Home Blog Page 55

অমিতাভ ঘোষ – জীবন্ত ইতিহাসের গল্প

অমিতাভ ঘোষ শুধু একজন লেখক নন, তিনি ইতিহাসকে জীবন দিয়ে কথোপকথন করানো এক শক্তিশালী কণ্ঠ। বাংলা ভাষার সেই সীমা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক সাহিত্যের মঞ্চে নিজের স্থান গড়ে নিয়েছেন এমন এক মুক্তচিন্তার মানুষ, যার লেখায় ইতিহাস শুধু অতীতের খোঁজ নয়, বরং আমাদের আজকের জীবনের আভাস।

অমিতাভ ঘোষের জন্ম ১৯৫৬ সালে কলকাতায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন শেষে তিনি সাহিত্য ও ইতিহাসের গভীর গবেষণায় নিমগ্ন হন। তাঁর কাজ শুধু ভারতীয় ইতিহাসের ব্যাখ্যা নয়, বরং উপনিবেশবাদের প্রভাব, সাংস্কৃতিক সংঘাত ও আধুনিক ভারতের জটিলতায় ডুবে থাকা এক বিশ্লেষণাত্মক ভঙ্গি। ইংরেজিতে লেখার কারণে তাঁর বইগুলো বিশ্বমঞ্চে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।

অমিতাভ ঘোষের লেখায় ইতিহাস কখনো একপেশে বা নিছক রাজনৈতিক নয়। তিনি ইতিহাসকে জীবন্ত রেখেছেন, যেখানে মানুষের অনুভূতি, রাজনৈতিক লড়াই, সংস্কৃতির সংঘর্ষ এবং সাম্রাজ্যবাদের ছায়া ফুটে ওঠে। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ঐতিহ্যবাহী ইতিহাসের বাইরেও বিস্তৃত , যেখানে শ্রেণী, জাতি ও লিঙ্গের সমন্বয় ঘটে এবং ইতিহাসকে নতুনভাবে উপলব্ধি করা যায়।

অমিতাভ ঘোষের অন্যতম প্রধান কৃতি “The Glass Palace” (গ্লাস প্যালেস) বিশ্বসাহিত্যে অনন্য স্থান অধিকার করেছে। এই উপন্যাসটি ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের কালজয়ী অধ্যায়। ১৮৮৫ সালের মায়ানমার থেকে শুরু করে স্বাধীন ভারতের পথচলা পর্যন্ত এর কাহিনি প্রসারিত।

গল্পের মূল নায়ক জাপানি যুবক উ সোরিনার জীবনের মাধ্যমে আমরা মায়ানমারের রাজতন্ত্র পতন, ব্রিটিশ শাসন ও এশিয়ার রাজনৈতিক পরিবর্তনের বিস্তৃত চিত্র পাই। গল্পের ধাঁধা জুড়ে রয়েছে পারিবারিক বন্ধন, ভালোবাসা, লালিত স্বপ্ন আর ইতিহাসের জটিলতা।

এই বইয়ের অনন্যত্ব হচ্ছে ইতিহাসকে শুধু ঘটনাসমূহের বর্ণনা নয়, বরং এক হৃদয়স্পর্শী গল্পের মাধ্যমে জীবন্ত করে তোলা। পাঠক সহজেই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সাথে ব্যক্তিগত আবেগের সংযোগ অনুভব করেন, যা অনেক ইতিহাস গ্রন্থে মেলে না।

“The Glass Palace” ছাড়াও অমিতাভ ঘোষের লেখাগুলো ইতিহাসের গভীরতা ও বহুমাত্রিক বিশ্লেষণে সমৃদ্ধ। In an Antique Land বইটিতে তিনি মধ্যযুগীয় ভারত ও মিশরের বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ নিয়ে গবেষণা করেছেন। এটি শুধু ইতিহাস নয়, বরং ইতিহাসের সঙ্গে ভ্রমণকাহিনির মেলবন্ধন, যেখানে তিনি মধ্যযুগীয় সমাজ ও বিশ্বাসের দিকগুলো জীবন্তভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। এখানে ইতিহাসকে শুধু তত্ত্ব নয়, বাস্তবের সঙ্গে যুক্ত করে উপস্থাপন করেছেন।

India After Gandhi এই বিশালগ্রন্থে স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনগুলো বিশ্লেষণ করেছেন। বইটি আধুনিক ভারতের জটিলতার পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরে, যেখানে গণতন্ত্র, জাতিগত দ্বন্দ্ব, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমাজ পরিবর্তনের নানা দিক আলোচিত হয়েছে। অমিতাভ ঘোষের সহজ ও বোধগম্য ভাষায় এই বইটি আধুনিক ভারতের ইতিহাস বুঝতে অপরিহার্য।

The Shadow Lines উপন্যাসে ১৯৪০-৫০ এর দশকের ভারত ও বাংলাদেশের বিভাজন, জাতীয় পরিচয় ও স্মৃতির জটিলতাকে তুলে ধরা হয়েছে। এখানে ইতিহাস ও ব্যক্তিগত স্মৃতি একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে, যা পাঠককে সীমারেখার বাইরে মানবিক সম্পর্কের গভীরতা সম্পর্কে ভাবায় ।

“Flood of Fire” “The Glass Palace” সিরিজের প্রথম খণ্ড, যা ১৯শ শতকের শেষ ভাগের ভারত ও এশিয়ার সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা নিয়ে। এটি ব্রিটিশ ভারতের বিস্তার, অ্যাংলো-চীনা যুদ্ধ ও অপিয়াম যুদ্ধে ব্রিটিশ শাসনের প্রভাব ফুটিয়ে তোলে, যেখানে বড় রাজনীতির প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনে কেমন প্রতিফলিত হয়, তা স্পষ্ট হয়।

কেন অমিতাভ ঘোষের লেখা পাঠকের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত হয়?

তার লেখায় ইতিহাস শুধু ঘটনা নয়, বরং মানুষের অনুভূতি, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংঘাতের জীবন্ত ছবি। কঠিন ইতিহাসকে সহজ ও প্রাণবন্ত করে তোলার দক্ষতা পাঠককে অতীত ও বর্তমানের মাঝে সেতুবন্ধন গড়ে দিতে সাহায্য করে। তাই তাঁর বইগুলো পড়া মানে শুধু তথ্য পাওয়া নয়, এক ধরনের মানসিক ও ভাবগত যাত্রায় অংশগ্রহণ।

অমিতাভ ঘোষ একাধারে ইতিহাসবিদ, গল্পকার ও সমাজবিজ্ঞানী। তার রচনাগুলো শুধু অতীতের বিবরণ নয়, আজকের জীবনের সঙ্গেও ইতিহাসকে সংযোগ করে। “The Glass Palace” সহ তাঁর অন্যান্য বইগুলো ইতিহাসকে মানবিক, গভীর ও প্রাণবন্ত করে তুলেছে। তাই তিনি সময়ের সঙ্গে প্রতিটি পাঠকের অন্তরে অমর স্থান অর্জন করেছেন। তাঁর লেখার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি ইতিহাস কেবল অতীত নয়, আমাদের পরিচয়, সংগ্রাম ও স্বপ্নের ধারাবাহিক গল্প।

সতর্কতার সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা ভারত-চীনের : বিবিসি রিপোর্ট

সীমান্তে বছরের পর বছর ধরে চলা উত্তেজনার পর ভারত ও চীন এখন ধীরে ধীরে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। তবে দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস এবং বড় চ্যালেঞ্জ এখনও রয়ে গেছে।

