Home Blog Page 58

Suicidal Aesthetic – কেন কিছু ডিজাইন আত্মহত্যার মতো অনুভূতি জাগায়?

ধরুন একটা বিশাল, কংক্রিটে মোড়ানো ফাঁকা শহুরে ব্লকের ভেতর দিয়ে আপনি একা হাঁটছেন। চারপাশে অদ্ভুত নীরবতা, দেয়ালগুলো ধূসর, জানালাগুলো নেই, মানুষের মুখ নেই শুধু এক ঘোর লাগা স্থবিরতা। এই অভিজ্ঞতাকে মনোবিজ্ঞানীরা বলেন visceral bleakness, আর স্থাপত্যবিদরা একে বলেন The Suicidal Aesthetic, অর্থাৎ এমন ডিজাইনের নকশা যা মানুষের বেঁচে থাকার ইচ্ছাকে হ্রাস করতে পারে।

Brutalism শব্দটি এসেছে ফরাসি “béton brut” থেকে, যার অর্থ “raw concrete”। ১৯৫০-৭০ দশকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ইউরোপে এবং আমেরিকায় এই ধারার স্থাপত্য জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সরল, কংক্রিটভিত্তিক, জানালাবিহীন, ভারী এবং একরকম নির্দয় এসব ভবনের নকশা মূলত গঠনগত বাস্তবতা ও খরচ বাঁচানোর ভাবনায় তৈরি হয়েছিল।

কিন্তু এর প্রভাব পড়েছিল মানুষের অনুভবের উপরও। বহু গবেষণায় দেখা যায়, ব্রুটালিস্ট স্থাপনাগুলোতে যারা বাস বা কাজ করে, তারা প্রায়ই বিচ্ছিন্নতা, নির্জনতা, হতাশা এবং কখনো কখনো আত্মহত্যার প্রবণতা অনুভব করে। লন্ডনের Thamesmead Estate বা বোস্টনের Government Center এই ভবনগুলো মানসিকভাবে ভারী ও দমবন্ধ করা বলে অভিযোগ রয়েছে।

এমনকি মনোবিজ্ঞানী Colin Ellard বলেন, “আমাদের মস্তিষ্ক প্রাকৃতিক দৃশ্য ও উষ্ণ নকশার প্রতি টান অনুভব করে। কংক্রিটের একঘেয়ে নির্লিপ্ততা আমাদের limbic system কে নিস্তেজ করে তোলে।” ফলাফলে দেখা যায় আত্মিক নিঃসঙ্গতা।

আরেকটি আধুনিক শহুরে নকশার নিঃশব্দ ট্র্যাজেডি হলো Dead Malls, অর্থাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়া শপিং মলগুলো। ১৯৮০-৯০-এর দশকে যেসব মল ছিলো আনন্দ, বিনোদন ও পুঁজির কেন্দ্র, তা এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত। আলোহীন করিডোর, পরিত্যক্ত দোকানঘর, নষ্ট এস্কেলেটর এই সবের মধ্য দিয়ে হাঁটলে যেন এক মৃত সমাজব্যবস্থার ভাঙা কাঠামোতে ঢুকে পড়া যায়।

Dead malls-এর ভিজ্যুয়াল এস্থেটিক অনেক সময় post-apocalyptic বা পরমানবিক একাকিত্বের প্রতিনিধিত্ব করে। এসব জায়গা এমনকি ইউটিউব বা টিকটকে “liminal horror” কনটেন্টের জন্ম দিয়েছে যেখানে এইসব ফাঁকা জায়গার ভয়াবহতা উঠে আসে।

রঙ, স্থান, আলো, ও স্থাপত্যশৈলী আমাদের মানসিক অবস্থার উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। হাসপাতাল বা স্কুলের ডিজাইন উষ্ণ ও বন্ধুসুলভ হলে রোগী বা শিক্ষার্থী ভালো সাড়া দেয়। কিন্তু যদি নকশা এমন হয় যা মানবিক যোগাযোগকে প্রতিরোধ করে, নিঃসঙ্গতা বাড়িয়ে তোলে, তাহলে তা হয়ে পড়ে আত্মঘাতী। যাকে বলা হয় design-induced depression।

এ বিষয়ে অধ্যাপক Sarah Williams Goldhagen বলেন, “Architecture is not just backdrop. It’s a cognitive force.” মানুষ যখন প্রতিনিয়ত শীতল, নির্জীব, রোবোটিক পরিবেশে থাকে, তখন তার মাঝে সৃষ্টি হয় urban alienation—একা হয়ে যাওয়ার এক গভীর মানসিক অবস্থা।

কিন্তু, কেন এমন নকশা তৈরি হয়?
এই প্রশ্নটা গুরুত্বপূর্ণ। ব্রুটালিজম যেমন তৈরি হয়েছিল দ্রুত শহর গড়ে তোলার বাস্তবতা থেকে, তেমনি শপিং মল ছিল পুঁজিবাদের এক প্রতীক। দুই ক্ষেত্রেই মূল চালিকা ছিলো efficiency, not empathy। মানুষের অনুভবের জায়গা অনেকসময় অর্থনৈতিক যুক্তিতে হারিয়ে যায়। আধুনিক ডিজাইনের ক্ষেত্রে এই ‘suicidal aesthetics’ যেন এক অদৃশ্য দানব, যা মনোবিজ্ঞানের পরিবর্তে ব্যালান্স শিট দেখে কাজ করে।

এই আত্মহননের নকশা থেকে মুক্তির পথ হলো human-centric design। নকশা যেটা মানসিক স্বাচ্ছন্দ্য, পরিবেশ-সামঞ্জস্য, সামাজিক সংযোগ এবং ভিজ্যুয়াল উষ্ণতার দিকে নজর দেয়। মারিনা তাবাসসুমের কাজ বাংলাদেশে আলো, বাতাস, পানি ও স্থানীয় উপাদান ব্যবহার করে একধরনের ‘নরম আধুনিকতা’ তৈরি করছেন, যা নান্দনিকতার সাথে মানুষের অনুভূতিকে সংযুক্ত করে।

