Home Blog Page 49

আকিরা কুরোসাওয়ার “Throne of Blood” সবরকম শ্রেণিবদ্ধতার বাইরে : ডেরেক ম্যালকম, চলচ্চিত্র সমালোচক, দ্য গার্ডিয়ান

একজন পরিচালকের কোন চলচ্চিত্রটি তাকে সর্বোত্তমভাবে উপস্থাপন করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক সময়ই কঠিন। ১০০ সেরা পরিচালকের তালিকা তৈরি করা যতটা সহজ, তাদের কোন চলচ্চিত্রটি নির্বাচন করা হবে, সেটা অনেক বেশি জটিল। প্রয়াত আকিরা কুরোসাওয়া নিঃসন্দেহে এখনো জাপানি পরিচালকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিচিত নাম। অথচ তাঁর সমতুল্য বা তাঁর চেয়েও বড় মাপের নির্মাতা মিকিও নারুসে, ইয়াসুজিরো ওজু কিংবা কেনজি মিজোগুচি তাঁরা কেবল চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের কাছেই পরিচিত।

তবে কোন চলচ্চিত্রটি কুরোসাওয়ার শিল্পকর্মের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা উচিত? বেশিরভাগ মানুষ বলবেন, হয় The Seven Samurai, সেই মহাকাব্যিক চলচ্চিত্র যা জন স্টারজেসের The Magnificent Seven-কে অনুপ্রাণিত করেছিল; কিংবা Rashomon, সেই চলচ্চিত্র যা ১৯৫১ সালের ভেনিস ফেস্টিভ্যালে পশ্চিমা দর্শকদের স্তম্ভিত করে দিয়েছিল, কারণ সেখানে একটি খুনের ঘটনাকে বিভিন্ন সাক্ষীর ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরা হয়; অথবা Ikiru (Living), যেখানে এক ক্যানসার আক্রান্ত সরকারি কর্মচারী জীবনের মানে খুঁজে পাওয়ার জন্য একটি বস্তি এলাকায় শিশুদের জন্য খেলার মাঠ গড়ে তোলে, এটি একটি বিষণ্ন অথচ মানবিক গল্প।

এই প্রতিটি সিনেমাই একটি করে মাস্টারপিস এবং এর বাইরেও কুরোসাওয়ার অনেক চমৎকার কাজ আছে। তবে আমার ব্যক্তিগত পছন্দ Throne of Blood (১৯৫৭), যা শেক্সপিয়ারের Macbeth নাটকের একটি জাপানি রূপান্তর। এখানে ‘স্কটিশ নাটক’টি রূপ নেয় একটি চমৎকার ভিজ্যুয়াল অভিব্যক্তিতে, যা জাপানি যোদ্ধা-ঐতিহ্যের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এটি ছিল টি. এস. এলিয়টের প্রিয় চলচ্চিত্র। এই নাট্যরূপটি মিতব্যয়ী, সংলাপ নয় বরং ধীরে গড়ে ওঠা ঘটনার বিস্তারে দৃশ্যগুলো বলিষ্ঠ হয়ে ওঠে। চরিত্রচিত্রণ হয়তো শেক্সপিয়ারের মতো সূক্ষ্ম নয়, কিন্তু সন্দেহ নেই, কবি হয়তো কবরেও এই কাজ দেখে বিরক্ত হতেন না। কুরোসাওয়ার নিজস্ব ভাষা শেক্সপিয়ারের ভাষার সঙ্গে এতটাই শক্তভাবে মিলেমিশে গেছে যে এটা এমনকি ভার্দির সঙ্গীতায়োজিত Macbeth-কেও ছাপিয়ে যায়।

চলচ্চিত্রের শুরুতেই আমরা দেখি কুরোসাওয়ার ম্যাকবেথ চরিত্র ওয়াশিজু (তাঁর প্রিয় অভিনেতা তোশিরো মিফুনে অভিনীত) ও মিকি কুয়াশা ও বৃষ্টিভেজা পাইন বনের মধ্যে দিয়ে ঘোড়া চড়ে যাচ্ছেন জাদুকরী নারীর (এখানে মাত্র একজন) সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে।

তাঁরা যখন ফিরে আসেন, তখন দর্শক হিসেবে আমরাও ঠিক বুঝে উঠতে পারি না তারা কোথায়। তারা ক্যামেরার দিকে বারবার এগিয়ে আসে, মোট বারোবার, আবার ফিরে যায়, যেন কোনো অদৃশ্য প্রতিবন্ধক তাদের আটকে রেখেছে। অবশেষে তারা এক সমতলভূমিতে পৌঁছায়, যেখান থেকে তারা যুদ্ধবাজ রাজপ্রাসাদ দেখতে পায়। এটা এতটাই সাহসী ও অভিনব নির্মাণ—আমি এরকম দৃশ্য আগে বা পরে আর কোথাও দেখিনি। ক্যামেরা ট্র্যাকিংয়ের এমন নিখুঁত ব্যবহার খুব কমই দেখা গেছে।

তবে এসব কারিগরি কৌশল কখনো নিজেকে জাহির করে না, বরং নাটকীয়তা তৈরি করে। যেমন, যখন ওয়াশিজু দেখে ‘কবওয়েব ফরেস্ট’ (শেক্সপিয়ারের ‘বারনাম উড’) ধীরে ধীরে তার দুর্গের দিকে এগিয়ে আসছে, অথবা যখন যুদ্ধ শেষে প্রতিশোধপরায়ণ সৈন্যদের তীর তার দেহে আঘাত হেনে বারবার তাকে ক্রুশবিদ্ধ করছে।

চলচ্চিত্রটি কখনো মৃত্যুসম নীরবতায় থেমে থাকে, কখনো প্রবল সহিংসতার বিস্ফোরণে কাঁপিয়ে তোলে এবং এর মধ্য দিয়ে নাটকটি শুধু শেক্সপিয়ারের কঙ্কালরূপ ধারণ করে না, বরং জাপানি ‘নো’ নাট্যের বৈশিষ্ট্যও ধারণ করে। লেডি ম্যাকবেথরূপী আসাজির সাদা মুখ যেন শুরু থেকেই তাঁকে ভূতের মতো করে তোলে; মিকির ঘোড়ার আতঙ্কিত আচরণ, তার মৃত্যুর মুহূর্তটিকে চোখের আড়াল করেও দর্শকের সামনে আনে; রাজসিংহাসনে বসা ঘরে হঠাৎ পাখির ঝাঁকের প্রবেশ কিংবা ধীরে ধীরে দুর্গের দিকে এগিয়ে আসা শবযাত্রা সবই যেন অনিবার্য ধ্বংসের পূর্বাভাস।

অনেকে কুরোসাওয়াকে ‘সবচেয়ে পাশ্চাত্যঘেঁষা’ জাপানি পরিচালক হিসেবে সমালোচনা করেছে, আবার প্রশংসাও করেছে এই জন্য যে তিনি পশ্চিমা দর্শকদের কাছে বোধগম্য। জাপানিরাও একসময় তাঁর কাজকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, বলেছিল তিনি যেন পুরনো ও অব্যবহারযোগ্য ঐতিহ্যের প্রতি অতিমাত্রায় আসক্ত।

এই সমালোচনা ও কাজ চালিয়ে যাওয়ার অসম্ভব চেষ্টার ফলে কুরোসাওয়া ১৯৭১ সালে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। পরে স্পিলবার্গ, জর্জ লুকাসসহ অনেক পশ্চিমা নির্মাতার সহায়তায় তিনি আবার চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করতে সক্ষম হন, তাঁদের চোখে তিনি ছিলেন এক প্রকার পূর্বের ডেভিড লিন। কুরোসাওয়ার অনেক সিনেমার তুলনায় Throne of Blood সবচেয়ে ভালোভাবে দেখায় যে, পশ্চিমা প্রভাব গ্রহণ করলেও (যেমন: পশ্চিমা আর্ট স্কুলে আঁকা শেখা বা জন ফোর্ডের প্রতি মুগ্ধতা), তবু তিনি মিজোগুচির মতোই জাপানি ঐতিহ্যেরই সন্তান।

