সাবা বাশির: শুরুটা শুরু থেকেই করি গুলজার সাহেব, A Poem A Day এই বইয়ের ভাবনা কীভাবে মাথায় এলো, সেই গল্পটাই আগে জানতে চাই।
গুলজার: শুরুতেই কিছু কথা পরিষ্কার করে বলতে চাই। আমি বহুদিন ধরেই একটা জিনিস লক্ষ্য করছিলাম, স্কুল-কলেজে কবিতা নিয়ে একটা নির্দিষ্ট মানসিকতা তৈরি হয়ে গেছে। একই কবি, একই কবিতা বছরের পর বছর ধরে পড়ানো হচ্ছে। পাঠ্যক্রম এখনও শেক্সপিয়ার, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, কোলরিজ আর গালিবের গণ্ডিতেই ঘোরে! এর ফলে ছাত্রছাত্রীরা কবিতার সাথে কোনো সংযোগই খুঁজে পায় না। কবিতা যেন তাদের জীবনে প্রাসঙ্গিক নয়, হৃদয়ে বাজে না।যেমন আমি যখন ছোট ছিলাম তখন Julius Caesar পড়েছি, আজকের প্রজন্মও তাই-ই পড়ছে। তখন আমার মনে হলো, আমরা কী আদৌ প্রাসঙ্গিক সাহিত্য পড়ছি?
আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি বহুদিন, প্রজন্ম পাল্টেছে। এই প্রজন্ম ফয়েজ আহমেদের “এই দাগদাগে উজালা, এই শব-গজিদা সেহর” এর সাথে সম্পর্ক খুঁজে পায়। অথবা অমৃতা প্রীতমের সেই বিখ্যাত পঙ্ক্তি “আজ আখোঁয়া ওয়ারিস শাহ নূ”। এই সব কবিতা আমাকে ছুঁয়েছিল, তাই হয়তো আমিও কবি হয়ে উঠেছিলাম।
এই বইটা আমি শুরু করেছিলাম স্বাধীনতা ও দেশভাগের সময় থেকে ১৯৪৭-এর কবিতা দিয়ে। কিন্তু তখন বুঝলাম আমি শুধু উত্তর ভারতের কবিতা দেখছি!দক্ষিণে কী হচ্ছিল? পূর্ব আর পশ্চিমে? তাই ভাবলাম, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কী ধরণের কবিতা লেখা হচ্ছিল, সেটা জানতে হলে শুধু একটা ভাষায় কাজ চলবে না। একটি ভাষা দিয়ে আপনি হয়তো চোখ বা নাক স্পর্শ করতে পারেন, হয়তো গোঁফ কিংবা দাড়ি (হাসেন)। কিন্তু পুরো মুখ ছুঁতে হলে আপনাকে সমস্ত ভাষা স্পর্শ করতে হবে। আমি নিজে ছয়-সাতটি ভাষা জানি, তাই সেগুলোর কবিতা পড়া শুরু করলাম। যেমন মারাঠিতে কুসুমাগ্রাজ, বাংলায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। পরে আরও এগোলাম কে সত্যচিদানন্দনসহ অনেকের কবিতা পড়লাম। তখন যেন এক ধরণের মানসিক আলোড়ন শুরু হলো।
একদিন হার্পারকলিন্সের তখনকার প্রধান সম্পাদক কার্তিকা আমাকে বললেন, ভারতীয় কবিদের কবিতা নিয়ে একটা বই করতে পারি কি না। বিভিন্ন ভারতীয় ভাষার কবিতাগুলোর কথা ভাবতেই আমার মনে হলো, যেন একটা ঘন জঙ্গল। কিন্তু সেই জঙ্গলের ভিতরে ঢুকতেই দেখলাম, ভিতরে নিজের পথ তৈরি করা যায়। সবার আগে এটা আমার নিজের জন্যই এক ভ্রমণ হয়ে উঠল।
কোনো লেখকই শূন্যে লিখে না। আমি যখন বিভিন্ন ভাষার কবিতা পড়ছিলাম, তখন বুঝলাম এই কবিতাগুলো সেই সময়ের লড়াই, বেদনা, আন্দোলন—যেমন ভাষা আন্দোলন, নকশাল আন্দোলন, নারীবাদ আন্দোলনের প্রতিফলন। এই বই তাই একটা জাতীয় চিত্র তুলে ধরেছে, এটা আমার দেখা একটা বিস্তৃত মানচিত্র। শতাধিক কবিতা পার করতেই পথ পরিষ্কার হলো। এটা তখন শুধু আর একটা সংকলন ছিল না এটা হয়ে উঠল দেশের ইতিহাসের মধ্য দিয়ে কাব্যের এক ভ্রমণচিত্র। এইভাবেই A Poem A Day বইয়ের জন্ম।
সাবা বাশির: বইয়ের আয়তন দেখলেই বোঝা যায় কী বিশাল পরিশ্রম আপনি করেছেন। এই কবিতাগুলো বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়াটা কেমন ছিল?
গুলজার: ভারতীয় ভাষাগুলো আমাদের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। পাকিস্তানে উর্দু, সিন্ধি আর পাঞ্জাবি কবিতা আছে। শ্রীলঙ্কায় তামিল কবিতা। বাংলাদেশ তো বাঙালি কবিতায় ভরপুর। নেপালি, তিব্বতীয় ভাষাও আছে। দালাই লামার সঙ্গে অনেকেই ভারতে এসেছিলেন। অনেক বছর পেরিয়ে গেছে, অথচ এখনো অনেকে তিব্বতের কথা মনে রেখে কবিতা লেখেন, যারা দেশকেই চোখে দেখেননি। ভাষাগুলো যেন নিজে থেকেই সংযোগ তৈরি করেছিল। এই প্রকল্পের মাধ্যমে আমি ভাষার সৌন্দর্য, ছন্দ, বহুত্ববাদ সবকিছুর সৌন্দর্য আবিষ্কার করেছি।
সাবা বাশির: হ্যাঁ, সাব-কন্টিনেন্টের কবিতাগুলো তো থাকছেই, কিন্তু উত্তর-পূর্ব ভারতের কবিতাগুলোও খুব শক্তিশালী। আপনি তো সংবিধানভুক্ত ভাষার বাইরেও গিয়েছেন করবোরক, কুংকনা অনেকেই এই ভাষার নামই শোনেননি। সেগুলো নিয়ে বলবেন?
গুলজার: কুংকনা গুজরাট সীমান্তে প্রচলিত একটা আদিবাসী ভাষা। আর কঙ্কনি হচ্ছে উপকূলীয় কর্ণাটক আর গোয়ার ভাষা যেটা দুই স্ক্রিপ্টে লেখা হয় এবং এতে তামিল ও মারাঠি শব্দ প্রচুর থাকে। করবোরক ত্রিপুরার ভাষা। আদিবাসীদের আলাদা উপভাষাও থাকে। আমি সংবিধানিক ভাষাগুলোর বাইরে গিয়েছি, কারণ আমি চাইছিলাম এমন কবিতা, যা সময়কে তুলে ধরেছে, যেটা প্রাসঙ্গিক। লিপির কথাও আসে। যেমন পাঞ্জাবি লেখা হয় গুরুমুখী ও শাহমুখীতে, যেটা আবার উর্দুর লিপি থেকে এসেছে। এই অতিক্রমণ, মিশ্রণটাই সৌন্দর্য। আমি ৩৬৫টি কবিতা নিজের হাতে বেছে নিয়েছি, কিন্তু শুরুতে আমার কাছে ৪০০-রও বেশি ছিল। শেষ পর্যন্ত বেছে নিতে সময় লেগেছে নয় বছর।
সাবা বাশির: এত পরিশ্রম সত্যিই বিস্ময়কর। কবিদের কীভাবে বাছলেন? কাউকে বাদ দিতে হয়েছিল?