বহু মনোবিজ্ঞানী এবং নিউরো-আর্কিটেক্ট গবেষকরা আজ বলেন, ডিজাইনের মধ্য দিয়ে যে মনো-উত্তেজনা বা ক্লান্তি আসে, তা নিছক অভিজ্ঞতামূলক নয় এটি পরিমাপযোগ্য, চাক্ষুষ স্টিমুলির প্রতিক্রিয়া হিসেবেও ধরা পড়ে। দৃষ্টিকোণহীন ঘর, রঙহীন পটভূমি এবং নির্জীব প্যাটার্নগুলো ডোপামিন ক্ষরণে ব্যাঘাত ঘটায়। আনন্দ, কৌতূহল বা আত্মিক সক্রিয়তার হ্রাস ঘটে। আমাদের চোখ ও মস্তিষ্ক এমন রূপ ও আলো-ছায়ার প্রতি সাড়া দেয় যা ছন্দময়, প্রাকৃতিক এবং আন্তরিক। কিন্তু ব্রুটালিস্ট ডিজাইনের কঠোর রেখা বা dead mall–এর মতো শূন্যতায় পূর্ণ স্থান মস্তিষ্কের সেই স্বাভাবিক সাড়া দেয়ার ক্ষমতাকে দুর্বল করে। ফলে দেখা দেয় হতাশা, বিষণ্নতা এবং স্থায়ী মানসিক ক্লান্তি।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক প্রশ্নও উঠে আসে, স্থপতিদের কি মানসিক স্বাস্থ্য বিবেচনায় নেয়ার দায়িত্ব থাকা উচিত নয়? আমরা যেভাবে রাস্তার নিরাপত্তা বা খাদ্যের মান নিয়ে নীতিমালা তৈরি করি, তেমনি কেন নকশার মানসিক প্রভাব নিয়ে কোনো নীতিশৃঙ্খলা নেই? নরওয়ে, ডেনমার্ক বা জাপানে কিছু শহর এখন এই ধারণায় কাজ শুরু করেছে যেখানে design for wellbeing ধারণাকে সামনে রেখে পার্ক, বাসস্থান ও পাবলিক স্পেস পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এই ধারণা আরও প্রসারিত হওয়া উচিত, বিশেষ করে সেই শহরগুলোতে যেখানে নান্দনিকতার চেয়ে ব্যয়-সংকোচনই এখনো ডিজাইনের চালিকা শক্তি।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে ডিজাইন একসময় আধুনিকতার প্রতীক ছিল আজ তা বিষণ্নতার রূপক হয়ে উঠেছে। কিন্তু এর বিপরীতে জন্ম নিচ্ছে এক নতুন চেতনা, reclamation aesthetics। অনেক তরুণ স্থপতি এখন স্থানিক উষ্ণতা ও মানুষের গল্পকে ফিরিয়ে আনতে পুরনো পরিত্যক্ত ভবন পুনঃনির্মাণ করছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি dead mall এখন কমিউনিটি আর্ট স্পেস বা লাইব্রেরি হিসেবে রূপান্তরিত হচ্ছে। বাংলাদেশেও কিছু তরুণ স্থপতি পুরনো বাড়িকে টেকসই বসবাসযোগ্য স্থানে রূপান্তর করছেন যেখানে আধুনিকতা মানেই ধূসরতা নয়, বরং প্রাণবন্ত শৈলী।স্থাপত্য নিছক ইট-পাথরের বিষয় নয়, এটি মনস্তত্ত্বেরও ভাষা। কিছু ডিজাইন আমাদের বেঁচে থাকার ইচ্ছাকে সক্রিয় করে, আবার কিছু নকশা যেন ধীরে ধীরে আমাদের নিঃশেষ করে দেয়। দৃষ্টিশক্তিকে ক্লান্ত করে, মস্তিষ্ককে নিঃসঙ্গ করে, হৃদয়কে শূন্য করে তোলে।

মোদীর তৃতীয় মেয়াদে ভারত সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ঘৃণা-অপরাধ বাড়ছে, প্রথম বছরেই ২৫ মুসলিম নিহত

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির তৃতীয় মেয়াদের প্রথম বছরে ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক অপরাধ (হেইট ক্রাইম) ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য(হেইট স্পিচ) আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। দিল্লিভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব সিভিল রাইটসের (এপিসিআর) নতুন প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

মুসলিম, দলিত, আদিবাসী এবং খ্রিষ্টানসহ অন্য সংখ্যালঘুদের ওপর এই সহিংসতা ‘পদ্ধতিগত ও প্রতিহিংসাপরায়ণ’ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোদি সরকারের প্রথম বছরে (৭ জুন, ২০২৪–৭ জুন, ২০২৫) মোট ৯৪৭টি ঘৃণা-সম্পর্কিত ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৪৫টি ঘৃণা ভাষণ, বাকি ৬০২টি ঘৃণা অপরাধ, যাতে হিন্দুত্ববাদীরা সংখ্যালঘুদের জানমালের ওপর সরাসরি ভয়ানক আক্রমণ করেছে।

৬০২টি ঘৃণা-সম্পর্কিত অপরাধের মধ্যে ১৭৩টিতে শারীরিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে এবং ২৫টি ঘটনায় ভুক্তভোগীর মৃত্যু হয়েছে। নিহত সবাই মুসলিম।

৩৪৫টি বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্যের মধ্যে ১৭৮টি বিজেপির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা দিয়েছেন। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) ও বজরং দলের নেতারা দিয়েছেন যথাক্রমে ২১ ও ২০টি। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী মোদি ৫টি, বিজেপি-শাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা ৬৩টি এবং অন্যান্য নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা ৭১টি বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন। এমনকি দুজন বিচারক ও একজন গভর্নরও এই তালিকায় রয়েছেন।

বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে, বিশেষ করে উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রে ঘৃণা-সম্পর্কিত অপরাধের ঘটনা বেশি ঘটেছে।

গণেশ চতুর্থী, নবরাত্রি, রাম নবমী এবং হোলির মতো হিন্দু উৎসবগুলো পরিকল্পিতভাবে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। মিডিয়া প্রচারণা, রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর এবং পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা এতে ইন্ধন জুগিয়েছে।

এপিসিআর জানিয়েছে, নথিভুক্ত ৬০২টি ঘৃণা-সম্পর্কিত অপরাধের মাত্র ১৩% ঘটনায় এফআইআর দায়ের করা হয়েছে, যা পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা বা জড়িত থাকার ইঙ্গিত দেয়।

প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে — নির্বাচন, এমনকি স্থানীয় নির্বাচনও ঘৃণা-সম্পর্কিত অপরাধ ও বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্যর কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে। দিল্লি, ঝাড়খণ্ড, মহারাষ্ট্র এবং উত্তরাখণ্ডে ঘৃণা-সম্পর্কিত অপরাধের উল্লম্ফন বিশ্লেষণে বোঝা যায়, নির্বাচনের সময় বিজেপির অনুকূলে একটি পরিবেশ তৈরির জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ঘৃণামূলক অপরাধ ও বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য ছড়ানো হয়।

ভারতশাসিত কাশ্মীরের পেহেলগামে সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলা ও তারপর ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সংঘাত সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলেছে। মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণা অপরাধ বেড়ে যায়।

এপিসিআর-এর এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে–গত এক বছরের ঘটনা দেখাচ্ছে, হিন্দুত্ববাদ এখন স্রেফ মতাদর্শ বা জীবনশৈলী নয়, সেটিই হয়ে উঠেছে দেশ শাসনের কাঠামো, যার প্রতিপক্ষ হিসেবে নির্দিষ্ট হয়ে গেছেন সংখ্যালঘু, দলিত ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ।

দ্রব্যগুণ – কালো জাদুর জিনিসপত্র

জাদুবিদ্যা কোনো গল্পকবিতার বিষয় নয়। এটি এক শক্তিশালী সাংস্কৃতিক প্রথা, যা প্রাচীন সভ্যতা থেকে আধুনিক গোপন সমাজ পর্যন্ত বিস্তৃত। জাদুবিদ্যায় ব্যবহৃত বস্তুগুলো সাধারণ চোখে সাধারণ বস্তু মনে হলেও কিন্তু বিশেষভাবে লোডেড।

রক্ত চিরকালই জাদুবিদ্যার এক চরম উপাদান। আফ্রিকান ভুতুড়ে কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের নেক্রোম্যান্সিতে দেখা যায়, বলির জন্য ব্যবহৃত ছুরিগুলোতে বিশেষ ধাতু ব্যবহৃত হয়। এই ছুরির ফল কেবল ধারালো নয়, তাকে প্রস্তুত করা হয় রাত্রির নির্জনতায়, চাঁদের আলোয়। এই ছুরির মুখে প্রথম রক্ত লাগানোর পর সেটি অ্যাক্টিভ হয়ে যায়। এরপর তার মাধ্যমে বলি দিলে বিশ্বাস করা হয় আত্মা, শক্তি ও নিয়ন্ত্রণ এক বিন্দুতে সংহত হয়। এখানে ছুরির ধাতু নিজেই আত্মিক জগতের সাথে যোগাযোগের একটি চ্যানেল হয়ে ওঠে ।