তবে চলচ্চিত্র হিসেবে Throne of Blood কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণিতে ফেলা যায় না। এটি ভিজ্যুয়াল শক্তির এক অনন্য নিদর্শন, যা জাপানি অনুভূতির গভীরতায় ভরপুর এবং সম্ভবত পর্দায় নির্মিত শ্রেষ্ঠ শেক্সপিয়ার রূপান্তর।

ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধে জিতে যাচ্ছে চীন : জংইউয়ান জো লিউ, কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের চীনবিষয়ক গবেষক

“… ২০১৮ সালে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এ কঠিন বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হয়। এর পর থেকে চীন এমন একটি কৌশল গ্রহণ করেছে, যেখানে প্রতিরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক—দুই ধরনের পদক্ষেপ একত্রে রয়েছে।

আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে চীন তাদের বাণিজ্যপ্রবাহের পথ ঘুরিয়ে দিয়েছে; ডলারের ওপর নির্ভরশীল বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থার বিকল্প খুঁজেছে এবং নিজেদের প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ অনেক গুণ বাড়িয়েছে।

চীন অভ্যন্তরীণ বাজারে ভোগ বাড়াতে চেয়েছে। এটি তারা শুধু ভোক্তাপ্রবণতা বাড়ানোর জন্য করেনি, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা গ্রিন টেকের মতো কৌশলগত খাতে চাহিদা বাড়ানোর জন্যও করেছে।

আক্রমণাত্মক কৌশল হিসেবে চীন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কঠোর করেছে এবং প্রতিপক্ষের ওপর দ্রুত ও সুচিন্তিতভাবে জবাব দেওয়ার সক্ষমতা দেখিয়েছে।

… একই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিগুলো আসলে যুক্তরাষ্ট্রের নিজের শিল্প খাতের চীনের ওপর নির্ভরতাকে প্রকাশ করে দিয়েছে। বিশেষ করে বিরল খনিজ ও বিভিন্ন কাঁচামাল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যে চীনের ওপর নির্ভরশীল, তা ইতিমধ্যে স্পষ্ট হয়ে গেছে।

ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদকেরা বিপাকে পড়েছেন এবং অতিরিক্ত দামে তাঁরা এসব উপকরণ কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।

… চীন মনে করে, যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের চেষ্টার ফল হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে যে অর্থনৈতিক সংযোগ তৈরি হয়েছিল, তা ট্রাম্প প্রশাসন যেকোনো মূল্যে বিচ্ছিন্ন করতে চায় এবং এর মাধ্যমে ট্রাম্প চীনের উত্থান ঠেকিয়ে দিতে চান।

চীন চায় না তাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধ হোক। চীন চায় না তাদের অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা হোক। কিন্তু চীন মনে করে, চীন যদি বিচ্ছিন্ন হতে বাধ্য হয়, তাহলে তারা সে বিচ্ছিন্নতাও মেনে নিতে পারবে; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সামনে মাথা নত করবে না। চীন মনে করে, ট্রাম্প যে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেছেন, সেই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র হেরে যাবে।

এ কারণেই চীনা নেতৃত্ব, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা আত্মনির্ভরতা তৈরির দিকে মনোযোগ দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ও প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমানো।

… নিশ্চিতভাবেই ট্রাম্পের শুল্ক নীতির কারণে চীনের গায়েও আঘাত লেগেছে। বিশেষ করে কম দামের হালকা শিল্পপণ্য (যেমন পোশাক, জুতা) এসব খাতে এর ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে।

তবে এতে কিছু ইতিবাচক দিকও তৈরি হতে পারে। যেমন ছোট ছোট অদক্ষ প্রতিষ্ঠান বাদ পড়ে গিয়ে শিল্পে একধরনের সংহতি ও দক্ষতা বাড়বে। এতে বেকারত্ব বাড়তে পারে। কিন্তু চীনে যেহেতু অনেক কারখানাই অটোমেশনের মাধ্যমে চলে, সেহেতু এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব ততটা গুরুতর হবে না।

… এদিকে ট্রাম্পের শুল্ক নীতি যেসব দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে, সেগুলো আরও গুরুত্বপূর্ণ। যেমন হুয়াওয়ে ও জেডটিইয়ের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা চীনের প্রযুক্তি খাতে অগ্রগতির ইচ্ছাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন নতুন করে ভূরাজনৈতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাগুলো চীনের শাসকদের জন্য জনগণকে ‘বিদেশিদের অপমান’-এর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করার সুযোগ করে দিচ্ছে।

… ২০১৮ সালে ট্রাম্প যখন চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেন, তখন থেকেই চীন সিদ্ধান্ত নেয়, তারা নিজেদের প্রযুক্তি নিজে তৈরি করবে। এখনো সেই চেষ্টা পুরোপুরি সফল হয়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্র যখন চীনকে চেপে ধরছে, তখন চীনের সামনে এ প্রযুক্তি উন্নয়নের চেষ্টা ছাড়া আর কোনো সহজ পথ খোলা নেই।

MIT-এর হাইড্রোজেল প্যানেল, মরুভূমির বাতাস থেকে সরাসরি সংগ্রহ করবে খাবার পানি

বিশ্বজুড়ে ২০০ কোটিরও বেশি মানুষ বর্তমানে নিরাপদ ও পর্যাপ্ত পানির সংকটে ভুগছে। জলবায়ু পরিবর্তন, মরুকরণ এবং অনিয়ন্ত্রিত নগরায়নের ফলে এই সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। ঠিক এই সংকটময় সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান এমআইটি (Massachusetts Institute of Technology) একটি বৈপ্লবিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে, যা বিদ্যুৎ ছাড়াই বাতাস থেকে সরাসরি পানযোগ্য পানি সংগ্রহ করতে পারে।

এই প্রযুক্তিটি একটি “প্যাসিভ” অর্থাৎ স্বনির্ভর, শূন্য-শক্তি-নির্ভর জানালার প্যানেল, যা দেখতে অনেকটা কালো কাচের পাতের মতো হলেও এর ভেতরে রয়েছে উচ্চতর বিজ্ঞান ও প্রকৌশল নকশা। প্যানেলটির মধ্যে ব্যবহৃত হয়েছে একটি হাইড্রোজেল ম্যাট্রিক্স, যা গ্লিসারল এবং হাইগ্রোস্কোপিক লবণ দিয়ে তৈরি। এই উপাদানগুলো রাতে বাতাসের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সক্ষম।

কীভাবে কাজ করে প্রযুক্তিটি?
এই প্যানেলের ডিজাইনটি অনুপ্রাণিত হয়েছে ওরিগামি (জাপানি কাগজ ভাঁজ করার নকশা) থেকে, যার ফলে এটি সহজে ভাঁজ করা, বহনযোগ্য এবং খরচে সাশ্রয়ী। রাতে প্যানেলের ভেতরের উপাদানগুলো বাতাসের মধ্যে থাকা জলীয় বাষ্প শোষণ করে। এরপর দিনের বেলায় সূর্যের তাপে সেই আর্দ্রতা বাষ্পীভূত হয়ে বিশুদ্ধ পানিতে রূপ নেয় এবং সহজে সংগ্রহ করা যায়।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই পদ্ধতিতে কোনো ধরণের ফিল্টার বা পরিশোধন যন্ত্রের প্রয়োজন পড়ে না। প্যানেল নিজেই লবণ এবং অন্যান্য দূষণকে নিষ্ক্রিয় করে পানিকে সরাসরি পানযোগ্য করে তোলে।

