হিটলার এক রাতে ছদ্মবেশে বার্লিনের অভিজাত সিনেমাহলে গেলেন। উদ্দেশ্য সিনেমা দেখা নয়, মধ্যবিরতির সময় পর্দায় তাঁর ছবি ভেসে উঠলে সবাই দাঁড়িয়ে সম্মান করছে কি না, তা যাচাই করা। সবাই দাঁড়িয়ে হিটলারের জয়ধ্বনি দিলেও হিটলার নিজে দাঁড়ালেন না। পাশের একজন বললেন, ‘দাঁড়িয়ে যাও ভাই, না হলে হিটলার আর তার দল তোমাকে বিপদে ফেলবে।’ এই কৌতুকের আড়ালে সত্যি কিছু লুকিয়ে আছে। হিটলার গোপনে যাচাই করতেন মানুষ তাঁর গুণকীর্তন করছে কি না, যারা করতেন না তাদের কঠোর শাস্তি হত। সিনেমাকেও তিনি প্রচারমাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতেন।
১৯২৭ থেকে ১৯৪৫ পর্যন্ত জার্মানির সিনেমা রাজনৈতিক পরিবেশের দ্বারা অত্যন্ত প্রভাবিত হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর ভার্সাই চুক্তির কারণে জার্মানি মারাত্মক অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ে। হিটলার ক্ষমতা গ্রহণের পর জাতীয় ঐক্যের ডাক দেন। ক্ষুধা-দারিদ্র্য আর ভঙ্গুর অর্থনীতির সময়ে জনগণ তার ডাকে সাড়া দেয়। পরে হিটলার একনায়কতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদী সরকার গঠন করে এবং দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, বিচারব্যবস্থা, শিল্প-সাহিত্যসহ সব কিছুই নিজের নিয়ন্ত্রণে আনেন।
হিটলারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন জোসেফ গোয়েবলস, প্রচার বা প্রোপাগান্ডা মন্ত্রকের প্রধান। হিটলার বিশ্বাস করতেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশরা প্রচারণায় এগিয়ে থাকার জন্য জয়ী হয়েছিল। তাই গোয়েবলসের ওপর মিথ্যা প্রচারণার দায়িত্ব পড়ে। গোয়েবলস জনপ্রিয় করে তোলেন রেডিও, বিনামূল্যে প্রতিটি নাগরিকের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেন ‘সরকারি’ রেডিও, যাতে শুধুমাত্র হিটলারের ভাষণই শোনা যায়।
তাঁর বিখ্যাত উক্তি—‘একটি বড় মিথ্যাকে বারবার বললে মানুষ এক সময় সেটাকে সত্য ভাববে।’ এই নীতির ভিত্তিতে গোয়েবলস প্রচারণা চালিয়ে যান।ইহুদি নিধন চলাকালে হিটলারকেই জার্মান জাতির ত্রাণকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন এবং জনগণকে সেই প্রচারণা বারবার শুনিয়ে বিশ্বাস করান।
হিটলারের সাফল্যগাথাই আলোচনা-প্রচারণায় প্রাধান্য পেত, ইহুদি নিধনকে আড়াল করা হতো। গোয়েবলসের তত্ত্বাবধানে প্রোপাগান্ডা মন্ত্রকের অধীনে জার্মান চলচ্চিত্র শিল্প পরিণত হয় প্রচারমাধ্যমে। নাৎসি পার্টির এই দুই শীর্ষ নেতাই সিনেমার শক্তিকেও কাজে লাগিয়েছেন। কমিউনিজম-ঘৃণাকারী গোয়েবলসও আইজেনস্টাইনের ‘পটেমকিন’ দেখে অনুপ্রাণিত হন, কারণ এর দৃশ্যশক্তিতে প্রচারকে আরও কার্যকর মনে করেন। তিনি নাৎসি ধ্যানধারণা প্রচারের জন্য উদ্যমী পরিচালকদের দিয়ে নানা সিনেমা তৈরি করান, যা মূলত নাৎসি বাহিনীর প্রচারেই ব্যবহৃত হতো।
