“গরিব কিন্তু সৎ” এই বাক্যটি আমাদের অনেকের শৈশবের গল্প-ভান্ডারে ঠাঁই পাওয়া এক চিরচেনা চরিত্রের সংজ্ঞা। রাজপুত্রের পাশে নেই তার রাজ্য, নেই ধনসম্পদ, কিন্তু আছে সততা, দয়া, সাহস। লোককাহিনির এই দরিদ্র বালক পরবর্তীতে নিজের গুণ দিয়ে রাজ্য জিতে নেয়, রাজকন্যা পায় কিংবা পরিণামে ভালো মানুষের সম্মান লাভ করে। কিন্তু এই প্রতীকী কাঠামো সমাজে কতটা কার্যকর? আর কিসে এই ভাবনাটি জন্ম নিয়েছে? কীভাবে লোককাহিনিতে গরিব মানুষকে নৈতিকতার চূড়ান্ত প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয় এবং এই কৌশল কীভাবে সমাজে বাস্তব দরিদ্রতা ও শ্রেণিগত বৈষম্য আড়াল করে রাখে?
লোককাহিনির সবচেয়ে শক্তিশালী একটি বৈশিষ্ট্য হলো প্রতিকূলতাকে জয় করার গল্প। সমাজের নিচু তলার মানুষ যখন সমাজের ওপরতলার বিরুদ্ধে সফল হয়, তখন তা জনগণের কল্পনায় ন্যায়ের বিজয় হিসেবে দেখা দেয়। এ কারণে দরিদ্র চরিত্রকে সচরাচর গড়ে তোলা হয় নিরীহ, পরিশ্রমী, নির্ভরযোগ্য এবং সর্বোপরি ভালো মানুষ হিসেবে।
বাংলার অনেক গল্পে দেখা যায় একজন গরিব ছেলে তার সততা, কষ্ট ও ভালো ব্যবহারের মাধ্যমে রাজ্যের রাজকন্যা বা সুখের জীবন পেয়ে যায়। এখানে বিত্তহীনতা কখনোই সমস্যা নয়, বরং তা চরিত্র গঠনের একটি শুদ্ধ মাধ্যম। এই ধরণের উপস্থাপনা শ্রেণিবিভক্ত সমাজে একধরনের কল্পনানির্ভর ন্যায়ের অনুভূতি তৈরি করে, যা বাস্তবতাকে শান্তভাবে মেনে নেওয়ার এক ধরনের নৈতিক তৃপ্তি সরবরাহ করে।
গরিব মানুষকে ভালো হিসেবে দেখানোর পেছনে একধরনের নৈতিকীকরণ কৌশল কাজ করে। সমাজে শ্রেণিগত বিভাজন এবং বৈষম্যের বাস্তবতা যখন গভীর হয়ে ওঠে, তখন লোককাহিনি দরিদ্র চরিত্রকে অতি নৈতিক করে তুলতে চায়, যেন অর্থনৈতিক বঞ্চনার প্রতিকার না চাইলেও চলে। এতে গরিব মানুষের অবস্থান বদলায় না, বরং একটি স্বপ্ন তৈরি হয় যে ‘তুমি সৎ থাকো, একদিন ভাগ্য বদলাবেই।’ এই ন্যারেটিভ রাষ্ট্র বা উচ্চশ্রেণির কাছে সুবিধাজনক। কারণ এতে দরিদ্র মানুষের ভেতর একধরনের আত্মত্যাগমূলক চেতনা ও সন্তুষ্টি তৈরি হয়। তারা আর সংগ্রাম করতে চায় না, পরিবর্তনের কথা ভাবে না, কারণ তখন ভালো থাকা’ই তো বড় কথা!
সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, দরিদ্র মানুষ যতটা না ভালো, তার চেয়ে বেশি প্রতিরোধহীন এবং প্রান্তিক। তারা সমাজের কাঠামোগত শক্তি দ্বারা এতটাই নিয়ন্ত্রিত যে, তাদের “ভালো” থাকার গল্প আসলে একটি নীরবতা ও নিরুপায় অবস্থান থেকে তৈরি। একজন দিনমজুর তার বাচ্চাকে স্কুলে পাঠাতে পারে না। সে চুরি করে না, মিথ্যা বলে না, এমনকি ভিক্ষাও চায় না কারণ সে জানে, সমাজ তাকে সুযোগ দেবে না। এই আচরণ থেকে আমরা সততা ব্যাখ্যা করি, কিন্তু আদতে সেটা সিস্টেমিক অবদমন। একইভাবে, দরিদ্র মানুষকে ‘শান্ত’, ‘বিনয়ী’ বা ‘ধৈর্যশীল’ বলার মধ্য দিয়ে আমরা আসলে তার প্রতিবাদহীন অবস্থাকে রোমান্টিসাইজ করি। এই ধরনের কাহিনি একধরনের কল্পিত ন্যায়ের বোধ তৈরি করে, যার ফলে সমাজে অসমতা, শোষণ ও শ্রেণি-দমন সহজেই চোখ এড়িয়ে যায়।
লোককাহিনিতে ধনী চরিত্রগুলো বেশিরভাগ সময়েই অহংকারী, অলস বা অন্যায়কারী হিসেবে দেখানো হয়। অথচ বাস্তবে ধনীদের সংস্থান, শিক্ষা, আইনি ক্ষমতা সবকিছু থাকে এবং তারা অসৎ বা সৎ দুইই হতে পারে। কিন্তু লোকগল্পে দারিদ্র্যকে যদি সৎ বানানো হয়, তাহলে ধনীদের খারাপ দেখিয়ে একটি মনস্তাত্ত্বিক ভারসাম্য তৈরি করা যায়, যা পাঠক বা শ্রোতাকে সাময়িক তৃপ্তি দেয়। এইভাবে ফোকলোর আমাদের মনে একধরনের নৈতিক কল্পনা তৈরি করে, যেখানে মানুষ তাদের বাস্তব অসাম্যকে মেনে নিতে শেখে। বাস্তবের পরিবর্তে কল্পনার জয়ে মন সান্ত্বনা পায়।
আধুনিক সমাজে এই ধারার অব্যাহত প্রতিফলন কেমন?
বিজ্ঞাপন, নাটক, সিনেমা সবখানে এখনো এই গরিব কিন্তু ভালো মানুষের চিত্র ব্যবহৃত হয়। শিশুদের শেখানো হয়, “সৎ থেকে যাও, ভবিষ্যতে সব ঠিক হয়ে যাবে।” কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সৎ থেকেও অনেকে দরিদ্রতার কষ্ট থেকে বের হতে পারেন না, বরং অন্যরা সুযোগের সুবিধা নিয়ে এগিয়ে চলে যায়।
এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও দেখা যায় একজন গরিব রিকশাচালক কষ্ট করে সন্তানকে পড়াচ্ছে, এমন ভিডিও ভাইরাল হয়। লোকজন কাঁদে, শ্রদ্ধা জানায়, কিন্তু প্রশ্ন করে না কেন সে গরিব, রাষ্ট্র কী করল না করল। এভাবেই যুগ যুগ ধরে সততার রোমান্স দরিদ্রতার কাঠামোগত নির্মাণকে ঢেকে রাখে।
লোককাহিনির “গরিব কিন্তু সৎ ছেলে” চরিত্র আমাদের সমাজের একটি গভীর বঞ্চনা ও অসমতার বাস্তবতাকে আড়াল করে রাখে। এই কাহিনি আমাদের শেখায়, তুমি সৎ থাকলেই হবে কিন্তু বলতে দেয় না, “তুমি কেন গরিব, কেন তুমি সুযোগ পাও না, আর সেই সুযোগ কে কাড়ছে?”
তাই ফোকলোরকে কেবল ঐতিহ্য নয়, বরং সমাজের কাঠামো ও শ্রেণিচর্চার একটি রাজনৈতিক দলিল হিসেবেও পড়তে হবে। নইলে গল্প ভালো থাকবে, কিন্তু বাস্তবতা বঞ্চিতই থেকে যাবে।


