Home Blog Page 54

কেন ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষোভের শিকার : ফ্রানচেসকা আলবানিজ ?

গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অভিযানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে প্রতিবেদন দেওয়ায় জাতিসংঘের বিশেষ দূত ফ্রানচেসকা আলবানিজের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন।

এ নিষেধাজ্ঞার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে আলবানিজের যদি কোনো সম্পদ থেকে থাকে, তা জব্দ করা হবে। এ ছাড়া তাঁর যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণও সীমিত হয়ে পড়বে।

গত বুধবার এক বিবৃতিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এ ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, এই ইতালীয় আইনজীবী (আলবানিজ) যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যুদ্ধ চালাচ্ছেন।

গত ৩০ জুন প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ফ্রানচেসকা আলবানিজ ৬০টির বেশি কোম্পানির নাম প্রকাশ করেন। যার মধ্যে আছে মার্কিন টেক জায়ান্ট গুগল, অ্যামাজন ও মাইক্রোসফট। আলবানিজ বলেন, এসব কোম্পানি ‘ইসরায়েলের দখলদার অর্থনীতিকে একধরনের গণহত্যার অর্থনীতিতে রূপান্তর’ করতে ভূমিকা রাখছে।

প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ও জাতীয় বিচারব্যবস্থাকে এসব কোম্পানির নির্বাহী ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচার করার আহ্বান জানানো হয়। জাতিসংঘের সদস্যদেশগুলোকে তিনি এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও সম্পদ জব্দ করারও সুপারিশ করেন।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও অভিযোগ করেন, আলবানিজ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সঙ্গে যোগাযোগ করে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তাঁর তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির সুপারিশ করেছেন। এ অভিযোগপত্র গত নভেম্বরে দাখিল করা হয়।

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা ও আফগানিস্তানে মার্কিন অপরাধ তদন্তে যুক্ত থাকায় গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের চারজন বিচারকের ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।

এ ছাড়া গত মাসে ট্রাম্প প্রশাসন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসকে একটি চিঠি পাঠিয়ে আলবানিজকে তাঁর পদ থেকে অপসারণের আহ্বান জানিয়েছে।

রুবিও অভিযোগ করেন, আলবানিজ প্রকাশ্যে ইহুদিবিদ্বেষ, সন্ত্রাসবাদের প্রতি সমর্থন এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও পশ্চিমা বিশ্বকে ঘৃণা করেন। তবে আলবানিজ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

২০২২ সালের মে মাস থেকে আলবানিজ অধিকৃত ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে জাতিসংঘের বিশেষ দূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ দায়িত্ব পালনকালে তিনি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইনি মতামত ও প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন। ইসরায়েলের মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যে কয়েকজন জোরালো দাবি জানিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে তিনি অন্যতম।

আলবানিজের প্রকাশিত প্রতিবেদনের মধ্যে আছে ফিলিস্তিনে আত্মনিয়ন্ত্রণ আইনের লঙ্ঘন; ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার ব্যাপক বঞ্চনা; ফিলিস্তিনি শিশুদের অধিকার লঙ্ঘন ও ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের গণহত্যার অভিযোগসংক্রান্ত দুটি প্রতিবেদন।

গত বছরের মার্চে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে উপস্থাপিত এক প্রতিবেদনে আলবানিজ বলেন, গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড গণহত্যার পর্যায়ে পৌঁছেছে—এমন বিশ্বাস করার যৌক্তিক ভিত্তি আছে।

আলবানিজ সেখানে গণহত্যার প্রমাণ হিসেবে গণহারে হত্যা, বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস এবং এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি, যেগুলো ফিলিস্তিনিদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে—এসব বিষয় তুলে ধরেন।

ফ্রানচেসকা আলবানিজের জন্ম ইতালির আরিয়ানো ইরপিনো শহরে, ১৯৭৭ সালে। তিনি একজন মানবাধিকার আইনজীবী। আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে তাঁর অভিজ্ঞতা দুই দশকের বেশি। তিনি পিসা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক এবং লন্ডনের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ (এসওএএস) থেকে মানবাধিকার আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

আলবানিজ জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনারের কার্যালয়ে মানবাধিকার কর্মকর্তা হিসেবে চার বছর কাজ করেছেন। এ ছাড়া জেরুজালেমে তিনি ফিলিস্তিনে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থায় (ইউএনআরডব্লিউএ) আইন কর্মকর্তা হিসেবেও কাজ করেছেন।

আলবানিজ ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের আইনি পরিস্থিতি নিয়ে অনেক লেখা লিখেছেন। তিনি ‘প্যালেস্টাইনিয়ান রিফিউজিস ইন ইন্টারন্যাশনাল ল’ (২০২০) ও ‘জে’অ্যাকিউজ’ (২০২৪) নামের দুটি বইয়ের সহলেখক। তিনি গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের সংগঠন ‘গ্লোবাল নেটওয়ার্ক অন দ্য কোয়েশ্চেন অব প্যালেস্টাইন’–এর সহপ্রতিষ্ঠাতা।

“শহীদুল জহিরের প্রবণতা ও স্বকীয়তা”

মুক্তিযুদ্ধের আগে বাংলাদেশের সাহিত্যের একটা বিরাট অংশ লেখা হয়েছে সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে। এ পর্বের ছোটগল্পে নির্মিতির চেয়ে মুখ্য হয়ে দাঁড়ায় বক্তব্য, যেহেতু, সময়টা ছিল জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের এবং একটি স্বাধীন জাতি গঠনের। কিন্তু স্বাধীনতা উত্তরকালে এসে ছোটগল্পে নিরীক্ষা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ পর্বের সবচেয়ে আলাদা ছোটগল্পকার হলেন শহীদুল জহির (১৯৫৩-২০০৮)।

তিনি প্রবণতার দিক থেকে বাংলা সাহিত্যে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ধারাবাহিকতা। শহীদুল জহির নিজেও সেটা স্বীকার করে জানিয়েছেন, ‘…আমার গল্প, বাংলা সাহিত্যের যে ঐতিহ্য আছে সেগুলো থেকেই আসা এবং বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে আসতে পারে। এটা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ হতে পারে।’ [সাক্ষাৎকার, আর কে রনি গৃহীত] শহীদুল জহির যখন লিখতে এসেছেন তখন বিশ্বে সাহিত্যজগতের বড় তারকা হলো গাবরিয়েল গারসিয়া মার্কেস। মূলত তিনি ওয়ালীউল্লাহ এবং মার্কেসকে বেটে তৃতীয় একটা কম্পোনেন্ট হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেছেন। গদ্যে সৈয়দ শামসুল হকের প্রভাবও লক্ষ্য করা যায়। আরেকটু বিশদভাবে বললে, কমলকুমার মজুমদার, জেমস জয়েস ও ইলিয়াসের প্রভাবও তাঁর ভেতর আছে। তবে এইসব প্রভাবকে ছাপিয়ে পরবর্তীকালে তিনি নিজেই গল্প বলার একটি স্বতন্ত্র ধারা সৃষ্টি করেছেন, যেটা আমরা কেবল ‘শহীদুল জহিরীয় ধারা’ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি। তাঁর শক্তি জাদুবাস্তবতার সঙ্গে রূপকথা বা টেল-ধর্মী আখ্যান নির্মাণে। এবং কথ্য ও মানভাষার মিশ্রণে স্বকীয় ভাষারীতি তৈরিতে।

শহীদুল জহিরের ভাষা

শহীদুল জহিরের গল্পের ভাষা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে কথা আছে। প্রমিত ভাষা ব্যবহারের মধ্যে মধ্যে তিনি টেক্সট এবং ডায়লগে কথ্য বা আঞ্চলিক ভাষারীতি ব্যবহার করেছেন। যেমন ক্রিয়াপদের ব্যবহারের ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায়, যায়া (গিয়ে/যেয়ে), হয়া (হয়ে), হারায়া (হারিয়ে), শিখায়া (শিখিয়ে), দিয়া (দিয়ে) প্রভৃতি। এটা তাঁর ক্ষণিক নিরীক্ষা নয়, তাঁর সাহিত্যের মূল স্রোতই এই ভাষা। এক্ষেত্রেও তিনি হয়ত ভাষার ‘কেন্দ্রগত’ ধারণাটা ভেঙে দিতে চেয়েছেন। ‘শোভন কথ্যভাষা’ বলে কিছু তিনি মানতে চাননি। ভাষাকে নতুন করে পরিসঞ্চালন করতে চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আসলে আমি ভাষাশিল্পী না।…আমি ভাষা সৌন্দর্যের প্রাসাদ তৈরি করতে চাই না।…আমি যাদের কথা বলি, যেভাবে বলি তাতে এই ভাষায় (কথ্যভাষা) প্রাণ থাকে।’ [সাক্ষাৎকার, আহমাদ মোস্তফা কামাল গৃহীত] এই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে অনেকে সাব-অল্টার্ন অ্যাপ্রোস খুঁজে পেতে পারেন। মার্কসীয় চিন্তাভাবনার লেখক হিসেবে সমাজে ভাষাগত কাঠামো বা বৈষম্য ভেঙে দেওয়ার প্রবণতার কথাও তোলা যেতে পারে। আবার বলা যেতে পারে তিনি ভাষার সাম্রাজ্যবাদীতা বা Linguistic imperialism-এর বিপক্ষে দাঁড়াতে চেয়েছেন।

