মুক্তিযুদ্ধের আগে বাংলাদেশের সাহিত্যের একটা বিরাট অংশ লেখা হয়েছে সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে। এ পর্বের ছোটগল্পে নির্মিতির চেয়ে মুখ্য হয়ে দাঁড়ায় বক্তব্য, যেহেতু, সময়টা ছিল জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের এবং একটি স্বাধীন জাতি গঠনের। কিন্তু স্বাধীনতা উত্তরকালে এসে ছোটগল্পে নিরীক্ষা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ পর্বের সবচেয়ে আলাদা ছোটগল্পকার হলেন শহীদুল জহির (১৯৫৩-২০০৮)।
তিনি প্রবণতার দিক থেকে বাংলা সাহিত্যে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ধারাবাহিকতা। শহীদুল জহির নিজেও সেটা স্বীকার করে জানিয়েছেন, ‘…আমার গল্প, বাংলা সাহিত্যের যে ঐতিহ্য আছে সেগুলো থেকেই আসা এবং বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে আসতে পারে। এটা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ হতে পারে।’ [সাক্ষাৎকার, আর কে রনি গৃহীত] শহীদুল জহির যখন লিখতে এসেছেন তখন বিশ্বে সাহিত্যজগতের বড় তারকা হলো গাবরিয়েল গারসিয়া মার্কেস। মূলত তিনি ওয়ালীউল্লাহ এবং মার্কেসকে বেটে তৃতীয় একটা কম্পোনেন্ট হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেছেন। গদ্যে সৈয়দ শামসুল হকের প্রভাবও লক্ষ্য করা যায়। আরেকটু বিশদভাবে বললে, কমলকুমার মজুমদার, জেমস জয়েস ও ইলিয়াসের প্রভাবও তাঁর ভেতর আছে। তবে এইসব প্রভাবকে ছাপিয়ে পরবর্তীকালে তিনি নিজেই গল্প বলার একটি স্বতন্ত্র ধারা সৃষ্টি করেছেন, যেটা আমরা কেবল ‘শহীদুল জহিরীয় ধারা’ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি। তাঁর শক্তি জাদুবাস্তবতার সঙ্গে রূপকথা বা টেল-ধর্মী আখ্যান নির্মাণে। এবং কথ্য ও মানভাষার মিশ্রণে স্বকীয় ভাষারীতি তৈরিতে।
শহীদুল জহিরের ভাষা
শহীদুল জহিরের গল্পের ভাষা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে কথা আছে। প্রমিত ভাষা ব্যবহারের মধ্যে মধ্যে তিনি টেক্সট এবং ডায়লগে কথ্য বা আঞ্চলিক ভাষারীতি ব্যবহার করেছেন। যেমন ক্রিয়াপদের ব্যবহারের ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায়, যায়া (গিয়ে/যেয়ে), হয়া (হয়ে), হারায়া (হারিয়ে), শিখায়া (শিখিয়ে), দিয়া (দিয়ে) প্রভৃতি। এটা তাঁর ক্ষণিক নিরীক্ষা নয়, তাঁর সাহিত্যের মূল স্রোতই এই ভাষা। এক্ষেত্রেও তিনি হয়ত ভাষার ‘কেন্দ্রগত’ ধারণাটা ভেঙে দিতে চেয়েছেন। ‘শোভন কথ্যভাষা’ বলে কিছু তিনি মানতে চাননি। ভাষাকে নতুন করে পরিসঞ্চালন করতে চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আসলে আমি ভাষাশিল্পী না।…আমি ভাষা সৌন্দর্যের প্রাসাদ তৈরি করতে চাই না।…আমি যাদের কথা বলি, যেভাবে বলি তাতে এই ভাষায় (কথ্যভাষা) প্রাণ থাকে।’ [সাক্ষাৎকার, আহমাদ মোস্তফা কামাল গৃহীত] এই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে অনেকে সাব-অল্টার্ন অ্যাপ্রোস খুঁজে পেতে পারেন। মার্কসীয় চিন্তাভাবনার লেখক হিসেবে সমাজে ভাষাগত কাঠামো বা বৈষম্য ভেঙে দেওয়ার প্রবণতার কথাও তোলা যেতে পারে। আবার বলা যেতে পারে তিনি ভাষার সাম্রাজ্যবাদীতা বা Linguistic imperialism-এর বিপক্ষে দাঁড়াতে চেয়েছেন।