গত মাসের শেষ দিকে দুইজন শীর্ষ ভারতীয় কর্মকর্তার চীন সফর এই সম্পর্ক উষ্ণতার ইঙ্গিত দেয়। জুনে ভারতীয় জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) বৈঠকে অংশ নিতে চীনে যান। পাঁচ বছরের মধ্যে চীনে কোনো ভারতীয় শীর্ষ কর্মকর্তার এটিই ছিল প্রথম সফর।

ভারত-চীনের উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে ৩,৪৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ অমীমাংসিত সীমান্ত। পাহাড়, নদী, হিমবাহে ঘেরা এই সীমান্তে প্রায়ই সেনারা মুখোমুখি অবস্থানে চলে আসেন, যা অনেক সময় সংঘর্ষে রূপ নেয়।

২০২০ সালের জুনে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন ভারতীয় ও ৪ জন চীনা সেনা নিহত হন। এরপর বিভিন্ন স্থানে দুই দেশের সেনাদের মধ্যে উত্তেজনা চলছেই।

তবে ভৌগলিক বাস্তবতা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা দুই দেশকে কিছু ক্ষেত্রে সমঝোতার দিকে নিয়ে গেছে।

গত বছর লাদাখের প্রধান বিরোধপূর্ণ এলাকাগুলো নিয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছায় দিল্লি এবং বেইজিং। চলতি বছরের শুরুতে তারা সরাসরি ফ্লাইট চালু ও ভিসা বিধিনিষেধ শিথিলের সিদ্ধান্ত নেয়। একই সময়ে ভারতীয় তীর্থযাত্রীদের ছয় বছর পর তিব্বতের কৈলাশ পর্বত দর্শনের অনুমতি দেওয়া হয়।

চীন ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। দুই দেশের মধ্যে বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ১২৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি। ভারতের শিল্প উৎপাদন ও কৃষিক্ষেত্রে চীনা পণ্যের ওপর নির্ভরতা রয়েছে, বিশেষত দুর্লভ খনিজ পদার্থের ক্ষেত্রে। তাই সীমান্তে শান্তি বজায় রাখা অর্থনৈতিক সম্পর্কের জন্য জরুরি।

চীনও হিমালয় সীমান্তে শান্তি চায়, কারণ তাদের নজর এখন তাইওয়ান এবং অন্যান্য বৈশ্বিক ইস্যুর দিকে। তবে কৌশলগত দিক থেকে চীন মনে করে, পশ্চিমা দেশগুলো ভারতের মাধ্যমে তাদের প্রভাবকে মোকাবিলা করার চেষ্টা করছে।

তাই সীমান্ত সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি বেইজিং চায় ভারত-চীনের বাণিজ্য ও বিনিয়োগে অগ্রগতি হোক এবং চীনা প্রকৌশলী ও কর্মীদের ভিসা সীমাবদ্ধতা তুলে নেওয়া হোক। (২০২০ সালের সংঘর্ষের পর ভারত অনেক চীনা অ্যাপ নিষিদ্ধ ও বিনিয়োগের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল।)

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফার শাসনামলে ভারতের দিক থেকে চীনের দিকে হাত বাড়ানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ভারত ভেবেছিল যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে তারা শক্ত সমর্থন পাবে, কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার দিকে নজর দিচ্ছে দিল্লি।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, ১ আগস্টের মধ্যে চুক্তি না হলে ভারতের ওপর শুল্ক আরোপ করা হবে। এই পটভূমিতে ভারত চীনের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের দিকে এগোচ্ছে।

দুই দেশ জানে, সীমান্ত বিরোধ দ্রুত সমাধান সম্ভব নয়। তাই উভয়েই এমন একটি সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইছে, যা পারস্পরিকভাবে লাভজনক এবং উত্তেজনা এড়িয়ে চলতে সাহায্য করবে, যাতে তারা কোনো বৈশ্বিক শক্তির ওপর নির্ভর না করে নিজেদের অবস্থান রক্ষা করতে পারে।

বিশ্বের প্রথম ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের কোম্পানি হলো – এনভিডিয়া

বিবিসি জানিয়েছে–বিশ্বের প্রথম কোম্পানি হিসেবে ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্যে পৌঁছেছে চিপ নির্মাতা এনভিডিয়া। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির চাহিদা বাড়তে থাকায় এনভিডিয়া ক্রমেই লাভবান হচ্ছে। বিভিন্ন সূত্রমতে, এআই চিপের ক্ষেত্রে ৭০ থেকে ৯৫ শতাংশ বাজার এখন এনভিডিয়ার দখলে।

৪ ট্রিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় ৪ কোটি ৮৭ লক্ষ কোটি টাকা। এই পরিমাণ অর্থ দিয়ে বাংলাদেশের প্রায় ৬০ বছরের বাজেটের অর্থসংস্থান সম্ভব।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এই কোম্পানিটি ২০২৩ সালের জুনে প্রথমবার ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্যে পৌঁছায়। মাত্র এক বছরের মধ্যে তা তিনগুণ বেড়ে ৪ ট্রিলিয়নে পৌঁছাল।

এই গতি অ্যাপল ও মাইক্রোসফটের চেয়েও দ্রুত। এই দুই প্রতিষ্ঠানই বর্তমানে ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি বাজারমূল্যসম্পন্ন যুক্তরাষ্ট্রের দুটি কোম্পানি।

টেক বিশেষজ্ঞ ড্যান আইভস একে এনভিডিয়ার জন্য “ঐতিহাসিক মুহূর্ত” বলে উল্লেখ করে বলেন, “এখনকার দিনে তাদের চিপই যেন নতুন সোনা আর তেল। এআই বিপ্লবের মূল ভিত্তি একটাই কোম্পানি—এনভিডিয়া।”

এখন কোম্পানিটি দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটজিপিটির মতো মডেল চালাতে ব্যবহৃত চিপের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায়। এই প্রবৃদ্ধির ফলে এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং এখন প্রযুক্তি দুনিয়ার বড় তারকায় পরিণত হয়েছেন। বিশেষ করে তাইওয়ানে তার এতই জনপ্রিয়তা যে, ভক্তরা তাকে রকস্টারের মতো দেখেন।

এনভিডিয়া চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ৪৪.১ বিলিয়ন ডলার আয়ের কথা জানিয়েছিল, যা গত বছরের তুলনায় ৬৯% বেশি। কোম্পানিটি প্রতি শেয়ারে ৮১ সেন্ট করে লাভ করেছে।

বর্তমানে এনভিডিয়া বিভিন্ন খাত থেকে আয় করে। যার মধ্যে রয়েছে, ভিডিও গেইম খেলার জন্য গ্রাফিক্স কার্ড তৈরি, পেশাদার ভিজুয়ালাইজেশন, যেমন– থ্রিডি ডিজাইন, অ্যানিমেশন বা সিনেমার জন্য উন্নত গ্রাফিক্স প্রযুক্তি এবং অটোমোটিভ ও রোবোটিক্স সফটওয়্যার ও চিপসেট, বিশেষ করে অটোমোটিভ গাড়ি ও রোবটের জন্য বিশেষ ধরনের চিপ ও সফটওয়্যার তৈরি করে তারা।

তবে এখন পর্যন্ত এনভিডিয়ার সবচেয়ে বড় মুনাফার অংশ আসে ডেটা সেন্টার বিভাগ থেকে। এ বিভাগেই তৈরি হয় বিশেষ ধরনের সেমিকন্ডাক্টর চিপ ও অন্যান্য প্রযুক্তি, যা বর্তমানে এআই বিপ্লবের পেছনে প্রধান শক্তি হিসেবে কাজ করছে।

“সাংস্কৃতিকভাবে বাঙালিদের ভাগ করা যায় না, দুই বাংলা এক সংস্কৃতিরই দুটি ধারা” : ঋত্বিক ঘটক

আপনি কেন চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন?

