Home Blog Page 53

মিটফোর্ড হত্যাকাণ্ড – সরকার ও বিএনপি কেউ দায় এড়াতে পারে না

0

ভাঙারি ব্যবসার আধিপত্য নিয়ে বিরোধের জেরে পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর ফটকে সোহাগকে কুপিয়ে ও শরীর-মস্তক পাথরে থেঁতলে দিয়েই পাষণ্ড দুর্বৃত্তরা ক্ষান্ত হয়নি, তারা তাঁর লাশের ওপর নৃত্য করতেও দ্বিধা করেনি। এই দৃশ্য দেশবাসীকে ঝাঁকুনি দিয়েছে–মানুষ এত বর্বর ও নিষ্ঠুর হয় কী করে!

সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, আশপাশের লোকজন হতবিহ্বলে সোহাগ হত্যা প্রত্যক্ষ করলেও এগিয়ে আসেননি। নির্বিকার ছিলেন হাসপাতালের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত আনসার সদস্যরাও। আমরা কেমন সমাজে বাস করছি, যেখানে অপরাধের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করতে এগিয়ে আসেন না?

এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বিএনপির যুব সংগঠন যুবদলের স্থানীয় নেতা-কর্মী জড়িত বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলীয় প্ররোচনায় অনেক হত্যাকাণ্ড হয়েছে। এই পুরান ঢাকায়ই বিরোধী দলের হরতাল কর্মসূচি বন্ধ করতে বিশ্বজিৎ দাস নামের এক দরজিকেও কুপিয়ে হত্যা করেছিল ছাত্রলীগের দুর্বৃত্তরা। এরপর তাদের হাতে নৃশংসভাবে খুন হন বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ।

কিন্তু চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পরও যে পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি, সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলো তার প্রমাণ। গত শুক্রবার খুলনার দৌলতপুরে যুবদল থেকে বহিষ্কৃত নেতাকে গুলি করে ও পায়ের রগ কেটে হত্যা করা হয় এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে।

পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত, চার মাসে রাজধানীতেই খুন হয়েছেন ১৩৬ জন। সারা দেশে এই সংখ্যা ১২ শতাধিক। অন্যদিকে ২০২১ সালের প্রথম চার মাসে ঢাকায় এই সংখ্যা ছিল ৫৫, ২০২২ সালে ৫৪, ২০২৩ সালে ৫১ ও ২০২৪ সালে ৪৭।

সোহাগ হত্যার প্রতিবাদে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও এলাকায় বিক্ষোভ-প্রতিবাদ হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালিয়ে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করাকেই সরকারের সাফল্য বলে দাবি করেছেন। আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল অপরাধীদের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে হত্যার বিচার করার কথা বলেছেন। কিন্তু তাঁদের আশ্বাস ও অঙ্গীকার কেন অপরাধ কমাতে পারছে না?

যে সংগঠনের ছত্রচ্ছায়ায় এ রকম খুনি তৈরি হয়, সেই সংগঠন কি খুনের দায় এড়াতে পারে? রাজনৈতিক দলগুলো তাদের যেসব নেতা-কর্মী হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়েছেন, তাঁদের বহিষ্কার করেই দায়িত্ব শেষ করছে। কিন্তু কীভাবে দলের আশ্রয়ে তাঁরা দুর্ধর্ষ অপরাধীতে পরিণত হচ্ছেন, সেই প্রশ্ন নিজেদের করছেন না।

দুষ্কৃতকারীদের অপরাধের দায় দল নেবে না—বিএনপির নেতারা আগে এ কথা বলে এলেও একশ্রেণির নেতা-কর্মীর বেপরোয়া কর্মকাণ্ড দলটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। যার কারণে লাল চাঁদ হত্যাকাণ্ডের পর বিএনপিকে লক্ষ্য করে ক্ষোভ-বিক্ষোভ ও নিন্দা-প্রতিবাদ বাড়ছে। এর আগে ৩ জুলাই আসামি ছিনিয়ে নিতে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম থানায় হামলা চালান বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা।

একশ্রেণির নেতা-কর্মী বেপরোয়া হয়ে ওঠার বিষয়ে বিএনপির নেতাদের কেউ কেউ বলছেন, কেন্দ্র থেকে মাঠ পর্যন্ত দলের বড় একটি অংশ রাতারাতি টাকা বানানোর ধান্দায় অস্থির হয়ে পড়েছেন। বিগত আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলের সীমাহীন দুর্নীতি ও লুটপাট থেকে অনেকে উৎসাহী। তাই যার যেখানে প্রভাব আছে, সে সেখানে অবৈধ অর্থের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছে।

এ জন্য এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, দখল, চাঁদাবাজি, ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ—এমন কর্মকাণ্ড চলছে। যেখানেই এসব কাজে বাধা আসছে, সেখানেই অঘটন ঘটছে এবং ঘটনাক্রমে কিছু কিছু প্রকাশ পাচ্ছে।

একের পর এক নৃশংস হত্যার ঘটনা ঘটলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়মমাফিক কার্যক্রমের বাইরে কিছু করছে না। অথচ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবির পাশাপাশি সেনাবাহিনীর সদস্যরাও নিয়োজিত আছেন।

অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিও পক্ষপাতমূলক। লালমনিরহাটের পাটগ্রামে আসামি ছিনতাই করার দায়ে সরকার স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। কিন্তু চট্টগ্রামের পটিয়ায় যাঁরা পুলিশের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হলেন, সরকার তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে সেখানকার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এটা আইনের শাসনের পরিপন্থী।

অপরাধীদের দমন করতে হলে আইনকে নিজস্ব গতিতে চলতে দিতে হবে। সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দায় এড়ানোর মনোবৃত্তি থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে।

টিএস এলিয়টের দৃষ্টিতে শেকসপিয়রের ‘হ্যামলেট’ একটি ব্যর্থ শিল্প

উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের শুরুর সাহিত্য-জগতে টিএস এলিয়ট (T. S. Eliot) ছিলেন আধুনিকতাবাদের অগ্রপথিক, যার কবিতা, প্রবন্ধ এবং সাহিত্যতত্ত্ব নতুন একটি ধারা তৈরি করে। ১৯১৯ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ “Hamlet and His Problems” এ তিনি সাহসিকতার সঙ্গে দাবি করেন, “Hamlet is most certainly an artistic failure.” এটি শুধু শেকসপিয়রের সমালোচনার সাহসী ভাষ্যই নয়, বরং একটি নতুন তাত্ত্বিক কাঠামো , “objective correlative” ― এর মাধ্যমে নাট্য বিশ্লেষণে এক নতুন দ্বার উন্মোচন।

হ্যামলেট নাটকের সমস্যাটি কোথায়?
টিএস এলিয়টের মতে, হ্যামলেট নাটকের মূল সমস্যা চরিত্রের মধ্যে নয়, বরং পুরো নাটকটির গঠন ও নাট্যশৈলীতে। তিনি মনে করেন শেকসপিয়র এই নাটকে এমন একটি মানসিক জটিলতা উপস্থাপন করতে চেয়েছেন, যা নাট্যকার নিজেও সম্পূর্ণভাবে ধরতে পারেননি। ফলাফলস্বরূপ নাটকটির আবেগ-প্রবাহ ও দর্শকের অনুভূতি দুইই বিছিন্ন হয়ে পড়ে।

এলিয়ট বলেন, সমালোচকেরা হ্যামলেট চরিত্রে নিজেদের আবেগ ও মনস্তত্ত্ব আরোপ করে ফেলেন, ফলে নাটকটির নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ ব্যাহত হয়।জার্মান কবি গ্যেটে ও ইংরেজ কবি কোলরিজ এই ভুল করেছেন বলেও এলিয়ট তীব্র সমালোচনা করেন। গ্যেটে হ্যামলেটকে নিজের ‘Werther’-এর মত করে দেখেছেন এবং কোলরিজ তাঁর নিজস্ব ব্যক্তিত্ব মিশিয়ে হ্যামলেট চরিত্রে এক ধরণের রোমান্টিক আবরণ তৈরি করেছেন।

এটি এলিয়টের দৃষ্টিতে সৃজনশীল সমালোচনার এক ধরনের বিপজ্জনক পথ, যেখানে সমালোচক আসলে লেখকের নয়, বরং নিজের মনোজগৎ প্রকাশ করেন।

এলিয়ট উল্লেখ করেন, হ্যামলেট নাটকের উৎস সম্ভবত থমাস কিডের The Spanish Tragedy ও একটি “Ur-Hamlet” নাটক, যেটিও কিডের লেখা বলে ধারণা করা হয়। এসব পুরনো সংস্করণে হ্যামলেটের মূল মোটিভ ছিল প্রতিশোধ এবং পাগলামির ভান ছিল কৌশলগত। কিন্তু শেকসপিয়র সেই কাঠামো ধরে রাখলেও চরিত্রকে দেন গভীর মানসিক দ্বিধা, যার ব্যাখ্যা অনুপস্থিত।