ফলে আমরা দেখি শহীদুল জহির সাহিত্যে বাস্তবের মতো হুবহু চরিত্র নির্মিতি ও ব্যবহৃত ভাষা প্রয়োগে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি ভাষার দিক থেকে সাহিত্যকে আলাদা একটি নির্মাণ হিসেবে দেখতে চাননি। অর্থাৎ তিনি সচেতনভাবে শব্দসঙ্কোচন বা শব্দসম্প্রসারণ করেননি। যে শব্দ তার চারপাশে চরে বেড়াচ্ছিল, তিনি তাই কুড়িয়ে নিয়েছেন। শহীদুল জহিরের অগ্রজ কথাশিল্পী আবদুশ শাকুর তাঁর ‘গদ্যের কঙ্কাল’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলেছেন, ‘তারা (চরিত্ররা) প্রায়শ আমার ভাষা নকল করে। আমি তাদের ভাষা নকল করি না। করি না, কারণ ওদের ভাষা প্রায়শ নকল- আরোপিত বলেই নকল। ওদের আসল শব্দ হরণ করেছে শোষক সমাজ।’ এরপর আবদুশ শাকুর বলছেন, আর্টে কৃত্রিম বা আর্টিফিশিয়াল হওয়ার প্রয়োজন আছে। তাঁর এই বক্তব্য থেকে তাঁর ছোটগল্পে এই ‘তৈরি’ ভাষা ব্যবহারের পেছনে একটা সুচিন্তিত কারণ আমরা লক্ষ্য করি। কিন্তু শহীদুল জহির ঠিক এর বিপরীত অবস্থান থেকে লিখেছেন। তার কাঠামোটা তৈরি বটে, কিন্তু ভাষাটা নয়।
শহীদুল জহিরের ন্যারেটিভ প্রবণতা
শহীদুল জহিরের সমষ্টির বয়ানে গিয়ে সমস্যা একটা হয়েছে। সমষ্টির বয়ান জেন্ডার ভাবনা থেকে নিউট্রাল থাকেনি। এটা হয়ে উঠেছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের যৌথভাষা। বা কমন দৃষ্টিভঙ্গি। ফলে শক্তিশালী নারী চরিত্র শহীদুল জহিরে নেই। আলাদা করে শক্তিশালী পুরুষ চরিত্র আমাদের খোঁজার প্রয়োজন হয় না কারণ পুরো কাঠামোটাই পুরুষের। আবার শহীদুল জহিরকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রতিনিধিরূপে ভাবতে পারছি না এই কারণে যে, এই সমষ্টি মানবিক চেতনাকে সমন্বিত করে একটা বয়ান খাড়া করেছে।
মার্কসীয় দর্শনের কোনো লেখক লিখছেন জাদুবাস্তবতার কৌশল অবলম্বন করে। সাধারণত এমনটি ঘটে না। কারণ যারা লেখালেখির ভেতর দিয়ে সমাজ-কাঠামোর পরিবর্তন ঘটাতে চান বা লেখালেখিকে মুভমেন্ট হিসেবে নেন তারা যতটা সম্ভব কমুউনিকেটিভ থাকার জন্য সরল ও ঐতিহ্যগত টেকনিক অবলম্বন করেন। কিন্তু শহীদুল জহির তা করেননি। তিনি বক্তব্যের দিক দিয়ে সমাজ ও রাজনীতি সচেতন লেখক বটে। সেই অর্থে তার সমস্ত গল্পই পলিটিক্যাল বা সোশ্যাল এলিগরি। একটু প্যারাডক্স বলে মনে হতে পারে, তিনি বাস্তববাদী (Realist) লেখক কিন্তু লিখেছেন চেতনাপ্রবাহ বা ড্রিম-টেকনিক অবলম্বন করে। সমষ্টিগত পর্যবেক্ষণ লিখছেন একান্ত ব্যক্তিগত কথনের ভঙ্গিতে। অর্থাৎ গোটা সমষ্টিটাই যেন একক ব্যক্তি। কারণ আলাদা করে কারো কোনো বয়ান বা পর্যবেক্ষণ নেই সেখানে। এখান থেকে আমরা মিডিয়া, প্রযুক্তি ও পুঁজিবিপ্লবের সাথে সাথে ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতাবোধের বিলোপ ঘটতে দেখছি। শহীদুল জহির নিজের একাকীত্ববোধ থেকে ঠিক তাঁর বিপরীত অবস্থানে অর্থাৎ সমষ্টির কাছে ফিরে যেতে চেয়েছেন। এটা তাঁর নিজের একান্ত আকুতি হয়ে থাকতে পারে। হতে পারে তিনি ব্যক্তিকেন্দ্রিক আধুনিকতার বিপক্ষে। তবে এর সরল একটা উত্তর তিনি নিজে দিয়েছেন, ‘এটা (সমষ্টির বয়ান ব্যবহার করা) আমি করি, কারণ, এমন অনেক কিছুই বলা হয়, বা করা হয়, যেটা আমি পরে অস্বীকার করতে চাই- লেখক হিসাবে।…লেখক হিসাবে আমি সবকিছুর দায়িত্ব নিতে পারব না জেনেই জনশ্রুতির ওপর নির্ভর করি, সমষ্টিক আকারে বর্ণনা করি।’ [সাক্ষাৎকার,আহমাদ মোস্তফা কামাল গৃহীত] অর্থাৎ তিনি যা ইচ্ছা বলার স্বাধীনতা অর্জন করার জন্য এই বয়ানরীতি অবলম্বন করেন।
শহীদুল জহির জাদুবাস্তব-পরাবাস্তব নাকি রূপকথার কথক?
