Home Blog Page 56

প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার ও গুলির নির্দেশ, শেখ হাসিনার ফোনালাপের সত্যতা নিশ্চিত করলো – বিবিসি

বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথোপকথনের একটি ফাঁস হওয়া অডিও রেকর্ডিং থেকে জানা যায়, গত বছরের জুলাইয়ে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের অনুমতি তিনি নিজেই দিয়েছিলেন।

বিবিসি আইয়ের যাচাই করা ওই রেকর্ডিং অনুসারে, শেখ হাসিনা তাঁর নিরাপত্তা বাহিনীগুলোকে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ‘প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার’ করার অনুমতি দিয়েছেন এবং ‘তাঁরা (এসব বাহিনীর সদস্যরা) যেখানেই তাঁদের (আন্দোলনকারী) পাবেন, গুলি করবেন।’

অজ্ঞাতপরিচয় একজন ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে শেখ হাসিনার কথোপকথনের ফাঁস হওয়া অডিওটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ যে, তিনি সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের গুলি করার জন্য সরাসরি অনুমতি দিয়েছিলেন। বিবিসি আই-এর যাচাই করা ওই রেকর্ডিং অনুসারে, শেখ হাসিনাকে বলতে শোনা যায় — “ওপেন নির্দেশনা দিয়ে দিছি। এখন থেকে লেথাল উইপেন (প্রাণঘাতী অস্ত্র) ব্যবহার করবে। যেখানে পাবে সোজা গুলি করবে।”

ফাঁস হওয়া অডিওটি সম্পর্কে জানেন, এমন একটি সূত্র বিবিসিকে জানিয়েছে, গত ১৮ জুলাই নিজের সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে শেখ হাসিনা ওই ফোনালাপ করেন।

এই অডিও রেকর্ডটি জাতীয় টেলিযোগাযোগ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র (এনটিএমসি) কর্তৃক রেকর্ড করা ফোনকলগুলোর একটি, যারা সরকারিভাবে যোগাযোগ পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে।

চলতি বছরের মার্চের শুরুতে ফোনালাপের অডিওটি কে ফাঁস করেছেন, তা স্পষ্ট নয়। বিক্ষোভের পর থেকে শেখ হাসিনার কলের অসংখ্য ক্লিপ অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছে, যার অনেকগুলোই যাচাই করা হয়নি।

গত ১৮ জুলাইয়ের ফাঁস হওয়া রেকর্ডিংয়ের কণ্ঠের সঙ্গে শেখ হাসিনার কণ্ঠস্বরের মিল শনাক্ত করেছে বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ।

বিবিসি আলাদাভাবে ইয়ারশটের অডিও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের দিয়ে এ রেকর্ডিংয়ের সত্যতা যাচাই করেছে। তাঁরা এটিতে এডিট করার বা কোনো রকম পরিবর্তন করার কোনো প্রমাণ পাননি। অডিওটি কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়েছে, এমন সম্ভাবনাও খুবই কম বলে তাঁরা জানিয়েছেন।

মানবাধিকার বা পরিবেশ রক্ষার ইস্যুতে অডিও-সংক্রান্ত তদন্তের কাজ করে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ইয়ারশট। তারা বলছে, ফাঁস হওয়া রেকর্ডিংটি সম্ভবত এমন একটি ঘরে ধারণ করা হয়েছিল, যেখানে ফোনকলটি স্পিকারে বাজানো হয়েছিল। কারণ, এতে স্বতন্ত্র টেলিফোনিক ফ্রিকোয়েন্সি ও ব্যাকগ্রাউন্ডে কিছু শব্দ ছিল।

ইয়ারশটের বিশেষজ্ঞরা রেকর্ডিংজুড়ে ইলেকট্রিক নেটওয়ার্ক ফ্রিকোয়েন্সি বা ইএনএফ শনাক্ত করেছেন। যে ফ্রিকোয়েন্সি অন্য একটি ডিভাইস থেকে অডিও রেকর্ডিংয়ের ক্ষেত্রে প্রায়ই উপস্থিত থাকে। এটি এমন এক সূচক, যার মানে হলো অডিওটিতে হেরফের করা হয়নি।

ইয়ারশটের বিশেষজ্ঞরা শেখ হাসিনার বক্তব্যে ছন্দ, স্বর ও শ্বাসের শব্দ বিশ্লেষণ করেছেন এবং ধারাবাহিক নয়েজের স্তরও শনাক্ত করেছেন। অডিওতে কৃত্রিম কোনো পরিবর্তন আনার প্রমাণ তাঁরা খুঁজে পাননি।

ব্রিটিশ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনজীবী টবি ক্যাডম্যান বিবিসিকে বলেছেন, রেকর্ডিংগুলো তাঁর (শেখ হাসিনার) ভূমিকা প্রমাণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো স্পষ্ট ও সঠিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে এবং অন্যান্য প্রমাণ দ্বারা সমর্থিত।

ষড়যন্ত্র তত্ত্ব – টিকা কি অটিজমের কারণ?

শুরুটা হয়েছিল একটা গবেষণা থেকে, ১৯৯৮ সাল, The Lancet নামক প্রভাবশালী মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত হয় অ্যান্ড্রু ওয়েকফিল্ড নামক এক ব্রিটিশ চিকিৎসকের গবেষণা। গবেষণাটি দাবি করে, এমএমআর (হাম, রুবেলা ও মাম্পস) টিকা গ্রহণের পর শিশুদের মধ্যে অটিজমের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। খবরটি চারদিকে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে। গণমাধ্যম উত্তপ্ত, অভিভাবকরা আতঙ্কিত এবং বিজ্ঞানীদের মুখে অস্পষ্ট উদ্বেগ। বিজ্ঞান যেমন প্রমাণ দাবি করে, তেমনই ভুল তথ্যের বিপরীতে সত্য উদঘাটনের কাজও তার। তাই শুরু হয় অনুসন্ধান।

ওই গবেষণার ওপর একের পর এক অনুসন্ধান চালাতে থাকে বিভিন্ন গবেষক দল। দেখা যায় ওয়েকফিল্ডের গবেষণায় অসংখ্য গলদ ছিল।অংশগ্রহণকারী শিশুর সংখ্যা ছিল মাত্র ১২ জন। কোন কন্ট্রোল গ্রুপ ছিল না। কিছু তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবেও গোপন করা হয়েছিল। টিকা নির্মাতাদের বিরুদ্ধে মামলা চালাতে অর্থনৈতিক স্বার্থ ছিল ওয়েকফিল্ডের। ২০১০ সালে The Lancet অফিসিয়ালি গবেষণাটি প্রত্যাহার করে নেয়। ওয়েকফিল্ডের মেডিকেল লাইসেন্সও বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু ততদিনে স্থায়ী দাগের মতো এক অদ্ভুত ভয় ঢুকে গেছে ।