এলিয়ট মনে করেন, শেকসপিয়র নতুন একটি আবেগগত মোটিভ (যেমন: মায়ের প্রতি বিতৃষ্ণা) যোগ করলেও সেটিকে নাট্যরূপ দিতে পারেননি। এই অসম্পূর্ণ সংমিশ্রণ নাটকটিকে দুর্বল করেছে। তাঁর ভাষায়, নাট্যকার চরিত্রের আবেগ প্রকাশ করতে ব্যর্থ হয়েছেন কারণ তিনি আবেগের জন্য যথাযথ বাইরের অবজেক্ট বা পরিবেশ খুঁজে পাননি। এলিয়টের বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয়, নাটকের কেন্দ্রবিন্দুতে প্রতিশোধ নয় বরং গার্ট্রুডের আচরণজনিত এক ধরণের অস্পষ্ট মানসিক অস্বস্তি রয়েছে, যার রূপায়ন নাট্যে অসম্পূর্ণ থেকে গেছে। এই অস্পষ্টতা নাটকটিকে একটি “incoherent artistic unity” বানিয়ে তোলে।

এলিয়ট তাঁর বিখ্যাত তত্ত্ব “Objective Correlative” (উদ্দীপক সমান্তরাল) ব্যাখ্যা করেন। তার মতে, আবেগ প্রকাশের একমাত্র কার্যকর উপায় হলো “একগুচ্ছ বস্তু, পরিস্থিতি বা ঘটনার মাধ্যমে সেই আবেগকে স্পষ্ট করা”। নাট্যকার যদি দর্শকের সামনে এমন পরিস্থিতি হাজির করতে পারেন, যার সঙ্গে আবেগ জুড়ে যায়, তাহলে চরিত্রের মানসিক অবস্থা দর্শকের মনে বাস্তবভাবে প্রতিফলিত হয়। হ্যামলেটের ক্ষেত্রে এই অনুপস্থিতি লক্ষণীয়। এলিয়ট বলেন, হ্যামলেটের মূল দ্বন্দ্ব হলো মায়ের প্রতি তার ঘৃণা ও বিতৃষ্ণা। কিন্তু এই আবেগ নাটকে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। গার্ট্রুড চরিত্র একা এই মানসিক বিপর্যয় ধারণ করতে পারেনি। ফলে দর্শক আবেগের মূল উৎস বুঝে উঠতে পারে না। এই ব্যর্থতা এলিয়টের ভাষায়, শেকসপিয়রের নিজেরও এক ধরণের “emotional incomprehension”-এর ফলাফল।

এবং এখানেই এলিয়ট এক তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রবর্তক হয়ে ওঠেন, যা পরবর্তীতে New Criticism ধারার ভিত্তি গড়ে তোলে। তার মতে সাহিত্য বিশ্লেষণে লেখকের মানসিকতা নয়, বরং পাঠ্য-পাঠ ও কাঠামোগত সামঞ্জস্য গুরুত্বপূর্ণ।

এলিয়ট হ্যামলেটকে artistic failure বললেও তিনি শেকসপিয়রের অন্যান্য নাটকে Objective Correlative এর সফল প্রয়োগ স্বীকার করেন।Macbeth নাটকে লেডি ম্যাকবেথের ঘুমের ঘোরে কথা বলা দৃশ্য, যেখানে রক্তের গন্ধ, ধোয়া না যাওয়া দাগ ইত্যাদির মাধ্যমে তার মানসিক পীড়া অনুভব করা যায়। এখানে শেকসপিয়র সফলভাবে আবেগকে বাইরের জগতে রূপান্তরিত করেছেন।

এলিয়টের এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি করে। অনেক সমালোচক বলেন, এলিয়ট নিজেই হ্যামলেট চরিত্রের ওপর অতিরিক্ত জোর দিয়েছেন, যেটা তিনি অন্যদের সমালোচনার ক্ষেত্রে দোষারোপ করেছিলেন। কেউ কেউ বলেন, “Hamlet and His Problems” শিরোনাম হওয়ার বদলে এটি হওয়া উচিত ছিল “Hamlet and Its Problems”। তাছাড়া এলিয়ট যেভাবে আবেগের সঠিক প্রকাশ খোঁজেন, তা নিয়েও আপত্তি আছে। সমালোচকেরা বলেন, শেকসপিয়র আসলে হ্যামলেটের বিভ্রান্তি ও জটিলতাকে নাটকীয় অস্তিত্ব দিয়েছেন এটা কোনো ব্যর্থতা নয় বরং একটি কৌশল। তাদের মতে একটি চরিত্রের আবেগ যদি জটিল হয়, তাহলে তার জন্য একটি বিশুদ্ধ অবজেকটিভ কোরেলেটিভ খোঁজাও একধরনের সরলীকরণ। শেকসপিয়রের হ্যামলেট সেই অস্পষ্ট, জটিল, দ্বিধাগ্রস্ত মানবিক অবস্থার প্রতিচ্ছবি।

টিএস এলিয়টের “Hamlet and His Problems” প্রবন্ধ কেবল একটি সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ নয়, বরং সাহিত্যে আবেগ প্রকাশ ও পাঠক-প্রতিক্রিয়ার তত্ত্ব নিয়ে এক যুগান্তকারী ভাবনা। তাঁর মতামত বিতর্কিত হলেও সাহিত্যে “objective correlative” ধারণাটি আজও আলোচ্য এবং প্রয়োগযোগ্য। শেকসপিয়রের হ্যামলেট যদি এক ধরণের বিভ্রান্তি হয়, তবে এলিয়ট সেই বিভ্রান্তিকে এক নতুন ভাষা দিয়েছেন, যাতে আমরা নাট্যশিল্পের গভীরতর প্রশ্নগুলো নিয়ে ভাবতে পারি।

আফ্রোফিউচারিজম – আফ্রিকান সাহিত্যে ভবিষ্যতের কল্পনা ও ঐতিহ্যের মিলন

আফ্রোফিউচারিজমের বীজ প্রোথিত আছে দাসপ্রথা এবং উপনিবেশবাদের গভীর ট্র্যাজেডির মধ্যে। যে মানুষগুলোকে তাদের জন্মভূমি থেকে ছিন্ন করে নিয়ে আসা হয়েছিল, যাদের সংস্কৃতি ও পরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল, তাদের কাছে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখা ছিল এক বিপ্লবী কাজ। বিশ শতকের প্রথম দিকে, যখন দ্রুতগতিতে বিজ্ঞানের অগ্রগতি হচ্ছিল, তখন কালো লেখকরা কল্পবিজ্ঞানের মাধ্যমে নিজেদের গল্প বলতে শুরু করেন।

১৯৯০-এর দশকে মার্ক ডি ফিশার ‘আফ্রোফিউচারিজম’ শব্দটি প্রথম ব্যবহারের মাধ্যমে এই ধারণাকে নাম দিয়েছিলেন। তবে এর ভিত্তি অনেক আগের।আফ্রিকার ঔপনিবেশিক শোষণ, বর্ণবাদের ইতিহাস এবং আফ্রো-আমেরিকান জনগোষ্ঠীর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এর ধারণার সূত্রপাত।

তারা এমন এক বিশ্বের কল্পনা করেন যেখানে কালো মানুষেরা শুধু টিকে থাকে না, বরং প্রযুক্তি এবং বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তারা নতুন সভ্যতা গড়ে তোলে।এই স্বপ্নই আফ্রোফিউচারিজমের মূল ভিত্তি স্থাপন করে।

আফ্রিকান সাহিত্য দীর্ঘকাল ধরে ঔপনিবেশিকতা, দাসপ্রথা, জাতিগত বিভেদ এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী সংগ্রামের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এই সাহিত্যগুলো আফ্রিকানদের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরলেও অনেক সময়ই তারা একটি হতাশাজনক বা সীমাবদ্ধ আখ্যানের জন্ম দিয়েছে।আফ্রোফিউচারিজম এই আখ্যানকে চ্যালেঞ্জ করে এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে তুলে ধরে, যেখানে আফ্রিকানরা শুধু ভুক্তভোগী নয়, বরং নিয়তি-নিয়ন্ত্রণকারী এবং উদ্ভাবক।

আফ্রোফিউচারিজমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো আফ্রিকান পৌরাণিক কাহিনী, আধ্যাত্মিকতা এবং লোককথাকে কল্পবিজ্ঞানের মোড়কে উপস্থাপন করা। এটি শুধু পুরোনো গল্পগুলোকে পুনরাবৃত্তি করে না, বরং সেগুলোকে আধুনিক প্রযুক্তি এবং ভবিষ্যতের ধারণার সাথে মিশিয়ে নতুন অর্থ দেয়। আফ্রিকার বিভিন্ন জাতির লোককথার চরিত্র, প্রাচীন সাম্রাজ্যের জ্ঞান, অথবা প্রথাগত আধ্যাত্মিক বিশ্বাসকে স্পেসশিপ, রোবট বা অন্য গ্রহের পটভূমিতে স্থাপন করা হয়।

