Home Blog Page 52

দেশে এক বছরে ১০ হাজার কোটি টাকার আপেল-মাল্টা বিক্রি

গত অর্থবছর বিদেশি ফল আপেল ও মাল্টার পেছনে বাংলাদেশের মানুষের খরচের পরিমাণ ১০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। এই হিসাব উঠে এসেছে আমদানি আর খুচরা বিক্রয়ের তথ্যে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বলছে, গত অর্থবছর আপেল আমদানি হয়েছে ১৬ কোটি ১৪ লাখ কেজি আর মাল্টা আমদানি হয়েছে ১৬ কোটি ৮৬ লাখ কেজি। সব মিলিয়ে বিদেশি ফল দুটি আমদানি হয়েছে ৩৩ কোটি কেজি।

গত বছর প্রতি কেজি সাধারণ আপেল বিক্রি হয়েছে গড়ে ৩০০ থেকে ৩২০ টাকায়। মাল্টা বিক্রি হয়েছে কমবেশি ২৮০ টাকায়। ভালো মানের আপেল ও মাল্টার দাম আরও বেশি।

আমদানি ও খুচরা মূল্যের হিসাবে, গত বছর আপেল খেতে ক্রেতাদের খরচ হয়েছে প্রায় ৫ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা। মাল্টার জন্য ক্রেতাদের খরচ ৪ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে গত বছরের গড় খুচরা দামে তা দাঁড়ায় ৯ হাজার ৯৬৭ কোটি টাকা।

আপেল-মাল্টার দাম আগের তুলনায় বেড়েছে। আমদানিও ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় গত অর্থবছরে কিছুটা অর্থাৎ ৪% কমেছে। ক্রয়ক্ষমতা থাকায় যেমন অনেকের এই ফল দুটি কেনার সামর্থ্য রয়েছে, তেমনি অনেকের সামর্থ্য না থাকায় হয়তো খাওয়া হয়নি।

গত অর্থবছরে ব্যবসায়ীরা প্রতি কেজি আপেল আমদানির জন্য খরচ করেছেন গড়ে ৭৬ টাকা ৩৫ পয়সা। প্রতি কেজি আপেল খালাসের আগে সরকারি কোষাগারে ব্যবসায়ীদের জমা দিতে হয়েছে গড়ে ১০৩ টাকা। তার মানে, বাজারে যাওয়ার আগে প্রতি কেজি আপেলে আনুষ্ঠানিক খরচ দাঁড়াল ১৭৯ টাকা ৩৫ পয়সা।

বন্দর থেকে খালাসের সময় বন্দরে হিমায়িত কনটেইনার রাখার ভাড়া দিতে হয়। তারপর আছে পরিবহন, সংরক্ষণসহ আনুষঙ্গিক খরচ। এভাবে ধাপে ধাপে মূল্য সংযোজন হতে থাকে। বাজারে নেওয়ার পর আমদানিকারকের হাত ঘুরে পৌঁছায় পাইকারি ব্যবসায়ীদের হাতে। পাইকারি থেকে কিনে নেন খুচরা বিক্রেতারা।

ক্রেতাদের পকেট থেকে যাওয়া মোট টাকার ২ হাজার ৪৩৯ কোটি টাকা পেয়েছেন বিদেশি বিক্রেতারা। আর সরকার রাজস্ব পেয়েছে ৩ হাজার ২২০ কোটি টাকা। বাকি টাকা ধাপে ধাপে আমদানিকারক আর ব্যবসায়ীরা পেয়েছেন।

গত বছর এই দুটি ফল আমদানিতে যুক্ত ছিল ৪৬৯ প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান হয়েছে অনেক মানুষের। আবার আমদানিকারক থেকে পাইকারি এবং পাইকারি থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।

গোর্খা রাজ্য – যে উপকথা নেপালকে আধুনিক রাষ্ট্র বানালো

নেপালের ইতিহাস বলতে গেলে গোর্খা রাজ্যের কথা আসবেই। এটি কেবল একটি ছোট পাহাড়ি রাজ্য ছিল না, ছিলো একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক শক্তি, যা পরবর্তীতে সমগ্র নেপালকে একত্রিত করে একটি আধুনিক রাষ্ট্রের ভিত্তি তৈরি করে। গোর্খা রাজ্যকে ঘিরে অনেক গল্প, অনেক গৌরব এবং অনেক রক্তক্ষয় আছে, একদিকে সাম্রাজ্য বিস্তারের কাহিনী, অন্যদিকে একটি জাতি গঠনের সংগ্রাম। ১৫৫৯ সালে রাজা দ্রাব্য শাহ ছোট্ট একটি রাজ্য হিসেবে গোর্খার (বর্তমান নেপালের পশ্চিমাংশে) ভিত্তি স্থাপনের মাধ্যমে গোর্খা রাজ্যের প্রতিষ্ঠা হয়। গোর্খার নামের উৎপত্তি ‘গোরক্ষনাথ’ থেকে, যিনি হিন্দু ধর্মে এক বিশিষ্ট যোগী। এর অবস্থান ছিল হিমালয়ের পাদদেশে, যা তাকে প্রাকৃতিকভাবে সুরক্ষিত ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। পাহাড়ি অঞ্চল হওয়ায় গোর্খাবাসীরা ছিল চটপটে, শক্তিশালী ও অভ্যস্ত কঠোর পরিশ্রমে যেগুলো তাদের সামরিক সাফল্যের অন্যতম কারণ।

দ্রাব্য শাহ গোর্খাকে একটি সুসংগঠিত প্রশাসনিক কাঠামোতে রূপান্তর করেন। তিনি স্থানীয় ক্ল্যান ও উপজাতিকে একত্রিত করে সামন্ততান্ত্রিক রাজনীতির বিরুদ্ধে একত্র হন। তবে গোর্খার প্রকৃত উত্থান ঘটে ১৮শ শতকের মাঝামাঝিতে, যখন রাজা পৃথ্বী নারায়ণ শাহ সিংহাসনে আরোহণ করেন।

১৭৪৩ সালে পৃথ্বী নারায়ণ শাহ রাজা হন। তিনিই গোর্খা রাজ্যকে একটি সাম্রাজ্যে রূপান্তর করার প্রকৃত রূপকার। তিনি উপলব্ধি করেন ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা এবং রাজনৈতিক দুর্বলতা নেপালিদের জন্য একটি দুর্বলতা। এই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে তিনি গোর্খা সেনাবাহিনীকে আধুনিক প্রশিক্ষণে গড়ে তোলেন এবং ধারাবাহিক যুদ্ধের মাধ্যমে একের পর এক রাজ্য দখল করতে থাকেন। কাঠমান্ডু উপত্যকার দখল ছিল এই একীকরণ প্রক্রিয়ার মোক্ষম পদক্ষেপ। ১৭৬৮ সালে গোর্খা বাহিনী মল্ল রাজাদের পরাজিত করে কাঠমান্ডু, পাটন এবং ভক্তপুর দখল করে। এ তিন শহর ঐতিহাসিকভাবে সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ ছিল, তাই এ দখল গোর্খা রাজ্যকে রাজনৈতিক বৈধতা ও অর্থনৈতিক শক্তি এনে দেয়।

গোর্খা সেনাবাহিনী ছিল সুসংগঠিত ও অনুশাসনপ্রিয়। পাহাড়ি ভূখণ্ডে যুদ্ধের দক্ষতা এবং গেরিলা কৌশলে তাদের জুড়ি ছিল না। তারা কুখ্যাত ‘খুকরি’ ছুরি ব্যবহার করত, যা আজও গোর্খা যোদ্ধাদের প্রতীক। গোর্খা বাহিনী শুধুই বলপ্রয়োগে জয়লাভ করেনি, তারা উন্নত প্রশাসন ও ন্যায্য বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের মন জয় করত। এই নীতিই ছিল পৃথ্বী নারায়ণ শাহের মূল শক্তি।