এই ভয় কিভাবে ছড়িয়ে পড়ে?
মানুষের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া খুব সহজ, বিশেষ করে যদি সেই ভয়টি সন্তানদের ঘিরে হয়। ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো সাধারণত কিছু জিনিসের আশ্রয় নেয়, সরকার, ওষুধ কোম্পানি, বিজ্ঞানীদের ওপর বিশ্বাস না রাখা। ভীতিকর গল্প ও ইন্টারনেটের ছায়া জগৎ যেখানে তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজন পড়ে না, কেবল বিশ্বাসের রসদই যথেষ্ট, বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে “মা’রা জানেন”, “প্রাকৃতিক চিকিৎসাই নিরাপদ” জাতীয় পোস্ট ও ভিডিও অদ্ভুতভাবে জনপ্রিয় হতে থাকে। Anti-vax Movement ধীরে ধীরে একধরনের সংস্কৃতি হয়ে যায়, যার ভাষা হচ্ছে অবিশ্বাস এবং যার ধর্ম হচ্ছে বিকল্প সত্য।

আজ অবধি ২৫টিরও বেশি বড় আকারের গবেষণা, কয়েক লক্ষ শিশুকে পর্যবেক্ষণ করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, কোনো টিকা এবং অটিজমের মধ্যে কোনো বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক নেই।

২০১৫ সালে ডেনমার্কে ৬,৫০,০০০ শিশুর ওপর গবেষণায় প্রমাণ হয় এমএমআর টিকার সঙ্গে অটিজমের সম্পর্ক নেই। ২০১৯ সালে জার্নাল অব অ্যামেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনে প্রকাশিত আরেকটি বিশ্লেষণেও একই ফলাফল উঠে আসে।

অটিজম তাহলে কোথা থেকে আসে?
বিজ্ঞানীরা বলছেন, জেনেটিক (বংশগত) এবং নিউরোডেভেলপমেন্টাল ফ্যাক্টর এর মিলিত প্রভাবেই অটিজম তৈরি হয়। গর্ভাবস্থায় মায়ের স্বাস্থ্যের অবস্থা, পরিবেশগত বিষাক্ততা, এমনকি জিনগত মিউটেশন এসবই হতে পারে অটিজমের কারণ। কিন্তু টিকা? একেবারেই নয়।

আমরা যখন টিকা নিয়ে সন্দিহান হই, তার প্রভাব পুরো সমাজে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৯ সালে হাম রোগে আক্রান্ত হয় প্রায় ১,২০০ জন। বেশিরভাগই টিকা নেয়নি। ইউরোপে টিকা বিরোধী আন্দোলনের কারণে বিলুপ্তপ্রায় রোগ আবার ফিরে আসে। কোভিড-১৯ মহামারির সময়ও এই অবিশ্বাস মানুষের টিকা নেওয়ার আগ্রহ কমিয়ে দেয়, যার ফলে মৃত্যু ও সংক্রমণ বাড়ে। এমনকি WHO-এর মতে, “Vaccine Hesitancy” বা টিকা নিতে ভয় পাওয়া এখন বিশ্বের শীর্ষ ১০ জনস্বাস্থ্য হুমকির একটি। একটি ভুল তথ্যের দাগ শুধু নিজের নয়, সমাজের প্রতিটি দুর্বল শরীরে পৌঁছায়।

ষড়যন্ত্র তত্ত্ব মানে কেবল ভুল তথ্য নয়, এটি এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক স্বস্তি। বিশেষ করে যাদের সন্তান অটিজমে আক্রান্ত, তারা কোনো কারণ খুঁজে নিতে চায়। টিকাকে দোষী বানিয়ে মনটা হালকা হয়। এই কারণ খোঁজা আসলে নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার চেষ্টা।

এছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম যা বিশ্বাস করে তাই দেখায়, তাতেই আমরা ঘুরেফিরে দেখি একদল লোক যারা বলে, “আমরাই জানি আসল সত্য”। তখন বিজ্ঞানকে মনে হয় সরকারের হাতের পুতুল, আর অ্যান্ড্রু ওয়েকফিল্ড হয়ে ওঠেন বিপ্লবী। ষড়যন্ত্র তত্ত্বের সবচেয়ে বড় শক্তি বাস্তবতার ছদ্মবেশ।

অটিজম নিয়ে প্রশ্ন করা খারাপ নয়। প্রশ্ন করা মানে সচেতন হওয়া। কিন্তু প্রশ্নের উত্তর যেন হয় প্রমাণভিত্তিক, গবেষণাভিত্তিক এবং বিজ্ঞানসম্মত। আমরা ভুলে যাই যে সব রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের বাবা-মা শতাব্দীর পর শতাব্দী লড়েছে, সেইসব রোগ আজ নির্বিকার এক ইঞ্জেকশনে নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এটা অলৌকিক নয়, এটা বিজ্ঞান। টিকা এবং অটিজম এ দুটি একে অপরের বিপরীত বলয়ের বাসিন্দা। একটিকে দোষী বানিয়ে আমরা আরেকটি সত্য থেকে চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছি।

মূল্যস্ফীতি কমে ৮.৪৮%, ২ বছরের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী — জুনে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি হার কমে ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। মে মাসে তা ছিল ৯ দশমিক ০৫ শতাংশ। জুনে মূল্যস্ফীতি গত দুই বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন হয়েছে।

২৭ মাস পর প্রথমবারের মতো মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নামল। খাদ্য এবং খাদ্য-বহির্ভূত উভয় পণ্যে দাম কমায় মূল্যস্ফীতি এতটা কমেছে।

জুনে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি কমে হয় ৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ। আগের মাসে তা ছিল ৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ। এর ফলে নিম্ন আয়ের মানুষ কিছুটা স্বস্তি পাবেন।

খাদ্য-বহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতিও সামান্য কমে মে মাসের ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ থেকে জুনে হয়েছে ৯ দশমিক ৩৭ শতাংশ।

২০২৩ সালের মার্চে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের উপরে ওঠে, এবং গত মাস পর্যন্ত ৯ শতাংশের ঘরেই ছিল মূল্যস্ফীতি। বিগত ২৭ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ২০২৪ সালের জুলাই মাসে।

প্রতিরোধের কৌতুক ভাষা meme

আজকের ডিজিটাল যুগে “মিম” (meme) শুধুমাত্র কৌতুক বা বিনোদনের উপকরণ নয়, বরং এটি নতুনধরনের সাংস্কৃতিক ভাষা। মিমের মাধ্যমে মানুষ নিজেদের অভিব্যক্তি, মতামত, ক্ষোভ, বিদ্রূপ বা স্মৃতি প্রকাশ করে। এখন এটি একটি লোকজ ডিজিটাল শিল্প, যা কখনও কখনও সোশ্যাল মিডিয়ায় রাষ্ট্র, রাজনীতি, লিঙ্গ, শ্রেণি বা সংস্কৃতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। চলুন দেখি কীভাবে মিম শুধু হাসির খোরাক নয়, বরং একটি প্রভাবশালী সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রতিবাদের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

