই রচনা করেন সতীময়না ও লোরচন্দ্রানী—যেখানে নারীর সতীচরিত্রের কাহিনি এক ধ্রুপদী কাঠামোয় উঠে আসে। তার ভাষা সরল, কিন্তু তাতে রোমান্স ও মূল্যবোধের সমন্বয় রয়েছে। অন্যদিকে মাগন ঠাকুর নিজে একজন বৌদ্ধ হলেও ছিলেন আলাওলের মেন্টর ও বাংলা কবিতার উপাসক। তার পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলার সুফি-রোমান্টিক কাব্যধারা পল্লবিত হয়।বৌদ্ধ, মুসলিম ও হিন্দু মিলে এই ত্রিমুখী উপস্থিতি বাংলা ভাষার ঐক্যসাধনের অনন্য প্রমাণ।
একটি বৌদ্ধ রাজ্যে এক মুসলিম কবি ফারসি মহাকাব্য বাংলায় অনুবাদ করছেন এবং সে অনুবাদের তত্ত্বে রয়েছে হিন্দু-ইসলাম-বৌদ্ধ চিন্তার মিলন এটাই ছিল আরাকানের দরবার। এই সহাবস্থান এক নতুন “বঙ্গ” তৈরি করেছিল, যা শুধুই ভৌগোলিক ছিল না, বরং ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল। এ কারণেই কেউ কেউ বলেন বাংলা ভাষার প্রকৃত আত্মা শুধু পশ্চিম বাংলার তত্ত্বে নয়, উপকূলীয় ও পাহাড়ি জনপদেও লুকিয়ে আছে।
বাংলা ভাষার গৌরব কেবল ১৯৫২ সালের শহীদ মিনারে নয়, তার রয়েছে প্রাচীন দরবার, সিংহাসন, প্রেমকাব্য এবং সুফিবাদের গভীর ইতিহাস। আরাকানের রাজদরবার তারই এক জলজ ছায়া, যেখানে বাঙালিত্ব কেবল মাটিতে নয়, ছিল পাহাড়ের ওপারেও, সিংহাসনের উচ্চারণেও।