ফলে আমরা দেখি শহীদুল জহির সাহিত্যে বাস্তবের মতো হুবহু চরিত্র নির্মিতি ও ব্যবহৃত ভাষা প্রয়োগে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি ভাষার দিক থেকে সাহিত্যকে আলাদা একটি নির্মাণ হিসেবে দেখতে চাননি। অর্থাৎ তিনি সচেতনভাবে শব্দসঙ্কোচন বা শব্দসম্প্রসারণ করেননি। যে শব্দ তার চারপাশে চরে বেড়াচ্ছিল, তিনি তাই কুড়িয়ে নিয়েছেন। শহীদুল জহিরের অগ্রজ কথাশিল্পী আবদুশ শাকুর তাঁর ‘গদ্যের কঙ্কাল’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলেছেন, ‘তারা (চরিত্ররা) প্রায়শ আমার ভাষা নকল করে। আমি তাদের ভাষা নকল করি না। করি না, কারণ ওদের ভাষা প্রায়শ নকল- আরোপিত বলেই নকল। ওদের আসল শব্দ হরণ করেছে শোষক সমাজ।’ এরপর আবদুশ শাকুর বলছেন, আর্টে কৃত্রিম বা আর্টিফিশিয়াল হওয়ার প্রয়োজন আছে। তাঁর এই বক্তব্য থেকে তাঁর ছোটগল্পে এই ‘তৈরি’ ভাষা ব্যবহারের পেছনে একটা সুচিন্তিত কারণ আমরা লক্ষ্য করি। কিন্তু শহীদুল জহির ঠিক এর বিপরীত অবস্থান থেকে লিখেছেন। তার কাঠামোটা তৈরি বটে, কিন্তু ভাষাটা নয়।

শহীদুল জহিরের ন্যারেটিভ প্রবণতা

শহীদুল জহিরের সমষ্টির বয়ানে গিয়ে সমস্যা একটা হয়েছে। সমষ্টির বয়ান জেন্ডার ভাবনা থেকে নিউট্রাল থাকেনি। এটা হয়ে উঠেছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের যৌথভাষা। বা কমন দৃষ্টিভঙ্গি। ফলে শক্তিশালী নারী চরিত্র শহীদুল জহিরে নেই। আলাদা করে শক্তিশালী পুরুষ চরিত্র আমাদের খোঁজার প্রয়োজন হয় না কারণ পুরো কাঠামোটাই পুরুষের। আবার শহীদুল জহিরকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রতিনিধিরূপে ভাবতে পারছি না এই কারণে যে, এই সমষ্টি মানবিক চেতনাকে সমন্বিত করে একটা বয়ান খাড়া করেছে।

মার্কসীয় দর্শনের কোনো লেখক লিখছেন জাদুবাস্তবতার কৌশল অবলম্বন করে। সাধারণত এমনটি ঘটে না। কারণ যারা লেখালেখির ভেতর দিয়ে সমাজ-কাঠামোর পরিবর্তন ঘটাতে চান বা লেখালেখিকে মুভমেন্ট হিসেবে নেন তারা যতটা সম্ভব কমুউনিকেটিভ থাকার জন্য সরল ও ঐতিহ্যগত টেকনিক অবলম্বন করেন। কিন্তু শহীদুল জহির তা করেননি। তিনি বক্তব্যের দিক দিয়ে সমাজ ও রাজনীতি সচেতন লেখক বটে। সেই অর্থে তার সমস্ত গল্পই পলিটিক্যাল বা সোশ্যাল এলিগরি। একটু প্যারাডক্স বলে মনে হতে পারে, তিনি বাস্তববাদী (Realist) লেখক কিন্তু লিখেছেন চেতনাপ্রবাহ বা ড্রিম-টেকনিক অবলম্বন করে। সমষ্টিগত পর্যবেক্ষণ লিখছেন একান্ত ব্যক্তিগত কথনের ভঙ্গিতে। অর্থাৎ গোটা সমষ্টিটাই যেন একক ব্যক্তি। কারণ আলাদা করে কারো কোনো বয়ান বা পর্যবেক্ষণ নেই সেখানে। এখান থেকে আমরা মিডিয়া, প্রযুক্তি ও পুঁজিবিপ্লবের সাথে সাথে ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতাবোধের বিলোপ ঘটতে দেখছি। শহীদুল জহির নিজের একাকীত্ববোধ থেকে ঠিক তাঁর বিপরীত অবস্থানে অর্থাৎ সমষ্টির কাছে ফিরে যেতে চেয়েছেন। এটা তাঁর নিজের একান্ত আকুতি হয়ে থাকতে পারে। হতে পারে তিনি ব্যক্তিকেন্দ্রিক আধুনিকতার বিপক্ষে। তবে এর সরল একটা উত্তর তিনি নিজে দিয়েছেন, ‘এটা (সমষ্টির বয়ান ব্যবহার করা) আমি করি, কারণ, এমন অনেক কিছুই বলা হয়, বা করা হয়, যেটা আমি পরে অস্বীকার করতে চাই- লেখক হিসাবে।…লেখক হিসাবে আমি সবকিছুর দায়িত্ব নিতে পারব না জেনেই জনশ্রুতির ওপর নির্ভর করি, সমষ্টিক আকারে বর্ণনা করি।’ [সাক্ষাৎকার,আহমাদ মোস্তফা কামাল গৃহীত] অর্থাৎ তিনি যা ইচ্ছা বলার স্বাধীনতা অর্জন করার জন্য এই বয়ানরীতি অবলম্বন করেন।

শহীদুল জহির জাদুবাস্তব-পরাবাস্তব নাকি রূপকথার কথক?

শহীদুল জহির জাদুবাস্তবতা বা কুহকী বাস্তবতার লেখক কিনা সেই প্রশ্ন তোলা উচিত হবে না। কারণ স্পষ্টতই তাঁর লেখায় জাদুবাস্তবতার উপকরণ আছে। তিনি সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে তিনি সচেতনভাবে জাদুবাস্তবতার বিষয়টি তাঁর গল্প-উপন্যাসে এনেছেন এবং সেটি তিনি গাবরিয়েল গারসিয়া মার্কেস থেকে গ্রহণ করেছেন। তিনি বলছেন, ‘জাদুবাস্তবতার ব্যাপারটা তো আমি মার্কেসের কাছ থেকে পেয়েছি। এবং এটা আমি গ্রহণ করেছি দুটো কারণে। প্রথমত, চিন্তার বা কল্পনার গ্রহণযোগ্যতার যে পরিধি সেটা অনেক বিস্তৃত হতে পারে বলে আমি মনে করি।…দ্বিতীয়ত, আমি আসলে বর্ণনায় টাইমফ্রেমটাকে ভাঙতে চাচ্ছিলাম…।’ [সাক্ষাৎকার, আহমাদ মোস্তফা কামাল গৃহীত]
কিন্তু শহীদুল জহিরকে পড়ার পর পাঠকের মনে স্বভাবতই প্রশ্ন চলে আসে- শহীদুল জহিরের জাদুবাস্তবতা কি মার্কেসীয় বা লাতিন সাহিত্যের জাদুবাস্তবতা? এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। হয়ত মোটাদাগে বলা যাবে, হ্যাঁ অথবা না। কিন্তু খতিয়ে দেখলে আমরা বুঝবো দুজনের জাদুবাস্তবতা এক নয়, আবার একও। অর্থাৎ বিষয়টি তর্ক ও তদন্তের।

আলোচ্য বিশ্লেষণের পর বলা চলে শহীদুল জহিরের গল্পে জাদুবাস্তবতা, পরাবাস্তবতা এবং রূপকথার বিষয় আছে। কিন্তু এমনভাবে এক ব্লেন্ডিংয়ের ভেতর দিয়ে যে তাকে আলাদা করা যায় না। আসলে জাদুবাস্তবতা, পরাবাস্তবতা এবং রূপকথা নিজেরাই প্রবণতার দিক থেকে খুব কাছাকাছি- একই বৃক্ষের তিন শাখা যেন। যে কারণে শহীদুল জহির তাঁর গুরু মার্কেস এবং ওয়ালীউল্লাহর চেয়ে দুর্বোধ্য হয়ে উঠেছেন। তাঁর গল্পকে একক কোনো সাহিত্য তত্ত্বের আলোকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা যাচ্ছে না। তাঁর সাহিত্যে বিনির্মাণের বিষয়টি এখানে পরিষ্কার হয়ে উঠেছে।
শহীদুল জহিরের গল্পে রূপকথা, মিথ, জাদুবাস্তবতা, পরাবাস্তবতা, কিউবিক ফর্মের ব্যবহার এবং ভাষা ও নির্মাণশৈলী বোঝার জন্য আমরা তাঁর টেক্সটকে ব্যবচ্ছেদ করে দেখতে পারি। আপাতত আমরা ‘ডুমুরখেকো মানুষ’ এবং ‘কাঠুরে ও দাঁড়কাক’ গল্পদুটিকে বেছে নিতে পারি।

সোর্স – মোজাফফর হোসেন, বাংলা ট্রিবিউন

বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি উপনিবেশ কীভাবে ভারত কে ভাঙলো?