ঋত্বিক ঘটক : আমি পাগল, চলচ্চিত্র তৈরি না করেই বাঁচতে পারি না। আমার কিছু করতে হবে। তাই আমি চলচ্চিত্র নির্মাণ করি। সত্যিই, অন্য কোন কারণ নেই।

চলচ্চিত্র নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য কি হওয়া উচিত?

ঋত্বিক ঘটক : চলচ্চিত্র তৈরির প্রাথমিক লক্ষ্য মানবজাতির জন্য ভাল কিছু করা। যদি আপনি মানবতার জন্য ভাল কিছু না করেন, কোন শিল্পই শিল্পের কাজ করে না। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন যে, ‘শিল্পটি সত্যের প্রতি বিশ্বস্ত এবং দ্বিতীয়ত সৌন্দর্য (সত্যম ও সুদর্শন)।’ এই সত্য একটি শিল্পী নিজস্ব অনুভূতি এবং ধ্যানের বাইরে । যেহেতু সত্য কখনোই চিরস্থায়ী এবং ধ্রুবক নয় এবং এই দুনিয়া সবসময়ই বিষয়গত এবং পরিবর্তিত হয়, প্রত্যেকেরই তাদের ব্যক্তিগত জীবনে তাদের সমগ্র জীবনের গভীরতম চিন্তাধারা এবং উপলব্ধির সাথে আসা উচিত। এটি কেবল সম্পূর্ণরূপে উপলব্ধি করার পরেই সেই সত্য গ্রহণ করা উচিত। শিল্প একটি তুচ্ছ জিনিস নয়।

একটি গল্প চিত্রায়ন বা উপন্যাস আপনার জন্য কোনটা গুরুত্বপূর্ণ? সাহিত্যিক মূল্য না একটি ভিন্ন শিল্প রূপান্তর প্রক্রিয়া?

ঋত্বিক ঘটক : আমি দুইয়ের মধ্যে কোন পার্থক্য দেখি না। এটা মানুষের জীবনের বিভিন্ন অভিব্যক্তি থেকে আসে। মানবজাতির ভালবাসা গুরুত্বের একমাত্র জিনিস। দৈনিক নিঃশব্দ, নিখুঁত নিন্দা কাজ- এই জীবন? আপনার প্রেম দিতে হবে, আপনার সব দিতে হবে। হৃদয় দিয়ে ভালোবাসতে হবে। আমি এটা করতে সক্ষম হয়েছি কিনা জানি না।

মেঘে ঢাকা তারা, সুবর্ণরেখার ও কমল গান্ধারের মধ্যে কি গভীর সংযোগ রয়েছে? যদি থাকে, তাহলে কি আপনি বিস্তৃতভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন?

ঋত্বিক ঘটক : অবশ্যই একটি স্বাভাবিক সংযোগ আছে। “মেঘে ঢাকা তারা সম্পূর্ণভাবে আমার … আমার অবচেতন সম্পর্ক। কিন্তু … কমল গান্ধার-এর সাথে খুব সচেতন সম্পর্ক ছিল। এবং সুবর্ণরেখা অত্যন্ত গুরুতর কাজ। এটা সত্যিই কঠিন কাজ ছিল, হ্যাঁ মানসিকভাবে … “। শুধু শারীরিক কঠোর পরিশ্রম নয়, কাজটি করার জন্য আমার মনস্তাত্ত্বিকভাবে খুব শ্রম দিতে হয়েছে। আমি জানি না আমি সফল কিনা! কিন্তু, ব্যাপারটি আসলেই দারুণ।

কিন্তু সংযোগ?

ঋত্বিক ঘটক : এই তিনটি মধ্যে শুধুমাত্র একটি সংযোগ আছে এবং তা হল ‘দুই বাংলার একত্রীকরণ’। আমি দুই বাংলাকে একত্রিত করতে চেয়েছি। আমি তাদের উভয়কে ভালবাসি…। আমি যা বলছি এবং আমি তা শেষ পর্যন্ত বলে যাব, আমি মরণ না হওয়া পর্যন্ত বলবো। আমি কোন কিছু কেয়ার করি না। আমি টাকার কেয়ার করি না। আমি এটার সাথে যুদ্ধ করতে পারি। ঋত্বিক ঘটক এখানে যা করতে পারে ও ঢাকায় তা করতে পারে। যে কেউ আমাকে তার জুতা দিয়ে পেটাতে চায়, তাতেও আমার কিছু যায় আসে না।

আপনার বেশিরভাগ চলচ্চিত্রে, দুই বাংলার বিভাজনের মধ্য থেকে সৃষ্ট বেদনা ও দুঃখকে তুলে ধরেছেন। দুই বাংলার বিভাজন কি আমাদের বর্তমান অবস্থা নির্ধারণে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ?

ঋত্বিক ঘটক : একেবারে। এবং আমি সবসময় এটির বিরুদ্ধে । এমনকি আমার শেষ ছবিতে আমি মনে করি আমি এটা তুলে ধরেছি। আমি রাজনৈতিক একীভূতকরণ সম্পর্কে কোন আলোচনার অংশ নই। আমি এটা বুঝতে পারছি না কারণ এবং আমার এটা কোন প্রয়োজন নেই। কিন্তু সাংস্কৃতিক একত্রীকরণে আমি আবেগপ্রবণ। আমি উভয় বাংলায় কাজ করেছি। আর আমার চেয়ে কেউ বেশি কিছু করেনি। এখানে আমার চেয়ে কেউ বাংলাদেশ সম্পর্কে বেশি জানে না। আমি যেভাবে থাকলাম এবং এখানে কাজ করেছি। বাংলাদেশে তিতাস একটি নদীর নাম চলচ্চিত্রের শুটিং করার সময় সেইসব বাঙালি ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে – বিশেষ করে মেয়েদের – এখানে অন্য কেউ এটিকে মেলাতে পারে না। সাংস্কৃতিকভাবে বাঙালিদের বিভক্ত করা যাবে না। দুই বাংলার এক সংস্কৃতি।

আমার লেলিন’ সিনেমাটি আমরা দেখতে পারিনি, কিন্তু কেন?

ঋত্বিক ঘটক : এইটা….অনেক সমস্যা ছিল। এর মধ্যে ‘মোরারজি দেশাই। আমার লেলিন’ সিনেমাটি সেন্সর বোর্ড থেকে ছাড়পত্র পেয়েছিলো। আমি ছাড়পত্রটি দিল্লি থেকে সংগ্রহ করেছিলাম। এরপর কংগ্রেস ভাগ হয়ে গেল। মোরারজি দেশাই আমাকে একটা চিঠি পাঠালেন। চিঠিকতে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী আমাকে বলেছেন ‘ঋত্বিক সিনেমাটা নিষিদ্ধ’। আমি বললাম এটা কি করে হতে পারে! আপনি কিছু একটা করুন।’ পরে হাকসার সাহিব’ যিনি আবার বাবার মতো, আমাকে অনেক ভালোবাসতেন। হাকসার ছিলেন মোরারজির প্রধান সহকারি। কথা বলার পর হঠাৎ একদিন একটি মেয়ে ওর নাম ‘নন্দিনী’ আমাকে ডেকে বলল ‘ঋত্বিক, তোমার জন্য কি করতে পারি? ওই সময় ঘরের মধ্যে হাসকার সাহিব প্রবেশ করলেন। এবং বললেন ‘ তার সঙ্গে কি অন্যায় করা হচ্ছে? আমার লেলিন’ সিনেমাটি রাশিয়াসহ কয়েকটি সমাজতান্ত্রিক দেশে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হলো। এদিকে হাসকার এবং নন্দিনী আমাকে ত্রিশ হাজার রুপি দেয়। এই রুপি দিয়ে আমি আমার সংসারের জন্য কিছু খাবার-পানীয় কিনে নেই। বাকী রুপি আমি আমার স্ত্রীর হাতে দিয়ে বলি ‘ এই নাও-এরপর অন্তত একমাস আমাকে বিরক্ত করবে না’।