ভুডু, ওয়েস্ট আফ্রিকান ও ক্যারিবীয়ান যাদুবিদ্যায় পশুর হাড়, দাঁত, চোখ বা শুকনো কলিজা একেকটি নির্দিষ্ট আত্মা বা শক্তির প্রতীক। এগুলো মাটিতে পুঁতে রাখা হয়, গন্ধক বা কফি দিয়ে ধুয়ে শুদ্ধ করা হয় এবং পরে মন্ত্রপাঠ করে “সংবেদনশীল” করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে এসব হাড় একটি বোতলের মধ্যে বিশেষ তেল ও আগরবাতির ধোঁয়ার সঙ্গে রেখে তন্ত্র তৈরি করা হয়, যাকে বলে conjuring bottle। এই বোতল হয় আত্মিক শক্তিকে বন্দী করার বাহন।

উত্তর ইউরোপীয় যাদুবিদ্যায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বস্তু হলো রুনস (runes)—বিশেষ চিহ্ন খোদাই করা পাথর বা কাঠ। প্রতিটি রুন একটি ধ্বনি, শক্তি ও ভবিষ্যদ্বাণী নির্দেশ করে। রুন খোদাই করা এই বস্তুগুলোকে শুধু টোকেন বা লাকি চার্ম বললে ভুল হবে এরা তথ্যসংগ্রাহক এবং সিগন্যাল ট্রান্সমিটার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।

ট্যালিজমান (যা শরীরে ধরা হয়) আর অ্যামুলেট (যা নিজে কাজ করে) এর মাঝে পার্থক্য রয়েছে। ধরা হয় সঠিক ধাতুতে সঠিক রাশিচিহ্ন বা প্রতীক খোদাই করলে সেই বস্তু অপদৈব প্রতিরোধী হয়ে ওঠে।

তন্ত্র-মন্ত্র, বা থেবান স্ক্রিপ্টে ব্যবহৃত বিশেষ কালি যেমন, গোধূলির সময়ে কালো মেষের রক্ত দিয়ে বানানো কালি, এগুলো শুধু ভাষা নয়, শক্তিও বহন করে। এই কালি দিয়ে লিখিত মন্ত্র বা চিহ্নবিশিষ্ট কাগজকে বলা হয় sigil। এসব sigil কোনো দেবতা, আত্মা, বা শক্তিকে আহ্বান করে। যখন এটি আগুনে পোড়ানো হয়, তখন সেই শক্তি বাতাসে ছড়িয়ে যায় ধরা হয়, অনুরোধ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়।

জাদুবিদ্যায় ব্যবহার হয় এক ধরনের প্যাথিক ম্যাটেরিয়াল যা প্রতিক্রিয়া ধারণ করে। অনেক আয়না, স্ফটিক বল বা কালো কাঁচ, ধ্যানরত যাদুকরের চিন্তা শুষে নিয়ে একধরনের প্রতিফলন তৈরি করে। ইংরেজি উইচক্র্যাফ্টে একে বলা হয় scrying। এইসব কাঁচ বা স্ফটিক নিজেই জাদু করে না বরং ব্যবহারকারীর চেতনার গভীরতাকে প্রতিফলিত করে। সুতরাং এটি “Occult Interface” হিসেবেই কাজ করে, যেখানে বস্তুর বাস্তবতা ও মনস্তত্ত্ব এক হয়ে যায়।

গন্ধক, লবণ, বা চূর্ণিত ধূপ এরা অনেকটাই উপেক্ষিত উপাদান হলেও জাদুবিদ্যায় মূল শক্তির স্থান। কারণ শক্তি দৃশ্যমান নয়, কিন্তু গন্ধ তা বহন করে। একটি সাধারণ লবণ ছিটিয়ে দিলে ‘protective field’ তৈরি হয় এমন বিশ্বাস স্কটিশ ও আইরিশ ওয়িকানদের মধ্যে প্রচলিত। আবার, মরিচ, ল্যাভেন্ডার, গোলাপ ও চন্দন-চূর্ণ একত্রে জ্বালালে যে ধোঁয়া ওঠে, তা নাকি নষ্ট আত্মা দূর করে এবং প্রার্থনাকে তীব্র করে তোলে।

ব্ল্যাক ম্যাজিকের অনেক প্রক্রিয়ায় লক্ষ্যবস্তুর শরীর থেকে নেওয়া বস্তু চুল, রক্ত, নখ ব্যবহার করা হয়। এগুলোর মাধ্যমে target linkage তৈরি হয় । ধারণা হলো যেহেতু এই বস্তু নিজের শক্তি ধারণ করে, তাই তাতে যাদুবিদ্যা প্রয়োগ করলে ওই মানুষ প্রভাবিত হবে। এগুলো Sympathetic Magic বা সাদৃশ্য জাদুবিদ্যার অন্তর্গত।

জাদুবিদ্যার বস্তুগুলো কখনোই কেবল জৈব বা অজৈব উপাদান নয়। যাদুবিদ্যার ভাষায় এরা শক্তির বাহক নয়, বরং শক্তির উপলক্ষ।এদের কার্যকারিতা নির্ভর করে সময়, স্থান, ব্যবহারকারী এবং উদ্দেশ্যের উপর। এইসব occult materials জাদুবিদ্যার ইতিহাসকে কেবল রহস্যময় করে তোলে না, বরং আধুনিক ইনারজেটিক সাইকোলজি ও ritual design ধারণার মধ্যেও প্রবেশ করেছে। তাদেরকে অবজ্ঞা করে বোঝা যাবে না, বরং বুঝতে হলে এই বস্তুগুলো কীভাবে মানুষের বিশ্বাস, প্রতীকি ভাষা, এবং চেতনার কাঠামো গঠনে ভূমিকা রাখে তা গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে।

নেতৃত্বের ঘাটতিতে গণঅভ্যুত্থানের বৈপ্লবিক সম্ভাবনা কাজে লাগেনি : অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ্, অর্থনীতিবিদ ও লেখক

“… আমাদের আর্থসামাজিক ভিত কিন্তু অত্যন্ত দুর্বল। বড় ধরনের কোনো কিছু গ্রহণ করার অনুপযোগী বাংলাদেশের সমাজ– এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ থাকা উচিত নয়। এখানে এক সময় উঠতি মধ্যবিত্তের বিকাশ ঘটেছিল, যাদের কণ্ঠস্বর বেশ উঁচু ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে– শেখা হাসিনার ১৫ বছর শুধু নয়, তারও আগে থেকে এখানে এমন একটা বিশ্রি শ্রেণি গড়ে উঠেছে, রাশিয়ার অনুকরণে যাদের বলা হচ্ছে অলিগার্ক। মাফিয়াতন্ত্রও আছে এখানে।

দেশের আসল ক্ষমতা এদের হাতে। সমাজটাকে তারা টাকা দিয়ে কলুষিত করে ফেলেছে। টাকা হলো এখন সামাজিক মর্যাদাসহ সবকিছুর মাপকাঠি। এ পরিস্থিতিতে সমাজটাকে আপনি একটু সভ্য-ভব্য করবেন, তা সম্ভব নয়।

… আমাদের সমাজের ভিতটা অলিগার্ক বা মস্তানদের হাতে। এদেরকে স্পষ্টভাবে, একেবারে ধরে ধরে একটা একটা করে উচ্ছেদ না করে কোনো টেকসই সংস্কার আপনি করতে পারবেন না।

বলা হচ্ছে, আমরা এমনভাবে সংস্কার করছি যাতে ফ্যাসিবাদ আর ফিরে না আসে। কিন্তু আর্থসামাজিক কাঠামো যদি দুর্বল, পচাগলা থেকে যায়, তাহলে সংস্কার টিকবে কীভাবে এখানে? এ ভিতের ওপর আপনি যতই সংস্কার করুন, দেখা যাবে কয়েক বছর পর আরেকটা রূপে ফ্যাসিবাদ আবার জেঁকে বসবে।