এটি ক্যালিফোর্নিয়ার বিখ্যাত ‘ডেথ ভ্যালি’ অঞ্চলে পরীক্ষা করা হয়েছে, যা পৃথিবীর অন্যতম শুষ্ক অঞ্চল। পরীক্ষায় দেখা গেছে প্রতিটি প্যানেল প্রতিদিন গড়ে ১৬০ মিলিলিটার বিশুদ্ধ পানি উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছে। এটি একটি ছোট পরিবারের ন্যূনতম পানি চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট, যদি তারা কয়েকটি প্যানেল একসঙ্গে ব্যবহার করে।

এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি কোনো রকমের বিদ্যুৎ, পাইপলাইন বা পাম্প ছাড়াই কাজ করে। ফলে এটি এমন সব স্থানে ব্যবহারযোগ্য যেখানে অবকাঠামোগত সুবিধা নেই, ফলে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, মরুভূমি, মানবিক বিপর্যয়পীড়িত এলাকা, শরণার্থী শিবির, কিংবা গ্রিডবিহীন গ্রামীণ অঞ্চলে সহজে ব্যবহার করা যাবে।

হালকা ও বহনযোগ্য হওয়ায় সহজেই স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণযোগ্য। একইসাথে এটি সহজে স্কেলআপ করা যায় অর্থাৎ চাহিদা অনুযায়ী একাধিক প্যানেল বসিয়ে পানি উৎপাদন বাড়ানো যায়।

এমআইটি বর্তমানে এই প্রযুক্তির ২০২৬ সালের মধ্যে ব্যাপক পরিসরে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে। আশা করা হচ্ছে এর মাধ্যমে নিরাপদ পানির অভাব দূর করে কোটি কোটি মানুষের জীবনমানের আমূল পরিবর্তন ঘটবে।

যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে ইউরোপ

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর সামরিক খরচ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগেও বলেছেন, এই প্রচেষ্টা দুর্বল ও অপর্যাপ্ত। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চলছে চতুর্থ বছরে। এ অবস্থায় ইউরোপ এখন এক যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, যেটার জন্য সে মোটেও প্রস্তুত নয়। ট্রাম্প – “আর ইউক্রেনের যুদ্ধ চলছে চার বছর ধরে, এই ধরনের কথা যখন উঠছে তখন ইউরোপ এক এমন যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে, যার জন্য সে তৈরি না।”

২০২৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি, ডেনমার্কের গোয়েন্দা সংস্থা একটি গুরুতর সতর্কবার্তা দেয়। তারা জানায় ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ হলে, রাশিয়া মাত্র ছয় মাস বা তার কম সময়ের মধ্যে পাশের কোনো দেশে যুদ্ধ শুরুর জন্য প্রস্তুত হয়ে যেতে পার

দুই বছরের মধ্যে রাশিয়া বাল্টিক অঞ্চলে আগ্রাসন শুরু করতে পারে। পাঁচ বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য না করলে তাহলে ইউরোপের ওপর আক্রমণ করতেও পারে। যদিও রাশিয়া দাবি করেছে, তারা ইউরোপে আগ্রাসনের কোনো পরিকল্পনা করে না।

২০২৫ সালের ৫ মার্চ, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ রাশিয়ার যুদ্ধ-নির্ভর অর্থনীতিকে চ্যালেঞ্জ করে বলেন, রুশ আগ্রাসন “সীমান্ত চেনে না”।

“আজ কে বিশ্বাস করে যে রাশিয়া ইউক্রেনেই থেমে যাবে?”
— ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট

এর পরের দিনই ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্য দেশ অতিরিক্ত সামরিক খরচে একমত হয়। প্রস্তাবের মধ্যে ছিল প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানোর পরিকল্পনা।

“আমরা আবার অস্ত্রায়নের যুগে প্রবেশ করছি।”
— উরসুলা ভন ডার লেইন
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট

তবে সবাই একমত নয়। গ্রিসের সাবেক অর্থমন্ত্রী ইয়ানিস ভারুফাকিস মনে করেন, এই বড়সড় অস্ত্রায়ন অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এবং অকার্যকর। কারণ ইউরোপের নেই পূর্ণাঙ্গ কোষাগার বা প্রকৃত ক্ষমতাসম্পন্ন সংসদ।

তার মতে যুদ্ধের পরিবর্তে রাশিয়া ও চীনকে যুক্ত করে শান্তি আলোচনা হওয়া উচিত যেখানে ইউক্রেন থাকবে নিরপেক্ষ ও সার্বভৌম।

“ইউরোপকে সত্যিকারে শক্তিশালী করতে হলে প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে অস্ত্র কিনা নয়, বরং গণতান্ত্রিক ঐক্য গড়ে তোলা।”
— ইয়ানিস ভারুফাকিস
অধ্যাপক, এথেন্স বিশ্ববিদ্যালয়

এই বিতর্ক চলাকালেই রাশিয়ার সীমানাঘেঁষা পাঁচটি দেশ ফিনল্যান্ড, পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া ও এস্তোনিয়া অ্যান্টি-পার্সোনেল মাইন নিষিদ্ধকারী ওটাওয়া চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেয়।

“এর ফলে এই অঞ্চল আগামী কয়েক দশক ধরে সাধারণ মানুষের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।”
— লয়েড অ্যাক্সওয়ার্থি
সাবেক কানাডীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী

যুদ্ধের প্রস্তুতির আওয়াজ শুনছে ব্যবসা-বাণিজ্য জগতও। ইউরোপের সবচেয়ে বড় বন্দর রটারডাম ইতিমধ্যেই সামরিক সরঞ্জাম বহনকারী জাহাজের জন্য জায়গা সংরক্ষণ করেছে এবং যুদ্ধ শুরু হলে কার্গো অন্যত্র সরানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৪৫ কোটি নাগরিককে এখন অন্তত ৭২ ঘণ্টার জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য মজুত রাখতে উৎসাহিত করা হচ্ছে যেমন পানীয় জল, টিনজাত খাবার ও ওষুধ।

“প্রস্তুতি আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া উচিত, প্রত্যেকেরই এখানে ভূমিকা রয়েছে।”
— হাজা লাহবিব
ইউরোপীয় কমিশনার (প্রস্তুতি ও সংকট ব্যবস্থাপনা)

যখন সর্বত্র যুদ্ধের প্রস্তুতির কথা শোনা যাচ্ছে, তখন মনে পড়ে এক প্রাচীন রোমান লেখক ভেজেটিয়াসের কথা, যিনি ৪র্থ বা ৫ম শতকে লিখেছিলেন: “যদি তুমি শান্তি চাও, তবে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও।” আজ, অধিকাংশ ইউরোপীয়ের কামনা ভেজেটিয়াস যেন ঠিকই বলেন

বাংলা বইয়ের প্রচ্ছদ – ক্লাসিক থেকে কনটেম্পোরারি

একটি বইয়ের প্রচ্ছদ কেবল আলংকারিক অংশ নয়, এটি পাঠকের চোখে বইটির প্রথম ছাপ, একটি ভিজ্যুয়াল ভাষা যা পাঠকে বইয়ের অন্তর্গত জগতের দিকে আহ্বান জানায়। বাংলা সাহিত্য জগতে বই প্রচ্ছদের ধরণ, উপস্থাপনা ও দর্শনের অদ্ভুত এক বিবর্তন ঘটেছে যেখানে সাহিত্যের ধারা যেমন বদলেছে, তেমনি বদলেছে প্রচ্ছদের রঙ, রেখা, ফর্ম ও দর্শন। এই বিবর্তন শুধুমাত্র ডিজাইনের নান্দনিক পরিবর্তন নয়, বরং এতে মিশে আছে সময়ের সমাজ-রাজনীতি, পাঠকের মনস্তত্ত্ব, প্রযুক্তির প্রভাব এবং বাজার অর্থনীতি।

