শুরুটা হয়েছিল একটা গবেষণা থেকে, ১৯৯৮ সাল, The Lancet নামক প্রভাবশালী মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত হয় অ্যান্ড্রু ওয়েকফিল্ড নামক এক ব্রিটিশ চিকিৎসকের গবেষণা। গবেষণাটি দাবি করে, এমএমআর (হাম, রুবেলা ও মাম্পস) টিকা গ্রহণের পর শিশুদের মধ্যে অটিজমের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। খবরটি চারদিকে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে। গণমাধ্যম উত্তপ্ত, অভিভাবকরা আতঙ্কিত এবং বিজ্ঞানীদের মুখে অস্পষ্ট উদ্বেগ। বিজ্ঞান যেমন প্রমাণ দাবি করে, তেমনই ভুল তথ্যের বিপরীতে সত্য উদঘাটনের কাজও তার। তাই শুরু হয় অনুসন্ধান।
ওই গবেষণার ওপর একের পর এক অনুসন্ধান চালাতে থাকে বিভিন্ন গবেষক দল। দেখা যায় ওয়েকফিল্ডের গবেষণায় অসংখ্য গলদ ছিল।অংশগ্রহণকারী শিশুর সংখ্যা ছিল মাত্র ১২ জন। কোন কন্ট্রোল গ্রুপ ছিল না। কিছু তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবেও গোপন করা হয়েছিল। টিকা নির্মাতাদের বিরুদ্ধে মামলা চালাতে অর্থনৈতিক স্বার্থ ছিল ওয়েকফিল্ডের। ২০১০ সালে The Lancet অফিসিয়ালি গবেষণাটি প্রত্যাহার করে নেয়। ওয়েকফিল্ডের মেডিকেল লাইসেন্সও বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু ততদিনে স্থায়ী দাগের মতো এক অদ্ভুত ভয় ঢুকে গেছে ।
এই ভয় কিভাবে ছড়িয়ে পড়ে?
মানুষের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া খুব সহজ, বিশেষ করে যদি সেই ভয়টি সন্তানদের ঘিরে হয়। ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো সাধারণত কিছু জিনিসের আশ্রয় নেয়, সরকার, ওষুধ কোম্পানি, বিজ্ঞানীদের ওপর বিশ্বাস না রাখা। ভীতিকর গল্প ও ইন্টারনেটের ছায়া জগৎ যেখানে তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজন পড়ে না, কেবল বিশ্বাসের রসদই যথেষ্ট, বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে “মা’রা জানেন”, “প্রাকৃতিক চিকিৎসাই নিরাপদ” জাতীয় পোস্ট ও ভিডিও অদ্ভুতভাবে জনপ্রিয় হতে থাকে। Anti-vax Movement ধীরে ধীরে একধরনের সংস্কৃতি হয়ে যায়, যার ভাষা হচ্ছে অবিশ্বাস এবং যার ধর্ম হচ্ছে বিকল্প সত্য।
আজ অবধি ২৫টিরও বেশি বড় আকারের গবেষণা, কয়েক লক্ষ শিশুকে পর্যবেক্ষণ করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, কোনো টিকা এবং অটিজমের মধ্যে কোনো বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক নেই।
২০১৫ সালে ডেনমার্কে ৬,৫০,০০০ শিশুর ওপর গবেষণায় প্রমাণ হয় এমএমআর টিকার সঙ্গে অটিজমের সম্পর্ক নেই। ২০১৯ সালে জার্নাল অব অ্যামেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনে প্রকাশিত আরেকটি বিশ্লেষণেও একই ফলাফল উঠে আসে।
অটিজম তাহলে কোথা থেকে আসে?
বিজ্ঞানীরা বলছেন, জেনেটিক (বংশগত) এবং নিউরোডেভেলপমেন্টাল ফ্যাক্টর এর মিলিত প্রভাবেই অটিজম তৈরি হয়। গর্ভাবস্থায় মায়ের স্বাস্থ্যের অবস্থা, পরিবেশগত বিষাক্ততা, এমনকি জিনগত মিউটেশন এসবই হতে পারে অটিজমের কারণ। কিন্তু টিকা? একেবারেই নয়।
আমরা যখন টিকা নিয়ে সন্দিহান হই, তার প্রভাব পুরো সমাজে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৯ সালে হাম রোগে আক্রান্ত হয় প্রায় ১,২০০ জন। বেশিরভাগই টিকা নেয়নি। ইউরোপে টিকা বিরোধী আন্দোলনের কারণে বিলুপ্তপ্রায় রোগ আবার ফিরে আসে। কোভিড-১৯ মহামারির সময়ও এই অবিশ্বাস মানুষের টিকা নেওয়ার আগ্রহ কমিয়ে দেয়, যার ফলে মৃত্যু ও সংক্রমণ বাড়ে। এমনকি WHO-এর মতে, “Vaccine Hesitancy” বা টিকা নিতে ভয় পাওয়া এখন বিশ্বের শীর্ষ ১০ জনস্বাস্থ্য হুমকির একটি। একটি ভুল তথ্যের দাগ শুধু নিজের নয়, সমাজের প্রতিটি দুর্বল শরীরে পৌঁছায়।
ষড়যন্ত্র তত্ত্ব মানে কেবল ভুল তথ্য নয়, এটি এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক স্বস্তি। বিশেষ করে যাদের সন্তান অটিজমে আক্রান্ত, তারা কোনো কারণ খুঁজে নিতে চায়। টিকাকে দোষী বানিয়ে মনটা হালকা হয়। এই কারণ খোঁজা আসলে নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার চেষ্টা।
এছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম যা বিশ্বাস করে তাই দেখায়, তাতেই আমরা ঘুরেফিরে দেখি একদল লোক যারা বলে, “আমরাই জানি আসল সত্য”। তখন বিজ্ঞানকে মনে হয় সরকারের হাতের পুতুল, আর অ্যান্ড্রু ওয়েকফিল্ড হয়ে ওঠেন বিপ্লবী। ষড়যন্ত্র তত্ত্বের সবচেয়ে বড় শক্তি বাস্তবতার ছদ্মবেশ।
অটিজম নিয়ে প্রশ্ন করা খারাপ নয়। প্রশ্ন করা মানে সচেতন হওয়া। কিন্তু প্রশ্নের উত্তর যেন হয় প্রমাণভিত্তিক, গবেষণাভিত্তিক এবং বিজ্ঞানসম্মত। আমরা ভুলে যাই যে সব রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের বাবা-মা শতাব্দীর পর শতাব্দী লড়েছে, সেইসব রোগ আজ নির্বিকার এক ইঞ্জেকশনে নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এটা অলৌকিক নয়, এটা বিজ্ঞান। টিকা এবং অটিজম এ দুটি একে অপরের বিপরীত বলয়ের বাসিন্দা। একটিকে দোষী বানিয়ে আমরা আরেকটি সত্য থেকে চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছি।