“মিম” শব্দটির গোড়াপত্তন করেন জীববিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স। ১৯৭৬ সালে তাঁর লেখা The Selfish Gene বইয়ে তিনি “meme” শব্দটি ব্যবহার করেন, একটি আইডিয়া বা আচরণ যা এক ব্যক্তি থেকে আরেক জনের মাঝে সংস্কৃতি হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় “মিম” ছিল বুদ্ধি, আচার বা সংস্কৃতির বীজ। তবে ২১শ শতকে এসে, বিশেষত ফেসবুক, টুইটার, রেডিট বা ইনস্টাগ্রামের যুগে, এই ধারণাটি রূপ নেয় ডিজিটাল ছবির সঙ্গে সংক্ষিপ্ত টেক্সটের সংমিশ্রণে।

একটি মিম হয়তো অল্প কিছু শব্দ ও একটি ছবির সমন্বয়, কিন্তু তাতেই থাকতে পারে গভীর রাজনৈতিক ইঙ্গিত বা সাংস্কৃতিক সমালোচনা। যেমন: সরকারী দুর্নীতিকে ব্যঙ্গ করা, লোডশেডিং নিয়ে জনগণের ক্ষোভ প্রকাশ, নারীর প্রতি সমাজের দ্বিচারিতা তুলে ধরা। এই ব্যঙ্গাত্মক ও বুদ্ধিদীপ্ত উপস্থাপনা এমনভাবে সাজানো হয়, যা সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, এমনকি যারা রাজনীতি নিয়ে সাধারণত আলোচনা করেন না, তাঁরাও মিমের মাধ্যমে সেই বাস্তবতা অনুভব করতে পারেন।

পৃথিবীর জুড়ে রাজনৈতিক আন্দোলনের একটি ডিজিটাল রূপ হয়ে উঠেছে মিম। হংকং-এর বিক্ষোভ, ভারতীয় CAA বিরোধী আন্দোলন, বা মার্কিন Black Lives Matter আন্দোলনে মিম ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয়েছে। মজার বিষয় হলো, এই মিমগুলো রাষ্ট্রযন্ত্রের চোখ ফাঁকি দিয়েও সামাজিক বার্তা পৌঁছে দিতে পেরেছে।

একদিকে সংবাদমাধ্যমে যেখানে নানা ধরনের নিয়ন্ত্রণ বা সেন্সরশিপ রয়েছে, অন্যদিকে মিম এই বাধা ভেঙে ফেলে। সে কারণে অনেকেই বলছেন “মিম হচ্ছে আধুনিক যুগের বিপ্লবের অংশ”। বাংলাদেশেও ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন, কোটা সংস্কার, বিদ্যুৎ সংকট কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালার বিরুদ্ধে ছাত্রদের প্রতিবাদে মিম বড় ভূমিকা পালন করেছে। এক ধরণের “ডিজিটাল দেয়াল লিখন” হিসেবেও কাজ করছে এই মাধ্যম।

মিম শুধু রাজনৈতিক নয়, সামাজিক সংস্কৃতির আয়নাও। বিয়ে বা যৌতুক নিয়ে মিমে যেমন হাস্যরস থাকে, তেমনি এতে লুকিয়ে থাকে সামাজিক সমালোচনাও। নারীবাদী মিম নারীর অধিকারের পক্ষেও কথা বলে, আবার কখনও তীব্রভাবে পুরুষতান্ত্রিক প্রতিক্রিয়াও প্রকাশ করে। বেকারত্ব, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক জটিলতা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক, সবই মিমের বিষয়। এমনকি লোকজ সংস্কৃতির উপাদান প্রবাদ, কথাবার্তা, গান—সবকিছু মিমের ভেতর ঢুকে গিয়ে এক নতুন আধুনিক রূপ পেয়েছে।

মিম কি শুধুই প্রতিরোধ?
সব মিম যে ন্যায়ের পক্ষে কথা বলে, এমনও নয়। কিছু মিম sexist, racist বা hate speech-এও পরিণত হয়। বিশেষ করে ট্রোল সংস্কৃতি যেভাবে কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করে, তা সামাজিক সহনশীলতাকে ধ্বংস করে দিতে পারে। তবে এটাও সত্য, যে মিম একটি ন্যারেটিভ যুদ্ধের ময়দান। এখানে কোন গল্পটি প্রতিষ্ঠা পাবে, সেটি অনেক সময় নির্ধারণ করে এই হিউমারের ভাষায় বলা ব্যঙ্গচিত্র।

মিমের আরও একটি দিক হলো এটি একটি “লোকজনভিত্তিক মাধ্যম”। সবার জন্য এটি সমানভাবে খোলা। স্মার্টফোন থাকলেই কেউ নিজের অভিজ্ঞতা, কষ্ট, বা মতামতকে একটি মিম আকারে প্রকাশ করতে পারে। এই সহজলভ্যতা মিমকে একটি গণসংস্কৃতি করে তুলেছে, যা প্রচলিত সংস্কৃতি’র কাঠামোকে ভেঙে দিয়েছে।

মিমের জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে এর সহজবোধ্যতা, হাস্যরস, এবং রিলেট করার ক্ষমতা। একজন তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, একজন মধ্যবয়সী চাকরিজীবী কিংবা একজন গৃহিণী সবার কাছেই এক একটি মিম তাদের জীবনের কোনো না কোনো বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয়। এটি এমন এক সাংস্কৃতিক মাধ্যম যা একদিকে আনন্দ দেয়, অন্যদিকে সমাজ সম্পর্কে চিন্তা করতে বাধ্য করে। এই দ্বৈত চরিত্রই মিমকে করে তুলেছে শক্তিশালী।

