গাজাজুড়ে হাজার হাজার আবাসিক ভবন নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পরিকল্পিতভাবে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিচ্ছে ইসরায়েল।
বিবিসি ভেরিফাই গাজায় মার্চে যুদ্ধবিরতি শেষের পর থেকে ৪০টি স্থানে অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়ার ফুটেজ শনাক্ত ও যাচাই করেছে। এই ফুটেজে তেল-আল-সুলতানের মতো এলাকায় বিভিন্ন স্কুলসহ আবাসিক ও পৌর ভবনও ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে দেখা গেছে।
তেল আল সুলতান রাফা নগরীর সবচেয়ে প্রাণবন্ত এলাকাগুলোর একটি। ঘনবসতিপূর্ণ এ এলাকার রাস্তা বরাবর ছিল শহরের একমাত্র বিশেষায়িত প্রসূতি হাসপাতাল, এতিমখানা ও পরিত্যক্ত শিশুদের পরিচর্যা কেন্দ্র।
এলাকাটির অধিকাংশ ভবন ইসরায়েলের বিমান হামলায় আগেই ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তবে ব্যাপক বোমাবর্ষণের পরও বেশকিছু ভবন দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু গত ১৩ জুলাই নাগাদ গোটা এলাকার ভবনই মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেবল একটি হাসপাতাল আর কয়েকটা ভবন এখনও আছে।
রাফার পাশের এখন সৌদিপাড়া সংলগ্ন এলাকায় ধ্বংসযজ্ঞ চলছে। সেখানে ছিল রাফার বড় বড় বেশ কয়েকটি মসজিদ ও স্কুল। ভিডিওতে এলাকাটিতে ইসসরায়েলের ট্যাংক এগুতে দেখা গেছে এবং রাস্তার পাশে খননযন্ত্র দিয়ে ইসরায়েলের সেনাদেরকে ভবন গুঁড়িয়ে দিতে দেখা যায়।
বোমা হামলায় মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া গাজার অন্যান্য অংশেও ভবন গুঁড়িয়ে দিচ্ছে ইসরায়েল।
গাজা সীমান্ত থেকে মাত্র ১ দশমিক ৫ কিলোমিটার দূরের কৃষিনির্ভর শহর খুজা’আতেও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে ইসরায়েল। খুজা’আ এবং আবাসান আল-কবিরা— দুটি কৃষি প্রধান শহরই এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে খুজা’আ শহরে ১১ হাজার মানুষের বাস ছিল। গত মে মাসে স্যাটেলাইট ছবিতে শহরটিতে বহু বাড়িঘর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গিয়েছিল। টমেটো, গম ও জলপাইয়ের জন্য পরিচিত এই শহরের প্রায় ১,২০০ ভবন ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী আইডিএফ।
এছাড়াও, ইসরায়েলি সীমান্ত থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে কিজান আবু রাশওয়ান নামের একটি গ্রামে ১৭ মে’র পর থেকে প্রায় সব ভবন ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, একসঙ্গে থাকা বেশ কয়েকটি টাওয়ার ব্লক একযোগে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
ইসরায়েল গাজার বিভিন্ন অংশকে ভাগ করে নিরাপত্তা করিডোর তৈরি করছে। এসব করিডোর বরাবর ভবনগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া, বাড়িঘর ভেঙে গাজায় সীমান্তের কাছের এলাকায় ইসরায়েলের ‘বাফার জোন’ তৈরির কথা শোনা গিয়েছিল আগেই।
আর এখন ইসরায়েল সীমান্ত ছাড়িয়ে গাজার আরও ভেতরে ঢুকে বাড়িঘর মাটিতে মিশিয়ে দিচ্ছে। কয়েকটি এলাকায় তারা এরই মধ্যে বাড়িঘর ধ্বংস করেছে।
আইডিএফ জানিয়েছে, এলাকাগুলো “সন্ত্রাসী অবকাঠামো” মুক্ত করতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে বিবিসি এসব নির্দিষ্ট ভবন ধ্বংসের পেছনে সামরিক কারণ জানতে চাইলে কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি।
একজন বিশ্লেষকের মতে, এই ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে গাজায় একটি দীর্ঘমেয়াদি ‘সিকিউরিটি জোন’ গড়ে তুলতে চাইছে ইসরায়েল, যা তারা স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে।
অন্য বিশ্লেষকরা বলছেন, রাফা-তে প্রস্তাবিত ‘মানবিক শহর’ গড়তে ভেঙে ফেলা হচ্ছে ভবনগুলো। জেরুজালেম ‘ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড সিকিউরিটির’ প্রেসিডেন্ট এফ্রায়িম ইনবারের ভাষ্য, এই ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে ইসরায়েল হয়ত চায় ফিলিস্তিনিদের ‘প্রবলভাবে গাজা ভূখন্ড ছেড়ে যাওয়ার ইচ্ছা’ তৈরি হোক।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এর আগেও এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে এমপিদের বলেছিলেন, সেনাবাহিনী “ধ্বংস করে চলেছে আরও বেশি ঘরবাড়ি”, যাতে ফিলিস্তিনিদের আর “ফিরে আসার জায়গা না থাকে”। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমে সেই বৈঠকের খবর ছড়িয়ে পড়েছিল।


