মৃত্যুর অনেক পরেও আমরা কখনও কখনও প্রিয়জনের পরিচিত গন্ধ টের পাই. কেউ বলে, ” বাবার পুরনো সিগারেটের গন্ধ আচমকা যেন ঘরে ভেসে এলো”, কেউবা বলে, “মায়ের ব্যবহার করা আতরের গন্ধ, অথচ কেউ ছিল না ঘরে।” এই ধরনের গন্ধ সাধারণত সংক্ষিপ্ত, হঠাৎ এবং কোন বাস্তব উৎস ছাড়াই অনুভূত হয়। প্রশ্ন ওঠে এই অনুভব কি শুধুই স্মৃতি ও মানসিক প্রতিক্রিয়া? নাকি এর পেছনে আত্মিক বা প্যারানরমাল ব্যাখ্যা আছে?
মানুষের গন্ধ সংবেদন খুবই শক্তিশালী। Olfactory bulb যেটা নাকে গন্ধ শনাক্ত করে, সেটি সরাসরি brain-এর limbic system (বিশেষ করে amygdala ও hippocampus) এর সাথে যুক্ত। এই limbic অংশই আবেগ ও স্মৃতি ধারণ করে। ফলে একটি গন্ধ সহজেই আমাদের কোনো স্মৃতিকে ‘trigger’ করতে পারে।
একজন ঘনিষ্ঠ প্রিয়জন মারা গেলে তার সঙ্গে যুক্ত গন্ধ (perfume, গায়ের গন্ধ, ধূপ বা তামাক) আমাদের মস্তিষ্কে একধরনের গভীর ছাপ রেখে যায়।অতীতে সেই গন্ধে ঘটা ঘটনাগুলোর আবেগীয় মাত্রা যত বেশি ছিলো, তত তীব্রভাবে তা পরবর্তী জীবনে ‘ফ্যান্টম সেন্সেশন’ হিসেবে ফিরে আসতে পারে।সুতরাং, মস্তিষ্কের পক্ষ থেকে এটি একটি “olfactory hallucination” হতে পারে বুঝে বা না বুঝে স্মৃতি থেকে টেনে আনা অনুভূতি।
এই ‘আত্মার গন্ধ’ অনেক সময় আসলে একধরনের মানসিক বা স্নায়বিক অবস্থার ফল, যার নাম Phantosmia, মানে কল্পিত গন্ধ অনুভব। এটি সাধারণত অতিরিক্ত স্ট্রেস বা বিষাদের সময়, মাইগ্রেন বা স্নায়বিক সমস্যা (Parkinson’s, Alzheimer’s), অবসাদজনিত মানসিক অবস্থা, অতীতে ব্যবহৃত ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। বিশেষজ্ঞরা বলেন, “মস্তিষ্ক যখন কোনো অভাব পূরণ করতে চায়, তখন ইন্দ্রিয়-ভিত্তিক প্রতারণার আশ্রয় নেয়।” প্রিয়জনের শূন্যতা, শোক কিংবা অপরাধবোধ থেকে এক ধরনের মস্তিষ্ক-উৎপন্ন গন্ধ তৈরি হতে পারে।
পৃথিবীর বহু সংস্কৃতিতে এই ধরনের গন্ধ অনুভবকে আত্মার উপস্থিতির ইঙ্গিত হিসেবে ধরা হয়। জাপান ও কোরিয়াতে বিশ্বাস করা হয়, আত্মা নিজেকে গন্ধ বা হঠাৎ ঠান্ডা বাতাসের মাধ্যমে জানায়। পশ্চিমা ‘clairalience’ তত্ত্ব অনুযায়ী, আত্মা নিজেকে পরিচিত গন্ধে চিহ্নিত করে তোলে। বাংলাদেশ বা দক্ষিণ এশিয়ায়, অনেকেই বলে থাকেন, “ভালো মানুষের আত্মা আতরের গন্ধ দেয়, আর পাপীদের থেকে দুর্গন্ধ আসে।” অনেকে দাবি করেন, মৃত্যুর কয়েক দিন বা সপ্তাহ পরেও প্রিয়জনের ব্যবহৃত গন্ধ তারা টের পেয়েছেন এমন সময়ে যখন কোনও বাস্তব উৎস ছিল না। অলৌকিক বিশ্বাস অনুযায়ী, আত্মারা আমাদের মাঝে আসে তখনই যখন তারা কিছু জানাতে চায় বা তাদের স্মরণ করা হয় গভীরভাবে।
এই গন্ধ অনুভব অনেক সময় multiple people-এর মধ্যেও দেখা গেছে। একটি পরিবারে একাধিক সদস্য একসাথে মৃত ব্যক্তির পরিচিত গন্ধ অনুভব করেছেন, এমন ঘটনা বিভিন্ন প্যারানরমাল গবেষণায় নথিভুক্ত আছে। যদি এটি শুধুই মস্তিষ্কের প্রক্রিয়া হত, তবে সব মানুষের ক্ষেত্রে তো একসাথে একই কল্পিত গন্ধ অনুভব হওয়ার কথা নয়। এটাই প্রশ্ন তোলে, এটা কি তবে সত্যিই কিছু বাইরের উৎস থেকে এসেছে?