… এখানে অতীতে যেমন বহু গণঅভ্যুত্থান হয়েছে, ভবিষ্যতেও তা হবে। যতদিন পর্যন্ত প্রজ্ঞাবান ও দৃঢ়চেতা নেতৃত্ব না আসবে, ততদিন এখানে স্থিতিশীলতা আপনি আশা করতে পারেন না। এক প্রকার গণঅভ্যুত্থানের ১০ বছরের চক্রে পড়ে যাবে দেশ।

… ত্যাগের দিক থেকে, গভীরতার দিক থেকে, মানুষের সাহসের দিক থেকে এবারের গণঅভ্যুত্থান সত্যিই অনন্য। মানুষের আকাঙ্ক্ষা এখানে বিশাল। কিন্তু এ আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য যে ধরনের নেতৃত্ব, রাজনীতি, চিন্তাভাবনা, দর্শন দরকার ছিল, তার ভীষণ অভাব আমি দেখছি। সময়ের এ আহ্বানে সাড়া দেওয়ার যোগ্যতা আমাদের বর্তমান নেতৃত্বের নেই বলে আমি মনে করি।

… আমিও ভেবেছিলাম, তারা(ছাত্ররা) দিশা দেখাবে। তাদের কিছু কথাবার্তাও আকর্ষণীয় ছিল। কিন্তু সেগুলোকে তারা সেভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। দ্বিতীয়ত, আপনি চট করে নেতা হতে পারবেন না। সে জন্য সময় লাগবে। সে সময়টার আগেই তারা নেতা হয়ে যাচ্ছে।

… ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের তরুণরা যা করেছে, নিঃসন্দেহে তা বিরাট কিছু। তাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো শেখ হাসিনার মতো ভয়ংকর এক শাসককে তারা শুধু পদত্যাগ নয়; দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছে। পুলিশ বাহিনী থানা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। এর মধ্যে একটা বিপ্লবী সম্ভাবনা ছিল বলে আমি মনে করি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, সেখানে কোনো বিপ্লবী নেতৃত্ব ছিল না।

… আমরা গভীর এক সংকটে আছি। এ সংকট শুধু গণতন্ত্রের নয়; স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বেরও সংকট। এ থেকে উদ্ধারের জন্য প্রকৃষ্ট মাঝিমাল্লা দরকার। আমরা সেই মাঝিমাল্লার অপেক্ষায় আছি। “

Saul Leiter এর ফটোগ্রাফি স্মৃতি, ছায়া, নিঃসঙ্গতার রং

নিউ ইয়র্কের এক শীতল বিকেল। জানালার ওপারে বৃষ্টি পড়ছে, রাস্তার মোড়ে লাল ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে আছে এক নারী। কাচের ওপারে জমে থাকা বৃষ্টির ফোঁটায় তার মুখ অস্পষ্ট, ছায়াচ্ছন্ন। ছবির পুরো ফ্রেমজুড়ে নরম আলো, ধোঁয়াটে রঙ, নিঃসঙ্গতা এবং অদ্ভুত রকমের স্থিরতা। এটাই স্যাউল লাইটারের সবচেয়ে বিখ্যাত ছবিগুলোর একটি “Red Umbrella” (1958)।

স্যাউল লাইটার (Saul Leiter, ১৯২৩–২০১৩) ছিলেন এমন এক শিল্পী, যিনি ফটোগ্রাফিকে কখনও সাংবাদিকতা বা নাটকীয়তার মাধ্যম হিসেবে দেখেননি। বরং তিনি এটিকে দেখেছিলেন যেন একধরনের মৌন চিত্রকাব্য। তার ছবিতে কাহিনি নেই আছে অনুভব, বর্ণনার বদলে আভাস, স্পষ্টতার বদলে অনিশ্চয়তা। আর এ কারণেই তিনি ফটোগ্রাফির ইতিহাসে অনন্য।

১৯৫০-এর দশকে, ফটোগ্রাফির জগতে রঙিন ছবি তখনও সিরিয়াস আর্ট হিসেবে গ্রহণযোগ্য ছিল না। পত্রিকার বিজ্ঞাপন ও পারিবারিক অ্যালবামের জায়গায় রঙিন ছবি সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু স্যাউল লাইটার এই তথাকথিত শুদ্ধতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে ভেঙে দিয়ে রঙকেই নিজের ভাষা করে নিলেন। তবে তার রঙ চড়া বা রোমাঞ্চকর নয় বরং ধোঁয়াটে, কুয়াশাভেজা, অনুভূতির মতো নরম। Kodachrome ফিল্মে তোলা তার ছবিগুলো যেন পেইন্টিংয়ের মতো, যেখান থেকে আলো ও ছায়ার নীরব মিশ্রণ ভেসে আসে।

তিনি বলতেন, “In order to build a career and to be successful, one has to be ambitious. Well, I guess I’m not ambitious.” এই কথাটি যেন তার শিল্পীসত্তার নির্যাস। তিনি কখনোই নাম-যশ-প্রতিযোগিতায় ছিলেন না। বরং নিজেকে গুটিয়ে রেখে, শহরের আনাচে-কানাচে, জানালার আড়াল থেকে তিনি তুলে আনতেন জীবনের নিঃশব্দ কবিতা।

স্যাউল লাইটার মূলত স্ট্রিট ফটোগ্রাফার, কিন্তু তার চোখ রাস্তার কোলাহলে নয়, নীরবতায়। অনেক সময় তিনি ছবি তুলেছেন জানালার ভিতর থেকে, যার কাচে জমে আছে বৃষ্টির ফোঁটা, কুয়াশা কিংবা প্রতিফলন। সে জানালার ওপারে মানুষ হেঁটে যাচ্ছে, বাস দাঁড়িয়ে আছে, আলো জ্বলছে;, কিন্তু সবকিছুই যেন এক পর্দার আড়াল থেকে দেখা, একধরনের স্বপ্নের ভিতর থাকা।

তার ছবিতে প্রায়ই দেখা যায় ছায়া, ছেঁড়া আংশিক মুখ, দূরের অবয়ব। বিষয়বস্তুর স্পষ্টতা যেন ইচ্ছা করেই গায়েব। ফলে ছবিটি হয়ে ওঠে এক অন্তর উপলব্ধি যেখানে মানুষ শুধু মানুষ নয়, বরং তার অভ্যন্তরীণ নিঃসঙ্গতাও।

একটি চমৎকার উদাহরণ হলো তার “Phone Call” (1957) নামক ছবিটি। ছবিটিতে দেখা যায়, একজন নারী টেলিফোন বুথে কথা বলছেন, কিন্তু বুথের কাচ ও আলোর প্রতিফলনে তার মুখ আংশিক আবৃত। আমরা জানি না সে কাকে বলছে, কী বলছে, শুধু অনুমান করি।ছবির চুপচাপ দৃষ্টিভঙ্গি সেই অপরিচিত মেয়েটিকে যেন আমাদের চেনা চেনা করে তোলে।

আরেকটি ছবির কথা বলা যায় “Snow” (1960)। এই ছবিতে ঝরতে থাকা তুষার, কাচে জমে থাকা জলকণা আর ট্রাফিক লাইটের আবছা প্রতিচ্ছবি সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক রহস্যময় শীতলতা।

“Soames Bantry” নামক একটি পোর্ট্রেট ছবিতে লাইটার তার প্রেমিকা ও চিত্রশিল্পী সঙ্গীকে দেখিয়েছেন এক গভীর স্নিগ্ধতায়।এই ছবির আলোর ব্যবহার, চোখের দৃষ্টি, ও রঙের স্তর যেন প্রেম ও ব্যক্তিগত ইতিহাসকে এক ফ্রেমে বেঁধে দেয়।