গোর্খা রাজ্যের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে নেপালের সংস্কৃতিতে একীকরণ ঘটতে থাকে। নেপাল বহু জাতিগোষ্ঠীর আবাসভূমি হলেওগোর্খা প্রশাসন স্থানীয় সংস্কৃতিকে সমন্বয় করে একটি সামগ্রিক নেপালি পরিচয় নির্মাণে সচেষ্ট ছিল। এই সময়ে হিন্দু ধর্মকে রাষ্ট্রীয় আইডেন্টিটির অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। একইসঙ্গে প্রশাসনিক ভাষা হিসেবে নেপালি (পার্বত্য খাস ভাষা) প্রচলিত হয়।

গোর্খা রাজ্যের সাম্রাজ্য বিস্তারের উচ্চাকাঙ্ক্ষা একসময় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। ১৮১৪-১৮১৬ সালের আংলো-নেপাল যুদ্ধ গোর্খার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। গোর্খারা সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করলেও শেষ পর্যন্ত তাদের পরাজয় ঘটে এবং সুগৌলি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে নেপাল ব্রিটিশ ভারতের অনেক অঞ্চল হারায়, তবে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকে।

গোর্খা রাজ্য শুধু নেপালেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তাদের সামরিক দক্ষতা ও সাহসিকতা এমন এক শক্তিশালী পরিচয় তৈরি করে, যা ব্রিটিশরাও স্বীকার করতে বাধ্য হয়। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গোর্খা যোদ্ধাদের সাহস ও লড়াইয়ের ক্ষমতা দেখে ১৮১৫ সালের পর তাদের নিজস্ব বাহিনীতে ‘গোর্খা রেজিমেন্ট’ গঠন করে। এই রেজিমেন্ট আজও ব্রিটিশ এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ‘গোর্খা’ নামটি তাই শুধু একটি ভৌগোলিক এলাকা নয়, বরং একটি আন্তর্জাতিক সামরিক পরিচয়ে পরিণত হয়েছে।

১৯শ শতকের শেষে ও ২০শ শতকের শুরুতে নেপালের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত রানা শাসন ব্যবস্থা গোর্খা রাজবংশকে ছায়াচ্ছন্ন করে তোলে। তবু গোর্খা ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করেই রাষ্ট্রের কাঠামো গড়ে ওঠে। ১৯৫১ সালে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে রানা শাসনের অবসান হয় এবং রাজতন্ত্র নতুনভাবে শক্তিশালী হয়। গোর্খা রাজ্যের পূর্বসূরিদের ভাবনা ও জাতিগত সংহতির ধারণা আধুনিক নেপালের সংবিধান প্রণয়ন ও জাতীয় পরিচয় নির্মাণে ভূমিকা রাখে।

‘গোর্খা’ এখন শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়, এটি নেপালিদের সাহসিকতা, আত্মত্যাগ এবং ঐক্যের প্রতীক। সাহিত্য, চলচ্চিত্র এবং লোকগাথায় এই নাম বহুবার উঠে এসেছে। নেপালের জাতীয়তাবাদী চেতনায় ‘গোর্খা পরিচয়’ একটি সাংস্কৃতিক ক্যাটালিস্ট হিসেবে কাজ করে, যার প্রতিধ্বনি আজও নেপালিদের রাজনৈতিক বক্তব্য এবং নাগরিক গৌরবের অংশ।

শেখ হাসিনার অডিও ফাঁস – ভারতের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক দ্য স্টেটসম্যানের সম্পাদকীয়

“বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে সম্প্রতি যেসব তথ্য ফাঁস হয়েছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অন্ধকার ও নিদর্শনময় অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একসময় যিনি গণতন্ত্রের রক্ষক এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির রূপকার হিসেবে প্রশংসিত ছিলেন, এখন তিনি দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক ইতিহাসে শান্তিকালীন অন্যতম নৃশংস দমন-পীড়নের সরাসরি নির্দেশদাতা হিসেবে অভিযুক্ত। যাচাইকৃত অডিও রেকর্ডিং এবং ফরেনসিক বিশ্লেষণে প্রমাণিত হয়েছে যে, শেখ হাসিনা নিজে ছাত্র-আন্দোলনের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের নির্দেশ দিয়েছিলেন।

প্রথমে সরকারি চাকরির কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন দিয়ে যে বিক্ষোভ শুরু হয়, তা দ্রুতই জাতীয় অভ্যুত্থানে রূপ নেয়–যা বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থার গভীর অসঙ্গতিগুলো উন্মোচন করে দেয়। পরবর্তী দমন-পীড়ন কোনো স্থানীয় প্রশাসনের ভুল হিসাব ছিল না; বরং এটি ছিল রাষ্ট্রীয় সহিংসতার একটি সমন্বিত, উপরের দিক থেকে পরিচালিত প্রয়োগ। অনেক হিসাব অনুযায়ী, এতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে এক হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হন। এই স্বৈরতান্ত্রিক অধঃপতন হঠাৎ ছিল না।

গত এক দশকে শেখ হাসিনা ধীরে ধীরে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেছেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব করেছেন এবং নজরদারি, সেন্সরশিপ ও নির্বিচার গ্রেফতারের মাধ্যমে ভিন্নমত দমন করেছেন। ৫ আগস্টের হত্যাযজ্ঞ– যা আন্দোলনের সবচেয়ে ভয়াবহ দিন বলে বিবেচিত, তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি ছিল বহু বছরের স্বৈরতন্ত্রের পরিণত প্রকাশ। একধরনের ‘গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট’-এর আড়ালে চলছিল এসব।

গত বছরের এই হত্যাযজ্ঞ এখনো বাংলাদেশের তরুণদের মনে তীব্র ক্ষতের মতো বেঁচে আছে। অনেকেই তাদের বন্ধুদের প্রকাশ্যে গুলিবিদ্ধ হতে দেখেছেন। শুধুমাত্র ন্যায্যতা, মর্যাদা এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা দাবি করায় তাদের গুলি করা হয়েছে।

এমনকি যখন এই গোপন রেকর্ডিংগুলো আন্তর্জাতিক মহলে সাড়া ফেলছে, তখনও হাসিনার দল দাবির পক্ষে অটল। তাদের ভাষায়, এসব পদক্ষেপ ‘উপযুক্ত ও সৎনিয়তে’ নেয়া হয়েছিল।

কিন্তু প্রমাণগুলো ভিন্ন কথা বলছে:
– সামরিক গ্রেডের অস্ত্র হাতে পুলিশ বাহিনী নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের উপর আধাঘণ্টারও বেশি সময় ধরে গুলি চালায়।
– ফরেনসিক ভয়েস-ম্যাচিংয়ে শেখ হাসিনার কণ্ঠ শনাক্ত হয়, যেখান থেকে নির্দেশ এসেছে।
– সরকারের নজরদারি অবকাঠামো ব্যবহার করে বিরোধীদের গতিবিধি মনিটর ও দমন করা হয়েছে।

এই ঘটনার প্রভাব শুধু বাংলাদেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি প্রতিবেশী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে এক তীব্র প্রশ্ন তোলে–একটি শক্তিশালী, প্রতিষ্ঠিত সরকার যদি নিজ দেশের জনগণের ওপর এভাবে সহিংসতা চালায়, তাহলে বিশ্ব কী ভূমিকা পালন করবে?

