Home Blog Page 51

ডিস্টোপিয়ান সাহিত্য – ভবিষ্যৎ না ঘটমান বর্তমান

মানুষের কল্পনার জগৎ সর্বদা দ্বিমুখী, একদিকে যেমন ইউটোপিয়ার স্বপ্ন অন্যদিকে তেমনই ডিস্টোপিয়ার দুঃস্বপ্ন। ডিস্টোপিয়ান সাহিত্য মানবজাতির এক বিভীষিকাময় ভবিষ্যতের চিত্র তুলে ধরে, যেখানে সমাজ, রাজনীতি এবং প্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাব ব্যক্তি স্বাধীনতার বিলুপ্তি ঘটায়। এই ধারার উল্লেখযোগ্য সাহিত্যিকদের মধ্যে জর্জ অরওয়েল এবং মার্গারেট অ্যাটউড বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাঁদের কাজ শুধু সতর্কতাই নয়, বরং আমাদের বর্তমান সমাজের ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করতেও সাহায্য করে।

ডিস্টোপিয়া হলো ইউটোপিয়ার বিপরীত ধারণা। যেখানে ইউটোপিয়া নিখুঁত, আদর্শ সমাজের স্বপ্ন দেখায়, ডিস্টোপিয়া সেখানে পতনশীল, ত্রুটিপূর্ণ এবং নিপীড়িত সমাজের চিত্র ফুটিয়ে তোলে। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে দুটি বিশ্বযুদ্ধ, ফ্যাসিবাদ ও কমিউনিজমের উত্থান এবং প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির ফলস্বরূপ ডিস্টোপিয়ান সাহিত্যের জন্ম হয়। লেখকরা দেখতে পান, মানবজাতির উন্নতি কল্পিত আদর্শের দিকে না গিয়ে বরং এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, নজরদারি, ব্যক্তিস্বাধীনতার বিলুপ্তি এবং সত্যের বিকৃতি এই ধারার মূল উপজীব্য।

ডিস্টোপিয়ান সাহিত্যের আলোচনায় জর্জ অরওয়েলের (George Orwell) নাম অপরিহার্য। তাঁর দুটি কালজয়ী উপন্যাস “অ্যানিমেল ফার্ম” (Animal Farm, ১৯৪৫) এবং “নাইনটিন এইটি-ফোর” (Nineteen Eighty-Four, ১৯৪৯) – স্বৈরাচারী শাসনের ভয়াবহতা নিপুণভাবে উন্মোচন করে।

“অ্যানিমেল ফার্ম” একটি রূপকধর্মী উপন্যাস, যেখানে একটি খামারের পশুপাখির বিপ্লব এবং পরবর্তীতে শূকরদের দ্বারা ক্ষমতা দখলের মধ্য দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের স্টালিনবাদী শাসনের নির্মম সমালোচনা করা হয়েছে। “সমস্ত প্রাণী সমান, কিন্তু কিছু প্রাণী অন্যদের চেয়ে বেশি সমান” – এই বিখ্যাত উক্তিটি ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সাম্যের নামে বৈষম্যের চূড়ান্ত রূপকে প্রকাশ করে। অরওয়েল এখানে দেখান, কীভাবে একটি মহৎ বিপ্লব স্বৈরাচারে রূপান্তরিত হতে পারে এবং কীভাবে ভাষা ও প্রোপাগান্ডা ব্যবহার করে জনমতকে বিভ্রান্ত করা হয়।

তবে অরওয়েলের ডিস্টোপিয়ান ধারণার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে “নাইনটিন এইটি-ফোর”-এ। এই উপন্যাসে ওশেনিয়া নামক একটি দেশের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে বিগ ব্রাদার (Big Brother) নামক এক সর্বশক্তিমান শাসক সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। “টেলিস্ক্রিন” (Telescreen) নামক যন্ত্রের মাধ্যমে প্রতিটি নাগরিকের উপর ২৪ ঘন্টা নজর রাখা হয়। “নিউস্পিক” (Newspeak) নামক একটি নিয়ন্ত্রিত ভাষা ব্যবহার করা হয়, যার উদ্দেশ্য হলো মানুষের চিন্তাভাবনাকে সীমাবদ্ধ করা এবং প্রতিবাদী ধারণাকে বিলুপ্ত করা।

“ডাবলথিংক” (Doublethink) ধারণার মাধ্যমে মানুষকে পরস্পরবিরোধী বিশ্বাস ধারণ করতে বাধ্য করা হয়, যেমন “যুদ্ধই শান্তি”, এবং “অজ্ঞতাই শক্তি”। উইনস্টন স্মিথ নামক প্রধান চরিত্রটি এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে সত্য ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পার্টির দ্বারা তার প্রতিরোধ চূর্ণ করা হয়। অরওয়েল দেখিয়েছেন, কীভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে ইতিহাসকে বিকৃত করা হয়, স্মৃতিকে মুছে ফেলা হয় এবং ব্যক্তিসত্তা বিলীন করে দেওয়া হয়।

অরওয়েলের পুরুষতান্ত্রিক ডিস্টোপিয়ার বিপরীতে মার্গারেট অ্যাটউড (Margaret Atwood) তাঁর “দ্য হ্যান্ডমেইড’স টেল” (The Handmaid’s Tale, ১৯৮৫) উপন্যাসে নারীদেহ এবং প্রজননকে কেন্দ্র করে এক নতুন মাত্রার ডিস্টোপিয়া উপস্থাপন করেছেন।

গিলিড (Gilead) নামক এক ধর্মীয় মৌলবাদী সমাজে কাহিনীটি আবর্তিত হয়, যেখানে পরিবেশ দূষণের কারণে প্রজনন ক্ষমতা কমে গেছে। ফলস্বরূপ কিছু নারীকে “হ্যান্ডমেইড” (Handmaid) হিসেবে নির্দিষ্ট করা হয়, যাদের একমাত্র কাজ হলো সমাজের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জন্য সন্তান উৎপাদন করা। অফ্রেড (Offred) নামক হ্যান্ডমেইড-এর দৃষ্টিকোণ থেকে এই সমাজের নির্মমতা, নিপীড়ন এবং নারীর প্রতি চরম অবমাননার চিত্র উঠে আসে।এই সমাজে নারীদের কোনো স্বাধীনতা নেই, তাদের নাম কেড়ে নেওয়া হয়, তাদের পরিধেয় পোশাক তাদের শ্রেণী নির্দেশ করে এবং তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, শিক্ষা বা পেশার কোনো স্থান নেই।

অ্যাটউড দেখান কীভাবে ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা কাঠামো নারীকে কেবল প্রজনন যন্ত্রে রূপান্তরিত করে। উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু হলো নারীর দেহ, যৌনতা এবং প্রজনন ক্ষমতার উপর রাষ্ট্রের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক ডিস্টোপিয়া নয়, বরং একটি ‘জৈবিক ডিস্টোপিয়া’ (biological dystopia), যেখানে নারীর শারীরিক অস্তিত্বই তার একমাত্র পরিচয় হয়ে দাঁড়ায় এবং তার মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সত্তা অস্বীকার করা হয়। “দ্য হ্যান্ডমেইড’স টেল” আধুনিক সমাজে নারীর অধিকার, প্রজনন স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় কর্তৃত্ববাদের বিপদ সম্পর্কে এক জোরালো সতর্কবাণী।

অরওয়েল এবং অ্যাটউডের ডিস্টোপিয়ান উপন্যাসগুলো ভিন্ন প্রেক্ষাপটে লেখা হলেও তাদের মধ্যে গভীর সংযোগ রয়েছে। অরওয়েল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও রাজনৈতিক মতাদর্শের মাধ্যমে ব্যক্তি স্বাধীনতার বিলুপ্তি দেখিয়েছেন, যেখানে অ্যাটউড দেখিয়েছেন লিঙ্গ, ধর্ম এবং জৈবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কীভাবে নারীর উপর নিপীড়ন চালানো হয়। দুজনেই দেখিয়েছেন, কীভাবে রাষ্ট্রযন্ত্র বা সমাজের ক্ষমতাশালী অংশ সাধারণ মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের চিন্তাভাবনাকে সীমাবদ্ধ করে এবং তাদের মানবিক অস্তিত্বকে অস্বীকার করে।

এই ডিস্টোপিয়ান সাহিত্য কেবল কাল্পনিক গল্প নয়, বরং আমাদের সমাজের অন্তর্নিহিত বিপদগুলোকে উন্মোচন করে। নজরদারি প্রযুক্তির বিস্তার, সংবাদ মাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং লিঙ্গ বৈষম্যের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা এ সবই অরওয়েল ও অ্যাটউডের ডিস্টোপিয়ান জগতের প্রতিচ্ছবি। এই সাহিত্য আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায় আমরা কি একটি ডিস্টোপিয়ান ভবিষ্যতের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছি? ব্যক্তি স্বাধীনতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং সত্যের জন্য আমাদের সংগ্রাম কি শেষ পর্যন্ত অর্থহীন হয়ে যাবে?