নানেয়া ব্রাউন (Nnedi Okorafor) এর মতো লেখকরা তাদের উপন্যাসে আফ্রিকান ঐতিহ্যবাহী ধর্মবিশ্বাস (যেমন ইগ্বো লোককথা) এবং আধুনিক বিজ্ঞান-প্রযুক্তিকে চমৎকারভাবে মিশিয়েছেন। তার “Who Fears Death” উপন্যাসে জাদুকরী ক্ষমতা সম্পন্ন এক নারীর গল্প বলা হয়েছে, যা আফ্রিকান মৌখিক ঐতিহ্য এবং ভবিষ্যতের এক ডিস্টোপিয়ান জগতের সংমিশ্রণ। এই ধরনের কাজগুলো আফ্রিকানদের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে সুদূরপ্রসারী ভবিষ্যতের সাথে সংযুক্ত করে।

অকটাভিয়া বাটলারকে (Octavia E. Butler) আফ্রোফিউচারিজমের অন্যতম অগ্রদূত হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তার লেখায় প্রায়শই কালো নারীদের শক্তিশালী ও জটিল চরিত্রে উপস্থাপন করেছেন। তার “Parable of the Sower” উপন্যাসে জলবায়ু পরিবর্তন এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলার মাঝে একটি নতুন সমাজের স্বপ্ন দেখা হয়, যেখানে কালো নারীরা নেতৃত্ব দিচ্ছে। এটি মানুষের জন্য এক ধরনের “উইশ ফুলফিলমেন্ট” (wish fulfillment), যেখানে তারা নিজেদেরকে একটি শক্তিশালী ও সক্ষম জাতি হিসেবে দেখতে পায়।

আফ্রিকান সাহিত্যের একটি বড় অংশ ঔপনিবেশিক শক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা হয়েছে। আফ্রোফিউচারিজম এই আখ্যানগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে আফ্রিকান দৃষ্টিকোণ থেকে ভবিষ্যৎকে তুলে ধরে। এটি পশ্চিমা সভ্যতার ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং দেখায়, আফ্রিকান প্রযুক্তি ও জ্ঞান পশ্চিমা ধারণার থেকে কোনো অংশে কম নয়, বরং ভিন্ন এবং স্বকীয়।

নকসিনো মাওয়ানাজা (Noxolo Maqamuka) এর মতো দক্ষিণ আফ্রিকার লেখকরা তাদের লেখায় ঔপনিবেশিকতার প্রতিক্রিয়া এবং ভবিষ্যত আফ্রিকান সমাজের চিত্র তুলে ধরেন, যেখানে ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান আধুনিক প্রযুক্তির সাথে মিশে এক নতুন রূপ নেয়। এটি একটি বিউপনিবেশীকরণ (decolonization) প্রক্রিয়া, যা সাহিত্যের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়।

আফ্রোফিউচারিজম কেবল কল্পনার জগৎ তৈরি করে না, এটি বাস্তব বিশ্বের সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যাগুলো নিয়েও আলোচনা করে। বর্ণবাদ, পরিবেশ দূষণ, সামাজিক বৈষম্য, ক্ষমতার অপব্যবহার এই বিষয়গুলো প্রায়শই আফ্রোফিউচারিস্ট গল্পগুলোতে দেখা যায়। তবে এখানে এই সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য নতুন পথ ও উপায় খোঁজা হয় যা সাধারণ সাহিত্যে বিরল।

তোমি আডেয়েমি (Tomi Adeyemi) এর “Children of Blood and Bone” এর মতো ইয়াং অ্যাডাল্ট ফ্যান্টাসি উপন্যাসগুলো জাতিগত নিপীড়ন এবং ক্ষমতা নিয়ে আলোচনা করে, যেখানে ফ্যান্টাসির মোড়কে বাস্তব সামাজিক সমস্যার প্রতিফলন ঘটে। এটি তরুণ আফ্রিকান আমেরিকান পাঠকদের জন্য নিজেদের গল্প এবং পরিচয় খুঁজে পাওয়ার একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে।

“ব্ল্যাক প্যান্থার” চলচ্চিত্রের কাল্পনিক দেশটি আফ্রোফিউচারিজমের এক শক্তিশালী প্রতীক। এটি দেখায় আফ্রিকান সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধরে রেখেও কীভাবে প্রযুক্তিগতভাবে বিশ্বের শীর্ষস্থানে পৌঁছানো সম্ভব। ওয়াকান্ডার ধারণা বিশ্বব্যাপী আফ্রোফিউচারিজমের জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছে এবং আফ্রিকান কল্পবিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ তৈরি করেছে।

আফ্রিকান সাহিত্যে আফ্রোফিউচারিজমের কাজ –

আফ্রোফিউচারিজম একটি একক বা নির্দিষ্ট শৈলী নয় বরং এটি অনেকগুলো উপ-ধারার সমষ্টি। কিছু লেখক সরাসরি কল্পবিজ্ঞান লেখেন, যেখানে মহাকাশ ভ্রমণ বা ভবিষ্যতের প্রযুক্তি মুখ্য থাকে। অন্যরা ফ্যান্টাসি লেখেন, যেখানে জাদুকরী উপাদান এবং পৌরাণিক কাহিনী প্রাধান্য পায়। আবার কিছু লেখক dystopian বা utopian সমাজের ছবি আঁকেন।

অকটাভিয়া বাটলার (১৯৪৭-২০০৬) নিঃসন্দেহে আফ্রোফিউচারিজমের মাদার ফিগার। তার কাজগুলো এই ধারাকে মূলধারায় নিয়ে আসে এবং পরবর্তী প্রজন্মের লেখকদের অনুপ্রাণিত করে। তার লেখায় ক্ষমতা, পরিচয়, প্রজাতি এবং মানবতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তোলা হয়।

“Kindred” (১৯৭৯) নামের উপন্যাসটি টাইম ট্র্যাভেলের মাধ্যমে একজন আধুনিক কৃষ্ণাঙ্গ নারীকে দাসপ্রথার সময়ে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। এটি ঐতিহাসিক ফিকশন এবং কল্পবিজ্ঞানের একটি জটিল মিশ্রণ, যা বর্ণবাদের নৃশংসতাকে নতুন চোখে দেখতে শেখায়। বাটলার এখানে শুধু দাসপ্রথার বর্ণনা দেননি, বরং এর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব এবং সময়ের সাথে সাথে এর ধারাবাহিকতাকে তুলে ধরেছেন।

“Parable of the Sower” (১৯৯৩) এই উপন্যাসে একটি dystopian ভবিষ্যতে পরিবেশগত বিপর্যয় এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলার মধ্যে একজন তরুণী নতুন ধর্মীয় দর্শন গড়ে তোলে। এটি টিকে থাকার সংগ্রাম, সম্প্রদায় গঠন এবং নতুন ভবিষ্যতের স্বপ্নের এক শক্তিশালী আখ্যান।

“Akata Witch” সিরিজ একটি ফ্যান্টাসি সিরিজ যা নাইজেরিয়ার পটভূমিতে নির্মিত, যেখানে জাদুর উপাদান এবং সমাজের রীতিনীতিকে তুলে ধরা হয়েছে।ব্রাউন তার লেখায় আফ্রিকান সংস্কৃতি এবং দৈনন্দিন জীবনকে এমনভাবে তুলে ধরেন যা পশ্চিমা পাঠকদের কাছেও আকর্ষণীয়।

“Children of Blood and Bone” সিরিজে জাদুর ব্যবহার এবং কাল্পনিক রাজ্য অরিশার পটভূমিতে জাতিগত নিপীড়ন ও মুক্তির সংগ্রাম নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এটি “ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার” আন্দোলনের সাথেও প্রাসঙ্গিক, যা আফ্রোফিউচারিজমের সামাজিক ভাষ্যের ক্ষমতাকে তুলে ধরে।

“ব্ল্যাক প্যান্থার”-এর মতো চলচ্চিত্রগুলো আফ্রোফিউচারিজমকে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করেছে, যার ফলে লেখকদের কাজও আরও বেশি পাঠকের কাছে পৌঁছাচ্ছে।

আফ্রোফিউচারিজম তাই কেবল সাহিত্যিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক হাতিয়ার যা আফ্রিকানদের জন্য নিজেদের আখ্যান লেখার এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্মাণের ক্ষমতা দিয়েছে। এটি একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক আন্দোলনগুলোর মধ্যে একটি, যা ভবিষ্যতেও আফ্রিকান সাহিত্যকে নতুন দিকে পরিচালিত করবে বলে আশা করা যায়।

নিউইয়র্ক টাইমস – ক্ষমতায় টিকে থাকতে নেতানিয়াহু গাজায় হামলা দীর্ঘায়িত করছেন

ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজা যুদ্ধ শেষ করতে যুদ্ধবিরতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের চাপ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। শুক্রবার প্রকাশিত নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিস্তৃত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই অভিযোগ তোলা হয়েছে।

শতাধিক ইসরাইলি ও আমেরিকান কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে নিউ ইয়র্ক টাইমসের এই প্রতিবেদনটি দাবি করেছে, নেতানিয়াহু গাজা যুদ্ধ চলাকালে এমন একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যেগুলো তার নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে গৃহীত হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের এপ্রিলে একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধবিরতির চুক্তি সম্পন্ন করতে হামাসের সঙ্গে আলোচনা চলছিল। কিন্তু পরে কট্টরপন্থি মন্ত্রীদের সমর্থন আদায় ও সরকারে টিকে থাকতে নেতানিয়াহু আর চুক্তির পথে এগোননি।

নেতানিয়াহুর জন্য গাজায় চুক্তি ছিল ব্যক্তিগত ঝুঁকির কারণ। ইসরায়েলে তিনি একটি নড়বড়ে জোট সরকারের প্রধান, যা উগ্রপন্থি মন্ত্রীদের সমর্থনের ওপর দাঁড়িয়ে। এ মন্ত্রীরা চান পুরো গাজা উপত্যকা দখল করে নিতে। তারা সেনাসদস্যদের সেখান থেকে সরিয়ে নিতে চান না।

দ্রুত একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলে এই মন্ত্রীরা ক্ষমতাসীন জোট সরকার ভেঙে দিতে পারেন। এর মাধ্যমে ইসরায়েলে নতুন নির্বাচন হবে, যেখানে নেতানিয়াহু হেরে যেতে পারেন। আর প্রধানমন্ত্রীর অফিসের বাইরে যাওয়া মানে নেতানিয়াহু সংকটের আবর্তে পড়া। কারণ, ২০২০ সাল থেকে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা চলছে।

বাইডেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকে ইসরাইলি জনগণের জরিপ তুলে ধরেছিলেন। ওই জরিপে দেখা গেছে ৫০ শতাংশের বেশি মানুষ গাজা যুদ্ধ বন্ধ করে জিম্মি বিনিময় চুক্তি করতে চায়। এর উত্তরে নেতানিয়াহু বলেন, আমার ভোটারদের ৫০ শতাংশ তা চায় না।

আরও একটি উদাহরণ তুলে ধরে নিউ ইয়র্ক টাইমস জানায়, ৯ জুন ইসরাইল ইরানের উপর হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল এবং ঠিক তার দুই দিন পর সংসদ ভেঙে দেওয়ার ভোট হওয়ার কথা ছিল। সেদিন নেতানিয়াহু জোট রক্ষা করতে হারে­দি (অতিধার্মিক) নেতা মোশে গাফনিকে গোপনে জানান যে, ইরানে শিগগির হামলা চালানো হবে।

দুই দিন পর গাফনি ও তার দল ডিগেল হাতোরাহ জোট সরকারের পক্ষে ভোট দেয়। এর ফলে নেতানিয়াহুর সরকার ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা পায়। সেদিন রাতেই ইসরাইলি বিমানবাহিনী ইরানে হামলা চালায়।

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, গাজা যুদ্ধকালীন নেতানিয়াহু একাধিক সিদ্ধান্ত নেন যেগুলো যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করে। এর পেছনে আছে তার রাজনৈতিকভাবে বাঁচার চেষ্টা, মিত্রদের সন্তুষ্ট করা এবং কৌশলে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা।

রিপোর্টে আরও তথ্য তুলে ধরা হয় যে, অক্টোবর ৭ এর আগের নয় মাসে নেতানিয়াহু তার শীর্ষ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে গেছেন। সাবেক আইডিএফ চিফ হার্জেল হালেভি, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট এবং শিন বেত প্রধান রোনেন বার বারবার নেতানিয়াহুকে বলেন, তার সরকারের বিচার ব্যবস্থা সংস্কার পরিকল্পনা ইসরাইলের নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।

এই অনুসন্ধান দক্ষিণ এশিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত বিশ্বের নেতৃত্বের রাজনৈতিক স্বার্থ বনাম জাতীয় নিরাপত্তা ও মানবাধিকার রক্ষার প্রশ্নে এক গুরুতর বিতর্ক উত্থাপন করে।

দক্ষিণ কোরিয়া – সর্বনিম্ন জন্মহার, অথচ আইভিএফ চিকিৎসা বাড়ছে কেন?

বিশ্বে যেখানে দক্ষিণ কোরিয়ার জন্মহার সবচেয়ে কম, সেখানে আইভিএফ (ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন) চিকিৎসার চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। কেউ আগেভাগেই ডিম্বাণু সংরক্ষণ করছেন, আবার কেউ সন্তান না হলে আইভিএফ চিকিৎসার আশ্রয় নিচ্ছেন।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দেশে এই ধরনের চিকিৎসার সংখ্যা প্রায় ৫০% বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখে। শুধু সিওল শহরেই গত বছর প্রতি ৬ শিশুর মধ্যে ১ শিশুর জন্ম হয়েছে আইভিএফ পদ্ধতিতে।

আইভিএফ হলো বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসার একটি পদ্ধতি, যেখানে নারীর ডিম্বাণু ও পুরুষের শুক্রাণু শরীরের বাইরে ল্যাবরেটরিতে নিষিক্ত করা হয় এবং তারপর নিষিক্ত ভ্রূণটি নারীর জরায়ুতে স্থাপন করা হয়। এটি সাধারণত তখন ব্যবহৃত হয় যখন স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণ সম্ভব না হয়।

দক্ষিণ কোরিয়া বারবার বিশ্বের সর্বনিম্ন জন্মহারের রেকর্ড ভেঙেছে। ২০২৩ সালে দেশটির জন্মহার কমে দাঁড়ায় মাত্র ০.৭২-এ, যা বৈশ্বিক গড় ২.২ থেকে অনেক নিচে। এই জন্মহার অব্যাহত থাকলে আগামী ৬০ বছরে দেশের জনসংখ্যা ৫ কোটির কাছাকাছি থেকে অর্ধেকে নেমে আসবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

দক্ষিণ কোরিয়ার জনসংখ্যা সংকটের মূলে রয়েছে সামাজিক ও আর্থিক চাপ। পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতির কারণে শিশু দেখভালের বেশিরভাগ কাজ পড়ে নারীদের ওপর, দীর্ঘ কর্ম-ঘণ্টা ও উচ্চশিক্ষার খরচ তরুণদের সন্তান নেওয়া থেকে বিরত রাখছে।

আবার আর্থিক ও সাংস্কৃতিক চাপে অনেকের সন্তান নেওয়ার স্বপ্ন শুধু পিছিয়ে গেছে। জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অধিকাংশ দক্ষিণ কোরিয়ান সন্তান চাইলেও সামর্থ্য না থাকায় তা নিচ্ছে না। এছাড়া, প্রথম সন্তান নেওয়ার সময় দক্ষিণ কোরিয়ান নারীদের গড় বয়স প্রায় ৩৪ বছর।

আইভিএফ চিকিৎসা গ্রহণকারী দক্ষিণ কোরিয়ান নারী কিম মি-এ বলেন–‘মানুষ তাদের তরুণবেলা পড়াশোনা, চাকরি খোঁজা এবং উন্নত জীবনযাপনের জন্য প্রস্তুতিতে ব্যয় করে কাটিয়ে দেয়। তবে যখন বিয়ে-সন্তান নিয়ে স্থির হওয়ার সময় আসে, তখন অনেক সময়ই দেখা যায় দেরি হয়ে যায়। আর যত বেশি অপেক্ষা করবেন, শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে গর্ভধারণ ততটাই কঠিন হয়ে ওঠে।”

আইভিএফ চিকিৎসা বেছে নিলে সন্তান ধারণের খরচও অনেক বেড়ে যায়। অনেকে আইভিএফ-এর পথে যাওয়ায় এই চিকিৎসা শিল্প ২০৩০ সালের মধ্যে ২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জনসংখ্যা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দক্ষিণ কোরিয়া সরকার বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসার জন্য সহায়তা বৃদ্ধি করেছে। সিওল সরকার ডিম্বাণু সংরক্ষণের জন্য সর্বোচ্চ ২০ লাখ কোরিয়ান ওন (প্রায় ১ হাজার ৪৬০ ডলার) এবং প্রতি আইভিএফ চক্রে ১১ লাখ ওন পর্যন্ত ভর্তুকি দিচ্ছে।

ওয়াশিংটনের পপুলেশন রেফারেন্স ব্যুরোর প্রেসিডেন্ট জেনিফার সিয়ুবা বলেন, ‘এটি নীতি নির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত যে অনেকের সন্তান নেয়ার ইচ্ছা থাকলেও, নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে পারছেন না।’ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবার নিয়ে কোরিয়ান সমাজে চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আসায় বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসার দিকে ঝুঁকছে অনেকেই।