স্যাউল লাইটার মূলত চিত্রশিল্পী হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। তার পিতার ইচ্ছা ছিল তিনি রাব্বি হবেন, কিন্তু তিনি ধর্মীয় শিক্ষা ছেড়ে আর্ট স্কুলে ভর্তি হন। তার অনেক অঙ্কন ও পেইন্টিং পরবর্তীকালে প্রদর্শিত হয়েছে। চিত্রশিল্পের এই প্রভাব তার ফটোগ্রাফি কম্পোজিশনে স্পষ্ট। তিনি ফ্রেমকে ভাগ করেন দেয়ালের রেখা, জানালার কাঁচ, ছায়া বা আলো দিয়ে। অনেক সময় ছবির বড় অংশ জুড়ে থাকে শুধু ধূসর দেয়াল বা কোনো বিমূর্ত রঙের স্তর এবং কোণে ছোট একটি মানব অবয়ব। এতে করে বাস্তবতা ঝাপসা হয়ে যায়, দর্শক বাধ্য হন ছবির মধ্যে নিজের গল্প খুঁজে নিতে।

এটিই লাইটারের ছবি দেখার প্রধান আহ্বান, এখানে আপনি শুধু একজন ফটোগ্রাফারের চোখে নয়, একজন কবির দৃষ্টিতে পৃথিবী দেখেন।লাইটারের ছবিতে সবচেয়ে শক্তিশালী যে উপাদানটি থাকে তা হলো নীরবতা। কোনো চিৎকার নেই, নাটকীয় মুহূর্ত নেই। একজন মানুষ ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে আছে এইটুকুই। কিন্তু সে দাঁড়ানো যেন এক গভীর গল্প বলছে।

“Man with Straw Hat” ছবিটিতে আমরা দেখি ট্রামের কাচের পেছনে একজন পুরুষ, মুখ পুরো ঢাকা। ছবিতে সেই কাচ, সেই রঙ, সেই গাঢ় আলো ও ছায়া সব মিলিয়ে যেন আমরা কিছু দেখি না, বরং কিছু অনুভব করি।

আরো কিছু কাজের কথা না বললেই নয়—“Taxi”, “Walking”, “Through Glass”, “Foot on El” প্রভৃতি ছবিতে শহরের প্রতিদিনকার জীবনকে নতুন দৃষ্টিতে ধরা হয়েছে, যেভাবে অন্য কেউ দেখেননি।

তার ছবিগুলো এক ধরনের উপস্থিত অনুপস্থিতি সৃষ্টি করে যেখানে মানুষ আছে, আবার নেইও। তারা বাস্তব নয়, স্মৃতি। যেন আমাদের জীবনেই তারা কোথাও ছিল, হারিয়ে গেছে, আবার ফিরে এসেছে কোনো প্রতিফলনে।

স্যাউল লাইটারের অনেক ছবি ৫০ বছর পর প্রকাশিত হয়েছে। ২০০৬ সালে Steidl থেকে প্রকাশিত “Early Color” বইটি তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এরপর আসে বহু প্রদর্শনী, ডকুমেন্টারি ফিল্ম (In No Great Hurry) এবং তরুণ ফটোগ্রাফারদের এক নতুন অনুপ্রেরণা।

তিনি নিজে কোনোদিন গ্যালারি বা পুরস্কারের পেছনে ছোটেননি। তিনি যেন নিজের ছবিগুলোকেও তার মতই লুকিয়ে রাখতেন। স্যাউল লাইটারের ফটোগ্রাফি আমাদের বলে, শহরের গল্প শুধু শব্দে নয়, তা বলা যায় আলো-ছায়ার ফাঁক গলে। তার ছবি এক ধরনের দার্শনিক পটভূমি তৈরি করে, যেখানে দৃশ্য নয়, অনুভব মুখ্য। আপনি যা দেখছেন তা সম্পূর্ণ নয় কিন্তু তাতেই জীবনের পূর্ণতা।

কেন তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দিল রাশিয়া?

নারী দমন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের পরও কাবুলে রাষ্ট্রদূত রেখেছে চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, উজবেকিস্তান ও পাকিস্তান। তবে, আনুষ্ঠানিকভাবে এবং প্রকাশ্যে রাশিয়াই প্রথম তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি প্রদান করলো।

রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়–তারা জ্বালানি, পরিবহন, কৃষি ও অবকাঠামো খাতে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার সম্ভাবনা দেখছে। সন্ত্রাস ও মাদক চোরাচালানের বিরুদ্ধে কাবুলকে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে রাশিয়া।

২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতা নেওয়ার পর অনেক দেশ তাদের কূটনৈতিক মিশন বন্ধ করলেও রাশিয়া তার কাবুল দূতাবাস চালু রেখেছে।টেলিগ্রামে এক বার্তায় তারা জানায়, কাবুলের সঙ্গে ‘সংলাপ সম্প্রসারণ’ আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এর আগেই ২০২২ সালে তালেবান সরকারের সঙ্গে প্রথম আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক চুক্তি করে রাশিয়া, যার আওতায় আফগানিস্তানে তেল, গ্যাস ও গম রপ্তানির সিদ্ধান্ত হয়।

২০২৩ সালের জুলাইয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তালেবানকে ‘সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে মিত্র’ বলে উল্লেখ করেন। ২০১৮ সাল থেকেই তালেবান প্রতিনিধি দল মস্কো সফর করে আসছে।

আফগানিস্তান থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ থেকে ইসলামপন্থি জঙ্গিরা রাশিয়ার প্রতি নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে কাজ করছে। তাদের বিরুদ্ধে লড়তে কাবুলকে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে বিবেচনা করে রাশিয়া।

২০২৪ সালের মার্চে ইসলামিক স্টেট (আইএস) এর বন্দুক হামলায় মস্কোর একটি কনসার্ট হলে ১৪৯ জন নিহত হন। মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করেন, তাদের গোয়েন্দাদের কাছে এমন তথ্য আছে যা ইঙ্গিত করছে বন্দুকধারীরা আইএসের আফগান শাখা আইসিস-কে’র (ইসলামিক স্টেট খোরাসান) সদস্য।

তালেবানের দাবি, তারা আফগানিস্তান থেকে ইসলামিক স্টেটের নিশানা মুছে ফেলতে কাজ করছে। তবে দুই দেশের ইতিহাস জটিল। ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন একটি মিত্র সরকারকে রক্ষার চেষ্টায় আফগানিস্তানে সৈন্য পাঠিয়েছিল, যা আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত হয়। নয় বছরের যুদ্ধে রাশিয়ার ১৫ হাজার সৈন্য নিহত হয়। অবশেষে ১৯৮৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে তারা আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করে।

পশ্চিমা দেশগুলো ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো তালেবান সরকারের কঠোর সমালোচক। শরিয়া আইন বাস্তবায়নের নামে তারা নারীদের অধিকার খর্ব করছে—এমন অভিযোগ উঠছে। নারীদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা নিষিদ্ধ, ঘর থেকে বের হতে হলে পুরুষ অভিভাবক বাধ্যতামূলক, কঠোর পোশাকবিধি এবং সর্বশেষ ‘পুণ্যের আদেশ’ আইনে নারীদের ঘরের বাইরে কথা বলাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

সাবেক সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর প্রকাশ্যে দণ্ড ও নির্যাতন, খেলাধুলা ও শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার রাস্তায় বিঘ্ন সৃষ্টি করার মতো একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে তালেবান সরকার। সর্বশেষ দেশটিতে দাবা খেলা নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের ওপর আরও একটি বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়।

২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতা নেওয়ার পর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ আফগানিস্তানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যার মধ্যে প্রায় ৯০০ কোটি ডলার সম্পদ জব্দ করা অন্যতম।