অনলাইন প্রতারণার জাল – বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে

২০২৫ সালের প্রথম পাঁচ মাসেই ভারতীয় নাগরিকেরা অনলাইন প্রতারণায় প্রায় ৮২০ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৯ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা) হারিয়েছেন বলে জানিয়েছে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিবেদনের বরাতে এই তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বিপুল প্রতারণার অধিকাংশই ঘটেছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে। বিশেষ করে—কম্বোডিয়া, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম, লাওস ও থাইল্যান্ড থেকে পরিচালিত স্ক্যাম সেন্টারগুলোর মাধ্যমে।

ভারতীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ‘ইন্ডিয়ান সাইবার ক্রাইম কো-অর্ডিনেশন সেন্টার’-এর তথ্য অনুযায়ী, ওই স্ক্যাম সেন্টারগুলো উচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত জায়গা থেকে পরিচালিত হয়। ধারণা করা হয়, সেগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে চীনা পরিচালক গোষ্ঠী।

অভিযোগ রয়েছে, ভারতীয় নাগরিকসহ বিভিন্ন দেশের অসংখ্য মানুষকে পাচারের মাধ্যমে ওই স্ক্যাম সেন্টারগুলোতে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাঁদের জোর করে অনলাইন প্রতারণায় নিযুক্ত করা হয়।

এ ক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে এসব মানুষকে প্রথমেই থাইল্যান্ড বা মিয়ানমারে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখান থেকে পাচার করা হয় মিয়ানমারের নিয়ন্ত্রণহীন সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোর বিভিন্ন সাইবার অপরাধ চক্রে।

২০২৫ সালের মার্চ মাসে ভারত সরকার মিয়ানমার-থাইল্যান্ড সীমান্ত এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়া ৫৪৯ জন ভারতীয় নাগরিককে দেশে ফিরিয়ে নেয়। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে এক সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভারত সরকার এখন পর্যন্ত কম্বোডিয়ায় অন্তত ৪৫টি, লাওসে পাঁচটি ও মিয়ানমারে একটি স্ক্যাম সেন্টার চিহ্নিত করেছে।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রথমবারের মতো গণমাধ্যমে এই সংকটের কথা সামনে আসে। তখন জানা যায়, শুধু ভারতীয়ই নয়, অসংখ্য বাংলাদেশিও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ‘সাইবার দাসত্বে’ আটকে রয়েছেন এবং প্রতারণার কাজে বাধ্য হচ্ছেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আটকে রাখা সাইবার দাসদের দিয়ে তাঁদের নিজ নিজ দেশের মানুষদের সঙ্গে প্রতারণার ফাঁদ পাতা হয়।

দেশে সাপের কামড়ে মৃত্যু – দিনে গড়ে ২০ জন, বছরে সাড়ে ৭ হাজার

0

দেশে প্রতিবছর ৪ লাখের বেশি মানুষ সাপের ছোবলের শিকার হয়। এর মধ্যে ২৪% বিষধর সাপের ছোবল। অর্থাৎ অন্তত সাড়ে ৯৬ হাজার মানুষ বিষধর সাপের ছোবলের শিকার হন। তাদের মধ্যে সাড়ে সাত হাজার মানুষ মারা যান।

সে হিসাবে সাপের ছোবলে প্রতিদিন দেশে গড়ে অন্তত ২০ জনের মৃত্যু হচ্ছে। এর বাইরে কত হাজার মানুষের অঙ্গহানি বা স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়, সেই পরিসংখ্যান নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২০২১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাপের ছোবলে ২০ থেকে ২২% মানুষের মৃত্যু হয় সমন্বিত চিকিৎসার অভাব ও সময়ক্ষেপণের কারণে। অথচ দ্রুত চিকিৎসা নিলে ৯০% পর্যন্ত আক্রান্তকে বাঁচানো সম্ভব।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ২০২৪ সালে হাসপাতালে সাপের ছোবলের চিকিৎসা নিতে আসা ২৪ হাজার ৪৩২ জনের তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে মারা গেছেন ১১৮ জন। এসব আক্রান্তের প্রায় সবাই প্রথমে ওঝা বা বৈদ্যের কাছে গিয়েছেন ঝাড়ফুঁক করাতে।

অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. সৈয়দ জাকির হোসেন বলেন, সবচেয়ে বেশি সাপের ছোবলের ঘটনা বরিশালে। তবে মৃত্যু বেশি পদ্মাপারের বৃহত্তর ফরিদপুর ও রাজশাহীতে। এসব এলাকায় বেশির ভাগ বিষধর সাপের ছোবলের ঘটনা ঘটে। বরিশালে বিষধর সাপ তেমন নেই।

জানা গেছে, বাংলাদেশে প্রয়োগ করা পলিভ্যালেন্ট অ্যান্টিভেনম সব ধরনের সাপের বিষের বিপরীতে কার্যকর নয়। বিষধর গোখরা, শঙ্খিনী ও রাসেলস ভাইপার বা চন্দ্রবোড়া প্রজাতির তিনটি সাপের বিষের প্রতিষেধক হিসেবে দেশে এই অ্যান্টিভেনম প্রচলিত। তবে সামুদ্রিক সাপ, পিট ভাইপার ও দুর্লভ ক্রেইটসহ অন্যান্য বিষধর সাপের বিষের ক্ষেত্রে এই অ্যান্টিভেনম কার্যকর নয়।

বাংলাদেশে যে অ্যান্টিভেনমগুলো ব্যবহার করা হয়, সেগুলো দক্ষিণ ভারতের চার ধরনের সাপ থেকে বিষ নিয়ে তৈরি। এই অ্যান্টিভেনোম খুব একটা উন্নত মানের নয়।

এক রাষ্ট্র, ছয় জাতি, সাতটি যুদ্ধ এবং একটি ভাঙা ইতিহাস – যুগোস্লাভিয়া

একসময় যুগোস্লাভিয়া দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের এক বিস্তৃত ভূখণ্ডজুড়ে ছড়িয়ে থাকা একটি সমাজতান্ত্রিক ফেডারেশনের নাম ছিলো। নাম থেকেই বোঝা যায় এটি ছিল ‘দক্ষিণ স্লাভদের দেশ’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে মার্শাল টিটোর নেতৃত্বে সার্ব, ক্রোট, বসনিয়ান, স্লোভেন, মেসিডোনিয়ান, মন্টেনেগ্রিন এ ছয়টি জাতিগোষ্ঠী এক ছাতার নিচে এল। প্রশ্ন থেকেই যায়এক হওয়ার সিদ্ধান্তটা আদৌ টেকসই ছিল? যখন শক্ত হাতে টিটো দেশটাকে সামলে রেখেছিলেন, তখন হয়তো জাতিগত দাঙ্গা ছিল না, কিন্তু বিভেদের বীজগুলো শিকড় গেড়ে বসছিল নিঃশব্দে।

কল্পনা করুন এক বাড়িতে ছয় ভাই থাকে, প্রত্যেকেই ভিন্ন ধর্মে বিশ্বাস করে, ভিন্ন ভাষায় কথা বলে, আর একে অপরকে শতাব্দীজুড়ে সন্দেহ করে এসেছে। যুগোস্লাভিয়াও ছিল অনেকটা সেরকমই। সার্বরা ছিল মূল রাজনৈতিক শক্তি, যারা অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক দিয়ে সবচেয়ে প্রভাবশালী।অন্যদিকে ক্রোটরা ছিল ক্যাথলিক ও ইউরোপমুখী। বসনিয়ান মুসলিমরা ছিল তৃতীয় স্তরের মতো অবহেলিত। এই জাতিগত পার্থক্য শুধু নামেই ছিল না ধর্ম, ভাষা, ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা সবকিছু মিলিয়ে একধরনের সাংস্কৃতিক আগুনের গোলক বানিয়েছিল দেশটা। আর এই আগুনে আগুন লাগাতে রাজনীতিকরাও দেরি করেননি।

১৯৮০ সালে টিটো মারা যাওয়ার পর, যেন সুতো কেটে গেলো। তার আগেই অনেক সমস্যার চাপা সংকেত ছিল,আর্থিক দুর্দশা, দুর্নীতিগ্রস্ত মবোক্র্যাসি, জাতিগত দাঙ্গার ভয়। কিন্তু তার মৃত্যু নতুন এক যুগ আনল, যেখানে কেন্দ্রীয় শাসন দুর্বল হয়ে গেলো আর আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ শক্ত হয়ে উঠতে থাকলো। এই সময় সার্ব নেতাদের নেতৃত্বে শুরু হলো “বড় সার্বিয়া” গঠনের স্বপ্ন। অন্যদিকে ক্রোট ও স্লোভেনরা চাচ্ছিল স্বাধীনতা। বসনিয়ান মুসলিমরা পড়ে গেল মাঝখানে, তারা নাতো পুরোপুরি সার্ব, নাতো ক্রোট, ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্তও তারা।

৯০-এর দশকে, একের পর এক প্রদেশ স্লোভেনিয়া, ক্রোয়েশিয়া, বসনিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করতে লাগল। আর শুরু হলো ভয়াবহ যুদ্ধ। স্লোভেনিয়া তুলনামূলক শান্তিপূর্ণভাবে আলাদা হয়ে গেলেও, ক্রোয়েশিয়া ও বসনিয়ায় রক্তগঙ্গা বইতে লাগল। সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে ১৯৯৫ সালে বসনিয়া যুদ্ধের সময়। ‍স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যায় সার্ব বাহিনী ৮,০০০ এর বেশি মুসলিম পুরুষ ও কিশোরকে হত্যা করে। এই গণহত্যা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে বড় নৃশংসতা। যুদ্ধের সময় ধর্ষণকে ব্যবহার করা হয়েছিল যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে, বিশেষত বসনিয়ায়। নারীর শরীর হয়ে উঠেছিল প্রতিশোধ ও আধিপত্যের মাঠ।

এই সংঘর্ষকে থামাতে জাতিসংঘ এবং পরে ন্যাটো হস্তক্ষেপ করে। বসনিয়ায় ন্যাটোর বোমাবর্ষণ এবং ডেটন অ্যাকর্ডের মাধ্যমে একরকম যুদ্ধ বন্ধ হয়। কিন্তু এও প্রশ্ন থেকে যায় এই হস্তক্ষেপ কি নিছক মানবতা রক্ষার জন্য, না কি ইউরোপের দরজায় এক অনিয়ন্ত্রিত আগুন বন্ধ করার কূটনৈতিক খেলা?