মিম সংস্কৃতি এখন আর শুধুমাত্র হাসির নয়। এটি আজকের তরুণ সমাজের প্রতিবাদের ভাষা, রুচির প্রতিফলন এবং সমাজব্যবস্থার এক চৌকস সমালোচক। মিমের মধ্য দিয়ে নতুন ধরণের সাংস্কৃতিক ভাষা তৈরি হয়েছে, যা একদিকে রাজনৈতিক, অন্যদিকে লোকজ। মিমের শক্তি এর চঞ্চলতায় নয়, বরং এর তীক্ষ্ণতায়। যতদিন মানুষ ব্যঙ্গ করবে, প্রশ্ন তুলবে, ভাববে এবং শেয়ার করবে ততদিন মিম সংস্কৃতি কেবল টিকে থাকবে না, বরং সংস্কৃতির নতুন ধারাকে চালিত করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক বিরতির মেয়াদ শেষ, বিশ্ববাজারে স্থিতিশীলতা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত ৯০ দিনের শুল্ক বিরতির মেয়াদ বুধবার শেষ হচ্ছে। তবে এই গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমার সমাপ্তি বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্বেগ তৈরি করেনি। বরং বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শুল্ক নিয়ে চলমান অনিশ্চয়তা ও দোদুল্যমানতার কারণে এখনই কোনো বড় ধরনের অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা কম। ফলে বিশ্ববাজারে এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত দেখা যাচ্ছে।

২ এপ্রিল ‘লিবারেশন ডে’ উপলক্ষে ট্রাম্প যে নতুন শুল্ক পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিলেন, তার অংশ হিসেবে আজ ১২টি দেশের কাছে শুল্কহারসংক্রান্ত প্রথম চিঠি পাঠানোর কথা। এত বড় একটি পদক্ষেপের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বড় ধরনের কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে না যাওয়া বাজারের স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত বহন করে।

নিউইয়র্কভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান নিউবার্গার বারম্যানের সহপ্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা জেফ ব্লেজেক বলেন, “বিশ্ববাজার এখন শুল্কসংক্রান্ত খবর নিয়ে আর তেমন উদ্বিগ্ন নয়। বরং বাজার অনেকটাই আত্মবিশ্বাসী ও স্থির অবস্থায় রয়েছে। ট্রাম্পের সময়সীমা নিয়ে অবস্থান খুব একটা কঠোর নয়। তাই বড় কোনো চমক না এলে বাজার ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কম।” তার এই মন্তব্য বাজারের বর্তমান মানসিকতাকেই তুলে ধরে।

সম্প্রতি ট্রাম্প শুল্কহার ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন, যা আগের ঘোষিত ১০-৫০ শতাংশের সীমার তুলনায় অনেক বেশি। এই শুল্ক আগামী ১ আগস্ট থেকে কার্যকর হতে পারে। তবে এমন কঠোর ঘোষণাও বিশ্ববাজারে বড় ধরনের কোনো প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হয়েছে।

এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র কেবল যুক্তরাজ্যের সঙ্গে একটি সীমিত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করতে পেরেছে এবং ভিয়েতনামের সঙ্গে একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছেছে। অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে যে চুক্তির আশা করা হচ্ছিল, তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। জাপানের সঙ্গেও আলোচনা খুব একটা এগোয়নি।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে চলমান আলোচনাও বিভিন্ন কারণে স্থবির হয়ে পড়েছে। বাণিজ্যিক অগ্রগতির এই ধীর গতি সত্ত্বেও বৈশ্বিক শেয়ারবাজার চাঙ্গা রয়েছে। ২ এপ্রিলের পর থেকে বিশ্ব শেয়ারবাজারে ১১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। শুরুর দিকে তিন কার্যদিবসে বাজার ১৪ শতাংশ পড়ে গেলেও পরবর্তী সময়ে ২৪ শতাংশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে, যা বাজারের স্থিতিস্থাপকতা প্রমাণ করে। গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ও ন্যাসডাক সূচক রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। ইউরোপের শেয়ারবাজার সূচক স্টক্স ৬০০ গত তিন মাসে ৯ শতাংশ বেড়েছে।

সিঙ্গাপুরভিত্তিক ইস্টস্প্রিং ইনভেস্টমেন্টসের পোর্টফোলিও ম্যানেজার রঙ রেন গো পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করে বলেন, “লিবারেশন ডে যদি ভূমিকম্প হয়, তাহলে শুল্ক চিঠিগুলো হবে আফটারশক। তবে এগুলোর প্রভাব আগের মতো তীব্র হবে না।”

বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে এত বেশি তারল্য (liquidity) রয়েছে যে অনেক বিনিয়োগকারী শুরুতে ঝুঁকি এড়াতে শেয়ার বিক্রি করেছিলেন।কিন্তু শেয়ারবাজার দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোয় এখন তারা আবার বিনিয়োগে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন, যাতে বাজারের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেন।

এদিকে ট্রাম্পের নতুন কর ও ব্যয়সংক্রান্ত বিলটি মার্কিন কংগ্রেসে দীর্ঘ বিতর্কের পর গত সপ্তাহে পাস হয়েছে। এতে ২০১৭ সালের করছাড় স্থায়ী করা হয়েছে, যা শেয়ারবাজার ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে। তবে বন্ডবাজার কিছুটা সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। কারণ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিলটি বাস্তবায়নে সরকারের ঋণ ৩ লাখ কোটি বা ৩ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে। এই কারণে ডলার সূচক ও মার্কিন ট্রেজারি বন্ড কিছুটা চাপের মুখে পড়েছে। বছরের প্রথমার্ধে ডলার সূচক ১১ শতাংশ কমেছে, যা ১৯৭৩ সালের পর সবচেয়ে খারাপ পারফরম্যান্স। শুধুমাত্র ২ এপ্রিল থেকে এখন পর্যন্ত সূচকটি ৬.৬ শতাংশ কমেছে।

বোস্টনভিত্তিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান টুইনফোকাসের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা জন পানটেকিডিস বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার চলতি বছর ভালো করতে পারে। তবে বর্তমানে সুদহার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বন্ডবাজার যদি সরকারি ব্যয় নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে এবং সুদহার বেড়ে যায়, তাহলে বাজারের চিত্র পুরোপুরি বদলে যেতে পারে।” সব মিলিয়ে শুল্কের সময়সীমা শেষ হতে চললেও বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা পরিস্থিতিকে ঠাণ্ডা মাথায় মোকাবেলা করছেন। বাজারের এই স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাসী মনোভাব বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।

১০ লাখ রোবট ব্যবহার করছে আমাজন, কমছে মানবকর্মীর সংখ্যা

বিশ্ববিখ্যাত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আমাজন তাদের গুদামগুলোতে অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয়তার নতুন এক মাইলফলকে পৌঁছেছে।যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী গণমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ জানিয়েছে, জাপানের একটি গুদামে আমাজন সম্প্রতি তাদের ১০ লাখতম রোবট ব্যবহার শুরু করেছে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিগগিরই গুদামগুলোতে মানুষের সমানসংখ্যক রোবট কাজ করতে পারে, যা প্রতিষ্ঠানটির জন্য একটি বড় অগ্রগতি হলেও কর্মীদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