নেদারল্যান্ডসের স্কুল – স্মার্টফোন নিষিদ্ধ করায় বেড়েছে পড়াশোনার মান

স্মার্টফোন নিষিদ্ধ করায় নেদারল্যান্ডসের স্কুলে পড়াশোনার পরিবেশ উন্নত হয়েছে। সরকারি এক গবেষণায় এমনটাই উঠে এসেছে।

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ক্লাসে ফোন নিষিদ্ধের জাতীয় নির্দেশনা জারির পর বেশিরভাগ স্কুলই সেটি মেনে নিয়েছে। এখন দেশটির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সেকেন্ডারি স্কুলে শিক্ষার্থীদের ফোন বাসায় রেখে আসতে বলা হয় বা লকারে রাখতে হয়। প্রতি পাঁচটি স্কুলের একটিতে ক্লাস শুরুর আগে ফোন জমা দিতে হয়।

গবেষকরা ৩১৭টি সেকেন্ডারি ও ৩১৩টি প্রাইমারি স্কুলের প্রধানদের ওপর জরিপ চালান। পাশাপাশি শিক্ষক, সহকারী শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের নিয়ে ১২টি ফোকাস গ্রুপ আলোচনা করেন তারা।

সেকেন্ডারি স্কুলগুলো জানিয়েছে, এখন শিক্ষার্থীরা ক্লাসে বেশি মনোযোগী হতে পারছে (৭৫%), সামাজিক পরিবেশও আগের চেয়ে ভালো হয়েছে (৫৯%), এবং কিছু স্কুল জানিয়েছে, ফলাফলেও উন্নতি হয়েছে (২৮%)।

গবেষক ড. আলেকজান্ডার ক্রেপেল বলেন, ‘সবচেয়ে ভালো উন্নতি হয়েছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যোগাযোগে। এখন আর কেউ লুকিয়ে কারও ছবি তুলে হোয়াটসঅ্যাপে ছড়াতে পারে না—এটা একটা বড় সামাজিক নিরাপত্তা। আগের মতো ব্রেক টাইমে সবাই ফোনে ডুবে থাকে না, এখন কথা বলতে হয়। মাঝে মাঝে ঝগড়া হলেও শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বলছে, এখন পরিবেশ অনেক ভালো।’

দেশটির প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি এডুকেশন মন্ত্রী মারিয়েলে পল বলেন, এই জাতীয় নির্দেশনা শ্রেণিকক্ষে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহায়তা করেছে। আগে কোনো শিক্ষক ব্যক্তিগতভাবে ফোন নিষিদ্ধ করতে চাইলে তা নিয়ে বিতর্ক হতো। বিশেষ করে নতুন শিক্ষকরা সেটি প্রয়োগ করতে হিমশিম খেতেন।

নেদারল্যান্ডসের পরিসংখ্যান সংস্থার তথ্যে বলা হয়েছে, দেশটির ৯৬% শিশু প্রতিদিন অনলাইনে থাকে, বেশিরভাগই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে।

গত মাসে সরকার অভিভাবকদের পরামর্শ দিয়েছে, ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করতে এবং ‘স্ক্রিন টাইম’ কমিয়ে আনতে। একজন সংসদ সদস্য স্কুলে মোবাইল ফোন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধের প্রস্তাব দিয়েছেন।

যন্ত্র যদি আপনার চিন্তা পড়ে ফেলে তখন আপনি কে?

ভাবুন আপনি কিছু ভাবছেন আর সেই ভাবনা সরাসরি কম্পিউটারে চলে যাচ্ছে। আপনি কোনো কথা না বললেও একটি ডিভাইস জানছে আপনি কেমন বোধ করছেন। এটি আর কোনো সাই-ফাই গল্প নয়, বরং বর্তমান প্রযুক্তির বাস্তবতা। এই প্রযুক্তির নাম ব্রেইন-কম্পিউটার ইন্টারফেস (BCI)। আর এটির উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে উঠছে এক গভীর প্রশ্ন, মানুষের মানসিক স্বাধীনতা ও “cognitive sovereignty” বা মস্তিষ্কের উপর স্বায়ত্তশাসন কি রক্ষা পাচ্ছে?

BCI কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?

BCI (Brain-Computer Interface) এমন একটি প্রযুক্তি যা সরাসরি মানুষের মস্তিষ্ক থেকে তথ্য সংগ্রহ করে কম্পিউটারে পাঠায়। এই প্রযুক্তি প্রথমত তৈরি হয়েছিল পক্ষাঘাতগ্রস্ত বা নিঃশব্দ রোগীদের যোগাযোগের জন্য। কিন্তু এখন এটি গড়ে উঠছে স্মার্টফোনের মতো সাধারণ ব্যবহার, গেমিং, বিজ্ঞাপন ও মনিটরিংয়ের জন্য। Elon Musk এর Neuralink প্রকল্প ইতোমধ্যেই মানুষের মস্তিষ্কে চিপ স্থাপন করে পরীক্ষামূলক তথ্য আদান-প্রদান শুরু করেছে। একইভাবে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রে সামরিক ও শিক্ষাক্ষেত্রে BCI ব্যবহার হচ্ছে মনোযোগ ও দক্ষতা বাড়াতে।

যখন আমরা বলি মানসিক স্বাধীনতা, তখন তা বোঝায় ব্যক্তি যা চিন্তা করছে, তা সে চাইলে প্রকাশ করবে, না চাইলে গোপন রাখবে।কিন্তু যদি কোনো প্রযুক্তি আমাদের ভাবনার তথ্য নিতে পারে, তবে সেই স্বাধীনতা আর কোথায়? Cognitive sovereignty মানে হলো “নিজের মস্তিষ্ক, নিজের তথ্য” এই অধিকার। এটি ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সর্বোচ্চ স্তর। যদি কেউ আপনার মাথার চিন্তা “পড়তে” পারে, তবে আপনি আদৌ স্বাধীন কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন।

চীনের কিছু স্কুলে ছাত্রদের মস্তিষ্কে BCI হেডব্যান্ড পরিয়ে তাদের মনোযোগের মাত্রা মাপা হয়। শিক্ষক জানেন কে পড়ায় মনোযোগ দিচ্ছে আর কে নয়। শিশুরা এতে মানসিক চাপে ভুগছে, কিন্তু বলা হচ্ছে এটি “ভবিষ্যতের শিক্ষা”।

চীনা কোম্পানিগুলো কর্মীদের মাথায় BCI সেন্সর ব্যবহার করে তাদের মুড, স্ট্রেস ও মনোযোগ ট্র্যাক করছে। এতে কর্মক্ষমতা বাড়লেও, ব্যক্তিগত অনুভূতি হারিয়ে যাচ্ছে।

BCI ব্যবহারে কোনো পণ্য দেখলে মস্তিষ্ক কেমন সাড়া দিচ্ছে, তা মেপে বিজ্ঞাপন নির্মাণ করা হচ্ছে। আপনি ভাবলেন মাত্র, আর আপনার সামনে পণ্য হাজির এই পর্যবেক্ষণ সমাজে স্বাধীন ক্রয়চিন্তার ব্যাঘাত ঘটায়।

ভবিষ্যতের নিয়ন্ত্রণ কি মাথার ভেতর?