বিংশ শতকের গোড়ার দিকে বাংলা বই প্রচ্ছদের দায়িত্ব মূলত লেখক বা প্রকাশকদের হাতে ছিল, এবং প্রচ্ছদ মানেই ছিল ‘টাইটেল পেজ’-এর উপর লেখার ছাপা নাম, হয়তো সামান্য অলংকরণ। এই সময়ের প্রচ্ছদে বৈচিত্র্য খুব সীমিত হলেও কিছু ব্যতিক্রমী প্রচেষ্টা দেখা যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বইগুলোর প্রচ্ছদে কখনও কখনও দেখা গেছে তাঁর নিজের আঁকা সরল অলঙ্করণ, যা কবিতার আবহকে ছুঁয়ে গেছে।

বিশ শতকের তিরিশের দশকে কাজী নজরুল ইসলামের বইগুলোর প্রচ্ছদে ক্যালিগ্রাফির উপস্থিতি এবং রাজনৈতিক/বিপ্লবী রঙের ব্যবহার ছিল উল্লেখযোগ্য। এই সময় প্রচ্ছদে শিল্পী হিসেবে কেউ স্বীকৃত ছিলেন না। প্রচ্ছদ ছিল কনটেন্টের সারাংশের এক রূপ, তার চেয়ে বেশি কিছু নয়।

পঞ্চাশের দশকের পর বাংলা সাহিত্য জগতে আধুনিকতার প্রভাব পড়ে এবং সেই প্রভাব প্রচ্ছদেও প্রতিফলিত হয়। সৈয়দ শামসুল হক, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদের বইগুলোর প্রচ্ছদে কেবল রঙের নয়, বরং সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতীক ব্যবহারে বৈচিত্র্য দেখা যায়।

এই সময় একঝাঁক শিল্পী প্রচ্ছদ শিল্পে আত্মপ্রকাশ করেন, এদের মধ্যে মোতাহের হোসেন চৌধুরী, কামরুল হাসান প্রমুখ। কামরুল হাসানের আঁকা প্রচ্ছদে লোকশিল্প, জমিনের গ্রাফিক্স ও রাজনৈতিক বার্তার এক চমৎকার সমন্বয় দেখা যায়। এই সময় প্রচ্ছদ শিল্পীর নাম বইয়ের কোথাও উল্লেখ না থাকা সত্ত্বেও, তাঁদের সৃষ্টিতে একটি নিজস্ব ভাষা গড়ে ওঠে।

নব্বইয়ের দশক থেকে বইয়ের প্রচ্ছদে স্পষ্টভাবে ডিজিটাল টুলসের প্রভাব দেখা যেতে থাকে। হাতে আঁকা অলংকরণ ধীরে ধীরে ডিজিটাল কম্পোজিশনের কাছে স্থান হারাতে শুরু করে। ফটোশপ, কোরেল ড্র ইত্যাদি সফটওয়্যার ব্যবহার করে প্রচ্ছদ তৈরি হতে শুরু করে। ফলাফলে প্রচ্ছদের অভিব্যক্তি আরও মোটা, চকচকে, এবং খানিকটা বাজারি হয়ে ওঠে। এই সময় পাঠকের রুচিতেও পরিবর্তন ঘটে তাঁরা বই কেনার সময় প্রচ্ছদ দেখে আকৃষ্ট হচ্ছেন। এই প্রবণতা প্রকাশকদের কাছে প্রচ্ছদকে “প্রোডাক্ট প্যাকেজিং” হিসেবে ভাবতে বাধ্য করে। কিছু ক্ষেত্রে এতে সৃজনশীলতা কমে যায়, প্রচ্ছদ হয়ে ওঠে এক ধরনের কপি-পেস্ট স্লোগান। তবে এর মধ্যেও কাজী রকিব, সাবের হোসেন, তানভীর আহমেদের মতো ডিজাইনাররা প্রচ্ছদে নতুন ভাবনার জোয়ার আনেন।

বর্তমান সময়ের বাংলা বই প্রচ্ছদ যেন এক বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। ডিজাইনার এখন কেবল একজন কারিগর নন, বরং বইয়ের পাঠ-বিশ্লেষক, কনসেপ্ট ডেভেলপার। প্রচ্ছদে টাইপোগ্রাফি, নেগেটিভ স্পেস, ন্যারেটিভ আর্ট এবং বিমূর্ত প্রতীকের ব্যবহারে এসেছে একধরনের কনটেম্পোরারি দৃষ্টিভঙ্গি।

বইমেলা কেন্দ্রিক প্রচ্ছদ ডিজাইনে আজ বাংলাদেশে যে বৈচিত্র্য দেখা যায়, তা অভূতপূর্ব। তরুণ ডিজাইনারদের মধ্যে কিছু চমৎকার নাম উঠে এসেছে—তন্ময় আহমেদ, আহনাফ আল মাসুদ, সালমান হক, মোশারফ করিম ইত্যাদি যাঁরা ডিজাইনকে বইয়ের সম্প্রসারিত পাঠ্য হিসেবে উপস্থাপন করছেন। তাঁরা প্রচ্ছদে সাহিত্য পাঠের গভীরতা, মনস্তাত্ত্বিক ভাষা, এবং পাঠকের অভিজ্ঞতার দিকগুলো গুরুত্ব দিচ্ছেন।

ধ্রব এষ বাংলা বইয়ের প্রচ্ছদ ডিজাইনের এক অতুলনীয় নাম, যিনি আধুনিক বাংলা বই প্রচ্ছদ ডিজাইনের সূচনা এবং বিকাশে অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি অসংখ্য বই, ম্যাগাজিন ও প্রকাশনার প্রচ্ছদ ডিজাইন করেছেন, যা আজও বাংলা গ্রাফিক ডিজাইনের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।

বর্তমান ডিজাইন দর্শনে প্রচ্ছদ শুধু নজরকাড়া নয়, এটি পাঠকের সঙ্গে একটি সাইকোলজিকাল সংযোগ তৈরি করে। প্রচ্ছদ যেন বইয়ের একটি প্রি-ল্যাঙ্গুয়েজ ফর্ম, যা পাঠকের মস্তিষ্কে একটি নির্দিষ্ট অনুভূতি সঞ্চার করে। ভালো প্রচ্ছদ পাঠককে বইয়ের ভিতরের জগতে ঢোকার আমন্ত্রণ জানায়।আজকের ডিজাইনাররা জানেন একটি প্রচ্ছদে কম রঙ, কম এলিমেন্ট দিয়েও একটি শক্তিশালী বার্তা দেওয়া যায়। মডার্ন মিনিমালিজম, লোকজ মোটিফ, ভিন্নধর্মী টাইপোগ্রাফি, এমনকি সোশ্যাল মিডিয়া উপযোগী কাভার ডিজাইন সব কিছুই এখন প্রচ্ছদের অংশ।

বাংলা বই প্রচ্ছদের বিবর্তন একটি সময়-নির্ভর নান্দনিক ভ্রমণ। এটি কেবল প্রযুক্তি বা শিল্পের পরিবর্তনের ইতিহাস নয়, বরং সমাজের সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের প্রতিফলন। প্রচ্ছদ এখন আর বইয়ের বাইরের আচ্ছাদন নয় এটি একটি পাঠ্যচিত্র, একটি ন্যারেটিভ, একটি নিঃশব্দ ভাষা যা পাঠকের মনে প্রথম রেখাটি এঁকে দেয়।

সবচেয়ে বেশি অস্ত্র আমদানি করে যে ১০টি দেশ

বিশ্বে সামরিক সরঞ্জাম আমদানির চিত্র গত ৫ বছরে নাটকীয়ভাবে পাল্টে গেছে। বিশ্বজুড়ে সংঘাত, নিরাপত্তা উদ্বেগ ও প্রতিরক্ষাসক্ষমতা জোরদারের চেষ্টায় সামরিক সরঞ্জাম আমদানির হার গত কয়েক বছরে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।

সুইডেনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই) ২০২০-২৪ সালের বৈশ্বিক অস্ত্র আমদানির তথ্য প্রকাশ করেছে।

২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ইউক্রেন বিশ্বের শীর্ষ অস্ত্র আমদানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। এ সময় বিশ্বজুড়ে মোট আমদানি হওয়া অস্ত্রের ৮.৮%-ই করেছে দেশটি। সেখানে সামরিক অস্ত্র আমদানি আগের পাঁচ বছরের তুলনায় শতগুণ বেড়েছে। এসআইপিআরআই বলেছে, রাশিয়ার হামলার পর ২০২৩ ও ২০২৪ সালে ইউক্রেনকে অন্তত ৩৫টি দেশ অস্ত্র সরবরাহ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র সরবরাহ করে। শীর্ষ সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে আছে যথাক্রমে জার্মানি ও পোল্যান্ড।

বৈশ্বিক অস্ত্র আমদানিতে দ্বিতীয় অবস্থানে নেমে এসেছে ভারত। ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে মোট আমদানি হওয়া অস্ত্রের ৮.৩% করেছে ভারত। তবে আগের পাঁচ বছরের (২০১৫-১৯) তুলনায় আমদানি ৯.৩% কমেছে। এর কারণ, নিজস্ব অস্ত্র উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পে বিনিয়োগ। দেশটিতে এখনো সবচেয়ে বেশি অস্ত্র সরবরাহ করে রাশিয়া। এ ছাড়া ফ্রান্স, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রও দেশটিতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অস্ত্র সরবরাহ করে।

মধ্যপ্রাচ্যের ছোট্ট ধনী দেশ কাতার বিশ্বের শীর্ষ অস্ত্র আমদানিকারী দেশগুলোর তালিকায় তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে। ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশটির অস্ত্র আমদানি আগের পাঁচ বছরের তুলনায় ৩ গুণ বেড়েছে। বৈশ্বিক অস্ত্র আমদানিতে দেশটির অংশীদারত্ব ৬.৮%। যুক্তরাষ্ট্র থেকে সর্বাধিক অস্ত্র কেনে কাতার। এ ছাড়া ইতালি ও যুক্তরাজ্য থেকেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অস্ত্র আসে।

২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বৈশ্বিক অস্ত্র আমদানির ৬.৮%-ই করেছে সৌদি আরব। যুক্তরাষ্ট্র দেশটির প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী হলেও স্পেন এবং ফ্রান্স থেকেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অস্ত্র আসে। সৌদি আরবের আমদানি করা প্রধান প্রধান অস্ত্রের মধ্যে আছে এফ-১৫ এসএ যুদ্ধবিমান, থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, ড্রোন ও কামান।

২০২০-২৪ সালে বৈশ্বিক অস্ত্র আমদানির ৪.৬% করেছে পাকিস্তান। চীন পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ। পাশাপাশি তুরস্ক ও নেদারল্যান্ডস থেকেও আসে অস্ত্র। পাকিস্তান আমদানি করে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান, চীনা ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও ফ্রিগেট যুদ্ধজাহাজ।

প্রথাগতভাবে প্রতিরক্ষায় সংযত হলেও জাপান গত পাঁচ বছর বড় অস্ত্র আমদানিকারক হয়ে উঠেছে। এ সময় তারা বৈশ্বিক আমদানির ৩.৯% করেছে। উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি এবং চীনের সামরিক উত্থান জাপানকে আরও সতর্ক করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র জাপানের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী। যুক্তরাজ্য ও জার্মানিও উল্লেখযোগ্য অংশীদার।

অস্ট্রেলিয়া দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক ভারসাম্য বজায় রাখতে গত পাঁচ বছরে অস্ত্র আমদানিতে গুরুত্ব দিয়েছে। ২০২০-২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে অস্ত্র আমদানির ৩.৫% করেছে দেশটি। অস্ট্রেলিয়ার প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন ও নরওয়ে।

মিসর অস্ত্র আমদানিতে ৮ম অবস্থানে রয়েছে। বৈশ্বিক অস্ত্র আমদানির ৩.৩ শতাংশের অংশীদার তারা। দেশটি জার্মানি, ইতালি ও ফ্রান্স থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র আমদানি করে।

বিশ্বের বৃহত্তম অস্ত্র রপ্তানিকারক যুক্তরাষ্ট্র নিজেও অস্ত্র আমদানি করে। বিশ্বজুড়ে অস্ত্র আমদানির ৩.১% করে দেশটি। এফ-৩৫ ও অন্যান্য প্রযুক্তির উন্নয়নে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও ইসরায়েল থেকে বিশেষ সরঞ্জাম কেনে যুক্তরাষ্ট্র। এ ছাড়া পরীক্ষামূলক অস্ত্রপ্রযুক্তিও আমদানি করে তারা।

বিশ্বজুড়ে অস্ত্র আমদানির ৩.১% আমদানি করে মধ্যপ্রাচ্যের আরেক তেলসমৃদ্ধ দেশ কুয়েত। দেশটি যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি ও ফ্রান্স থেকে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র কেনে।

আমেরিকা থেকে ইউরেশিয়া হয়ে, ইউরোপ থেকে আমেরিকায় ঘোড়ার ঐতিহাসিক ঘূর্ণিপথ

ঐতিহাসিকদের মতে ঘোড়া প্রথম আমেরিকায় আসে প্রায় ৫০ মিলিয়ন বছর আগে, যখন এদের পূর্বপুরুষরা উত্তর আমেরিকায় বিচরণ করত। ইওসিন যুগে হিরাকোথেরিয়াম (Hyracotherium) নামের ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী থেকে শুরু করে মেসোহিপ্পাস (Mesohippus) এবং মেরিচিপ্পাস (Merychippus)-এর মতো বিবর্তিত রূপগুলো উত্তর আমেরিকার তৃণভূমি এবং বনভূমিতে অবাধে ঘুরে বেড়াত। এই প্রাণীগুলো পরিবেশের সাথে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছিল, তাদের দাঁত ঘাস খাওয়ার উপযোগী হয়েছিল এবং তাদের পা দ্রুত দৌড়ানোর জন্য লম্বা ও শক্তিশালী হয়েছিল।

একসময় এখানকার বৈশ্বিক জলবায়ু ও পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে এই প্রাণীগুলো বিলুপ্ত হয়ে যায়। তবে প্রাগৈতিহাসিক যুগে পৃথিবীর তাপমাত্রা কমে আসায় বরফ যুগের সূচনা হয় এবং বেরিং ল্যান্ড ব্রিজ তৈরি হয়, যার ফলে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার বছর আগে ঘোড়া বেরিং প্রণালী দিয়ে এশিয়াতে ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে কিছু ঘোড়া ইউরোপ এবং আফ্রিকার দিকে অগ্রসর হয়, যেখানে তারা বিভিন্ন প্রজাতির জন্ম দেয়।

