Home Blog Page 50

Stalker এমন একজন, যে বিশ্বাস করে মানুষকে সুখী করা যায় শুধু বিশ্বাস দিয়ে : আন্দ্রেই তারকোভস্কি

গুয়ারা: “স্টকার” শব্দটার মানে কী?

তারকোভস্কি: এই শব্দটা এসেছে ইংরেজি “to stalk” ক্রিয়াটি থেকে, যার মানে গোপনে, নিঃশব্দে কারো পেছনে যাওয়া। আমাদের ছবিতে ‘স্টকার’ বলতে এমন একজন পেশাদারকে বোঝায়, যে একটি নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ করে নির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্যে। ঠিক যেন একজন গ্যাংস্টার, পাচারকারী বা চোরাকারবারির মতো। এটি এক ধরনের উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত পেশা।

আমার মনে হয়, দর্শকদের এমনকি ভাবা উচিত, আদৌ অন্য কোনো স্টকার আছে কিনা, বা সত্যিই এমন কোনো ‘জোন’ আছে কিনা। হতে পারে, যেখানে ইচ্ছেপূরণ হয় এমন কোনো কক্ষ (room) আদৌ নেই সেটা হয়তো একটা রূপকথা, একটা ঠাট্টা, অথবা পুরোপুরি স্টকারের কল্পনা। এসব প্রশ্নের উত্তর ইচ্ছাকৃতভাবে ছবিতে স্পষ্ট করা হয়নি।

এ ছবিতে ‘রুম’ নামের যে জায়গায় মানুষ তাদের গোপন আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারে তা আসলে শুধু একটি বাহানা। মূলত এটা তিনটি চরিত্রের ভেতরের জগত উন্মোচনের মাধ্যম।

আপনার স্টকার চরিত্রটা কেমন?

তিনি একজন একদম সৎ মানুষ, নির্মল এবং বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে নিষ্পাপ। তাঁর স্ত্রী তাকে আশীর্বাদধন্য বলে। তিনি মানুষকে জোনে নিয়ে যান “তাদের সুখী করার জন্য” এটাই তাঁর বিশ্বাস। নিঃস্বার্থভাবে নিজেকে পুরোপুরি এই দায়িত্বে সঁপে দেন তিনি। মনে করেন, এটাই মানুষের সুখের একমাত্র পথ। তিনি এক অর্থে শেষ আদর্শবাদীর মতো যিনি বিশ্বাস করেন যে মানুষের ইচ্ছাশক্তি বা প্রয়াস ছাড়াও প্রকৃত সুখ পাওয়া সম্ভব। এই পেশাই তাঁর জীবনের একমাত্র মানে।

একজন পুরোহিত যেমন উপাসনালয়ে লোকজনকে নিয়ে যান, স্টকার তেমনি করে মানুষকে জোনে নিয়ে যান যাতে তারা সুখী হতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই পথযাত্রায়, যাঁদের তিনি পথ দেখান, তাঁদের প্রভাবে তিনি নিজেই নিজের বিশ্বাস হারান।

তিনি আর বিশ্বাস রাখতে পারেন না যে সত্যিই কেউ সুখী হয়, বা কেউ সত্যিকারের বিশ্বাস নিয়ে ‘রুম’-এর মুখোমুখি হয়। শেষ পর্যন্ত, তিনি ফিরে যান সেই একটিমাত্র বিশ্বাসে,সুখের ধারণা মানুষের নিঃস্বার্থ আস্থা দিয়ে পাওয়া ।

এই ছবির ধারণা কীভাবে এলো?

এই প্রশ্নটা অনেকেই করেন। কিন্তু বলতে গেলে, আমার ছবির ধারণা আসাটা খুবই সাধারণ, একঘেয়ে, ধাপে ধাপে ঘটে। কোনো নাটকীয়তা নেই, কোনো রোমাঞ্চকর মুহূর্ত নেই। ইংমার বার্গম্যান একবার বলেছিলেন, একটা রশ্মি মেঝেতে পড়তে দেখে হঠাৎ এক সিনেমার ভাবনা এসেছিল তাঁর মাথায়। আমার ক্ষেত্রে তা হয়নি। হয়তো কোনো ছবি হঠাৎ আসে, কিন্তু সময়ের সঙ্গে তা বদলে যায় স্বপ্নের মতোই। শেষে একদম অচেনা, ভিন্ন কিছুতে রূপ নেয়।

তাহলে “স্টকার”-এর পেছনে কোনো গল্প আছে?

একসময় আমি আমার বন্ধু পরিচালক জর্জি কালাতোজিশভিলিকে “রোডসাইড পিকনিক” উপন্যাসটা পড়ার পরামর্শ দিই। ভাবলাম হয়তো উনি এটা নিয়ে ছবি বানাতে পারবেন। কিন্তু পরে কোনো এক কারণে উনি লেখকদের সঙ্গে বোঝাপড়ায় আসতে পারেননি। তখন উনি কাজটা ছেড়ে দেন। মাঝে মাঝে সেই ধারণাটা আমার মাথায় ফিরে আসতে থাকে। একসময় মনে হতে থাকে, এই উপন্যাস থেকে একটি সংহত, একক স্থান-কাল-কর্মের ভিত্তিতে সিনেমা করা সম্ভব। এই আরিস্টটেলীয় একতাগুলোর মাধ্যমে আমি মনে করতাম, সত্যিকারের সিনেমা সম্ভব। অ্যাকশন বা বাহ্যিক নাটকীয়তা নয়, বরং এই মাধ্যমে সমকালীন বুদ্ধিজীবীর অবস্থান ও দর্শন তুলে ধরা যায়। যদিও ছবির চিত্রনাট্যে “রোডসাইড পিকনিক” থেকে মাত্র দুটি শব্দ নেওয়া হয়েছে “স্টকার” এবং “জোন”।

এই ছবিতে কোনো আত্মজৈবনিক ব্যাপার আছে?
হয়তো “মিরর”-এর চেয়েও বেশি। “স্টকার” এ আমি এমন কিছু অনুভূতি ও স্মৃতি ব্যবহার করেছি যা একান্তই ব্যক্তিগত। যেমন লেখক চরিত্রটির কিছু আচরণে আমার নিজের কথা মনে পড়ে যায়। অভিনেতা সোলোনিৎসিন আমার নির্দেশ খুব মনোযোগ দিয়ে অনুসরণ করেছিলেন। তাঁর কিছু মুখভঙ্গি, কথার ভঙ্গিমা, আচরণে আমি নিজের ছায়া দেখতে পাই। যদিও আমি লেখক চরিত্রটিকে খুব পছন্দ করি না।

আপনি কাকে সবচেয়ে বেশি সহানুভূতি দেখান?

নিশ্চয়ই স্টকারকে। মনে হয় যেন ও আমার ভাই। হয়তো হারিয়ে যাওয়া ভাই, কিন্তু ভাই-ই। আমি ওর মানসিক দ্বন্দ্ব, জীবনের প্রতি ওর অভিমান, সবটা গভীরভাবে অনুভব করি। চিত্রনাট্যে লেখক বা বিজ্ঞানীর মতোই স্টকারও একজন শিক্ষিত, গভীরভাবে সংবেদনশীল মানুষ, যদিও সে এক ধরনের সমাজবহির্ভূত। শুরু থেকেই আমার ইচ্ছে ছিল ছবির শেষে এমন একটা জায়গায় হঠাৎ একটা বিশাল বইয়ের তাক দেখা যাবে যেটা পরিবেশের সঙ্গে একদম অসঙ্গত। এমন একটা বইয়ের তাক আমি নিজে কখনো পাইনি। স্টকার যেভাবে এলোমেলোভাবে বইগুলো রাখে, আমিও সেভাবেই চাই।

“স্টকার”-এর পর নতুন কোনো ছবির কথা ভাবছেন?

হ্যাঁ, আমরা “ভয়েজ টু ইতালি” নামে একটা ছবি করতে চাই। আপনি (গুয়ারা) এ বিষয়ে আমার চেয়ে ভালো বলতে পারবেন। আমরা এমন একটা ছবি বানাতে চাই, যা একঘেয়ে ও বাণিজ্যিক হবে না। এতে হয়তো কিছু পুরনো দর্শক হারাবো, কিন্তু নতুন, ভিন্ন ধরনের দর্শক পাবো।

আপনি কি সিনেমা বানানোর পদ্ধতি বদলাতে চাইছেন?
হ্যাঁ, চাই। যদিও এখনো জানি না কীভাবে। ইচ্ছে করে একদম স্বাধীনভাবে, অপেশাদারদের মতো করে একটা ছবি বানাতে যেখানে বড় বাজেট নেই, কোনো চাপে নেই। শুধু প্রকৃতি আর মানুষকে দেখব, আর তার থেকেই গল্প আসবে। কোনো পূর্ব পরিকল্পনা বা নির্দিষ্ট দৃশ্যের বাধ্যবাধকতা থাকবে না। ছোট ক্যামেরা দিয়ে শুট করা, লাইট বা নির্দিষ্ট অভিনেতার উপর নির্ভরতা ছাড়াই এমন একটি মুক্ত কাজের অভিজ্ঞতা আমাকে হয়তো আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে।

অসম্পূর্ণতার এক মহিমান্বিত প্রতীক লিওনার্দো দা ভিঞ্চি : আলেকজান্ডার হোপ, প্রাক্তন পরিচালক, ক্রিস্টিজ

২০১৯ সালের ২ মে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির মৃত্যুর ৫০০ বছর পূর্ণ হলো। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অসংখ্য সমালোচক তাকে সব শিল্পীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। লিওনার্দো নিজেও হয়তো এ দাবির সঙ্গে দ্বিমত করতেন না।

