নেপালের ইতিহাস বলতে গেলে গোর্খা রাজ্যের কথা আসবেই। এটি কেবল একটি ছোট পাহাড়ি রাজ্য ছিল না, ছিলো একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক শক্তি, যা পরবর্তীতে সমগ্র নেপালকে একত্রিত করে একটি আধুনিক রাষ্ট্রের ভিত্তি তৈরি করে। গোর্খা রাজ্যকে ঘিরে অনেক গল্প, অনেক গৌরব এবং অনেক রক্তক্ষয় আছে, একদিকে সাম্রাজ্য বিস্তারের কাহিনী, অন্যদিকে একটি জাতি গঠনের সংগ্রাম। ১৫৫৯ সালে রাজা দ্রাব্য শাহ ছোট্ট একটি রাজ্য হিসেবে গোর্খার (বর্তমান নেপালের পশ্চিমাংশে) ভিত্তি স্থাপনের মাধ্যমে গোর্খা রাজ্যের প্রতিষ্ঠা হয়। গোর্খার নামের উৎপত্তি ‘গোরক্ষনাথ’ থেকে, যিনি হিন্দু ধর্মে এক বিশিষ্ট যোগী। এর অবস্থান ছিল হিমালয়ের পাদদেশে, যা তাকে প্রাকৃতিকভাবে সুরক্ষিত ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। পাহাড়ি অঞ্চল হওয়ায় গোর্খাবাসীরা ছিল চটপটে, শক্তিশালী ও অভ্যস্ত কঠোর পরিশ্রমে যেগুলো তাদের সামরিক সাফল্যের অন্যতম কারণ।
দ্রাব্য শাহ গোর্খাকে একটি সুসংগঠিত প্রশাসনিক কাঠামোতে রূপান্তর করেন। তিনি স্থানীয় ক্ল্যান ও উপজাতিকে একত্রিত করে সামন্ততান্ত্রিক রাজনীতির বিরুদ্ধে একত্র হন। তবে গোর্খার প্রকৃত উত্থান ঘটে ১৮শ শতকের মাঝামাঝিতে, যখন রাজা পৃথ্বী নারায়ণ শাহ সিংহাসনে আরোহণ করেন।
১৭৪৩ সালে পৃথ্বী নারায়ণ শাহ রাজা হন। তিনিই গোর্খা রাজ্যকে একটি সাম্রাজ্যে রূপান্তর করার প্রকৃত রূপকার। তিনি উপলব্ধি করেন ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা এবং রাজনৈতিক দুর্বলতা নেপালিদের জন্য একটি দুর্বলতা। এই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে তিনি গোর্খা সেনাবাহিনীকে আধুনিক প্রশিক্ষণে গড়ে তোলেন এবং ধারাবাহিক যুদ্ধের মাধ্যমে একের পর এক রাজ্য দখল করতে থাকেন। কাঠমান্ডু উপত্যকার দখল ছিল এই একীকরণ প্রক্রিয়ার মোক্ষম পদক্ষেপ। ১৭৬৮ সালে গোর্খা বাহিনী মল্ল রাজাদের পরাজিত করে কাঠমান্ডু, পাটন এবং ভক্তপুর দখল করে। এ তিন শহর ঐতিহাসিকভাবে সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ ছিল, তাই এ দখল গোর্খা রাজ্যকে রাজনৈতিক বৈধতা ও অর্থনৈতিক শক্তি এনে দেয়।
গোর্খা সেনাবাহিনী ছিল সুসংগঠিত ও অনুশাসনপ্রিয়। পাহাড়ি ভূখণ্ডে যুদ্ধের দক্ষতা এবং গেরিলা কৌশলে তাদের জুড়ি ছিল না। তারা কুখ্যাত ‘খুকরি’ ছুরি ব্যবহার করত, যা আজও গোর্খা যোদ্ধাদের প্রতীক। গোর্খা বাহিনী শুধুই বলপ্রয়োগে জয়লাভ করেনি, তারা উন্নত প্রশাসন ও ন্যায্য বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের মন জয় করত। এই নীতিই ছিল পৃথ্বী নারায়ণ শাহের মূল শক্তি।
গোর্খা রাজ্যের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে নেপালের সংস্কৃতিতে একীকরণ ঘটতে থাকে। নেপাল বহু জাতিগোষ্ঠীর আবাসভূমি হলেওগোর্খা প্রশাসন স্থানীয় সংস্কৃতিকে সমন্বয় করে একটি সামগ্রিক নেপালি পরিচয় নির্মাণে সচেষ্ট ছিল। এই সময়ে হিন্দু ধর্মকে রাষ্ট্রীয় আইডেন্টিটির অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। একইসঙ্গে প্রশাসনিক ভাষা হিসেবে নেপালি (পার্বত্য খাস ভাষা) প্রচলিত হয়।
গোর্খা রাজ্যের সাম্রাজ্য বিস্তারের উচ্চাকাঙ্ক্ষা একসময় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। ১৮১৪-১৮১৬ সালের আংলো-নেপাল যুদ্ধ গোর্খার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। গোর্খারা সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করলেও শেষ পর্যন্ত তাদের পরাজয় ঘটে এবং সুগৌলি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে নেপাল ব্রিটিশ ভারতের অনেক অঞ্চল হারায়, তবে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকে।
গোর্খা রাজ্য শুধু নেপালেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তাদের সামরিক দক্ষতা ও সাহসিকতা এমন এক শক্তিশালী পরিচয় তৈরি করে, যা ব্রিটিশরাও স্বীকার করতে বাধ্য হয়। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গোর্খা যোদ্ধাদের সাহস ও লড়াইয়ের ক্ষমতা দেখে ১৮১৫ সালের পর তাদের নিজস্ব বাহিনীতে ‘গোর্খা রেজিমেন্ট’ গঠন করে। এই রেজিমেন্ট আজও ব্রিটিশ এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ‘গোর্খা’ নামটি তাই শুধু একটি ভৌগোলিক এলাকা নয়, বরং একটি আন্তর্জাতিক সামরিক পরিচয়ে পরিণত হয়েছে।
১৯শ শতকের শেষে ও ২০শ শতকের শুরুতে নেপালের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত রানা শাসন ব্যবস্থা গোর্খা রাজবংশকে ছায়াচ্ছন্ন করে তোলে। তবু গোর্খা ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করেই রাষ্ট্রের কাঠামো গড়ে ওঠে। ১৯৫১ সালে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে রানা শাসনের অবসান হয় এবং রাজতন্ত্র নতুনভাবে শক্তিশালী হয়। গোর্খা রাজ্যের পূর্বসূরিদের ভাবনা ও জাতিগত সংহতির ধারণা আধুনিক নেপালের সংবিধান প্রণয়ন ও জাতীয় পরিচয় নির্মাণে ভূমিকা রাখে।
‘গোর্খা’ এখন শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়, এটি নেপালিদের সাহসিকতা, আত্মত্যাগ এবং ঐক্যের প্রতীক। সাহিত্য, চলচ্চিত্র এবং লোকগাথায় এই নাম বহুবার উঠে এসেছে। নেপালের জাতীয়তাবাদী চেতনায় ‘গোর্খা পরিচয়’ একটি সাংস্কৃতিক ক্যাটালিস্ট হিসেবে কাজ করে, যার প্রতিধ্বনি আজও নেপালিদের রাজনৈতিক বক্তব্য এবং নাগরিক গৌরবের অংশ।