প্রাক-কলম্বীয় যুগে উত্তর আমেরিকায় ঘোড়ার বিলুপ্তি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং রহস্যময় ঘটনা ছিল। ধারণা করা হয়, শেষ বরফ যুগের সমাপ্তি এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে এই বিলুপ্তি ঘটেছিল। প্রায় ৮,০০০ থেকে ১০,০০০ বছর আগে পৃথিবীর জলবায়ু দ্রুত পরিবর্তিত হয়, যার ফলে বৃহৎ তৃণভূমির অভাব দেখা দেয় এবং অনেক বড় আকারের প্রাণীর খাদ্য সংকট দেখা দেয়। একই সাথে, মানব শিকারীদের আবির্ভাবও এই বিলুপ্তির একটি কারণ হতে পারে। এই শিকারীরা ঘোড়ার মতো বড় প্রাণীদের ব্যাপক হারে শিকার করত, যা তাদের সংখ্যা দ্রুত কমিয়ে দিয়েছিল। এরপর প্রায় ১০,০০০ বছর ধরে উত্তর আমেরিকায় কোনো ঘোড়ার অস্তিত্ব ছিল না, এক দীর্ঘ সময়ের জন্য এই মহাদেশ ঘোড়া শূন্য ছিল।

তবে কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের পর ইউরোপীয় উপনিবেশবাদীরা ঘোড়াকে আবার আমেরিকায় নিয়ে আসে, এটি ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। ১৫১৯ সালে হার্নান কর্টেসের মেক্সিকো বিজয়ের সময় স্পেনীয়রা প্রথম ঘোড়া নিয়ে আসে। এই ঘোড়াগুলো ছিল মূলত আন্দালুসিয়ান, বারবার এবং আরব প্রজাতির মিশ্রণ। এই প্রজাতিগুলো ছিল শক্তিশালী, দ্রুত এবং দীর্ঘ যাত্রার জন্য অত্যন্ত উপযুক্ত। তাদের শারীরিক গঠন এবং মানসিক দৃঢ়তা তাদের নতুন পরিবেশে টিকে থাকতে সাহায্য করেছিল এবং উপনিবেশ স্থাপনে স্পেনীয়দের জন্য অপরিহার্য ভূমিকা পালন করেছিল।

স্পেনীয়দের আগমনের পর ঘোড়া আমেরিকার স্থানীয় সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং যুদ্ধ কৌশলকে সম্পূর্ণভাবে পাল্টে দেয়। স্থানীয় আমেরিকান উপজাতিরা, যেমন সু, চেইয়েন, কমাঞ্চ এবং আপাচি, ঘোড়ার ব্যবহার দ্রুত শিখেছিল এবং এটি তাদের জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। ঘোড়ার পিঠে চড়ে তারা শিকার, যুদ্ধ এবং বাণিজ্য করত। ঘোড়া তাদের গতিশীলতা বহুগুণ বাড়িয়েছিল এবং মহিষের মতো বৃহৎ প্রাণী শিকার ও খাদ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়াকে অনেক সহজ করে তুলেছিল। ঘোড়া তাদের সামাজিক কাঠামো, যাযাবর জীবনধারা এবং উপজাতীয় ক্ষমতাকে প্রভাবিত করেছিল, যার ফলে অনেক উপজাতি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

ঘোড়ার আগমন আমেরিকার ভূদৃশ্যকেও প্রভাবিত করেছিল। ঘোড়ার দ্রুত চলাচল এবং বৃহৎ তৃণভূমি চারণের ক্ষমতা পরিবেশগত ভারসাম্যকে প্রভাবিত করেছিল, বিশেষ করে পশ্চিমাঞ্চলের তৃণভূমিগুলো নতুনভাবে বিন্যস্ত হয়েছিল। একই সাথে ঘোড়ার বিস্তৃতি কৃষি কাজেও নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।কৃষকরা ঘোড়ার সাহায্যে জমি চাষ এবং ফসল পরিবহনে সক্ষম হয়, যা কৃষিজ উৎপাদন বৃদ্ধি করে এবং তাদের জীবনযাত্রাকে আরও স্থিতিশীল করে তোলে। ঘোড়ার শক্তি এবং সহনশীলতা মানব শ্রমের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়েছিল এবং বড় আকারের কৃষি কার্যক্রম সম্ভব করেছিল।

ঘোড়া মূলত উত্তর আমেরিকাতেই বিবর্তিত হয়েছিল। সেখান থেকে বেরিং ল্যান্ড ব্রিজ পেরিয়ে এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়ে। ইউরোপে ঘোড়ার বিভিন্ন প্রজাতি এবং উপপ্রজাতি বিকশিত হয়, যা পরবর্তীতে স্পেনীয় উপনিবেশবাদীরা আবার আমেরিকায় নিয়ে আসে। এই প্রত্যাবর্তন ছিল এক ঐতিহাসিক আবর্তন, যেখানে ঘোড়া তার আদি জন্মভূমিতে ফিরে এসেছিল, তবে এবার নতুন প্রজাতি এবং নতুন ভূমিকা নিয়ে। কলম্বাসের যাত্রার পর স্পেনীয়রা যে ঘোড়াগুলো নিয়ে এসেছিল, সেগুলো মূলত তাদের সেনাবাহিনী, কৃষিকাজ এবং পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হতো। এটি কেবল একটি প্রত্যাবর্তন ছিল না, বরং একটি সাংস্কৃতিক বিনিময়ও ছিল, যেখানে ইউরোপীয় প্রযুক্তি এবং জীবনধারা আমেরিকার স্থানীয় পরিবেশে মিশে গিয়েছিল।

আমেরিকায় আসার পর ঘোড়ার বংশবিস্তার দ্রুত গতিতে হয়। কিছু ঘোড়া পাল থেকে পালিয়ে যায় এবং বন্য ঘোড়ায় (মুস্তাং) পরিণত হয়। এই মুস্তাংগুলো উত্তর আমেরিকার বিশাল তৃণভূমিতে অবাধে বিচরণ করত এবং তাদের সংখ্যাও দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এই বন্য ঘোড়াগুলো স্থানীয় আমেরিকান উপজাতিদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হয়ে ওঠে। তারা বন্য ঘোড়া ধরে প্রশিক্ষণ দিত এবং তাদের নিজস্ব কাজে ব্যবহার করত, যা তাদের শিকার, যুদ্ধ এবং পরিবহনের ক্ষমতাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছিল। উনিশ শতকে ঘোড়ার সংখ্যা ছিল শীর্ষে। তখন আমেরিকা মহাদেশের বিভিন্ন স্থানে ঘোড়া ব্যবহার করা হতো। পরিবহণ থেকে শুরু করে কৃষি কাজ, সেনাবাহিনী এবং খেলাধুলা – সবক্ষেত্রেই ঘোড়ার ব্যবহার ছিল ব্যাপক এবং অবিচ্ছেদ্য। রেলপথের প্রসারের আগেও ঘোড়া ছিল দ্রুততম পরিবহন ব্যবস্থা।

বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে মোটর গাড়ির আবিষ্কার এবং আধুনিক প্রযুক্তির বিকাশের ফলে ঘোড়ার ব্যবহার কিছুটা কমে যায়। রেলপথ, গাড়ি এবং ট্রাকের প্রসারের ফলে ঘোড়ার উপর মানুষের নির্ভরতা কমে আসে। তবে ঘোড়ার গুরুত্ব পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি। আধুনিক যুগে ঘোড়া এখনও রেসিং, পলো, ড্রেসেজ, ইকুয়েস্ট্রিয়ান জাম্পিং এবং থেরাপি সহ বিভিন্ন খেলাধুলা এবং বিনোদনের কাজে ব্যবহৃত হয়। এটি কেবল একটি খেলাধুলা নয়, বরং একটি শিল্প এবং জীবনধারা হিসেবেও টিকে আছে। এছাড়াও কিছু স্থানে ঘোড়া এখনও পরিবহন এবং কৃষিকাজে ব্যবহৃত হয়, বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে এবং যেসব স্থানে আধুনিক যানের প্রবেশাধিকার সীমিত। ঘোড়ার মাংস ও দুধও কিছু অঞ্চলে খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যদিও এটি সব সংস্কৃতিতে প্রচলিত নয়।