ঔপনিবেশিক ইতিহাসে “বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি” শুধু একটি প্রশাসনিক অঞ্চল নয় এটি ছিলো একটি পরীক্ষাগার, যেখানে ব্রিটিশরা উপমহাদেশের উপর আধিপত্য কায়েমের মডেল তৈরি করে। এই প্রেসিডেন্সির গঠনের মধ্য দিয়েই যে ধরনের ভাষা, শ্রেণি, ধর্ম, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক বিভাজন শুরু হয়েছিল, তারই চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় ১৯৪৭ সালে ভারতের বিভাজনের মাধ্যমে।

১৭৬৫ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় “দিওয়ানি” বা রাজস্ব আদায়ের অধিকার পায়। এটি শুধু অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নয়, গভীর প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক দখলের সূচনা ছিল। এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করেই গঠিত হয় “বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি” যার আওতায় আসতো আজকের বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ওড়িশা ও অসমের কিছু অংশ। এটি ছিল বৃটিশদের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক একক, যেখানে শাসনের কাঠামো, কর-নীতি, এবং বিচারব্যবস্থার উপনিবেশিক প্যাটার্ন প্রথম বাস্তবায়িত হয়।

লর্ড ম্যাকলের “Minute on Indian Education” (১৮৩৫) অনুসারে, ইংরেজি শিক্ষিত একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে তোলা হয় যারা “রক্তে ভারতীয়, কিন্তু চিন্তায় ও মানসে ইংরেজ।” এই শ্রেণি, মূলত বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি থেকে গড়ে ওঠা নববঙ্গীয় মধ্যবিত্ত, অচিরেই প্রশাসনের নানান স্তরে স্থান পায়। কিন্তু এই শিক্ষানীতির মাধ্যমে গ্রামবাংলার কৃষক ও মুসলমান সমাজ বাইরে পড়ে যায়, উচ্চবর্ণ হিন্দু শিক্ষিত শ্রেণি একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করে। এর ফলশ্রুতিতে গড়ে ওঠে শিক্ষিত বনাম অশিক্ষিত, হিন্দু বনাম মুসলিম এবং নগর বনাম গ্রাম বিভাজন, যা পরবর্তীতে রাজনৈতিক বিভাজনের রূপ নেয়।

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনার সময় ব্রিটিশরা বাংলার মুসলমানদের ভিন্নতাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের দিকে ঝুঁকে যায় । পূর্ব বাংলা ও আসামকে আলাদা করে মুসলমান-প্রধান একটি প্রদেশ গঠন করা হয়, যাতে মুসলমানদের মধ্যে ব্রিটিশ অনুগত মনোভাব গড়ে ওঠে এবং হিন্দু জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রতিক্রিয়া রোধ হয়।

তবে বেশ কিছু সংকট এই বিভাজন আরও গভীর করে তোলে। মুসলমানদের কাছে “পূর্ব বাংলা” হয়ে উঠে সম্ভাবনার প্রতীক। হিন্দু সমাজের কাছে এটি ছিল জাতীয়তাবাদের ওপর আঘাত। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হলেও মানসিক বিভাজন থেকে যায় এবং “হিন্দু-মুসলিম” দ্বৈরথ রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা হয়ে ওঠে।

বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির মূল কেন্দ্র ছিল কলকাতা। সব শিল্প, শিক্ষা, বিচার, প্রশাসন কেন্দ্রীভূত ছিল এখানে। ফলে পূর্ববঙ্গের মানুষ উন্নয়ন ও প্রতিনিধিত্বে উপেক্ষিত থাকে। মুসলিম কৃষক ও নিম্নবিত্ত শ্রেণি ‘জাতীয় রাজনীতি’ থেকে দূরে সরে যায়। এখান থেকেই জন্ম নেয় মুসলিম লীগের মতো দল, যারা পূর্ববঙ্গের বঞ্চনার প্রশ্নকে ব্যবহার করে আলাদা রাষ্ট্রের দাবি জোরদার করে।

বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির সময় ব্রিটিশরা ফারসি বাদ দিয়ে বাংলা ও ইংরেজি চালু করে। কিন্তু এই বাংলা ভাষা ছিল উচ্চবর্ণ হিন্দু দ্বারা নির্মিত যেখানে মুসলমান সমাজের আঞ্চলিক ভাষা, ধারা, রীতি একপ্রকার অদৃশ্য হয়ে যায়। এই সাংস্কৃতিক বৈষম্য বহু মুসলমানের মধ্যে নিজস্বতা হারানোর ভয় গড়ে তোলে। এই চিন্তাগুলো পরবর্তীতে উঠে আসে আবুল কালাম আজাদ ও খিলাফত আন্দোলনের ভাষ্যকারদের মধ্যে যারা নিজেদের স্বতন্ত্র হিসেবে দেখাতে থাকেন।

বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির ভিতরেই ১৯৪৬ সালে ঘটে “Great Calcutta Killings”, যা হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গাকে সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় বাংলাকে ভেঙে পূর্ব বাংলা (পূর্ব পাকিস্তান, পরে বাংলাদেশ) এবং পশ্চিমবঙ্গ (ভারতের অন্তর্ভুক্ত) দুই ভাগ করা হয়। এই বিভাজন শুধুই ধর্মীয় ছিল না বরং উপনিবেশিক প্রশাসন, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও শ্রেণিবৈষম্যের দীর্ঘস্থায়ী ফলাফল।

বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি ছিল এমন এক সাংস্কৃতিক অঞ্চল, যেখানে একদিকে গড়ে উঠেছিল বাংলাভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ, অপরদিকে ধর্মভিত্তিক পরিচয়ও ধীরে ধীরে জোরালো হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, নজরুল, শামসুর রাহমান সকলেই বাঙালিত্বকে কেন্দ্র করে সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভাষা নির্মাণ করেন, কিন্তু ঔপনিবেশিক বিভাজন এই সাংস্কৃতিক ঐক্যকে ধীরে ধীরে ধর্মীয় সীমারেখায় রূপান্তরিত করে।

বাংলাভাষী হওয়া সত্ত্বেও একজন মুসলমান ও একজন হিন্দু বাঙালি আলাদা আলাদা রাজনৈতিক অভিজ্ঞান নিয়ে বেড়ে ওঠে। এই দ্বৈততা বাংলা ভাষাভাষীদের অভ্যন্তরীণ ঐক্যকে দুর্বল করে এবং ভারত ভাগের সময় ধর্ম চূড়ান্ত বিভাজকের ভূমিকা হয়ে দাঁড়ায়।

আজকের বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ দুই বাংলার সমাজে এখনো সেই ঐতিহাসিক বিভাজনের ছায়া রয়ে গেছে। রাজনৈতিক দল, পাঠ্যবই, ইতিহাসচর্চা সবখানেই অতীতের সেই প্রশাসনিক বিভক্তি ও সাংস্কৃতিক শেকড় নিয়ে টানাপড়েন চলছেই। বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি শুধু এক সময়কার উপনিবেশ নয়, এটি একটি জাতির সাংস্কৃতিক বিভক্তির প্রতীক, যার অভিঘাত ইতিহাস ছাড়িয়ে আজও সমাজ-রাজনীতিকে প্রভাবিত করছে।

বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি ছিলো মূলত এক উপনিবেশিক প্রকল্পের প্রতীক, যেখানে শাসনের নামে বিভাজন, উন্নয়নের নামে বৈষম্য এবং শিক্ষার নামে শ্রেণিবিচ্ছেদ তৈরি করা হয়। এই অঞ্চলটি শুধু প্রথম উপনিবেশ ছিল না, এটি ছিল সেই জমিন, যেখানে ভারত ভাগের বীজ অনেক আগেই রোপিত হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য যুদ্ধের শাস্তি পাচ্ছে বাংলাদেশ

ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির অধীনে বাংলাদেশসহ ছোট এশীয় দেশগুলোর ওপর সবচেয়ে কঠোর শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এই শুল্কের আনুষ্ঠানিক যুক্তি ছিল তথাকথিত ‘অন্যায্য বাণিজ্য ঘাটতি’ সংশোধন, যেখানে কোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্রে যতটা রপ্তানি করে, তার তুলনায় অনেক কম আমদানি করে।

তবে বিশ্লেষকরা ব্যাপকভাবে প্রশ্ন তুলেছেন এই ঘাটতির হিসাব ব্যবহারের যৌক্তিকতা নিয়ে। তাদের মতে, এই শুল্ক আসলে চীনকে শায়েস্তা করার ভূরাজনৈতিক কৌশলের একটি ছদ্মবেশী হাতিয়ার মাত্র। যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত তাদেরই লক্ষ্যবস্তু করেছে, যারা চীনের বিনিয়োগ বা যোগান ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলমান বাণিজ্য আলোচনা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মকর্তাদের মতে- বাংলাদেশ সেই সব দেশের একটি, যাদের ওয়াশিংটন চাপ দিচ্ছে নিজেদের উৎপাদনখাতের সাথে চীনা সরবরাহকারীদের সংযোগ বিছিন্ন করতে।

এই শুল্ক হুমকি বাংলাদেশকে এক কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলেছে—একদিকে সবচেয়ে বড় ক্রেতা যুক্তরাষ্ট্র, অন্যদিকে সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী চীন। এভাবে বাংলাদেশকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধের সংঘাতে জড়িয়ে ফেলা হচ্ছে।

কর্মকর্তাদের মতে–প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ৩৫% হারে কঠোর শুল্ক আরোপ করেছেন, কারণ এসব পণ্যে চীনা কাঁচামালের মাত্রা অত্যন্ত বেশি। তাঁরা বলছেন–এ পদক্ষেপ চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর কৌশলের অংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ চীন থেকে ১৬.৬৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে, যা মোট আমদানি ব্যয়ের ২৬.৪%। এর মধ্যে ৮০ শতাংশের বেশি কাঁচামাল তৈরি পোশাক খাতের—যেমন কাপড়, কেমিক্যাল ও আনুষঙ্গিক উপকরণ।

এই নির্ভরশীলতাই বাণিজ্য বিরোধের মূল কারণ। যুক্তরাষ্ট্র কঠোর ‘রুলস অব অরিজিন’ (Rules of Origin বা RoO) প্রস্তাব করেছে, যেখানে মার্কিন বাজারে প্রবেশের জন্য কোনো পণ্যে ৪০% স্থানীয় মূল্য সংযোজন থাকতে হবে।

বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান স্বীকার করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রস্তাব বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ এতে অত্যন্ত বেশি স্থানীয় মূল্য সংযোজনের শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে।

এর চাপ সবচেয়ে বেশি পড়বে গার্মেন্টস শিল্পের ওভেন (woven) খাতে, যা যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির বৃহত্তম অংশ। শিল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, আমেরিকান ভোক্তাদের জন্য তৈরি ট্রাউজার ও শার্টের মতো পণ্যের প্রায় ৭০% ওভেন কাপড়ই চীন থেকে আমদানি করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি এখানেই থেমে থাকেনি। তারা বাংলাদেশের শুল্কব্যবস্থাকেও তাদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার আহ্বান জানিয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত দেশগুলোর জন্য কম শুল্ক এবং যারা যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্কের আওতায়, তাদের জন্য বেশি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব রয়েছে।