২০২১ সালে আমাজনের গুদামে ছিল ৩ লাখ ৫০ হাজার রোবট। সেখান থেকে মাত্র চার বছরে সংখ্যাটি প্রায় তিনগুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ লাখে। প্রতিবছর গড়ে ১ লাখ ৬২ হাজার ৫০০টি নতুন রোবট যুক্ত হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে।

শুরুতে আমাজনের রোবটগুলো দেখতে ছিল ঘর পরিষ্কার করার রুমবার রোবটের মতো, যেগুলো উঠিয়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যেত। তবে ২০২৩ সালে প্রথমবারের মতো প্রতিষ্ঠানটি মানুষের মতো দেখতে (হিউম্যানয়েড) রোবট চালু করে।

শুধু গুদামে নয়, আমাজন এখন ‘লাস্ট মাইল ডেলিভারি’ বা ডেলিভারির শেষ ধাপেও রোবট ব্যবহারের চেষ্টা করছে। এতে তাদের পুরো ডেলিভারি চেইনে রোবটের প্রভাব আরও বাড়বে।

রোবট ব্যবহারের কারণে প্রতিটি গুদামে কর্মীসংখ্যা গড়ে মাত্র ৬৭০, যা গত ১৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০১৫ সালে যেখানে প্রতিজন কর্মী গড়ে ১৭৫টি প্যাকেজ হ্যান্ডেল করতেন, এখন সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৮৭০-এ।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, রোবট ব্যবহারে ২০৩০ সালের মধ্যে আমাজন বছরে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করতে পারবে। তবে এতে মানবকর্মীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

আমাজন জানায়, ২০১৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত তারা ৭ লাখের বেশি কর্মীকে নতুন প্রযুক্তির ওপর প্রশিক্ষণ দিয়েছে। তাদের মতে, রোবট আসার ফলে নতুন ধরনের কাজের সুযোগও তৈরি হচ্ছে।

তবে কিছু চাকরি হারানো অনিবার্য হয়ে উঠছে। এমনকি আমাজনের করপোরেট কর্মীদেরও সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী অ্যান্ডি জ্যাসি। তার মতে, আগামী কয়েক বছরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) করপোরেট পর্যায়েও কিছু চাকরি কেড়ে নেবে।

মানবজন্মের ভবিষ্যৎ

জন্ম একসময় ছিল একান্তই প্রাকৃতিক, স্বাভাবিক ও পারিবারিক অভিজ্ঞতা। কিন্তু তাও আজ প্রযুক্তির ছায়ায় নতুন এক ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বিজ্ঞান, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, কৃত্রিম গর্ভাশয়, ক্লোনিং ও ডেটা অ্যানালিটিক্স এইসব নতুন প্রযুক্তির আলোকে জন্ম এখন শুধুই শারীরবৃত্তীয় কোনো প্রক্রিয়া নয়, বরং রাজনৈতিক, নৈতিক ও সামাজিক এক জটিল বাস্তবতা। তাহলে ভবিষ্যতে মানুষ জন্মাবে কীভাবে? কে সিদ্ধান্ত নেবে জন্মের?

মা হবেন যন্ত্র?

বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যেই “External Womb” বা বাইরের গর্ভাশয় প্রযুক্তিতে অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জন করেছেন। ইজরায়েলের গবেষকরা ২০২১ সালে প্রথমবারের মতো কৃত্রিমভাবে ভ্রূণকে গর্ভাশয়ের বাইরে ২১ দিন পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখেন। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি যদি মানুষের উপর প্রয়োগযোগ্য হয়, তবে মা হওয়া মানে আর নিজের শরীরে সন্তান ধারণ করা নয়। এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী।মাতৃত্ব তখন আর শুধু নারীর ভূমিকায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, সমাজে পিতৃত্ব, মাতৃত্ব ও অভিভাবকত্বের ধারণা বদলে যাবে। ধনী পরিবার বা রাষ্ট্রগুলো নিজেদের মতো করে শিশু তৈরি করতে পারবে। ফলে জন্ম একটি সামাজিক শ্রেণি বিভাজনের উপকরণ হয়ে উঠতে পারে।

জন্মের আগেই শিশুর চোখের রঙ, উচ্চতা, বুদ্ধিমত্তা এমনকি চারিত্রিক গঠনও নির্ধারণ করা সম্ভব, এখন এটি আর সাই-ফাই নয়।CRISPR নামক প্রযুক্তি দিয়ে মানব-ডিএনএ সম্পাদনার (gene editing) মাধ্যমে ‘ডিজাইনার বেবি’ তৈরি করা যাচ্ছে। এটি এখনো নৈতিকভাবে বিতর্কিত ও নিয়ন্ত্রিত হলেও কিন্তু ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি আরও জনপ্রিয় হতে পারে।

ধনী ও প্রযুক্তিসম্পন্ন পরিবাররা সুপার-চাইল্ড তৈরি করতে পারবে, ফলে সমাজে জিনগত শ্রেণীবিন্যাস গড়ে উঠতে পারে। ডারউইনের ‘Survival of the Fittest’-এর ধারণা মুছে গিয়ে তা হয়ে উঠবে ‘Designed to be the Fittest’।

ভবিষ্যতের জন্ম মানেই শুধুমাত্র দেহগত অস্তিত্ব নয়, তথ্যগত অস্তিত্বও। আজ জন্মের সাথে সাথে শিশুর পরিচয় বায়োমেট্রিক, জিনোম সিকোয়েন্সিং, স্বাস্থ্য ডেটা ইত্যাদির মাধ্যমে ডিজিটালি সংরক্ষিত হচ্ছে। এই তথ্যগুলো ভবিষ্যতে হবে নিয়ন্ত্রণের অস্ত্র।রাষ্ট্র বা কর্পোরেট সংস্থা জন্মের সাথে সাথেই শিশুর সম্ভাব্য ভবিষ্যত নির্ধারণ করতে পারবে। স্বাধীনতার প্রশ্ন আসলে, জন্ম কি তখন একটি ব্যক্তি অধিকার হবে, নাকি একটি প্রি-ডেটারমিনড পণ্য?