ইরানের শীর্ষ কমান্ডারদের মোবাইল ফোন ট্র্যাক করে হত্যা করেছে – মোসাদ

ইসরায়েলি হামলায় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কমপক্ষে ২০ জন সিনিয়র কমান্ডার নিহত হয়েছেন।বেশ কয়েকজন পরমাণুবিজ্ঞানীকেও হত্যা করা হয়। এসব হামলা এতটাই নিখুঁত ছিল যে ধারণা করা হয়েছে, তাঁদের অবস্থান সম্পর্কে আগে থেকেই জানত ইসরায়েল।

সম্প্রতি বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেই রহস্য ফাঁস করলেন ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সাবেক উপপ্রধান রামে ইগ্রা। ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের হত্যায় মোবাইল ফোন প্রযুক্তি ব্যবহার করে টার্গেট নির্ধারণ করেছে মোসাদ—এমনটাই জানান সংস্থাটির সাবেক উপপ্রধান।

বিবিসির ইরানবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক খাজরা নাজির এক প্রশ্নের উত্তরে রামি ইগ্রা বলেন, ‘যদি আপনার হাতে একটি মোবাইল থাকে, তাহলে আপনার কোনো কিছুই গোপন নেই। এটা সবার জন্য প্রযোজ্য। আর যদি রেভল্যুশনারি কমান্ডার হয়, তাহলে তো কোনো কথাই নেই। তাঁদের বাসা কোথায়, কোন ফ্ল্যাটে থাকেন, এসব জানা যায়।’

ব্যাখ্যা করে রামি বলেন, মোবাইল ফোন ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে ইরানি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কমান্ডারদের সুনির্দিষ্ট অবস্থান শনাক্ত করা হয়। এরপর অত্যাধুনিক গাইডিং সিস্টেমযুক্ত মিসাইল দিয়ে হামলা চালানো হয়।

এখন প্রশ্ন হলো, ইসরায়েলের মিসাইল সুনির্দিষ্টভাবে শীর্ষ কর্মকর্তাদের বেডরুমে হামলা করল? এর উত্তর হলো, আরও স্পর্শকাতর প্রযুক্তি, যেটার উন্নয়ন নিয়ে দুই বছর ধরে কাজ করেছে ইসরায়েল। প্রযুক্তির কল্যাণে এখন এমনকি তাঁদের বেডরুমের অবস্থানও জানা সম্ভব হয়েছে।

তবে শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের মৃত্যু ইরানের সার্বিক প্রতিরক্ষা শক্তিতে তেমন প্রভাব ফেলবে না বলেও মন্তব্য করেন মোসাদের সাবেক এই উপপ্রধান।

তাঁর মতে, এখন যদি ইরান সত্যিই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে সক্ষম হয়, তবে এর দায়ভার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর বর্তায়। কারণ, তাঁরাই ইরানকে পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরিয়ে দিয়েছেন।

ইজরায়েলের ভয়ংকর পরিকল্পনা – গাজার সব বাসিন্দা স্থানান্তর হবে রাফাহর ক্যাম্পে

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ জানিয়েছেন, গাজার সব ফিলিস্তিনিকে গাজার দক্ষিণাঞ্চলের একটি শিবিরে স্থানান্তরের জন্য সামরিক বাহিনীকে প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। দেশটির গণমাধ্যমগুলো সোমবার (৭ জুলাই) এ তথ্য জানিয়েছে।

কাটজ সাংবাদিকদের বলেন, রাফাহ শহরের ধ্বংসস্তূপের ওপর একটি ‘হিউম্যানিটারিয়ান সিটি’ অর্থাৎ মানবিক আশ্রয় শিবির হিসেবে একটি এলাকা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে তার, যেখানে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৬ লাখ ফিলিস্তিনিকে রাখা হবে, এবং পরে গাজার পুরো ২১ লাখ জনগোষ্ঠীকে সেখানে স্থানান্তর করা হবে।

তিনি বলেন, ভেতরে প্রবেশের আগে নিরাপত্তা যাচাই করে নিশ্চিত হতে হবে যে তারা হামাসের সাথে যুক্ত নয়। একবার ভেতরে ঢুকলে তাদের বাইরে যেতে দেওয়া হবে না।

তিনি আরও জানান, যদি পরিস্থিতি অনুকূল হয়, তাহলে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির আলোচনা চলছে, সেই সময়েই শিবিরের নির্মাণকাজ শুরু হতে পারে।

এ পরিকল্পনাকে এক ইসরায়েলি মানবাধিকার আইনজীবী সরাসরি ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের একটি প্রক্রিয়াগত পরিকল্পনা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

মানবাধিকার আইনজীবী মাইকেল স্ফার্ড ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘এটি মূলত গাজা উপত্যকার দক্ষিণ প্রান্তে জনগণকে জোরপূর্বক স্থানান্তরের মাধ্যমে তাদের উপত্যকার বাইরে বহিষ্কারের প্রস্তুতি।’

জাতিসংঘও এর আগে সতর্ক করেছে, কোনো দখলকৃত ভূখণ্ডের বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে জোরপূর্বক স্থানান্তর বা বহিষ্কার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী এবং ‘জাতিগত নির্মূলের শামিল’।

কাটজের বক্তব্যের পরে সোমবার হোয়াইট হাউসে এক বৈঠকের সময় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি প্রস্তাব নিয়ে কথা বলেন। ওই প্রস্তাব অনুযায়ী, যুদ্ধ-পরবর্তী গাজার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্র নেবে এবং সেখানে বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের স্থায়ীভাবে অন্যত্র পুনর্বাসন করবে।

নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমি মনে করি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দূরদৃষ্টি অত্যন্ত চমৎকার। এর নামই হলো স্বাধীন ইচ্ছা। যদি কেউ থাকতে চায়, তারা থাকতে পারবে, আর যদি কেউ চলে যেতে চায়, তবে তাদের চলে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত…’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমন দেশগুলো খুঁজে বের করতে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছি, যারা সবসময় বলে এসেছে যে তারা ফিলিস্তিনিদের জন্য আরও ভালো ভবিষ্যৎ দিতে চায়।’

ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা আশপাশের দেশগুলো থেকে দুর্দান্ত সহযোগিতা পেয়েছি, প্রত্যেকটি দেশের কাছ থেকেই দারুণ সহযোগিতা পেয়েছি। সুতরাং কিছু ভালোই হবে।’

ফিলিস্তিনিরা আশঙ্কা করছেন, এটি তাদের জীবনে আরেকটি নাকবা নিয়ে আসতে পারে — আরবি ভাষায় যার অর্থ ‘বিপর্যয়’। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের সময় ও তার পরের যুদ্ধে লাখ লাখ ফিলিস্তিনি তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বা জোরপূর্বক বিতাড়িত হতে বাধ্য হয়েছিল।

তাদের অনেকেই গাজায় আশ্রয় নিয়েছিলেন, আর বর্তমানে তাদের বংশধররা গাজার জনসংখ্যার প্রায় ৭৫%। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৯ লাখ নথিভুক্ত ফিলিস্তিনি শরণার্থী দখলকৃত পশ্চিম তীরে বাস করছে। আরও ৩৪ লাখ শরণার্থী জর্ডান, সিরিয়া ও লেবাননে বাস করছে।

হামাস নির্মূলের নামে ইজরাইলের গত দুই বছরের সামরিক অভিযানে গাজার অধিকাংশ মানুষকে একাধিকবার তাদের বাড়িঘর ছেড়ে যেতে হয়েছে। অনুমান করা হচ্ছে, গাজার ৯০% এর বেশি বাড়িঘর আংশিক বা পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা, পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। খাদ্য, জ্বালানি, ওষুধ ও আশ্রয়ের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে।

স্বপ্ন কি মনের বার্তা পৌঁছে দিতে পারে?