শহীদুল জহির জাদুবাস্তবতা বা কুহকী বাস্তবতার লেখক কিনা সেই প্রশ্ন তোলা উচিত হবে না। কারণ স্পষ্টতই তাঁর লেখায় জাদুবাস্তবতার উপকরণ আছে। তিনি সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে তিনি সচেতনভাবে জাদুবাস্তবতার বিষয়টি তাঁর গল্প-উপন্যাসে এনেছেন এবং সেটি তিনি গাবরিয়েল গারসিয়া মার্কেস থেকে গ্রহণ করেছেন। তিনি বলছেন, ‘জাদুবাস্তবতার ব্যাপারটা তো আমি মার্কেসের কাছ থেকে পেয়েছি। এবং এটা আমি গ্রহণ করেছি দুটো কারণে। প্রথমত, চিন্তার বা কল্পনার গ্রহণযোগ্যতার যে পরিধি সেটা অনেক বিস্তৃত হতে পারে বলে আমি মনে করি।…দ্বিতীয়ত, আমি আসলে বর্ণনায় টাইমফ্রেমটাকে ভাঙতে চাচ্ছিলাম…।’ [সাক্ষাৎকার, আহমাদ মোস্তফা কামাল গৃহীত]
কিন্তু শহীদুল জহিরকে পড়ার পর পাঠকের মনে স্বভাবতই প্রশ্ন চলে আসে- শহীদুল জহিরের জাদুবাস্তবতা কি মার্কেসীয় বা লাতিন সাহিত্যের জাদুবাস্তবতা? এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। হয়ত মোটাদাগে বলা যাবে, হ্যাঁ অথবা না। কিন্তু খতিয়ে দেখলে আমরা বুঝবো দুজনের জাদুবাস্তবতা এক নয়, আবার একও। অর্থাৎ বিষয়টি তর্ক ও তদন্তের।
আলোচ্য বিশ্লেষণের পর বলা চলে শহীদুল জহিরের গল্পে জাদুবাস্তবতা, পরাবাস্তবতা এবং রূপকথার বিষয় আছে। কিন্তু এমনভাবে এক ব্লেন্ডিংয়ের ভেতর দিয়ে যে তাকে আলাদা করা যায় না। আসলে জাদুবাস্তবতা, পরাবাস্তবতা এবং রূপকথা নিজেরাই প্রবণতার দিক থেকে খুব কাছাকাছি- একই বৃক্ষের তিন শাখা যেন। যে কারণে শহীদুল জহির তাঁর গুরু মার্কেস এবং ওয়ালীউল্লাহর চেয়ে দুর্বোধ্য হয়ে উঠেছেন। তাঁর গল্পকে একক কোনো সাহিত্য তত্ত্বের আলোকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা যাচ্ছে না। তাঁর সাহিত্যে বিনির্মাণের বিষয়টি এখানে পরিষ্কার হয়ে উঠেছে।
শহীদুল জহিরের গল্পে রূপকথা, মিথ, জাদুবাস্তবতা, পরাবাস্তবতা, কিউবিক ফর্মের ব্যবহার এবং ভাষা ও নির্মাণশৈলী বোঝার জন্য আমরা তাঁর টেক্সটকে ব্যবচ্ছেদ করে দেখতে পারি। আপাতত আমরা ‘ডুমুরখেকো মানুষ’ এবং ‘কাঠুরে ও দাঁড়কাক’ গল্পদুটিকে বেছে নিতে পারি।
সোর্স – মোজাফফর হোসেন, বাংলা ট্রিবিউন


