“আমি বিশ্বাস করি মৃত্যুতে আমার শেষ হবে না” : আল মাহমুদ, কবি এবং ঔপন্যাসিক

ফেরদৌস মাহমুদ : মাহমুদ ভাই, আপনার তো অসংখ্য সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছে বিভিন্ন জায়গায়। এখন প্রশ্ন করতে গেলে দেখা যাবে আগের অনেক প্রশ্নেরই রিপিটেশন হয়ে গেছে। উত্তরগুলোও দেখা যাবে একই রকম। আপনার সঙ্গে কিছু নতুন বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছি। আপনি কী বলেন?

আল মাহমুদ : দেখো আজকে সারাদিনই আমাকে একটার পর একটা ইন্টারভিউ দিতে হয়েছে। ঠিক কী ধরনের প্রশ্ন তুমি করবা সেটা তো আমি বলতে পারব না। তুমিই ভেবে দেখো কী করলে ভালো হয়। তবে আমি কিন্তু কানে ঠিক মতো শুনতে পাই না, একটু জোরে জোরে প্রশ্ন করবে।

ফেরদৌস মাহমুদ: অসুবিধা নেই, আমি চিৎকার করে করেই প্রশ্ন করব। তাহলে শুরু করি `আপনি কেমন আছেন’ এ প্রশ্ন দিয়েই।

আল মাহমুদ : খুব ভালো আছি, এটা বলতে পারব না। ইদানীং অলসভাবে বিছানায় চুপাচাপ শুয়ে থাকতেই ভালো লাগে।

ফেরদৌস মাহমুদ: মানুষ যখন চুপচাপ বসে থাকে বা অলসভাবে সময় কাটায় ওই মুহূর্তগুলোতে কিন্তু তাঁর মধ্যে অদ্ভুত কিছু ভাবনা ঘুরপাক খায়। সে নানা রকম স্মৃতি-বিস্মৃতির জগৎ বা চিন্তার মধ্যে ঘোরাফেরা করে। আপনার চিন্তার ওই জগৎটা সম্পর্কে বলুন।

আল মাহমুদ : হ্যাঁ, তোমার কথা ঠিক। চুপচাপ শুয়ে থাকলেও বিভিন্ন স্মৃতি-বিস্মৃতি মাথার মধ্যে ঘোরাফেরা করেই। আমার আসলে তেমন সুখের স্মৃতি খুব একটা নেই। নানা সমস্যার মধ্যে বলা চলে জীবন কাটিয়েছি। মানুষের কাছ থেকে নানাভাবে প্রতারিত হয়েছি। কিন্তু মানুষের ওপর আস্থা হারাইনি। এখনো মানুষকে বিশ্বাস করতে দ্বিধা করি না। কারণ আমি তো জানি সব মানুষ একরকম হয় না। আমি আমার মতো মানুষও অনুসন্ধান করি।

ফেরদৌস মাহমুদ: আপনি যখন লেখালেখি শুরু করেন ওই সময়ের মধ্যেই তো দেশ ভাগ হয়। আপনার লেখালেখি শুরুর সময়ের সাহিত্যিক-পরিবেশটা সম্পর্কে বলুন।

আল মাহমুদ : আমি যখন লিখতে শুরু করি, তখন দেশ ভাগ একটা বড় ব্যাপার ছিল। ওই সময় সাতচল্লিশ-আটচল্লিশের দিকে কলকাতা থেকে অনেক প্রখ্যাত কবি ঢাকায় এসে বসতি করে। তাদের সঙ্গে আমরা ভিড়তে চেয়েছি। যেমন ধরো- ফররুখ আহমদ, সৈয়দ আলী আহসান, আহসান হাবীব এসব প্রখ্যাত কবির কথা। কিন্তু নানা মানসিক ব্যবধানের জন্যই তাঁরা আমাদের পাত্তা দেননি। আমরা তখন আমাদের জন্য একটা স্বতন্ত্র কবিতা আন্দোলনের প্রয়াস করি। তা অবশ্য সচেতনভাবে করি না। নিজে থেকেই হয়ে যায়। তবে চল্লিশের কবিরা প্রথম দিকে আমাদের কোনো স্বীকৃতি বা সম্মান জানাতে প্রস্তুত ছিলেন না। আমরা নিজেরাই আমাদের রাস্তা তৈরি করে নিয়েছি। যেমন- আমার বিষয় ছিল, বাংলাদেশের সে সময়কার গ্রাম-জনপদ, নদী, নারী, প্রকৃতি, পরিবেশ এবং আঞ্চলিক শব্দ কাব্যে ব্যবহার করা। আমি সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করি বোদ্ধা পাঠকমহলের। আমার সমসাময়িক অথচ অগ্রজ শামসুর রাহমান তখনো বুদ্ধদেব বসুর কবিতা পত্রিকায় লিখছেন। আমিও বসুর পত্রিকায় লেখা পাঠাই এবং লেখা ছাপা হয়। এভাবেই আমরা কবিতা পত্রিকার মাধ্যমে বুদ্ধদেব বসুর পছন্দ-অপছন্দের ও রুচির সহযাত্রী হয়ে যাই। আমাদের দেশে অগ্রজরা আমাদের একেবারেই স্বীকৃতি দিতে চাননি। ফলে আমরা দেশ ভাগ হওয়ার পরও কলকাতামুখী থেকে যেতে বাধ্য হই। আজ যদিও মনে হয়, ব্যাপারটা আমাদের জন্য স্বাস্থ্যকর ছিল না। কিন্তু আমরা ছিলাম নিরুপায়।