এই প্রস্তাব সরাসরি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) ‘সবচেয়ে অনুকূল জাতি’ (MFN) নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক, যেখানে সব সদস্য দেশকে সমান শুল্ক হারে পণ্য আমদানির অধিকার দেওয়া হয়।

এই কঠিন প্রস্তাবের মুখে ঢাকা আপসের চেষ্টা করেছে। কঠোর রুলস অব অরিজিন বা শুল্ক সামঞ্জস্যের বিষয়ে একমত না হয়ে বাংলাদেশি আলোচকরা বিকল্প হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও বেশি পণ্য আমদানি করার প্রস্তাব দিয়েছেন, যেন বাংলাদেশ-পক্ষে ৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি কমানো যায়। এ লক্ষ্যে তারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি এলএনজি, তুলা, সয়াবিন ও বোয়িং বিমানের অর্ডার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

আলোচনায় শুধু বাণিজ্য নয়, নিরাপত্তা ও বিনিয়োগসংক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ উঠে এসেছে। বাংলাদেশের কর্মকর্তারা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের আলোচকরা তাদের বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিয়ে নিশ্চয়তা চেয়েছেন এবং সম্প্রতি বাংলাদেশে চীনা পুঁজি প্রবাহ বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বাংলাদেশী শিল্পপ্রতিষ্ঠানে চীনা মালিকানা বাড়ার বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী দুর্বলতা, মেধাস্বত্ব আইন এবং শ্রম অধিকার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।

ঢাকাভিত্তিক থিংক-ট্যাংক ‘পলিসি এক্সচেঞ্জ’-এর চেয়ারম্যান মসরুর রিয়াজ এ প্রসঙ্গে বলেন–চলমান এই আলোচনা শুধু বাণিজ্য নয়, বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের গভীরভাবে সম্পৃক্ত।

Minimal Phone – কীভাবে বদলে দিয়েছে মনোযোগের বিজ্ঞান?

এখনকার সময়ে মোবাইল ফোন আমাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সঙ্গী। কিন্তু সেই সঙ্গী যখন আমাদের মনোযোগ, ঘুম, সম্পর্ক এমনকি আত্মপরিচয়ের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে, তখন প্রশ্ন ওঠে আমরা কি আসলেই নিয়ন্ত্রণে আছি? এই প্রশ্ন থেকেই ডিজিটাল মিনিমালিজম ধারণার জন্ম। আর এই ধারণার মূর্ত রূপ হচ্ছে Minimal Phone, এটি কেবল একটি ফোন নয়, একপ্রকার দর্শন।

Minimal Phone সেইসব মানুষের জন্য, যারা প্রযুক্তিকে উপভোগ করতে চায় কিন্তু প্রযুক্তির দাস হতে চায় না। যারা বিশ্বাস করে প্রযুক্তি থাকা দরকার, কিন্তু সেটি যেন নীরব সহচর হয়, নয় কোন মনোযোগ চোর।

Minimal Phone-এর ডিজাইন অনবদ্য। কোনো বাড়তি সৌন্দর্য নেই, আবার একেবারে নির্লিপ্তও নয়। মেটাল ফ্রেম, রিসাইকেলযোগ্য ম্যাট ফিনিশ ব্যাক, আর এক ধরনের Monochrome OLED ডিসপ্লে, যা চোখের ওপর চাপ কমায় এবং আলো কম থাকা পরিবেশেও আরামদায়ক অভিজ্ঞতা দেয়। এই ফোনে নেই হোম স্ক্রিনের কোনো থিম, অ্যানিমেশন, বা রঙিন আইকন। বরং প্রতিটি জিনিস এমনভাবে উপস্থাপিত, যেন আপনি শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় কাজটি করে ফোনটি নামিয়ে রাখতে পারেন।

Minimal OS হল Android ভিত্তিক এক সংযত ও নিজস্ব অপারেটিং সিস্টেম। এখানে গুগল নেই, প্লে-স্টোর নেই, এমনকি ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারের কোন সুযোগই নেই। তবে কল, মেসেজ, নোট, ক্যালেন্ডার, ঘড়ি, রিমাইন্ডার, সিম্পল ম্যাপ, মিউজিক এবং অফলাইন বুক রিডার দেওয়া আছে যাতে আপনি প্রয়োজনীয় কাজগুলো করতে পারেন।

এছাড়া এ ফোনে “ফোকাস মোড” একটি বিশেষ ফিচার, যেখানে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সবরকম ডিসট্র্যাকশন বন্ধ রাখা যায়। জরুরি কল ছাড়া কিছুই ঢুকবে না এমণ একটি মনোযোগ-রক্ষাকারী পরিবেশ তৈরি হয়। আরও চমকপ্রদ বিষয় হলো, Minimal Phone-এ কোনো “pull to refresh” অপশন নেই। আপনি নিজেই স্ক্রল করে নতুন কিছু খুঁজে পেতে পারবেন না—কারণ এই ফোনে খোঁজার কিছু নেই, যা আপনাকে চক্রের মতো আটকে রাখে।

ফোনটির ভিতরে একটি মিড-রেঞ্জ Snapdragon প্রসেসর ব্যবহার করা হয়েছে, যা অ্যাপের প্রয়োজন অনুযায়ী যথেষ্ট দ্রুত। ৪ জিবি র‍্যাম এবং ৬৪ জিবি ইন্টারনাল স্টোরেজসহ এতে আপনি নোট, মিউজিক, ইমেইল (সীমিতভাবে) ব্যবহার করতে পারবেন। ৬.১ ইঞ্চির ডিসপ্লে হলেও এটি Full HD নয়, কারণ ডিভাইসটির লক্ষ্য চোখ ধাঁধানো স্ক্রীন নয় বরং ব্যবহারকারীর চোখকে বিশ্রাম দেওয়া। বডি হালকা, হাতে ধরা আরামদায়ক এবং পকেটের জন্য একেবারে আদর্শ সাইজ। দীর্ঘ সময় ব্যবহারে ক্লান্তি আসে না।

এত কম পাওয়ার-ড্রেইনিং সফটওয়্যার ও ডিসপ্লে ব্যবস্থার কারণে Minimal Phone-এর ব্যাটারি পারফরমেন্স দারুণ। ৪,০০০ mAh ব্যাটারিতে সহজেই ৪ থেকে ৫ দিন ব্যাকআপ পাওয়া যায়। আপনি যদি কেবল কল, নোট, বই পড়া ও occasional ম্যাপ ব্যবহার করেন তবে এক সপ্তাহও চলে যেতে পারে। চার্জিং ব্যবস্থাও উন্নত, USB-C চার্জিং, দ্রুত চার্জ হয় এবং কিছু মডেলে ওয়্যারলেস চার্জিংও সমর্থন করে।

Minimal Phone ক্যামেরা রেখেছে শুধুমাত্র কার্যকর প্রয়োজনীয়তা হিসেবে। ৮ মেগাপিক্সেল ব্যাক ক্যামেরা ও ৫ মেগাপিক্সেল ফ্রন্ট ক্যামেরা দিয়ে আপনি ডকুমেন্ট স্ক্যান বা সহজ ছবি তুলতে পারবেন, কিন্তু এর মাধ্যমে ইনস্টাগ্রাম-গ্রেড সেলফি তুলতে পারবেন না। এটা ইচ্ছাকৃতভাবেই ডিজাইন করা, কারণ ছবিকে এখানে স্মৃতি নয়, বরং তথ্যের বাহক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ভিডিও প্লেব্যাক সীমিত, এবং কোনো ইউটিউব, নেটফ্লিক্স বা স্ট্রিমিং অ্যাপও নেই।

এই ফোন এখনো mass production-এ আসেনি। এটি প্রি-অর্ডার ভিত্তিক এবং বছরে কয়েকবার মাত্র ১০০০-২০০০ ইউনিট ছাড়া হয়। ফোনটির দাম গড়ে ৩৫০-৪৫০ ডলার, যা একটি সাধারণ মিডরেঞ্জ স্মার্টফোনের দামের কাছাকাছি। তবে যারা এই ফোনের দর্শনে বিশ্বাসী, তাদের মতে এটি একটি মোবাইল আসক্তি থেকে মুক্তির বিনিময় মূল্য বিনিয়োগ।

Minimal Phone-এর সাথে সবচেয়ে বেশি তুলনা হয় Light Phone-এর, যেটিও একইভাবে ডিজিটাল মিনিমালিজমকে প্রমোট করে। তবে Light Phone অনেক বেশি সীমাবদ্ধ। স্ক্রিন ছোট, ম্যাপ বা নোট অ্যাপ নেই, এমনকি টাইপ করা কষ্টকর। অন্যদিকে Minimal Phone আরও ভারসাম্যপূর্ণ, স্মার্ট আর মিনিমাল এর মাঝের এক সূক্ষ্ম রেখা।

Minimal Phone কেবল একটা ফোন নয়, এ এক প্রযুক্তি-দর্শনের প্রতিফলন। যেখানে মানুষ নিজের মনোযোগ, সময়, ও উপস্থিতিকে আবার নিজের দখলে আনার চেষ্টা করে। যারা মানসিক প্রশান্তি খোঁজেন, প্রযুক্তির শৃঙ্খলা চান এবং বাস্তব জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে চান, তাদের জন্য এটি হতে পারে এক নতুন দিগন্ত। এই যুগে যেখানে আমরা স্মার্টফোনে দম বন্ধ হয়ে পড়েছি, সেখানে Minimal Phone যেন এক মুক্ত বাতাস। এটা শুধুই একটি গ্যাজেট নয়, এটা এক ধরনের জাগরণ।

“শিল্প সৃষ্টি আনন্দের কিছু নয়” : এবেচো মুসলিমোভা

তিনি শিল্প সৃষ্টিকে মানসিক সংঘর্ষের মঞ্চ হিসেবে দেখান এবং সমসাময়িক চিত্রকলা ও কার্টুনিশ শৈলীতে শারীরিক-মানসিক জটিলতাগুলো সাহসিকতার সঙ্গে প্রকাশ করে শিল্পী জীবনের সত্য উন্মোচন করেন।

প্রশ্ন: মুসলিমোভা, বহু বছর ধরে আপনার শিল্পচর্চা একটি চরিত্র “ফাতেবি”-কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। আপনি কি তাকে আপনার বিকল্প সত্তা (alter ego) বলে মনে করেন?