২০১৭ সালে তার ‘সালভাতোর মুন্দি’ চিত্রকর্মটি কিনে নেওয়া হয় ৩৪৫ মিলিয়ন পাউন্ডে, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ দামে কেনা শিল্পকর্ম। যদিও এর অবস্থা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে এবং অনেকে এর আসলেই লিওনার্দোর চিত্র কিনা, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।

তবুও লুভর যেভাবে এই চিত্রকর্মটিকে তাদের আসন্ন লিওনার্দো প্রদর্শনীতে রাখার ঘোষণা দিয়েছে, তা এসব সমালোচকদের অবস্থানকে দুর্বল করে।বিখ্যাত শিল্প আবিষ্কারের পেছনে বিপুল অর্থ জড়িয়ে থাকলে তা নিয়ে সংশয়ের ঐতিহ্য রয়েছে। যেমন রুবেনসের ‘স্যামসন ও ডেলাইলা’-এর ক্ষেত্রেও সমালোচনা থেমে থাকেনি।

অবশ্য “সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পী” বা “সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম” বলে আদতে কিছুই নেই। তবুও লিওনার্দো যে ইতিহাসের মহান শিল্পীদের একজন, তা অস্বীকার করা কঠিন। আর ‘মোনালিসা’ আজও সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত চিত্রকর্ম। বিস্ময়করভাবে বহু সমালোচনার যুগেও লিওনার্দোর খ্যাতি কখনো কলুষিত হয়নি।

ফ্রান্সের রাজা ফ্রাঁসোয়া প্রথম বলেছিলেন, “লিওনার্দোর মতো আর কেউ জন্মায়নি, শিল্পে যেমন, দর্শনেও তেমন।” গিয়র্জিও ভাসারি লিখেছিলেন, “মাঝেমধ্যে প্রকৃতি এমন এক সৌন্দর্য, সৌজন্য ও প্রতিভার সমাহার সৃষ্টি করে যা স্বর্গীয় মনে হয়। লিওনার্দো তেমনই এক অলৌকিক সৃষ্টি।”

আর্নস্ট গমব্রিচ বলেছিলেন, “মানবজ্ঞান এমন কোনো ক্ষেত্র ছিল না যেখানে লিওনার্দোর ছোঁয়া পৌঁছেনি। শারীরবিদ্যা, প্রাণিবিদ্যা, যান্ত্রিক প্রকৌশল, জলবিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা, আলোকবিদ্যা সবই তার দ্বারা রূপান্তরিত হয়েছিল। এমন বিস্ময়কর প্রতিভা বিরল।”

তবে একটি সীমাবদ্ধতা ছিল যা লিওনার্দো কখনো অতিক্রম করতে পারেননি, অপূর্ণতা ও অনির্ভরযোগ্যতা। তার মন এত বিস্তৃত ছিল যে এক বিষয়ের গভীরে ঢোকার আগেই নতুন কিছুর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়তেন। অনেক কিছু পরিকল্পনা করতেন, কিন্তু খুব কমই শেষ করতেন।

ভাসারি লিখেছিলেন, “লিওনার্দো বহু কিছু শুরু করতেন, কিন্তু শেষ করতেন না। কারণ তিনি এমন এক উৎকর্ষ কল্পনা করতেন যা বাস্তবে হাত দিয়ে রূপ দেওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল।”

যেমন আজ ফাইন আর্ট আর অ্যাপ্লায়েড আর্টের সীমারেখা মুছে গেছে, রেনেসাঁ যুগের শিল্পীরাও শুধু চিত্র বা ভাস্কর্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন না। লিওনার্দো নিজেও মিলানের ডিউক লুডোভিকো স্পোর্জার দরবারে চাকরি চেয়েছিলেন সৈন্যবাহিনীর উন্নয়নের পরিকল্পনার মাধ্যমে, শিল্পী পরিচয়টা যেন ছিল শুধু বাড়তি যোগ।

তবে লিওনার্দো ছিলেন রাজদরবারের এক অলঙ্কার। তার সৌন্দর্য, শিষ্টাচার ও বুদ্ধিমত্তা সেই সময়েও প্রশংসিত হয়েছিল। ফলে ছবি আঁকার সময় হয়তো তার হাতে খুব কমই ছিল।

এবং যতগুলো ছবি তিনি একেছেন, তার অনেকগুলোই অসম্পূর্ণ বা খারাপ অবস্থায়। ‘দ্য লাস্ট সাপার’ একইসাথে বিখ্যাত এবং দুর্ভাগ্যজনকতার উদাহরণ।লিওনার্দো রঙের নতুন ভঙ্গি প্রয়োগ করতে গিয়ে শুকনো দেয়ালে গ্লেজ ব্যবহার করেন, যা সময়ের সঙ্গে ভেঙে পড়ে এবং বহুবার দুর্বল রেস্টোরেশনের শিকার হয়।

তবুও এত সীমাবদ্ধতার মাঝেও তার প্রতিভা এমন যে তা অস্বীকার করা সম্ভব নয়। তার অসম্পূর্ণতা, তার ভগ্ন প্রতিশ্রুতি সবই এক আশ্চর্য আবেগময় জাদুতে মোড়া।

ভাসারি যেমন বলেছিলেন, লিওনার্দোর এই অসম্পূর্ণতা মনোযোগহীনতার জন্য নয়, বরং অতিমাত্রায় মনোযোগের জন্য। তার লেখাগুলো পড়লে বোঝা যায় তিনি একেক সময় একেক বিষয়ের প্রতি গভীর নিষ্ঠা দেখিয়েছেন। অপটিক্স, তরলবিদ্যা, ভূতত্ত্ব, শারীরবিদ্যা একটি বিশাল জগতকে তিনি নিজস্ব চোখে আবিষ্কার করতে চেয়েছেন। কিন্তু সেই জ্ঞানের ভারই যেন তাকে আটকে রেখেছে। চিত্রশিল্প একটি সংক্ষিপ্ত প্রকাশভঙ্গি, অথচ লিওনার্দো চেয়েছেন প্রতিটি আঁচড়ে জগৎকে বিশ্লেষণ করে ফুটিয়ে তুলতে। কিন্তু সেই চেষ্টা, মানুষের জন্য প্রায় অসম্ভব।

অনেকে তাকে রেনেসাঁর মানুষ বললেও, তিনি ছিলেন আত্ম-শিক্ষিত, লাতিন ভাষায় দুর্বল এবং প্রাচীন ক্লাসিক সাহিত্য নিয়ে আগ্রহহীন। তার বিজ্ঞানচর্চা ছিল অনেক বেশি মধ্যযুগীয় পণ্ডিতদের চিন্তায় প্রভাবিত।

শিল্পের ক্ষেত্রে অবশ্য তিনি রেনেসাঁর আত্মা ধারণ করেছিলেন। চার শতকের দার্শনিক, সাহিত্যিক ও বৈজ্ঞানিক বিতর্কের সম্মিলন, মধ্যযুগীয় রাজদরবার সংস্কৃতি ও জাতীয় চেতনার মিশ্রণে গড়া সেই সময়ের চূড়ান্ত রূপকার ছিলেন তিনি।

তার চিত্রভাষা যত জটিলই হোক তাতে ছিল এক অদ্বিতীয় শক্তি ও সূক্ষ্মতা। তার সেরা কাজের সৌন্দর্য এতটাই অনন্য যে তার শিষ্যরাও তা ধারণ করতে পারেননি। বরং তার প্রভাব অন্যদের কাজে আরও সূক্ষ্মভাবে প্রস্ফুটিত হয়েছে। রাফায়েলের ক্ষেত্রে লিওনার্দোর প্রভাব তাকে ছাপিয়ে না গিয়ে বরং সমৃদ্ধ করেছে, বিশেষ করে তার ‘আলবা মাদোন্না’ ছবিতে।

এই ছিল এক বিরল প্রতিভা, তবুও অপূর্ণতায় পূর্ণ। যেন গ্রিক ট্র্যাজেডির কোনো নায়কের মতো, লিওনার্দোর দুর্ভাগ্যের মূল কারণ তার অতিরিক্ত প্রতিভাই। সেই প্রতিভাই তার সামনে এমন এক উচ্চতা নির্মাণ করেছিল, যাকে ছুঁতে গিয়েই বারবার ব্যর্থতায় ফিরেছেন তিনি। তিনি হয়তো আদর্শ রেনেসাঁ পারসন’ ছিলেন না, কিন্তু শিল্পের জগতে তিনি এক গভীর ও সার্বজনীন মানবিকতার প্রতীক।

স্যালি রুনি – কেন আজকের জরুরী লেখক!

একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে ইংরেজি সাহিত্যের অঙ্গনে যে ক’জন তরুণ লেখক পাঠক ও সমালোচক উভয়ের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন, তাঁদের মধ্যে আইরিশ লেখিকা স্যালি রুনি নিঃসন্দেহে অন্যতম। তাঁর উপন্যাসগুলো বিশেষত ‘কনভারসেশনস উইথ ফ্রেন্ডস’ এবং ‘নরমাল পিপল’, আধুনিক প্রজন্মের জীবন, সম্পর্ক এবং সামাজিক জটিলতাগুলোকে এমন সূক্ষ্ম ও বাস্তবসম্মত ভঙ্গিমায় তুলে ধরেছে যে তা বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ পাঠকের সঙ্গে এক গভীর সংযোগ স্থাপন করতে পেরেছে। রুনি কেবল একজন গল্পকার নন, তিনি বর্তমান সমাজের মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার এক নিপুণ বিশ্লেষক।

রুনির লেখার মূল আকর্ষণ তাঁর চরিত্রগুলোর বাস্তবসম্মত উপস্থাপনা। তাঁর উপন্যাসের চরিত্রগুলো সাধারণত বুদ্ধিদীপ্ত, সংবেদনশীল এবং নিজেদের আবেগ ও আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে সচেতন। তবে একই সঙ্গে তারা দ্বিধাগ্রস্ত, আত্ম-সচেতনতার জালে আটকা পড়া এবং পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রায়শই ব্যর্থ। তাঁর চরিত্রগুলো প্রায়শই তাদের অনুভূতি প্রকাশে দ্বিধা করে, যা তাদের সম্পর্ককে আরও জটিল করে তোলে। এই নীরবতা এবং অব্যক্ততা রুনির লেখার একটি বৈশিষ্ট্য, যা আধুনিক মানুষের বিচ্ছিন্নতার এক গভীর চিত্র তুলে ধরে।

স্যালি রুনির প্রথম উপন্যাস ‘কনভারসেশনস উইথ ফ্রেন্ডস’ (২০১৭)। এই উপন্যাসটি ফ্রান্সেস নামের একজন তরুণী শিক্ষার্থীর দৃষ্টিকোণ থেকে বর্ণিত হয়েছে, যে তার প্রাক্তন প্রেমিকা ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু ববির সাথে একটি বিবাহিত দম্পতির (মেলিসা ও নিক) সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। উপন্যাসটি চতুর্মুখী সম্পর্কের জটিলতা, বন্ধুত্ব, প্রেম, শ্রেণিগত বিভাজন এবং যোগাযোগের ব্যর্থতাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। ফ্রান্সেসের আত্ম-সচেতনতা, তার শারীরিক অসুস্থতা এবং সম্পর্কের মধ্যে তার নিজস্ব অবস্থান খুঁজে পাওয়ার সংগ্রাম এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য।

রুনি এই উপন্যাসে দেখিয়েছেন কীভাবে আধুনিক তরুণ-তরুণীরা তাদের আবেগ প্রকাশে দ্বিধাগ্রস্ত হয় এবং সম্পর্কের মধ্যে নিজেদের জায়গা তৈরি করতে হিমশিম খায়। এটি মূলত মানসিক নৈকট্য এবং শারীরিক সম্পর্কের মধ্যেকার সূক্ষ্ম রেখাগুলো অন্বেষণ করে। এই উপন্যাসে রুনি দেখিয়েছেন কীভাবে আধুনিক সম্পর্কগুলো কেবল রোমান্টিক বা শারীরিক আকর্ষণ দ্বারা পরিচালিত হয় না, বরং বুদ্ধিবৃত্তিক সংযোগ এবং সামাজিক অবস্থানের মতো বিষয়গুলোও তাতে প্রভাব ফেলে।

তাঁর দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় উপন্যাস ‘নরমাল পিপল’ (২০১৮)। এটি মারিয়ানে শেরিডান এবং কনেল ওয়াল্ড্রন নামের দুই তরুণ-তরুণীর সম্পর্কের গল্প, যারা আয়ারল্যান্ডের একই ছোট শহর থেকে আসে কিন্তু ভিন্ন আর্থ-সামাজিক পটভূমির অধিকারী। মারিয়ানে একটি বিত্তশালী কিন্তু অকার্যকর পরিবারের মেয়ে এবং স্কুলে সামাজিকভাবে প্রান্তিক, অন্যদিকে কনেল জনপ্রিয় এবং মেধাবী শিক্ষার্থী যার মা একজন পরিচারিকা। উপন্যাসটি তাদের স্কুল জীবন থেকে শুরু করে ডাবলিন ট্রিনিটি কলেজে প্রবেশ এবং পরবর্তী জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের সম্পর্কের উত্থান-পতন, মানসিক টানাপোড়েন, শ্রেণিগত পার্থক্য এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সংকটকে তুলে ধরে।

রুনি এই উপন্যাসে দেখিয়েছেন কীভাবে অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক চাপ এবং ভুল বোঝাবুঝি তাদের গভীর ভালোবাসার সম্পর্ককে বারবার প্রভাবিত করে। ‘নরমাল পিপল’ আধুনিক সম্পর্কের জটিলতা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং পারস্পরিক নির্ভরতার এক গভীর চিত্রায়ন। এই উপন্যাসে রুনির অন্যতম শক্তিশালী দিক হলো, তিনি দেখান কীভাবে চরিত্রগুলো একে অপরের প্রতি গভীর অনুভূতি থাকা সত্ত্বেও, তাদের ভেতরের দ্বিধা এবং সমাজের চাপ তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে।

রুনির তৃতীয় উপন্যাস ‘বিউটিফুল ওয়ার্ল্ড, হোয়্যার আর ইউ’ (২০২১)। এই উপন্যাসে দুই বান্ধবী, এলিস, এইলিন এবং তাদের প্রেমিকদের (ফেলিক্স ও সাইমন) গল্প বলা হয়েছে। উপন্যাসটি তাদের ব্যক্তিগত জীবন, সম্পর্ক, যৌনতা এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয় নিয়ে তাদের ইমেইল আদান-প্রদানের মাধ্যমে এগিয়ে চলে। এখানেও রুনি আধুনিক জীবনের অস্থিরতা, শিল্প ও সাহিত্যের ভূমিকা এবং বিশ্বজুড়ে চলমান সংকট নিয়ে তরুণ প্রজন্মের ভাবনাকে তুলে ধরেছেন। এটি আগের উপন্যাসগুলোর মতোই সম্পর্ক, শ্রেণি এবং যোগাযোগের উপর জোর দেয়, তবে এটি আরও বেশি দার্শনিক এবং আত্ম-প্রতিফলনমূলক। এই উপন্যাসে রুনি কেবল ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়, বরং বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আধুনিক মানুষের অবস্থান এবং তাদের নৈতিক দ্বিধাগুলোকেও অন্বেষণ করেছেন।

রুনির বর্ণনাশৈলী তাঁর লেখার আরেকটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। তিনি সংক্ষিপ্ত, তীক্ষ্ণ এবং নিরাবেগ গদ্য ব্যবহার করেন, যা পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখে। তাঁর সংলাপগুলো অত্যন্ত বাস্তবসম্মত এবং প্রায়শই দ্রুতগতির, যা আধুনিক কথোপকথনের ছন্দকে প্রতিফলিত করে। তিনি চরিত্রের অভ্যন্তরীণ মনস্তত্ত্ব এবং চিন্তাভাবনাকে গুরুত্ব দেন, যা তাদের অনুভূতি এবং অনুপ্রেরণা বুঝতে সাহায্য করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং ডিজিটাল যোগাযোগের প্রভাবও তাঁর লেখায় অত্যন্ত প্রাসঙ্গিকভাবে আসে। ইমেইল এবং মেসেজের মাধ্যমে যোগাযোগের যে নতুন মাত্রা তৈরি হয়েছে, তা তাঁর উপন্যাসে সম্পর্কের জটিলতা বাড়াতে বা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রুনির গদ্যের এই সরলতা এবং সরাসরি ভাব পাঠককে চরিত্রগুলোর কাছাকাছি নিয়ে আসে, তাদের মানসিক টানাপোড়েনকে আরও নিবিড়ভাবে অনুভব করতে সাহায্য করে।

সমালোচকরা রুনির লেখাকে ‘মিলেনিয়াল ফিকশন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, কারণ তিনি বর্তমান প্রজন্মের হতাশা, অস্থিরতা, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের জটিলতাগুলোকে অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সঙ্গে তুলে ধরেন। তাঁর উপন্যাসে যৌনতা, রাজনীতি, বন্ধুত্ব এবং ভালোবাসার মতো বিষয়গুলো খোলামেলাভাবে আলোচিত হয়, যা আধুনিক পাঠকের কাছে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি দেখান কীভাবে এই প্রজন্মের তরুণরা সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে নিজেদের পরিচয় এবং উদ্দেশ্য খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। রুনির চরিত্রগুলো প্রায়শই নিজেদের রাজনৈতিক বিশ্বাস এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব নিয়ে লড়াই করে, যা বর্তমান তরুণ সমাজের এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি। তারা কেবল প্রেমের সম্পর্কেই নয়, বরং নিজেদের আদর্শ এবং মূল্যবোধের সাথেও এক ধরনের বোঝাপড়ার চেষ্টা করে।

রুনির লেখার কিছু সমালোচনাও রয়েছে। কেউ কেউ তাঁর চরিত্রগুলোকে অতিরিক্ত আত্ম-সচেতন বা ‘নেভেল-গেজিং’ বলে মনে করেন, যা কখনও কখনও গল্পের গতিকে মন্থর করে তোলে। আবার কিছু সমালোচক তাঁর উপন্যাসের বিষয়বস্তুর পুনরাবৃত্তি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন, যেখানে প্রায়শই একই ধরনের সম্পর্কগত জটিলতা এবং শ্রেণিগত বিভাজন ফিরে আসে। তবে এই সমালোচনা সত্ত্বেও, স্যালি রুনির সাহিত্যকর্ম আধুনিক ইংরেজি সাহিত্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

২০২০ সালে Normal People উপন্যাসটি Hulu ও BBC-এর যৌথ প্রযোজনায় সিরিজে রূপান্তরিত হয়। এই সিরিজটি তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। তাঁর উপন্যাসগুলো কেবল বেস্টসেলারই হয়নি, বরং সাহিত্যিক মহলেও ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে এবং বিভিন্ন পুরস্কার লাভ করেছে। ‘নরমাল পিপল’ উপন্যাসের সফল টেলিভিশন রূপান্তর তাঁর জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে তুলেছে । তাঁর কাজগুলো কেবল সাহিত্যিক মহলে নয়, বরং পপ সংস্কৃতিতেও একটি উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে, যা আধুনিক প্রজন্মের অনুভূতি এবং উদ্বেগকে মূলধারার আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

পরিশেষে বলা যায় স্যালি রুনি কেবল একজন সফল ঔপন্যাসিক নন, তিনি আধুনিক সমাজের একজন তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষক। তাঁর সাহিত্যের শক্তি এইখানেই যেখানে রাজনীতি, প্রেম, আত্মপরিচয় আর সমাজ একত্রে এক গভীর অনুভূতিময় ডকুমেন্ট হয়ে ওঠে। সাহিত্যের ক্লাসিক ধারা ও নতুন প্রজন্মের অভিজ্ঞতার মাঝে তিনি তৈরি করেছেন এক অনন্য সেতুবন্ধন।

বংশগত রোগ রোধে বৈপ্লবিক সাফল্য, ৩ জনের ডিএনএ নিয়ে আইভিএফ পদ্ধতিতে শিশুর জন্ম

বৃটিশ চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ৩ জন ব্যক্তির ডিএনএ ব্যবহার করে ইনভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (আইভিএফ) পদ্ধতিতে ৮টি সুস্থ শিশুর জন্ম দেয়া সম্ভব হয়েছে। এই অনন্য চিকিৎসা পদ্ধতির মূল লক্ষ্য ছিল মায়ের দেহে থাকা মাইটোকন্ড্রিয়াল জেনেটিক রোগ শিশুদের মধ্যে সঞ্চারিত হওয়া প্রতিরোধ করা।

এই আট শিশুর মধ্যে চারটি ছেলে ও চারটি মেয়ে। এর মধ্যে একটি যমজ জুটি রয়েছে। তাদের মায়েরা ছিলেন এমন ঝুঁকিপূর্ণ নারীদের তালিকায়, যাদের মাইটোকন্ড্রিয়ায় মারাত্মক জেনেটিক মিউটেশন ছিল। এই মিউটেশনযুক্ত মাইটোকন্ড্রিয়া সন্তানের মস্তিষ্ক, হৃদযন্ত্র ও পেশিকে ধীরে ধীরে অকার্যকর করে তোলে। অনেক শিশুর বয়স হবার আগেই মৃত্যু ঘটে। সারা বিশ্বে প্রায় ৫ হাজার নবজাতকের মধ্যে একজনের ক্ষেত্রে এ ধরনের রোগ দেখা যায়।

এই শিশুদের জন্ম হয়েছে নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটির একটি ফার্টিলিটি ক্লিনিকে। সেখানে এই পদ্ধতির পথিকৃৎ গবেষকরা দীর্ঘ দুই দশক ধরে কাজ করছেন। ২০১৫ সালে বৃটেন এই চিকিৎসা পদ্ধতির আইনগত অনুমোদন দেয় এবং ২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো লাইসেন্স দেয়।

মাইটোকন্ড্রিয়াল ডোনেশন ট্রিটমেন্ট (এমডিটি) নামের এই চিকিৎসায় প্রথমে মায়ের ডিম্বাণু এবং পিতার শুক্রাণু ব্যবহার করে নিষেক ঘটানো হয়।এরপর নিষিক্ত ডিম্বাণুর নিউক্লিয়াস (যেখানে মূল ২০,০০০টি জিন থাকে) একটি সুস্থ ডোনারের ডিম্বাণুতে প্রতিস্থাপন করা হয়, যার নিজস্ব নিউক্লিয়াস আগেই সরিয়ে নেয়া হয়।

ফলে তৈরি হয় এমন একটি নিষিক্ত ডিম্বাণু, যাতে থাকে মা-বাবার জেনেটিক তথ্য, তবে মাইটোকন্ড্রিয়া থাকে তৃতীয় ব্যক্তির – যিনি ডোনার। এই পদ্ধতিতে তৈরি ডিম্বাণু মায়ের গর্ভে প্রতিস্থাপন করা হলে গর্ভাবস্থা শুরু হয় এবং সন্তান জন্ম নেয় মায়ের জেনেটিক রোগ ছাড়াই।

এই আট শিশুর জন্ম ও স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বর্ণনা করা হয়েছে নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত দুটি গবেষণাপত্রে। শিশুরা জন্মের সময় সম্পূর্ণ সুস্থ ছিল।

এই সাফল্যের ফলে এখন সারা বিশ্বেই চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এমডিটি পদ্ধতির বিস্তারে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। শিশুদের জীবনের শুরুতেই মরণব্যাধি ঠেকিয়ে সুস্থ জীবন উপহার দেয়ার পথে এটি হতে পারে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

যুক্তরাজ্যের নিউ ক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা প্রথম এই চিকিৎসা-পদ্ধতিতে সাফল্যের দাবি করার পর ব্রিটিশ সরকারের অনুমতি চায়। ‘থ্রি-পারসনস বেবি’ নামে বহুল আলোচিত-সমালোচিত এই বিল শেষ পর্যন্ত হাউস অব কমন্সে গড়ায়। পরে ২০১৫ সালে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে যুক্তরাজ্যের আইনপ্রণেতারা এই পদ্ধতি প্রয়োগের অনুমোদন দেন।

তবে আইন পাস হলেও শুরুতে যুক্তরাজ্য এই পদ্ধতি প্রয়োগ করেনি। এ পদ্ধতিতে প্রথম শিশুর জন্ম হয় ২০১৬ সালে, যুক্তরাষ্ট্রে। যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা নেওয়া জর্ডানের একটি পরিবারে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রথম শিশুর জন্ম হয়।

মানুষের শরীরে থাকা ২০ হাজার জিনের বিশাল অংশই দেহের প্রায় প্রতিটি কোষের নিউক্লিয়াসে কুণ্ডলী পাকানো অবস্থায় থাকে। কিন্তু নিউক্লিয়াসকে ঘিরে থাকা তরলে শত থেকে হাজারো মাইটোকন্ড্রিয়া থাকে, যাদের আবার নিজস্ব ৩৭টি জিন সেট রয়েছে। এই জিনে মিউটেশন মাইটোকন্ড্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত বা সম্পূর্ণ অকার্যকর করে দিতে পারে, যা সন্তানদের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। মাইটোকন্ড্রিয়া হলো কোষের ভেতরের শক্তি-উৎপাদক ছোট অঙ্গানু, যা শুধু মায়ের কাছ থেকেই উত্তরাধিকারসূত্রে আসে।

উপনিবেশিক উত্তরাধিকার ও জাতিগত বিভাজনে – শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধ

দক্ষিণ এশিয়ার শান্তিপূর্ণ দ্বীপদেশ শ্রীলঙ্কা, যার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বৌদ্ধ ঐতিহ্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত, সেই রাষ্ট্রে এক সময় বাস্তবতা ছিল পুড়ে যাওয়া গ্রাম, আত্মঘাতী হামলা, মাইন বিস্ফোরণ ও সংঘর্ষে পরিপূর্ণ একটি সমাজ। ১৯৮৩ সাল থেকে শুরু হয়ে ২০০৯ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয় এক দীর্ঘ, রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ। এই যুদ্ধ ছিল জাতিগত বৈষম্য, সাংস্কৃতিক বঞ্চনা ও আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম থেকে উদ্ভূত, যা ক্রমে এক অস্ত্রধারী সংঘর্ষে রূপ নেয়।

শ্রীলঙ্কা ১৮১৫ সালে ব্রিটিশ শাসনের অধীনে আসে। ব্রিটিশ শাসকেরা প্রশাসনিক ও শিক্ষাব্যবস্থায় তুলনামূলকভাবে তামিলদের অগ্রাধিকার দিয়েছিল, কারণ তামিল জনগোষ্ঠী শিক্ষিত ছিল এবং দক্ষিণ ভারতের তামিল অভিবাসীরা চা বাগানেও কাজ করত। কিন্তু ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতার পর সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলি গোষ্ঠী রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় এবং একে একে এমন সব আইন প্রণয়ন শুরু করে যা তামিলদের প্রতি বৈষম্যমূলক ছিল।

১৯৫৬ সালে পাশ হওয়া “Sinhala Only Act” ছিল অন্যতম বিতর্কিত পদক্ষেপ, যা সিংহলি ভাষাকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করে। এর মাধ্যমে তামিলদের প্রশাসনিক ও শিক্ষাগত সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ে। সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা চালু হয়, যেখানে সিংহলিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এই বৈষম্যমূলক নীতির বিরুদ্ধে তামিলদের মধ্যে বিরোধ বাড়তে থাকে এবং তাদের মধ্যে এক ধরনের আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি জন্ম নেয়।

এই সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বঞ্চনার প্রতিক্রিয়ায় ১৯৭৬ সালে গঠিত হয় Liberation Tigers of Tamil Eelam (LTTE), যাকে তামিল টাইগাররাও বলা হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণ। এলটিটিই’র লক্ষ্য ছিল শ্রীলঙ্কার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে একটি স্বাধীন তামিল রাষ্ট্র ‘তামিল ইলাম’ গঠন করা। তাদের কৌশল ছিল চরমপন্থী রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, আত্মঘাতী বোমা হামলা এবং শিশু সৈনিক ব্যবহারের মতো নৃশংস পন্থা অবলম্বন করে তারা নিজেদের সামরিক শক্তি বাড়িয়ে তোলে।

এই সংঘর্ষ ক্রমেই পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। এলটিটিই কেবল একটি বিদ্রোহী সংগঠন ছিল না, তারা সমান্তরাল প্রশাসন, আদালত এবং কর আদায় ব্যবস্থাও চালু করেছিল। তারা বহু আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বকে হত্যা করে যার মধ্যে ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী এবং শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপতি প্রেমাদাসাও ছিলেন।

যুদ্ধের ধাপসমূহ ও ভারতের ভূমিকা
গৃহযুদ্ধকে সাধারণত চারটি ধাপে ভাগ করা যায়। প্রথম পর্যায়ে, ১৯৮৩ সালে সংঘটিত “Black July” দাঙ্গায় সিংহলি জনতা বহু তামিলকে হত্যা করে, যা যুদ্ধের সূচনা চিহ্নিত করে। এরপর ভারতের হস্তক্ষেপ শুরু হয়। ১৯৮৭ সালে ইন্দো-শ্রীলঙ্কা চুক্তির মাধ্যমে ভারতীয় শান্তিরক্ষী বাহিনী শ্রীলঙ্কায় প্রবেশ করে। তবে এলটিটিই-র সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ শুরু হলে ভারতীয় বাহিনী বিতর্কিত হয়ে পড়ে এবং অবশেষে ১৯৯০ সালে তারা প্রত্যাহার করে।

দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হয়। এলটিটিই বহু এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। সরকার ও বিদ্রোহীদের মধ্যে একাধিকবার যুদ্ধবিরতি হলেও তা ভেঙে পড়ে। ২০০৬ সালে মাহিন্দা রাজাপাকসে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর সরকার যুদ্ধজয়ের কৌশলে যায়। ২০০৯ সালের মে মাসে প্রভাকরণ নিহত হন এবং এলটিটিই সম্পূর্ণভাবে পরাজিত হয়।

এই যুদ্ধ শুধু সামরিক সংঘর্ষ ছিল না ছিল এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। অনুমান করা হয় যে, কেবল ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে প্রায় ৪০,০০০ বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারান। প্রায় ৩ লক্ষ তামিল উদ্বাস্তুতে পরিণত হন, লক্ষাধিক শিশু শিক্ষার বাইরে পড়ে যায় এবং বহু এলাকায় ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটে।

যুদ্ধের শেষ ধাপে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ তোলে। সরকার তা অস্বীকার করলেও আন্তর্জাতিক মহলে শ্রীলঙ্কার ভাবমূর্তি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

যুদ্ধ শেষ হলেও সমস্যার সমাধান হয়নি। সরকার কিছু অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পুনর্বাসন প্রকল্প গ্রহণ করে, তবে তামিল জনগণের অভিযোগ ছিল সেনাবাহিনী তাদের ভূমি দখল করে রেখেছে, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে তারা এখনও পিছিয়ে এবং বৌদ্ধ প্রতীক দিয়ে তামিল সাংস্কৃতিক স্থানগুলোকে সংকুচিত করা হয়েছে।

একদিকে শান্তি প্রতিষ্ঠার দাবি, অন্যদিকে নিপীড়নের বাস্তবতা এই দ্বৈততা শ্রীলঙ্কার রাজনীতি ও সমাজে এখনও প্রতিফলিত হচ্ছে। যুদ্ধজয়ের পরও যদি জাতিগত সহাবস্থান ও মর্যাদার ন্যায্য বণ্টন না হয়, তবে তা শুধু একটি অস্ত্রবিহীন যুদ্ধের সূচনা মাত্র।

শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধ আমাদের শিখিয়ে দেয়, একটি রাষ্ট্রে যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রেণি নিজেদের আধিপত্যকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করে এবং সংখ্যালঘুদের বঞ্চিত করে, তবে সেই সমাজে সহিংসতা অনিবার্য হয়ে ওঠে। এই যুদ্ধ শুধু শ্রীলঙ্কার অভ্যন্তরীণ সমস্যা ছিল না, ছিল গোটা দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এক সতর্কবার্তা জাতিসত্তার স্বীকৃতি, অধিকার ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ যদি অবহেলিত হয় তবে একটি রাষ্ট্রের ভেতরেই গৃহযুদ্ধ জন্ম নেয়।

গাজা – ব্যাংক ধ্বংস, এটিএম কাজ করছে না, ধসে পড়েছে অর্থনীতি

ইসরায়েল গত বছরের অক্টোবরে হামলা শুরুর সময় গাজায় নতুন মুদ্রিত শেকেল পাঠানো বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকেই সেখানে প্রচলিত মুদ্রার সংকট দেখা দেয়। নতুন নোট আসা বন্ধ থাকায় গাজার জনগণ বাধ্য হয়ে পুরোনো টাকাই বারবার ব্যবহার করছে।

যুদ্ধ শুরুর আগেও গাজায় লেনদেনের বেশিরভাগ (৮০ শতাংশের বেশি) হতো হাতে হাতে নগদ অর্থে। তবে এখন সেই অর্থব্যবস্থা প্রায় ধ্বংসের মুখে। গাজার ৫৬টি ব্যাংকের সব শাখা ধ্বংস হয়ে গেছে। আগে যেখানে ৯৪টি এটিএম ছিল, এখন মাত্র ৩টি আংশিকভাবে কাজ করছে। দুই মিলিয়নের বেশি মানুষের জন্য এটুকুই ভরসা।

এই অবস্থায় অনেকেই ফাটা-ছেঁড়া নোট দিয়ে কেনাকাটা করতে না পেরে এগোচ্ছেন মেরামতের দিকে। এক ব্যক্তি এখন দিনে ৫০০ থেকে ৬০০টি নোট মেরামত করেন—যদি তা ঠিক করার মতো হয়। প্রতি নোট মেরামতে তিনি নেন ২ শেকেল, যা প্রায় ৪০ পেন্সের মতো।

ইসরায়েলি বোমা হামলা, স্থল অভিযান ও খাদ্য, জ্বালানি আর ওষুধের ওপর নিষেধাজ্ঞায় গাজার অর্থনীতি প্রায় ভেঙে পড়েছে। এখন যা কিছু চলছে, তা মূলত চলছে রাস্তার হকার, দোকানপাট আর চুরি হয়ে আসা পণ্যের ফেরিওয়ালাদের ভরসায়।

শিল্প এলাকা, ব্যাংক আর কারখানা ধ্বংস বা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গাজায় বেশিরভাগ মানুষ এখন বেকার বা নিঃস্ব। নগদ টাকার ঘাটতিতে লেনদেন এখন অনেকটাই চলে গেছে বিনিময় পদ্ধতির (বার্টার সিস্টেম) দিকে—এক জিনিসের বদলে আরেক জিনিস। আর তা হচ্ছে ফেসবুকের মাধ্যমে।

গাজা শহরের আল-জালাআ স্ট্রিটের বাজারে থাকা সুহেইলা সাল্লাক বলেন, ‘কেউ ফেসবুকে পোস্ট দেয়—বাচ্চার দুধের একটি কৌটার বিনিময়ে চাই এক ব্যাগ ছোলা বা মটর। আমি তাদের মেসেজ করি, একমত হই—শুধু বাঁচার জন্য।’

এখন গাজার বেশিরভাগ মানুষই নগদ টাকার থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত এবং সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল। গত কয়েক সপ্তাহে সেই সাহায্য নিতে গিয়ে নতুন করে তৈরি হওয়া বিতরণ কেন্দ্রগুলোতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে মানুষ। এসব কেন্দ্র পরিচালনা করছে যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, আর সেগুলো ঘিরে রয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর কঠোর নিরাপত্তা।

গাজায় চলমান যুদ্ধের ২১ মাসে এখন পর্যন্ত ৫৮ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু গত মে মাসের শেষ থেকে শুরু হওয়া নতুন কিছু সহায়তা কেন্দ্রে হামলায় প্রাণ গেছে আরও ৮০০ জনের। এ তথ্য জানিয়েছে হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

জাতিসংঘ গত জুন মাসে প্রায় ৪০০ বার ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ত্রাণ পাঠানোর জন্য সমন্বয় করার চেষ্টা করে। কিন্তু এর ৪৪ শতাংশ ক্ষেত্রেই ইসরায়েল প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। অন্যদিকে, ইসরায়েল নিজে থেকে প্রতিদিন ৩২ ট্রাক ত্রাণ পাঠাচ্ছে, ফেব্রুয়ারিতে শেষ হওয়া যুদ্ধবিরতির পর থেকে।

চলতি বছর টানা চার মাসেরও বেশি সময় ধরে গাজায় একফোঁটা জ্বালানিও ঢোকেনি, যদিও প্রায় সব পরিষেবার জন্যই জ্বালানি অত্যন্ত জরুরি। বিদ্যুৎ না থাকায় বেকারি, হাসপাতাল, সমাজসেবা, পানি পরিশোধন কেন্দ্র ও মানবিক সংস্থাগুলোকে চালু রাখতে হয়েছে জেনারেটর দিয়েই।

এই সপ্তাহে অবশেষে কিছুটা জ্বালানি প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যেটাকে জাতিসংঘ স্বাগত জানিয়েছে। তবে সংস্থাটি বলেছে, ‘এটা দৈনন্দিন চাহিদা পূরণের জন্য একেবারেই যথেষ্ট নয়।’

আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অর্থনীতি অনুষদের ডিন সামির আবু মুদাল্লাহ বলেন, ‘জ্বালানির এই সংকট অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। ফিলিস্তিনি পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দাম বেড়েছে ৫৫০ শতাংশেরও বেশি। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এমনকি চলাফেরাও এখন খুব ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে।’

সহজ, সুলভ থ্রিডি প্রিন্টিং বদলে দিচ্ছে অনেক কিছু

বর্তমান বিশ্বের অন্যতম আলোচিত ও ভবিষ্যতমুখী প্রযুক্তি হলো ৩ডি প্রিন্টিং। কখনো যা ছিল শুধুই গবেষণাগার কিংবা বড় কোম্পানির প্রটোটাইপিং টুল, এখন তা বাংলাদেশেও হয়ে উঠছে সুলভ ও ব্যবহারিক। শিক্ষা, চিকিৎসা, শিল্প-কারখানা, এমনকি ব্যক্তিগত সৃজনশীলতায়ও এর ব্যবহার বাড়ছে দ্রুত গতিতে।

কী এই ৩ডি প্রিন্টিং?