ফেরদৌস মাহমুদ: আপনার নিকট-অগ্রজ ছিলেন চল্লিশের কবিরা। তাঁদের মধ্যে কি সমর সেনও পড়েন?

আল মাহমুদ : না, সমর সেন তো ছিলেন বলা যায় তিরিশেরই কবি। চল্লিশের বলতে পারো সুভাস মুখোপাধ্যায় বা মঙ্গলাচরণকে।

ফেরদৌস মাহমুদ: এক্ষেত্রে অরুণ মিত্রের নামও তো নেয়া যায়।

আল মাহমুদ : অরুণ মিত্র অবশ্য চল্লিশে লেখা শুরু করলেও তাঁর লেখা প্রভাব বিস্তার করে কিন্তু পঞ্চাশের শুরুর দিকে। অর্থাৎ আমাদের সময়ে এসে। তিনি কবিতায় ফরাসি কাব্য-আঙ্গিক অনুসরণ করতেন। বিষয়টা আমাদের কাছে তখন নতুন ছিল, ফলে তাঁর কবিতা আমরা খুব মনোযোগ দিয়ে পড়তাম।

ফেরদৌস মাহমুদ: আপনার একটা কবিতা আছে `প্রত্যাবর্তনে লজ্জা’। যে কবিতাটায় আমরা এক ট্রেন ফেল তরুণের দেখা পাই, ওই কবিতাটার ওপর অনেক সময় চলচ্চিত্রের কর্মশালায়ও চিত্রনাট্য লিখতে দেয়া হয়। আপনার এ কবিতাটা লেখার প্রেক্ষাপট বা মুহূর্তটা সম্পর্কে বলুন।

আল মাহমুদ : কবিতাটা লেখা হয়েছিল অন্যান্য কবিতা যেভাবে লেখা হয় ওই রকমভাবেই। স্বাভাবিকভাবেই। কবিতাটা আসলে আমার ব্যক্তিগত জীবনেরই বিষয়। বলতে পারো, আমি যে কোনো সময়ই ঠিক জায়গায় পৌঁছতে পারি না এটা তারই একটা প্রকাশ। আমার লাইফে আমি অসংখ্যবার ট্রেন ফেল করেছি। দেখেছি গাড়ি চলে যায়; কিন্তু আমি স্টেশনে একা পড়ে আছি। এ পড়ে থাকার বেদনাই এই কবিতাটাতে প্রকাশ পেয়েছে।

ফেরদৌস মাহমুদ: কবিদের মধ্যে অনেক সময় একে-অপরের প্রতি ঈর্ষা লক্ষ্য করা যায়। কবিদের এ ঈর্ষার বিষয়টাকে আপনি কীভাবে দেখেন। আপনার মধ্যে কি কখনো কারও প্রতি এই ঈর্ষা কাজ করেছে?

আল মাহমুদ : আমি নিজে কখনো কারও প্রতি কোনো ঈর্ষাবোধ করিনি। আমার সঙ্গে কারও কোনো প্রতিযোগিতার ব্যাপার ছিল না। আমার সামনে কেবল একজন বড়মাপের কবি ছিলেন, তিনি শামসুর রাহমান। তাঁর সঙ্গে আমার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। তাঁর মৃত্যুর কয়েকদিন আগেও, তুমি এখন যেখানটায় বসে আছ, সেখানেই তিনি বসেছিলেন। তাঁর পছন্দ মতো চা খেয়ে তিনি বিদায় হয়েছিলেন। অগ্রজের সম্মান আমি সবসময়ই তাকে দিয়েছি।
তবে আমি তোমার বলা ওই কবিদের ঈর্ষার কথাটা বিশ্বাস করি। কেননা, আমি সারাজীবন ব্যক্তিগতভাবে আমার প্রতি অনেক ঈর্ষাকাতর বন্ধুদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। তাদের কারও নামই আমি এখানে বলতে চাই না। তাদের অনেকের দ্বারা আমাকে অনেক মানসিক টেনশনের মধ্যে দিন কাটাতে হয়েছে। এরপরও সব সময় আমি বন্ধুত্বের মর্যাদা রক্ষা করতে চেয়েছি। যদিও জানি আধুনিক কবিদের কোনো বন্ধু হয় না।