যুগোস্লাভ যুদ্ধ আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার ব্যবস্থারও একটি পরীক্ষা ছিল। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য ICTY (International Criminal Tribunal for the former Yugoslavia) গঠন করা হয় । স্লোবোদান মিলোসেভিচ সহ বহু নেতা বিচারের মুখোমুখি হয়।

আজকের দিনে, যুগোস্লাভিয়ার জায়গায় আমরা দেখি সাতটি স্বাধীন রাষ্ট্র—স্লোভেনিয়া, ক্রোয়েশিয়া, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, সার্বিয়া, মন্টেনেগ্রো, উত্তর মেসিডোনিয়া, ও কসোভো যাদের স্বীকৃতি এখনো বিতর্কিত। দেশগুলো তাদের নিজ নিজ পথ খুঁজছে। কেউ ইউরোপীয় ইউনিয়নে ঢুকেছে, কেউ দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক মন্দার সঙ্গে আজও লড়ছে ।

যুদ্ধের ভেতরেও মানুষের সৃজনশীলতা থেমে থাকেনি। ৭০–৮০-এর দশকে যুগোস্লাভ রক সংগীত ছিল এক ধরনের সাংস্কৃতিক বিদ্রোহ। Bijelo Dugme, EKV, Azra এইসব ব্যান্ড ছিল আইডেন্টিটির প্রতীক, যেখানে জাতিগত পরিচয়ের বাইরে দাঁড়িয়ে এক নতুন যুব সমাজ গড়ে উঠছিল। যুদ্ধ যখন শুরু হয়, এই শিল্পীরা কেউ কেউ রুখে দাঁড়ায়, কেউ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়, কেউ চুপসে যায়। কিন্তু ইতিহাসে তারা একটা সম্ভাব্য ‘অন্য যুগোস্লাভিয়া’-র বড় চিহ্ন রেখে গেছে।

বসনিয়ার রক্তক্ষয়ের কয়েক বছর পর ১৯৯৮–৯৯ সালে আবার আগুন জ্বলে ওঠে কসোভো প্রদেশে। আলবেনীয় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই অঞ্চলে স্বাধীনতার দাবি বাড়তে থাকে, আর সার্ব বাহিনী সেখানে দমন নীতি চালায়। এর জবাবে ন্যাটো সরাসরি সার্বিয়ার উপর বিমান হামলা শুরু করে। এই হামলার ফলে সার্বিয়ার জনগণের মনোজগতে একধরনের আত্মরক্ষা বনাম বঞ্চনার মানসিকতা তৈরি হয়, যার ছায়া আজও রাজনীতিতে বর্তমান। সার্বিয়াকে তারা মনে করে অবাঞ্ছিত এবং কসোভোর স্বাধীনতা এখনো স্বীকৃতি দেয়নি।

আজকের যুগোস্লাভ-উত্তর রাষ্ট্রগুলোর তরুণ প্রজন্ম যুদ্ধের স্মৃতি নিয়ে বড় হয়নি। তারা বড় হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্বপ্ন, টিকটকের ট্রেন্ড, আর অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে। কিন্তু এক অদ্ভুত দ্বিধায় থাকে তারা একদিকে অতীতের রক্তাক্ত ইতিহাস, অন্যদিকে একটি ঐক্যবদ্ধ, সুস্থ সমাজের আকাঙ্ক্ষা। বসনিয়ার মুসলিম তরুণরা এখনও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, সার্ব তরুণরা নিজেদের পরিচয় নিয়ে দ্বিধায় থাকে, আর ক্রোট তরুণরা ইউরোপের অংশ হতে চায়। কেউ কেউ আবার বলে, “আমাদের সময়কার যুগোস্লাভিয়া থাকলে আমরা সবাই একসাথে বাস করতাম”।

যুগোস্লাভিয়ার ভাঙন ইতিহাসের বইয়ে একপাক্ষিক রাজনৈতিক ঘটনাপঞ্জি নয়, বরং সেটা মানব সম্পর্ক, সংস্কৃতি, ট্র্যাজেডি আর স্বপ্নভঙ্গের গল্প।তা না হলে কীভাবে একসময়কার একটি সফল মাল্টিন্যাশনাল রাষ্ট্র একে একে এতগুলো টুকরোয় ভেঙে যায়?

Bone Conduction Headphone – কতটা আরাম কতটা সুরক্ষা?

আজকের যুগে হেডফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা দ্রুত বেড়েই চলছে। নানা রকম হেডফোন ব্যক্তিগত ও পেশাগত কাজে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে বোন কনডাকশন হেডফোন একটি নতুন ও অভিনব প্রযুক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা প্রচলিত ইয়ারফোন ও হেডফোনের থেকে ভিন্ন ও উন্নত মানের শ্রবণ অভিজ্ঞতা প্রদান করে।

বোন কনডাকশন হেডফোন কী?
বোন কনডাকশন হেডফোন মূলত এমন একটি ডিভাইস যা আমাদের কানের মধ্যে ইয়ারক্যানাল (ear canal) বন্ধ না করে সরাসরি কানের পিছনের হাড়ের মাধ্যমে শব্দ পরিবহন করে। সাধারণ হেডফোন বা ইয়ারফোনে যেমন শব্দ বাতাসের মাধ্যমে কানের ভেতরে পৌঁছায়, তেমনি বোন কনডাকশন প্রযুক্তিতে শব্দ কম্পন (vibration) আকারে কানের পাশের হাড়ের মাধ্যমে সরাসরি কানের অভ্যন্তরে পৌঁছায়।

কিভাবে কাজ করে?
বোন কনডাকশন হেডফোনের বিশেষ প্যাটার্ন থাকে যা কম্পন তৈরি করে। এই কম্পনগুলি কানের পাশের হাড়ে লাগানো হয় এবং হাড়ের মাধ্যমে সরাসরি কানের ভিতরের কক্সা (cochlea) পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এর ফলে বাহ্যিক শব্দের সঙ্গে একসাথে মিউজিক বা কথোপকথন শুনতে পাওয়া যায়।

বোন কনডাকশন হেডফোনের সুবিধা –
১. শ্রবণ স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ: প্রচলিত ইয়ারফোন বা হেডফোন দীর্ঘক্ষণ ব্যবহারে কানে চাপে পড়ে এবং কানের যন্ত্রণা বা ক্ষতি করতে পারে। বোন কনডাকশন হেডফোন কানের বাইরে বসানো হয়, তাই কানের ভিতরের অংশ সম্পূর্ণ মুক্ত থাকে।

২. পরিবেশের শব্দ শুনতে পাওয়া যায়: বাইরের শব্দগুলোও স্পষ্ট শুনতে পাওয়া যায়, যেমন গাড়ির আওয়াজ, কথোপকথন বা সতর্ক সংকেত। তাই বাইরের পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন থাকা যায়।

৩. আর্থোপেডিক ও মেডিক্যাল প্রয়োগ: যারা কানের ভেতরে শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন বা কানের চ্যানেল ব্লক আছে, তাদের জন্য এটি আদর্শ। শারীরিক প্রতিবন্ধীতয়ও (যেমন কানের ইনফেকশন) থাকলে বোন কনডাকশন হেডফোন ব্যবহার করাই ভালো।

৪. স্বাচ্ছন্দ্য: দীর্ঘ সময় পরেও কানে কোনও চাপ বা অস্বস্তি হয় না।

বোন কনডাকশন হেডফোনের কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। প্রচলিত হেডফোনের তুলনায় বোন কনডাকশন হেডফোনের বেস (bass) বা গভীর শব্দ কম হতে পারে, কারণ শব্দ সরাসরি বাতাসের মাধ্যমে না গিয়ে হাড়ের মাধ্যমে পৌঁছায়। যেহেতু কানের ভিতর পুরোপুরি ঢুকে না, তাই বাইরে থেকে কিছুটা শব্দ শোনা যায়। ফলে প্রাইভেসি কম হতে পারে।অন্যান্য সাধারণ হেডফোনের তুলনায় দাম কিছুটা বেশি হতে পারে।

বর্তমানে বোন কনডাকশন হেডফোনের জনপ্রিয়তা অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে যারা বাইক চালান, দৌড়ান বা ব্যায়াম করেন তারা এটি পছন্দ করেন, এটা কানের ভেতরে ঢুকে না তাই বাহিরের শব্দ সম্পর্কিত সতর্কতা বজায় থাকে। এছাড়া কর্মক্ষেত্রেও যারা পরিবেশের শব্দ শুনে সতর্ক থাকতে চান, তাদের জন্য এটি আদর্শ।