চট্টগ্রামের স্লেভ ট্রেডের না বলা উপাখ্যান

চট্টগ্রাম বাংলাদেশের এক ঐতিহাসিক বন্দর নগরী, দীর্ঘকাল ধরে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এর ভৌগোলিক অবস্থান একে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বাণিজ্যিক কার্যকলাপের সাথে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত করেছে। তবে এই সমৃদ্ধ ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায় হলো স্লেভ ট্রেড বা দাস ব্যবসা। প্রথাগতভাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে দাস ব্যবসার বিষয়টি খুব বেশি আলোচিত না হলেও, চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে এর অস্তিত্বের প্রমাণ সুস্পষ্ট।

ষোড়শ থেকে সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত চট্টগ্রামের উপকূল অঞ্চল ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ দাস বন্দর, যেখানে পোর্তুগিজ জলদস্যু ও আরাকানিজ (মঘ) রাজা যৌথভাবে দাস ধরাশায়ী ব্যবসা চালাত।

দাসত্ব মানব ইতিহাসের এক প্রাচীন এবং বিশ্বব্যাপী ঘটনা। প্রাচীন সভ্যতাগুলো থেকে শুরু করে আধুনিক যুগ পর্যন্ত বিভিন্ন রূপে দাসত্বের অস্তিত্ব বিদ্যমান ছিল। দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশেও দাসত্বের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। স্থানীয় দাসত্বের পাশাপাশি, আরব, পারস্য, পর্তুগিজ, ওলন্দাজ এবং ব্রিটিশ বণিকদের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক দাস ব্যবসাও এই অঞ্চলে বিস্তার লাভ করে। চট্টগ্রাম তার কৌশলগত অবস্থানের কারণে, এই আন্তর্জাতিক দাস ব্যবসার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

নবম শতাব্দীর আরব ভৌগোলিকদের লেখায় চট্টগ্রামের বন্দরের উল্লেখ পাওয়া যায়, যা বোঝায় যে এই অঞ্চলটি তখন থেকেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি কেন্দ্র ছিল। ত্রয়োদশ শতাব্দীর ইবনে বতুতার ভ্রমণ কাহিনীতেও বাংলার সমৃদ্ধি ও বাণিজ্যিক গুরুত্বের বর্ণনা রয়েছে। এই সময় থেকেই সম্ভবত আরব বণিকদের মাধ্যমে দাস আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে পর্তুগিজদের আগমন এবং তাদের বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য বিস্তারের সাথে সাথে চট্টগ্রামের দাস ব্যবসা এক নতুন মাত্রা পায়।

ষোড়ড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে চট্টগ্রাম ছিল পর্তুগিজ জলদস্যু এবং আরাকানি মগদের (আরাকান রাজ্যের স্থানীয় অধিবাসী) দস্যুতার এক আখড়া। এই সময়কালে পর্তুগিজরা চট্টগ্রাম এবং সংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে তাদের বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে এবং স্থানীয় ক্ষমতাধরদের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে। তাদের মূল ব্যবসাগুলোর মধ্যে একটি দাস ব্যবসা।

পর্তুগিজ জলদস্যুরা বাংলার উপকূলীয় গ্রামগুলোতে হামলা চালাতো, মানুষকে ধরে নিয়ে যেত এবং তাদের দাস হিসেবে বিক্রি করে দিত। আরাকানি মগরাও এই কাজে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল। তারা পর্তুগিজদের সাথে হাত মিলিয়ে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নারী, পুরুষ এবং শিশুদের ধরে নিয়ে যেত এবং তাদের ক্রীতদাস হিসেবে আরাকান এবং অন্যান্য অঞ্চলে বিক্রি করত।

ঐতিহাসিক তথ্যপ্রমাণ অনুযায়ী, পর্তুগিজ এবং আরাকানি জলদস্যুরা প্রায়শই সুন্দরবন এবং মেঘনা নদীর মোহনার মতো দুর্গম অঞ্চলে তাদের আস্তানা স্থাপন করত। সেখান থেকে তারা অতর্কিত হামলা চালিয়ে স্থানীয়দের অপহরণ করত। এই ক্রীতদাসদের মধ্যে অনেকেই ছিল কৃষক, জেলে এবং সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ। তাদের প্রধানত চাষাবাদ, গৃহস্থালি কাজ এবং বিভিন্ন ধরনের শ্রমসাধ্য কাজে ব্যবহার করা হত। এমনকি অনেক সময় এই দাসদের বার্মায় (বর্তমান মিয়ানমার) নিয়ে গিয়েও বিক্রি করা হত, যেখানে তাদের প্রধানত কৃষি কাজে লাগানো হত। আরাকান রাজাদের কাছে পর্তুগিজদের উপহার হিসেবেও দাস পাঠানো হতো বলে জানা যায়।

চট্টগ্রামের দাস ব্যবসার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল এর উৎস এবং গন্তব্য। দাসদের একটি বড় অংশ ছিল বাংলার অভ্যন্তর থেকে অপহৃত সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে ঢাকা, নোয়াখালী, বরিশাল এবং খুলনার মতো অঞ্চলগুলো ছিল দাস অপহরণের প্রধান ক্ষেত্র। এই অঞ্চলগুলো থেকে অপহৃত দাসদের চট্টগ্রামে এনে জড়ো করা হতো এবং সেখান থেকে তাদের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হতো।

দাসদের গন্তব্যস্থলও ছিল বৈচিত্র্যময়। কিছু দাসকে চট্টগ্রামের স্থানীয় অভিজাত শ্রেণী এবং ব্যবসায়ীরা ব্যবহার করত। বাকিদের আরাকান, সুমাত্রা, জাভা, মালয়েশিয়া এবং এমনকি ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে বিক্রি করা হতো। চট্টগ্রাম বন্দরের ভৌগোলিক গুরুত্বের কারণে এটি দাস ব্যবসার একটি ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে কাজ করত। দূর-দূরান্ত থেকে আসা বণিকরা চট্টগ্রামে দাস ক্রয়-বিক্রয় করত, যা এই ব্যবসাকে আরও বিস্তার লাভে সাহায্য করে।

চট্টগ্রামে দাস ব্যবসার অস্তিত্ব এই অঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। এটি সমাজের একটি বৃহৎ অংশের মধ্যে চরম অস্থিতিশীলতা এবং ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছিল। মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছিল এবং অপহরণের ভয়ে অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। এর ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং স্থানীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

দাস ব্যবসার কারণে একশ্রেণীর বণিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তির অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ঘটেছিল, যারা এই অবৈধ ব্যবসার মাধ্যমে প্রচুর অর্থ উপার্জন করত। এটি সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধি করেছিল এবং একটি অনুৎপাদনশীল অর্থনীতির জন্ম দিয়েছিল। দাসদের সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করা হতো এবং তাদের সাথে অমানবিক আচরণ করা হতো।

১৬৬৬ সালে মোগল সেনাপতি শায়েস্তা খাঁ চট্টগ্রাম পুনর্দখল করেন। এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। এই পুনর্দখলের মাধ্যমে পোর্তুগিজ ও আরাকানিদের দাস ব্যবসার অবসান ঘটে। মোগল প্রশাসন বন্দরটির উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এবং ধীরে ধীরে দাস ব্যবসার কার্যক্রম নিষিদ্ধ বা সীমিত করে। শায়েস্তা খাঁর এই অভিযান শুধুই সামরিক সাফল্য নয়, মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়ের দিক থেকেও একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক।

চট্টগ্রামের দাস ব্যবসা উপমহাদেশের ইতিহাসে একটি উপেক্ষিত অধ্যায়। অথচ এর মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি কীভাবে উপনিবেশিক আগ্রাসন, স্থানীয় রাজনীতি ও অর্থনৈতিক লোভ মিলে একটি জনগোষ্ঠীকে দাসত্বে পরিণত করতে পারে।

চীনের প্রযুক্তি নীতিতে – হিউম্যানয়েড রোবট

২১শ শতাব্দীর প্রযুক্তিগত বিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রোবোটিক্স। বিশেষ করে মানুষের মতো দেখতে ও কাজ করতে সক্ষম হিউম্যানয়েড রোবট একটি রোমাঞ্চকর ও বিতর্কিত আবিষ্কার। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার নাম উঠলেও আজকের দিনে চীন এই দৌড়ে এক নতুন মহাশক্তি।

চীনে রোবোটিক্স নিয়ে কাজ শুরু হয় গত শতকের শেষ ভাগে, কিন্তু মূলধারায় আসে ২০০০ দশকের শুরুতে। তখনো জাপানের ‘আসিমো’ (ASIMO) কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার ‘হুবারো’ (Hubo) বিশ্বে আলোড়ন তুলছে। চীন অপেক্ষাকৃত নীরব থাকলেও, সরকার-সমর্থিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তখন নিজেদের প্রস্তুত করতে ব্যস্ত। বিশেষ করে ‘চাইনিজ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস’ এবং ‘জিয়াংনান ইউনিভার্সিটি’ এর গবেষণায় বড় ভূমিকা রাখে।