৩ডি প্রিন্টিং হলো একটি অ্যাডিটিভ ম্যানুফ্যাকচারিং প্রযুক্তি যার মাধ্যমে ডিজিটাল ডিজাইন থেকে বাস্তব, ত্রিমাত্রিক বস্তু তৈরি করা হয় স্তরে স্তরে উপাদান (প্লাস্টিক, রজন, ধাতু ইত্যাদি) জমিয়ে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি করা যায় খেলনা, যন্ত্রাংশ, স্থাপত্য মডেল, এমনকি দেহের কৃত্রিম অঙ্গ।

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্টার্টআপ এবং ইন্ডাস্ট্রিতে ৩ডি প্রিন্টিং-এর ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। প্রাথমিকভাবে ঢাকা ও চট্টগ্রামে এর ব্যবহার শুরু হলেও এখন দেশের বিভিন্ন জেলাতেও ছোট পরিসরে ৩ডি প্রিন্টার ব্যবহার হচ্ছে।

বিশেষ করে ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়, ডিজাইন স্কুল এবং মেডিকেল কলেজগুলোতে ৩ডি প্রিন্টার এখন গবেষণা ও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পাশাপাশি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর ভোকেশনাল কোর্সেও বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে।

কোন কোন ব্র্যান্ড বাংলাদেশে জনপ্রিয়?

বর্তমানে বাংলাদেশের বাজারে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের ৩ডি প্রিন্টার সহজলভ্য হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
Creality: চাইনিজ এই ব্র্যান্ডটি সাশ্রয়ী দামে ভালো মানের এফডিএম প্রিন্টার দিয়ে বাংলাদেশে জনপ্রিয়। বিশেষ করে Ender-3 V2 ও CR-10 সিরিজ ব্যাপক ব্যবহৃত।

Anycubic: যারা রেজিন প্রিন্টারে আগ্রহী, তাদের কাছে Anycubic Photon Mono সিরিজ বিশেষভাবে পছন্দের। প্রিসিশন ও ফাইন ডিটেইলে এটি ভালো কাজ দেয়।

Prusa: ইউরোপিয়ান এই ব্র্যান্ডটি অপেক্ষাকৃত দামি হলেও প্রফেশনাল কাজের জন্য বেশ নির্ভরযোগ্য। তবে বাংলাদেশে তুলনামূলক কম ব্যবহার হয়।

Flashforge ও Elegoo: এই ব্র্যান্ডগুলোও এখন বাংলাদেশের স্টুডিও ও ডিজাইন ফার্মগুলোতে জায়গা করে নিচ্ছে।

ঢাকার IDB ভবন, রায়সা টেক, এবং Daraz, Ryans Computers, Tech Land ইত্যাদি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এসব ব্র্যান্ড পাওয়া যায়। দামের পরিসর ২৫,০০০ টাকা থেকে শুরু করে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত।

কোথায় ব্যবহৃত হচ্ছে?
আর্কিটেকচার ও ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন: ছোট আকারে বিল্ডিং বা যন্ত্রাংশের মডেল বানানোয় ব্যবহৃত হয়।

শিক্ষা: ছাত্রদের হাতে-কলমে শেখানোর জন্য বিভিন্ন প্রজেক্ট বানাতে।

চিকিৎসা: কৃত্রিম হাড়, দাঁত, বা শারীরিক অঙ্গের মডেল তৈরিতে।

ব্যক্তিগত ও সৃজনশীল কাজ: গেমিং ফিগার, অলঙ্কার, হোম ডেকর ইত্যাদি বানাতে।

৩ডি প্রিন্টিং আর বিলাসিতা নয়। এখন এটি বাংলাদেশে বাস্তব, দরকারি এবং দিনকে দিন আরও জনপ্রিয়। শিক্ষা থেকে শিল্প পর্যন্ত এর যে বহুমাত্রিক ব্যবহার প্রমাণ করে প্রযুক্তির এই তরঙ্গ আমরা ঠেকাতে পারবো না, বরং সেটাকে দেশের অগ্রগতির জন্য কাজে লাগাতে হবে ।

মার্কিন শুল্ক নিয়ে দর-কষাকষি – চীনের সাথে বাণিজ্য-বিনিয়োগ কমানোর চাপ, কি করবে বাংলাদেশ?

বাণিজ্যসংক্রান্ত বিষয়গুলোতে একমত হলেও বাণিজ্যের বাইরের বিষয়ে এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের শুল্ক বিষয়ক দর-কষাকষি আটকে আছে।এর মধ্যে এমন কিছু স্পর্শকাতর বিষয় রয়েছে যেগুলোর বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টাসহ অন্যদের পরামর্শ নিয়ে আগামী সপ্তাহে তৃতীয় দফায় দর-কষাকষির আলোচনা করতে ওয়াশিংটনে যাবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্টের (গোপনীয়তার চুক্তি) কারণে দর-কষাকষি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলছেন না সরকারের উপদেষ্টা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ব্যবসায়ী নেতা প্রথম আলোকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা কেবল বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।ভূরাজনৈতিক কৌশলগত বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। যার মূল উদ্দেশ্য–বাংলাদেশ যাতে চীনের দিকে বেশি ঝুঁকে না যায়।যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া, বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়াতে মনোযোগী হবে না। এমনকি চীনা বিনিয়োগেও বেশি উৎসাহ দেবে না বাংলাদেশ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দর-কষাকষিতে যেসব শর্ত নিয়ে আলোচনা হচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে–যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো দেশকে নিষেধাজ্ঞা দেয়, তাহলে বাংলাদেশকেও তা মেনে চলতে হবে। তার মানে, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় পড়া দেশের সঙ্গে বাংলাদেশকে ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা বিনিয়োগসংক্রান্ত কার্যক্রম থেকে বিরত থাকতে হবে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের যেসব পণ্যকে বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত সুবিধা দেবে, তা অন্য কোনো দেশকে না দেওয়ার শর্ত রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অপর এক ব্যবসায়ী প্রথম আলোকে বলেন–যুক্তরাষ্ট্র চায়, সামরিক কাজে ব্যবহৃত পণ্যসামগ্রী দেশটি থেকে আমদানি করুক বাংলাদেশ। তার বিপরীতে চীন থেকে সামরিক পণ্য আমদানি কমানোর নিশ্চয়তা চায় দেশটি।

ঢাকা যাতে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় আঞ্চলিক কৌশলের (আইপিএস) পক্ষে থাকে সেটিও চায় যুক্তরাষ্ট্র। আইপিএস হলো যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিস্তৃত কৌশল। এর লক্ষ্য হচ্ছে পুরো অঞ্চলে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করে চীনের প্রভাব মোকাবিলা করা।

বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির একক বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ ৮৬৯ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ১৮ শতাংশের কিছু বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হওয়া বাংলাদেশি পণ্যের ৮৫ শতাংশের বেশি তৈরি পোশাক।

বাংলাদেশের পণ্যে ৩৫% শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। এ হার বিদ্যমান হারের অতিরিক্ত। এতে মোট শুল্ক দাঁড়াবে অন্তত ৫১%।

যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান এখন তৃতীয়। রপ্তানিকারকরা বলছেন, নতুন শুল্কহার কার্যকর হলে ভারতের কাছে এ মর্যাদা হারানোর শঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশকে টপকে তৃতীয় স্থানে চলে আসতে পারে ভারত। দ্বিতীয় স্থানে থাকা ভিয়েতনামের সঙ্গে বাংলাদেশের আরও বড় ব্যবধান তৈরি হতে পারে।

চীন, ভিয়েতনাম ও ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তি হচ্ছে। চুক্তি অনুযায়ী, ভিয়েতনাম এবং ভারতের শুল্কভার ২০ শতাংশের মধ্যেই থাকছে। চুক্তির ফলে চীনের পণ্যের শুল্ক ৯০ শতাংশ কমছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি এখন অসম প্রতিযোগিতার মুখে। দেশটিতে রপ্তানি ব্যাপক হারে কমে যেতে পারে বাংলাদেশের।

তবে, রপ্তানির বাজার কিছু দেশের জন্য যতটা গুরুত্বপূর্ণ, বাংলাদেশের কাছে ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। ওয়ার্ল্ড ট্রেড স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিভিউ অনুসারে, ভিয়েতনামের জিডিপির প্রায় ৯০ শতাংশই আসছে রপ্তানি থেকে। ২০২২ সালে বাংলাদেশের রপ্তানি জিডিপির অনুপাত ছিল ১২.৫%।

বাংলাদেশের জিডিপি বা অর্থনীতি রপ্তানি দিয়ে চলে না; বরং আমাদের আমদানি বেশি। অর্থনীতিতে উৎপাদন খাতের চেয়ে সেবা খাতের অবদান বেশি। যদিও রপ্তানি কমে গেলে অর্থনীতি ধাক্কা খাবে, তা নিশ্চিত।

বর্তমান পরিস্থিতিতে করণীয় প্রসঙ্গে ফেসবুকে আমেরিকা প্রবাসী সাংবাদিক নাজমুল আহসান লিখেছেন —

‘যুক্তরাষ্ট্রের মার্কেট আর রপ্তানি ভিয়েতনামের জন্য মহা গুরুত্বপূর্ণ। নট সো মাচ ফর বাংলাদেশ। আমাদের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো ইইউর মার্কেট। এই কারণে ভিয়েতনাম ডেসপারেট হয়েছে। বাংলাদেশেরও হতেই হবে, তা নয়।

ইয়েস, ৩৫% ইজ অ্যা সেটব্যাক। কিন্তু তাই বলে সবকিছু গ্লুম আর ডুম নয়। ইন ফ্যাক্ট, বাংলাদেশের যেই মেইন প্রোডাক্ট অর্থাৎ রেডিমেড গার্মেন্টস, এটা সরাসরি আমেরিকার ভোক্তা পর্যায়ে অ্যাফেক্ট করবে। বাংলাদেশ বরং ধীরে চলো নীতিতেও খারাপ করবে না।’

শিক্ষক ও বিশ্লেষক শিবলী আজাদ লিখেছেন — ‘মালয়েশিয়ান বাণিজ্যমন্ত্রী শুল্ক কমাতে ট্রাম্পের চুক্তির শর্তকে দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর হাত দেয়া আখ্যা দিয়ে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে–আমেরিকার সাথে মালয়েশিয়ার ট্রেড ডিল হলে হবে, নইলে কুয়্যালালমপুর নিজের পথ দেখবে। বাংলাদেশকে হয়ত, মালয়েশিয়ার পথে হাঁটতে হবে।