বোন কনডাকশন হেডফোন তৈরিতে বেশ কিছু বিশ্বখ্যাত কোম্পানি কাজ করছে। তাদের মধ্যে প্রধান কয়েকটি হলো:

AfterShokz (Shokz) বোন কনডাকশন হেডফোনের পায়োনিয়ার ব্র্যান্ড। স্পোর্টস ও অ্যাকটিভ লাইফস্টাইলের জন্য তাদের হেডফোন বিশেষ জনপ্রিয়। জনপ্রিয় মডেলগুলো হলো Aeropex, OpenMove, Titanium।

বিশ্ববিখ্যাত অডিও ব্র্যান্ড Bose বোন কনডাকশন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে এবং উচ্চমানের শব্দ ও আরামদায়ক ডিজাইনের হেডফোন তৈরি করছে।

Sony আধুনিক প্রযুক্তি মিশ্রিত কিছু বোন কনডাকশন হেডফোন বাজারে আনছে, যদিও AfterShokz-এর মতো পূর্ণ সিরিজ এখনো তৈরি করেনি।

Vidonn চীনের একটি ব্র্যান্ড, যা বাজেট বান্ধব কিন্তু কার্যকর বোন কনডাকশন হেডফোন সরবরাহ করে। Pyle আমেরিকার একটি কোম্পানি, যারা স্পোর্টস ও বাইকের জন্য বিশেষ বোন কনডাকশন হেডফোন তৈরি করে।

অন্যান্য ব্র্যান্ড যেমন Tayogo, H2O Audio ইত্যাদিও কিছু জনপ্রিয় মডেল বাজারে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশেও এইসব ব্র্যান্ডের বোন কনডাকশন হেডফোন ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এবং অনলাইনে ও কিছু ইলেকট্রনিক দোকানে পাওয়া যাচ্ছে।

বোন কনডাকশন হেডফোন আধুনিক, নিরাপদ ও আরামদায়ক প্রযুক্তি, যা প্রচলিত হেডফোনের তুলনায় ভিন্ন শ্রবণ অভিজ্ঞতা দেয়। এর মাধ্যমে শ্রবণ স্বাস্থ্য সুরক্ষিত থাকে এবং একই সঙ্গে বাইরের পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন থাকা যায়। বিশ্ববাজারে AfterShokz, Bose, Sony-এর মত কোম্পানি এই প্রযুক্তির উন্নয়নে নেতৃত্ব দিচ্ছে। ভবিষ্যতে প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বোন কনডাকশন হেডফোনের কার্যকারিতা আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যায়।

শুল্ককে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন – ট্রাম্প

ব্রাজিলে নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পরও অন্যায়ভাবে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টার অভিযোগে বিচার চলছে সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর। এই বিচারকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ আখ্যা দিয়ে তা বন্ধের দাবি জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর এই দাবি আদায়ে তিনি ব্রাজিলের বিরুদ্ধে ৫০% পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন।

লুলা দা সিলভার কাছে হেরে যাওয়ার পর ২০২৩ সালের ৮ জানুয়ারি বলসোনারোর সমর্থকেরা ব্রাজিলের কংগ্রেস, প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ ও সুপ্রিম কোর্টে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করেন। ব্রাজিলে বলসোনারোর সমর্থকদের হামলার ঠিক দুই বছর আগে একই কায়দায় যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল হিলে হামলা চালিয়েছিলেন ট্রাম্প-সমর্থকরা।

বলসোনারো ক্ষমতায় থাকাকালে ট্রাম্পের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। এখন সেই বন্ধুকে আইনি বিপদ থেকে বাঁচাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল প্রভাবকে ব্যবহার করে ব্রাজিলকে চাপে ফেলার কৌশল নিয়েছেন ট্রাম্প।

শুল্ক আরোপের পেছনে বাণিজ্য ঘাটতিকে অজুহাত হিসেবে দেখাচ্ছেন ট্রাম্প। তার যুক্তি অনুযায়ী, যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রে বেশি পণ্য রপ্তানি করে, কিন্তু সেই তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে কম আমদানি করে–সেসব দেশের ওপর শুল্ক আরোপ করছেন। তবে অন্তত ব্রাজিলের ক্ষেত্রে এই যুক্তি একেবারেই খাটে না। ব্রাজিলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি তো নেই-ই, বরং ওয়াশিংটনের প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত রয়েছে।

এতে এটাই প্রমাণিত হয় যে–এই শুল্ক আরোপের পেছনে মূল উদ্দেশ্য হলো, অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে একটি সার্বভৌম দেশের বিচারিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করা এবং নিজের রাজনৈতিক মিত্রকে সুবিধা দেওয়া।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য শুল্ককে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি নতুন কিছু নয়। ২০১৭ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর তিনি চীনের ওপর শুল্ক আরোপের জন্য ফেন্টানিলের মতো মাদক পাচারকে অজুহাত হিসেবে খাড়া করেছিলেন।

ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী প্রতিষ্ঠিত বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার ওপর একটি বড় আঘাত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। যুক্তরাষ্ট্র নিজেই বিশ্ববাণিজ্যের এই নিয়ম গড়ে তোলায় নেতৃত্ব দিয়েছিল। এর ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বা ডব্লিউটিও। এই সংস্থাটি তৈরির মূল উদ্দেশ্য ছিল শুল্কের মতো বিষয়কে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা।

এ প্রসঙ্গে গত ৮ জুলাই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বার্ষিক বৈঠকের উদ্বোধনী ভাষণে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন–‘শুল্ক, রপ্তানি সীমাবদ্ধতা এবং বিনিয়োগে প্রতিবন্ধকতা এখন ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ধারালো অস্ত্র।’ তিনি ‘বিশ্বকে প্রভাব বলয়ে ভাগ করার ধারণা’ প্রত্যাখ্যান করার আহ্বান জানান।

বাংলাদেশের ওপর আরোপিত ৩৫% শুল্ক কমানোর আলোচনাতেও বাংলাদেশকে চীনের কাছ থেকে আমদানি কমানোর চাপ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তারা বাংলাদেশের শুল্কব্যবস্থাকেও তাদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার আহ্বান জানিয়েছে। আলোচনায় শুধু বাণিজ্য নয়, যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা ও চীনের বিনিয়োগ বৃদ্ধি সংক্রান্ত বিষয়ও এনেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন–বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে এই শুল্ক হুমকি চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর কৌশলের অংশ।

“নির্জনতা তখনই ভয়ংকর, যখন বাস্তবতা আর আপনাকে ছুঁতে পারে না” : গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ

পিটার : টেপ রেকর্ডার ব্যবহার করলে আপনি কেমন বোধ করবেন?

মার্কেজ : সমস্যা হলো, যখনই জানবেন সাক্ষাৎকার রেকর্ড করা হচ্ছে তখনই ভাবভঙ্গি বদলে যাবে। আমার বেলায় আমি সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিরক্ষামূলক মনোভাব দাঁড় করিয়ে দিই। সাংবাদিক হিসেবে সাক্ষাৎকারের সময় টেপ রেকর্ডারের ব্যবহার এখনো আমরা শিখিনি বলে আমার ধারণা।আমি মনে করি, সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে কোনো ধরনের নোট না নিয়ে দীর্ঘ কথোপকথন চালিয়ে যাওয়া। তারপর কথোপকথনের স্মৃতি থেকে এটাকে লিখে ফেলা, হুবহু একইরকম শব্দে প্রকাশ করতে হবে এমন নয় – যে-ধারণার সৃষ্টি হয়েছে তা প্রকাশ করা। আরেকটি উপকারি পদ্ধতি হচ্ছে নোট নেওয়া আর সাক্ষাৎকারদাতার প্রতি অনুগত থেকে এর ব্যাখ্যা করা। যা আপনাকে ফাঁসিয়ে দেবে তা হচ্ছে যন্ত্রটি সাক্ষাৎকারদাতার প্রতি অনুগত নয়, আপনি যখন সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে বোকামি করে ফেলবেন টেপ রেকর্ডার তাও ধারণ করে ফেলবে। সেজন্যে যখন টেপ রেকর্ডার থাকে আমি সচেতন হয়ে যাই যে, আমার সাক্ষাৎকার নেওয়া হচ্ছে; আর যখন যন্ত্রটি থাকে না আমি অবচেতনে এবং সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে কথা বলে যাই।

পিটার : সাক্ষাৎকার নিতে আপনি কখনো টেপ রেকর্ডার ব্যবহার করেননি?

মার্কেজ : সাংবাদিক হিসেবে আমি কখনো ব্যবহার করিনি। আমার খুব চমৎকার একটি টেপ রেকর্ডার আছে, এটা কেবল গান শুনতে ব্যবহার করি। তবে সাংবাদিক হিসেবে আমি কখনো সাক্ষাৎকার নিইনি। আমি রিপোর্ট করেছি, প্রশ্ন আর উত্তরের সাক্ষাৎকার কখনো নয়।

পিটার : আপনার কাছে মহৎ সাংবাদিকতার কাজ কোনটি?