ঘোড়ার আমেরিকা থেকে বিলুপ্তি এবং তারপর ইউরোপ থেকে প্রত্যাবর্তন একটি অসাধারণ ঐতিহাসিক ঘটনা। এই ঘটনা মানব সভ্যতার অগ্রগতি এবং পরিবেশের সঙ্গে তার সম্পর্কের এক প্রতিচ্ছবি। ঘোড়া কেবল একটি প্রাণী নয়, এটি ইতিহাসের সাক্ষী, যা মানব জাতির বিবর্তন এবং তার সংস্কৃতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। এটি প্রমাণ করে কীভাবে একটি প্রাণী একটি মহাদেশের ইতিহাস, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে।

এই ঐতিহাসিক আবর্তন ঘোড়ার অভিযোজন ক্ষমতা এবং মানুষের সাথে তার সহাবস্থানের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ঘোড়া সম্ভবত মানব ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পশু, যার অবদান ইতিহাস জুড়ে বিদ্যমান।

আলাউদ্দিন খিলজি – কিভাবে ধর্ম ছাড়াই শাসন বৈধতা গড়লেন?

মধ্যযুগের ভারতীয় উপমহাদেশে যখন রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা ও আরব-ইসলামিক বিশ্বে খলিফাতন্ত্রের ছায়া ভারী হয়ে উঠছিল তখন দিল্লি সালতানাতের দ্বিতীয় খিলজি শাসক আলাউদ্দিন খিলজি (শাসনকাল: ১২৯৬–১৩১৬) এক ব্যতিক্রমী পথ অনুসরণ করেন। তিনি খলিফার আনুগত্য স্বীকার না করেই ক্ষমতা ধরে রাখেন এবং নিজের রাষ্ট্রকে একটি স্বাধীন ও বাস্তবভিত্তিক প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসেন।আলাউদ্দিন রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখতে মূল্য নিয়ন্ত্রণ, সামরিক ও রাজস্ব সংস্কার, কৃষিনীতি ও বাজারব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এক নতুন ধরনের মধ্যযুগীয় অর্থনৈতিক রাজনীতির জন্ম দেন।

তুর্কি ও আফগান শাসকরা সাধারণত ইসলামী খলিফার অনুমোদনকে তাদের শাসনের বৈধতা হিসেবে দেখাতেন। কিন্তু আলাউদ্দিন খিলজি এর বিরোধিতা করেন। তিনি খলিফার নামে খুতবা পড়ানো বন্ধ করে দেন এবং নিজেকে “জামানার আইনদাতা” (Zil-e-Ilahi নয়, বরং কার্যকর ‘শক্তির কেন্দ্র’) হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান। এটি শুধু ধর্মীয় বৈধতা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করাই নয় বরং ছিল এক নবজাত রাজনৈতিক আদর্শ। যেখানে রাষ্ট্র ক্ষমতার উৎস হলো প্রশাসনিক দক্ষতা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামরিক শক্তি, not divine sanction.

আলাউদ্দিন শাসনের প্রথম দিকেই বিদ্রোহ, জমিদারদের ষড়যন্ত্র ও দুর্বল কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থার কারণে চাপ অনুভব করছিলেন। এই প্রেক্ষাপটে তিনি চারটি মৌলিক স্তম্ভে প্রশাসনিক সংস্কার গড়ে তোলেন।

তিনি প্রথমবারের মতো ‘খালিসা’ এলাকা অর্থাৎ রাজস্ব সরাসরি রাজকোষে যাবে এমন অঞ্চল পরিচালিত করেন। ভূমির উর্বরতা অনুযায়ী কৃষকদের থেকে কর নেওয়ার জন্য রাজস্ব কর্মকর্তা নিয়োগ করেন। এর মাধ্যমে জমিদারদের ক্ষমতা সীমিত হয়, কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ আসে।

রাজ্যের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ‘চৌকি’ স্থাপন করে সেখানে গোপনচর নিয়োগ দেওয়া হয়। এই গোয়েন্দারা স্থানীয় শাসকদের কার্যকলাপ নজরে রাখত।রাজনৈতিক বিদ্রোহের সম্ভাবনা আগেই নিরসন হতো।

তিনি শাসনের ক্ষেত্রে ধর্মীয় পক্ষপাত না দেখিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখেন, যেখানে অপরাধ অনুযায়ী বিচার হতো। আলাউদ্দিন খিলজির সবচেয়ে আলোচিত সংস্কার ছিল বাজার নিয়ন্ত্রণ ও মূল্য নির্ধারণ। এটি ছিল একটি বিপ্লবী ধারণা যেখানে তিনি সরাসরি রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে দ্রব্যের মূল্য, মজুরি ও চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করতেন।

চাল, আটা, ঘি, দুধ, কাপড়ের সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ করে দেন। শ্রমিক ও সেনাদের মজুরি নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। বাজারে অতিরিক্ত মজুদ ও মুনাফাখোরি রোধে ‘দারি’ নামক গোয়েন্দা নিযুক্ত করা হয়। দাম নিয়ন্ত্রণে “হিসাবদার” ও “মুন্সি” নিয়োগ করে সরকার বাজার মনিটর করে।

এই পদ্ধতি অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করে তোলে এবং সৈন্যদের কম বেতনে জীবিকা নির্বাহ সম্ভব করে, যা রাজকোষের ওপর চাপ কমায়। আলাউদ্দিন বুঝেছিলেন, প্রশাসনিক শক্তি তখনই কার্যকর হয় যখন সেনাবাহিনী শক্তিশালী ও নিয়ন্ত্রিত থাকে। তাই তিনি ‘দাগ’ (ঘোড়ার গায়ে ছাপ) এবং ‘হুলিয়া’ (সৈনিকের বর্ণনা) প্রথা চালু করেন, যাতে বেতনভোগী সেনাবাহিনী অসততা করতে না পারে। সৈন্যদের সরাসরি কেন্দ্র থেকে নিয়োগ দেওয়া ও মজুরি পরিশোধ করতেন। এর ফলে রাজন্যশ্রেণির প্রভাব কমে যায় এবং সেনাবাহিনী সুলতানের প্রতি অনুগত থাকে।

আলাউদ্দিন খিলজি প্রমাণ করেন, মধ্যযুগের ভারতেও ধর্মীয় অনুমোদন ছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনা সম্ভব, যদি শাসক নিজেই অর্থনীতি, সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। তিনি ইসলামী আইন (শরিয়াহ)-এর বদলে “জবরদস্তি নিয়ম” প্রচলন করেন, যা ছিল বাস্তব ভিত্তিক। এ কারণে অনেক ঐতিহাসিকই বলেন তিনি ছিলেন “ধর্মনিরপেক্ষ অথচ একনায়ক শাসক”, যিনি মধ্যযুগের রাষ্ট্রনীতিতে ব্যতিক্রমী চিন্তা এনেছিলেন।

আলাউদ্দিন খিলজির প্রশাসনিক সংস্কার ও মূল্য নিয়ন্ত্রণ ছিল শুধুমাত্র অর্থনৈতিক বা সাংগঠনিক কৌশল নয়, ছিল রাজনৈতিক বৈধতা প্রতিষ্ঠার কৌশল। খলিফার ছত্রছায়া ছাড়াই কিভাবে একজন শাসক জনগণ, অর্থনীতি ও সৈন্যদের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রেখে রাষ্ট্রের ভিত্তিকে স্থিতিশীল করতে পারেন আলাউদ্দিন তার প্রমাণ।

তাঁর শাসনামল দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যযুগীয় ইতিহাসে একটি অনন্য নজির, যেখানে রাজনৈতিক বাস্তবতা ধর্মীয় অনুশাসনের চেয়ে বেশি কার্যকর ভূমিকা রেখেছিল। অর্থনীতি ও প্রশাসনের শক্তি কিভাবে রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে তা আজও এক মূল্যবান পাঠ।

ট্রাম্পের ইউক্রেন পরিকল্পনার নেপথ্যে যুদ্ধ, না বাণিজ্য?