১৯৮৩ সালে নিউ ইয়র্কে এক নার্সিং হোমে কয়েকজন নার্স এক বৃদ্ধার মৃত্যুর ৩ দিন পরেও একই ঘরে তার ব্যবহৃত সেন্টের গন্ধ অনুভব করেন। অথচ সেই সময় ঘরটি ছিল বন্ধ। বাংলাদেশেও বিভিন্ন গ্রামীণ অঞ্চলে লোকেরা বলে, কেউ মারা যাওয়ার পর বহুদিন পর্যন্ত তার চেনা গন্ধ ঘরে থেকে যায়।
আধ্যাত্মিকতায় গন্ধ বহুসময় ধরে এক গুরুত্বপূর্ণ ইন্দ্রিয়-ভিত্তিক মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত। অনেক ধর্মেই গন্ধকে ‘আত্মার ভাষা’ বলা হয়। হিন্দু ধর্মে ধূপ, চন্দনের গন্ধ আত্মার উপস্থিতি এবং শুদ্ধির চিহ্ন। ইসলামে জানাজার সময় আতর ব্যবহার করা হয় মৃতদেহের পবিত্রতা বোঝাতে, যা আত্মার ভ্রমণের জন্য প্রস্তুতি হিসেবে ধরা হয়। খ্রিস্টান মঠে incense বা ধূপকাঠি পোড়ানোর রীতি রয়েছে, যাতে বিশ্বাস করা হয় স্বর্গীয় আত্মারা নেমে আসে। এই বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দু হল, আত্মা শারীরিক না হলেও ঘ্রাণের মতো সূক্ষ্ম মাধ্যমের মাধ্যমে উপস্থিত হতে পারে।
বর্তমানে বেশ কয়েকটি আধুনিক গবেষণা চেষ্টা করছে এই অলৌকিক গন্ধ অনুভূতির পেছনে নিউরোসায়েন্স ও সাইকোলজির ভূমিকা বোঝার জন্য। তবে এখনও প্রশ্ন থেকে যায়— গন্ধ যদি শুধুই স্মৃতি থেকে আসে, তবে সেটা হঠাৎ কেন? একাধিক ব্যক্তি একই সময়ে একই গন্ধ কীভাবে অনুভব করে? কেন এই গন্ধ সাধারণত গভীর রাত বা নির্জন সময়ে আসে?
‘আত্মার গন্ধ’ শব্দটি আপাতদৃষ্টিতে রহস্যময় হলেও এর মধ্যে জড়িয়ে আছে আমাদের স্মৃতি, অনুভূতি এবং মৃত্যু-পরবর্তী শূন্যতাকে গ্রহণ করার এক মানসিক প্রক্রিয়া। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি Olfactory hallucination বা স্মৃতিজনিত মস্তিষ্ক প্রতিক্রিয়া হলেও, প্যারানরমাল দৃষ্টিকোণ থেকে একধরনের আত্মিক ইঙ্গিত হতে পারে। একেকজন একে দেখেন একেকভাবে কেউ মানসিক, কেউ আধ্যাত্মিক, কেউবা নিছক কাকতালীয়। কিন্তু এটা নিশ্চিত, প্রিয়জনের গন্ধ মৃত্যু পার করেও আমাদের মনে, ঘ্রাণে ও অনুভবে কখনও কখনও ফিরে আসে।