মার্কেজ : জন হার্সের হিরোশিমা একটি অসাধারণ কাজ।

পিটার : এখনকার এমন কোনো কাহিনি কি আছে যা নিয়ে কাজ করতে আপনি বিশেষভাবে পছন্দ করবেন?

মার্কেজ : এমন অনেক রয়েছে, অনেকগুলো নিয়ে আমি লিখেছিও। আমি পর্তুগাল, কিউবা, অ্যাঙ্গোলা এবং ভিয়েতনাম নিয়ে লিখেছি। আমি পোল্যান্ড নিয়ে লিখতে চাই। আমার ধারণা এখন সেখানে যা ঘটছে আমি হুবহু বর্ণনা করে যেতে পারব। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা হতো। পোল্যান্ডে এখন প্রচন্ড শীত, কিন্তু আমি যে আরামপ্রিয় সাংবাদিক।

পিটার : আপনি কি মনে করেন উপন্যাস এমন কিছু করতে পারে যা সাংবাদিকতা করতে পারে না?

মার্কেজ : একটুও না, আমি মনে করি একটু পার্থক্যও নেই। উভয়ের উৎস এক, রসদ এক, সম্পদ ও ভাষা এক। ড্যানিয়েল ডেফোর দ্য জার্নাল অব দ্য প্লেগ ইয়ার একটি মহান উপন্যাস আর হিরোশিমা সাংবাদিকতার একটি শ্রেষ্ঠ কাজ।

পিটার : সত্য বনাম কল্পনার ভারসাম্য রক্ষা করতে সাংবাদিক ও ঔপন্যাসিকের ভিন্ন ভিন্ন দায়িত্ব রয়েছে কি?

মার্কেজ : সাংবাদিকতায় একটি ঘটনা যদি মিথ্যে হয় তাহলে তা সমস্ত কাজটিকে প্রভাবিত করবে। পক্ষান্তরে উপন্যাসের একটি একক ঘটনা যদি সত্যি হয় তাহলে তা গোটা কাজটিকে বৈধতা প্রদান করবে। পার্থক্য সেখানেই, তার তা লেখকের প্রতিশ্রুতিতে নিহিত। যতক্ষণ মানুষকে বিশ্বাস করিয়ে যেতে পারে একজন ঔপন্যাসিক, ততক্ষণ যা চান লিখে যেতে পারেন।

পিটার : কবছর আগে একটি সাক্ষাৎকারে মনে হয়েছে, আপনি বিস্ময়ের সঙ্গে আপনার পেছনের সাংবাদিক-জীবনের দিকে তাকিয়েছেন – তখন এত দ্রুততার সঙ্গে কাজ করতে পারতেন?

মার্কেজ : উপন্যাসই হোক কি সাংবাদিকতা, আগের মতো লিখে যাওয়া আমার জন্য খুব কষ্টকর। আমি যখন সংবাদপত্রে কাজ করতাম, যা লিখেছি তাতে প্রতিটি শব্দ নিয়ে তেমন সচেতন ছিলাম না, কিন্তু এখন সচেতন। আমি যখন বোগোটায় এল স্পেকতাদর পত্রিকায় কাজ করতাম, আমাকে সপ্তাহে অন্তত তিনটা বড় লেখা দিতে হতো। প্রতিদিন দু-তিনটে সম্পাদকীয় নোট, এছাড়া আমি চলচ্চিত্র-সমালোচনা লিখতাম। রাতে সবাই যখন চলে যেত, আমি রয়ে যেতাম আর উপন্যাস নিয়ে বসতাম। ছাপাখানার লাইনোটাইপ মেশিনের শব্দ আমার ভালো লাগত, বৃষ্টির শব্দের মতো মনে হতো। মেশিন থেমে গেলে আমি নৈঃশব্দ্যের মধ্যে পড়ে থাকতাম, আমি আর কাজ করতে পারতাম না। এখন সে-তুলনায় আমার লেখালেখি অনেক কম। এখন কাজের দিনগুলোতে সকাল নটা থেকে দুপুর দুটো বা তিনটে পর্যন্ত কাজ করে লিখতে পারি বড়জোর চার পাঁচ লাইনের একটি ছোট অনুচ্ছেদ। পরদিন দেখা যায় এটা আবার ছিঁড়ে ফেলছি।

পিটার : এই পরিবর্তন কেন এলো, আপনার লেখা উচ্চপ্রশংসিত সে-কারণে, না কোনো রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি থেকে?

মার্কেজ : দুটো থেকেই। আমার মনে হয়, আমার কল্পনারও বাইরে এমন বিপুলসংখ্যক পাঠকের জন্য লিখছি – এই ধারণা আমার ওপর এক ধরনের সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ববোধের সৃষ্টি করে। এর সঙ্গে অহঙ্কাকারও যোগ হয় – এ-লেখার মান যেন আগের লেখার চেয়ে কমে না যায়।

পিটার : প্রথমদিকে আপনাকে প্রভাবিত করেছেন এমন কজনের নাম বলবেন কি?

মার্কেজ : ছোটগল্পের প্রতি আমার যে বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি সেখান থেকে আমাকে যারা বের করে নিয়ে এসেছিলেন, তারা হচ্ছেন আমেরিকার লস্ট জেনারেশনের লেখক। আমি অনুধাবন করি, তাদের সাহিত্যের সঙ্গে জীবনের সম্পর্ক রয়েছে, যা আমার ছোটগল্পে নেই। তারপর এমন একটি ঘটনা ঘটে যা এই মনোভাবের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ৯ এপ্রিল ১৯৪৮ এটা ছিল বোগোতাজো, রাজনৈতিক নেতা গেইতান গুলিবিদ্ধ হন এবং মানুষ উন্মত্তের মতো বোগোটার রাস্তায় নেমে আসে। যখন খবরটা আমার কানে আসে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ডিং হাউজে আমি দুপুরের খাবারের জন্য তৈরি হচ্ছি। আমি দৌড়ে সেখানে যাই। ততক্ষণে গেইতানকে ট্র্যাক্সিতে তুলে হাসপাতালের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমি যখন বোর্ডিং হাউজে ফিরে আসি, রাস্তায় নামা লোকজন তখন বিক্ষোভ শুরু করেছে, দোকানপাট লুট করছে, ভবনে আগুন দিচ্ছে। আমিও তাদের সঙ্গে যোগ দিই। সেদিন বিকেল ও সন্ধ্যায় আমার বোধোদয় হয়, কোন ধরনের দেশে আমি বসবাস করছি আর এর মোকাবেলায় আমার ছোটগল্প তুচ্ছ। পরবর্তীকালে যখন আমাকে জোর করে, আমি যেখানে আমার শৈশব কাটিয়েছি, সেই ক্যারিবীয় অঞ্চলের বারানকুইলায় পাঠানো হয়। আমি বুঝতে পারি, এ-জীবনই আমি যাপন করেছি, এ-জীবনই আমার চেনা, আর আমি এ নিয়েই লিখতে চাই।

পিটার : ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অব সলিচিউডের অনিদ্রা মহামারির উৎস কী?
মার্কেজ : ইডিপাস দিয়ে শুরু, প্লেগ নিয়ে আমি সবসময়ই আগ্রহী ছিলাম। মধ্যযুগের প্লেগ নিয়ে আমি অনেক পড়াশোনা করেছি। আমার প্রিয় একটি বই ড্যানিয়েল ডেফোর দ্য জার্নাল অব দ্য প্লেগ ইয়ার্স – অনেকগুলো কারণের একটি হচ্ছে ডেফো ছিলেন একজন সাংবাদিক, যার লেখা পড়ে মনে হয় তিনি কল্পলোকের কাহিনি বলছেন। অনেক বছর ধরে আমার মনে হয়েছে, ডেফো লন্ডনে প্লেগ যেভাবে দেখেছেন সেভাবেই বর্ণনা করেছেন। কিন্তু আমি দেখলাম এটি আসলে একটি উপন্যাস, কারণ লন্ডনে যখন প্লেগের প্রাদুর্ভাব হয় তখন ড্যানিয়েল ডেফোর বয়স সাত বছরেরও কম। প্লেগ বরাবরই আমার কাছে ফিরে ফিরে আসা একটি বিষয় – বিভিন্ন অকরণে। ইভিল আওয়ারে পুস্তিকাগুলো প্লেগ। অনেক বছর ধরে আমি ভেবেছি, কলম্বিয়ার রাজনৈতিক সহিংসতার অধিবিদ্যার ধরন প্লেগের মতোই। ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অব সলিচিউড লেখার আগে ‘ওয়ান ডে আফটার স্যাটারডে’ নামের একটি গল্পে আমি সব পাখি মেরে ফেলার জন্য প্লেগের আশ্রয় নিয়েছিলাম। ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অব সলিচিউডে ইনসমনিয়া প্লেগ – অনিদ্রা মহামারি সাহিত্যের একটি চাতুরী হিসেবে ব্যবহার করেছিলাম – এটা নিদ্রা মহামারির ঠিক উল্টোপিঠ। শেষ পর্যন্ত সাহিত্য ছুতারগিরি ছাড়া আর কিছু নয়।