স্বপ্ন নিয়ে মানুষের কৌতূহল যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। স্বপ্নের জগৎ কি শুধুই আমাদের মস্তিষ্কের একটি বায়োলজিক্যাল প্রক্রিয়া, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে আরও গভীর কোনো রহস্য? কি করে কোনো স্বপ্নে আমরা অনেক দূরের কারো কথা শুনতে বা ভাবতে পারি? আধুনিক বিজ্ঞান এই প্রশ্নগুলোকে জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেছে নানা পরীক্ষার মাধ্যমে, যার মধ্যে অন্যতম একটি আলোচিত এবং রহস্যময় পরীক্ষা হলো মাইমনাইডিস মেডিকেল সেন্টারের ড্রিম টেলিপ্যাথি এক্সপেরিমেন্ট।

দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞান ও প্যারানরমাল গবেষণায় টেলিপ্যাথির বিষয়টি রহস্য এবং বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। স্বপ্নের মাধ্যমে টেলিপ্যাথি বা “ড্রিম টেলিপ্যাথি” হলো এমন এক ধারণা যেখানে কেউ ঘুমন্ত অবস্থায় অন্য কারো মনের ভাব বা ছবি গ্রহণ করতে পারে। মাইমনাইডিস মেডিকেল সেন্টারে ১৯৬০ থেকে ১৯৭০-এর দশকে পরিচালিত এই পরীক্ষা হলো এক ধরনের বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টা যা টেলিপ্যাথির এই সম্ভাবনাকে পরীক্ষা করে। বিশেষ করে স্বপ্নের মধ্য দিয়ে দূরত্ব অতিক্রম করে তথ্য আদানপ্রদান সম্ভব কিনা তাই ছিল মূল প্রশ্ন।

পরীক্ষাটি মোটামুটি এমন ছিল, এক ব্যক্তি যাকে বলা হত “সেন্ডার” (Sender), সে এক ঘরে থাকে এবং কিছু নির্দিষ্ট ছবি বা ছবি সংক্রান্ত তথ্য মনে রেখে থাকে। অন্য ব্যক্তি যাকে বলা হত “রিসিভার” (Receiver), সে আরেক ঘরে ঘুমিয়ে থাকে। সেন্ডার মন থেকে একটি ছবি নিয়ে সেটি রিসিভারের কাছে “প্রেরণ” করার চেষ্টা করত। রিসিভার ঘুমের অবস্থায় স্বপ্নে সেই ছবি বা তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করত। পরবর্তীতে রিসিভারের স্বপ্নের বর্ণনা ও আঁকা ছবি সেন্ডারের ছবি ও তথ্যের সাথে মিলিয়ে দেখা হত। পরীক্ষাটি একাধিকবার পুনরাবৃত্তি করা হয় এবং আশ্চর্যের বিষয় হলো, বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে রিসিভারের স্বপ্নে আসল ছবি বা তার মিল পাওয়া গিয়েছে।

মাইমনাইডিসের এই পরীক্ষা টেলিপ্যাথির পক্ষে শক্তিশালী একটি প্রমাণ বলে বিবেচিত হয়েছে, বিশেষত এটি স্বপ্নের সাথে জড়িত ছিল, যা মানুষের অবচেতন মনের একটি রহস্যময় অবস্থা। ফলাফলগুলো বলেছিল, রিসিভারের স্বপ্ন ও সেন্ডারের ছবি মাঝে মাঝে গুরুত্বপূর্ণ মিল ছিল।

পরীক্ষাগুলোতে কঠোর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। তবে অবশ্যই এই ফলাফলগুলো বিতর্কিতও ছিল এবং পরবর্তীতে অন্যান্য গবেষকরা এই পরীক্ষার পুনরাবৃত্তি করতে পারেননি অথবা যথেষ্ট শক্তিশালী প্রমাণ পাননি। বিজ্ঞানী সমাজের মধ্যে এই পরীক্ষাকে গ্রহণযোগ্যতা দিতে আপাতত অসুবিধা হচ্ছে মূলত কারণ টেলিপ্যাথি বা প্যারানরমাল ক্ষমতা আজও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় দৃঢ়তার সঙ্গে প্রমাণিত হয়নি।

স্বপ্নের মাধ্যমে যোগাযোগের ধারণাটি শুধু বৈজ্ঞানিক নয়, সাংস্কৃতিক ও দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গভীর অর্থ বহন করে। বাংলা এবং ভারতীয় পুরাণ-কথায় স্বপ্নের মাধ্যমে আগাম বার্তা পাওয়া, বা স্বপ্নে কারো সঙ্গে আলাপ হওয়া বহুবার বর্ণিত। এইসব আচার-অনুষ্ঠানে স্বপ্নকে প্রেতাত্মা, দেবতা কিংবা অতিপ্রাকৃত শক্তির বার্তা হিসেবে গৃহীত হয়েছে। মানুষের আত্মার এমন অবয়বকে অনেকসময় স্বপ্নের মধ্যে খুঁজে পাওয়া হয়। এছাড়া বহু কবি ও দার্শনিক স্বপ্নকে অবচেতন মনের গভীরতম অংশ হিসেবে দেখেছেন, যেখানে ব্যক্তির আসল চেতনা কিংবা মহাজাগতিক সত্য প্রকাশ পায়। জগৎজোড়া সাহিত্য, কাব্য এবং লোকসংস্কৃতিতেই স্বপ্নের মাধ্যমে এমন গোপন বার্তা পাওয়া নিয়ে অগাধ বিশ্বাস দেখা যায়। যদি স্বপ্নের মাধ্যমে অন্য কারো মনের ভাব বোঝা সম্ভব হয়, তাহলে এটা মানব মনের অসীম সম্ভাবনারই প্রমাণ এবং তার সাংস্কৃতিক বোধের বহিঃপ্রকাশ।

মাইমনাইডিস পরীক্ষা অনেকের কাছে প্যারানরমাল বা অপ্রমাণিত বিজ্ঞানের আওতায় পড়েছে। আধুনিক নারোসায়েন্স বা মনস্তত্ত্বের দৃষ্টিতে, স্বপ্নের তথ্য আদান-প্রদান কঠিনই নয় অসম্ভব বলে দেখা হয়। তবে কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান এবং মাইন্ড-ব্রেইন সম্পর্কের নতুন নতুন তত্ত্ব এইসব পুরনো ধারণাকে পুনরায় আলোচনায় নিয়ে আসছে।

আধুনিক গবেষণাগুলো এখনো এই পরীক্ষাকে পুরোপুরি সমর্থন করে না, তবে এটি স্পষ্ট যে মানুষের মনের সম্পূর্ণ রহস্য এখনো অন্বেষণের অপেক্ষায়। সেইসাথে স্বপ্ন ও টেলিপ্যাথি নিয়ে মানুষের কল্পনা ও বিশ্বাস আজও থেমে নেই, যেগুলো সংস্কৃতির এক অমুল্য অংশ। বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির এই সংঘর্ষ ও সমন্বয় থেকে মানুষের মানসিক ও আত্মিক জীবন আরও সমৃদ্ধ হতে পারে।