: না, আমি তাকে বিকল্প সত্তা বলব না। হয়তো বলা যায়, তিনি একটি আত্মপ্রতিকৃতি, কিন্তু এমন এক আত্মপ্রতিকৃতি, যা আমি নিজে না। একটা অঙ্কন, সমতল এবং ছায়াবিহীন রেখাচিত্র, আর আমি খুব সতর্কভাবে তাকে ওই সমতল রেখাতেই রাখি। সেটি আমার এক ধরনের সারোগেট সেল্ফ বা নিজের জন্য তৈরি একটি যন্ত্রের মতো। এটা এমন সব আবেগ বা মানসিক অভিজ্ঞতাকে চ্যাপ্টা করে প্রকাশ করতে সাহায্য করে, যেগুলো আমার ভেতরে থাকে বলে ধরার মতো রূপ নেই। এক ধরনের সরল কৌতুক বলা যায়, যা এসব অস্পষ্ট অনুভূতিকে স্পষ্ট ও পাঠযোগ্য করে তোলে।

প্রশ্ন: আপনার মতে, সব ভালো শিল্প কি শিল্পীর জন্য এমন কিছুই করে?

: আমি বলতে পারি না! আমি শুধু আমার নিজের অভিজ্ঞতা নিয়েই বলতে পারি। তবে মাঝে মাঝে আমি যখন ফাতেবি সম্পর্কে বলি, তখন টের পাই আমি যেন আসলে শিল্প তৈরির ব্যাপারটাই বর্ণনা করছি। হয়তো এ কারণেই আমি তার সঙ্গে এত জড়িয়ে আছি, কারণ তিনি যেন আমার সৃষ্টির এক চূড়ান্ত প্রেরণা। আমি তাকে এমন একটি সত্তায় পরিণত করেছি যার নিজের ব্যক্তিত্ব আছে, নিজস্ব জগতে নিজের মতো করে টিকে থাকার ক্ষমতা আছে। তিনি আমাকে মাঝেমধ্যেই চমকে দেন! আর সব আঁকাজোকা আবার বারবার সেখানেই ফিরে যায়।

প্রশ্ন: গ্রাফিতি শিল্পী আন্দ্রে সারাইভা বলেছেন, তিনি তার চরিত্র Mr. A-কে লক্ষ লক্ষবার এঁকেছেন, যেন একটা বাধ্যতামূলক কাজ। আপনার ক্ষেত্রেও কি তেমন কিছু?

: আমার ক্ষেত্রে এটা বাধ্যতামূলক নয়। এটা কোনো দৈনন্দিন অনুশীলন নয়, যদিও মাঝে মাঝে সেটা এমন হয়। আমি তার প্রতি আসক্ত নই। আঁকা না লাগলে আমি বরং অন্য কিছু করতেই বেশি পছন্দ করি! আমি চাই একটা ভালো আঁকা হোক, তাই অনেক হাঁটাহাঁটি করি, শরীরেও, মাথার ভেতরেও। তারপর আঁকতে ভয় লাগে।

প্রশ্ন: কেন ভয় পান?

: কারণ যদি আমার মনের কথা ঠিকঠাক না হয়? কিছু আঁকার আগে অনেক প্রস্তুতি নিতে হয়। যেমন আমার সাম্প্রতিক প্রদর্শনীতে, ডেভিড জ্‌ভিরনার গ্যালারিতে, আমি উদ্বোধনের আগের রাত পর্যন্ত কাজ করেছি। কারণ এই চরিত্রটা এমন এক মাধ্যম, যার মাধ্যমে আমি আমার নিজের ভেতরের ও বাইরের ঘটনাগুলোর প্রতিফলন দেখি। এটা সময়োপযোগী। মহামারির সময় আমি অনেক ভাবতাম কীভাবে শরীর বা মনকে ঘিরে থাকা জায়গাগুলো সংকুচিত বা বিস্তৃত হয়। তখন আমাদের চারপাশের দেয়াল, যেগুলোর মধ্যে আমরা সময় কাটাতে বাধ্য হই, এই শারীরিক সীমাবদ্ধতা আরও তীব্র হয়ে উঠেছিল।

প্রশ্ন: ফাতেবিকে আমরা দেখেছি সিঁড়ির চারপাশে প্যাঁচানো, একটা বোতলের মধ্যে আটকে, জানালায় চেপে বসা, এমনকি শরীর থেকে তরল বের হচ্ছে এমন দৃশ্যেও। এসব ভঙ্গি কি আপনার আবেগী অবস্থার প্রতিফলন?

: আমি আঁকা শুরু করেছিলাম স্কুলজীবনের একটা পর্যায়ে খুব হতাশাজনক সময়ের পর। পরে বুঝেছি, আমি কিছু একটা বলার জন্য ভীষণ মরিয়া ছিলাম। আর হাস্যরস ছিল সেটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে প্রকাশের উপায়। কোনো ভাবনা কাজ করে না, যদি সেটা আমাকে হাসাতে না পারে। এমনকি সেটা যদি ভয়ংকর বা গা ছমছমে কিছু হয়, তবু তাতে এক ধরনের অন্ধকার রস থাকতে হয়, যাতে বোঝা যায়, সেটা কিছু বলছে, আবেগে ভেসে যাচ্ছে না। যেমন “লিকিং ভেসেলস” নামের ছবিটার কথাই ধরুন, তখন হয়তো আমার মনে হচ্ছিল আমি যেন নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছি। তবে আমি প্রায়ই এমনটা অনুভব করি। আমি আমার অনুভূতি তুলে ধরতে চাই না, বরং অনুভূতিগুলোকে উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করি রূপ ও গঠন ভাবতে, যা ভিজ্যুয়াল আর্টের মূল উপাদান।

প্রশ্ন: যাই হোক, শুনে মনে হচ্ছে এটা বেশ আবেগঘন একটা শ্রম।

: শিল্প তৈরি করাটা খুব সুখের কিছু না, আমার জন্য তো নয়। অনেক সৃজনশীল কাজের ক্ষেত্রেই এটা হয়তো সত্যি… কিন্তু আমি তাকে নিয়ন্ত্রণ করি, তাকে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ফেলি, আমি তার সমস্যাগুলো তৈরি করি, যেগুলোর জন্য তাকে নিজেই সমাধান হতে হয়। অথচ সেই সমাধানের সূত্রটাও সে-ই ধরে রাখে। যতক্ষণ না তিনি এমনভাবে প্রকাশিত হন, যা আমার কাছে অর্থবহ, আমি যেন এক ধরনের বন্দিত্বে থাকি। আমাদের সম্পর্ক এমনই, একটা বাঁধন। নিজের সত্তার সঙ্গে এই সম্পর্ক অনেক সময় এক ধরনের কারাগার। আবার সেটা উপভোগও করি।

প্রশ্ন: তাহলে কি কখনো বিরতি নিতে হয় আপনাকে?

: হ্যাঁ, ক্লান্ত হই। তখন আমি সেটি নিয়েও একটা ড্রয়িং করি! এটাই সেই বাঁধন। বহুবার মনে হয়েছে, “আর কত?” ভাবি, “ এবার ওকে মেরে ফেলি।” কিন্তু তারপর ভাবি, তাহলে তো এটা নিয়েই একটা ছবি আঁকতে পারি, ওকে মারার ছবি! তখন সেটা আঁকি, আর তাতে যেন মনে হয় পরের ছবির জন্য জায়গা তৈরি হয়ে গেল। সুতরাং আমি বিরতি নিই, নিজেকে বিরতি নিতে বলি, কিন্তু আবার ফিরে আসি।

প্রশ্ন: বারবার একই চরিত্র আঁকাটা কি একধরনের পরিচিত আরাম দেয়?

: একদমই। আমি তাকে চিনি। এই পরিচিতি একটা স্বস্তি দেয়, ভবিষ্যতে কী হবে তা না জানার ভয় কিছুটা কমে। আমি জানি, সে নিজের মতো করে পড়ে থাকতে পারবে। একটা চরিত্রকে একফ্রেমে আঁকার কিছু সীমাবদ্ধতা তো আছেই। শুরুতে আমি কিছু বিধিনিষেধ দিয়েছিলাম. যেমন কোনো ছায়া নয়, কারণ ছায়া বললে গভীরতা আসে, যেটা আমি চাইনি। তিনি কেবল কালো রেখা, যেন আলোকিত হয়ে ঝলসে যাওয়া, এই সীমার মধ্যে রেখেই আমি তাকে গড়ে তুলেছিলাম। কিন্তু পরে বুঝলাম, এসব নিয়ম তো আমরা নিজেরাই বানিয়েছি। আর আমার পক্ষে এখন এসব ভেঙে ফেলা সম্ভব, কারণ এখন তিনি এতটাই পরিণত, যে তার চারপাশে কিছু নতুন যোগ করলেও তিনি ঠিকঠাক থাকবেন। তিনি এখন যথেষ্ট শক্তিশালী।

প্রশ্ন: আপনি এখন রঙও ব্যবহার করছেন, এটাও কি সেই পরিসর বাড়ানোর অংশ?