পিটার : আপনি প্রায়ই নির্জনতার শক্তির থিম ব্যবহার করে থাকেন।

মার্কেজ : আপনার যত বেশি ক্ষমতা থাকবে, কে আপনার কাজে মিথ্যে বলছে এবং কে বলছে না, তা বের করা তত কঠিন হয়ে উঠবে। আপনার ক্ষমতা যখন নিরঙ্কুশ হবে বাস্তবতার সঙ্গে আপনার আর কোনো সম্পর্ক থাকবে না – আর এটাই হচ্ছে সবচেয়ে জঘন্য নির্জনতা। একজন শক্তিশালী ব্যক্তি, যিনি একনায়ক, তাকে ঘিরে রাখে বিভিন্ন ধরনের স্বার্থ এবং এমনসব মানুষ যাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য তাকে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করা; সবকিছুই সংঘবদ্ধভাবে তাকে বিচ্ছিন্ন করতেই করা হয়। (সংক্ষেপিত)

বৈষম্যহীন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা হারিয়ে গেছে : সামিনা লুৎফা নিত্রা। অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সংগঠক, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, ‘বটতলা’ নাট্যদল।

“… আন্দোলনের অর্জন বলতে আমরা শুধু একটা রেজিমের পতন চাইনি, ব্যবস্থাটার পতন চেয়েছিলাম। তবে এটা সত্যি, আওয়ামী লীগ যে ধরনের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করেছিল—দুর্নীতি, হত্যা, সহিংসতা ইত্যাদির রূপটা আমরা সরিয়ে দিতে পেরেছি, সেটা একটা বড় অর্জন।

… আমরা দেখতে পাচ্ছি না যে, সঠিকভাবে বিচারটা শুরু হয়েছে। ট্রুথ অ্যান্ড রিকন্সিলেশনে আমরা পৌঁছাতে পারিনি। আমরা শুধু ভাঙাভাঙি দেখছি।

… সঠিক পদ্ধতি না মেনে একদল মানুষ যখন বিচার করতে বসেন, সে অধিকার তাঁদের কে দিয়েছে? আগস্টের ৫ তারিখে ভাস্কর্য ভাঙা, বত্রিশ বা গণভবন ভাঙা ছিল আন্দোলনকারী জনতার রোষ। কিন্তু সাত-আট মাস পর যখন ৩২ নম্বরের বাড়ি ভাঙা, বিভিন্ন পত্রিকা অফিসের সামনে জেয়াফত করা—সেটা তো সংঘবদ্ধ সহিংসতাকে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। এর সবগুলো ঘটনা সরকারের ব্যর্থতার কারণে ঘটেছে।

… বৈপ্লবিক পরিবর্তনের যে সুযোগ এসেছিল সেটাকে সবচেয়ে অযৌক্তিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করল বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো। আর রাজনৈতিক দলগুলোর বিন্দুমাত্র প্রস্তুতি ছিল না এই গণ-অভ্যুত্থান সফল হলে তারা কী করবে! যদিও তারা এখন ক্রেডিটের দাবি তুলছে।

… মানুষের মধ্যে একটা জাগ্রত সচেতনতার অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, সেটাকে কাজে লাগানো দরকার। তারা এই জাগ্রত অবস্থাটাকে আবার কীভাবে পুরোনো জায়গায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় সেই ফর্মুলা নিয়ে সারাক্ষণ জপছে। দর্শক হিসেবে আমার এসবই মনে হয়।

অসংখ্য তরুণ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল, তারা কিন্তু রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়ে উঠেছে। এই সচেতন ছেলেমেয়েগুলোকে স্পেস দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারেনি রাজনৈতিক দলগুলো। আসলে তাদের কোনো ভাবনা ও প্রস্তুতিই নেই। সত্যিই তাদের গণতন্ত্রের দিকে যাওয়ার প্রস্তুতি নেই, যে গণতন্ত্রে দলগুলোকে কেউ প্রশ্ন করার সুযোগ পাবে।

… এই তরুণদের প্রচণ্ড শক্তিকে দেশের কাজে লাগানো সম্ভব ছিল। তারা যেভাবে ট্রাফিক ব্যবস্থা, বন্যা পরিস্থিতি এবং ডাকাতি অবস্থাকে ট্যাকেল করল—প্রতিটা ক্ষেত্রে তারা কিন্তু তাদের কর্তব্যটা পালন করেছে। তারা তাদের কর্তব্যের চেয়ে বেশি পালন করেছে। এই তরুণদের চেয়ে যে রাজনৈতিক দলগুলোর সামর্থ্য বেশি তারা কিন্তু তরুণদের কাজে লাগাতে পারেনি।

এই জায়গা থেকে আমি বলব, আসলেই বৈপ্লবিক মুহূর্তটা স্লিপ করে গেছে। তারা সংস্কার নিয়ে এক জিনিসের মধ্যে যে আটকে আছে, সেখান থেকে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের জায়গায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে যাবে।

… শিক্ষার্থীদের যে নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপি। এই দল যে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে, সেটা তাদের ক্ষতি করছে। এনসিপির মধ্যে যদি বৈপ্লবিক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকেও থাকে, সেগুলো অঙ্কুরে বিনষ্ট করছে। এখন তারা জনগণের কাছে যাচ্ছে। কিন্তু ছয় মাস আগে সেটা করা দরকার ছিল। আমি তাদের নভেম্বর-ডিসেম্বরে বলেছিলাম, তাদের আসলে প্রত্যেক শহীদের বাসায় যাওয়া উচিত। কিন্তু তখন তারা সরকারে চলে গেছে।

… ৫ আগস্টের পর থেকে পাশের দেশ থেকে একটা বিশাল ক্যাম্পেইন করা হয়েছে—‘শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশ জঙ্গি রাষ্ট্র হয়ে গেছে, দেশটা নারীর জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠেছে।’ সেই ক্যাম্পেইনের বিষয়টা স্বীকার করে নিয়ে বলতে চাই, এখন যেকোনো ঘটনাকে বেশি করে প্রচারে আনা হয়। যেটা আগে তারা করত না, অন্য কেউ করত।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এ ধরনের সমস্যা থাকার পরেও সরকারের উচিত ছিল ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বিশেষ করে নারী এবং প্রান্তিক মানুষদের।স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেটা করতে ব্যর্থ হয়েছে। আর তারা যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না সেটা নিয়ে পরিষ্কার করে কোনো বক্তব্য দিচ্ছে না।

… সরকারই কিন্তু নারী কমিশনের জন্য সম্মানিত ব্যক্তিদের দায়িত্ব দিয়েছিল। কিন্তু সরকারের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এই নারীদের অপমানের শিকার হতে হলো। তার বিরুদ্ধে সরকার তো কিছু বলল না এবং করল না। এ দায় যে সরকারের সেটাও স্বীকার করল না। সরকার কি তাহলে তাদের ভয় পেয়েছে? না আমাদের বিশ্বাস করাতে চায় যে, সরকার ভয় পায়।

… আর এ ধরনের পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশের সমাজ তৈরি ছিল না। সরকার গঠনের আগে জনগণকে সম্পৃক্ত করা হয়নি। আর এলিটরা তো সেই কাঠামো পরিবর্তন করতে চাইবে না। সে জন্য বলছি, বিগত সময়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করা হয়েছিল, সেগুলো তৈরি করা দরকার ছিল। কিন্তু সেটা করা হয়নি।বরং উল্টো ঘটনা ঘটেছে।

আগে যেমন আওয়ামী লীগ করার জন্য সবকিছু পাওয়া যেত, এখন সেখানে আওয়ামী লীগ করেন না, সেটা প্রমাণ করতে পারলে সবকিছু পেয়ে যাচ্ছেন। কেন প্রতিষ্ঠানগুলোকে তৈরি করা গেল না, সেই দায় এই সুবিধাভোগীদের। কিন্তু বেশি দায় হলো সরকারের—যারা সংস্কার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শুধু সময়টা পার করল, কিন্তু কোনোভাবেই আসল কাজটি করল না।

… জুলাই আন্দোলনের চেতনাটা আসলে কী? সেটাও তো আমরা সবাই জানি না। কারণ, সে সময় তো এসব নিয়ে কথা বলার সুযোগ ছিল না। আমরা সবাই চেয়েছি হত্যাকাণ্ড থামানো এবং শেখ হাসিনার পতন। দিন দিন সরকার বেশি অ্যাগ্রেসিভ হয়েছে এবং আরও বেশি ক্ষমতা দেখিয়েছে। কিন্তু এইবার এত বেশি ফোর্স প্রয়োগ করার পরে, মানুষ মনে করেছে হাসিনাকে সরাতে পারলে হত্যাকাণ্ড থামানো যাবে। তাঁকে হটানো ছাড়া এর বেশি কোনো চিন্তা কারও মধ্যে ছিল না।

তবে আমি দেখেছিলাম, জুলাই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা সে সময় দেয়ালে যেসব কথাবার্তা লিখেছে বা ডিজিটাল কনটেন্ট বানিয়েছে, সেখানে একটা বৈষম্যহীন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা ছিল। তাদের কাছে ইনক্লুসিভনেসের কথা ছিল। তারা বিভিন্ন জাতিসত্তার অধিকারের কথা বলেছে, অর্থনৈতিক বৈষম্য মুক্তির কথা বলেছে। আমরা আসলেই আন্দোলনকারীদের মধ্যে বৈষম্যহীন এবং ইনক্লুসিভনেসের স্বপ্ন দেখেছিলাম।

সেই আকাঙ্ক্ষাটা হারিয়ে গেছে। কারণ, ৫ আগস্টের পর আমরা দেখলাম সংখ্যাগরিষ্ঠের আকাঙ্ক্ষাটা এখানে প্রতিষ্ঠিত হলো। ইসলামী আন্দোলন ও হেফাজতে ইসলাম ৩ আগস্ট পর্যন্ত শেখ হাসিনার সঙ্গে ছিল। এদের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠের কথা অনুযায়ী আমাদের চলতে হবে—এ পরিস্থিতি কীভাবে তৈরি হলো?