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অনেক আলোচনার পর প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিতে যাচ্ছেন ইউক্রেনকে। অবশ্য সরাসরি নয়। যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রতিটি ১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ওই ব্যবস্থা কিনবে ইউরোপ। এরপর সেগুলো ইউক্রেনকে দেওয়া হবে।

নতুন এই ব্যবস্থার ফলে একদিকে আর্থিকভাবে লাভবান হবে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে ইউক্রেনকে সরাসরি অস্ত্র সহায়তার সমালোচনাও আড়াল করতে পারবেন ট্রাম্প। এজন্যই তার সোমবারের ইউক্রেন সংক্রান্ত ঘোষণাকে কৌশলগত দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলা হচ্ছে।

সোমবার ট্রাম্প রাশিয়াকে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য করার জন্য দুটি উদ্যোগ ঘোষণা করেন। এর মধ্যে রয়েছে কিয়েভে নতুন অস্ত্র পাঠানো এবং আগামী ৫০ দিনের মধ্যে শান্তি না এলে মস্কোর ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার হুমকি। তিনি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি বিরক্তিও প্রকাশ করেন। কারণ তার শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবগুলো মস্কো উপেক্ষা করেছে।

হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তা সিএনএনকে জানান, ট্রাম্প ‘সেকেন্ডারি ট্যারিফ’ বলতে বোঝাতে চেয়েছিলেন রাশিয়ার ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক এবং সেইসব দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা যারা রাশিয়ার তেল কিনছে। যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার সঙ্গে খুব সামান্য বাণিজ্য করে। এই নিষেধাজ্ঞা ভারতের মতো দেশ ও চীনের ওপর পড়বে, যারা রাশিয়ার তেল কিনছে। এটি রুশ অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।

যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কর্মকর্তার মতে, ইউক্রেনকে নতুন অস্ত্র সরবরাহের এই উদ্যোগ মস্কোর প্রতি একটি স্পষ্ট বার্তা দেবে। এটি বোঝাবে, পুতিনের প্রতি ট্রাম্পের বিরক্তি সত্যিই গভীর। কারণ গত সপ্তাহেই তিনি রুশ নেতার কর্মকাণ্ডকে “বাজে কথা” বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।

পাশাপাশি, ট্রাম্প এই উদ্যোগ থেকে বড় অঙ্কের আর্থিক লাভের আশাও করছেন। কারণ একটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র সিস্টেমের দাম প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার। তিনি ইতোমধ্যেই এই পরিকল্পনাকে যুক্তরাষ্ট্রের লাভজনক একটি স্কিম হিসেবে প্রচার করেছেন।

জনপ্রিয় ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট ও দৈনন্দিন কার্যকারিতা বৃদ্ধিতে এদের ভূমিকা

বর্তমান ডিজিটাল যুগে ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রযুক্তি দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। কমান্ডের মাধ্যমে তথ্য অনুসন্ধান, কাজ সম্পন্ন এবং স্মার্ট ডিভাইস নিয়ন্ত্রণে এর চাহিদা বাড়ছে। গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট, অ্যাপল সিরি, অ্যামাজন অ্যালেক্সা ও মাইক্রোসফট কোর্টানা বিশ্বের অন্যতম প্রধান ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট।

গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট (Google Assistant)

গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট গুগলের তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট, যা স্মার্টফোন, স্মার্ট স্পিকার, স্মার্ট টিভি এবং অন্যান্য IoT ডিভাইসের সঙ্গে কাজ করে। এটি বাংলা ভাষাও সমর্থন করে। গুগল অ্যাসিস্ট্যান্টের মাধ্যমে ব্যবহারকারী তথ্য খোঁজা, রিমাইন্ডার সেট করা, মিউজিক চালানো, ঘরের লাইট নিয়ন্ত্রণসহ বহু কাজ ভয়েস কমান্ডে করতে পারেন। বাংলাদেশের বাজারে গুগল অ্যাসিস্ট্যান্টের বাংলা সমর্থন দ্রুত জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছে।

অ্যাপল সিরি (Apple Siri)

অ্যাপল সিরি iPhone, iPad, Mac এবং Apple Watch-এ অন্তর্ভুক্ত একটি প্রাথমিক ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট। সিরি বাংলা ভাষা সমর্থন না করলেও এটি ইংরেজি এবং অন্যান্য ভাষায় দ্রুত ও নির্ভুল সাড়া দেয়। অ্যাপল ইকোসিস্টেমের সাথে যুক্ত ব্যবহারকারীরা দৈনন্দিন কাজ যেমন কল, মেসেজ, নোট তৈরি এবং রিমাইন্ডার সেটিংয়ে সিরির ওপর নির্ভর করেন।

অ্যামাজন অ্যালেক্সা (Amazon Alexa)

অ্যামাজন অ্যালেক্সা স্মার্ট হোম ডিভাইস নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত কার্যকর। Echo স্মার্ট স্পিকার এবং অন্যান্য ডিভাইসে Alexa-এর ব্যবহার ব্যাপক।Alexa ব্যবহার করে ঘরের লাইট, ফ্যান, এসি ও অন্যান্য IoT ডিভাইস ভয়েস কমান্ডে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

মাইক্রোসফট কোর্টানা (Microsoft Cortana)
কোর্টানা মাইক্রোসফটের তৈরি ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট, এটি উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমে অন্তর্ভুক্ত। অফিস ও প্রোডাক্টিভিটি টুল হিসেবে কোর্টানা ক্যালেন্ডার ম্যানেজমেন্ট, ইমেইল পরিচালনা এবং অন্যান্য কমান্ডে সহায়ক। ভাষার সীমিত সমর্থনের কারণে বাংলাদেশে এর ব্যবহার সীমিত।

বাংলাদেশে স্মার্টফোন এবং ইন্টারনেটের দ্রুত বিস্তারের কারণে ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্টের চাহিদা বেড়েছে। বিশেষ করে গুগল অ্যাসিস্ট্যান্টের বাংলা ভাষা সমর্থন দেশীয় ব্যবহারকারীদের কাছে বড় সুবিধা । এছাড়া কিছু স্থানীয় স্টার্টআপ ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বাংলায় আরও উন্নত ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট তৈরির ওপর কাজ করছে, যা ভবিষ্যতে স্থানীয় সংস্কৃতি ও ভাষার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারবে। স্মার্ট হোম, IoT এবং দৈনন্দিন জীবনে ডিজিটাল সহায়তা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্টের জনপ্রিয়তা আরও বাড়বে। বাংলা ভাষার উন্নত উচ্চারণ স্বীকৃতি ও পার্সোনালাইজেশন প্রযুক্তি যুক্ত হলে এই প্রযুক্তি বাংলাদেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হবে।