ফেরদৌস মাহমুদ: ফরহাদ মজহার একবার কোথাও বলেছিলেন, বাউলরা যতখানি সাধারণ মানুষের অনেক কাছাকাছি যেতে পেরেছেন, আধুনিক কবিরা তা পারেননি। আধুনিক কবিরা মানুষের খুব কাছাকাছি যেতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন। এ ব্যর্থতা প্রসঙ্গে উদাহরণ হিসেবে তিনি আপনার এবং শামসুর রাহমানের কথাও বলেছিলেন। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্যটা শুনতে চাচ্ছি।

আল মাহমুদ : ফরহাদ মজহার হয়তো বিষয়টা এভাবেই দেখেছেন। ওটা তাঁর ব্যক্তিগত মতামত।
সাধারণ জনগণ কখনো সাহিত্য-সংস্কৃতি-কবিতা ইত্যাদির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকে না। তবে সব লেখকই পাঠকের মুখাপেক্ষী। এখন জনগণ বলতে যা বোঝা যায়, সেখানে পাঠকদেরও ধরতে হবে। যদি সেভাবে ধরা হয়, তাহলে সেখানেও আমাদের গতায়ত আছে। একবারে নাখোশ করে দিলে তা চলবে কেন।

ফেরদৌস মাহমুদ: খুব কমন একটা প্রশ্ন করি- মার্কসবাদের প্রতি আপনার এত ক্ষোভ কেন? আপনি তো নিজে এক সময় মার্কসবাদীই ছিলেন।

আল মাহমুদ : আমার প্রকৃতপক্ষে কোনো আদর্শবাদের প্রতি ক্ষোভ নেই। আমি এক সময়, খুব স্বাভাবিক পড়াশোনা দ্বারা মার্কসবাদের প্রতি আগ্রহী হয়েছিলাম এবং হয়তো বা এর সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততাও ঘটে গিয়েছিল। তবে অন্যত্র পড়াশোনা আমাকে এর থেকে সরে আসার প্ররোচনা দিয়েছে। আমাকে একজন পূর্ণাঙ্গ বিশ্বাসী মানুষে পরিণত করেছে। বলতে পারো, আমি পড়তে পড়তে বদলাই আর লিখেতে লিখতে বিবর্তিত হই।

ফেরদৌস মাহমুদ: তাহলে তো আমরা বলতে পারি, পড়তে পড়তে আপনি আপনার বর্তমান বিশ্বাস থেকে আবারও সরে দাঁড়াতে পারেন।
আল মাহমুদ : না, এখানে একটা জিনিস আছে। এখানে একটা কথা থেকে যায় সেটা হলো, মানুষের বিশ্বাস। ধর্ম মানুষকে একটা চিরন্তন আশ্রয়ের আশ্বাস দেয়। এ আশ্বাসের বলেই মানুষ পরকালে বিশ্বাস করে। মৃত্যুর পরবর্তী জীবনে বিশ্বাস করে। আমি মনে করি এ পার্থিব জীবনই শেষ নয়, মৃত্যুর পরও আমার একটা জীবন শুরু হবে।

ফেরদৌস মাহমুদ: অনেক সময় আমাদের কাছে মনে হয়, লালন ও গৌতম বুদ্ধের মধ্যে চিন্তার ক্ষেত্রে কোথায় যেন এক ধরনের মিল রয়েছে। এ বিষয়ে আপনার কী মনে হয়।

আল মাহমুদ : বাহ্যিকভাবে ওইরকম মনে হলেও আমি তোমার সঙ্গে বিষয়টাতে সম্পূর্ণ একমত হতে পারলাম না। কেননা, আমার কাছে মনে হয়েছে দুজনের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। পার্থক্যটা হচ্ছে- লালন প্রশ্ন করেছেন এবং নিজেই জবাব দিয়েছেন। এ জবাবগুলো আমাদের অনেক জিজ্ঞাসার সমাধান দিয়েছে। অপরদিকে গৌতম বুদ্ধের দর্শন, প্রশ্ন এবং উত্তর আমার কাছে মনে হয়েছে কৌতূহলোদ্দীপক; কিন্তু পরিতৃপ্তিকর নয়। আমার মতো ব্যক্তিকে তিনি কোনো সমাধানই দিতে পারেননি।

ফেরদৌস মাহমুদ: আপনার শুরুর দিকে বেশিরভাগ লেখার প্রকাশ বাংলাদেশে না হয়ে কলকাতাকেন্দ্রিক কেন?
আল মাহমুদ : তখন কলকাতাকেন্দ্রিকতা আস্তে আস্তে স্তিমিত হয়ে আসছিল। তবে তখনকার কলকাতার পত্রিকা এদেশে আসত। আমাদের অভ্যেস অনুযায়ী আমরা লিখেছি। কৃত্তিবাস, ময়ুখ এসব পত্রিকায় আমি নিয়মিত লিখতাম। আর ঢাকায় তখন সমকাল প্রকাশ হতো; সমকাল প্রকাশিত হওয়ার পর আমি কিন্তু কলকাতায় বেশি লিখতাম না। সমকালে সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদক হিসেবে ছিলেন অসাধারণ সম্পাদক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন