Home Blog Page 48

“কবিতা তো একটি সময়ের দলিল” : গুলজার, কবি ও চলচ্চিত্রকার

সাবা বাশির: শুরুটা শুরু থেকেই করি গুলজার সাহেব, A Poem A Day এই বইয়ের ভাবনা কীভাবে মাথায় এলো, সেই গল্পটাই আগে জানতে চাই।

গুলজার: শুরুতেই কিছু কথা পরিষ্কার করে বলতে চাই। আমি বহুদিন ধরেই একটা জিনিস লক্ষ্য করছিলাম, স্কুল-কলেজে কবিতা নিয়ে একটা নির্দিষ্ট মানসিকতা তৈরি হয়ে গেছে। একই কবি, একই কবিতা বছরের পর বছর ধরে পড়ানো হচ্ছে। পাঠ্যক্রম এখনও শেক্সপিয়ার, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, কোলরিজ আর গালিবের গণ্ডিতেই ঘোরে! এর ফলে ছাত্রছাত্রীরা কবিতার সাথে কোনো সংযোগই খুঁজে পায় না। কবিতা যেন তাদের জীবনে প্রাসঙ্গিক নয়, হৃদয়ে বাজে না।যেমন আমি যখন ছোট ছিলাম তখন Julius Caesar পড়েছি, আজকের প্রজন্মও তাই-ই পড়ছে। তখন আমার মনে হলো, আমরা কী আদৌ প্রাসঙ্গিক সাহিত্য পড়ছি?

আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি বহুদিন, প্রজন্ম পাল্টেছে। এই প্রজন্ম ফয়েজ আহমেদের “এই দাগদাগে উজালা, এই শব-গজিদা সেহর” এর সাথে সম্পর্ক খুঁজে পায়। অথবা অমৃতা প্রীতমের সেই বিখ্যাত পঙ্‌ক্তি “আজ আখোঁয়া ওয়ারিস শাহ নূ”। এই সব কবিতা আমাকে ছুঁয়েছিল, তাই হয়তো আমিও কবি হয়ে উঠেছিলাম।

এই বইটা আমি শুরু করেছিলাম স্বাধীনতা ও দেশভাগের সময় থেকে ১৯৪৭-এর কবিতা দিয়ে। কিন্তু তখন বুঝলাম আমি শুধু উত্তর ভারতের কবিতা দেখছি!দক্ষিণে কী হচ্ছিল? পূর্ব আর পশ্চিমে? তাই ভাবলাম, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কী ধরণের কবিতা লেখা হচ্ছিল, সেটা জানতে হলে শুধু একটা ভাষায় কাজ চলবে না। একটি ভাষা দিয়ে আপনি হয়তো চোখ বা নাক স্পর্শ করতে পারেন, হয়তো গোঁফ কিংবা দাড়ি (হাসেন)। কিন্তু পুরো মুখ ছুঁতে হলে আপনাকে সমস্ত ভাষা স্পর্শ করতে হবে। আমি নিজে ছয়-সাতটি ভাষা জানি, তাই সেগুলোর কবিতা পড়া শুরু করলাম। যেমন মারাঠিতে কুসুমাগ্রাজ, বাংলায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। পরে আরও এগোলাম কে সত্যচিদানন্দনসহ অনেকের কবিতা পড়লাম। তখন যেন এক ধরণের মানসিক আলোড়ন শুরু হলো।

একদিন হার্পারকলিন্সের তখনকার প্রধান সম্পাদক কার্তিকা আমাকে বললেন, ভারতীয় কবিদের কবিতা নিয়ে একটা বই করতে পারি কি না। বিভিন্ন ভারতীয় ভাষার কবিতাগুলোর কথা ভাবতেই আমার মনে হলো, যেন একটা ঘন জঙ্গল। কিন্তু সেই জঙ্গলের ভিতরে ঢুকতেই দেখলাম, ভিতরে নিজের পথ তৈরি করা যায়। সবার আগে এটা আমার নিজের জন্যই এক ভ্রমণ হয়ে উঠল।

কোনো লেখকই শূন্যে লিখে না। আমি যখন বিভিন্ন ভাষার কবিতা পড়ছিলাম, তখন বুঝলাম এই কবিতাগুলো সেই সময়ের লড়াই, বেদনা, আন্দোলন—যেমন ভাষা আন্দোলন, নকশাল আন্দোলন, নারীবাদ আন্দোলনের প্রতিফলন। এই বই তাই একটা জাতীয় চিত্র তুলে ধরেছে, এটা আমার দেখা একটা বিস্তৃত মানচিত্র। শতাধিক কবিতা পার করতেই পথ পরিষ্কার হলো। এটা তখন শুধু আর একটা সংকলন ছিল না এটা হয়ে উঠল দেশের ইতিহাসের মধ্য দিয়ে কাব্যের এক ভ্রমণচিত্র। এইভাবেই A Poem A Day বইয়ের জন্ম।

সাবা বাশির: বইয়ের আয়তন দেখলেই বোঝা যায় কী বিশাল পরিশ্রম আপনি করেছেন। এই কবিতাগুলো বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়াটা কেমন ছিল?

গুলজার: ভারতীয় ভাষাগুলো আমাদের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। পাকিস্তানে উর্দু, সিন্ধি আর পাঞ্জাবি কবিতা আছে। শ্রীলঙ্কায় তামিল কবিতা। বাংলাদেশ তো বাঙালি কবিতায় ভরপুর। নেপালি, তিব্বতীয় ভাষাও আছে। দালাই লামার সঙ্গে অনেকেই ভারতে এসেছিলেন। অনেক বছর পেরিয়ে গেছে, অথচ এখনো অনেকে তিব্বতের কথা মনে রেখে কবিতা লেখেন, যারা দেশকেই চোখে দেখেননি। ভাষাগুলো যেন নিজে থেকেই সংযোগ তৈরি করেছিল। এই প্রকল্পের মাধ্যমে আমি ভাষার সৌন্দর্য, ছন্দ, বহুত্ববাদ সবকিছুর সৌন্দর্য আবিষ্কার করেছি।

সাবা বাশির: হ্যাঁ, সাব-কন্টিনেন্টের কবিতাগুলো তো থাকছেই, কিন্তু উত্তর-পূর্ব ভারতের কবিতাগুলোও খুব শক্তিশালী। আপনি তো সংবিধানভুক্ত ভাষার বাইরেও গিয়েছেন করবোরক, কুংকনা অনেকেই এই ভাষার নামই শোনেননি। সেগুলো নিয়ে বলবেন?

গুলজার: কুংকনা গুজরাট সীমান্তে প্রচলিত একটা আদিবাসী ভাষা। আর কঙ্কনি হচ্ছে উপকূলীয় কর্ণাটক আর গোয়ার ভাষা যেটা দুই স্ক্রিপ্টে লেখা হয় এবং এতে তামিল ও মারাঠি শব্দ প্রচুর থাকে। করবোরক ত্রিপুরার ভাষা। আদিবাসীদের আলাদা উপভাষাও থাকে। আমি সংবিধানিক ভাষাগুলোর বাইরে গিয়েছি, কারণ আমি চাইছিলাম এমন কবিতা, যা সময়কে তুলে ধরেছে, যেটা প্রাসঙ্গিক। লিপির কথাও আসে। যেমন পাঞ্জাবি লেখা হয় গুরুমুখী ও শাহমুখীতে, যেটা আবার উর্দুর লিপি থেকে এসেছে। এই অতিক্রমণ, মিশ্রণটাই সৌন্দর্য। আমি ৩৬৫টি কবিতা নিজের হাতে বেছে নিয়েছি, কিন্তু শুরুতে আমার কাছে ৪০০-রও বেশি ছিল। শেষ পর্যন্ত বেছে নিতে সময় লেগেছে নয় বছর।

সাবা বাশির: এত পরিশ্রম সত্যিই বিস্ময়কর। কবিদের কীভাবে বাছলেন? কাউকে বাদ দিতে হয়েছিল?

গুলজার: সময়ভিত্তিকভাবে বেছে নিয়েছিলাম। যেমন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ৮-১০টি কবিতা অনুবাদ করেছিলাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনটি রেখেছি, তিনটিই ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে। অরুণ কলাটকারের তিনটি কবিতা নিয়েছি।

জয়ন্ত মহাপাত্রর “প্রোগ্রেস” নামের একটি শক্তিশালী কবিতা রেখেছি ১৯৯৯ সালের সেই ভয়াবহ ঘটনায়, যখন এক অস্ট্রেলিয়ান মিশনারি ও তার দুই শিশুকে পুড়িয়ে মারা হয়। ওটা বাদ দিতে পারিনি। কিন্তু সেই কবিতাটি তাঁর কবিসত্তাকে পুরোপুরি তুলে ধরে না, তাই আরও দুটি নিয়েছি। তিনি অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমসাময়িক কবি। পাঞ্জাবি ভাষায় অমৃতা প্রীতম একটা যুগকে প্রতিনিধিত্ব করেন। হরিবংশ রাই বচ্চনের “মধুশালা”, সাহির লুধিয়ানভির “তাজ মহল” এসব অমর কবিতা বাদ দেওয়া যেত না। ফয়েজকে বাদ দেওয়া সম্ভব?

অনেক কবিকে বাদ দিতে হয়েছে এই কারণে যে, তারা হয়তো ভালো লিখেছিলেন, কিন্তু ধারাবাহিকভাবে কবিতা লেখেননি বা অন্তত দুইটি কাব্যগ্রন্থ নেই।
নারী-পুরুষ আলাদা করে ভাবিনি। কামলা দাস, পারভীন শাকির, জেহরা নিগাহ এইসব কণ্ঠ উপেক্ষা করার প্রশ্নই ওঠে না।

গজলও শুধু উর্দু নয়, মারাঠি, তামিল, হিন্দিতেও লেখা হয়েছে। দুষ্যন্ত কুমারের সেই বিখ্যাত গজল, “হো গয়ি হ্যায় পীড় পর্বত সি…” রেখেছি, হরিশ ত্রিবেদীকে দিয়ে অনুবাদ করিয়েছি্লাম।

সাবা বাশির: আপনি তো চলচ্চিত্র-জগতের কবিদেরও এনেছেন জান নিসার আখতার, সাহির, জাভেদ আখতার, প্রসূন জোশী। এমনকি অভিনেত্রী মীনা কুমারী আর দীপ্তি নাভালকেও রেখেছেন, যাঁদের কবি হিসেবে অনেকেই জানেন না।

গুলজার: হ্যাঁ, এরা আমার জগতের মানুষ। এরা কেবল সিনেমার জন্য নয়, স্বাধীন কবিতাও লিখেছেন। অনেকে জানেন না, “নাজ” ছদ্মনামে মুশায়রায় যেতেন মীনা কুমারী। আমি ভাবলাম, মনে করিয়ে দেওয়া দরকার, তাঁর আরও এক পরিচয় ছিল। দীপ্তি নাভালেরও প্রকাশিত কবিতা আছে।

সাবা বাশির: বইয়ে ৩৬৫টি কবিতা বলা হয়েছে, কিন্তু আমি একটিকে ‘লুকিয়ে থাকা রত্ন’ মনে করলাম। ৩৬৬তম কবিতা, অধিবর্ষের জন্য, আর সেটা আপনার নিজের লেখা ইজাজত সিনেমার “মেরা কুছ সামান”।

গুলজার: এটা ছিল উদয়ন মিত্রর অবদান। এখানে বলব, উদয়ন মিত্র ও অনন্ত পদ্মনাভন অনেক সাহায্য করেছেন। সম্পূর্ণ প্রকল্পে তাঁরা পাশে ছিলেন।আর ফারহানাও—সে রেকর্ড রাখত, ফাইল দেখত, উৎস ট্র্যাক করত। বড় কাজ করেছে। শেষ কবিতা নিয়ে যদি বলি, উদয়ন যুক্তি দিয়েছিল এই কবিতাটি চলচ্চিত্রের হলেও কবিতার সব উপাদান আছে। তাই এটিকে অধিবর্ষের জন্য ৩৬৬তম হিসেবে রাখা হয়।

এবার খেলা নিয়ে বাংলাদেশবিরোধী রাজনীতি ভারতের

আগামী মাসে তিন ওয়ানডে ও তিন টি-টোয়েন্টি খেলতে বাংলাদেশে আসার কথা ছিল ভারত ক্রিকেট দলের। সফরটি আইসিসি ভবিষ্যৎ সফরসূচির (এফটিফি) অংশ।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ও ভারতের ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) সফরের সূচিও চূড়ান্ত করে ফেলেছিল গত এপ্রিলে। কিন্তু চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে বিসিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ভারত আপাতত আসছে না। এক বছরের বেশি সময় পিছিয়ে ভারতের বাংলাদেশ সফরটি হবে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে। ঠিক কী কারণে পেছানো হয়েছে, তা বিসিবি বা বিসিসিআই কেউই স্পষ্ট করে বলেনি।

এর মাসখানেক আগে জুনের প্রথম দিকে একই ধরনের খবর আসে ফুটবলেও। ঢাকায় সাফ অনূর্ধ্ব-২০ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে ভারত অংশ নেবে না বলে জানিয়ে দেয় অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন (এআইএফএফ)।

২৪ জুলাই ঢাকায় বার্ষিক সাধারণ সভা(এজিএম) ডেকেছে এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল(এসিসি)। এবারের এসিসি এজিএম এশিয়া কাপের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আগস্ট-সেপ্টেম্বরে টুর্নামেন্টটি হওয়ার কথা ভারতে।

কিন্তু ভারতের ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআই এ বৈঠকের জন্য ঢাকায় আসতে রাজি নয়। শুধু ‘রাজি নয়’-তেই সীমাবদ্ধ না থেকে ঢাকায় বৈঠকের বিষয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়ে বার্তা সংস্থা এএনআইকে বলা সূত্রের মন্তব্যটি বেশ চাছাছোলা—‘এশিয়া কাপ তখনই হতে পারে, যদি সভার ভেন্যু ঢাকা থেকে পরিবর্তন করা হয়।’

মাস দুয়েকের মধ্যে বাংলাদেশে তিনটি ক্রীড়া আয়োজনে ভারতের ‘না’ করে দেওয়া, পিছিয়ে দেওয়া বা তীব্র আপত্তির পেছনে আনুষ্ঠানিক কোনো কারণ জানা যায়নি। তবে মূল কারণ কী হতে পারে, সেটির আভাস আছে ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে।

২ জুলাই বিবিসি বাংলা ভারতের বাংলাদেশ সফর নিয়ে এক প্রতিবেদনে জানায়, ‘রাজনৈতিক কারণে’ ভারতীয় ক্রিকেট দলের বাংলাদেশ সফরে ভারত সরকার সায় দিচ্ছে না।

ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র দিল্লিতে বিবিসিকে জানান, এই মুহূর্তে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যে ধরনের শীতল কূটনৈতিক সম্পর্ক বিরাজ করছে এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে ভারতে যে ধরনের ‘বিরূপ মনোভাব’ দেখা যাচ্ছে, তাতে সে দেশে ভারতের ক্রিকেট টিমের সফর কোনো ইতিবাচক বার্তা দেবে না।

কিন্তু ভারতের ক্রিকেট দলের প্রায় তিন সপ্তাহের সফরে আসা আর বিসিসিআই কর্মকর্তাদের ঢাকায় দুই দিনের বৈঠকে আসা তো এক নয়। তাহলে ঢাকায় এসিসি বৈঠক নিয়ে ভারতের এত আপত্তি কেন?

এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিষয়ে ভারত সরকারের বর্তমান অবস্থানের প্রভাব যে আছে, সেটি স্পষ্ট ‘বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যেতে নারাজ’ কথায়। তবে পাশাপাশি ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বের প্রভাবেরও ইঙ্গিত আছে।

তবে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের দ্বন্দ্বের প্রভাবের চেয়ে বাংলাদেশ বিষয়ে ভারতের অবস্থান বড় হয়ে ওঠে বিসিসিআইয়ের মূল দাবির ধরনে। তাঁরা ভেন্যু বদল চান, মানে শুধু ঢাকায়ই আসতে রাজি নন। ভারতের পাশাপাশি আফগানিস্তান আর ওমানের ক্রিকেট বোর্ডেরও নাকি ঢাকায় আসতে আপত্তি। যদি তা–ই হয়, সেটি যে ভারতের প্রভাবে, তা অনুমান করা কঠিন কিছু নয়।

পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের খেলার রাজনীতিতে নিয়মিত জড়িয়ে পড়ার ঘটনা দীর্ঘদিনের। এবার কি তাতে জুড়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের নামও?

‘জীবনানন্দ দাশ’ রূপক ও দ্বন্দ্বের  প্রয়োগ : ড. আজফার হোসেন, মার্কিন অধ্যাপক ও চিন্তক

জীবনানন্দ দাশকে আজ আমরা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে স্বীকৃতি দেই। কিন্তু জীবদ্দশায় তিনি ছিলেন প্রায় উপেক্ষিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১) জীবনানন্দের কবিতাকে প্রথমে একেবারেই গুরুত্ব দেননি, তাঁর প্রতিক্রিয়া ছিল কড়া এবং প্রায় অবজ্ঞাসূচক। পরে তিনি কিছুটা প্রশংসা করলেও, তা ছিল সংক্ষিপ্ত ও কেবল দৃশ্য-রূপকল্পের প্রশংসায় সীমাবদ্ধ। কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬) পর্যন্ত জীবনানন্দকে ঠাট্টার ছলে বলেছিলেন “তাঁর কাছে রূপকই মায়ের চেয়ে বড়।”

তবে সত্য এই, জীবনানন্দের কবিতার আসল শক্তি গড়ে উঠেছে তাঁর অসাধারণ রূপক ও চিত্ররূপ নির্মাণের মধ্য দিয়ে। যদিও তিনি এই অলঙ্কারগুলোর বাইরেও অনেক গভীরতায় পৌঁছাতে পেরেছেন। তাঁর সমকালীনদের মধ্যে একমাত্র বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮–১৯৭৪) প্রকৃতভাবে জীবনানন্দকে পাঠ করেছিলেন এবং মূল্যায়ন করার চেষ্টা করেছিলেন। তবে তাঁর এই মূল্যায়নও ছিল পাশ্চাত্য ভাবনাপ্রসূত। তিনি জীবনানন্দকে “সর্বাধিক নিঃসঙ্গ কবি” বলে অভিহিত করলেও, তাঁর লেখাকে শুধুই ব্যক্তিগত নিঃসঙ্গতা, বিচ্ছিন্নতা বা অস্তিত্ববাদী সংকটে সীমাবদ্ধ করেছেন। এই মূল্যায়ন জীবনানন্দের বিশাল ও বৈচিত্র্যপূর্ণ সাহিত্যভাণ্ডারের প্রতি সুবিচার করে না।

জীবনানন্দ দাশের সাহিত্যজীবন ১৯১৯ থেকে ১৯৫৪ এই ৩৫ বছরে বিস্তৃত। তিনি বিভিন্ন পত্রিকায় ২৬৯টি কবিতা প্রকাশ করেন, যার মধ্যে ১৬২টি কবিতা স্থান পেয়েছে তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত সাতটি কাব্যগ্রন্থে। তবে তাঁর মৃত্যুর পর গত ছয় দশকের বেশি সময়ে আবিষ্কৃত হয়েছে তাঁর ২৮টি উপন্যাস, ১০০-র বেশি গল্প, অসংখ্য প্রবন্ধ, চিঠি, ডায়রি, গান, এমনকি স্কেচ ও আঁকা ছবিও। শুধু তাঁর “সাহিত্য-নোট” ছিল ৪২৭২ পাতার বিশাল সংগ্রহ। তাই আজ আমরা বুঝি, জীবনানন্দ শুধু কবিই ছিলেন না, তিনি ছিলেন শক্তিশালী কথাসাহিত্যিক, গভীর চিন্তকও।

তাঁর উপন্যাসগুলোর যথাযথ মূল্যায়ন আজও হয়নি। ১৯৩১ থেকে ১৯৪৮ সালের মধ্যে লেখা এই উপন্যাসগুলো পূর্ণিমা, বিবহা, কারুবাসনা, জীবনপ্রণালী, প্রেতিনীর রূপকথা, মল্ল্যবান, জলপাইহাটি, বাসমতীর উপাখ্যান ও সুতীর্থ সবই পরীক্ষা-নিরীক্ষামূলক কাঠামোয় গড়া। এইসব রচনায় জীবনের অস্তিত্ব, আত্মজৈবনিক সংকট, ভাষার সীমা, সমাজ-রাজনীতি সবই জটিলভাবে জড়িয়ে আছে।

তবে সবকিছু ছাপিয়ে, জীবনানন্দ দাশ প্রথমত একজন কবি। আজকের পাঠক ও সমালোচকেরা তাঁর কবিতায় খুঁজে পান কিটসের সংবেদনশীলতা, এডগার অ্যালান পো-র রহস্যময়তা ও মৃত্যুচিন্তা, মালার্মের প্রতীকবাদ, ইয়েটসের বিষাদভাব, উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামসের চিত্রময়তা। শার্ল বোদলেয়ারের “সিনেসথেসিয়া”, এক ইন্দ্রিয়ের অনুভব অন্য ইন্দ্রিয় দিয়ে প্রকাশ জীবনানন্দের কবিতাতেও প্রবলভাবে উপস্থিত। আলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত এই বিষয়ে মূল্যবান বিশ্লেষণ করেছেন।

এছাড়াও সমালোচকেরা তাঁর লেখায় খুঁজে পেয়েছেন ইমপ্রেশনিজম, অ্যাবস্ট্রাক্ট এক্সপ্রেশনিজম, দাদাইজম, সূররিয়ালিজম এমনকি পোস্টমডার্নিজম-এর ছাপ। এ তালিকা পূর্ণ নয়, কিন্তু এটি প্রমাণ করে জীবনানন্দের কাব্যিক ভাষা কতটা বহুমাত্রিক এবং ব্যাখ্যাযোগ্য।

তাঁর কবিতা গ্রামীণ বাংলার দৃশ্যপটে দৃঢ়ভাবে স্থাপিত। বিশেষ করে “রূপসী বাংলা” গ্রন্থে পাওয়া যায় এক অনন্য চিত্রসম্ভার: শব্দহীন আলো, শিশিরে ভেজা চালতা ফুল, সন্ধ্যার ছায়ায় হিম হয়ে আসা শালিক, অশ্বিনের আকাশে কদমবন, ধানগন্ধ মাখা পেঁচা, রোদে ঝলমলে মাছরাঙা, পাকা আম, কামরাঙা, লেবু গাছের ঝোলা ডাল, শারপুঁটি-চিতল মাছের লাফ, কর্ণফুলী, পদ্মা, ধলেশ্বরী, জালাঙ্গী এবং অবশ্যই ধানসিঁড়ি নদী।

এই বাংলাই তাঁর কবিতায় হয়ে ওঠে এক “কংক্রিট ইউনিভার্সাল”। তাই তিনি বলতে পারেন “চলে যেও তুমি, তবে আমি থাকি বাংলার তীরে।”

তবে তাঁর কবিতায় শহরের বাস্তবতাও তীব্রভাবে হাজির। ট্রাম, বাস, গ্যাসবাতি, জানালা, দরজা, দোকানের সাইনবোর্ড, বস্তি, হকার, ভিখারী, দিনমজুর, রিকশাওয়ালা সবই তাঁর কবিতার উপমা ও চিত্রে পরিণত হয়েছে। জীবনানন্দ শহর ও গ্রামের দ্বন্দ্বময় সম্পর্ককে তাঁর কবিতায় ফুটিয়ে তুলেছেন এবং উপনিবেশিক বাংলার শ্রেণিবোধসম্পন্ন আধুনিক কবিদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে সচেতন একজন।

আমি পূর্বে যুক্তি দিয়েছি জীবনানন্দ তাঁর কবিতায় রাজনৈতিক অর্থনীতির ধারণাগুলো ব্যবহার করে পুঁজিবাদের পণ্য সংস্কৃতির সূক্ষ্ম সমালোচনা করেছেন। তাই তাঁকে নিছক নান্দনিক বা জীবনবিমুখ “শুদ্ধতাবাদী” হিসেবে দেখা ভুল।

জীবনানন্দের কবিতার প্রধান ভাব-প্রবণতা অনেক বিস্তৃত, ইতিহাস ও চিরন্তনের দ্বন্দ্ব, ভাষা ও প্রেমের দার্শনিকতা, ভূগোল ও মানচিত্র কল্পনা, যুদ্ধ ও শান্তি, সমাজ-সংঘাত, অতীতচেতনা, মধ্যবিত্ত রাজনীতিবিদদের ভণ্ডামি, নৈতিক পতন, হতাশা ও আশাবাদ, এমনকি বিপ্লবের ধারণা। “বিপ্লব” শব্দটি তিনি সরাসরি ব্যবহার করেছেন বহু কবিতায় যেমন “মহাপৃথিবী”, “সাতটি তারার তিমির”, “বেলা অবেলা কালবেলা” এমনকি তাঁর মৃত্যুর পর আবিষ্কৃত বহু কবিতাতেও। এইসব কবিতায় রাজনীতি ও দর্শন একত্রে কাজ করে, তাঁর কাব্যিক ভাষা যেন এক সৃষ্টিশীল তড়িৎ শক্তির বিস্ফোরণ। তাঁর সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ, দেশভাগ সবই তাঁর চেতনা ও কাব্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

সবশেষে জীবনানন্দ দাশ তাঁর “শ্রেষ্ঠ কবিতা”-র ভূমিকায় নিজেই বলেছেন তাঁর লেখাকে যেন লেবেল বা চিহ্ন দিয়ে সীমাবদ্ধ না করা হয়। তিনি চেয়েছেন তাঁর কাজকে সামগ্রিকভাবে দেখা হোক। আর এই “সামগ্রিকতা”-র প্রশ্নটি আজও পাঠক ও সমালোচকদের সামনে এক চ্যালেঞ্জ হয়েই রয়ে গেছে।

বিশ শতকের ডিজাইন আইকনিক চেয়ার

চেয়ারের মূল কাজ বসার জায়গা দেওয়া হলেও, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উপাদান, প্রযুক্তি এবং নকশার নান্দনিকতার বিবর্তনের মাধ্যমে এটি নানাভাবে রূপান্তরিত হয়েছে। বিখ্যাত স্থপতিদের নকশা করা আইকনিক চেয়ারগুলো সময়ের সীমা ছাড়িয়ে স্থায়ী হয়ে উঠেছে। উপকরণ নির্বাচন ও নকশায় ব্যবহৃত কৌশলের মাধ্যমে এই চেয়ারগুলো নিজেদের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছে এবং এখনও জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছে।

Egg Chair
স্থপতি: আরনে জ্যাকবসেন
সময় : ১৯৫৮
ডেনিশ স্থপতি আরনে জ্যাকবসেন আধুনিকতার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। ১৯৫৮ সালে তিনি কোপেনহেগেনের SAS রয়্যাল হোটেলের (বর্তমানে রেডিসন কালেকশন রয়্যাল হোটেল) জন্য এগ চেয়ারটি নকশা করেন। এর অর্গানিক ও ভাস্কর্য-সদৃশ রূপ বিশ্বব্যাপী এটিকে একটি আইকনে পরিণত করেছে। চেয়ারটি শক্ত ফোম দিয়ে তৈরি এবং সাধারণত চামড়া বা কাপড় দিয়ে মোড়ানো হয়। উচ্চ পিঠ, হাতল ও ঘুরতে সক্ষম ভিত্তির জন্য এটি দীর্ঘ সময় বসার জন্য আরামদায়ক ও নান্দনিক এক আসন।

Tulip Armchair
স্থপতি: ইরো সারিনেন
সময় : ১৯৫৮
ফিনিশ-আমেরিকান স্থপতি ইরো সারিনেনের নকশা করা টিউলিপ আর্মচেয়ার তার টিউলিপ পেডেস্টাল সিরিজের অংশ। চার পায়ার প্রচলিত ডিজাইন থেকে ভিন্ন, এটি একটি মাত্র বেস থেকে উঠে এসেছে। গ্লাসের মতো একটি একক ভঙ্গিতে চেয়ারটি নির্মিত হয়েছে। অ্যালুমিনিয়ামের পা এবং ফাইবারগ্লাসের শরীরের সাথে এই চেয়ার আধুনিক, পরিশীলিত এবং যুগান্তকারী ডিজাইনের প্রতীক।

Eames Lounge Chair and Ottoman
স্থপতি: চার্লস ও রে ইয়েমস
সময় : ১৯৫৬
চার্লস ও রে ইয়েমস আধুনিক ডিজাইনের ইতিহাসে এক প্রভাবশালী দম্পতি। ইয়েমস লাউঞ্জ চেয়ার, ইংরেজ ক্লাব চেয়ার থেকে অনুপ্রাণিত, নরম চামড়া ও বাঁকা কাঠের ব্যবহারে তৈরি। চেয়ারটি অ্যালুমিনিয়ামের ঘুরন্ত বেসে স্থাপিত এবং নান্দনিক ও আরামদায়ক আসন তৈরি করে। এটি আধুনিক আসবাবের একটি স্থায়ী প্রতীক।

Bowl Chair
স্থপতি: লিনা বো বার্ডি
সময় : ১৯৫১
ব্রাজিলের আধুনিক স্থপতি লিনা বো বার্ডির নকশা করা বাউল চেয়ার তার মানব-কেন্দ্রিক নকশা দর্শনের এক বাস্তব উদাহরণ। প্রকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত একটি গোল বাটির মতো আকৃতি বিশিষ্ট এই চেয়ার চারটি ধাতব পায়ার ওপর বসানো। এটি শুধুমাত্র বসার বস্তু নয়, বরং একটি সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক।

Panton Chair
স্থপতি: ভার্নার প্যান্টন
সময় : ১৯৫৮
ডেনিশ স্থপতি ভার্নার প্যান্টনের ডিজাইন করা এই চেয়ারটি বিশ্বের প্রথম এক টুকরো প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি চেয়ার। ইংরেজি অক্ষর ‘S’ এর মতো ঢেউখেলানো ফর্ম ও বিভিন্ন রঙে এটি এক উজ্জ্বল, তরুণ ও প্রাণবন্ত নকশার উদাহরণ।

KONICA MINOLTA DIGITAL CAMERA

Barcelona Chair
স্থপতি: লুডউইগ মিস ভ্যান ডার রোহে
সময় : ১৯২৯
মিস ভ্যান ডার রোহের “less is more” দর্শনের প্রতিফলন বার্সেলোনা চেয়ার, এটি মূলত স্পেনের রাজপরিবারের জন্য নকশা করা হয়েছিল। এক্স-আকৃতির স্টেইনলেস স্টিলের ফ্রেম ও ক্লাসিক চামড়ার আসনসহ এই চেয়ার বিলাসিতা ও আধুনিকতার সংমিশ্রণ।

Alta Armchair
স্থপতি: অস্কার নিমেয়ার
সময় : ১৯৭১
ব্রাজিলিয়ান স্থপতি অস্কার নিমেয়ার তাঁর কন্যা আনা মারিয়ার সঙ্গে মিলে এই চেয়ারটি তৈরি করেন। ঢেউখেলানো ও আকর্ষণীয় এই ফর্ম নিমেয়ারের স্থাপত্যশৈলীরই প্রতিফলন। কালো পালিশ করা কাঠ ও চামড়া দিয়ে নির্মিত এই চেয়ার আরামদায়ক ও ভাস্কর্যতুল্য।

Wassily Chair
স্থপতি: মার্সেল ব্রয়ার
সময় : ১৯২৫
বাউহাউস আন্দোলনের ছাত্র মার্সেল ব্রয়ার সাইকেলের হ্যান্ডেলবার থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ওয়াসিলি চেয়ার তৈরি করেন। স্টিল টিউব দিয়ে তৈরি এই হালকা ও আধুনিক চেয়ার বসার ধারণাকে নতুনভাবে উপস্থাপন করে।

Paimio Chair
স্থপতি: আলভার আল্টো
সময় : ১৯৩১
ফিনিশ স্থপতি আলভার আল্টো পেইমিও স্যানেটরিয়ামের জন্য এই চেয়ারটি তৈরি করেন। যক্ষ্মা রোগীদের শ্বাস নিতে সুবিধা হয় এমনভাবে চেয়ারটির ব্যাকরেস্টের কোণ নির্ধারণ করা হয়। বাঁকা পাতলা কাঠ দিয়ে তৈরি এই চেয়ার তার “form follows function” নীতির উদাহরণ।

হত্যা-ধ্বংস করলেই মিলছে পয়েন্ট, যুদ্ধকে কি ‘গেমে’ পরিণত করছে ইউক্রেন?

ইউক্রেনের ফ্রন্টলাইনে রুশ সেনা ও তাদের সরঞ্জামকে নিশানা করে চালানো হচ্ছে ড্রোন হামলা। সেসব হামলার ভিডিও করা হচ্ছে, তথ্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে, হিসাব রাখা হচ্ছে; যা ব্যবহৃত হচ্ছে সৈনিক/ইউনিটকে পুরস্কৃত করতে।

গত বছর পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়া প্রকল্প ‘আর্মি অব ড্রোনস: বোনাস’ (‘ই-পয়েন্টস’ নামেও পরিচিত)-এর আওতায় প্রতিটি ধ্বংস বা হত্যার জন্য ইউক্রেনীয় সেনাদের পয়েন্ট দেওয়া হচ্ছে।

সত্তরের দশকের টেলিভিশন গেম শো বা জনপ্রিয় ভিডিও গেম কল অব ডিউটির কিলস্ট্রিকের মতো এই প্রকল্পেও পয়েন্ট মানেই পুরস্কার।

ইউক্রেন সরকার ও সেনাবাহিনীর প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত ব্রেভ ওয়ান দল এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘লক্ষ্যবস্তু যত বেশি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও বড় মাপের হয়, প্রতিটি ইউনিট তত বেশি পয়েন্ট পায়। যেমন শত্রুপক্ষের রকেট লঞ্চার ধ্বংস করলে মেলে ৫০ পয়েন্ট ট্যাংক ধ্বংসে ৪০ পয়েন্ট আর ট্যাংক আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত করলে পাওয়া যায় ২০ পয়েন্ট।’

এই পুরো প্রক্রিয়াকে অনেকে বলছেন ‘যুদ্ধের গেমিফিকেশন’ অর্থাৎ যুদ্ধকে গেমের কাঠামোতে রূপ দেওয়া।

বিবিসি বলছে, প্রতিটি ড্রোন ভিডিও সতর্কতার সঙ্গে বিশ্লেষণ করা হয় রাজধানী কিয়েভে। সেখানে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ও কৌশলগত অগ্রাধিকার অনুযায়ী পয়েন্ট বরাদ্দ দেওয়া হয়, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তনশীল।

ইউক্রেনের ফ্রন্টলাইনের সেনারা এখন জানেন, এই ভিডিও ফুটেজ তাঁদের জন্য পুরস্কারও বয়ে আনতে পারে।

এই সেনারা ‘ই-পয়েন্টস’ প্রকল্পটি কীভাবে দেখছেন, তা জানতে বিবিসি যোগাযোগ করে ইউক্রেনের এক ডজনের বেশি সামরিক ইউনিটের সঙ্গে। প্রতিক্রিয়াগুলো ছিল মিশ্র।

দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে লড়াইরত ২২তম মেকানাইজড ব্রিগেডের সেনা জ্যাক বলেন, ‘যুদ্ধ করতে করতে আমাদের ছেলেরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তাদের মন কোনো কিছুতেই টানে না। কিন্তু এই প্রকল্প কিছুটা হলেও তাদের সাহায্য করছে। তারা পুরস্কার পাচ্ছে। এটা একটা ভালো মোটিভেশন।’

তবে এই প্রকল্প নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। অনেকের কাছে ‘ই-পয়েন্টস’ সেনাদের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত প্রেরণা জোগাতে পারছে না। স্নেক নামের এক সেনা বলেন, শুধু পয়েন্ট দিয়ে সেনাদের পালিয়ে যাওয়া ঠেকানো যাবে না।

আরেক সেনা দিমিত্রো বলেন, ‘এই প্রকল্প আমাদের বিকৃত মানসিকতারই ফল, যেখানে আমরা প্রতিটা জিনিসকে মুনাফায় রূপান্তর করতে চাই, এমনকি নিজেদের মৃত্যুকেও।’

সমালোচকদের মতে, এই পদ্ধতি নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। কেউ কেউ পুরোনো সরঞ্জামে ইচ্ছাকৃত হামলা চালিয়ে পয়েন্ট বাড়ানোরও অভিযোগ তুলছেন।

গাজা – পরিকল্পিতভাবে আবাসিক এলাকা ধ্বংস করছে ইসরাইল

গাজাজুড়ে হাজার হাজার আবাসিক ভবন নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পরিকল্পিতভাবে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিচ্ছে ইসরায়েল।

বিবিসি ভেরিফাই গাজায় মার্চে যুদ্ধবিরতি শেষের পর থেকে ৪০টি স্থানে অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়ার ফুটেজ শনাক্ত ও যাচাই করেছে। এই ফুটেজে তেল-আল-সুলতানের মতো এলাকায় বিভিন্ন স্কুলসহ আবাসিক ও পৌর ভবনও ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে দেখা গেছে।

তেল আল সুলতান রাফা নগরীর সবচেয়ে প্রাণবন্ত এলাকাগুলোর একটি। ঘনবসতিপূর্ণ এ এলাকার রাস্তা বরাবর ছিল শহরের একমাত্র বিশেষায়িত প্রসূতি হাসপাতাল, এতিমখানা ও পরিত্যক্ত শিশুদের পরিচর্যা কেন্দ্র।

এলাকাটির অধিকাংশ ভবন ইসরায়েলের বিমান হামলায় আগেই ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তবে ব্যাপক বোমাবর্ষণের পরও বেশকিছু ভবন দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু গত ১৩ জুলাই নাগাদ গোটা এলাকার ভবনই মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেবল একটি হাসপাতাল আর কয়েকটা ভবন এখনও আছে।

রাফার পাশের এখন সৌদিপাড়া সংলগ্ন এলাকায় ধ্বংসযজ্ঞ চলছে। সেখানে ছিল রাফার বড় বড় বেশ কয়েকটি মসজিদ ও স্কুল। ভিডিওতে এলাকাটিতে ইসসরায়েলের ট্যাংক এগুতে দেখা গেছে এবং রাস্তার পাশে খননযন্ত্র দিয়ে ইসরায়েলের সেনাদেরকে ভবন গুঁড়িয়ে দিতে দেখা যায়।

বোমা হামলায় মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া গাজার অন্যান্য অংশেও ভবন গুঁড়িয়ে দিচ্ছে ইসরায়েল।

গাজা সীমান্ত থেকে মাত্র ১ দশমিক ৫ কিলোমিটার দূরের কৃষিনির্ভর শহর খুজা’আতেও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে ইসরায়েল। খুজা’আ এবং আবাসান আল-কবিরা— দুটি কৃষি প্রধান শহরই এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

যুদ্ধ শুরুর আগে খুজা’আ শহরে ১১ হাজার মানুষের বাস ছিল। গত মে মাসে স্যাটেলাইট ছবিতে শহরটিতে বহু বাড়িঘর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গিয়েছিল। টমেটো, গম ও জলপাইয়ের জন্য পরিচিত এই শহরের প্রায় ১,২০০ ভবন ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী আইডিএফ।

এছাড়াও, ইসরায়েলি সীমান্ত থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে কিজান আবু রাশওয়ান নামের একটি গ্রামে ১৭ মে’র পর থেকে প্রায় সব ভবন ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, একসঙ্গে থাকা বেশ কয়েকটি টাওয়ার ব্লক একযোগে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

ইসরায়েল গাজার বিভিন্ন অংশকে ভাগ করে নিরাপত্তা করিডোর তৈরি করছে। এসব করিডোর বরাবর ভবনগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া, বাড়িঘর ভেঙে গাজায় সীমান্তের কাছের এলাকায় ইসরায়েলের ‘বাফার জোন’ তৈরির কথা শোনা গিয়েছিল আগেই।

আর এখন ইসরায়েল সীমান্ত ছাড়িয়ে গাজার আরও ভেতরে ঢুকে বাড়িঘর মাটিতে মিশিয়ে দিচ্ছে। কয়েকটি এলাকায় তারা এরই মধ্যে বাড়িঘর ধ্বংস করেছে।

আইডিএফ জানিয়েছে, এলাকাগুলো “সন্ত্রাসী অবকাঠামো” মুক্ত করতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে বিবিসি এসব নির্দিষ্ট ভবন ধ্বংসের পেছনে সামরিক কারণ জানতে চাইলে কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি।

একজন বিশ্লেষকের মতে, এই ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে গাজায় একটি দীর্ঘমেয়াদি ‘সিকিউরিটি জোন’ গড়ে তুলতে চাইছে ইসরায়েল, যা তারা স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে।

অন্য বিশ্লেষকরা বলছেন, রাফা-তে প্রস্তাবিত ‘মানবিক শহর’ গড়তে ভেঙে ফেলা হচ্ছে ভবনগুলো। জেরুজালেম ‘ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড সিকিউরিটির’ প্রেসিডেন্ট এফ্রায়িম ইনবারের ভাষ্য, এই ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে ইসরায়েল হয়ত চায় ফিলিস্তিনিদের ‘প্রবলভাবে গাজা ভূখন্ড ছেড়ে যাওয়ার ইচ্ছা’ তৈরি হোক।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এর আগেও এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে এমপিদের বলেছিলেন, সেনাবাহিনী “ধ্বংস করে চলেছে আরও বেশি ঘরবাড়ি”, যাতে ফিলিস্তিনিদের আর “ফিরে আসার জায়গা না থাকে”। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমে সেই বৈঠকের খবর ছড়িয়ে পড়েছিল।

কবিতা লেখার দায় ছিল বিপজ্জনক : মাহমুদ দারবিশ, ফিলিস্তিনি কবি ও লেখক

: আপনি কি গদ্য লেখেন?

: গদ্য আমার ভালো লাগে। মাঝে মাঝে গদ্য এমন এক ধরনের কবিতার গভীরতায় পৌঁছে যেতে পারে, যা কবিতাও পারে না। তবে সময় পেরিয়ে যাচ্ছে, আর আমার কবিতার প্রকল্প এখনও অসম্পূর্ণ। আমার ভেতরে গদ্য আর কবিতার মধ্যে একটা প্রতিযোগিতা চলে। কিন্তু আমার পক্ষপাত সবসময় কবিতার দিকেই।

: আপনি কীভাবে মেমোরি ফর ফরগেটফুলনেস: আগস্ট, বৈরুত, ১৯৮২ লেখেন? বইটির শুরুতেই আপনি লেখেন, “একটি স্বপ্ন থেকে আরেকটি স্বপ্ন জন্ম নেয়।” এরপর একের পর এক জীবন্ত গদ্য-কবিতার মাধ্যমে অবরুদ্ধ শহরের দৃশ্য ও শব্দ তুলে ধরেছেন। এটা লেখার পেছনে কী ঘটনা কাজ করেছিল?

.: ঘটনাটি ঘটার চার বছর পর আমি বইটি লিখি। তখন আমি প্যারিসে ছিলাম। মাত্র দুই-তিন মাসের মধ্যেই এটি শেষ করি, খুব দ্রুত। সেই সময়ের স্মৃতি, বৈরুতের ছাপ আমাকে পিছু ছাড়ছিল না। আমি কবিতা লিখতেই পারছিলাম না। অনেকটা এখনকার মতো। এই দুঃসহ অবস্থার থেকে মুক্তি পেতেই আমি বইটি লিখি। আমার উদ্দেশ্য ছিল একান্তই ব্যক্তিগত। আমি ঐতিহাসিক ছিলাম না, বিশ্লেষকও না। কেবল নিজের ভেতরের ভার নামাতে লিখেছিলাম। এই লেখার মধ্য দিয়ে আমার লেখকজগতের অচলাবস্থা ভেঙে গেল।

: আপনি তো দুটো সময়ই পার করেছেন, তাহলে সেই সময়ের সঙ্গে এখনকার সময়ের মিল কোথায়?

: বৈরুতের অবরোধ ছিল অনেক বেশি তীব্র ও বিপজ্জনক। সেটি ছিল পুরোনো ধাঁচের যুদ্ধ। শহরের এমন কোনো রাস্তা ছিল না যেখানে বিপদ ছিল না। যারা বেঁচে ফিরেছে, তারা ভাগ্যবান। জীবন ঝুঁকিতে ছিল সবার। আর এখন যা হচ্ছে, তা ধাপে ধাপে ঘটছে। মাঝে মাঝে খুব ভয়াবহ কিছু হয়, আবার কিছু সময় শুধু যন্ত্রণাদায়ক। সবচেয়ে খারাপ সময় এপ্রিল মাসে, আমি ইউরোপে ছিলাম। ফলে সক্রিয় বোমা বর্ষণ, গুলি চলার সময় আমি সেখানেই ছিলাম। এখন অবরোধটাই হয়ে গেছে স্বাভাবিক। যুদ্ধ নেই, গুলি নেই, কিন্তু মানুষ এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যেখানে ভাবনার একমাত্র বিষয় হচ্ছে: কারফিউ কখন উঠবে? ময়লা কখন পরিষ্কার হবে? অফিসে যাওয়া যাবে কবে? বিষয়টি এখন আর সংবাদও নয়, বরং নিত্যদিনের জীবনের অংশ। এটাই সবচেয়ে ভয়াবহ। এর কোনো উজ্জ্বল চিত্র আর নেই, মানুষ যেন অভ্যস্ত হয়ে গেছে। জানি না এই অভিজ্ঞতা কোনো রেকর্ডে থাকবে কিনা। হয়তো কোনো এক সময় লেখার রূপ নেবে গদ্য ও কবিতার সংমিশ্রণে। তবে এখনই না, সময়ের একটি ব্যবধান প্রয়োজন।

.: আপনি কবে প্রথম কবিতা লেখা শুরু করেন?

: ছোটবেলায় আমি দুর্বল ছিলাম, খেলাধুলা করতে পারতাম না, কুস্তি বা ফুটবল খেলায় অংশ নিতে পারতাম না। তাই ভাষার দিকে ঝুঁকে পড়ি। বড়দের সঙ্গে অনেক সময় কাটাতাম। আমার দাদার ঘরে প্রতিবেশীরা জড়ো হয়ে আরবি কাহিনি বলতেন, মাঝে মাঝে কবিতা থাকত। সেই রোমান্টিক গল্পগুলো শুনে আমি গভীরভাবে আন্দোলিত হতাম। যদিও অনেক কিছু বুঝতাম না, তবুও শব্দের ধ্বনি আমাকে স্পর্শ করত। আমি টের পেতাম, ভাষার মধ্য দিয়েই আমার সংকটের সমাধান সম্ভব। তখন থেকেই স্বপ্ন দেখতাম আমি একদিন কবি হব। কবিকে মনে হতো যেন এক রহস্যময়, অতিমানবিক ক্ষমতাসম্পন্ন কেউ!

শৈশবেই কবিতা লিখতে শুরু করি, কিন্তু তখন বুঝিনি যে আমি কবিতা লিখছি। আমার বাবা-মা ও শিক্ষকরা আমাকে উৎসাহ দিতেন। খেলাধুলায় পারতাম না, তাই লেখার মধ্য দিয়েই যেন নিজেকে প্রমাণ করতে চেয়েছি।

.: আপনি কবে থেকে নিজেকে একজন কবি হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে শুরু করলেন?

: না, আমি নিজেকে গুরুত্ব দিই না। আমি কবিতাকে গুরুত্ব দিই। মজার ব্যাপার হলো, প্রথম যিনি আমাকে কবিতার গুরুত্ব বোঝালেন, তিনি ছিলেন গালিলি অঞ্চলের ইসরায়েলি সামরিক প্রশাসক।
আমি তখন ১২ বছর বয়সী। আমাদের গ্রাম ছিল সামরিক শাসনের অধীনে। আমি ক্লাসে প্রথম ছিলাম। ইসরায়েলের স্বাধীনতা দিবসে আমাকে কিছু পড়ে শোনাতে বলা হয়। আমি একটি কবিতা পড়েছিলাম যেটা আমাদের আরব অবস্থান নিয়ে কথা বলছিল। পরদিন সামরিক গভর্নর আমাকে ডেকে পাঠান। তিনি আমাকে তিরস্কার করেন।

আমি তখন একেবারেই নিষ্পাপ ছিলাম। বুঝতে পারিনি সত্য বলা বিপজ্জনক হতে পারে। ভাবলাম এত বড় রাষ্ট্র, আর তারা আমার কবিতায় ক্ষুব্ধ! তাহলে কবিতা নিশ্চয়ই গুরুত্ব রাখে। সত্য বলার এই কাজটাই বিপজ্জনক ছিল।

: আপনি একাই গিয়েছিলেন সামরিক গভর্নরের সঙ্গে দেখা করতে?

এম. ডি.: হ্যাঁ, আমি একাই গিয়েছিলাম। ১২ বছরের একটি ছেলে, যার লেখা একটি কবিতার জন্য সামরিক গভর্নর এতটা ক্ষুব্ধ হয়! ভাবুন!

: আপনার পরিবার কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল?

: তারা একদিকে গর্বিত ছিল, তাদের ছেলে এমন কিছু বলেছে যা তারা নিজেরা বলতে পারেনি, আবার ভয়ও পেয়েছিল আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে। আমি লেখালেখির জন্য অনেক মূল্য দিয়েছি। ১৬ বছর বয়সে প্রথম গ্রেপ্তার হই। এরপরও বারবার কারাগারে যেতে হয়।

তবে আমার মা-বাবা কখনও আমাকে লেখালেখি থেকে বিরত করেননি। পরে আমি কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হই। তখন ভাবতাম কবিতা সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার। আমি এটাকে খুব গুরুত্ব দিয়ে নিয়েছিলাম। কিন্তু পরে বুঝলাম, কবিতা বাস্তবতা বদলায় না। এটি মানুষের অনুভূতিতে প্রভাব ফেলে, কিন্তু বাস্তব পরিবর্তন আনে না। কবিতা শুধু কবিকেই বদলায়।

তবে আমি নিজেকে সিরিয়াস কবি হিসেবে দেখি না। বরং আমি যত বড় হচ্ছি, আর আমার কবিতাকে যত বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, আমি তত বেশি চিন্তিত হয়ে পড়ছি।

: আপনি বলেছেন, কবিতা পরিবর্তনের মাধ্যম নয়। তাহলে আপনি কি মনে করেন, আপনি ফিলিস্তিনি জাতীয় সংগ্রামে কোনো ভূমিকা রেখেছেন?

.: শুরুতে আমার কবিতা ফিলিস্তিনি পরিচয়ের গঠনে ভূমিকা রেখেছিল। কবি ভাষার মাধ্যমে জাতিকে শক্তি দিতে পারেন। মানুষকে আরও মানবিক, সহনশীল করে তুলতে পারেন। আমার কবিতা শোক ও উৎসবে পাঠ করা হয়। কিছু কবিতা গান হয়ে মানুষের মধ্যে আশা জাগায়।
তবে আমার প্রধান লক্ষ্য হলো আমার কবিতা আরবি কবিতাকে কতটা এগিয়ে নিতে পারছে, সেটাই। (সংক্ষেপিত)

“আমি বিশ্বাস করি মৃত্যুতে আমার শেষ হবে না” : আল মাহমুদ, কবি এবং ঔপন্যাসিক

ফেরদৌস মাহমুদ : মাহমুদ ভাই, আপনার তো অসংখ্য সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছে বিভিন্ন জায়গায়। এখন প্রশ্ন করতে গেলে দেখা যাবে আগের অনেক প্রশ্নেরই রিপিটেশন হয়ে গেছে। উত্তরগুলোও দেখা যাবে একই রকম। আপনার সঙ্গে কিছু নতুন বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছি। আপনি কী বলেন?

আল মাহমুদ : দেখো আজকে সারাদিনই আমাকে একটার পর একটা ইন্টারভিউ দিতে হয়েছে। ঠিক কী ধরনের প্রশ্ন তুমি করবা সেটা তো আমি বলতে পারব না। তুমিই ভেবে দেখো কী করলে ভালো হয়। তবে আমি কিন্তু কানে ঠিক মতো শুনতে পাই না, একটু জোরে জোরে প্রশ্ন করবে।

ফেরদৌস মাহমুদ: অসুবিধা নেই, আমি চিৎকার করে করেই প্রশ্ন করব। তাহলে শুরু করি `আপনি কেমন আছেন’ এ প্রশ্ন দিয়েই।

আল মাহমুদ : খুব ভালো আছি, এটা বলতে পারব না। ইদানীং অলসভাবে বিছানায় চুপাচাপ শুয়ে থাকতেই ভালো লাগে।

ফেরদৌস মাহমুদ: মানুষ যখন চুপচাপ বসে থাকে বা অলসভাবে সময় কাটায় ওই মুহূর্তগুলোতে কিন্তু তাঁর মধ্যে অদ্ভুত কিছু ভাবনা ঘুরপাক খায়। সে নানা রকম স্মৃতি-বিস্মৃতির জগৎ বা চিন্তার মধ্যে ঘোরাফেরা করে। আপনার চিন্তার ওই জগৎটা সম্পর্কে বলুন।

আল মাহমুদ : হ্যাঁ, তোমার কথা ঠিক। চুপচাপ শুয়ে থাকলেও বিভিন্ন স্মৃতি-বিস্মৃতি মাথার মধ্যে ঘোরাফেরা করেই। আমার আসলে তেমন সুখের স্মৃতি খুব একটা নেই। নানা সমস্যার মধ্যে বলা চলে জীবন কাটিয়েছি। মানুষের কাছ থেকে নানাভাবে প্রতারিত হয়েছি। কিন্তু মানুষের ওপর আস্থা হারাইনি। এখনো মানুষকে বিশ্বাস করতে দ্বিধা করি না। কারণ আমি তো জানি সব মানুষ একরকম হয় না। আমি আমার মতো মানুষও অনুসন্ধান করি।

ফেরদৌস মাহমুদ: আপনি যখন লেখালেখি শুরু করেন ওই সময়ের মধ্যেই তো দেশ ভাগ হয়। আপনার লেখালেখি শুরুর সময়ের সাহিত্যিক-পরিবেশটা সম্পর্কে বলুন।

আল মাহমুদ : আমি যখন লিখতে শুরু করি, তখন দেশ ভাগ একটা বড় ব্যাপার ছিল। ওই সময় সাতচল্লিশ-আটচল্লিশের দিকে কলকাতা থেকে অনেক প্রখ্যাত কবি ঢাকায় এসে বসতি করে। তাদের সঙ্গে আমরা ভিড়তে চেয়েছি। যেমন ধরো- ফররুখ আহমদ, সৈয়দ আলী আহসান, আহসান হাবীব এসব প্রখ্যাত কবির কথা। কিন্তু নানা মানসিক ব্যবধানের জন্যই তাঁরা আমাদের পাত্তা দেননি। আমরা তখন আমাদের জন্য একটা স্বতন্ত্র কবিতা আন্দোলনের প্রয়াস করি। তা অবশ্য সচেতনভাবে করি না। নিজে থেকেই হয়ে যায়। তবে চল্লিশের কবিরা প্রথম দিকে আমাদের কোনো স্বীকৃতি বা সম্মান জানাতে প্রস্তুত ছিলেন না। আমরা নিজেরাই আমাদের রাস্তা তৈরি করে নিয়েছি। যেমন- আমার বিষয় ছিল, বাংলাদেশের সে সময়কার গ্রাম-জনপদ, নদী, নারী, প্রকৃতি, পরিবেশ এবং আঞ্চলিক শব্দ কাব্যে ব্যবহার করা। আমি সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করি বোদ্ধা পাঠকমহলের। আমার সমসাময়িক অথচ অগ্রজ শামসুর রাহমান তখনো বুদ্ধদেব বসুর কবিতা পত্রিকায় লিখছেন। আমিও বসুর পত্রিকায় লেখা পাঠাই এবং লেখা ছাপা হয়। এভাবেই আমরা কবিতা পত্রিকার মাধ্যমে বুদ্ধদেব বসুর পছন্দ-অপছন্দের ও রুচির সহযাত্রী হয়ে যাই। আমাদের দেশে অগ্রজরা আমাদের একেবারেই স্বীকৃতি দিতে চাননি। ফলে আমরা দেশ ভাগ হওয়ার পরও কলকাতামুখী থেকে যেতে বাধ্য হই। আজ যদিও মনে হয়, ব্যাপারটা আমাদের জন্য স্বাস্থ্যকর ছিল না। কিন্তু আমরা ছিলাম নিরুপায়।

ফেরদৌস মাহমুদ: আপনার নিকট-অগ্রজ ছিলেন চল্লিশের কবিরা। তাঁদের মধ্যে কি সমর সেনও পড়েন?

আল মাহমুদ : না, সমর সেন তো ছিলেন বলা যায় তিরিশেরই কবি। চল্লিশের বলতে পারো সুভাস মুখোপাধ্যায় বা মঙ্গলাচরণকে।

ফেরদৌস মাহমুদ: এক্ষেত্রে অরুণ মিত্রের নামও তো নেয়া যায়।

আল মাহমুদ : অরুণ মিত্র অবশ্য চল্লিশে লেখা শুরু করলেও তাঁর লেখা প্রভাব বিস্তার করে কিন্তু পঞ্চাশের শুরুর দিকে। অর্থাৎ আমাদের সময়ে এসে। তিনি কবিতায় ফরাসি কাব্য-আঙ্গিক অনুসরণ করতেন। বিষয়টা আমাদের কাছে তখন নতুন ছিল, ফলে তাঁর কবিতা আমরা খুব মনোযোগ দিয়ে পড়তাম।

ফেরদৌস মাহমুদ: আপনার একটা কবিতা আছে `প্রত্যাবর্তনে লজ্জা’। যে কবিতাটায় আমরা এক ট্রেন ফেল তরুণের দেখা পাই, ওই কবিতাটার ওপর অনেক সময় চলচ্চিত্রের কর্মশালায়ও চিত্রনাট্য লিখতে দেয়া হয়। আপনার এ কবিতাটা লেখার প্রেক্ষাপট বা মুহূর্তটা সম্পর্কে বলুন।

আল মাহমুদ : কবিতাটা লেখা হয়েছিল অন্যান্য কবিতা যেভাবে লেখা হয় ওই রকমভাবেই। স্বাভাবিকভাবেই। কবিতাটা আসলে আমার ব্যক্তিগত জীবনেরই বিষয়। বলতে পারো, আমি যে কোনো সময়ই ঠিক জায়গায় পৌঁছতে পারি না এটা তারই একটা প্রকাশ। আমার লাইফে আমি অসংখ্যবার ট্রেন ফেল করেছি। দেখেছি গাড়ি চলে যায়; কিন্তু আমি স্টেশনে একা পড়ে আছি। এ পড়ে থাকার বেদনাই এই কবিতাটাতে প্রকাশ পেয়েছে।

ফেরদৌস মাহমুদ: কবিদের মধ্যে অনেক সময় একে-অপরের প্রতি ঈর্ষা লক্ষ্য করা যায়। কবিদের এ ঈর্ষার বিষয়টাকে আপনি কীভাবে দেখেন। আপনার মধ্যে কি কখনো কারও প্রতি এই ঈর্ষা কাজ করেছে?

আল মাহমুদ : আমি নিজে কখনো কারও প্রতি কোনো ঈর্ষাবোধ করিনি। আমার সঙ্গে কারও কোনো প্রতিযোগিতার ব্যাপার ছিল না। আমার সামনে কেবল একজন বড়মাপের কবি ছিলেন, তিনি শামসুর রাহমান। তাঁর সঙ্গে আমার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। তাঁর মৃত্যুর কয়েকদিন আগেও, তুমি এখন যেখানটায় বসে আছ, সেখানেই তিনি বসেছিলেন। তাঁর পছন্দ মতো চা খেয়ে তিনি বিদায় হয়েছিলেন। অগ্রজের সম্মান আমি সবসময়ই তাকে দিয়েছি।
তবে আমি তোমার বলা ওই কবিদের ঈর্ষার কথাটা বিশ্বাস করি। কেননা, আমি সারাজীবন ব্যক্তিগতভাবে আমার প্রতি অনেক ঈর্ষাকাতর বন্ধুদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। তাদের কারও নামই আমি এখানে বলতে চাই না। তাদের অনেকের দ্বারা আমাকে অনেক মানসিক টেনশনের মধ্যে দিন কাটাতে হয়েছে। এরপরও সব সময় আমি বন্ধুত্বের মর্যাদা রক্ষা করতে চেয়েছি। যদিও জানি আধুনিক কবিদের কোনো বন্ধু হয় না।

ফেরদৌস মাহমুদ: ফরহাদ মজহার একবার কোথাও বলেছিলেন, বাউলরা যতখানি সাধারণ মানুষের অনেক কাছাকাছি যেতে পেরেছেন, আধুনিক কবিরা তা পারেননি। আধুনিক কবিরা মানুষের খুব কাছাকাছি যেতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন। এ ব্যর্থতা প্রসঙ্গে উদাহরণ হিসেবে তিনি আপনার এবং শামসুর রাহমানের কথাও বলেছিলেন। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্যটা শুনতে চাচ্ছি।

আল মাহমুদ : ফরহাদ মজহার হয়তো বিষয়টা এভাবেই দেখেছেন। ওটা তাঁর ব্যক্তিগত মতামত।
সাধারণ জনগণ কখনো সাহিত্য-সংস্কৃতি-কবিতা ইত্যাদির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকে না। তবে সব লেখকই পাঠকের মুখাপেক্ষী। এখন জনগণ বলতে যা বোঝা যায়, সেখানে পাঠকদেরও ধরতে হবে। যদি সেভাবে ধরা হয়, তাহলে সেখানেও আমাদের গতায়ত আছে। একবারে নাখোশ করে দিলে তা চলবে কেন।

ফেরদৌস মাহমুদ: খুব কমন একটা প্রশ্ন করি- মার্কসবাদের প্রতি আপনার এত ক্ষোভ কেন? আপনি তো নিজে এক সময় মার্কসবাদীই ছিলেন।

আল মাহমুদ : আমার প্রকৃতপক্ষে কোনো আদর্শবাদের প্রতি ক্ষোভ নেই। আমি এক সময়, খুব স্বাভাবিক পড়াশোনা দ্বারা মার্কসবাদের প্রতি আগ্রহী হয়েছিলাম এবং হয়তো বা এর সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততাও ঘটে গিয়েছিল। তবে অন্যত্র পড়াশোনা আমাকে এর থেকে সরে আসার প্ররোচনা দিয়েছে। আমাকে একজন পূর্ণাঙ্গ বিশ্বাসী মানুষে পরিণত করেছে। বলতে পারো, আমি পড়তে পড়তে বদলাই আর লিখেতে লিখতে বিবর্তিত হই।

ফেরদৌস মাহমুদ: তাহলে তো আমরা বলতে পারি, পড়তে পড়তে আপনি আপনার বর্তমান বিশ্বাস থেকে আবারও সরে দাঁড়াতে পারেন।
আল মাহমুদ : না, এখানে একটা জিনিস আছে। এখানে একটা কথা থেকে যায় সেটা হলো, মানুষের বিশ্বাস। ধর্ম মানুষকে একটা চিরন্তন আশ্রয়ের আশ্বাস দেয়। এ আশ্বাসের বলেই মানুষ পরকালে বিশ্বাস করে। মৃত্যুর পরবর্তী জীবনে বিশ্বাস করে। আমি মনে করি এ পার্থিব জীবনই শেষ নয়, মৃত্যুর পরও আমার একটা জীবন শুরু হবে।

ফেরদৌস মাহমুদ: অনেক সময় আমাদের কাছে মনে হয়, লালন ও গৌতম বুদ্ধের মধ্যে চিন্তার ক্ষেত্রে কোথায় যেন এক ধরনের মিল রয়েছে। এ বিষয়ে আপনার কী মনে হয়।

আল মাহমুদ : বাহ্যিকভাবে ওইরকম মনে হলেও আমি তোমার সঙ্গে বিষয়টাতে সম্পূর্ণ একমত হতে পারলাম না। কেননা, আমার কাছে মনে হয়েছে দুজনের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। পার্থক্যটা হচ্ছে- লালন প্রশ্ন করেছেন এবং নিজেই জবাব দিয়েছেন। এ জবাবগুলো আমাদের অনেক জিজ্ঞাসার সমাধান দিয়েছে। অপরদিকে গৌতম বুদ্ধের দর্শন, প্রশ্ন এবং উত্তর আমার কাছে মনে হয়েছে কৌতূহলোদ্দীপক; কিন্তু পরিতৃপ্তিকর নয়। আমার মতো ব্যক্তিকে তিনি কোনো সমাধানই দিতে পারেননি।

ফেরদৌস মাহমুদ: আপনার শুরুর দিকে বেশিরভাগ লেখার প্রকাশ বাংলাদেশে না হয়ে কলকাতাকেন্দ্রিক কেন?
আল মাহমুদ : তখন কলকাতাকেন্দ্রিকতা আস্তে আস্তে স্তিমিত হয়ে আসছিল। তবে তখনকার কলকাতার পত্রিকা এদেশে আসত। আমাদের অভ্যেস অনুযায়ী আমরা লিখেছি। কৃত্তিবাস, ময়ুখ এসব পত্রিকায় আমি নিয়মিত লিখতাম। আর ঢাকায় তখন সমকাল প্রকাশ হতো; সমকাল প্রকাশিত হওয়ার পর আমি কিন্তু কলকাতায় বেশি লিখতাম না। সমকালে সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদক হিসেবে ছিলেন অসাধারণ সম্পাদক।

কলম কথা – কালি ও দর্শন

১) পার্কার পেন
১৮৮৮ সালে জর্জ স্যাফোর্ড পার্কার পার্কার পেন কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। তাদের “লাকি কার্ভ” ফিড সিস্টেম এবং ১৯৩১ সালের দ্রুত শুকানো কুইংক কালি কলম জগতে বিপ্লব আনে। ১৯৪১ সালে বাজারে আসে আইকনিক “পার্কার ৫১”, যার এয়ারোডাইনামিক নকশা বিমানের মতো মসৃণ এবং আধা-ঢাকা নিব কালি শুকানো থেকে রক্ষা করে। এটি ছিল পরিপূর্ণ আমেরিকান স্বপ্নের প্রতীক। পরবর্তীতে “জটার” বলপয়েন্ট কলম, ক্লিক বোতাম ও স্টেইনলেস বডির জন্য অফিস ব্যবহারে বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়।

২) মন্টব্ল্যাঙ্ক
১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত জার্মান ব্র্যান্ড মন্টব্ল্যাঙ্ক বিলাসবহুল লেখনীর মাপকাঠি তৈরি করে। তাদের “Meisterstück 149” কলমটি কালো রেজিনে তৈরি, হাতে তৈরি ১৮-ক্যারেট সোনার নিব এবং প্লাটিনাম রিং দিয়ে সাজানো। প্রতিটি কলমে থাকে সিরিয়াল নম্বর যা একে একক ও বিশেষ করে তোলে। ডিজাইন ভারসাম্যপূর্ণ ও ওজনদার। এই ব্র্যান্ডের প্রতীক ছয়ফলা তুষারচূড়াটি লেখার সৌন্দর্য ও মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

৩) ক্রস
১৮৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ক্রস হচ্ছে আমেরিকার সবচেয়ে পুরনো কলম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান। তাদের “Century II” কলম দীর্ঘ ও সরু, প্রফেশনাল পরিবেশের জন্য মানানসই। আর “Townsend” সিরিজটি বেশি ভারী ও পূর্ণাঙ্গ, এগুলো রাষ্ট্রপতি পর্যায়ের অফিসিয়াল কাজে ব্যবহৃত হয়। এই নকশাগুলোতে কর্পোরেট মিনিমালিজম ও দীর্ঘস্থায়ীত্বের ছাপ স্পষ্ট।

৪) পেলিকান
১৮৩৮ সালে হ্যানোভার শহরে প্রতিষ্ঠিত পেলিকান প্রথম ১৯২৯ সালে ফাউন্টেন পেন আনে, যাতে পিস্টন ফিলিং প্রযুক্তি ছিল। তাদের “Souverän Series (M800)” আজও জনপ্রিয়, যার সবুজ-কালো স্ট্রাইপড ব্যারেল ও সোনার ক্লিপ একে এক অনন্য ঐতিহ্যিক রূপ দেয়। বড় সোনার নিব এবং ব্যালান্সড ডিজাইন এটি দীর্ঘ সময় লেখার জন্য আরামদায়ক করে তোলে।