যদি সত্যিই স্বপ্নের মাধ্যমে মনের যোগাযোগ সম্ভব হয়, তবে এর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব অসীম। দূরত্ব, ভাষা ও সংস্কৃতির বাধা দূর হয়ে মানুষের মধ্যে গভীর সংযোগ স্থাপিত হতে পারে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে ‘মনের কথা’ বা ‘অবচেতন যোগাযোগ’ নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। এছাড়া রোগ নির্ণয়, মানসিক চিকিৎসা, বা এমনকি সৃজনশীলতার ক্ষেত্রেও স্বপ্নের এই অদ্ভুত ক্ষমতা ব্যবহার করা যেতে পারে। আমরা জানি না ভবিষ্যতে মাইমনাইডিস পরীক্ষার মতো ধারণা কতটা বাস্তব রূপ নেবে, তবে এটি আজও মানুষের কৌতূহল এবং স্বপ্নের রহস্যকে উজ্জীবিত করে রাখে।

মাইমনাইডিস মেডিকেল সেন্টারের ড্রিম টেলিপ্যাথি পরীক্ষা হয়তো বৈজ্ঞানিক সমাজের পুরোপুরি গ্রহণযোগ্যতা পায়নি, তবু এটি আমাদের মনের অজানা সীমা ও স্বপ্নের রহস্য উন্মোচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। স্বপ্নের মাধ্যমে টেলিপ্যাথির ধারণা সাংস্কৃতিক আস্থাকে স্পর্শ করে এবং মানুষের আত্মিক ও দার্শনিক অনুসন্ধানকে উদ্দীপিত করে।

কারাগারে কাজ – বন্দিদের দৈনিক মজুরি মাত্র ২ টাকা!

বাংলাদেশের বিদ্যমান জেল কোডের বহু পুরনো মজুরি বিধান অনুসারে কারাগারে থাকা বন্দিরা কাজ করলে দৈনিক মাত্র ২ টাকা মজুরি পান। এই অপ্রতুল পারিশ্রমিক বন্দিদের শ্রমের মাধ্যমে পুনর্বাসনের উৎসাহকে নষ্ট করে।

গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘Right to Employment in Prison: Employment as a Basic Human Need’ শীর্ষক এক সেমিনারে বিষয়টি তুলে ধরেন কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মোহাম্মদ মোতাহার হোসেন।

তিনি বলেন, জেল কোড অনুযায়ী একজন বন্দিকে প্রতিদিন যে কাজই করুক না কেন—ফার্নিচার তৈরি, সেলাই কিংবা পোশাক উৎপাদন—মাত্র ২ টাকা দেওয়া হয়।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, কারাগারে তৈরি পণ্য কম দামে বিক্রি হয় শুধু উৎপাদন দক্ষতার কারণে নয়, বরং অপ্রতুল মজুরি কাঠামোর জন্য।

কারা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের কারাগারগুলোতে ৭০,০০০-এর বেশি বন্দি রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫% প্রবীণ এবং ৬৫,০০০ বন্দির বয়স ১৮ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে।

তবে বন্দিদের কেবলমাত্র একটি ছোট অংশই উৎপাদনমূলক কাজে নিয়োজিত, যার প্রধান কারণ হলো পর্যাপ্ত প্রণোদনার অভাব।

এই পরিস্থিতি মোকাবেলায়, কারা বিভাগ কারাগারের ভেতর ‘ওপেন ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে বেসরকারি কোম্পানিগুলো উৎপাদন ইউনিট স্থাপন করতে পারবে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও অন্যান্য অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

প্রথম পর্যায়ে ১০,০০০ বন্দিকে কর্মসংস্থানের আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। মোতাহার বলেন, “আমরা যদি প্রতিদিন মাত্র ১০০ টাকা মজুরি দিতে পারি, সেটাই হবে একটি ‘গেম চেঞ্জার’।”

“একজন বন্দি মাসে ৩,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকা আয় করে ঘরে টাকা পাঠাতে পারবে। এতে পরিবার উপকৃত হবে, এবং বন্দিরাও আশার আলো দেখবে,” তিনি যোগ করেন।

এই জোনগুলো বন্দিদের জন্য উন্নত জীবনযাপন, চলাচলের স্বাধীনতা, ভালো খাবার ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধির সুযোগ দেবে, তবে নিরাপত্তা বিধি বজায় রেখে। উদ্দেশ্য হলো এমন একটি বাস্তব কর্মপরিবেশ তৈরি করা, যা মর্যাদা ও জীবনের লক্ষ্য ফিরিয়ে আনবে।

মোতাহার আরও জানান, কারাগারকে আনুষ্ঠানিকভাবে সংশোধনাগারে রূপান্তরের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তায় প্রণয়নাধীন Correction Services Act-2025 এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে।

তিনি বলেন, নতুন আইনটি পুরনো জেল কোডের পরিবর্তে একটি আধুনিক কাঠামো তৈরি করবে, যা বন্দিদের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের অধিকার নিশ্চিত করবে।

এই পরিকল্পনায় আগ্রহ দেখিয়েছে বিভিন্ন বেসরকারি উদ্যোক্তা ও আন্তর্জাতিক অংশীদার। যদিও কিছু মানবাধিকার সংগঠন জোরপূর্বক শ্রমের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, মতাহার আশ্বস্ত করে বলেন, এতে অংশগ্রহণ হবে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছামূলক এবং মজুরি হবে ন্যায্য।

তিনি বলেন, “অনেক বন্দি আছেন যারা ২০-২৫ বছর সাজা খেটে বের হন, কিন্তু পরিবার তাদের গ্রহণ করে না। তারা ফিরে যান শূন্য হাতে।”

সরকার বর্তমানে কেবল বন্দিদের খাবারের পেছনেই বছরে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা ব্যয় করে, যেখানে মোট বাজেট প্রায় ১,০০০ কোটি টাকার কাছাকাছি। বছরে প্রায় ৮ লাখ বন্দি কারাগারে আসা-যাওয়া করেন।

এই বিশাল সংখ্যার সামান্য অংশকেও যদি উৎপাদনশীল শ্রমে যুক্ত করা যায়, তাহলে সরকারি ব্যয় কমবে এবং পুনর্বাসনের পথও উন্মুক্ত হবে।

মোতাহার বলেন, “কর্মসংস্থানকে অধিকার হিসেবে দেখতে হবে, সুবিধা হিসেবে নয়। যদি আমরা চাই যে কারাগার থেকে সংশোধিত হয়ে উন্নত মানুষ বের হয়ে আসুক, তাহলে আমাদের তাদের ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ করতেই হবে।”

আপনি কী নিশ্চিত আপনার সব স্মৃতি সত্য?

আমরা অনেক সময় নিঃসন্দেহে বলি “আমি এটা স্পষ্ট মনে করতে পারছি!” কিন্তু কী আশ্চর্য, গবেষণায় দেখা গেছে, এমন দৃঢ় স্মৃতিও অনেক সময় পুরোপুরি ভুল হতে পারে। এই ধরনের “False Memory” বা মিথ্যা স্মৃতি এমন এক মানসিক ঘটনা, যা আমাদের নিজের অভিজ্ঞতা হিসেবেই মনে হয়, কিন্তু বাস্তবে তা হয় নি, বা হয়ে থাকলেও বিকৃত রূপে মস্তিষ্কে গেঁথে গেছে।

False Memory এমন একটি মানসিক অবস্থা, যেখানে ব্যক্তি এমন কিছু ঘটনা বা অভিজ্ঞতা মনে করেন, যা কখনো ঘটেইনি বা সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে ঘটেছিল। এটি কল্পনা, সাজানো গল্প বা অন্যের অভিজ্ঞতা নিজের মনে করে নেওয়ার ফলেও হতে পারে।
কেউ হয়তো মনে করেন তিনি শৈশবে একবার রেলস্টেশনে হারিয়ে গিয়েছিলেন, অথচ বাস্তবে তিনি কখনোই রেলস্টেশনে যাননি।