ভবিষ্যতে শুধু মানুষের শরীর থেকে নয়, কৃত্রিমভাবে তৈরি ক্লোন বা এমনকি এআই সন্তানের ধারণাও বাস্তব হয়ে উঠছে। ইতিমধ্যেই রোবট সন্তানের ধারণা এবং ভার্চুয়াল চাইল্ড অ্যাডপশন নানান দেশে জনপ্রিয় হচ্ছে।

একটি শিশুর সাথে আবেগ, পরিচর্যা ও ভালোবাসা এগুলো যদি এআই সন্তানের সাথেও সম্ভব হয়, তবে মানুষ জন্ম কি শুধুই জৈবিক থাকবে? ক্লোন সন্তানের উত্তরাধিকার, পরিচয়, মানবাধিকার এসব এখনো সম্পূর্ণ অজানা এবং অনিয়ন্ত্রিত এলাকা।

যে সমাজ একসময় জন্মকে ঈশ্বর-নির্ভর বা নিয়তি-নির্ভর মনে করত, সেই সমাজ আজ জন্মকে তথ্য, অর্থ ও প্রযুক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। ভবিষ্যতের জন্ম জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকে নতুন অর্থ দেবে। প্রযুক্তির মাধ্যমে জন্ম সীমিত বা অতি নির্ধারিত হলে প্রাকৃতিক জনসংখ্যা ঘাটতি/বৃদ্ধির ওপর প্রভাব পড়বে।

জন্ম একসময় কেবলমাত্র দেহ, আবেগ ও সম্পর্কের উৎস ছিল, তা ভবিষ্যতে হয়ে উঠতে পারে প্রোগ্রামড, ইঞ্জিনিয়ারড ও নিয়ন্ত্রিত ঘটনা। প্রশ্ন উঠছে মানুষ কি কেবল জন্ম নেবে, নাকি ভবিষ্যতে তাকে তৈরি করা হবে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু বিজ্ঞানের হাতে নয়, সমাজ, নৈতিকতা ও রাজনীতির হাতেও।

Water as Power – দক্ষিণ এশিয়ার নদী রাজনীতি

জল একদিকে জীবন ধারণের মূল উপাদান, অন্যদিকে এটি হয়ে উঠেছে আধুনিক রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে শক্তি, দখল ও আধিপত্যের প্রতীক।দক্ষিণ এশিয়ায় বিশেষত বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও চীন, এই অঞ্চলের নদীগুলো শুধু প্রকৃতির সৃষ্টি নয়, বরং একটি কূটনৈতিক অস্ত্র, যা দিয়ে গঠন বা ভাঙা হয় ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য। নদী নিয়ে এই রাজনীতি সবচেয়ে প্রকট হয়ে ওঠে তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও ইন্দাস নদীর জলবণ্টন ইস্যুতে।

নদী মানেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা?

“Water is the new oil” এই কথাটি বিশ্ব রাজনীতিতে আজ আর নিছক কবিত্ব নয়। নদী যার নিয়ন্ত্রণে, তার হাতে একপ্রকার ভৌগোলিক অস্ত্র থাকে। ভারতের মতো নদীর উজান রাষ্ট্র যদি ইচ্ছাকৃতভাবে পানি আটকে রাখে বা অতিরিক্ত ছেড়ে দেয়, তবে ভাটির দেশ বাংলাদেশ হয়ে পড়ে দুর্বল ও জিম্মি। আর এই ক্ষমতাকে ব্যবহার করা হয় রাজনৈতিক দরকষাকষিতে, কখনও সরাসরি আবার কখনও গোপনে।

তিস্তা নদী মূলত ভারত ও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। ১৯৮৩ সাল থেকেই উভয় দেশ এই নদীর পানি বণ্টন নিয়ে আলোচনা করে আসছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ চুক্তি হয়নি। কেন? একদিকে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার চুক্তির পক্ষে থাকলেও, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার, বিশেষত মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এর বিরোধিতা করে থাকেন। ফলে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিশ্রুতিও বারবার ভেস্তে যায়। এখানে বোঝা যায় রাজ্য ও কেন্দ্রের দ্বন্দ্বের মাঝখানে পড়ে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক! বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে তিস্তার পানি নির্ভরতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চুক্তি না হওয়ায় খরা, চাষাবাদের ব্যাঘাত ও পানির সঙ্কট স্থানীয় জনগণের জন্য একটা দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা তৈরি করেছে।

ব্রহ্মপুত্র নদ চীন থেকে শুরু হয়ে ভারতে প্রবেশ করে এবং পরে বাংলাদেশে এসে মিশে যায় যমুনায়। এই নদী নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হচ্ছে চীনের ‘ড্যাম কূটনীতি’। চীন ইতিমধ্যে নদীর উজানে একাধিক বাঁধ নির্মাণ করেছে, যার ফলে ভারতের অরুণাচল প্রদেশে এবং বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে পানির প্রবাহে পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। চীনের এই একতরফা পানি ব্যবস্থাপনা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য একধরনের জিওপলিটিক্যাল হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্ন উঠছে—চীন যদি একদিন পুরো নদীর উৎস নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়, তবে ভারত বা বাংলাদেশ কীভাবে নিজেদের ভূখণ্ডের সেচ, পানীয় ও কৃষিনির্ভর জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করবে?

১৯৬০ সালে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের মধ্যে ইন্দাস নদীর পানি বণ্টন নিয়ে ইন্দাস ওয়াটার ট্রিটি নামে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি হয়।বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় তৈরি এই চুক্তি অনেক সময় পানি নিয়ে সংঘাত রোধ করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের রাজনৈতিক কৌশল ও উত্তেজনার জেরে মোদি সরকার ইন্দাস চুক্তিকে ‘পুনর্বিবেচনার হুমকি’ দিয়েছে। এতে পাকিস্তান একে রাজনৈতিক চাপ হিসেবে দেখছে। এটি একধরনের water weaponization পানি দিয়ে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করা।

নদী কূটনীতিতে আজ আর শুধু রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরফগলা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও খরার প্রকোপ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। এই পরিবর্তন একদিকে কৃষিনির্ভর জনগোষ্ঠীর জীবনমানকে হুমকির মুখে ফেলছে, অন্যদিকে কূটনৈতিক সমঝোতা বাস্তবায়নকেও জটিল করে তুলছে।
বিশেষ করে তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র নদে বর্ষাকালে হঠাৎ অতিরিক্ত পানি প্রবাহ এবং শুষ্ক মৌসুমে পানিশূন্যতা উভয় পরিস্থিতিই বাংলাদেশকে বিপদে ফেলছে। এই জিও-ইকোলজিক্যাল দৃষ্টিকোণটি এখন পর্যন্ত আঞ্চলিক চুক্তিতে গুরুত্ব পাচ্ছে না।

সরকারি কূটনৈতিক তৎপরতার বাইরে নাগরিক সমাজ এবং পরিবেশ আন্দোলনকারীদের ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তিস্তা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশে নানা সময় মানববন্ধন, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম হয়েছে। ভারতের মধ্যেও কিছু সংগঠন তিস্তা নিয়ে যৌক্তিক সমঝোতার পক্ষে কথা বলেছে। এই ধরনের Bottom-up (জনগণের দাবি থেকে উঠে আসা) আন্দোলন রাষ্ট্রকে গণমুখী নদী কূটনীতিতে এগিয়ে যেতে বাধ্য করতে পারে। তবে এই আন্দোলনকে রাজনৈতিক পক্ষাবলম্বন থেকে দূরে রাখতে হবে।