২০১৫ সালে চীন “মেইড ইন চায়না ২০২৫” নামক জাতীয় কৌশল ঘোষণা করে, যেখানে রোবোটিক্স ছিলো অন্যতম মূল খাত। এই উদ্যোগের পর থেকে হিউম্যানয়েড রোবট নির্মাণে চীন তার বিশাল উৎপাদন ক্ষমতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), এবং মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দক্ষতাকে একত্রিত করে দ্রুত অগ্রসর হয়। চীনের লক্ষ্য শুধুমাত্র রোবট বানানো নয়, বরং সেগুলোকে দৈনন্দিন জীবনে কার্যকরভাবে যুক্ত করা। যেমন: হাসপাতাল, বৃদ্ধাশ্রম, স্কুল, ব্যাংক, এমনকি থিয়েটার বা রেস্টুরেন্টেও রোবট কাজ করছে।

প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও উল্লেখযোগ্য উদাহরণ
জিয়াওইস (Xiaoyi):
২০১৭ সালে, ‘জিয়াওইস’ নামক একটি রোবট চীনের মেডিকেল লাইসেন্সিং পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়। এটি ছিল এক ঐতিহাসিক ঘটনা, যা AI ও হিউম্যানয়েড সিস্টেমকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগের একটি নিদর্শন।

জিয়াওইস (Xiaomei) ও জিয়াওপাং (Xiaopang):
এই দুটি রোবট সামাজিক সহচর (social companion) হিসেবে তৈরি হয়েছে। শিশু ও বৃদ্ধদের সঙ্গে কথা বলা, আবেগ বোঝা, এমনকি গল্প বলা ও আবেগ প্রকাশ করা এই রোবটগুলো এই কাজগুলো বেশ ভালোভাবেই করতে পারে।

জিয়াওইচি (Xiao Qi):
২০২৩ সালে প্রকাশিত এই রোবটটি মানুষের হাঁটার গতি, মুখের অভিব্যক্তি ও স্বরভঙ্গি অনুকরণে অত্যন্ত পারদর্শী। এটি চীনের “Tsinghua University” এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান “UBTech” এর যৌথ উদ্ভাবন।

চীনা হিউম্যানয়েড রোবটগুলোর পেছনে কাজ করে শক্তিশালী সেন্সর সিস্টেম, মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ও রিয়েল-টাইম ভিশন প্রসেসিং। হিউম্যানয়েড রোবটের ক্ষেত্রে “emotion detection” বা আবেগ শনাক্তকরণ এখন বড় এক গবেষণার কেন্দ্র। চীনের “iFlytek” কোম্পানি AI-ভিত্তিক ভয়েস রিকগনিশনে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছে।

রোবটের অগ্রগতি যেমন চমকপ্রদ, তেমনি অনেক সামাজিক প্রশ্নও তুলছে। চীনের নাগরিকদের মধ্যে একাংশ মনে করে, রোবট ব্যবহারে মানবিক সংযোগ কমে যাবে, কর্মসংস্থানে প্রভাব পড়বে। আবার অনেকে প্রশ্ন তোলে হিউম্যানয়েড রোবট যদি মানুষের মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তবে তার দায় কে নেবে? এছাড়াও রোবটের মাধ্যমে নজরদারি, সেন্সরশিপ এবং ‘ডিজিটাল কনট্রোল’ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে চীনের বিরুদ্ধে কিছু উদ্বেগও রয়েছে।

চীনে রোবট এখন শুধু কারখানা বা গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ নয়। সাংহাই, শেনচেন কিংবা বেইজিংয়ের মতো শহরে রোবট থিয়েটার, আর্ট ইনস্টলেশন এমনকি কবিতা পাঠ প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে। এইভাবে রোবট একটি সাংস্কৃতিক অংশ হয়ে উঠছে।

চীন ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের এক নম্বর AI এবং রোবট প্রযুক্তির শক্তি হতে চায়। বিশেষ করে বয়স্ক জনগোষ্ঠী বৃদ্ধির কারণে ‘সোশ্যাল রোবট’ এর চাহিদা বেড়েছে। ভবিষ্যতে হিউম্যানয়েড রোবটদের শিক্ষক, চিকিৎসক, পর্যটন গাইড এমনকি পারিবারিক সহকারী হিসেবেও ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে। “Xiaomi”, “Huawei”, “UBTech” ও “CloudMinds” এর মতো চীনা টেক জায়ান্টরা এখন হিউম্যানয়েড রোবটকে ভোক্তা পর্যায়ে আনার চেষ্টা করছে—যা এক দশক আগেও ছিল কল্পনা।

চীনের হিউম্যানয়েড রোবট প্রযুক্তি শুধুমাত্র যান্ত্রিক উন্নয়নের নিদর্শন নয়, বরং এক নতুন সমাজ-সভ্যতার দিকচিহ্ন। মানুষ ও যন্ত্রের সম্পর্ক নিয়ে যে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে, তাতে চীন এখন এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। এই অগ্রগতি যেমন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে, তেমনি আমাদের ভাবনার জানালাও। এই প্রযুক্তি কি আমাদের কাজ কেড়ে নেবে, নাকি নতুন এক মানবিক সহায়ক সমাজ গড়ে তুলবে—এই প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যতেই লুকিয়ে আছে।

সমাধান হচ্ছে বিচার দৃষ্টান্তমূলক বিচার : রাজীব আহাম্মদ, সাংবাদিক

“…সমাধান হচ্ছে বিচার। দৃষ্টান্তমূলক বিচার। সরকার চাইলে, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে ১৫ দিনে সোহাগ হত্যার বিচার করা সম্ভব। সাক্ষী, আলামত সবই হাতের কাছে আছে। যত দ্রুত সাজা দেওয়া যাবে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কাজ এগোবে।

… দ্বিতীয় জরুরি আলাপ হলো, পুরান ঢাকার হত্যায় যুবদল, ছাত্রদল কর্মীদের নাম আসছে। নিহত সোহাগও যুবদল কর্মী ছিলেন বলে জানা যাচ্ছে।সংবাদমাধ্যম এবং বিভিন্ন দলের করা হিসাবে গত ১১ মাসে বিএনপি নেতাকর্মীদের দ্বন্দ্বে ১২০ জনের নিহত খবর পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে আশির বেশি বিএনপির নেতাকর্মী।

১৫ বছর গণতন্ত্রের জন্য লড়াই একটি দলের নেতাকর্মীরা এতটা বেপরোয়া হওয়া দল‌টির জন‌্যই দুর্ভাগ্যজনক। অপকর্মের পর বহিষ্কার করা সমাধান নয়। সমাধান হলে, গত ১০ মাসে তিন হাজারের বেশি বহিষ্কারেই অপকর্ম থেমে যেত। যেহেতু থামছে না, তাহলে সমস্যা অনেক গভীরে।

তাহলো, আওয়ামী লীগ আমলের ‘ক্ষমতার হেডম’ সংস্কৃতি রয়ে গেছে। এ থেকে বের হতে দলে চিরুনী অভিযান দরকার। যে নেতার কর্মী অপকর্ম করবে, তাকে দল থেকে বের দিতে হবে। সম্ভব হলে, আরও কঠোর হতে হবে। নইলে চড়া মূল্য দিতে হতে বিএনপিকে। এখন বিএনপি কী করবে, তা বিএনপির ব্যাপার।

যে রকম জঘন্য জিঘাংসায় সোহাগকে হত্যা করা হয়েছে বলে ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, তাতে মনে হয় শুধু চাঁদাবাজি বা ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নয়, ব্যক্তিগত পর্যায়ে চরম আক্রোশ ক্রোধ রয়েছে। চাঁদার জন্য এতটা নৃশংস ঘটনার নজির নেই। সুতরাং খতিয়ে দেখা উচিত প্রকৃত কারণ কী।

জুলাইয়ে কোটি মানুষ পথে নেমেছিল। গুলির মুখে একে অন্যের ঢাল হয়েছিল। বিনা পরোয়ায় জীবন দিয়েছে। কিন্তু সোহাগকে ভরা বাজারে হত্যার পরও মানুষ কেনো এগিয়ে এলো না বুঝতে পারছি না। মানুষ কি তবে দেশ বদলের আশা হারিয়ে ফেলেছে?

সরকারকে তা দেখতে হবে। অপকর্মের পর ব্যবস্থা নেওয়ার হম্বিতম্বি না করে, আইন শৃঙ্খলার দৃশ্যমান উন্নতি করতে হবে। মানুষকে আশ্বস্ত করতে হবে, আশাবাদী করতে হবে। নইলে সামনের দিন আরও খারাপ হবে। ফ্যাসিবাদ ফিরবে।”

In the Mood for Love আমার কাছে দুটি চরিত্রের একটি নীরব ওয়াল্টজ : ওং কার ওয়াই

প্রশ্ন: আপনার সিনেমাগুলোর শিরোনাম অনেক সময়েই গল্পের সঙ্গে বিরোধ তৈরি করে। যেমন, “Happy Together” একটি সমকামী যুগলের বিচ্ছেদের গল্প, আর “In the Mood for Love” সিনেমাটির মূল চরিত্ররা যেন ভালোবাসা এড়াতেই চায়।

ওং কার ওয়াই: “In the Mood for Love”-এর আসল চীনা নামটা অনুবাদ করা খুব কঠিন। সেটি অনেক বেশি কাব্যিক, মানুষের জীবনের সোনালি সময়, বিশেষ করে একজন নারীর যৌবনের পূর্ণ প্রস্ফুটনের ছবি আঁকে। যখন সিনেমাটি কানে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছিল, তখন ইংরেজি শিরোনাম খুঁজছিলাম।

দলের অনেকে বিভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু কোনোটাই ঠিক মানানসই মনে হচ্ছিল না। হঠাৎ একদিন আমি একটা রেকর্ডের দোকানে গিয়ে ব্রায়ান ফেরির গাওয়া “In the Mood for Love” নামক একটি অ্যালবাম দেখতে পাই। তখন ভাবলাম, এটাও তো খারাপ নয়।

এই গানটা ষাটের দশকের, ঠিক যে সময়ে সিনেমার গল্পও বসানো। আসলে সিনেমাটা প্রেম নিয়ে নয়, প্রেমের ‘মুড’ বা আবহ নিয়ে। সবাই শিরোনামটা পছন্দ করলো, তাই সেটাই রাখা হলো।

প্রশ্ন: ষাটের দশকের প্রতি আপনার এমন টান কেন? “Days of Being Wild”-এও সেই সময়কালকে তুলে ধরেছেন। আপনি তো বলেছিলেন, “In the Mood for Love” সেই সময়ের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য।

ওং কার ওয়াই: আমি আসলে চল্লিশের দশকেও ফিরে যেতে চাই, কিন্তু তা করা খুব ব্যয়বহুল আর জটিল। ষাটের দশক আমার শৈশবের সময়। সেসব স্মৃতির মাঝে ফিরে যেতে ইচ্ছা করে। এটা নির্মাতাদের একটা বিশেষ সুবিধা—চাইলেই তারা সময়ে ভ্রমণ করতে পারে। যেই সময়কে ফিরে পেতে চাই, সেটাকেই সিনেমায় ধারণ করি।

প্রশ্ন: “In the Mood for Love” এবং “Days of Being Wild” দুই সিনেমাই ষাটের দশকে ভিত্তি করে নির্মিত। এদের মধ্যে কি কোনো সংযোগ আছে?

ওং কার ওয়াই: অনেকে ধরে নেয় এটা “Days of Being Wild”-এর সিকুয়েল। কিন্তু এটি ভিন্ন গল্প। শুরুতে আমরা চেষ্টা করেছিলাম ভিন্ন রাখার। কিন্তু এক সময় মনে হলো, এত আলাদা করেও কী লাভ? কিছুটা সংযোগ থাকতে পারে। যদিও এটা “Days of Being Wild part two” নয়, তবে একে তার এক্সটেনশন বলা যেতে পারে।

ম্যাগি চুং (অভিনেত্রী) যখন হাউসওয়াইফ চরিত্রে অভিনয় করছিলেন, তখন তিনি সংযোগটা হারিয়ে ফেলেছিলেন। আমি বলেছিলাম, “তুমি তো Days of Being Wild-এ খুব স্বাভাবিক অভিনয় করেছিলে। সেটাও তো একই সময়কাল।” তিনি বলেন, “তখন আমি তরুণী ছিলাম, এত সাজতে হতো না।” আমি তখন বলি, “তুমি ভাবো তুমি সেই একই মানুষ, শুধু দশ বছর পরে।” তার নামটাও আমরা একই রেখেছিলাম। তখন থেকে তিনি চরিত্রটা ধরতে পেরেছিলেন।

প্রশ্ন: সিনেমাটিতে কোনো যৌন দৃশ্য নেই, কিন্তু একটি দৃশ্য শুট করা হয়েছিল। কেন তা বাদ দেওয়া হলো?

ওং কার ওয়াই: আমি শুরুতেই সেই দৃশ্যটি শুট করি, যাতে অভিনেতা-অভিনেত্রী বুঝতে পারেন তাদের সম্পর্কের ধরণটা কেমন। এই দৃশ্যের পর তারা চরিত্রগুলোর ভেতর রসায়ন অনুভব করতে পারে হাটা, তাকানো, আচরণ সব বদলে যায়। শেষ পর্যন্ত দৃশ্যটা কেটে ফেলি, কিন্তু সেই রসায়ন থেকেই যায়। “Happy Together”-এও ঠিক এমন করেছিলাম। প্রথম দিনেই প্রেমের দৃশ্য। যেন তারা মুখোমুখি হয় তারা প্রেমে জড়ায়, না শুধু দৈহিক সম্পর্ক করে।এটা কিন্তু পার্থক্য গড়ে দেয়।

প্রশ্ন: আপনি দীর্ঘদিন ধরে অস্ট্রেলিয়ান সিনেমাটোগ্রাফার ক্রিস্টোফার ডয়েলের সঙ্গে কাজ করছেন। আপনার সিনেমা ভিজ্যুয়ালি খুব শক্তিশালী। আপনার গ্রাফিক ডিজাইনের পটভূমিও আছে। আপনার কাছে ভিজ্যুয়াল সৌন্দর্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

ওং কার ওয়াই: আমি যা সামনে দেখি, তা থেকেই প্রতিক্রিয়া দিই জায়গাটা, মুখগুলো—সব মিলিয়ে যদি ভালো লাগে, তখন মনে হয় ঠিক আছে। অবশ্যই গ্রাফিক ডিজাইনের প্রশিক্ষণ সহায়তা করে। কিন্তু শুধু দেখতে ভালো হলেই হয় না, আমরা দৃশ্যের গতি, কাঠামো এসব নিয়েও অনেক কাজ করি।

যেমন, “Yumenji’s theme” ১৯৭২ সালে তৈরি জাপানি সুরকার উমেবায়াশি শিগেরুর সুর করা একটি ওয়াল্টজ। গানটা বারবার সিনেমায় বাজে। আমি সেটি শুনিয়ে অভিনেতা আর সিনেমাটোগ্রাফারকে সিনেমার ‘মুড’ বোঝাতে চেয়েছিলাম। সিনেমাটাকে আমি এই দুই চরিত্রের মাঝে একটা নাচ, এক ধরনের ওয়াল্টজ মনে করি ।

প্রশ্ন: আপনার তো অনেক ফুটেজ তৈরি হয়, “In the Mood for Love”-এরও চার ঘণ্টা শুটিং ছিল। তারপর কেটে ৯০ মিনিটের সিনেমা বানানো কি কঠিন?

ওং কার ওয়াই: বেশিরভাগ নির্মাতারা এডিটিংয়ে জিনিস গঠন করেন, একত্র করে কিছু তৈরি করেন। আর আমরা যা করি, তা হলো ধ্বংস। যেটা দরকার নেই তা বাদ দিই। প্রতিটি দৃশ্যকে দেখি, এটা কি দরকার? যেমন, প্রেমের দৃশ্য, আমরা বললাম দরকার নেই, কেটে দিলাম। এটা কষ্টের, কারণ অনেক ভালো জিনিস বাদ দিতে হয়। আর পরে মন চায়, সবাইকে সেই না-থাকা জিনিসগুলোও দেখাতে।

প্রশ্ন: আপনি এখন “2046” নামে একটি সিনেমা বানাচ্ছেন। নামটি রাজনৈতিক, হংকংয়ের জন্য নির্ধারিত “বেসিক ল’ ৫০ বছর পর, অর্থাৎ ২০৪৬ সালে শেষ হবে।

ওং কার ওয়াই: হ্যাঁ। আমি ভাবছিলাম, ধরে নিই হংকং ৫০ বছর একই রকম থেকে গেলো, কিন্তু পৃথিবী বদলাতে লাগলো। সিনেমাটা হবে পরিবর্তন নিয়ে।কারণ হংকংয়ের মানুষ পরিবর্তনকে ভয় পায়। এটি একটি ভবিষ্যতের সিনেমা হবে, যেখানে হংকং, চীন, জাপান, কোরিয়া, এমনকি ইউরোপেরও অভিনেতারা থাকবে।

‘The Substance’ সৌন্দর্যের আতঙ্ক : মণিকা ক্যাস্টিলো, critic, journalist, programmer