সংকটে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরও এখনো সুস্পষ্ট আশার আলো দেখা যাচ্ছে না।বাংলাদেশের প্রকৃত গণতান্ত্রিক পুনরুদ্ধার কেবল অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এ দেশের জনগণের বিরুদ্ধে সংঘটিত বর্বরতার একটি জাতীয় বিচারের মধ্য দিয়েও তা নির্ধারিত হবে।

এই বিচার প্রতিশোধের জন্য নয়–বরং নিশ্চিত করার জন্য যে ভবিষ্যতে আর কোনো জনপ্রিয় বা উত্তরাধিকারি নেত্রী ক্ষমতার অপব্যবহার করতে না পারেন। ঢাকা শহরে যখন ইতিহাস রচিত হচ্ছে, তখন গোটা অঞ্চলকে সতর্কভাবে তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কারণ স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের যত কথাই বলা হোক, একটি রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক, তার প্রকৃত মাপকাঠি হলো–সাধারণ মানুষ যখন প্রতিবাদ করে, তখন সরকার তাদের প্রতি কেমন আচরণ করে। সেই পরীক্ষায় শেখ হাসিনা ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হয়েছেন।”

AI কনটেন্ট YouTube এর নতুন পদক্ষেপ

সম্প্রতি YouTube এমন এক যুগে প্রবেশ করেছে যেখানে কনটেন্টের পরিমাণ বিপুল হলেও প্রতিনিয়ত এর মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে AI ব্যবহৃত ভিডিওগুলোর গুণগত মান, মৌলিকতা ও ভিউয়ার এক্সপেরিয়েন্সের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে YouTube ঘোষণা করেছে, তারা শিগগিরই mass-produced ও repetitive ভিডিওগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। এর লক্ষ্য হচ্ছে প্ল্যাটফর্মে মানসম্পন্ন, তথ্যবহুল এবং আসল কনটেন্টের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা।

YouTube-এর মতে, এমন সব কনটেন্টকে mass-produced বা repetitive বলা হচ্ছে যেগুলো একই স্ক্রিপ্ট, গানের ব্যাকগ্রাউন্ড, ভিজ্যুয়াল ফরম্যাট বা স্টাইল বারবার ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে। এসব ভিডিও সাধারণত এআই বা স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম দিয়ে তৈরি হয় এবং অনেক সময় কোনো পার্সোনাল টাচ থাকে না। উদাহরণস্বরূপ একটি বাচ্চাদের ছড়া বা টিউটোরিয়াল ভিডিও শুধু নাম, ভয়েসওভার বা কিছু গ্রাফিক্স পাল্টে অনেকগুলো চ্যানেলে একইভাবে ক্লোন করে আপলোড করা হয়। এই ধরনের ভিডিওর বিস্তার সাধারণ কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের দৃশ্যমানতা হ্রাস করছে এবং একই সঙ্গে দর্শকদের মধ্যে একঘেয়েমিও তৈরি করছে।

মূলত দু’টি কারণে YouTube এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, ChatGPT, Sora, Runway-এর মতো এআই টুল দিয়ে খুব সহজেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিডিও তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। এতে কনটেন্টের মৌলিকতা এবং মানুষের তৈরি কনটেন্টের সঙ্গে প্রতিযোগিতা অসমান হয়ে যাচ্ছে। অনেক YouTube দর্শক ও বিজ্ঞাপনদাতা অভিযোগ করেছে যে, প্ল্যাটফর্মে নিম্নমানের ও পুনরাবৃত্ত কনটেন্ট বেশি দেখা যাচ্ছে, যা তাদের অভিজ্ঞতাকে ক্ষুণ্ণ করছে।

কীভাবে বাস্তবায়ন হবে এই ক্র্যাকডাউন?
YouTube ঘোষণা করেছে তারা তাদের মডারেশন এবং মনিটরিং অ্যালগরিদমে নতুন আপডেট আনবে। এতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যে ভিডিওগুলো একই কনটেন্ট বারবার ব্যবহার করছে বা কোনো স্প্যামি প্যাটার্ন অনুসরণ করছে শনাক্ত করা যাবে। এসব কনটেন্টকে demonetize করে দেওয়া হবে, এসব ভিডিও থেকে আয় করা যাবে না, এমনকি প্রয়োজনে তা প্ল্যাটফর্ম থেকেও সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। YouTube Partner Program-এ (YPP) যারা আছেন তাদের জন্য নতুন রিভিউ মেকানিজম আনা হবে, যেখানে mass-produced বা repetitive nature-এর কনটেন্টের জন্য আলাদা নীতিমালা কার্যকর হবে।

এই পদক্ষেপকে অনেকেই স্বাগত জানালেও কিছু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে এআই ব্যবহৃত কিন্তু মানসম্মত কনটেন্টও কি এই নিয়মের শিকার হবে? ছোট চ্যানেল যারা টেমপ্লেট ব্যবহার করে ভিডিও তৈরি করে তাদের কী হবে? YouTube জানিয়েছে, তারা প্রেক্ষিত বুঝে case-by-case রিভিউ করবে এবং content originality, viewer value ও human input কে গুরুত্ব দেবে।

“Taste of Cherry” আমার কাছে জীবনকে বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা : আব্বাস কিয়ারোস্তামি

প্রশ্ন: আপনি তো সান ফ্রান্সিসকোতে “আকিরা কুরোসাওয়া আজীবন সম্মাননা পুরস্কার” নিতে এসেছেন। কুরোসাওয়ার ছবিগুলোর সঙ্গে আপনার কি বিশেষ কোনো আত্মিক টান আছে?

উত্তর: না, সরাসরি কোনো আত্মিক টান নেই। তবে আমার মনে হয়, একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা যিনি হয়তো এক ধরনের ধারায় কাজ করেন, অন্য একদম ভিন্ন ধাঁচের নির্মাতার কাজ থেকেও আনন্দ নিতে পারেন। যেমন, আমি “দ্য গডফাদার” সিনেমাটি সত্যিই খুব পছন্দ করি এবং এটা বললে অনেকেই অবাক হন। তারা বলেন, “আপনি যেরকম সিনেমা বানান, আপনি কিভাবে এমন একটা সিনেমা পছন্দ করতে পারেন?” কিন্তু এটাই তো সিনেমার সৌন্দর্য! [হাসি]

প্রশ্ন: আপনার ছবিগুলোতে অনেক সময়ই চরিত্র বা গল্পের সব কিছু স্পষ্টভাবে বলা থাকে না। আপনি নিজেই বলেছেন, দর্শক যেন নিজের মতো করে ছবিটা শেষ করে নেয়। কিন্তু একদিকে আপনি বলছেন সবাই একইরকম মানুষ, অন্যদিকে বলছেন সবাই যেন ভিন্নভাবে বুঝে। এই দ্বৈততা কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

উত্তর: এটা সত্যিই কঠিন প্রশ্ন। হ্যাঁ, মানুষ আলাদা এবং আমি চাই না যে সবাই সিনেমা দেখে একদম একইভাবে সেটাকে বুঝে ফেলুক। একটা ক্রসওয়ার্ড পাজল যেমন সবাই ঠিকঠাক একইভাবে পূরণ করে সেটা আমার উদ্দেশ্য নয়। কেউ যদি ভুল বুঝেও ছবিটা শেষ করে, তাও সেটা সঠিক, কারণ সেটাই তার নিজের উপলব্ধি। আমি ছবিতে ফাঁকা জায়গা রাখি যেন দর্শক নিজের চিন্তা আর অভিজ্ঞতা দিয়ে সেটা পূরণ করতে পারে। আমার মতে কবিতা, সংগীত বা ভাস্কর্যের মতো বিমূর্ততা সিনেমাতেও আসা উচিত। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সিনেমা কেবল গল্প বলার মাধ্যমে আটকে গেছে, শিল্পের জায়গা থেকে দূরে সরে গেছে।

প্রশ্ন: কেউ কেউ সত্যিই বিমূর্ত সিনেমা বানান যেখানে গল্প নেই, শুধু রঙ, গতি, আবেগ। আপনাকে কি সেসব টানে?

উত্তর: প্রতিটি ছবিতে কিছু না কিছু গল্প থাকা উচিত। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেই গল্পটা কীভাবে বলা হচ্ছে। আমি চাই গল্পটা যেন কবিতার মতো হয়, দর্শকের চোখে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ তৈরি করে। কিছু ছবি আমাকে পুরোপুরি আকর্ষণ করে না, তবুও মাঝখানে এমন একটা মুহূর্ত থাকে, যা আমার কল্পনায় একটা জানালা খুলে দেয়। অনেক সময় মাঝপথেই সিনেমা ছেড়ে বের হয়ে এসেছি, কারণ মনে হয়েছে, আমি ছবির শেষটা নিজের মতো বুঝে ফেলেছি। এরপর যদি বসে থাকি, তাহলে সে অনুভূতিটা নষ্ট হয়ে যাবে।

প্রশ্ন: আপনি আসলে একজন কবির মতো কাজ করেন। আপনার ছবির নাম তো “The Wind Will Carry Us”—এটা তো কবিতার লাইন এবং ছবিতেও কবিতার অংশ আছে। আপনি কি সিনেমাকে উপন্যাসের চেয়ে বেশি কবিতার দিকে নিয়ে যেতে চাইছেন?