গুলজার: সময়ভিত্তিকভাবে বেছে নিয়েছিলাম। যেমন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ৮-১০টি কবিতা অনুবাদ করেছিলাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনটি রেখেছি, তিনটিই ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে। অরুণ কলাটকারের তিনটি কবিতা নিয়েছি।
জয়ন্ত মহাপাত্রর “প্রোগ্রেস” নামের একটি শক্তিশালী কবিতা রেখেছি ১৯৯৯ সালের সেই ভয়াবহ ঘটনায়, যখন এক অস্ট্রেলিয়ান মিশনারি ও তার দুই শিশুকে পুড়িয়ে মারা হয়। ওটা বাদ দিতে পারিনি। কিন্তু সেই কবিতাটি তাঁর কবিসত্তাকে পুরোপুরি তুলে ধরে না, তাই আরও দুটি নিয়েছি। তিনি অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমসাময়িক কবি। পাঞ্জাবি ভাষায় অমৃতা প্রীতম একটা যুগকে প্রতিনিধিত্ব করেন। হরিবংশ রাই বচ্চনের “মধুশালা”, সাহির লুধিয়ানভির “তাজ মহল” এসব অমর কবিতা বাদ দেওয়া যেত না। ফয়েজকে বাদ দেওয়া সম্ভব?
অনেক কবিকে বাদ দিতে হয়েছে এই কারণে যে, তারা হয়তো ভালো লিখেছিলেন, কিন্তু ধারাবাহিকভাবে কবিতা লেখেননি বা অন্তত দুইটি কাব্যগ্রন্থ নেই।
নারী-পুরুষ আলাদা করে ভাবিনি। কামলা দাস, পারভীন শাকির, জেহরা নিগাহ এইসব কণ্ঠ উপেক্ষা করার প্রশ্নই ওঠে না।
গজলও শুধু উর্দু নয়, মারাঠি, তামিল, হিন্দিতেও লেখা হয়েছে। দুষ্যন্ত কুমারের সেই বিখ্যাত গজল, “হো গয়ি হ্যায় পীড় পর্বত সি…” রেখেছি, হরিশ ত্রিবেদীকে দিয়ে অনুবাদ করিয়েছি্লাম।
সাবা বাশির: আপনি তো চলচ্চিত্র-জগতের কবিদেরও এনেছেন জান নিসার আখতার, সাহির, জাভেদ আখতার, প্রসূন জোশী। এমনকি অভিনেত্রী মীনা কুমারী আর দীপ্তি নাভালকেও রেখেছেন, যাঁদের কবি হিসেবে অনেকেই জানেন না।
গুলজার: হ্যাঁ, এরা আমার জগতের মানুষ। এরা কেবল সিনেমার জন্য নয়, স্বাধীন কবিতাও লিখেছেন। অনেকে জানেন না, “নাজ” ছদ্মনামে মুশায়রায় যেতেন মীনা কুমারী। আমি ভাবলাম, মনে করিয়ে দেওয়া দরকার, তাঁর আরও এক পরিচয় ছিল। দীপ্তি নাভালেরও প্রকাশিত কবিতা আছে।
সাবা বাশির: বইয়ে ৩৬৫টি কবিতা বলা হয়েছে, কিন্তু আমি একটিকে ‘লুকিয়ে থাকা রত্ন’ মনে করলাম। ৩৬৬তম কবিতা, অধিবর্ষের জন্য, আর সেটা আপনার নিজের লেখা ইজাজত সিনেমার “মেরা কুছ সামান”।
গুলজার: এটা ছিল উদয়ন মিত্রর অবদান। এখানে বলব, উদয়ন মিত্র ও অনন্ত পদ্মনাভন অনেক সাহায্য করেছেন। সম্পূর্ণ প্রকল্পে তাঁরা পাশে ছিলেন।আর ফারহানাও—সে রেকর্ড রাখত, ফাইল দেখত, উৎস ট্র্যাক করত। বড় কাজ করেছে। শেষ কবিতা নিয়ে যদি বলি, উদয়ন যুক্তি দিয়েছিল এই কবিতাটি চলচ্চিত্রের হলেও কবিতার সব উপাদান আছে। তাই এটিকে অধিবর্ষের জন্য ৩৬৬তম হিসেবে রাখা হয়।