এই প্রযুক্তি অনেক সম্ভাবনার দোর খুলে দিলেও, সমাজে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ভয়ানক হতে পারে। কারা কী ভাবছে তা জানার মাধ্যমে সরকার বা প্রতিষ্ঠানগুলো নাগরিকদের দমন করতে পারে। কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তিগত মস্তিষ্ক তথ্য ব্যবহার করে পণ্যের বিক্রি বাড়াতে পারে, যেখানে মানুষের স্বাধীনতা ও পছন্দের জায়গা সংকুচিত হয়। যাদের মাথায় BCI ইনপ্লান্ট থাকবে না, তারা পিছিয়ে পড়বে এমণ একটি নতুন ধরনের ডিজিটাল শ্রেণিবিন্যাস তৈরি হতে পারে।

BCI এখনও নিয়ন্ত্রণহীন এক প্রযুক্তি। এখনই যদি কোনো আন্তর্জাতিক মানবাধিকারভিত্তিক নীতিমালা তৈরি না হয়, তবে ভবিষ্যতে এটি গণতন্ত্র, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মানবতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। জাতিসংঘের মতো সংস্থার উচিত এ ধরনের প্রযুক্তির উপর “cognitive rights” ঘোষণার মাধ্যমে সুরক্ষা নিশ্চিত করা। ব্যক্তি যেন তার মস্তিষ্কের তথ্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সেটাই ভবিষ্যৎ স্বাধীনতার আসল চাবিকাঠি।

মানুষ কি কেবল যন্ত্রের বাহক?
BCI প্রযুক্তি আমাদের উন্নয়ন, চিকিৎসা ও যোগাযোগের নতুন দিগন্ত খুলে দিলেও, এর ভয়াবহ দিক উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।মানুষের মস্তিষ্ক এখনো শেষ অবশিষ্ট গোপন জায়গা। সেটিও যদি নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে, তবে মানুষের আসল পরিচয় আর কোথায় থাকবে? এই মুহূর্তে সমাজ হিসেবে আমাদের করণীয় হলো প্রযুক্তির গতি থামানো নয়, বরং নৈতিকভাবে পরিচালিত করা। নইলে মস্তিষ্ক আর মানুষের সম্পত্তি থাকবে না, পরিণত হবে কেবলমাত্র একটি ডেটা মেশিনে।

দ্য মুন এফেক্ট : চাঁদ কি আমাদের মনেরও দিকনির্দেশক?

মানব সভ্যতার প্রাচীনতম বিশ্বাস ও জ্যোতিষশাস্ত্রের ধ্যান-ধারণায় চন্দ্রগ্রহ বা ‘চাঁদ’ এক বিশেষ অবস্থান অধিকার করে রয়েছে।শুধু রাতের আকাশের এক জ্যোতি নয়, বরং মানুষের মনস্তত্ত্ব, আবেগ এবং অন্তর্দৃষ্টি বা intuition-এর গভীরে কাজ করা এক রহস্যময় শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। চাঁদের অবস্থা, গতি ও পরিবর্তন মানুষের মানসিক জীবন ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে যে তথ্য দেয়, তা আজও জ্যোতিষশাস্ত্রের গবেষণার মূল আকর্ষণ।

ভারতীয় জ্যোতিষশাস্ত্রে চন্দ্রকে ‘মন’ বা মানসিক শক্তির প্রতীক বলা হয়। এটি মানুষের আবেগ, মেজাজ, স্মৃতি এবং অবচেতন মনকে নিয়ন্ত্রণ করে। গ্রহের অবস্থান নির্ভর করে ব্যক্তি কতটা সংবেদনশীল, কিভাবে আবেগ প্রকাশ করে এবং তার মনের গভীরে কী চলছে।

পশ্চিমা জ্যোতিষেও চাঁদ মানসিকতার অন্দরমহল বোঝাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ব্যক্তির চাঁদের রাশি, যা তার জন্মকালে চাঁদের অবস্থানের ওপর নির্ভর করে, তার আবেগী বৈশিষ্ট্য ও অন্তর্দৃষ্টির ধরন নির্ধারণ করে।

পূর্ণিমা ও অমাবস্যার সময় চন্দ্রের গতি মানুষের মেজাজে অসাধারণ পরিবর্তন আনে। অনেক সময় পূর্ণিমার রাতে অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা, চিন্তার উত্থান-পতন ও অস্বাভাবিক স্বপ্ন দেখা যায়, যা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায়ও ধরা পড়ে।

চাঁদের প্রভাব মানুষের আবেগের ওঠাপড়া ও মেজাজের পরিবর্তন নিয়ে বহু গবেষণার বিষয়। যাদের জন্মকালে চাঁদ ‘কর্কট’ বা ‘মীন’ রাশিতে থাকে, তারা বেশি সংবেদনশীল ও আবেগপ্রবণ হতে পারেন। তাদের মেজাজ খুব দ্রুত পরিবর্তিত হয় এবং তারা অন্যের অনুভূতি সহজে উপলব্ধি করেন। চন্দ্রগ্রহের অবস্থান ব্যক্তির স্মৃতিশক্তির ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। আবেগ সংরক্ষণ ও অতীতের অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করে চাঁদ, যা মানুষের ব্যক্তিত্ব ও মনস্তত্ত্বের অন্দরমহলকে আকার দেয়।

মনে রাখা জরুরি, চাঁদের প্রভাব শুধু আবেগেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে। অনেক সময় চাঁদের অবস্থান বিষণ্নতা, উদ্বেগ বা মানসিক চাপ বৃদ্ধির কারণ হতে পারে।

Intuition বা অন্তর্দৃষ্টিকে অনেকে ‘মনোযোগী অনুভব’ হিসেবে অভিহিত করেন, সেটির সঙ্গে চন্দ্রের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর।আধ্যাত্মিক শিক্ষা ও জ্যোতিষশাস্ত্র এই বিশ্বাসে বিশ্বাসী যে চাঁদ মানুষের অবচেতন মনের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে।

বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, চাঁদের পূর্ণিমা ও অমাবস্যার সময় মানুষের মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশের কার্যক্রম পরিবর্তিত হয়,এটি আবেগ ও intuition-এ প্রভাব ফেলে। যেহেতু মানবদেহের অধিকাংশ অংশ জলীয়, আর জোয়ার-ভাটা যেমন মহাসাগরের পানিকে প্রভাবিত করে, ঠিক তেমনি চাঁদের শক্তি মস্তিষ্কের তরঙ্গ ও মানসিক আবেগের তরঙ্গকে স্পর্শ করে।

এ কারণে অনেক মানুষ পূর্ণিমার রাতে বেশি স্বপ্ন দেখেন, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে intuition বেশি স্পষ্ট হয় বা কোনো গোপন সত্য আবিষ্কার করেন। এমনকি অনেক আধ্যাত্মিক গুরু ও ট্যারো পাঠক বিশ্বাস করেন ‘দ্য মুন’ কার্ড এবং চাঁদের মিলনে মানুষের অন্তর্দৃষ্টি নতুন মাত্রা পায়।

‘দ্য মুন’ কার্ডটি মূলত চন্দ্রগ্রহের রহস্যময়তা ও মনের অজানা স্তরকে প্রতিফলিত করে। এটি বিভ্রান্তি, গোপন তথ্য, অবচেতন মন এবং স্বপ্নের প্রতীক।