আমেরিকার সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য ৮.৫ বিলিয়ন ডলারের। ওদিকে চীনের সাথে বাণিজ্য ১৮ বিলিয়ন ডলার। চীন থেকে বাংলাদেশ কৃষি ও শিল্পের মেশিনারী, ইলেকট্রনিক্স পণ্য, গার্মেন্টের জন্যে তুলা ও খাদ্যশস্য আমদানী করে। বাংলাদেশের ভেতর আমদানীকৃত পণ্যের দাম কম রাখতে বাংলাদেশ চীনা পণ্যের ওপর কম ট্যারিফ বা শুল্ক রাখে। তা না হলে, ২০ হাজার টাকার যন্ত্র ৬০ হাজার টাকা দাম হতো—চীনকে শায়েস্তা করতে ট্রাম্প সেটাই চাচ্ছে। সেটা করতে গেলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ধ্বসে পড়বে। কৃষিপণ্যের দাম হবে আকাশচুম্বী।

দরকারে, আমেরিকায় বাংলাদেশের রপ্তানী ৩-৪ বিলিয়ন ডলার কমে গেলেও সামরিক ও অর্থনৈতিক তথা জাতীয় নিরাপত্তার দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থে বাংলাদেশের উচিৎ হবে না ট্রাম্প প্রশাসনের চাপের কাছে নতি স্বীকার করা। ঢাকার সাফ জবাব হবে, দিলে দাও না হলে ৩৫% সই।

মনে রাখতে হবে ট্রাম্পের আগ্রাসী এই নীতিও হবে সাময়িক। সারা দুনিয়ার সাথে গোলযোগ বাঁধানোর কারণে আমেরিকার অর্থনীতিতে ক্রাইসিস দেখা দিলেই ট্রাম্প ফের নড়েচড়ে বসবে। সেটাও না হলে, বড়জোর আর সাড়ে তিন বছর ট্রাম্পের শুল্কনীতি বলবৎ থাকবে। ট্রাম্পের বিদায়ের পরই আমেরিকা ফের আগের নীতিতে ফিরে যাবে।’

“জীবন হলো দুই অনন্তের মাঝখানে একটি ক্ষণিকের স্ফুলিঙ্গ” : ডেভিড গিলমোর

প্রশ্ন: “The Division Bell” আমার প্রিয় পিংক ফ্লয়েড অ্যালবাম এবং “High Hopes” গানটা ব্যান্ডটির জন্য একটা পরিসমাপ্তির মতো মনে হয়েছিল। তখন কি সত্যিই ব্যান্ড থেমে যাওয়ার কথা ছিল?

উত্তর: না, তেমন কোনো চিন্তা ছিল না। কোনো নির্দিষ্ট কারণ ছিল না যে থেমে যেতে হবে। তবে জীবন যেমন চলে, কিছু জিনিস মাঝেমধ্যে পথে এসে পড়ে—তেমনি তখন কিছু ব্যস্ততা সামনে এসে পড়ে। আমরা আরেকটা অ্যালবাম বা ট্যুরে যেতে পারিনি। “High Hopes” অ্যালবামের জন্য দারুণ একটা সমাপ্তি, কিন্তু তা ব্যান্ডের শেষ নয়।

প্রশ্ন: সিড ব্যারেটের মেঝের কাঠগুলো নিলামে £২৮,০০০-র বেশি দামে বিক্রি হয়েছে। আপনি কি আপনার অতীতের কোনো বস্তু ফেরত পেতে অনেক টাকা খরচ করতে রাজি?

উত্তর: না, তেমন কিছু নেই। পুরনো গাড়ি বা গিটারও না। তবে সিড আমাকে ৬৬ বা ৬৭ সালে একটা লাল চামড়ার জ্যাকেট দিয়েছিল ওটা পেলে ভালো লাগতো। আর আমার গোলাপি ভেলভেট প্যান্ট, যেটা কিনেছিলাম ‘Granny Takes a Trip’ দোকান থেকে। ওটা ১৯৬৯ সালে লন্ডনের এক লন্ড্রোম্যাট থেকে চুরি হয়ে যায়। যদিও এখন সেটা গায়েও উঠতো না!

প্রশ্ন: ইউকে’র গ্রাসরুট সংগীতকে সাহায্য করতে কনসার্ট টিকিটে একটা স্বেচ্ছা লেভি বসিয়ে তহবিল গঠন করার যে প্রস্তাব আছে, আপনি কী ভাবেন?

উত্তর: আমি একমত। এখনকার সংগীতশিল্পীদের জন্য সময়টা কঠিন। বড় বড় কোম্পানিগুলো বেশিরভাগ আয় নিয়ে নিচ্ছে। আগে শিল্পীরা বেশি লাভ পেত, এখন তা হয় না। এখনকার সংগীতশিল্পীদের বেঁচে থাকতে হলে লাইভ পারফর্ম করতে হয়, রেকর্ড করে আয় হয় না। এটা খুব দুঃখজনক। এ যুগটা খুব দয়ালু নয়। সবকিছু রোবট আর AI-এর হাতে যাচ্ছে, আর ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে।

প্রশ্ন: “Comfortably Numb”-এর গিটার সলো আপনাকে কী বোঝায়? এটা কি কিছু বলছে?

উত্তর: আমি যে সঙ্গীতটুকু লিখেছি, তার ওপরে সলো বাজানোটা খুবই আনন্দের। প্রতিবার বাজানোর সময় সেটার মানে বদলায়।

প্রশ্ন: আধুনিক গানে গিটার সলো দেখা যায় না। এটা কি এখন পুরনো কালের ব্যাপার?

উত্তর: সময়ের চক্রে এমন হয়। আমি এখনও সলো বাজাচ্ছি। আশা করি, আবার ফিরে আসবে। সংগীতে কিছু সময়ের বিরতি অনেক মূল্যবান।

প্রশ্ন: টেলিকাস্টার নাকি স্ট্র্যাটোকাস্টার কোনটা পছন্দ?

উত্তর: গান অনুযায়ী গিটার ঠিক করি। দুটোই ভালোবাসি।

প্রশ্ন: রজার ওয়াটারসের সঙ্গে আবার কখনো মঞ্চে উঠবেন?

উত্তর: একেবারেই না। আমি এমন লোকদের এড়িয়ে চলি যারা পুতিন বা মাদুরো’র মতো স্বৈরশাসক ও নারী-এলজিবিটি নিপীড়কদের সমর্থন করে। রিক রাইটের সঙ্গে মঞ্চে ফিরে যেতে পারলে ভালো লাগত, সে ছিল দারুণ সঙ্গীতপ্রতিভাধর এবং শান্ত মানুষ।

প্রশ্ন: কেট বুশকে কি আবার মঞ্চে আনা সম্ভব?

উত্তর: কেট বুশ নিজে চাইলে তবেই সম্ভব। ২০১৪ সালের তার কনসার্টগুলো অসাধারণ ছিল। আমরা অনেক রাতে গিয়েছিলাম। আমি ওকে আবার জেন্টলি বোঝানোর চেষ্টা করেছি।

প্রশ্ন: আপনার নতুন অ্যালবামে ‘mortality’ (মরণশীলতা) নিয়ে ভাবনা এসেছে। আপনি কীভাবে দেখেন মৃত্যুকে?

উত্তর: আমি কোনো পরকাল বা উচ্চতর শক্তিতে বিশ্বাস করি না, এটা দুঃখজনক। “A Single Spark” গানটা মূলত আমার অনুভূতির প্রকাশ। নাবোকভের “Speak, Memory”-এর একটি লাইন থেকে অনুপ্রাণিত। তিনি বলেছিলেন, জীবন দুই অনন্তের মাঝের একটা ক্ষণিকের স্পার্ক মাত্র।

প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন সংগীত শুধু মানুষের বুদ্ধি থেকে আসে, নাকি কোনো উচ্চতর উৎস থেকেও আসে?

উত্তর: আমি নাস্তিক, কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয় সংগীত যেন নিজেরাই আমার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে—যেন আমি নিজে করিনি।

প্রশ্ন: একজন গিটারবাদী হিসেবে সলো বাজানোর কৌশল বাড়াতে কী পরামর্শ দেবেন?
উত্তর: কৌশল ভুলে যাও! শুধু এমন সুর বাজাও যেটা তোমার হৃদয় ও মনকে ছুঁয়ে যায়।

প্রশ্ন: রজার ওয়াটারসের লেখা সেরা কোনো গানের কথা মনে পড়ে?
উত্তর: ভাবি দেখি… “Walk With Me Sydney”?

প্রশ্ন: বর্তমান সঙ্গীতের অবস্থা কেমন মনে হয়? কোনো ব্যান্ড আছে যাদের গান আপনাকে অনুপ্রাণিত করে?

উত্তর: আমি খুব বেশি আধুনিক গান শুনি না। তবে Alt-J ব্যান্ডের গান শুনে ভালো লেগেছে। ওদের প্রযোজক Charlie Andrew-এর কাজ দারুণ লেগেছে, সেই কারণেই ওকে আমার অ্যালবামে নিয়েছি। ও আমার অতীতকে পাত্তা না দিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে এটা খুব দরকারি।

প্রশ্ন: ২০১৯ সালে আপনি যে গিটার ও অ্যাম্প বিক্রি করেছিলেন, সেগুলো কি মিস করেন?