… আর একটা কথা, জুলাই চেতনাকে আমরা নিজেদের রাজনৈতিক আদর্শবোধ দ্বারা দেখতে চেয়েছি। এ কারণে কারও সঙ্গে কারওটা মেলেনি। অনেকে হয়তো বলতে পারে, আমরা প্রতারিত হয়েছি। আসলে প্রতারিত হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, সহস্রাধিক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, আর মানুষ তার বিরুদ্ধেই দাঁড়িয়েছে।

আর ডানপন্থী ফ্যাসিবাদ আসার যে আশঙ্কার কথা বললেন, সেটা তো সারা বিশ্বে এসেছে। তবে তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। এ কারণে আমি বলতে চাই, যারা এ ধরনের ফ্যাসিবাদ চান না এবং যাঁরা অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তি ছিলেন, তাঁদের সবার উচিত একটা প্ল্যাটফর্মে আসা, আমরা যাতে পরের ধাপে অগ্রসর হতে পারি। “

হিটলার ও গোয়েবলসের প্রোপাগান্ডা এবং নাৎসি চলচ্চিত্র : স্বপন বিশ্বাস, লেখক ও কবি

হিটলার এক রাতে ছদ্মবেশে বার্লিনের অভিজাত সিনেমাহলে গেলেন। উদ্দেশ্য সিনেমা দেখা নয়, মধ্যবিরতির সময় পর্দায় তাঁর ছবি ভেসে উঠলে সবাই দাঁড়িয়ে সম্মান করছে কি না, তা যাচাই করা। সবাই দাঁড়িয়ে হিটলারের জয়ধ্বনি দিলেও হিটলার নিজে দাঁড়ালেন না। পাশের একজন বললেন, ‘দাঁড়িয়ে যাও ভাই, না হলে হিটলার আর তার দল তোমাকে বিপদে ফেলবে।’ এই কৌতুকের আড়ালে সত্যি কিছু লুকিয়ে আছে। হিটলার গোপনে যাচাই করতেন মানুষ তাঁর গুণকীর্তন করছে কি না, যারা করতেন না তাদের কঠোর শাস্তি হত। সিনেমাকেও তিনি প্রচারমাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতেন।

১৯২৭ থেকে ১৯৪৫ পর্যন্ত জার্মানির সিনেমা রাজনৈতিক পরিবেশের দ্বারা অত্যন্ত প্রভাবিত হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর ভার্সাই চুক্তির কারণে জার্মানি মারাত্মক অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ে। হিটলার ক্ষমতা গ্রহণের পর জাতীয় ঐক্যের ডাক দেন। ক্ষুধা-দারিদ্র্য আর ভঙ্গুর অর্থনীতির সময়ে জনগণ তার ডাকে সাড়া দেয়। পরে হিটলার একনায়কতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদী সরকার গঠন করে এবং দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, বিচারব্যবস্থা, শিল্প-সাহিত্যসহ সব কিছুই নিজের নিয়ন্ত্রণে আনেন।

হিটলারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন জোসেফ গোয়েবলস, প্রচার বা প্রোপাগান্ডা মন্ত্রকের প্রধান। হিটলার বিশ্বাস করতেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশরা প্রচারণায় এগিয়ে থাকার জন্য জয়ী হয়েছিল। তাই গোয়েবলসের ওপর মিথ্যা প্রচারণার দায়িত্ব পড়ে। গোয়েবলস জনপ্রিয় করে তোলেন রেডিও, বিনামূল্যে প্রতিটি নাগরিকের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেন ‘সরকারি’ রেডিও, যাতে শুধুমাত্র হিটলারের ভাষণই শোনা যায়।

তাঁর বিখ্যাত উক্তি—‘একটি বড় মিথ্যাকে বারবার বললে মানুষ এক সময় সেটাকে সত্য ভাববে।’ এই নীতির ভিত্তিতে গোয়েবলস প্রচারণা চালিয়ে যান।ইহুদি নিধন চলাকালে হিটলারকেই জার্মান জাতির ত্রাণকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন এবং জনগণকে সেই প্রচারণা বারবার শুনিয়ে বিশ্বাস করান।

হিটলারের সাফল্যগাথাই আলোচনা-প্রচারণায় প্রাধান্য পেত, ইহুদি নিধনকে আড়াল করা হতো। গোয়েবলসের তত্ত্বাবধানে প্রোপাগান্ডা মন্ত্রকের অধীনে জার্মান চলচ্চিত্র শিল্প পরিণত হয় প্রচারমাধ্যমে। নাৎসি পার্টির এই দুই শীর্ষ নেতাই সিনেমার শক্তিকেও কাজে লাগিয়েছেন। কমিউনিজম-ঘৃণাকারী গোয়েবলসও আইজেনস্টাইনের ‘পটেমকিন’ দেখে অনুপ্রাণিত হন, কারণ এর দৃশ্যশক্তিতে প্রচারকে আরও কার্যকর মনে করেন। তিনি নাৎসি ধ্যানধারণা প্রচারের জন্য উদ্যমী পরিচালকদের দিয়ে নানা সিনেমা তৈরি করান, যা মূলত নাৎসি বাহিনীর প্রচারেই ব্যবহৃত হতো।

বিশেষভাবে দুটি সিনেমা উল্লেখযোগ্য ফ্রিটজ ল্যাং এর ‘মেট্রোপলিস’ (১৯২৭) এবং লেনি রিফেনস্টাহল-এর ‘ট্রায়াম্ফ দেস উইলেন্স’ (১৯৩৫)। প্রথমটি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিভিত্তিক, যেখানে প্রান্তিক মানুষের ডাক ও বিদ্রোহ উঠে এসেছে। দ্বিতীয়টিতে রিফেনস্টাহল দেখান, জার্মানি আন্তর্জাতিক শোষণের বিরুদ্ধে লড়ছে এবং হিটলারের নেতৃত্বে পুনর্গঠিত হচ্ছে।

বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্র-বিশেষজ্ঞ ডেভিড বোর্ডওয়েল বলেছিলেন, ‘হিটলার সিনেমার ভক্ত ছিলেন; তিনি অভিনেতা ও নির্মাতাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতেন এবং রাতের খাবারের পর প্রায়ই সিনেমা দেখতেন।’ হিটলার এমনকি ফ্রিটজ ল্যাংকে নাৎসি চলচ্চিত্র তত্ত্বাবধানের একটা সংস্থার দায়িত্ব দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ল্যাং শেষ পর্যন্ত ইহুদি মা থাকার কারণে আমেরিকায় পালিয়ে যান।

লেনি রিফেনস্টাহল ছিলেন নাৎসি আদর্শে উৎসাহী পরিচালক ‘ডার সিগ দেস গ্লাউবেনস’ (১৯৩৩) নির্মাণের সুযোগ পেয়ে প্রচারমুখী চলচ্চিত্র বানান।হিটলারের পছন্দে তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তবে ফিল্ম কমিশনের দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে গোয়েবলস-রিফেনস্টাহল দ্বন্দ্ব শুরু হয়। পরে ১৯৩৪-এর নুরেমবার্গ সমাবেশের ওপর ভিত্তি করে বানান বিখ্যাত ‘ট্রায়াম্ফ দেস উইলেন্স’। রিফেনস্টাহল ১৯৩৫ সালে ২৮ মিনিটের সৈনিকদের নিয়ে আরেকটি ছবি বানান। ১৯৩৬-এ বার্লিন অলিম্পিকের ওপর নির্মাণ করেন অলিম্পিয়া—যা পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক প্রচারও পায়। ১৯৩৯ সালে রিফেনস্টাহলকে যুদ্ধ-সংবাদদাতা হিসেবে পোল্যান্ড পাঠানো হয়। ওয়ারশ যুদ্ধ ও বিজয়ের দৃশ্য ধারণ করেন, পরে নাৎসিদের কার্যকলাপে বিরক্ত হয়ে সে সম্পর্ক ছিন্ন করেন ও যুদ্ধের শেষদিকে আমেরিকায় চলে যান।

‘ট্রায়াম্ফ দেস উইলেন্স’-এ রিফেনস্টাহল হিটলারের ব্যক্তিত্ব, নেতা হিসেবে মহানতা ও জনতার আবেগ ফুটিয়ে তুলেছেন লো ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল ও আলোর ব্যবহারে সমাবেশের মধ্যে তাঁকে একমাত্র প্রভাবশালী ব্যক্তি বলেই উপস্থাপন করেছেন। হিটলার বিড়ালকে স্নেহ করছেন, আদর্শ সমাজের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন এমন চিত্র বারবার ফুটে ওঠে। চলচ্চিত্রে শ্রেণিহীন, জাতিভেদহীন এক জার্মানির স্বপ্ন ঘন ঘন পুনরাবৃত্ত, তবে আসলে বাস্তবে তা ছিল সম্পূর্ণ খণ্ডিত এক বিভাজিত সমাজ।