: অনেক বছর আমি তাকে শুধু সাদা-কালোয় এঁকেছি। একটা সময় দেখলাম, যারা রঙ ব্যবহার করছে, তাদের প্রতি আমার হিংসে জন্মাচ্ছে! তখন বুঝলাম, সাদা-কালোর নিয়মটাও আমি নিজেই বানিয়েছি, কোনো বাস্তব কারণ ছিল না। তারপর রঙ ব্যবহার করতে শুরু করলাম, কিন্তু ভাবলাম রঙ কীভাবে সঠিকভাবে ব্যবহার করব? কারণ তিনি তো সবসময় একা থাকেন, তাই রঙ যেন তার পাশে আরেকটা চরিত্রের মতো এক ধরনের ক্যামিও। কিছু ছবিতে রজার র‌্যাবিট-এর মতো একটা ভাব হয়, যেখানে সে রঙিন জগতের সঙ্গে মিশে যেতে পারে, রঙের সঙ্গেও কথা বলতে পারে যেন।

প্রশ্ন: সময় নিয়ে ধীরে ধীরে নতুন জিনিস যোগ করাটা কি আপনার পছন্দের পদ্ধতি? আপনি কি কখনো নতুন কোনো চরিত্র যোগ করার কথা ভাবেন?

: এই ধীর গতিটাই আমার খুব পছন্দ, এটা খুব স্বাভাবিকভাবে এগিয়ে যায়। আমার জন্য এটা দরকার। আমি মনে করি অন্য চরিত্রটা হচ্ছে সেই স্থানবিশেষ স্থাপত্য বা ঘর, যেখানে কাজগুলো রাখা হয়, আর দর্শকের সঙ্গে সম্পর্কটা গড়ে ওঠে। “ফাতেবি ডাইজেস্ট”-এর জন্য আমি একটাই আকারে ছবি এঁকেছি, একইরকমভাবে ফ্রেম করেছি, তাই সেগুলো যেকোনো জায়গায় রাখা যায়। কিন্তু প্রদর্শনীর দ্বিতীয় কক্ষে, দুটি বড় ছবি ও একটি মিউরাল ছিল। মিউরালটা পুরো দেয়ালে আঁকা হওয়ায় সেটি নির্দিষ্ট স্থানকেন্দ্রিক ছিল। আমি মনে করি, সেই স্থানটিই আরেকটা চরিত্রে পরিণত হয় যার সঙ্গে ফাতেবির সম্পর্ক তৈরি হয়। আর আমি সেই দিকটা নিয়েই ভবিষ্যতে কাজ করতে আগ্রহী।

Emma Robertson,

Executive Editor, The Talks

উপমহাদেশে ব্রিটিশদের মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা

আমরা যখন ব্রিটিশ ভারতের উপনিবেশিক ইতিহাসের কথা ভাবি, তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে লুঠতরাজ, প্রশাসনিক শোষণ, কিংবা শিক্ষাগত সংস্কার।কিন্তু ইতিহাসের এক গোপন স্তর আছে, যেখানে ঘটে গেছে এমন কিছু ঘটনা, যেগুলো না পুরোদস্তুর বিজ্ঞানের আওতায় পড়ে, না শুধুই লোককথা। আজ আলোচনা করবো এমনই এক অধ্যায় হিপনোসিস ট্রায়ালস বা ব্রিটিশদের বাংলায় মননিয়ন্ত্রণ বা সাইকোলজিক্যাল এক্সপেরিমেন্ট চালানোর প্রচেষ্টা নিয়ে।

১৮৪৫ সালে কলকাতায় পোস্ট করা একজন স্কটিশ সার্জন, ড. জেমস এসডেইল (James Esdaile)। তিনি ছিলেন মেসমেরিজম বা হিপনোটিক ট্রান্স ব্যবহার করে ব্যথাবিহীন অস্ত্রোপচারে বিশ্বাসী। এটাই ছিল উপমহাদেশে হিপনোসিসের প্রথম দস্তাবেজভিত্তিক প্রয়োগ। কলকাতার আলিপুর জেলে তিনি শতাধিক কয়েদিকে মেসমেরিক ট্রান্সে পাঠিয়ে অস্ত্রোপচার করেন, কোনও রকম অ্যানেস্থেসিয়া ছাড়াই। ঘটনাটি শুধু ব্রিটিশ চিকিৎসাবিদ্যায় নয়, বরং উপনিবেশিক শাসনের মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন অধ্যায় সূচিত করেছিল।

ব্রিটিশরা শুধু হিপনোসিসকে চিকিৎসায় নয়, মনোসংবেদন, নিয়ন্ত্রণ ও শ্রেণিবিন্যাসের একটি উপায় হিসেবেও দেখতে শুরু করেছিল। ১৯ শতকের শেষে ও ২০ শতকের শুরুতে, কলকাতার মেডিক্যাল কলেজ থেকে শুরু করে প্রেসিডেন্সি জেল পর্যন্ত কিছু অঘোষিত পরীক্ষার দাবি পাওয়া যায় যেখানে বন্দীদের মানসিক অবস্থান বোঝার জন্য মনস্তাত্ত্বিক প্রশ্নাবলি, আচরণ পর্যবেক্ষণ এবং অজানা স্মৃতিচক্র বিশ্লেষণের কথা বলা হয়েছিল।

ব্রিটিশ প্রশাসনের ভেতরের কিছু রিপোর্টে “problematic native” বা “restless Bengali youth” নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে লেখা হয়, যা অনেক গবেষকের মতে, ব্যবস্থাপনার বাইরে সাইকোলজিক্যাল হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত দেয়।

স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মধ্যে যাঁরা কারাগারে ছিলেন, তাঁদের অনেকের স্মৃতিচারণায়, যেমন ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর আত্মজীবনীতে উল্লেখ আছে অদ্ভুত জিজ্ঞাসাবাদ, ঘুম ভেঙে তাড়িত করা, বারবার একই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি, এমনকি স্বপ্নের মাধ্যমে আত্মসমর্পণ ঘটানোর প্রচেষ্টা। যদিও এগুলো সরাসরি হিপনোসিস নয়, কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বিস্তারের নিরীক্ষা হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। এরকম কিছু কেস ফাইল ১৯৯৮ সালে ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স আর্কাইভ থেকে ডিক্লাসিফায়েড হয়, যেখানে “mental weakening before interrogation” বা “non-coercive psychological trial” শব্দগুলো দেখা যায়।

ড. এসডেইল-এর হিপনোটিক অস্ত্রোপচারের ঘটনাগুলি ইউরোপে আলোড়ন তোলে। কিন্তু অনেক গবেষক বলেন, এসব পরীক্ষা বন্দীদের সম্মতি ছাড়াই করা হতো। এদিকে কিছু সমসাময়িক হিন্দু পুরোহিত ও মুসলিম পীর হিপনোসিসকে অশুভ চর্চা বলেও আখ্যা দেন। David Arnold তাঁর গবেষণায় বলেন, এই ধরনের চিকিৎসা কৌশল এক ধরনের “colonial spectacle” হয়ে উঠেছিল, যা দেখাত ব্রিটিশ বিজ্ঞান কিভাবে বন্য ভারতীয় দেহকে শৃঙ্খলিত করতে পারে। অর্থাৎ হিপনোসিস এখানে শুধু চিকিৎসা ছিল না, মানসিক দাসত্বের একটি প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কিংবা সুকুমার রায়ের লেখায় “মনোবিকার”, “পরামর্শহীন অবচেতনা”, “স্বপ্নদ্রষ্টা” ইত্যাদি চরিত্র বা বিষয়বস্তু উঠে এসেছে, যা সমসাময়িক সমাজে এই মানসিক ও অলৌকিক নিয়ন্ত্রণ তত্ত্বের অস্তিত্বকেই ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে, ইউরোপীয় মনোবিদদের (যেমন সিগমুন্ড ফ্রয়েড, জঁ মার্টিন শারকো) গবেষণাও তখন ভারতীয় উপনিবেশে প্রভাব ফেলতে শুরু করে। কলকাতার কিছু ব্রিটিশ মনোচিকিৎসক ‘Hypnotic Catalepsy’ ও ‘Suggestion Therapy’ নিয়ে লেখালেখি করেন, যাদের গবেষণা ম্যাড্রাস মেডিকেল কলেজ ও বোম্বে ইউনিভার্সিটির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে, ব্রিটিশরা কি হিপনোসিস বা মননিয়ন্ত্রণকে কেবল চিকিৎসা বা শিক্ষা প্রয়োগে ব্যবহার করেছিল, না কি এর পেছনে ছিল আরও গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য? উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ফুকোর বিশ্লেষণে যেতে হবে, যেখানে শাসক শ্রেণি শরীর ও মনের উপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপনের জন্য জ্ঞান ও চিকিৎসা কে উপায় হিসেবে ব্যবহার করে। অর্থাৎ হিপনোসিস ছিল শুধু অ্যানেস্থেসিয়া নয়, বরং জ্ঞানচর্চা ও ক্ষমতার ছদ্মবেশে মনস্তাত্ত্বিক বন্দিত্ব।

ব্রিটিশ মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণ কৌশলের বিরুদ্ধে ভারতীয় বুদ্ধিজীবী সমাজ সরাসরি না বললেও, লেখালেখি, নাটক ও প্রবন্ধের মাধ্যমে এর বিপরীতে ‘আত্মচেতনার পুনর্দাবি’ করা শুরু হয়। ব্রহ্ম সমাজ, আর্য সমাজ এমনকি সুফি চেতনার ধারায়ও হিপনোটিক প্রভাব ও আত্মনিয়ন্ত্রণ নিয়ে চর্চা দেখা যায়।