জ্যোতিষশাস্ত্র ও ট্যারো পাঠ একত্রে দেখালে দেখা যায়, চাঁদের অবস্থান ও ‘দ্য মুন’ কার্ড মিলিতভাবে ব্যক্তির আবেগ, intuition এবং অতিপ্রাকৃত অভিজ্ঞতার উপর গভীর প্রভাব ফেলে। এই মিলনে মানুষের স্বপ্ন, deja vu অনুভূতি, এমনকি psychic visions বা সাইকিক অভিজ্ঞতাও হতে পারে। ‘দ্য মুন’ কার্ড একইসাথে সতর্ক করে দেয় যে সব সময় আবেগের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়, কারণ বিভ্রান্তি ও মিথ্যারও প্রভাব থাকতে পারে। কিন্তু এর গভীর আধ্যাত্মিক অর্থ মানুষের মানসিক বিকাশের পথও নির্দেশ করে।

occult বিষয়গুলোতে চন্দ্রগ্রহের প্রভাবের অনেক রহস্য লুকিয়ে রয়েছে। পূর্ণিমা ও অমাবস্যার সময় মানুষ অস্বাভাবিক স্বপ্ন, আগাম ঘটনার বার্তা পাওয়া, বা মনের অজানা শক্তির অনুভূতি পেতে পারেন। ট্যারো পাঠের সময় ‘দ্য মুন’ কার্ড বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একটি গভীর আধ্যাত্মিক যাত্রার সূচনা হিসেবে ধরা হয়, যেখানে মিথ্যা ও সত্যের মধ্যকার সেতুবন্ধন খুঁজে পাওয়া যায়। অনেক আধ্যাত্মিক ও মিস্টিক বিশ্বাস করেন যে চাঁদের তরঙ্গ মানুষের মানসিক শক্তিকে জাগ্রত করে এবং psychic শক্তির বিকাশ ঘটায়, যা অতিপ্রাকৃত ঘটনা ও অভিজ্ঞতার জন্য দরজা খুলে দেয়।

চন্দ্রগ্রহ শুধু একটি গ্রহ নয়, এটি মানুষের আবেগ, মানসিকতা এবং অন্তর্দৃষ্টির এক অদ্ভুত শক্তি। জ্যোতিষশাস্ত্র এই প্রভাবকে লক্ষ করেছে হাজার বছর ধরে এবং আধুনিক গবেষণাও অনেকাংশে এটি সমর্থন করে। মানব জীবনের গভীরে চাঁদের এই প্রভাব আমাদের আবেগের ওঠাপড়া, স্বপ্ন এবং intuition-কে প্রভাবিত করে। তরো কার্ডের ‘দ্য মুন’ কার্ড এই রহস্যময় শক্তির একটি চিত্র, যা আমাদের মনের অজানা স্তরে প্রবেশের চাবিকাঠি।

সাহিত্যে বিকল্প ইতিহাস – প্রতীক, কল্পনা ও সত্য

২০০৩ সালে প্রকাশিত হওয়ার পরই ড্যান ব্রাউনের উপন্যাস The Da Vinci Code এক বৈশ্বিক আলোড়ন সৃষ্টি করে। শুধুমাত্র একটি থ্রিলার নয়, বইটি একধরনের ‘সাহিত্যিক চ্যালেঞ্জ’ ছুড়ে দেয় প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসের প্রতি। বিশেষ করে খ্রিস্টধর্ম, লিওনার্দো দা ভিঞ্চির শিল্পকর্ম এবং ধর্মীয় প্রতীকবাদের অর্থঘটনাকে ঘিরে। কিন্তু প্রশ্ন হলো এইরকম সাহিত্য কি কেবল কল্পনামাত্র, না কি এটি ইতিহাসের বিকল্প ব্যাখ্যারও উৎস?

ইতিহাসকে ফিকশনে ব্যবহার নতুন কিছু নয়। শেক্‌সপিয়র তার নাটকে ইংল্যান্ডের রাজাদের ইতিহাস পুনর্গঠন করেছিলেন, আবার মার্ক টোয়েন “A Connecticut Yankee in King Arthur’s Court” উপন্যাসে মধ্যযুগকে বিদ্রুপ করেছিলেন। তবে Da Vinci Code একধাপ এগিয়ে যায়—এটি ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় ঘটনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

উপন্যাসটি দাবি করে যে, যীশু খ্রিস্ট বিবাহিত ছিলেন মেরি ম্যাগডালিনের সাথে এবং তাদের সন্তান-সন্ততি একটি ‘পবিত্র রক্তরেখা’ হিসেবে ইউরোপে টিকে আছে। এই দাবিকে ইতিহাসবিদেরা সরাসরি মিথ্যা বলে অভিহিত করলেও সাধারণ পাঠকের মনে একধরনের কৌতূহল ও সংশয়ের জন্ম দেয়। ইতিহাসের উপর সাহিত্যিক প্রভাব এখানেই—এটি সত্য-মিথ্যার মাঝখানে একটি ধূসর অঞ্চল তৈরি করে।

বইটি যেভাবে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির চিত্রকর্ম যেমন The Last Supper বা Mona Lisa নিয়ে সৃষ্টিশীল ব্যাখ্যা দেয়, তা সুনির্দিষ্টভাবে একাডেমিক নয়, কিন্তু গভীরভাবে প্রতীকী। উপন্যাসের চরিত্ররা যেমন বলে, “Symbols are a language that can help us understand our past,” তা সত্য, কিন্তু প্রতীক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে যখন কল্পনার মাত্রা বাস্তবতার সাথে গুলিয়ে যায়, তখন সমস্যা তৈরি হয়। ড্যান ব্রাউন উপন্যাসে লিখেছেন, “All descriptions of artwork, architecture, documents, and secret rituals in this novel are accurate.” এই ঘোষণাটি পাঠকের মনে একধরনের “আধা-সত্য” বিশ্বাস তৈরি করে, যেখানে সাহিত্যিক ব্যাখ্যাকে ঐতিহাসিক সত্য ধরে নেওয়া হয়।

অনেক পাঠক Da Vinci Code পড়ার পর ইতিহাসের প্রতি গভীর আগ্রহী হন, আবার কেউ কেউ ক্যাথলিক চার্চ ও বাইবেলের নির্ভুলতা নিয়েই সংশয়ে পড়ে যান। অর্থাৎ সাহিত্যের এই প্রভাব কেবল পাঠে সীমিত নয়, এটি পাঠকের বিশ্বাস ও জ্ঞানের কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করে।

উপন্যাসটি প্রকাশের পর “Priory of Sion” নামের সংগঠনটিকে ঘিরে একধরনের তদন্ত ও গুজব শুরু হয়, যদিও ঐ সংগঠনটি প্রমাণিতভাবে একটি ২০শ শতকের মিথ্যা উদ্ভাবন। কিন্তু সাহিত্যের শক্তি এখানেই—এটি ঐতিহাসিক ‘প্লট’ ও সাহিত্যিক ‘প্লট’-এর মধ্যে বিভাজন অস্পষ্ট করে তোলে।

“Alternative History” বা বিকল্প ইতিহাস বলতে বোঝায় এমন এক কল্পনা, যেখানে প্রকৃত ইতিহাসের পরিবর্তে একটি “কি হতো যদি…” প্রশ্ন চালিত বাস্তবতা উপস্থাপিত হয়। Da Vinci Code-এ এই প্রবণতা স্পষ্ট। এটি নতুন তাত্ত্বিক জায়গা তৈরি করে, যেটি একদিকে সাংস্কৃতিক ইতিহাসের গভীর ব্যাখ্যা দিতে পারে, আবার অন্যদিকে ইতিহাসকে তাত্ত্বিক সংশয়েও ফেলে দেয়।

The Da Vinci Code আমাদের মনে করিয়ে দেয় সাহিত্যের ক্ষমতা কেবল গল্প বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি ইতিহাসের কাঠামো, ধর্মীয় বিশ্বাস, শিল্প ও সংস্কৃতির চিহ্নগুলোকেও নতুন আলোয় উদ্ভাসিত করতে পারে। অনেক তথ্য কাল্পনিক বা বিতর্কিত হলেও উপন্যাসটি প্রমাণ করে—সাহিত্য যখন ইতিহাসকে কল্পনার আয়নায় ফেলে দেখে, তখন জন্ম নেয় এক নতুন সত্য, পাঠকের মানসিক ইতিহাস। এই সত্য হয়তো প্রামাণ্য নয়, কিন্তু তা মানব সৃষ্টিশীলতার চূড়ান্ত প্রয়াস, যেখানে জ্ঞান, কল্পনা ও প্রশ্ন মিলিয়ে এক নতুন বোঝাপড়ার পথ তৈরি হয়।