নদীগুলো স্বাভাবিক নিয়মেই বিভিন্ন দেশের সীমান্ত অতিক্রম করে চলে। ফলে এগুলো নিয়ে যৌথ ব্যবস্থাপনা না করলে কোনো দেশই টেকসইভাবে পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না। কিন্তু সমস্যা হলো এই অঞ্চলটিতে পানির ব্যবস্থাপনা নয়, বরং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও নিরাপত্তার দৃষ্টিভঙ্গি বেশি সক্রিয়। চীন বা ভারত দুই দেশই নিজেদের ভূরাজনৈতিক শক্তিকে বজায় রাখতে নদীকে ব্যবহার করছে একপ্রকার ‘চুপচাপ অস্ত্র’ হিসেবে। বাংলাদেশের মতো ছোট দেশ এসব ক্ষেত্রে পড়ে যায় একধরনের কূটনৈতিক একঘরে অবস্থানে। যতক্ষণ না আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখে এবং বহুপাক্ষিক কাঠামো তৈরি না হয়, ততক্ষণ দক্ষিণ এশিয়ায় নদী হবে দ্বন্দ্বের প্রতীক।

কিন্তু নদী হলো দক্ষিণ এশিয়ার প্রাণ। কিন্তু এই প্রাণ আজ পলিটিক্সের টানাপড়েনে আটকে। তিস্তা হোক, ব্রহ্মপুত্র হোক কিংবা ইন্দাস এসব নদীর জল কেবল পানি নয়, এটি ক্ষমতার প্রতীক। আজ প্রয়োজন, নদীকে ‘ক্ষমতার অস্ত্র’ নয়, সহযোগিতার সেতু হিসেবে দেখা। না হলে ভবিষ্যতের দক্ষিণ এশিয়া শুধু পানিশূন্যই নয়, আরও সংকটগ্রস্ত এবং সংঘাতপ্রবণ হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশিদের আয়ু এখন বৈশ্বিক গড় আয়ুর চেয়ে বেশি

জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) ‘বিশ্ব জনসংখ্যা পরিস্থিতি (এসডব্লিউওপি) ২০২৫’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে – বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বৈশ্বিক গড়কে ছাড়িয়ে গেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে যেখানে পুরুষদের গড় আয়ু ৭১ বছর, সেখানে বাংলাদেশে তা ৭৪ বছর। নারীদের বৈশ্বিক গড় আয়ু ৭৬ বছর হলেও বাংলাদেশে তা ৭৭ বছর। মঙ্গলবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে ইউএনএফপিএর বাংলাদেশ প্রতিনিধি ক্যাথরিন ব্রিন কামকং প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের জনসংখ্যা এখন ১৭ কোটি ৫৭ লাখ। এর অর্ধেকই নারী এবং দুই-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ প্রায় ১১ কোটি ৫০ লাখ মানুষ কর্মক্ষম (১৫-৬৪ বছর বয়সী)।

দেশের মোট জনসংখ্যার ১৯% কিশোর-কিশোরী (যাদের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ) এবং ১০ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীর সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি, যা মোট জনসংখ্যার ২৮%। এটি বাংলাদেশকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কাজে লাগানোর একটি বিশাল সুযোগ করে দিয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৭% (প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ) মানুষের বয়স ৬৫ বছরের বেশি, যা দেশে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে শ্রমশক্তি সংকুচিত হওয়া এবং বয়স্কদের যত্ন ও সামাজিক সুরক্ষার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার মতো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে দেশ।

বাংলাদেশের মোট প্রজনন হার (টিএফআর) ২.১, যা মধ্যম স্তরে রয়েছে। তবে দেশের কিছু অঞ্চলে এখনও কিশোর বয়সে নারীদের গর্ভধারণের হার বেশি, যা বাল্য বিবাহ, জন্মনিরোধ ব্যবস্থার সীমিত ব্যবহার এবং যৌনশিক্ষার অভাবে হয়ে থাকে।

কোরিয়া প্রজাতন্ত্রের মতো উচ্চ-আয়ের দেশগুলোতে নারীদের প্রজনন ক্ষমতা জনপ্রতি মাত্র ০.৮ সন্তানের মধ্যে নেমে এসেছে, যা বিশ্বব্যাপী সর্বনিম্ন। অন্যদিকে, আফ্রিকার কিছু দেশে জন্মহার এখনও বেশি। সেখানে গড়ে ৫.৮ শিশু জন্মহার নিয়ে শীর্ষে রয়েছে নাইজার।

ইউএনএফপিএর প্রতিনিধি ক্যাথরিন ব্রিন কামকং বলেন, বাংলাদেশে সরকার বর্তমানে জিডিপির ০.৭% এবং সাধারণ বাজেটের ২% স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ করছে। আমরা আশা করি, এটি জিডিপির ৫% এবং সাধারণ বাজেটের ১৫% হবে। কারণ, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কাজে লাগানোর জন্য স্বাস্থ্য ও সুস্থতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মৃতদের ঘ্রাণ কি ফিরে আসে?

মৃত্যুর অনেক পরেও আমরা কখনও কখনও প্রিয়জনের পরিচিত গন্ধ টের পাই. কেউ বলে, ” বাবার পুরনো সিগারেটের গন্ধ আচমকা যেন ঘরে ভেসে এলো”, কেউবা বলে, “মায়ের ব্যবহার করা আতরের গন্ধ, অথচ কেউ ছিল না ঘরে।” এই ধরনের গন্ধ সাধারণত সংক্ষিপ্ত, হঠাৎ এবং কোন বাস্তব উৎস ছাড়াই অনুভূত হয়। প্রশ্ন ওঠে এই অনুভব কি শুধুই স্মৃতি ও মানসিক প্রতিক্রিয়া? নাকি এর পেছনে আত্মিক বা প্যারানরমাল ব্যাখ্যা আছে?