হিপনোসিস বা মননিয়ন্ত্রণ নিয়ে যেসব ঘটনা বাংলায় ঘটেছিল, তা হয়তো খোলাখুলি নয়। কিন্তু ব্রিটিশদের নিষ্ঠুর শাসননীতি”র এক বিকল্প চেহারা হিসেবে এসব ঘটনাকে ব্যাখ্যা করা যায়। আমরা যখন স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস পড়ি, তখন যুদ্ধ, বিপ্লব আর সাহসের কথা দেখি। কিন্তু এর আড়ালে যে মনস্তাত্ত্বিক স্তর ছিল, চেতনার গভীরে ঢুকে মনকে নিয়ন্ত্রণ করার পরিকল্পনা, তা আজও আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়।

এই বিষয়টির ওপর গবেষণা করতে গেলে যেসব উৎস উঠে আসবে –
James Esdaile’s Hypnotic Surgery in British India – (Wikipedia, Edinburgh Medical Review)
Colonialism and the Body – David Arnold
The Psychology of Rule – Gyan Prakash
Freedom Fighter Memoirs – (e.g. Trilokya Nath Chakraborty, Barindra Kumar Ghosh)
British Archives on Intelligence Files – (Declassified, 1998)

বিশ্ববাজারে পোশাক রপ্তানি, চ্যালেঞ্জের মুখেও ২য় স্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ

গত বছর আগস্টে ক্ষমতার পালাবদলের পর প্রায় দুই মাস টানা শ্রমিক অসন্তোষে জর্জরিত ছিল তৈরি পোশাকশিল্প। কারখানায় গ্যাস সংকটও ছিল প্রকট। এ রকম আরও কিছু চ্যালেঞ্জের মধ্যেই বিশ্ববাজারে পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় স্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিভিউ ২০২৪’ প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। এ নিয়ে টানা চতুর্থবারের মতো বিশ্ববাজারে পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় স্থান ধরে রাখার কৃতিত্ব দেখাল বাংলাদেশ। পোশাক রপ্তানিতে বরাবরের মতো এবারও প্রথম স্থানে আছে চীন।

২০২৪ সালে বিশ্ব বাজারে পোশাক বিক্রি হয় ৫৫৭ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার। ডব্লিউটিওর পরিসংখ্যান বলছে, গত বছর চীন বিশ্ববাজারে ১৬৫ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। গত বছর বাংলাদেশ ৩৮ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন বা ৩ হাজার ৮৪৮ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী ভিয়েতনামের গত বছর পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩৩ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলার বা ৩ হাজার ৩৯৪ কোটি ডলার।

বিশ্ববাজারে প্রধান ১০ রপ্তানিকারক দেশের মধ্যে চতুর্থ তুরস্কের রপ্তানি প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের পোশাক। ৫ম ভারতের রপ্তানি ১৬ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারের পোশাক। কম্বোডিয়ার রপ্তানি পরিমাণ ছিল ১০ বিলিয়ন ডলারের মতো। পাকিস্তানের রপ্তানির পরিমাণ ছিল সাড়ে ৯ বিলিয়ন ডলারের মতো।

“গরিব কিন্তু সৎ” – লোককাহিনিতে শ্রেণি ব্যবস্থার নৈতিক ফাঁদ

“গরিব কিন্তু সৎ” এই বাক্যটি আমাদের অনেকের শৈশবের গল্প-ভান্ডারে ঠাঁই পাওয়া এক চিরচেনা চরিত্রের সংজ্ঞা। রাজপুত্রের পাশে নেই তার রাজ্য, নেই ধনসম্পদ, কিন্তু আছে সততা, দয়া, সাহস। লোককাহিনির এই দরিদ্র বালক পরবর্তীতে নিজের গুণ দিয়ে রাজ্য জিতে নেয়, রাজকন্যা পায় কিংবা পরিণামে ভালো মানুষের সম্মান লাভ করে। কিন্তু এই প্রতীকী কাঠামো সমাজে কতটা কার্যকর? আর কিসে এই ভাবনাটি জন্ম নিয়েছে? কীভাবে লোককাহিনিতে গরিব মানুষকে নৈতিকতার চূড়ান্ত প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয় এবং এই কৌশল কীভাবে সমাজে বাস্তব দরিদ্রতা ও শ্রেণিগত বৈষম্য আড়াল করে রাখে?

লোককাহিনির সবচেয়ে শক্তিশালী একটি বৈশিষ্ট্য হলো প্রতিকূলতাকে জয় করার গল্প। সমাজের নিচু তলার মানুষ যখন সমাজের ওপরতলার বিরুদ্ধে সফল হয়, তখন তা জনগণের কল্পনায় ন্যায়ের বিজয় হিসেবে দেখা দেয়। এ কারণে দরিদ্র চরিত্রকে সচরাচর গড়ে তোলা হয় নিরীহ, পরিশ্রমী, নির্ভরযোগ্য এবং সর্বোপরি ভালো মানুষ হিসেবে।

বাংলার অনেক গল্পে দেখা যায় একজন গরিব ছেলে তার সততা, কষ্ট ও ভালো ব্যবহারের মাধ্যমে রাজ্যের রাজকন্যা বা সুখের জীবন পেয়ে যায়। এখানে বিত্তহীনতা কখনোই সমস্যা নয়, বরং তা চরিত্র গঠনের একটি শুদ্ধ মাধ্যম। এই ধরণের উপস্থাপনা শ্রেণিবিভক্ত সমাজে একধরনের কল্পনানির্ভর ন্যায়ের অনুভূতি তৈরি করে, যা বাস্তবতাকে শান্তভাবে মেনে নেওয়ার এক ধরনের নৈতিক তৃপ্তি সরবরাহ করে।

গরিব মানুষকে ভালো হিসেবে দেখানোর পেছনে একধরনের নৈতিকীকরণ কৌশল কাজ করে। সমাজে শ্রেণিগত বিভাজন এবং বৈষম্যের বাস্তবতা যখন গভীর হয়ে ওঠে, তখন লোককাহিনি দরিদ্র চরিত্রকে অতি নৈতিক করে তুলতে চায়, যেন অর্থনৈতিক বঞ্চনার প্রতিকার না চাইলেও চলে। এতে গরিব মানুষের অবস্থান বদলায় না, বরং একটি স্বপ্ন তৈরি হয় যে ‘তুমি সৎ থাকো, একদিন ভাগ্য বদলাবেই।’ এই ন্যারেটিভ রাষ্ট্র বা উচ্চশ্রেণির কাছে সুবিধাজনক। কারণ এতে দরিদ্র মানুষের ভেতর একধরনের আত্মত্যাগমূলক চেতনা ও সন্তুষ্টি তৈরি হয়। তারা আর সংগ্রাম করতে চায় না, পরিবর্তনের কথা ভাবে না, কারণ তখন ভালো থাকা’ই তো বড় কথা!

সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, দরিদ্র মানুষ যতটা না ভালো, তার চেয়ে বেশি প্রতিরোধহীন এবং প্রান্তিক। তারা সমাজের কাঠামোগত শক্তি দ্বারা এতটাই নিয়ন্ত্রিত যে, তাদের “ভালো” থাকার গল্প আসলে একটি নীরবতা ও নিরুপায় অবস্থান থেকে তৈরি। একজন দিনমজুর তার বাচ্চাকে স্কুলে পাঠাতে পারে না। সে চুরি করে না, মিথ্যা বলে না, এমনকি ভিক্ষাও চায় না কারণ সে জানে, সমাজ তাকে সুযোগ দেবে না। এই আচরণ থেকে আমরা সততা ব্যাখ্যা করি, কিন্তু আদতে সেটা সিস্টেমিক অবদমন। একইভাবে, দরিদ্র মানুষকে ‘শান্ত’, ‘বিনয়ী’ বা ‘ধৈর্যশীল’ বলার মধ্য দিয়ে আমরা আসলে তার প্রতিবাদহীন অবস্থাকে রোমান্টিসাইজ করি। এই ধরনের কাহিনি একধরনের কল্পিত ন্যায়ের বোধ তৈরি করে, যার ফলে সমাজে অসমতা, শোষণ ও শ্রেণি-দমন সহজেই চোখ এড়িয়ে যায়।

লোককাহিনিতে ধনী চরিত্রগুলো বেশিরভাগ সময়েই অহংকারী, অলস বা অন্যায়কারী হিসেবে দেখানো হয়। অথচ বাস্তবে ধনীদের সংস্থান, শিক্ষা, আইনি ক্ষমতা সবকিছু থাকে এবং তারা অসৎ বা সৎ দুইই হতে পারে। কিন্তু লোকগল্পে দারিদ্র্যকে যদি সৎ বানানো হয়, তাহলে ধনীদের খারাপ দেখিয়ে একটি মনস্তাত্ত্বিক ভারসাম্য তৈরি করা যায়, যা পাঠক বা শ্রোতাকে সাময়িক তৃপ্তি দেয়। এইভাবে ফোকলোর আমাদের মনে একধরনের নৈতিক কল্পনা তৈরি করে, যেখানে মানুষ তাদের বাস্তব অসাম্যকে মেনে নিতে শেখে। বাস্তবের পরিবর্তে কল্পনার জয়ে মন সান্ত্বনা পায়।

আধুনিক সমাজে এই ধারার অব্যাহত প্রতিফলন কেমন?

বিজ্ঞাপন, নাটক, সিনেমা সবখানে এখনো এই গরিব কিন্তু ভালো মানুষের চিত্র ব্যবহৃত হয়। শিশুদের শেখানো হয়, “সৎ থেকে যাও, ভবিষ্যতে সব ঠিক হয়ে যাবে।” কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সৎ থেকেও অনেকে দরিদ্রতার কষ্ট থেকে বের হতে পারেন না, বরং অন্যরা সুযোগের সুবিধা নিয়ে এগিয়ে চলে যায়।

এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও দেখা যায় একজন গরিব রিকশাচালক কষ্ট করে সন্তানকে পড়াচ্ছে, এমন ভিডিও ভাইরাল হয়। লোকজন কাঁদে, শ্রদ্ধা জানায়, কিন্তু প্রশ্ন করে না কেন সে গরিব, রাষ্ট্র কী করল না করল। এভাবেই যুগ যুগ ধরে সততার রোমান্স দরিদ্রতার কাঠামোগত নির্মাণকে ঢেকে রাখে।

লোককাহিনির “গরিব কিন্তু সৎ ছেলে” চরিত্র আমাদের সমাজের একটি গভীর বঞ্চনা ও অসমতার বাস্তবতাকে আড়াল করে রাখে। এই কাহিনি আমাদের শেখায়, তুমি সৎ থাকলেই হবে কিন্তু বলতে দেয় না, “তুমি কেন গরিব, কেন তুমি সুযোগ পাও না, আর সেই সুযোগ কে কাড়ছে?”