“অসাধারণ সৌন্দর্যের অসম্ভব মানদণ্ড আর সমাজের তরুণত্ব-আসক্তি, এই দুইয়ের চাপে ভেঙে পড়ার অনুভূতি নতুন নয়। কিন্তু করালি ফারজিয়াত পরিচালিত নতুন সিনেমা The Substance এমন এক সময়ে এসেছে, যখন “ওজেম্পিক যুগ” আমাদের জানায়, শরীরে ছুরি-কাঁচি ছাড়াই এক ইঞ্জেকশনে অসম্ভব মনে হওয়া ওজন কমানো সম্ভব।

আমার সামাজিক মাধ্যমে নিয়মিতই বিজ্ঞাপন আসে “ফিরে পান আপনার পুরনো নিজেকে”, “সস্তায় শুরু করুন, ফলাফল পাবেন দ্রুত”। লোভনীয়, নয় কি?যদিও ওজন কমানোর জন্য ব্যবহৃত GLP-1 ওষুধের সঙ্গে সিনেমায় দেখানো রহস্যময় “Substance”-এর কোনো সরাসরি মিল নেই, তবুও সিনেমাটি এই আকাঙ্ক্ষা “যৌবনের ঝর্ণাধারা” খোঁজার অন্ধ অনুসন্ধানকে রক্ত-ও-নিয়ন আলোয় মুড়ে এক ভয়াবহ দৃষ্টিতে তুলে ধরে।

ডেমি মুর অভিনীত এলিজাবেথ স্পার্কল, একসময় পর্দায় জ্বলজ্বল করতেন। এখন তাঁর তারকা হাঁটা শুরু করেছে পতনের পথে, যেন হলিউড ওয়াক অফ ফেমে খোদাই করা তার নামও অতীতের স্মৃতি। এক বিকৃত মানসিকতার নির্বাহী হার্ভি (ডেনিস কুয়েড) তাঁকে তাঁর ফিটনেস টিভি অনুষ্ঠান থেকে বরখাস্ত করে, শুধুমাত্র তার বয়সের কারণে, কারণ তার জায়গায় চাই “তরুণ কেউ”।

অপমান ও বিষাদে জর্জরিত এলিজাবেথ জানতে পারে “The Substance” নামক এক রহস্যময় প্রডাক্টের কথা, যা তারই একটি তরুণ সংস্করণ তৈরি করে দেয়, তাঁর ক্যারিয়ার টিকিয়ে রাখার মতো যৌবন। তবে এই পদার্থের নিয়ম-কানুন অনেকটা “Gremlins” ছবির দানবদের মতো জটিল, একবারেই তরুণ সংস্করণ সক্রিয় করা যাবে, আর প্রতি সাত দিন পরপর তারা একে অপরের সঙ্গে স্থানবিনিময় করবে। যদিও তারা একসঙ্গে এক চেতনার অংশ, কিন্তু এলিজাবেথ ও তাঁর তরুণ রূপ সু (মার্গারেট কোয়ালি) সময়ের সঙ্গে বুঝতে শুরু করেন চিরতরুণ থাকার ব্যয় কত গভীর ও নীরব।

ফারজিয়াত এলিজাবেথ ও সু-কে উপস্থাপন করেন যেন ফ্রাঙ্কেনস্টাইন ও তার সৃষ্ট দানব—যাদের দুঃখ সমানভাবে বোধগম্য। যা একটি পুনর্জন্মের চেষ্টারূপে শুরু হয়, তা খুব দ্রুত এক ভয়াবহ পরিণতিতে মোড় নেয়। The Substance-এ পরিচালক স্পষ্টভাবেই সম্মান জানাচ্ছেন ডেভিড ক্রোনেনবার্গের বডি-হরর ধারাকে (যেমন The Brood), স্টুয়ার্ট গর্ডনের Re-Animator (যেখানে একটি সবুজ পদার্থ দানব তৈরি করে), The Invisible Man, এমনকি ব্রায়ান ডি পালমার Carrie-এর মতো রক্তে ভেজা প্রতিশোধময় নারীর জগতকে। বার্নার্ড হারম্যানের Vertigo থিম হয়তো একটু বেশিই সরাসরি ব্যবহার মনে হতে পারে, কিন্তু সিনেমার আবেশী আবহে তা খাপে খাপে মেলে।

ফারজিয়াতের প্রথম সিনেমা Revenge-এর মতো, এখানে তিনি খুব স্বল্প চরিত্রের ওপর একটি আঁটসাঁট চিত্রনাট্য রচনা করেছেন। তাঁর পেছনের দলটিও সমান দক্ষ, সিনেমাটোগ্রাফার বেঞ্জামিন ক্রাচুন ‘Revenge’-এর উজ্জ্বল গোলাপি ও নীল রঙকে আরও প্রসারিত করে এক ঝলমলে, বেভারলি হিলস-সুলভ রঙের আড়ালে ঢেকে দিয়েছেন ছবিকে। পোশাক পরিকল্পনায় এম্যানুয়েল ইউচনোভস্কি চরিত্রের অভ্যন্তরীণ রূপকে চোখধাঁধানো রঙ আর উপকরণে প্রকাশ করেন। আর রাফার্টির সুর যেন এলএ-র ৪০৫ হাইওয়েতে ছুটে চলা এক গাড়ির মতো ছবির গতি বাড়িয়ে তোলে।

The Substance মূলত ভয়াবহতার আবরণে ঢেকে রেখেছে বিনোদন দুনিয়ার তীব্র সমালোচনা—একটি এমন শিল্প, যা মানুষকে যৌবনের প্রতারণামূলক বিকল্প দিয়ে টাকা কামায়। চরিত্র হার্ভির মাধ্যমে যিনি বিকৃত, উঁচু গলায় চিৎকার করেন, আর নারীদের অবমাননার প্রতিমূর্তি ফারজিয়াত ও ক্রাচুন ক্যামেরায় কখনও ফিশ-আই লেন্স, কখনও তাকে আরও বিকৃত করে তুলতে অস্বস্তিকর ক্লোজ-আপ ব্যবহার করেন।

স্ট্যানিসলাস রেইডেল্লেতের প্রোডাকশন ডিজাইনের জন্য যেমন স্টুডিওর অতিরিক্ত লম্বা করিডোর “The Shining”-এর কমলা কার্পেটের রঙে মাখানো, কিংবা ফার্মাসিউটিক্যাল ডিপোর ডিজাইন যেন হুবহু 2001: A Space Odyssey থেকে উঠে আসা, সব মিলিয়ে সিনেমাটির পরিবেশ যেন বাস্তবের থেকে একটু বেশি উজ্জ্বল, একটু বেশি অতিরঞ্জিত।

সু চরিত্রে মার্গারেট কোয়ালি রূপান্তরিত হয়েছেন পাশের বাড়ির হট-গার্লরূপে, নিয়ন পোশাক, লিপগ্লস, ঝুলে পড়া কানে দুল, আর ছেলেদের প্রতি দুর্বলতা। এলিজাবেথের শো-এর তুলনায় সু-র ভিডিওতে বেশি ফোকাস তার শরীরের খুঁটিনাটিতে, যা বাস্তবে কর্পোরেট সমাজ বিক্রি করে যৌবনের মোহে।ডেনিস কুয়েড যেন এমন একজন ভিলেন যার গোঁফ না থাকলেও, তার কণ্ঠস্বর, ঠাটবাট আর হৃদয়হীনতা দিয়ে নারী বিদ্বেষের অঙ্গুলি চিহ্ন।

তবে এই সিনেমাটি আসলে দাঁড়িয়ে আছে ডেমি মুরের হৃদয়ভাঙা অভিনয়ের ওপর। এক নারীর আত্ম-অস্বীকৃতি, সমাজের চোখে তার মূল্যহীনতা আর একটি মিরাকল ওষুধে আসক্তির অসহ্য যন্ত্রণাকে তিনি যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তা গভীর। একটি দৃশ্যে এলিজাবেথ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পরিপাটি মেকআপ আর সাজে নিজেকে প্রস্তুত করেন, কিন্তু তার চোখে ফুটে ওঠে হতাশা। সে নিজের সৌন্দর্য দেখতে পায় না। সে লিপস্টিক মুছে ফেলে, চোখ থেকে টেনে ফেলে কৃত্রিম পাপড়ি। সেই মুহূর্তে তার নিজের প্রতিচ্ছবি তার সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়ায়।

এই অভিজ্ঞতা আমাদের অনেকেরই চেনা, যখন নিজেকে সাজিয়ে তোলার মাঝে নিজের ত্রুটি খুঁজি, সৌন্দর্যের চাপে নিজেকে হারিয়ে ফেলি। এই গল্প শুধুমাত্র সময়োপযোগী একটি সতর্কবার্তা নয় The Substance আমাদের জানিয়ে দেয়, এই ভয়াবহতাগুলো বহুদিন ধরেই আমাদের সাথে ছিল এবং এই ব্যথা শুধু চামড়ার নিচেই নয় তারও অনেক গভীরে।