৫) ল্যামি
১৯৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত ল্যামি ১৯৬৬ সালে “ল্যামি ২০০০” কলম দিয়ে ডিজাইনের জগতে নতুন অধ্যায় শুরু করে। ম্যাক্রোলন ও ব্রাশ স্টেইনলেস স্টিল দিয়ে তৈরি এই কলমে seamless body ও আধা-ঢাকা নিব থাকে। এর ডিজাইন বাউহাউস দর্শনে বিশ্বাসী “form follows function”। এছাড়া Safari বা AL-Star সিরিজ রঙিন ও তরুণদের জন্য উপযোগী, যেখানে ত্রিভুজাকৃতির grip section ব্যবহৃত হয়।

৬) পাইলট
১৯১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত পাইলট তাদের উদ্ভাবনী মনোভাব দিয়ে চমকে দেয়। “Vanishing Point” ছিল বিশ্বের প্রথম retractable nib fountain pen যেখানে একটি বোতামে নিব লুকানো যায়। আধুনিক ও ঝকঝকে ডিজাইন একে দিনে-রাতে ব্যবহারযোগ্য করে তোলে। তাদের Custom 823 মডেলটি ট্রান্সপারেন্ট বডি ও ভ্যাকুম ফিলিং সিস্টেমসহ প্রযুক্তি আর নান্দনিকতার এক অপূর্ব মিশেল।

৭) শেফার
১৯১২ সালে আইওয়ার ফোর্ট ম্যাডিসনে প্রতিষ্ঠিত শেফার লেভার ফিলিং ব্যবস্থার পথপ্রদর্শক। তাদের Balance Series এর স্ট্রিমলাইনড নকশা—উভয় প্রান্তে সূচালো আর্ট ডেকো যুগের প্রতিফলন। আর Legacy Heritage সিরিজ পুরনো ও নতুন ডিজাইনের মেলবন্ধন। ভারসাম্যপূর্ণ, মোটা গড়নের এই কলমগুলো পেশাদারদের হাতে এক শৈল্পিক অনুভূতি জাগায়।

৮) ওয়াটারম্যান
১৮৮৪ সালে লুইস ওয়াটারম্যান প্রতিষ্ঠিত করেন এই ব্র্যান্ড, যার প্রধান উদ্ভাবন ছিল তিন-ফিশার ফিড সিস্টেম। তাদের Carène Series ইয়টের ঢেউখেলানো নকশা থেকে অনুপ্রাণিত। নিবটি ব্যারেলের অংশ হিসেবে একীভূত যাকে বলা হয় inlaid nib। অন্যদিকে Hémisphère হালকা ও স্লিম, প্রতিদিন লেখার জন্য উপযুক্ত এবং দেখতে আধুনিক।

৯) উনি-বল
১৯৮০ দশকে উনি-বল (মিতসুবিশি পেনসিল কোম্পানি) “Signo” সিরিজ দিয়ে জেল পেনকে জনপ্রিয় করে । ট্রান্সপারেন্ট ব্যারেল, রাবার গ্রিপ ও sleek ডিজাইন একে ছাত্র ও পেশাজীবীদের প্রিয় করে তোলে। এদের বিশেষ কালি কাগজের সঙ্গে রাসায়নিকভাবে মিশে জালিয়াতি রোধ করে একটি নিরাপত্তা সচেতন ডিজাইনের দৃষ্টান্ত হয়ে যায়।

সিরিয়ায় কেন হামলা করছে ইসরায়েল?

ইসরাইল সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে বোমাবর্ষণ করেছে, হামলা চালিয়েছে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে। এ হামলায় অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। নেতানিয়াহুর দাবি, দ্রুজদের রক্ষায় ইসরায়েল সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেছে।

দ্রুজ সংখ্যাগরিষ্ঠ সুয়েইদায় দ্রুজ ও স্থানীয় বেদুইনদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বহুদিন ধরে চলছে। সেখানে চার দিনের বেশি সময় ধরে দ্রুজ গোষ্ঠী, বেদুইন গোত্র ও সিরীয় নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ চলছে।

আগে থেকেই সিরিয়ার গোলান মালভূমি ইসরায়েলের দখলে। দেশটি দ্রুজ সংখ্যালঘুদের সম্ভাব্য মিত্র বলে বিবেচনা করে। ইসরায়েল বলছে, এ অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল এই সংখ্যালঘুদের রক্ষা করা এবং যে সরকারপন্থী বাহিনী গোষ্ঠীটির ওপর হামলা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে, তাদের ওপর আঘাত হানা।

দ্রুজ হচ্ছে এক ধর্মীয় সংখ্যালঘু গোষ্ঠী, যারা সিরিয়া, লেবানন, ইসরায়েল এবং দখলকৃত গোলান হাইটসে বসবাস করে এবং আরবি ভাষায় কথা বলে। দ্রুজ ধর্ম হলো শিয়া ইসলামের একটি শাখা যার নিজস্ব স্বতন্ত্র পরিচয় এবং বিশ্বাস রয়েছে। দ্রুজ সম্প্রদায় নিজেদের ‘মুয়াহিদুন’ বলে, যার মানে ‘যারা এক আল্লাহতে বিশ্বাস করে’।

সিরিয়ায় দ্রুজ সম্প্রদায়ের আনুমানিক সাত লাখ মানুষের বসবাস। অন্যদিকে, ইসরায়েলে তাঁদের সংখ্যা দেড় লাখ। ইসরায়েলি দ্রুজদের অনেকেই মনে করেন, ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের সময় ১৯৪৮ সাল থেকে তাঁদের সঙ্গে ইহুদিদের একধরনের ‘রক্তের বন্ধন’ তৈরি হয়েছে।

তবে ২০১৮ সালের জাতিরাষ্ট্র আইনের পর এ ভাবনায় ছেদ পড়েছে। এখন অনেক দ্রুজ মনে করেন, তাঁরা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। তবে এখনো বেশির ভাগ দ্রুজ ইসরায়েলি রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত ও সেনাবাহিনীতেও নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেন।

কানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক এবং দ্রুজ স্টাডিজ জার্নালের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক রামি জিদান বলেন, ইসরায়েলি দ্রুজরা নিজেদের একই সঙ্গে দ্রুজ, ইসরায়েলি ও আরব বলে মনে করেন। তাঁরা মনে করেন, ইহুদি ও দ্রুজ—উভয়ই সংখ্যালঘু হিসেবে নিপীড়নের শিকার। এ ঐতিহাসিক উপলব্ধি তাঁদের ইসরায়েলের প্রতি আনুগত্যের ভিত্তি তৈরি করেছে।

রামি জিদানের মতে, এখন এ সম্পর্কের ভিত্তিতেই ইসরায়েলি দ্রুজরা চাইছেন, ইসরায়েল যেন সিরিয়ায় তাঁদের সম্প্রদায়ের লোকজনকে রক্ষা করে। যদিও সিরীয় দ্রুজরা ঐতিহ্যগতভাবে ইসরায়েলবিরোধী। কিন্তু তাঁদের কিছু নেতা সম্প্রতি ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তুলেছেন।

ইসরায়েলের শীর্ষ বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সাম্প্রতিক এ হামলাগুলো সম্ভবত পুরোপুরি দ্রুজদের রক্ষার উদ্দেশ্যে নয়; বরং এর পেছনে ইসরায়েলি সরকার ও সংকটে থাকা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই বেশি রয়েছে।

নিউইয়র্কে ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কনসাল জেনারেল আলোন পিনকাস আল–জাজিরাকে বলেন, ‘এটি পুরোপুরি সুযোগসন্ধানী বিষয়।’ আরেকটি আঞ্চলিক জাতিগোষ্ঠীর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইসরায়েল কখনো কুর্দদের সাহায্য করেনি। তাই দ্রুজদের ক্ষেত্রে সহানুভূতির ভাব দেখানোটা মূলত ছলচাতুরী।

পিনকাস সিরিয়ায় ইসরায়েলি সাম্প্রতিক হামলার পেছনে কয়েকটি উদ্দেশ্য সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন, যেমন নেতানিয়াহু যুদ্ধকালীন নেতা হিসেবে নতুন করে নিজের ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে চাচ্ছেন। এর মাধ্যমে নিজের দুর্নীতির মামলার বিচার বিলম্বিত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। পাশাপাশি গত ২১ মাসে শুধু সামরিক শক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যকে পুনর্গঠনের ‘ভ্রান্ত ধারণাকে’ জোরদার করার চেষ্টা করছেন।

পিনকাস আরও বলেন, ‘নেতানিয়াহু চান না, সিরিয়ায় একটা শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার গড়ে উঠুক; বরং তিনি চান, একটি দুর্বল রাষ্ট্র; যার এক অংশ কুর্দদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, অন্য অংশ দ্রুজ ও বেদুইনদের দখলে থাকবে। ফলে ইসরায়েল দক্ষিণ সিরিয়ায় নিজের ইচ্ছামতো কাজ করতে পারবে।’

সুয়েইদায় দ্রুজদের কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সহিংসতা শুরুর বহু আগে থেকেই ইসরায়েল সিরিয়ায় হামলা করে আসছে।
১৪ বছরের গৃহযুদ্ধ শেষে স্বৈরশাসক বাশার আল-আসাদের পতনের পর থেকে ইসরায়েল সিরিয়ায় শত শত বার হামলা চালিয়েছে ও প্রায় ৪০০ বর্গকিলোমিটার (১৫৫ বর্গমাইল) এলাকা দখলে নিয়েছে। এ ছাড়া ১৯৬৭ সাল থেকে সিরিয়ার পশ্চিম গোলান মালভূমি নিয়ন্ত্রণ করছে ইসরায়েল।

২০২৫ সালের মার্চ মাসের শুরুতে, সিরিয়ার উপকূলীয় প্রদেশগুলো থেকে সংঘর্ষের খবর আসে যেখানে সাবেক শাসক বাশার আল-আসাদের সমর্থনকারী আলাউইত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর শত শত মানুষ নিহত হয়েছে বলে খবর এসেছে।