তাই ফোকলোরকে কেবল ঐতিহ্য নয়, বরং সমাজের কাঠামো ও শ্রেণিচর্চার একটি রাজনৈতিক দলিল হিসেবেও পড়তে হবে। নইলে গল্প ভালো থাকবে, কিন্তু বাস্তবতা বঞ্চিতই থেকে যাবে।

Parasite – আধুনিক সমাজে দুই প্রান্তের সংঘর্ষ

“এই উৎসবের মৌসুমে যখন সমালোচকেরা একের পর এক ‘হট টেক’ দিচ্ছেন, তখন “আপনি এরকম সিনেমা আগে কখনো দেখেননি” এই কথাটা যেন এতটাই ক্লিশে হয়ে গেছে যে এখন আর কেউ সিরিয়াসলি নেয় না। এখন যেকোনো নতুন বড় বাজেটের সিনেমাকে “মাস্টারপিস” (অমর সৃষ্টি) বলা হয়, যেন খুব সহজ একটা বিশেষণ। কিন্তু আসলেই যদি এমন কোনো সিনেমা সামনে আসে যা অপ্রত্যাশিত, অসাধারণ ও দারুণভাবে নতুন কিছু বলছে, তখন আমরা সেটা বোঝাতে কী ভাষা ব্যবহার করব? আর যদি সত্যিকার অর্থে একটা “মাস্টারপিস” এসে পড়ে, একটা এমন চলচ্চিত্র যার প্রতিটি বাঁক চমকপ্রদ এবং যেটা নিয়ে গভীর লেখা তখনই সম্ভব হবে যখন স্পয়লার দেওয়ার ভয় থাকবে না, তখন কী করা উচিত?

আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব, কারণ বং জুন-হোর “Parasite” নিঃসন্দেহে বছরের সেরা চলচ্চিত্রগুলোর একটি। শুধু আমার কথাটা বিশ্বাস করুন।Bong Joon-ho এর আগেও শ্রেণিগত বৈষম্য নিয়ে ছবি বানিয়েছেন, যেমন “Snowpiercer” কিংবা “Okja”। তবে “Parasite” সম্ভবত তার সবচেয়ে সাহসী প্রচেষ্টা, যেখানে সে বর্তমান বিশ্বের কাঠামোগত বৈষম্যকে সরাসরি ও তীক্ষ্ণভাবে তুলে ধরেছেন। এটি একধরনের টোনাল জাগলিং, প্রথমে মনে হবে ব্যঙ্গচিত্র বা রসবোধসম্পন্ন সামাজিক নাটক; কিছু মজার ও চতুর প্রতারক চরিত্র ধাক্কা খাচ্ছে এক ধনী, অদ্ভুত পরিবারের সঙ্গে।

কিন্তু এরপর হঠাৎ করেই বং আমাদের এমন এক মোড় ঘুরিয়ে দেন যেখানে প্রশ্ন উঠে, “আসলে আমরা কী দেখছি?” এবং সেখান থেকে গল্প রক্তপাতের দিকে গড়ায়। গরিবেরা কি সত্যিই ধনীদের জগতে প্রবেশ করতে পারে? সিনেমার দ্বিতীয়ার্ধ যেন এক নিঃশ্বাসে টানা দেখা এক দুঃসাহসী অভিযাত্রা। কোথাও কোথাও মনে হতে পারে সিনেমাটি হয়তো ভেঙে পড়বে, অতিরিক্ত মোচড়ে হারিয়ে ফেলবে নিজেকে, কিন্তু বং সুনিপুণ দক্ষতায় সবকিছু এক সুতোয় বেঁধে রাখেন। আর ফলাফল? শ্বাসরুদ্ধকর!

কিম কি-উ ও তার পরিবার দারিদ্র্যের চরম কিনারায় বাস করে। তারা পিজার বাক্স ভাঁজ করে কিছু টাকা রোজগার করে, পাশের ক্যাফের ওয়াই-ফাই চুরি করে ইন্টারনেট চালায়, আর প্রতিবেশীদের জন্য ফগিং চললে জানালা খুলে রাখে, যাতে নিজের ঘরটাও ফ্রীতে কীটনাশক পায়।

কিম কি-উ’র জীবন বদলে যায় যখন তার এক বন্ধু তাকে একটি ইংরেজি টিউটরের কাজ অফার করে। বন্ধুটি বিদেশে যাচ্ছে, আর সে চায় না অন্য কেউ এসে তার পছন্দের মেয়েটিকে হাতিয়ে নিক। প্রশ্ন ওঠে, সে কেন কি-উকে এতটা বিশ্বাস করে, যদিও আমরা জানি এবং জানতে পারি সে আসলে কেমন।

কি-উ নিজের নাম বদলে “কেভিন” হয়ে যায় এবং শিক্ষক হিসেবে ঢুকে পড়ে পার্ক পরিবারে। মেয়েটি, পার্ক দা-হিয়ে (জং জি-সো), তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। কিন্তু কেভিনের লক্ষ্য আরও বড়। সে ধীরে ধীরে তার পুরো পরিবারকে পার্কদের বাড়িতে ঢোকাতে চায়। সে পার্কদের মা ইয়ন-কিয়ো-কে (যিনি অসাধারণ অভিনয় করেছেন) বোঝায় যে বাড়ির ছেলের একজন ‘আর্ট টিচার’ দরকার, আর সেই সুবাদে তার বোন ‘জেসিকা’ (পার্ক সো-দাম) চরিত্রে প্রবেশ করে। অল্প সময়ের মধ্যেই বাবা-মাও ঢুকে পড়ে পার্কদের ঘরে। সবকিছু যেন নিখুঁতভাবে চলছে কিম পরিবারের জন্য। পার্করাও খুশি মনে হয়। কিন্তু এরপরই শুরু হয় রূপান্তর।

“Parasite”-এর চিত্রনাট্য অবশ্যই অনেক প্রশংসা পাবে, কারণ এর টুইস্ট এবং টার্নগুলো অত্যন্ত চতুরভাবে লেখা। বং এবং হান জিন-ওন একসাথে এই চিত্রনাট্য তৈরি করেছেন। কিন্তু এই চলচ্চিত্রকে শুধু চিত্রনাট্যের মাধ্যমে বোঝা যাবে না, এটি মূলত ভিজ্যুয়াল ভাষার এক বিস্ময়কর প্রয়োগ।সিনেমাটোগ্রাফার কিয়ং-পিও হং (“Burning,” “Snowpiercer”) ও সেরা ডিজাইন টিমের সহায়তায় প্রতিটি দৃশ্য হয়ে উঠেছে দৃষ্টিনন্দন ও অর্থবহ।পার্কদের পরিষ্কার, শূন্য ও আধুনিক ঘরবাড়ির বিপরীতে কিম পরিবারের সংকীর্ণ, স্যাঁতসেঁতে বাসস্থান শুধু প্রতীকী নয়, চোখের আরামও বটে্‌ কিন্তু সেটা কখনও খুব জোরে দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে না। আর কিমদের বাসা যেহেতু আধা-ভূগর্ভস্থ, সেটা যেন তাদের অবস্থানকেই চিহ্নিত করে। তারা না পুরোপুরি নিচে, না পুরোপুরি ওপরে, আটকে আছে ধনী-গরিবের মধ্যে বিস্তৃত ফাঁকে।

“Parasite” শুধুই এক চমৎকার গল্প নয়, এর নিচে আছে গভীর সব রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষণ। কীভাবে ধনীরা দরিদ্রদের শ্রমের উপর নির্ভর করে টিকে থাকে, হোক সেটা গৃহপরিচারিকা, গাড়িচালক, বা শিক্ষকের রূপে, কিংবা আরও অন্ধকার কোনো বাস্তবতায়, তা এখানে অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। কিম পরিবার সেটা ভবিষ্যতের অপ্রত্যাশিত নিষ্ঠুরতায় নিজে গায়ের চামড়ায় টের পায়।

তবে এ চলচ্চিত্র কখনোই একরৈখিক বার্তা-বহনকারী সিনেমা হয়ে ওঠে না। বরং এর ভেতরেই আছে একধরনের আনন্দ, আর সেই আনন্দটাই আবার দুঃখের ছায়া ফেলে। আমি নিজেও জানি না ঠিক কীভাবে এটা সম্ভব, কিন্তু “Parasite” এমন এক নিখুঁতভাবে গাঁথা কাজ যেখানে প্রতিটি দৃশ্য উপভোগ্য, আর সেই আনন্দে ভেসে যাওয়ার পরেও মাথায় ঘুরতে থাকে বং জুন-হোর বলার বিষয়গুলো। বিশেষ করে শেষ কয়েকটি দৃশ্য যেগুলো হৃদয় বিদারক এবং দীর্ঘকাল ধরে আপনার মনে গেঁথে থাকবে।

এই সিনেমা নিঃসন্দেহে বছরজুড়ে আলোচনার জন্ম দেবে। আর আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেবে যে বং জুন-হো বিশ্বের অন্যতম সেরা নির্মাতা।আপনি কখনও এমন কোনো সিনেমা দেখেননি। আচ্ছা… এবার আমি নিজেই সেই ক্লিশে কথাটা বলে ফেললাম। কিন্তু এবার সেটা সত্যি।

– Brian Tallerico
Managing Editor of RogerEbert.com