মিথ্যা স্মৃতি কেন ঘটে?
স্মৃতি আমাদের মস্তিষ্কে কোনোরূপ রেকর্ডার নয়, বরং প্রতিবার যখন আমরা কিছু মনে করার চেষ্টা করি এটা পুনর্গঠিত হয়। এই reconstructive nature of memory-এর কারণেই অনেক সময় মস্তিষ্ক ফাঁকা জায়গা পূরণ করতে গিয়ে ভুল তথ্য বসিয়ে দেয়।

মস্তিষ্ক অনেক সময় অতীতের ফাঁকফোকর পূরণ করতে নতুন অংশ বানিয়ে নেয় যেটা আমরা সত্যি বলে বিশ্বাস করি। বাইরের কারও বক্তব্য বা প্রশ্নের ধরন মস্তিষ্ককে একটি বিকল্প স্মৃতি তৈরি করতে উদ্বুদ্ধ করে। যেমন: “তোমার ছোটবেলায় যেদিন তুমি খুনসুটি করেছিলে… মনে আছে?”—এমন প্রশ্নের ফলেও ব্যক্তি এমন কিছু বিশ্বাস করতে পারেন যা হয়নি। কোন ঘটনার পর ভুল তথ্য পেলে, সেই ভুলটাই আমাদের মূল স্মৃতিতে ঢুকে যায়।

নিউরোসায়েন্স কী বলছে?
স্মৃতি সংরক্ষণের পেছনে রয়েছে আমাদের হিপোক্যাম্পাস (hippocampus), অ্যামিগডালা (amygdala) ও প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স (prefrontal cortex)-এর মতো অংশগুলো। গবেষণায় দেখা গেছে, এই অংশগুলো যখন ভুলভাবে সক্রিয় হয় বা ভুল তথ্য পুনরায় encode করে, তখনই মিথ্যা স্মৃতি গড়ে ওঠে।

১৯৯৫ সালে Elizabeth Loftus নামের এক মনোবিজ্ঞানী এমন এক পরীক্ষায় অংশ নেন যেখানে তিনি অংশগ্রহণকারীদের মনে করান যে তারা শৈশবে শপিংমলে হারিয়ে গিয়েছিল। ফলাফল? অনেকেই স্পষ্টভাবে সেই হারিয়ে যাওয়ার স্মৃতি বর্ণনা করে ফেলেন, যা ছিল পুরোপুরি বানানো!

স্মৃতি কেবল তথ্যের গুদাম নয়, তা আবেগের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। Emotional tagging-এর মাধ্যমে আবেগপূর্ণ ঘটনা বেশি মনে থাকে, কিন্তু তা বিকৃতও হতে পারে। অনেক সময় খুব ভয়াবহ বা আনন্দময় ঘটনার স্মৃতি নাটকীয় হয়ে যায়, কারণ মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা তখন অতিরিক্ত সক্রিয় থাকে। আবার ট্রমা বা মানসিক যন্ত্রণার ক্ষেত্রে অনেকেই কিছুই মনে করতে পারেন না, এটিও একধরনের আত্মরক্ষামূলক ‘false memory’ বা স্মৃতিহীনতা।

আমাদের চারপাশের পরিবেশ, পরিবার, মিডিয়া সবকিছুই আমাদের স্মৃতি গঠনে প্রভাব ফেলে। Collective memory বা সম্মিলিত স্মৃতি অনেক সময় একাধিক মানুষের মধ্যে একসঙ্গে তৈরি হয়, যদিও ঘটনা সত্য নয়। ‘ম্যান্ডেলা ইফেক্ট’ (Mandela Effect) নামক একটি জনপ্রিয় ঘটনা যেখানে বহু মানুষ ভুল করে মনে করেন যে নেলসন ম্যান্ডেলা ১৯৮০-র দশকে কারাগারে মারা গিয়েছিলেন। বাস্তবে তা হয়নি। এই ধরণের মিথ্যা স্মৃতি ব্যক্তি নয়, পুরো সমাজজুড়ে ছড়ায়।

আমাদের মস্তিষ্ক কি ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল মনে রাখে?

এই প্রশ্নের উত্তরে হ্যাঁ এবং না দু’টোই বলা যায় । মস্তিষ্ক “ইচ্ছাকৃত”ভাবে ভুল মনে রাখে না ঠিকই, কিন্তু নিজের সুরক্ষার জন্য, মানসিক স্থিতি বজায় রাখতে, কিংবা স্মৃতির ফাঁক পূরণ করতে এমন স্মৃতি তৈরি করে, যেগুলো প্রকৃত সত্য নয়। কোনো ট্রমাটিক বা কষ্টকর স্মৃতি মস্তিষ্ক দমন করে রাখতে পারে বা বিকৃত রূপে মনে রাখতে পারে, এটা একটা survival mechanism।

False memory আমাদের শিক্ষা দেয় যে স্মৃতিকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করা ঠিক নয়। আমরা নিজেদের জীবনের গল্পগুলো নির্ভুলভাবে মনে রাখি, এই ধারণা বাস্তবে টেকে না। শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবী যারা মানুষের মুখের তথ্যের উপর নির্ভর করেন, তাদের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। শিশুদের ক্ষেত্রেও মিথ্যা স্মৃতি সহজেই তৈরি হতে পারে, বিশেষ করে যাদের মস্তিষ্ক এখনো পুরোপুরি গঠিত হয়নি। তাই শিশুদের সাক্ষ্য বা বক্তব্যের মূল্যায়ন করতে হলে এই দিকগুলো খেয়াল রাখা জরুরি।

এর সম্পূর্ণ প্রতিরোধ হয়তো সম্ভব নয়, তবে কিছু কৌশলে মিথ্যা স্মৃতির প্রভাব কমানো যায়। ঘটনা লিখে রাখা বা ডকুমেন্ট করা, Group discussion এ যাচাই করা, মনোযোগ দিয়ে শোনা ও সত্য যাচাই করা, আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রাখা।

স্মৃতি মানে শুধু তথ্যের সংগ্রহ নয়, এটা অনুভূতির, দৃষ্টিভঙ্গির, সমাজের ও মস্তিষ্কের যৌথ নির্মাণ। মিথ্যা স্মৃতি আমাদের শেখায় সত্যের ধারণা অনেক সময় আপেক্ষিক এবং মানুষের মন কতোটা জটিল।

লোককথা ও আমাদের শেকড়ের গল্প

আমাদের পূর্বপুরুষরা কীভাবে জীবনযাপন করতেন, কোন বিশ্বাসে তাঁরা পরিচালিত হতেন, অথবা কোন ঘটনা তাঁদের জীবনে গভীর ছাপ ফেলেছিল, এসব প্রশ্ন আমাদের মনে প্রায়ই উঁকি দেয়। ইতিহাসের পাতায় আমরা এর কিছু উত্তর খুঁজে পাই, কিন্তু সবটুকু নয়। সমাজের গভীরে প্রোথিত লোককথা, কিংবদন্তি, প্রবাদ-প্রবচন, গান এবং প্রথাগুলোই সেই নীরব ইতিহাসকে ধারণ করে, যা লিখিত দলিলপত্রে সবসময় পাওয়া যায় না। ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং গোষ্ঠীগত পরিচয় সংরক্ষণে লোককথার ভূমিকা অপরিহার্য; এটি কেবল গল্প বা বিনোদন নয়, বরং একটি সমাজের সম্মিলিত অভিজ্ঞতার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

ইতিহাস বলতে আমরা সাধারণত লিখিত দলিল, শিলালিপি বা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যকে বুঝি। কিন্তু মানব ইতিহাসের একটি বিশাল অংশ গোষ্ঠীগত ঐতিহ্যের মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে স্থানান্তরিত হয়েছে। লোককথা এই মৌখিক ঐতিহ্যের এক শক্তিশালী ধারক। যখন কোনো সম্প্রদায় একটি নির্দিষ্ট ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হয়, তখন সেই ঘটনার বিবরণ তাদের গল্পে, গানে বা প্রবাদে ঠাঁই করে নেয়।