উত্তর: সত্যি বলতে, কয়েকটা প্রিয় গিটার রেখে দিয়েছি। গিটার আমার কাছে কেবল কাজের যন্ত্র। অতিরিক্ত আবেগ নেই। যেটা বড় কথা, ওই বিক্রির টাকাগুলো ClientEarth-এ দিয়ে ভালো কাজে লাগছে এটাই শান্তি দেয়।

প্রশ্ন: আপনি কি মহাকাশে যেতে চান?
উত্তর: আমাকে একবার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। আমরা মস্কোতে পারফর্ম করার পর। কিন্তু ওদের রকেট আর ক্যাপসুল দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, “না ভাই, ধন্যবাদ।” সব কিছু এত দুর্বল, নাট-বল্টু দিয়ে ঠেসে রাখা!

প্রশ্ন: মনটা শান্ত করতে চাইলে আপনি কাদের গান শোনেন?

উত্তর: এখন অনেক সময় আমি গান না শুনে অডিওবুক শুনি। যেমন—Hitler, Stalin, Mum and Dad – ড্যানিয়েল ফিঙ্কেলস্টাইন, The Escape Artist, Inside Story – মার্টিন এমিস। এমিসের বইটা দারুণ, মৃত্যুর আগে নিজের সব চিন্তা একসাথে রেখেছেন।

প্রশ্ন: আপনি এমন কিছু অ্যালবামের অংশ হয়েছেন যা ইতিহাসের সেরা। এটা কি চাপ দেয় নাকি অনুপ্রেরণা?

উত্তর: বেশিরভাগ সময়েই অনুপ্রেরণা দেয়। যেমন নতুন অ্যালবাম শেষ করে স্টুডিওতে বসে শুনছিলাম ঠিক সেই অনুভূতিই হচ্ছিল, যেটা হয়েছিল ১৯৭৩ সালে Abbey Road-এ “The Dark Side of the Moon” শুনে। একইরকম উত্তেজনা।

প্রশ্ন: আপনার সংগীত জীবনে আর কী স্বপ্ন আছে?
উত্তর: আমার স্বপ্ন হলো চালিয়ে যাওয়া। এই ট্যুর শেষ হলে আবার স্টুডিওতে ঢুকব নতুন গান তৈরি করতে। এর চেয়ে বেশি কিছু চাই না।

– Christopher Lord,
(Freelance journalist, Writer, specialising in rock music)

“Game of Thrones” কীভাবে এটি এক দশক শাসন করল, তারপর হারিয়ে ফেলল নিজের পথ : সারা হিউজেস, ব্রিটিশ লেখিকা ও সাংবাদিক

২০১০-এর দশকে টেলিভিশনে অনেক সিরিজ ছিল, কিন্তু ‘গেম অব থ্রোনস’ ছিল একেবারেই আলাদা। এইচবিওর জর্জ আর. আর. মার্টিনের বিশাল কল্পকাহিনি অবলম্বনে নির্মিত এই সিরিজ পুরো টেলিভিশন জগতকেই একরকম দখল করে নিয়েছিল। এটি এতটাই আলোচিত ছিল যে প্রতিটি পর্ব নিয়েই অনলাইনে বিশ্লেষণ, আলোচনা চলত। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা থেকে শুরু করে স্নুপ ডগ সবাই এই সিরিজের ভক্ত । ফ্যান ভিডিও, থিওরি, মিমে ভরে উঠেছিল ইন্টারনেট। প্রতি পর্বে গড়ে ২৫ মিলিয়নের বেশি দর্শক ছিল (যেখানে অবৈধ ডাউনলোডের সংখ্যাও অন্তর্ভুক্ত ছিল না) এবং বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পাইরেট হওয়া শো হওয়ার গৌরব’ও এটি অর্জন করে।

এই সিরিজ ছিল শেষ ‘ইভেন্ট টেলিভিশন’ যেটা একসাথে সবাই দেখত, একসাথে আলোচনা করত। যেখানে আজকের দিনে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের কারণে মানুষ নিজ নিজ সময়ে বিঞ্জ করে দেখে, সেখানে ‘গেম অব থ্রোনস’ সবাইকে সপ্তাহ ধরে অপেক্ষা করিয়ে রাখত। এই অপেক্ষার মধ্যেই তৈরি হতো উত্তেজনা, গুঞ্জন, আলোচনার ঝড়।

সবচেয়ে বড় কথা, এই সিরিজ ছোট পর্দায় ‘ফ্যান্টাসি’ ধারাটির ধারণাই বদলে দিয়েছিল। এর আগে মনে করা হতো, ফ্যান্টাসি সিরিজ টিভিতে সফল হবে না।কিন্তু এই শো’র পর থেকে যেন সবাই ফ্যান্টাসি বানাতে ছুটে গেল। ওয়েস্টেরোসের ছায়া দেখা যায় ‘দ্য লাস্ট কিংডম’ থেকে শুরু করে ‘ব্রিটানিয়া’র মতো ইতিহাসনির্ভর সিরিজেও। নেটফ্লিক্সের ‘দ্য উইচার’ এর রক্তাক্ত সহিংসতা আর অপ্রয়োজনীয় নগ্নতা ‘গেম অব থ্রোনস’-এর ছাঁচ অনুসরণ করে তৈরি।

তবে সব সময় এমন ছিল না। ২০১১ সালে যখন সিরিজটি শুরু হয়, তখন মূল আকর্ষণ ছিল তীক্ষ্ণ সংলাপ, রাজনীতিক ষড়যন্ত্র, চরিত্রগুলোর মানসিক জটিলতা। কিন্তু যত সময় গেলো এবং যখন লেখক মার্টিনের মূল বই থেকে কনটেন্ট শেষ হয়ে গেল, তখন নির্মাতা বেনিয়ফ ও ওয়েইস নিজেদের মতো গল্প লিখতে শুরু করলেন। চরিত্রভিত্তিক গল্প গড়িয়ে গিয়ে বড়সড় যুদ্ধ আর বিস্ফোরণে পরিণত হলো।

এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ ছিল ষষ্ঠ সিজনের ফিনালে, ‘দ্য উইন্ডস অব উইন্টার’। সার্সি যখন পুরো ‘বেলর’ সেপ্ট উড়িয়ে দেয়, তখন সেটা প্রশংসা কুড়িয়েছিল। কিন্তু এখন অনেকে মনে করেন, সেটাই ছিল সেই মুহূর্ত যখন এই সিরিজের ভিতটা ভেঙে পড়ে। নির্মাতারা প্রমাণ করে ফেললেন যখন কোনো ধারণা থাকবে না, তখন তারা বিস্ফোরণ দিয়ে গল্প টানবেন।

সার্সিকে ভিলেন বানিয়ে ফেললেও, তারপর তার চরিত্র নিয়ে কিছুই করা হয়নি। রাজনীতির জায়গায় তারা পুরো মনোযোগ দিলেন যুদ্ধ আর ভিজ্যুয়াল স্পেক্টাকেলে। নাইট কিং-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধের গুরুত্ব থাকলেও, কিংস ল্যান্ডিংয়ের রাজনীতিক জটিলতা বাদ যাওয়ায় শেষের দুই সিজন হয়ে পড়েছিল ‘স্টাইল ওভার সাবস্ট্যান্স’-এর নজির। হঠাৎ লিটলফিঙ্গারের মৃত্যু, ডেনেরিসের আগুনে কিংস ল্যান্ডিং ধ্বংস সবই যেন নাটকীয়তা তৈরির চেষ্টা, বাস্তবিক নয়।

এই ‘শুধুই দৃশ্যমান চমক’ ধরনটি অনেক সিরিজের ক্ষতিও করেছে। ‘ট্রয়’, ‘দ্য বাস্টার্ড এক্সিকিউশনার’, ‘আমেরিকান গডস’ সবই ‘গেম অব থ্রোনস’ এর মতো হতে চেয়েছিল, কিন্তু আসল চাবিকাঠি কাহিনির গভীরতা উপেক্ষা করে ব্যর্থ হয়েছে।

অন্যদিকে যেসব সিরিজ সফল হয়েছে যেমন আউটল্যান্ডার, পেনি ড্রেডফুল, হিজ ডার্ক ম্যাটেরিয়ালস তারা মূল গল্পকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। তারা দেখিয়েছে, ভালোবাসা থেকে উৎসারিত গল্পের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকলে সেটি দর্শককে আকর্ষণ করে। নিছক জনপ্রিয়তার খোঁজে তৈরি হলেই তা সফল হয় না।

তবু ব্যর্থতা থামায়নি নতুন ফ্যান্টাসি প্রজেক্টগুলোর পরিকল্পনা। ‘লর্ড অব দ্য রিংস’, ‘দ্য হুইল অব টাইম’, ‘দ্য কিংকিলার ক্রনিকল’ সবকিছু তৈরির কাজ চলছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তখন কি দর্শক এসব দেখার আগ্রহ রাখবে? কারণ, ‘গেম অব থ্রোনস’ যতটা আলোড়ন তুলেছিল, ততটাই দ্রুত যেন বিস্মৃতও হয়ে গেছে। সেরা দশকের সিরিজের তালিকায়ও এটি ধীরে ধীরে নেমে গেছে।

‘গেম অব থ্রোনস’ শেষ পর্যন্ত অনেক কিছুর প্রতিশ্রুতি দিয়েও তার গভীরতা ধরে রাখতে পারেনি। জাতিগত উপস্থাপনায় ছিল বড় সীমাবদ্ধতা, ডোথরাকিদের বর্বর হিসেবে দেখানো, ডেনেরিসের চরিত্রে ‘সাদা ত্রাণকর্তা’ ভাব, বা যৌনতা নিয়ে বিতর্কিত উপস্থাপন সব মিলিয়ে এটি নানা প্রশ্ন তৈরি করেছে। অনেক দৃশ্যেই ছিল নারীবিরোধী বা বিভ্রান্তিকর চিত্রায়ন।

ফলে হয়তো সিরিজটির সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হতে পারে এর গল্প নয়, বরং এর বাজেট আর সেই বাজেটকে অনুসরণ করে যারা কপি করেছে তাদের দৌড়। গেম অব থ্রোনস শেষ। কিন্তু তার ছায়া, চাইলে বলাই যায় আজও চলমান।