বিশেষভাবে দুটি সিনেমা উল্লেখযোগ্য ফ্রিটজ ল্যাং এর ‘মেট্রোপলিস’ (১৯২৭) এবং লেনি রিফেনস্টাহল-এর ‘ট্রায়াম্ফ দেস উইলেন্স’ (১৯৩৫)। প্রথমটি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিভিত্তিক, যেখানে প্রান্তিক মানুষের ডাক ও বিদ্রোহ উঠে এসেছে। দ্বিতীয়টিতে রিফেনস্টাহল দেখান, জার্মানি আন্তর্জাতিক শোষণের বিরুদ্ধে লড়ছে এবং হিটলারের নেতৃত্বে পুনর্গঠিত হচ্ছে।
বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্র-বিশেষজ্ঞ ডেভিড বোর্ডওয়েল বলেছিলেন, ‘হিটলার সিনেমার ভক্ত ছিলেন; তিনি অভিনেতা ও নির্মাতাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতেন এবং রাতের খাবারের পর প্রায়ই সিনেমা দেখতেন।’ হিটলার এমনকি ফ্রিটজ ল্যাংকে নাৎসি চলচ্চিত্র তত্ত্বাবধানের একটা সংস্থার দায়িত্ব দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ল্যাং শেষ পর্যন্ত ইহুদি মা থাকার কারণে আমেরিকায় পালিয়ে যান।
লেনি রিফেনস্টাহল ছিলেন নাৎসি আদর্শে উৎসাহী পরিচালক ‘ডার সিগ দেস গ্লাউবেনস’ (১৯৩৩) নির্মাণের সুযোগ পেয়ে প্রচারমুখী চলচ্চিত্র বানান।হিটলারের পছন্দে তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তবে ফিল্ম কমিশনের দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে গোয়েবলস-রিফেনস্টাহল দ্বন্দ্ব শুরু হয়। পরে ১৯৩৪-এর নুরেমবার্গ সমাবেশের ওপর ভিত্তি করে বানান বিখ্যাত ‘ট্রায়াম্ফ দেস উইলেন্স’। রিফেনস্টাহল ১৯৩৫ সালে ২৮ মিনিটের সৈনিকদের নিয়ে আরেকটি ছবি বানান। ১৯৩৬-এ বার্লিন অলিম্পিকের ওপর নির্মাণ করেন অলিম্পিয়া—যা পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক প্রচারও পায়। ১৯৩৯ সালে রিফেনস্টাহলকে যুদ্ধ-সংবাদদাতা হিসেবে পোল্যান্ড পাঠানো হয়। ওয়ারশ যুদ্ধ ও বিজয়ের দৃশ্য ধারণ করেন, পরে নাৎসিদের কার্যকলাপে বিরক্ত হয়ে সে সম্পর্ক ছিন্ন করেন ও যুদ্ধের শেষদিকে আমেরিকায় চলে যান।
‘ট্রায়াম্ফ দেস উইলেন্স’-এ রিফেনস্টাহল হিটলারের ব্যক্তিত্ব, নেতা হিসেবে মহানতা ও জনতার আবেগ ফুটিয়ে তুলেছেন লো ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল ও আলোর ব্যবহারে সমাবেশের মধ্যে তাঁকে একমাত্র প্রভাবশালী ব্যক্তি বলেই উপস্থাপন করেছেন। হিটলার বিড়ালকে স্নেহ করছেন, আদর্শ সমাজের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন এমন চিত্র বারবার ফুটে ওঠে। চলচ্চিত্রে শ্রেণিহীন, জাতিভেদহীন এক জার্মানির স্বপ্ন ঘন ঘন পুনরাবৃত্ত, তবে আসলে বাস্তবে তা ছিল সম্পূর্ণ খণ্ডিত এক বিভাজিত সমাজ।
নাৎসি শাসন জনগণের মধ্যে নিষ্ঠুর শ্রেণিবিভাজন, জাতিগত ঘৃণা, ইহুদি নিধন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ছড়িয়ে দেয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ‘মাস্টার রেস’ তৈরির অজুহাতে নানা জাতিগোষ্ঠীকে নিঃশেষ করা। শিল্পের লক্ষ্য মানবিকতা বিকাশ, কিন্তু নাৎসি শাসনের ফ্যাসিবাদ শিল্পকেও নিয়ন্ত্রণে আনে, মিথ্যা প্রচার আর বিভাজনের হাতিয়ার বানায়, শিল্পীর স্বাধীনতাকেও গ্রাস করে ফেলে।