বাংলাদেশের লোককথায় ১৭৭০ সালের মহাদুর্ভিক্ষ (ছিয়াত্তরের মন্বন্তর) বা ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের (পঞ্চাশের মন্বন্তর) ভয়াবহতা আজও নানা লোকগান ও ছড়ায় প্রতিফলিত হয়। দস্যুতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধবিগ্রহ, এমনকি কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির জন্ম-মৃত্যুও লোককথার বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে। এই লোককথাগুলো শুধু ঘটনা বর্ণনা করে না, বরং সেই ঘটনার প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি, নৈতিক অবস্থান এবং আবেগকেও ফুটিয়ে তোলে। মোগল শাসনের বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রতিরোধের গল্পগুলোতে সাধারণত শাসকগোষ্ঠীর শোষণ এবং সাধারণ মানুষের সাহসিকতা ও আত্মত্যাগকে মহিমান্বিত করা হয়। এটি কোনো নিছক গল্প নয়, একটি সম্প্রদায়ের ইতিহাসের প্রতি তাদের নিজস্ব ব্যাখ্যা, যা তাদের যৌথ স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখে। লিখিত ইতিহাসে হয়তো কেবল বিজয়ীর বয়ান থাকে, কিন্তু লোককথা পরাজিত বা সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতাকেও তুলে ধরে, যা সমাজের বৃহত্তর চিত্রকে সম্পূর্ণ করে।

প্রতিটি গোষ্ঠীর নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে যা তাদের অন্যদের থেকে আলাদা করে। এই বৈশিষ্ট্যগুলো তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম, ভৌগোলিক অবস্থান এবং অবশ্যই, তাদের ঐতিহ্যবাহী গল্প ও প্রথার মধ্যে নিহিত থাকে। লোককথা এই গোষ্ঠীগত পরিচয়ের মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করে। যখন একটি শিশু তার দাদী-নানির মুখে কল্পকাহিনীর পরিবর্তে নিজ অঞ্চলের বীরদের গল্প, স্থানীয় নদ-নদীর উৎপত্তির কিংবদন্তি অথবা নিজস্ব সম্প্রদায়ের লোকাচার বিষয়ক প্রবাদ শোনে, তখন তার মনে নিজ ভূমি ও পূর্বপুরুষদের প্রতি এক গভীর সংযোগ তৈরি হয়।

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোককথায় সেই অঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, কৃষিকাজ, মৎস্য শিকার, বা কারুশিল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত উপাখ্যান পাওয়া যায়। হাওর অঞ্চলের লোকগানে বাউলদের জীবনদর্শন এবং প্রকৃতির সাথে তাদের আত্মিক সম্পর্ক মূর্ত হয়ে ওঠে, যা সেই অঞ্চলের মানুষের এক স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয় বহন করে। একইভাবে উপজাতিয়দের লোককথা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য, পূর্বপুরুষদের মহৎ কাজ এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে তাদের সম্পর্কের এক গভীর ধারণা দেয়, যা তাদের স্বতন্ত্র অস্তিত্বকে সুদৃঢ় করে। এই গল্পগুলো কেবল তাদের বিনোদনই দেয় না, বরং তাদের যৌথ আত্মাকে সংজ্ঞায়িত করে। তারা শেখে তারা কারা, তাদের পূর্বপুরুষরা কী ছিলেন এবং তাদের মূল্যবোধগুলো কী।

লোককথা কেবল স্মৃতি বা পরিচয় সংরক্ষণ করে না, এটি একটি সমাজের অভ্যন্তরে সংহতি ও স্থিতিশীলতা আনতেও সাহায্য করে। যখন একটি সম্প্রদায়ের মানুষ একই গল্প শুনে বড় হয়, একই প্রথা পালন করে এবং একই প্রবাদবাক্য ব্যবহার করে, তখন তাদের মধ্যে এক ধরনের অদৃশ্য বন্ধন তৈরি হয়। এই সাধারণ সাংস্কৃতিক ভিত্তি তাদের একত্রিত করে এবং সামাজিক সংহতিকে শক্তিশালী করে। ঈদ, পূজা, নববর্ষ বা অন্যান্য স্থানীয় উৎসবের সাথে সম্পর্কিত লোককথা ও প্রথাগুলো এই সংহতিকে আরও দৃঢ় করে।

এছাড়া লোককথার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধের শিক্ষালয় হিসেবে কাজ করে। রাজা-রানীর গল্পে ন্যায়-অন্যায়ের বিচার, পশুপাখির রূপক গল্পে সততা-নিষ্ঠার শিক্ষা, বা ভূতের গল্পে অন্যায়ের শাস্তির বার্তা এগুলো সব সমাজের অলিখিত নিয়মাবলী। এই গল্পগুলো শিশুদের ছোটবেলা থেকেই ভালো-মন্দ, উচিত-অনুচিত সম্পর্কে ধারণা দেয় এবং তাদের সামাজিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। লোককথার মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সমাজের মৌলিক নৈতিক কাঠামো এবং আচরণের নিয়মাবলী প্রবাহিত হয়। এর ফলে সমাজের সদস্যগণ জানে কী আশা করা হয় এবং কীভাবে সমাজের সাথে মানিয়ে চলতে হয়।

ডিজিটাল যুগের বিস্তার সত্ত্বেও লোককথার প্রাসঙ্গিকতা মোটেই কমেনি, বরং এর রূপান্তরে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। বর্তমানে ইন্টারনেট ও সামাজিক মাধ্যমগুলো নতুন নতুন শহুরে কিংবদন্তি (Urban Legends) এবং মিমের (Memes) জন্ম দিচ্ছে, যা আধুনিক সমাজের উদ্বেগ, হাস্যরস এবং সামাজিক ধারাকে প্রতিফলিত করে। এই নতুন রূপগুলোও এক ধরনের লোককথা, যা দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে এবং সমসাময়িক সমাজের যৌথ স্মৃতি ও পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠছে। তথাপি পুরনো লোককথাগুলোর গুরুত্ব এখনো অপরিসীম।বিশ্বায়নের এই যুগে যখন বিভিন্ন সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটছে, তখন নিজেদের ঐতিহ্য ও মূলকে ধরে রাখা জরুরি হয়ে পড়েছে।লোককথাগুলো আমাদের সেই মূলের সাথে যুক্ত রাখে, আমাদের নিজস্বতা মনে করিয়ে দেয়। এই গল্পগুলো নতুন প্রজন্মের কাছে আমাদের শিকড়ের বার্তা পৌঁছে দেয় এবং তাদের মধ্যে নিজেদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ তৈরি করে।

বলা যায়, লোককথা নিছকই গল্প বা কল্পনার ফসল নয়, এটি একটি জাতির ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং গোষ্ঠীগত পরিচয়ের জীবন্ত স্মারক।এটি সমাজের বিবর্তন, সংগ্রাম, বিজয় এবং মূল্যবোধের এক বিশাল ভাণ্ডার। লোককথা ইতিহাসের ফাঁক পূরণ করে, সংস্কৃতিকে সংজ্ঞায়িত করে এবং সামাজিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করে। আমাদের উচিত এই অমূল্য ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে এর গুরুত্ব তুলে ধরা, যাতে ভবিষ্যতের পথযাত্রীরাও তাদের পূর্বপুরুষদের গৌরবময় উত্তরাধিকারকে জানতে পারে এবং নিজেদের পরিচয়ের সাথে সংযুক্ত থাকতে পারে।