নাৎসি শাসন জনগণের মধ্যে নিষ্ঠুর শ্রেণিবিভাজন, জাতিগত ঘৃণা, ইহুদি নিধন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ছড়িয়ে দেয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ‘মাস্টার রেস’ তৈরির অজুহাতে নানা জাতিগোষ্ঠীকে নিঃশেষ করা। শিল্পের লক্ষ্য মানবিকতা বিকাশ, কিন্তু নাৎসি শাসনের ফ্যাসিবাদ শিল্পকেও নিয়ন্ত্রণে আনে, মিথ্যা প্রচার আর বিভাজনের হাতিয়ার বানায়, শিল্পীর স্বাধীনতাকেও গ্রাস করে ফেলে।

ম্যাজিক রিয়ালিজম – লাতিন আমেরিকার সাহিত্যিক বিস্ময়

“বাস্তবতা এতটাই অবিশ্বাস্য, যে কখনও কখনও কল্পনাই বেশি সত্য।” — গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস। এই বাক্য দিয়ে শুরু করলে ভুল হয় না, কারণ লাতিন আমেরিকান সাহিত্যের যে ধারাটি পৃথিবীর সাহিত্য মানচিত্রে এক নতুন মাত্রা এনে দেয়, তা হলো ম্যাজিক রিয়ালিজম। বাস্তবতার অজস্র ছিদ্র দিয়ে সেখানে ঢুকে পড়ে অলৌকিক, অতীত হয়ে ওঠে ভবিষ্যতের ছায়া, আর সমাজজীবনের গভীর রক্তক্ষরণ প্রকাশ পায় রূপক ও স্বপ্নের ভাষায়। পাঠকের কাছে এই অলৌকিকতা নতুন নয়, বরং তা যেন জীবনেরই এক রূপ, যা দিনের আলোতে অদৃশ্য থাকে।

‘ম্যাজিক রিয়ালিজম’ (Magical Realism) শব্দবন্ধটির প্রথম ব্যবহার হয় চিত্রকলার ক্ষেত্রে। ১৯২৫ সালে জার্মান সমালোচক ফ্রানৎস রো তার প্রবন্ধে এই শব্দ ব্যবহার করেন। তবে সাহিত্যিক পরিসরে, বিশেষত লাতিন আমেরিকার সাহিত্যে ১৯৪০–৭০-এর দশকে এটি এক বিপ্লবী কৌশল হয়ে ওঠে । ঔপনিবেশিকতা, সামাজিক বৈষম্য, রাজনীতি, আদিবাসী চেতনা ও ক্যাথলিক বিশ্বাস এই সবকিছুর সহাবস্থানে গড়ে ওঠা এক জটিল বাস্তবতা, লাতিন আমেরিকার মানুষের কাছে স্বাভাবিক বাস্তবতাই ছিল অলৌকিকতায় ভরা। এই অঞ্চলের লেখকরা বুঝেছিলেন, পশ্চিমা বাস্তবতাবাদ দিয়ে তাঁদের অভিজ্ঞতা বোঝানো সম্ভব নয়। তাই তাঁরা এমন এক ভাষা ও ন্যারেটিভ নির্মাণ করলেন, যেখানে ইতিহাস ও মিথ, দুঃস্বপ্ন ও রাজনীতি একসাথে কথা বলে।

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস এই ধারার সবচেয়ে বিখ্যাত ও প্রভাবশালী নাম। তাঁর One Hundred Years of Solitude উপন্যাসে ‘ম্যাকন্ডো’ নামের কল্পিত শহরটি কেবল একটি স্থান নয় বরং এক ঐতিহাসিক চেতনা, যেখানে পরিবার, রাজনীতি, সাম্রাজ্যবাদ ও স্মৃতির ধাঁধা একে অন্যকে গ্রাস করে।একটি জায়গায় বৃষ্টির মতো হলুদ ফুল ঝরে পড়ে আকাশ থেকে, মৃত মানুষদের আত্মা হাঁটে ঘরে ঘরে, এক বৃদ্ধা আকাশে উড়ে যান কিন্তু লেখকের ভাষা এতটাই সংযত ও প্রাকৃতিক যে পাঠক এসবকে অবিশ্বাস করেন না।

তাঁর Chronicle of a Death Foretold উপন্যাসে হত্যার পূর্বাভাস থাকা সত্ত্বেও কেউ কিছু করতে পারে না, এই নির্লিপ্ততা যেন ভবিতব্যের অলৌকিক ভীতি। তিনি বারবার আমাদের দেখান, ইতিহাস শুধু ঘটনার নয়, বরং স্মৃতির, ব্যাখ্যার, এবং কখনো কখনো কল্পনারও বিষয়।

হোর্হে লুই বোর্হেস ম্যাজিক রিয়ালিজমকে নিয়ে যান আরও বিমূর্ত, দার্শনিক ও জটিল মাত্রায়। তাঁর গল্পে সময় বৃত্তাকার, বাস্তবতা অসীম এবং ব্যক্তি আসলে একটি প্রতিফলিত ধারণা। “The Library of Babel” নামক গল্পে তিনি এমন একটি লাইব্রেরির কথা বলেন, যেখানে পৃথিবীর সব সম্ভাব্য বই একত্র আছে যার মধ্যে আছে ঈশ্বরের অস্তিত্বপ্রমাণ, ভবিষ্যতের ইতিহাস, এমনকি নিজস্ব মৃত্যুর বর্ণনা। এটি কল্পনা হলেও, সেখানে গভীর দার্শনিক প্রশ্ন লুকিয়ে, জ্ঞান কি আদৌ সীমাহীন? নাকি সীমাহীন জ্ঞানের মানে হারিয়ে যায়? বোর্হেসের গল্পে ম্যাজিক রিয়ালিজম এমনভাবে মিশে আছে যে পাঠক বাস্তবতা নিয়েই সন্দিহান হয়ে পড়ে।

চিলিয়ান লেখিকা ইসাবেল আয়েন্দে তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস The House of the Spirits-এ ম্যাজিক রিয়ালিজমকে নারীর দৃষ্টিভঙ্গি ও পারিবারিক ইতিহাসের সঙ্গে মিশিয়েছেন। তাঁর নারীকেন্দ্রিক ভাষ্য, রাজনৈতিক পটভূমি ও পারিবারিক অলৌকিকতা এক জটিল রূপ নেয়। এখানে পূর্বপুরুষদের আত্মা গল্প বলেন, ভবিষ্যৎদর্শী চরিত্ররা বিপ্লবের গন্ধ পান, মৃতরা চলে না বরং থেকে যান। এই সব অলৌকিকতা কোনো অদ্ভুত ঘটনা নয়; বরং তা বিশ্বাস, সংহতি, বংশগত ট্রমা ও রুখে দাঁড়ানোর এক প্রতীক। আয়েন্দের লেখা বোঝায় অলৌকিকতাকে নারীর অভিজ্ঞতা, ইতিহাস ও স্বপ্নের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করা যায়, যেটি দীর্ঘদিন সাহিত্যে উপেক্ষিত ছিল।

কেন এই সাহিত্য আজও আমাদের টানে?
ম্যাজিক রিয়ালিজম শুধু এক সাহিত্যিক স্টাইল নয়, এটিও এক দৃষ্টিভঙ্গি। এর ভেতর দিয়ে লেখকরা এমন সত্য বলেন, যা বাস্তববাদের গণ্ডিতে বলা যেত না। যখন সমাজ স্তব্ধ, রাষ্ট্র ভীতিপ্রদ, ইতিহাস বিকৃত, তখন স্বপ্নই হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ভাষা। পাঠক এই সাহিত্য পড়েন যেমন মুগ্ধ হয়, তেমনি চিন্তিত হয়। কারণ এখানে জীবনের সবচেয়ে অবাস্তব ঘটনাও হয়ে যায় বিশ্বাসযোগ্য। ম্যাজিক রিয়ালিজম পাঠককে চমকে না দিয়ে ধীরে ধীরে ঘুম ভাঙায়, তাকে বাস্তবতাকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়।

লাতিন আমেরিকান ম্যাজিক রিয়ালিজম আমাদের শেখায় জীবন শুধু যান্ত্রিক ঘটনার সমষ্টি নয় বরং এতে আছে স্মৃতি, মিথ, অলৌকিকতা ও মনের অভ্যন্তরীণ জগত। গার্সিয়া মার্কেস, বোর্হেস, আয়েন্দে তাঁরা সবাই এক ভাষায় বলেছেন, আমরা যা দেখছি তার বাইরেও বাস্তবতা আছে। সেই বাস্তবতা কখনো স্বপ্নের মতো, কখনো ভয়ের মতো, কখনো নিরবতার মতো গভীর।

এই সাহিত্যের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এটি একেবারে নিজের মতো। এটি পশ্চিমা বাস্তববাদের অনুবর্তী নয় বরং এক স্বাধীন কল্পনাশক্তির ঘোষণা।লাতিন আমেরিকার ইতিহাস, জনজীবন ও সংস্কৃতি এই ধারাকে জন্ম দিয়েছে, আর সেই জন্ম এখন বিশ্বসাহিত্যের প্রাতিষ্ঠানিক পরিধি ছাপিয়ে স্বতন্ত্র চেতনায় রূপ নিয়েছে।