উত্তর: অবশ্যই। আমি বিশ্বাস করি, টিকে থাকার দিক থেকে কবিতার সিনেমাই বেশি সময় ধরে বাঁচবে, গল্প বলা সিনেমা নয়। আমার বাসার উপন্যাসের বইগুলো প্রায় নতুনই আছে, একবার পড়েই রেখে দিয়েছি। কিন্তু কবিতার বইগুলো ছেঁড়াফাঁড়া হয়ে গেছে কারণ আমি বারবার সেগুলো পড়ি। কবিতা সবসময় ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকে, বারবার নতুন অর্থ বের হয়। উপন্যাস একবার পড়লে আপনি জেনে ফেলেন কী হয়েছে, কিন্তু কবিতা প্রতিবার নতুন কিছু দেয়।

প্রশ্ন: কিন্তু মানুষ তো সাধারণত সিনেমা একবার-দুইবার দেখেই শেষ করে। আপনি কি আশা করেন মানুষ আপনার ছবি বারবার দেখবে?

উত্তর: না, এটা বলা স্বার্থপরতা হবে। আমি সিনেমা বানানোর সময় ভাবি না কে ক’বার দেখবে। আমি যা জানি, সেইভাবে বানাই। তারপর ফলাফল মেনে নিই, সেটা সুখকর হোক বা না হোক। তবে আমি জানি, অনেক দর্শক ছবি দেখে হয়তো সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট হবে না, কিন্তু সেটা তারা ভুলতেও পারবে না। ডিনারের সময় তারা এ নিয়ে কথা বলবে। আমি চাই দর্শকের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হোক, তারা ভাবুক ছবিটা নিয়ে।

প্রশ্ন: স্কুলে আমরা যেসব কবিতা মুখস্থ করতাম, সেগুলো আসলে ভাবনার দরজা খুলত না বরং ভেতরটা বন্ধ করে দিত। আপনার সিনেমা তো উল্টোভাবে কাজ করে।

উত্তর: একদম ঠিক বলেছেন। কবিতার সিনেমা হচ্ছে এমন এক ধাঁধা যেখানে টুকরোগুলো আপনি নিজের মতো সাজাতে পারেন। শেষ পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত ফলাফল নেই, কোনো উপদেশও নেই।

প্রশ্ন: আর কোন নির্মাতাদের আপনি আপনার ধরণের ভাবনার কাছাকাছি মনে করেন?

উত্তর: হৌ শিয়াও শিয়েন একজন। তর্কোভস্কির ছবি আমাকে বাস্তব জীবন থেকে পুরো আলাদা করে দেয় সবচেয়ে আধ্যাত্মিক মনে হয়। ফেলিনির ছবিতেও যেমন স্বপ্নের জগৎ আসে, তর্কোভস্কির ছবিতে সেটা পুরোটাই আছে। থিও অ্যাঞ্জেলোপুলাসের ছবিগুলোতেও কিছু মুহূর্তে সেই আধ্যাত্মিকতা আসে। আমার বিশ্বাস, সিনেমা ও শিল্প আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বাইরের কোথাও নিয়ে যেতে পারে যদিও শুরুটা সেখান থেকেই হয়। এটাই আমাদের শান্তি দেয়।

প্রশ্ন: “Taste of Cherry” ছবির নায়ক তো পুরোপুরি জীবন থেকে মুক্তি চাইছিলেন। একে মানসিক সমস্যা বলা যায় না। বরং এটা আবারও সেই ভৌত ও আত্মিক দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে।

উত্তর: হ্যাঁ, দর্শকরা এ নিয়ে নানা মত দেয়। আত্মহত্যা ইসলাম ধর্মে নিষিদ্ধ, কিন্তু অনেক ধার্মিক মানুষ ছবিটা ভালোবেসেছে। তারা বলেছে, এটা আত্মহত্যা নয়, এটা স্বর্গে যাওয়ার খোঁজ। ছবির শেষ দিকে চেরি ফুল আর প্রকৃতির দৃশ্য সেই বার্তাই দেয় সে একটা শান্তিময় জায়গায় পৌঁছেছে।

প্রশ্ন: ছবিটা কি সেন্সরের সমস্যা পড়েছিল?
উত্তর: কিছু বিতর্ক হয়েছিল। তবে আমি তাদের বোঝাতে পেরেছিলাম, ছবিটা আত্মহত্যা নিয়ে না, জীবনের শেষ করার “সক্ষমতা” নিয়ে। সেই সক্ষমতাই ঈশ্বরের দয়া। ঈশ্বর আমাদের এই দরজা দিয়েছেন, আমরা নিজেরা বেছে নেই জীবনে থাকা। একটা দার্শনিকের কথা আমাকে সাহায্য করেছিল: “আত্মহত্যার সম্ভাবনা না থাকলে, আমি অনেক আগেই নিজেকে মেরে ফেলতাম।” ছবির মূল বার্তা হলো জীবনকে বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা।

প্রশ্ন: আপনি তো সম্পূর্ণ স্ক্রিপ্ট ছাড়াই কাজ করেন, চরিত্র আর সংলাপ তৈরি হয় শুটিংয়ের সময়। কেন?
উত্তর: এটা করতে হয়েছে কারণ আমি অপেশাদার অভিনেতাদের নিয়ে কাজ করি। যখন একটা দৃশ্য বুঝিয়ে দিই, তারা এমনভাবে কথা বলে, যা আমি ভাবিইনি। এটা একটা চক্রের মতো, আমি জানি না আমি তাদের শেখাই, না তারা আমাকে। অনেক সময় দর্শকদের মতো আমিও অবাক হয়ে যাই।

রাজনীতিতে বিরোধ বাড়ছে, গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারে ঐক্যমত হচ্ছে না

নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নিয়োগে বিরোধীদলকে যুক্ত করে কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে বিএনপি, যা সবাই ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। কিন্তু, নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে (পিআর পদ্ধতিতে) রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে উচ্চকক্ষের আসন বণ্টন এবং সাংবিধানিক নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ–এ দুটি মৌলিক সংস্কারে রাজি নয় বিএনপি। এনসিপি, জামাত, ইসলামী আন্দোলনসহ বেশিরভাগ দল এই দুটি বিষয়ে একমত।

রাজনৈতিক সূত্রের বরাতে সমকালকে জানিয়েছে–পিআর, উচ্চকক্ষ, সাংবিধানিক নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণসহ কয়েকটি সংস্কার প্রস্তাবে কাছাকাছি অবস্থানে আনতে গত বৃহস্পতিবার রাতে বিএনপি, জামায়াত এবং এনসিপি নেতাদের নিয়ে ‘অঘোষিত বৈঠক’ করে সরকার। তবে এতে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ বৈঠকে জানিয়ে দেন, পিআর পদ্ধতির উচ্চকক্ষ বিএনপি মানবে না। প্রয়োজন হলে উচ্চকক্ষের দরকার নেই। জামায়াত এবং এনসিপির প্রতিনিধিরা বৈঠকে জানান, আনুপাতিক উচ্চকক্ষের দাবি তারা ছাড়বেন না।

পরে সরকারের একজন উপদেষ্টা এ নিয়ে বিএনপি শীর্ষ নেতৃত্বের দ্বারস্থ হন। সেখান থেকেও জানানো হয়, সালাহউদ্দিন আহমেদের বক্তব্যই বিএনপির অবস্থান।

কমিশন প্রস্তাব করেছিল, সংবিধান সংশোধনে সংসদের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন হবে। বিএনপির ভাষ্য, উচ্চকক্ষের আসন ভোটের অনুপাতে বা পিআর পদ্ধতিতে বণ্টন হলে কোনো দল এককভাবে ৬৭% বা দুই-তৃতীয়াংশ ভোট পাবে না। ফলে ভবিষ্যতে সরকারি দলের পক্ষে একক সিদ্ধান্তে সংবিধান সংশোধনের সুযোগ থাকবে না।

কমিশনের মতো জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলনসহ অন্য দলগুলোর যুক্তি, অতীতে সরকারি দলগুলো ৪০-৪৯% ভোট পেয়েও দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়ে ইচ্ছামাফিক সংবিধান সংশোধন করেছে। এই ব্যবস্থা ঠেকাতেই সংসদের উচ্চকক্ষে তারা পিআর পদ্ধতি চালুর দাবি জানাচ্ছে।

বিএনপিকে রাজি করাতে না পেরে বিকল্প প্রস্তাব দিতে যাচ্ছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি দলের নেতারা সমকালকে বলেছেন, এ প্রস্তাব অগ্রহণযোগ্য। তাদের বক্তব্য–আনুপাতিক উচ্চকক্ষ ও সাংবিধানিক নিয়োগ কমিটি মৌলিক সংস্কার, এ দুই বিষয়ে কোন ছাড় নেই।

চলমান সংলাপে অংশ নেওয়া ৩০ রাজনৈতিক দল এবং জোটের মধ্যে জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলনসহ ২৩ দল আনুপাতিক পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষের বিষয়ে একমত। বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনের মিত্র গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন, জেএসডি, নাগরিক ঐক্যও এতে একমত।

“বুদ্ধদেব বসুর কবিতা ও কাব্যচিন্তার মৌল সদৃশতা” : সৌভিক রেজা, লেখক ও সাহিত্য সমালোচক

বুদ্ধদেব বসুকে নিয়ে বাঙালি পাঠকের একটা বেশ বড়ো অংশের রয়েছে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, সমীহ। সেই অর্থে তাঁকে নিয়ে এখনো পর্যন্ত নেতিবাচক সমালোচনা খুব বেশি নেই। এর একটা কারণ হচ্ছে, বুদ্ধদেবের সাহিত্যচিন্তার মধ্যে রাজনীতির অংশটা তুলনামূলকভাবে কম; কখনো-কখনো নেই বলেই মনে হয়। ভাববাদী সমালোচনাকে তিনি একটি চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যেতে সমর্থ হয়েছিলেন, সেটিকে একটি স্বীকৃত আকৃতি দিয়েছিলেন। এছাড়া গতিশীল প্রাণবান জীবনের বহমান সৃষ্টিশীলতার যে-কথাটি নানাভাবে বলা হয়, তার অনবদ্য একটি নমুনা আমরা বুদ্ধদেব বসুর মধ্যে দেখতে পাই।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে তিনি ফ্যাসিবাদবিরোধী, প্রগতিশীল রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে খানিকটা জড়িয়ে গিয়েছিলেন। এ-সম্পর্কে অনেক পরে বুদ্ধদেব স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানিয়েছিলেন, ‘সুখের হয়নি আমার পক্ষে, যুদ্ধকালীন কলকাতার সেই যোড়বহুল রাজনীতি … কোনো তৎকালিক বিষয়ে … আমার একফোঁটা উৎসাহ নেই। আমি পাই না সেই বাতাসের ছোঁওয়া যাতে অস্পষ্ট রেণু উড়ে বেড়ায়, সেই অর্ধালোক যেখানে কল্পনা খেলা করতে পারে।’ আর তারপরই বুদ্ধদেব তাঁর সেই জৈবনিক পর্বের ইতি টেনে নিজের অভিজ্ঞতার সারসংকলন করেছেন এইভাবে – ‘অনেক বিক্ষেপ ও বিশৃঙ্খলা ও সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে, উদ্যমের অনেক অপব্যয় ও আবেগের অনেক ব্যর্থতা পেরিয়ে ধীরে ধীরে আমার অনুভূতি হলো যে সব গতি ও প্রগতি ও পতন ও বিতর্কের পরে অবশেষে কোনো-এক গভীর রাত্রে নিজের মধ্যে নিবিষ্টতা ভালো।’

বলা যায়, এই নিবিষ্টতার মধ্যেই নিহিত রয়েছে বুদ্ধদেব বসুর যাবতীয় সাহিত্যকর্মের প্রার্থিত ও প্রাণময় চেতনা। তাঁর মৌলিক সৃষ্টিপ্রতিভার সমস্ত উৎসমুখ সেখান থেকেই উৎসারিত হয়েছে, হয়েছে বিকশিত আর উৎসিক্ত। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের পদাতিক কাব্যের আলোচনার উপসংহারেও তিনি বলেছিলেন, ‘দুদিক বজায় রাখা চলবে না। … হয় তাঁকে [সুভাষ মুখোপাধ্যায়] কর্মী হতে হবে নয়তো কবি।’

এসবের মানে এইটি নয় যে, বুদ্ধদেব বসু নির্বিকারভাবে তাঁর সাহিত্যচিন্তাকে গ্রহণ করেছিলেন, যার মধ্যে শুধু কল্পনার একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। বিষয়টি ঠিক তেমন নয়। আত্মজিজ্ঞাসাকে তিনি বরাবরই গুরুত্ব দিয়েছেন আর তাঁর সাহিত্যচিন্তার মধ্যে আমরা সেই আত্মজিজ্ঞাসারই একটি সদর্থক ও সকর্মক অভিযান দেখতে পাই। আর সেসবের সঙ্গে তিনি যুক্ত করেছিলেন সাহিত্যচিন্তার দ্ব্যর্থময় দ্যুতি, যাকে কখনো-কখনো একজন সাহিত্যিকের, একজন সৃষ্টিশীল মানুষের চৈতন্যের জাগরণ হিসেবে অভিহিত করতে চেয়েছেন। আর তিনি দৃঢ়ভাবে এই বিশ্বাসে স্থিত হয়েছিলেন যে, ‘চৈতন্য মানেই আধ্যাত্মিকতা’। এসবের সঙ্গে ধর্মের কোনো সরাসরি সংযোগ নেই, যদিও কখনো-কখনো নিজেকে তিনি সরাসরি ‘হিন্দু’ হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছিলেন। বরিস পাস্তেরনাক যেমন স্বীকার করেছিলেন, ‘খ্রিষ্ট এসেছিলেন আমার কাছে, তাঁকে না পেলে এই যুগের যন্ত্রণা আমি সহ্য করতে পারতাম না।’ তাঁর কবিতার মধ্যেও আমরা সেই স্বীকারোক্তির কাব্যিক নমুনা দেখতে পাই –

ক্ষান্ত কলরোল। আমি বেরিয়ে আসি রঙ্গমঞ্চে।
দরজার খুঁটিতে হেলান দিয়ে
দূর প্রতিধ্বনি থেকে আন্দাজ করে নিতে চাই
আমার আয়ুষ্কালের আসন্ন ঘটনাগুলিকে।
হাজার দূরবীনের দৃষ্টি ধারে-ধারে
আমাকে তাক করে আছে রাতের অন্ধকার।
আব্বা, পিতা, যদি সম্ভব হয়
আমার এই পাত্র হোক হস্তান্তরিত।
(অনুবাদ : বুদ্ধদেব বসু)

অন্যদিকে বুদ্ধদেব বসুর ভাষ্য হচ্ছে এ-রকম : ‘আমরা হিন্দু, আমাদের পক্ষে নিজেদের বা অন্যদের কোনো ধর্মই আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করা সম্ভব নয়।’ কেন সম্ভব নয়? – সেটি আরো বিশদে গিয়ে বুদ্ধদেব বলেছেন, ‘পৌত্তলিক আমরা, আমাদের কাছে সবই রূপ হয়ে ওঠে, হয়ে ওঠে রূপক বা প্রতীক; আমরা জানি যে ধ্যান ভিন্ন মুক্তির পথ নেই।’ আর সেইসঙ্গে তিনি সেই ধ্যানের গুণ ও ক্রিয়া সম্পর্কে নিজের উপলব্ধিকে প্রকাশ করেছিলেন এইভাবে : ‘ধ্যানের লক্ষ্য যা-ই হোক, তাতে এসে যায় না; হোক না তা নারী, বা কবিতা, বা দেবতা।’ হাঙ্গেরির নোবেলজয়ী লেখক ইমরে কার্তেজ (Imre Kertesz : 1929 – 2016) তাঁর নিজের ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে বলতে গিয়ে একবার জানিয়েছিলেন, ‘My Jewsishness is shaped by the Holocaust. I do not speak Hebrew, I did not have a religious education… I am not familiar with Jews philosophy’ আর এসব বলতে গিয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত নিজেকে একজন ‘non-Jewish Jew‘ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।

বুদ্ধদেবের উপলব্ধির সঙ্গে এই যে অন্য দেশের লেখকদের ভাবনার সামীপ্য, সেটি তাঁর সাহিত্যচিন্তার সামূহিক সিদ্ধান্তকেই যেন এক ধরনের পূর্ণতা প্রদান করে থাকে। কেননা এই সাহিত্যচিন্তার মধ্যে দিয়ে একজন লেখকের বহুমুখী প্রতিভার যে-দায়িত্বের ভার, সেটি প্রকাশিত হতে থাকে। বুদ্ধদেব বসুর বেলাতেও সেটি ঘটতে দেখা গিয়েছে। আত্মজিজ্ঞাসার উপান্তে পৌঁছে গিয়ে তিনি লিখেছিলেন –
কিছুই সহজ নয়, কিছুই সহজ নয় আর।

লেখা, পড়া, প্রুফ পড়া, চিঠি লেখা, কথোপকথন,
যা-কিছু ভুলিয়ে রাখে, আপাতত, প্রত্যেহের ভার।

দুরূহ, নূতনতর, ক্ষমাহীন দায়িত্বের ভার।
কিছুই সহজ নয়, কিছুই সহজ নেই আর।
(‘দায়িত্বের ভার’)

একজন লেখকের দায়িত্বের সেই ভার বিষয়ে সচেতন ছিলেন বলেই, সাহসে ভর দিয়ে, লিখতে পেরেছিলেন ‘শুধু তা-ই পবিত্র, যা ব্যক্তিগত। গভীর সন্ধ্যায়/ নরম আচ্ছন্ন আলো; হলদে-ম্লান বইয়ের পাতার/ লুকোনো নক্ষত্র ঘিরে আকাশের মতো অন্ধকার।’ বলা যায়, ব্যক্তিগত পবিত্রতায় নিজেকে সমর্পিত করতে পেরেছিলেন বলেই বুদ্ধদেবের সাহিত্যচিন্তার মধ্যে দায়িত্বের ভারের পাশাপাশি একজন সাহিত্যিকের আত্মমর্যাদার বোধটুকুও প্রকাশিত হতে থাকে।

সাহিত্যের প্রতি, নিজের লেখালেখির প্রতি বুদ্ধদেব বসুর ভালোবাসা ছিল অনেকটা কিংবদন্তির মতো। কোনো অবস্থাতেই তিনি লেখার কলমকে ত্যাগ করেননি। তিনি এটিও বিশ্বাস করতেন যে, ‘যদি কখনো মনে হয় যে কবিতার উৎস আছে শুকিয়ে, তার জন্যে ঘটনার ঘনঘটাকে কেন দায়ী করবো – তার কারণ খুঁজতে হবে নিজেরই মধ্যে।’ পাশাপাশি এটিও তিনি আমৃত্যু মনে রেখেছিলেন ‘যে-কোনো সময়ে, কবিকে জয়ী হতে হবে মানুষের উপর, নয়তো কবিতা সম্ভব হবে না।’ কবিকে তিনি মনে করতেন, ‘মরমী, ভাবুক, ঈশ্বরের জন্যে সতৃষ্ণ।’ আজকের দিনের কবি হলেন ‘জটিল চঞ্চল বিক্ষুব্ধ জগতের কেন্দ্রবাসী এক নিঃসঙ্গ মানুষ।’ কবি অ্যাডোনিস (Adonis : 1930) নিজের লেখালেখির বিষয়ে বলতে গিয়ে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, ‘When I don’t write, I feel as if I don’t exist. Through writing I find out who I am, I learn to discover and disclose myself.’

বুদ্ধদেবের ভাবনাও অ্যাডোনিসের এই ভাবনার চেয়ে আলাদা কিছু ছিল না। সেজন্যেই তিনি একান্তভাবে লেখালেখির মধ্যে নিজেকে সমর্পণ করতে পেরেছিলেন। এটি শুধু তাঁর জীবনের লক্ষ্য ছিল না, সেইসঙ্গে এর মধ্যে দিয়ে তিনি ব্যক্তিগত মোক্ষের সন্ধানও করে গিয়েছিলেন।

শতাব্দী জুড়ে মানুষের কল্পনার আর্কাইভ, আরব্য রজনীর “এক হাজার এক রাত”

আজ থেকে বহু শতাব্দী আগে যখন সময় মাপা হতো সূর্য আর চাঁদের গতিপথে, আর পৃথিবীর আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিল রহস্য আর অ্যাডভেঞ্চারের হাতছানি, তখন জন্ম নিয়েছিল এক জাদুকরী গল্পের সংকলন আরব্য রজনী, যা বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তায় “এক হাজার এক রাত” নামেই পরিচিত। এটি নিছকই কিছু গল্পের সমাহার নয়, বরং মানব মনের গভীরতম আকাঙ্ক্ষা, ভয়, প্রেম আর প্রতিশোধের অসাধারণ ক্যানভাস। এর প্রতিটি পাতায় লুকিয়ে আছে এমন কিছু সত্য যা আধুনিক জীবনেও আমাদের ভাবায়, অবাক করে এবং গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

আরব্য রজনীর মূল গল্পটি শুরু হয় এক হৃদয়বিদারক প্রেক্ষাপটে। পারস্যের পরাক্রমশালী রাজা শাহরিয়ার তার স্ত্রীর বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়ে এতটাই বিমর্ষ হয়ে পড়েন যে তিনি প্রতি রাতে একজন নতুন কুমারীকে বিয়ে করে পরদিন সকালে তাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন। এই নৃশংসতার জাঁতাকলে যখন রাজ্যের কুমারীরা নিঃশেষ প্রায়, তখন এগিয়ে আসেন উজিরের বুদ্ধিমতী কন্যা শেহেরজাদে। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও তিনি স্বেচ্ছায় রাজার শয়নকক্ষে প্রবেশ করেন, তবে তরবারির মুখে মাথা পেতে দিতে নয়, বরং গল্প শোনানোর এক অভিনব কৌশল নিয়ে।

শেহেরজাদে জানতেন শাহরিয়ারের হৃদয় পাথরের মতো কঠিন হলেও, মানুষের সহজাত গল্প শোনার আগ্রহকে দমন করা কঠিন। তাই তিনি প্রতি রাতে একটি করে নতুন গল্প শুরু করতেন, কিন্তু শেষ করতেন না। রাতের পর রাত, গল্পের পর গল্প চলতে থাকে, আর শাহরিয়ারের কৌতূহল শেহেরজাদেকে বাঁচিয়ে রাখতে বাধ্য করে। এক হাজার এক রাত ধরে শেহেরজাদে গল্প শুনিয়েছিলেন, আর এই সময়ের মধ্যে শাহরিয়ারের ক্রোধ প্রশমিত হয়, তার হৃদয়ে প্রেম ও বিশ্বাস ফিরে আসে।

শেষ পর্যন্ত তিনি শেহেরজাদেকে তার রানী হিসেবে গ্রহণ করেন এবং তাদের রাজ্যের উপর থেকে অভিশাপ উঠে যায়। এই মূল কাঠামোটিই আরব্য রজনীকে কেবল একটি গল্প সংকলন নয়, বরং গল্প বলার ক্ষমতার এক বিজয়গাথা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

“One Thousand and One Nights” নামে পশ্চিমে পরিচিত হলেও, এর মূল আরবি নাম Alf Layla wa-Layla—অর্থাৎ “এক হাজার এক রাত”। এটা কোনো একক লেখকের লেখা নয়। এই গ্রন্থের উৎস পারস্য, ভারত ও আরবের লোককাহিনি থেকে শুরু করে মধ্যযুগীয় কাহিনি, সুফি উপাখ্যান, নগর জীবন ও দরবারি কৌতুক পর্যন্ত বিস্তৃত। এ যেন মানুষের কল্পনার আর্কাইভ।

আরব্য রূপকথা মানে শুধু আলিবাবা আর চল্লিশ চোর, আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ বা সিনবাদের সমুদ্রযাত্রা নয়। এই গল্পগুলোর গভীরে ডুব দিলে আপনি দেখতে পাবেন মানব সমাজের এক বিস্তৃত চিত্র। এখানে যেমন আছে রাজকীয় জাঁকজমক আর জাদুর ছোঁয়া, তেমনি আছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, তাদের চাতুর্য, তাদের সংগ্রাম। প্রতিটি গল্পই যেন এক একটি ছোট নাটক, যেখানে প্রেম, ঈর্ষা, লোভ, আত্মত্যাগ, বীরত্ব আর বিশ্বাসঘাতকতার মতো চিরন্তন মানবীয় অনুভূতিগুলো জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

আলিবাবা ও চল্লিশ চোর গল্পে আলিবাবার সততা আর ভাই কাসিমের লোভের পরিণতি দেখানো হয়েছে। এটি আমাদের শেখায় ধন-সম্পত্তির পেছনে অন্ধের মতো ছুটলে তার পরিণতি কী হতে পারে। আবার আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপে একটি সাধারণ ছেলের ভাগ্যের পরিবর্তন হয় জাদুর মাধ্যমে, কিন্তু তার জাদুর ব্যবহার আর তার আশেপাশের মানুষের আচরণই গল্পের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এটি ভাগ্যের পাশাপাশি বুদ্ধিমত্তা আর ভালো-মন্দের পার্থক্য নিয়েও ভাবতে শেখায়।

আরব্য রজনী কেবল একটি সাহিত্যকর্ম নয়, এটি বিভিন্ন সংস্কৃতির এক মিলনস্থলও। এতে পারস্য, ভারত, মিশর, মেসোপটেমিয়া এবং আরব উপদ্বীপের লোককাহিনীর এক অপূর্ব মিশ্রণ ঘটেছে। এই গল্পগুলো শতাব্দী ধরে মুখে মুখে প্রচলিত ছিল এবং বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। তাই এর মধ্যে আমরা যেমন ইসলামী ঐতিহ্য দেখতে পাই, তেমনি দেখতে পাই প্রাচীন প্রাচ্যের নানা বিশ্বাস ও প্রথার প্রতিফলন।

এই সংকলনটি বিশ্বসাহিত্যে এক বিশাল প্রভাব ফেলেছে। আধুনিক ফ্যান্টাসি লেখক থেকে শুরু করে অনেক চলচ্চিত্র নির্মাতারা পর্যন্ত অনেকেই “এক হাজার এক রাত” দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন। এর চরিত্রগুলো, এর পটভূমি এবং এর গল্প বলার ধরণ অসংখ্য নতুন সৃষ্টিকে উৎসাহিত করেছে। আজ পর্যন্ত, এর জনপ্রিয়তা এতটুকুও কমেনি, বরং নিত্য নতুন অনুবাদ, চলচ্চিত্র, কার্টুন আর ভিডিও গেমসের মাধ্যমে এটি নতুন প্রজন্মের কাছেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

হয়তো আপনার জীবনে কোনো শাহরিয়ার নেই, যিনি প্রতি রাতে আপনাকে হত্যা করতে চান। কিন্তু শেহেরজাদের গল্প বলার কৌশল আমাদের শেখায় কঠিনতম পরিস্থিতিতেও বুদ্ধি আর সৃজনশীলতা দিয়ে পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব। আপনার হয়তো জাদুর প্রদীপ নেই, কিন্তু আপনার ভেতরের শক্তি আর সঠিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আপনিও নিজের জীবনকে আলোকিত করতে পারেন।

এই গল্পগুলো আমাদের দেখায় ভালো কাজের ফল ভালোই হয়, আর মন্দ কাজের পরিণতি হয় ধ্বংসাত্মক। আমাদের স্বপ্ন দেখতে শেখায়, চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে শেখায় এবং প্রতিকূলতার মাঝেও আশার আলো খুঁজে পেতে সাহায্য করে। “এক হাজার এক রাত” আমাদের নিজেদের ভেতরের আলিবাবা, আলাদিন বা সিনবাদকে খুঁজে বের করতে অনুপ্রাণিত করে। এটি নিছকই কিছু গল্পের সমষ্টি নয়, এটি এক জীবনদর্শন, যা সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে আমাদের হৃদয়কে আজও স্পর্শ করে।

ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী : রাফাহে প্রস্তাবিত ‘মানবিক শহর’ হবে ফিলিস্তিনিদের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ গাজার রাফাহে একটি ‘মানবিক শহর’ তৈরি করে সেখানে সব গাজাবাসীকে স্থানান্তর করার প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে এই প্রস্তাবের ঘোর বিরোধিতা করেছেন ইসরায়েলেরই সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এহুদ ওলমার্ট বলেছেন, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী যে ‘মানবিক শহর’ গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছেন, সেটি বাস্তবে ‘কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প’ হয়ে দাঁড়াবে। সেখানে ফিলিস্তিনিদের জোর করে পাঠানো হলে তা হবে জাতিগত নির্মূলীকরণের প্রচেষ্টা।

ওলমার্ট বলেন, গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েল এরই মধ্যে যুদ্ধাপরাধ করছে। আর যদি মানবিক শহর নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়, তাহলে তা হবে আরও একটি ভয়াবহ ধাপ।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাৎজ এর আগে বলেন–এই ক্যাম্পে পাঠানো হলে ফিলিস্তিনিরা শুধু তখনই সেখান থেকে বের হতে পারবে, যখন তারা অন্য কোনো দেশে যাবে।

২০০৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এহুদ ওলমার্ট আরো বলেন, ‘যখন সরকার গাজার অর্ধেক জনগণকে “উচ্ছেদ” করে ক্যাম্পে পাঠানোর পরিকল্পনা করে, তখন এটা মানবিক উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে বলে আর বিশ্বাসযোগ্য নয়। এটা আসলে তাদের তাড়িয়ে দেওয়ার কৌশল।’

এদিকে, কাৎজ প্রস্তাবিত এই মানবিক শহর প্রকল্পকে সমর্থন দিচ্ছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও। তবে যে এলাকায় এই শহর নির্মাণের পরিকল্পনা, তা থেকে ইসরায়েল সেনা প্রত্যাহারে রাজি না হওয়াতেই যুদ্ধবিরতির আলোচনায় অগ্রগতি থেমে আছে বলে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।

যেসব ইসরায়েলি এই মানবিক শহর পরিকল্পনাকে নাৎসি জার্মানির কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের সঙ্গে তুলনা করেছেন, তাঁদের সরকারের পক্ষ থেকে প্রচণ্ড সমালোচনা করা হয়েছে। ইসরায়েলের হলোকাস্ট স্মৃতি সংগ্রহশালা ‘ইয়াদ ভাশেম’ এক সাংবাদিককে এই তুলনার জন্য ‘হলোকাস্টের তাৎপর্য বিকৃত করার’ অভিযোগে অভিযুক্ত করে।

ইসরায়েলের মানবাধিকার আইনজীবী এবং গবেষকেরা বলছেন, এই পরিকল্পনা মানবতাবিরোধী অপরাধের রূপরেখা এবং কিছু বিশেষ শর্তে তা গণহত্যার পর্যায়েও পড়তে পারে।

“আমি চরিত্র বসাই, তারপর দেখি তারা একে অপরকে কীভাবে পাল্টায়” : সত্যজিৎ রায়

ফোলকে আইসাকসন: বেশিরভাগ মহান শিল্পীর একটা মিল থাকে—শৈশব, সেই শৈশবে যা ঘটেছে, তা তাদের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। আপনি কি আপনার নিজস্ব প্রেক্ষাপট ও শুরুটা নিয়ে কিছু বলতে পারেন?

সত্যজিৎ রায়: আমি মনে করি, আমি সত্যিকারের শিল্পী হিসেবে কাজ করতে শুরু করি ক্যালকাটা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে আসার পর। আমি অর্থনীতিতে অনার্স করেছিলাম। তারপর দুই বছর তিন মাস শান্তিনিকেতনে কাটিয়েছি, যেটা কবি, সমাজ সংস্কারক এবং শিল্পী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশ্ববিদ্যালয়। আমি এই সময়টাকেই আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গঠনমূলক সময় হিসেবে বিবেচনা করি। আমি সেখানে ছবি আঁকা শিখছিলাম, আর তখনই আমার হাতে ছিল গভীরভাবে চিন্তা করার, বই পড়ার, প্রকৃতি দেখার ও মানুষকে জানার সবচেয়ে বেশি সময়। সেই সময় থেকেই আমার সবকিছু শুরু হয়—চলচ্চিত্রে আগ্রহ ইত্যাদি। আমার শৈশবটা ছিল বেশ অদ্ভুত। যখন আমি দুই বছরের, তখনই আমার বাবা মারা যান। আমরা উত্তর কলকাতায় একটা বড় বাড়িতে থাকতাম, বাড়িতেই ছিল একটা বড় প্রিন্টিং প্রেস, ব্লক-মেকিং ইউনিট আর বই প্রকাশনার ব্যবসা, কিন্তু সবকিছু একসময় একেবারে ধ্বংস হয়ে গেল।

ফোলকে আইসাকসন: আপনি কি মনে করেন ‘চারুলতা’ (১৯৬৪)-তে এর কিছু ছায়া আছে?