মানুষের গন্ধ সংবেদন খুবই শক্তিশালী। Olfactory bulb যেটা নাকে গন্ধ শনাক্ত করে, সেটি সরাসরি brain-এর limbic system (বিশেষ করে amygdala ও hippocampus) এর সাথে যুক্ত। এই limbic অংশই আবেগ ও স্মৃতি ধারণ করে। ফলে একটি গন্ধ সহজেই আমাদের কোনো স্মৃতিকে ‘trigger’ করতে পারে।

একজন ঘনিষ্ঠ প্রিয়জন মারা গেলে তার সঙ্গে যুক্ত গন্ধ (perfume, গায়ের গন্ধ, ধূপ বা তামাক) আমাদের মস্তিষ্কে একধরনের গভীর ছাপ রেখে যায়।অতীতে সেই গন্ধে ঘটা ঘটনাগুলোর আবেগীয় মাত্রা যত বেশি ছিলো, তত তীব্রভাবে তা পরবর্তী জীবনে ‘ফ্যান্টম সেন্সেশন’ হিসেবে ফিরে আসতে পারে।সুতরাং, মস্তিষ্কের পক্ষ থেকে এটি একটি “olfactory hallucination” হতে পারে বুঝে বা না বুঝে স্মৃতি থেকে টেনে আনা অনুভূতি।

এই ‘আত্মার গন্ধ’ অনেক সময় আসলে একধরনের মানসিক বা স্নায়বিক অবস্থার ফল, যার নাম Phantosmia, মানে কল্পিত গন্ধ অনুভব। এটি সাধারণত অতিরিক্ত স্ট্রেস বা বিষাদের সময়, মাইগ্রেন বা স্নায়বিক সমস্যা (Parkinson’s, Alzheimer’s), অবসাদজনিত মানসিক অবস্থা, অতীতে ব্যবহৃত ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। বিশেষজ্ঞরা বলেন, “মস্তিষ্ক যখন কোনো অভাব পূরণ করতে চায়, তখন ইন্দ্রিয়-ভিত্তিক প্রতারণার আশ্রয় নেয়।” প্রিয়জনের শূন্যতা, শোক কিংবা অপরাধবোধ থেকে এক ধরনের মস্তিষ্ক-উৎপন্ন গন্ধ তৈরি হতে পারে।

পৃথিবীর বহু সংস্কৃতিতে এই ধরনের গন্ধ অনুভবকে আত্মার উপস্থিতির ইঙ্গিত হিসেবে ধরা হয়। জাপান ও কোরিয়াতে বিশ্বাস করা হয়, আত্মা নিজেকে গন্ধ বা হঠাৎ ঠান্ডা বাতাসের মাধ্যমে জানায়। পশ্চিমা ‘clairalience’ তত্ত্ব অনুযায়ী, আত্মা নিজেকে পরিচিত গন্ধে চিহ্নিত করে তোলে। বাংলাদেশ বা দক্ষিণ এশিয়ায়, অনেকেই বলে থাকেন, “ভালো মানুষের আত্মা আতরের গন্ধ দেয়, আর পাপীদের থেকে দুর্গন্ধ আসে।” অনেকে দাবি করেন, মৃত্যুর কয়েক দিন বা সপ্তাহ পরেও প্রিয়জনের ব্যবহৃত গন্ধ তারা টের পেয়েছেন এমন সময়ে যখন কোনও বাস্তব উৎস ছিল না। অলৌকিক বিশ্বাস অনুযায়ী, আত্মারা আমাদের মাঝে আসে তখনই যখন তারা কিছু জানাতে চায় বা তাদের স্মরণ করা হয় গভীরভাবে।

এই গন্ধ অনুভব অনেক সময় multiple people-এর মধ্যেও দেখা গেছে। একটি পরিবারে একাধিক সদস্য একসাথে মৃত ব্যক্তির পরিচিত গন্ধ অনুভব করেছেন, এমন ঘটনা বিভিন্ন প্যারানরমাল গবেষণায় নথিভুক্ত আছে। যদি এটি শুধুই মস্তিষ্কের প্রক্রিয়া হত, তবে সব মানুষের ক্ষেত্রে তো একসাথে একই কল্পিত গন্ধ অনুভব হওয়ার কথা নয়। এটাই প্রশ্ন তোলে, এটা কি তবে সত্যিই কিছু বাইরের উৎস থেকে এসেছে?

১৯৮৩ সালে নিউ ইয়র্কে এক নার্সিং হোমে কয়েকজন নার্স এক বৃদ্ধার মৃত্যুর ৩ দিন পরেও একই ঘরে তার ব্যবহৃত সেন্টের গন্ধ অনুভব করেন। অথচ সেই সময় ঘরটি ছিল বন্ধ। বাংলাদেশেও বিভিন্ন গ্রামীণ অঞ্চলে লোকেরা বলে, কেউ মারা যাওয়ার পর বহুদিন পর্যন্ত তার চেনা গন্ধ ঘরে থেকে যায়।

আধ্যাত্মিকতায় গন্ধ বহুসময় ধরে এক গুরুত্বপূর্ণ ইন্দ্রিয়-ভিত্তিক মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত। অনেক ধর্মেই গন্ধকে ‘আত্মার ভাষা’ বলা হয়। হিন্দু ধর্মে ধূপ, চন্দনের গন্ধ আত্মার উপস্থিতি এবং শুদ্ধির চিহ্ন। ইসলামে জানাজার সময় আতর ব্যবহার করা হয় মৃতদেহের পবিত্রতা বোঝাতে, যা আত্মার ভ্রমণের জন্য প্রস্তুতি হিসেবে ধরা হয়। খ্রিস্টান মঠে incense বা ধূপকাঠি পোড়ানোর রীতি রয়েছে, যাতে বিশ্বাস করা হয় স্বর্গীয় আত্মারা নেমে আসে। এই বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দু হল, আত্মা শারীরিক না হলেও ঘ্রাণের মতো সূক্ষ্ম মাধ্যমের মাধ্যমে উপস্থিত হতে পারে।

বর্তমানে বেশ কয়েকটি আধুনিক গবেষণা চেষ্টা করছে এই অলৌকিক গন্ধ অনুভূতির পেছনে নিউরোসায়েন্স ও সাইকোলজির ভূমিকা বোঝার জন্য। তবে এখনও প্রশ্ন থেকে যায়— গন্ধ যদি শুধুই স্মৃতি থেকে আসে, তবে সেটা হঠাৎ কেন? একাধিক ব্যক্তি একই সময়ে একই গন্ধ কীভাবে অনুভব করে? কেন এই গন্ধ সাধারণত গভীর রাত বা নির্জন সময়ে আসে?

‘আত্মার গন্ধ’ শব্দটি আপাতদৃষ্টিতে রহস্যময় হলেও এর মধ্যে জড়িয়ে আছে আমাদের স্মৃতি, অনুভূতি এবং মৃত্যু-পরবর্তী শূন্যতাকে গ্রহণ করার এক মানসিক প্রক্রিয়া। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি Olfactory hallucination বা স্মৃতিজনিত মস্তিষ্ক প্রতিক্রিয়া হলেও, প্যারানরমাল দৃষ্টিকোণ থেকে একধরনের আত্মিক ইঙ্গিত হতে পারে। একেকজন একে দেখেন একেকভাবে কেউ মানসিক, কেউ আধ্যাত্মিক, কেউবা নিছক কাকতালীয়। কিন্তু এটা নিশ্চিত, প্রিয়জনের গন্ধ মৃত্যু পার করেও আমাদের মনে, ঘ্রাণে ও অনুভবে কখনও কখনও ফিরে আসে।