গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অভিযানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে প্রতিবেদন দেওয়ায় জাতিসংঘের বিশেষ দূত ফ্রানচেসকা আলবানিজের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন।
এ নিষেধাজ্ঞার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে আলবানিজের যদি কোনো সম্পদ থেকে থাকে, তা জব্দ করা হবে। এ ছাড়া তাঁর যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণও সীমিত হয়ে পড়বে।
গত বুধবার এক বিবৃতিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এ ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, এই ইতালীয় আইনজীবী (আলবানিজ) যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যুদ্ধ চালাচ্ছেন।
গত ৩০ জুন প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ফ্রানচেসকা আলবানিজ ৬০টির বেশি কোম্পানির নাম প্রকাশ করেন। যার মধ্যে আছে মার্কিন টেক জায়ান্ট গুগল, অ্যামাজন ও মাইক্রোসফট। আলবানিজ বলেন, এসব কোম্পানি ‘ইসরায়েলের দখলদার অর্থনীতিকে একধরনের গণহত্যার অর্থনীতিতে রূপান্তর’ করতে ভূমিকা রাখছে।
প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ও জাতীয় বিচারব্যবস্থাকে এসব কোম্পানির নির্বাহী ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচার করার আহ্বান জানানো হয়। জাতিসংঘের সদস্যদেশগুলোকে তিনি এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও সম্পদ জব্দ করারও সুপারিশ করেন।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও অভিযোগ করেন, আলবানিজ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সঙ্গে যোগাযোগ করে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তাঁর তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির সুপারিশ করেছেন। এ অভিযোগপত্র গত নভেম্বরে দাখিল করা হয়।
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা ও আফগানিস্তানে মার্কিন অপরাধ তদন্তে যুক্ত থাকায় গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের চারজন বিচারকের ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
এ ছাড়া গত মাসে ট্রাম্প প্রশাসন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসকে একটি চিঠি পাঠিয়ে আলবানিজকে তাঁর পদ থেকে অপসারণের আহ্বান জানিয়েছে।
রুবিও অভিযোগ করেন, আলবানিজ প্রকাশ্যে ইহুদিবিদ্বেষ, সন্ত্রাসবাদের প্রতি সমর্থন এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও পশ্চিমা বিশ্বকে ঘৃণা করেন। তবে আলবানিজ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
২০২২ সালের মে মাস থেকে আলবানিজ অধিকৃত ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে জাতিসংঘের বিশেষ দূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ দায়িত্ব পালনকালে তিনি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইনি মতামত ও প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন। ইসরায়েলের মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যে কয়েকজন জোরালো দাবি জানিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে তিনি অন্যতম।
আলবানিজের প্রকাশিত প্রতিবেদনের মধ্যে আছে ফিলিস্তিনে আত্মনিয়ন্ত্রণ আইনের লঙ্ঘন; ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার ব্যাপক বঞ্চনা; ফিলিস্তিনি শিশুদের অধিকার লঙ্ঘন ও ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের গণহত্যার অভিযোগসংক্রান্ত দুটি প্রতিবেদন।
গত বছরের মার্চে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে উপস্থাপিত এক প্রতিবেদনে আলবানিজ বলেন, গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড গণহত্যার পর্যায়ে পৌঁছেছে—এমন বিশ্বাস করার যৌক্তিক ভিত্তি আছে।
আলবানিজ সেখানে গণহত্যার প্রমাণ হিসেবে গণহারে হত্যা, বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস এবং এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি, যেগুলো ফিলিস্তিনিদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে—এসব বিষয় তুলে ধরেন।
ফ্রানচেসকা আলবানিজের জন্ম ইতালির আরিয়ানো ইরপিনো শহরে, ১৯৭৭ সালে। তিনি একজন মানবাধিকার আইনজীবী। আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে তাঁর অভিজ্ঞতা দুই দশকের বেশি। তিনি পিসা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক এবং লন্ডনের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ (এসওএএস) থেকে মানবাধিকার আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
আলবানিজ জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনারের কার্যালয়ে মানবাধিকার কর্মকর্তা হিসেবে চার বছর কাজ করেছেন। এ ছাড়া জেরুজালেমে তিনি ফিলিস্তিনে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থায় (ইউএনআরডব্লিউএ) আইন কর্মকর্তা হিসেবেও কাজ করেছেন।
আলবানিজ ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের আইনি পরিস্থিতি নিয়ে অনেক লেখা লিখেছেন। তিনি ‘প্যালেস্টাইনিয়ান রিফিউজিস ইন ইন্টারন্যাশনাল ল’ (২০২০) ও ‘জে’অ্যাকিউজ’ (২০২৪) নামের দুটি বইয়ের সহলেখক। তিনি গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের সংগঠন ‘গ্লোবাল নেটওয়ার্ক অন দ্য কোয়েশ্চেন অব প্যালেস্টাইন’–এর সহপ্রতিষ্ঠাতা।