সত্যজিৎ রায়: আসলে এটা তো ঠাকুরের মূল গল্পে (নষ্টনীড়, ১৯০১) আগে থেকেই ছিল। কিন্তু যেহেতু আমার জীবনের অভিজ্ঞতা এমন ছিল, তাই আমি সেসব খুব বাস্তবভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছি। আমি তখন ছয় বছরের মতো, ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যখন আমাদের সেই বড় বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হয়। আমার মা আর আমি তখন কার্যত অসহায় হয়ে পড়ি। আমরা তখন আমার মামার বাড়িতে আশ্রয় নিই, উনিই আমাদের থাকার জায়গা দেন।

ফোলকে আইসাকসন: আপনার পরিবার কি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আত্মীয় ছিল?

সত্যজিৎ রায়: আত্মীয় না, কিন্তু আমার বাবা ও ঠাকুরের মধ্যে ভালো পরিচয় ছিল। আর আমার দাদু ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু; তাঁদের বয়সও প্রায় একইরকম ছিল। শান্তিনিকেতনে পড়তে যাওয়ার বিষয়টা মূলত ঠাকুর নিজেই চেয়েছিলেন। আমি কিন্তু তখন খুব একটা আগ্রহী ছিলাম না—আমি শহরের মানুষ, আর শান্তিনিকেতন ছিল একেবারে গ্রামীণ জায়গা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওখানে গিয়ে আমার দারুণ লাভ হয়েছে। যেসব শিক্ষক ছিলেন, তাঁরা কেবল চিত্রশিল্পীই নন, সত্যিকার অর্থে গভীর দৃষ্টিভঙ্গি ও উপলব্ধিসম্পন্ন মানুষ ছিলেন।

ফোলকে আইসাকসন: গত একশো বছর ধরে যে বাঙালি সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ চলছে, সেটা নিশ্চয়ই আপনার কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ?

সত্যজিৎ রায়: অবশ্যই, আমি একে খুবই গুরুত্বপূর্ণ সময় বলে মনে করি, যদিও এখনকার তরুণ প্রজন্ম অনেকেই তা বোঝে না। তবে আমি নিজেকে ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে দেখি কি না, সেটা আমি কখনও সচেতনভাবে ভেবে দেখিনি। তবে আশা করি, আমার কাজের মধ্য দিয়ে সেটার কিছুটা প্রকাশ পায়।

ফোলকে আইসাকসন: আপনার বাড়িতে কি রাজনীতি নিয়ে আলোচনা হতো?

সত্যজিৎ রায়: খুব বেশি না, অন্তত আমার মামার বাড়িতে না। তবে প্রতিদিনের পরিবেশ সংগীত ছিল । আমার ফুপি, কাকিমারা সবাই গান করতেন। কিন্তু পরিবারটি খুব একটা বুদ্ধিবৃত্তিক ছিল না, আর আমি সেখানকার পরিবেশে একজন শিল্পী হিসেবে গড়ে উঠিনি।

ফোলকে আইসাকসন: যুদ্ধের ঠিক আগ মুহূর্তে আপনি কী করছিলেন?

সত্যজিৎ রায়: আমি তখন শান্তিনিকেতনে ছিলাম। যেদিন জাপানিরা কলকাতায় বোমা ফেলল, সেদিনই আমি শান্তিনিকেতন ছেড়ে দিলাম। খবরটা রেডিওতে শুনে মনে হলো আমি যেন ঘটনাগুলোর থেকে অনেক দূরে আছি। আমার মা তখন কলকাতায় ছিলেন, তাই আমি ফিরে এলাম। আমি জানতাম, আমি ফাইন আর্ট নয়, বাণিজ্যিক শিল্পেই যাব।

ফোলকে আইসাকসন: দেশভাগ আপনার জীবনে কী প্রভাব ফেলেছিল?
সত্যজিৎ রায়: আমার নিজের জীবন তেমনভাবে প্রভাবিত হয়নি। যদিও আমার মূল বাড়ি এখনকার পূর্ব পাকিস্তানে (বাংলাদেশে) সেখানে আমার দাদু জন্মেছিলেন, আমার বাবা কিছুদিন সেখানে ছিলেন কিন্তু আমি কখনও ওখানে থাকিনি। আমি সবসময়ই নিজেকে কলকাতা আর পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বলেই অনুভব করি। তবে সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের গান, লোককথা এসবের সঙ্গে আমি পরিচিত ছিলাম। কিন্তু আমাদের জীবনে যা সত্যিই বড় প্রভাব ফেলেছে, তা হলো শহরের পথে পথে, রেল স্টেশনে শরণার্থীদের দৃশ্য। মানুষজনের সেই ধীর-ধীরে জমে ওঠা, একের ওপর এক মানবজীবনের স্তূপ, তা সত্যিই ভয়ংকর ছিল।

ফোলকে আইসাকসন: আপনি কি আইজেনস্টাইনের ছবি দেখেছিলেন?

সত্যজিৎ রায়: হ্যাঁ, রাশিয়ান সিনেমাও কিছু দেখা যেত, কারণ তখন রাশিয়া আমাদের মিত্র ছিল। ম্যাক্সিম গোর্কি ট্রিলজি, আইজেনস্টাইনের ছবি, পুদোভকিনের কিছু কাজ এসব এসেছিল। একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা—১৯৪৬ বা ’৪৭ সালে পুদোভকিন আর অভিনেতা চেরকাসভ কলকাতায় এসেছিলেন। আমি এর আগেই ‘আইভান দ্য টেরিবল’ (১৯৪৪) দেখেছি, আর চেরকাসভকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম উনার চোখ এত বড় করে কীভাবে রেখেছিলেন, কারণ তাঁর চোখ তো আসলে ছোট। উনি বলেছিলেন, “আইজেনস্টাইন আমাকে এমন করতে বলেছিলেন।” উনি একটু সমালোচনামূলক সুরে বলেছিলেন, “আইজেনস্টাইন আমাকে এমন সব অস্বাভাবিক ভঙ্গিমা নিতে বলতেন, যে দিনের শেষে শরীরের সবখানে ব্যথা করত।”

ফোলকে আইসাকসন : আপু ট্রিলজিতে কি আত্মজীবনীমূলক উপাদান আছে অনেকটা?

সত্যজিৎ রায়: প্রথম আর তৃতীয় পর্বে তেমন কিছু নেই, কিন্তু দ্বিতীয় পর্বে হয়তো কিছুটা আছে। তবে এটা বুঝতে হবে এই উপাদানগুলো এসেছে মূল উপন্যাস থেকেই। যেটা ছবিতে আছে, তার বীজরূপ মূল বইতেই ছিল। তবে দ্বিতীয় পর্বে আমি কিশোর আপুর সঙ্গে তার বিধবা মায়ের সম্পর্কের জায়গায় নিজেকে অনেকটা মেলাতে পেরেছিলাম, কারণ আমিও একইরকম পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে গিয়েছি। অবশ্য আমি কোনো গ্রামে থাকতাম না, আর মায়ের কাছ থেকে দূরে গিয়ে পড়াশোনা করতে হয়নি। কিন্তু সচেতনভাবে, বা হয়তো অচেতনভাবেও আমি আমার নিজের অভিজ্ঞতাকে আপুর অভিজ্ঞতার সঙ্গে জুড়ে দিতে পেরেছিলাম। আমার মনে হয়, এর ফলে আমি চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক দিকটা গভীরভাবে ধরতে পেরেছিলাম, একেবারে ভেতর থেকে!