Home Blog Page 47

জুলাইকে বিক্রি হতে দেব না : সায়ান

“… জুলাইয়ের অর্জন, সেটাকে কেন্দ্র করে অনেক কথাবার্তা হয়, কোথাও কোথাও হতাশাও আছে। সবকিছুর পরও এক বছর আগে এই মাটির বুকে কতগুলো বাচ্চা ছিল, অনেক মানুষ ছিলেন। মাটিতে বাচ্চাগুলোর রক্ত মিশে গেছে। এটাকে অস্বীকার করা, খাটো করা, মানতে না পারাটা আমার কাছে অগ্রহণযোগ্য।

নিশ্চয়ই জুলাইকে অনেকে বিক্রি করছেন। নিশ্চয়ই জুলাই নিয়ে অনেকে অহংকারী হয়ে উঠেছেন। (তারপরও) জুলাই আমাদের বাংলাদেশের মাটির গল্প।আপনি কোনো গণ-অভ্যুত্থানকে বাদ দিতে পারবেন না। আপনি উনসত্তর, নব্বইকে বাদ দিতে পারবেন না। এটাকে ছোট করে দেখার অবকাশ নেই।

… মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি যেমন ৫০ বছর ধরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অনেকাংশে বিক্রি করেছে, সে রকম করে জুলাইকে বিক্রি করার একধরনের মানসিকতা আমি দেখেছি। জুলাইকে বিক্রি হতে দেব না।

… জুলাইয়ে অংশ নেওয়াটা আমাদের দায়িত্ব ছিল, তাই বলে বাড়াবাড়ি কৃতিত্ব দাবি করা, মহৎ ভূমিকায় চলে যাওয়া অসমর্থনযোগ্য, অগ্রহণযোগ্য।

… (জুলাই) অ্যাবসলিউটলি জনতার। অ্যাবসলিউটলি বাংলাদেশের সব মানুষের। যাঁরা গণতন্ত্রমনা মানুষ, যাঁরা অত্যাচার নিতে পারছিলেন না; যাঁদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছিল। পিঠ এতটাই ঠেকে গিয়েছিল যে মৃত্যুকে আর পরোয়া করেননি। বেঁচে থাকার জন্য চুপ ছিলেন। তারপর দেখা গেল, খোলা বুকের ছেলেগুলোকে পুলিশ গুলি করে মারছে—সেই দৃশ্য বাংলাদেশের প্রতিটি কোণঠাসা প্রাণে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল।

… এখনো প্রতিদিনের অসংখ্য ঘটনা আমাদের আহত করে, হতাশ করে, কষ্ট দেয়। মনে হয়, আরও কত বড় লড়াই আমাদের লড়তে হবে। আমাদের বিচারে ফিরতে হবে, নির্বাচনে ফিরতে হবে। আমাদের শত্রু অনেক, এর মধ্যে সবচেয়ে কষ্টদায়ক বিষয় হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি।

সাধারণ জনতা এখনো কোণঠাসা; কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে চৈতন্যের উদ্ভাস ঘটেছে, তাঁরা আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। এই জায়গাকে ইগনোর করতে পারবেন না। বিশৃঙ্খলা হচ্ছে, মব হচ্ছে, তবে চোখ এড়াচ্ছে না কিছুই। আমরা গন্ডগোলের মধ্যে আছি, কিন্তু কিছুতেই আগের সময়ের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না।

কী হবে আমরা জানি না, সবাই মিলে যেটাকে ঠেকিয়ে দিতে পারব, সেটাই হবে। অনেক পক্ষ আছে, অনেক রকমের অভিযোগ, হতাশা আছে; কিন্তু দিন শেষে এটা আমাদের জনতার নতুন বাংলাদেশ, এখানে জনতাও একটা পক্ষ হিসেবে নিজেকে দেখেন। সেটা ছিল না আগে। এটা মানতে হবে।

… মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী কয়েক বছর অনেক ধরনের অস্থিরতা ছিল; অনেক ধরনের দুঃখ-কষ্ট, ন্যায়-অন্যায় ছিল। অস্থিরতার মধ্যেও মনে করেন কেউ একজন এসে বলল, মুক্তিযুদ্ধ ভুল ছিল; এটা আমি কোনো দিন মানব না, স্বীকার করব না। তার মানে কী? মুক্তিযুদ্ধ আমাদের পরিচয়ের গল্প। স্বাধীনতাসংগ্রাম একবারই হয়, সেখানে আমরা জিতেছি। এরপর প্রত্যেকটা মানুষের হাজার হাজার সমস্যা, সেগুলো তো চলতে থাকে। সেখানে জনতাও একটা পক্ষ। জনতার বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ নেই। লড়াই কখনো শেষ হয় না।

সে হিসেবে বলব, একাত্তরের ধারাবাহিকতায় নব্বই আসে, একাত্তরের ধারাবাহিকতায় চব্বিশ আসে। চব্বিশ মানুষের, নব্বই মানুষের, একাত্তর তো অবশ্যই মানুষের। সে রকম পরিস্থিতি তৈরি হলে আবারও মানুষ মাটির জন্য যা লাগবে, মাটিকে তা-ই দেবেন। আবার মানুষ রাজপথে মরে যাবেন।

জনতার কৃতিত্ব যদি কেউ কেড়ে নিতে চায়, কেউ বলবে ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’; কেউ বলবে ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’; কেউ বলবে ‘অমুকের কৃতিত্ব’—কিছুই মানব না। আপনি কোনোভাবে যদি মানুষকে ছোট করেন, বাচ্চাগুলোর রক্ত মাটিতে মিশে যাওয়ার ঘটনা ভুলিয়ে দিতে চান, আমরা সেটা মানব না।

… জুলাইয়ের নারীরা কেউ রান্নাঘরে, কেউ স্কুলে, কেউ চাকরিতে ছিলেন, যখন এই মাটির তাঁকে দরকার ছিল, বুক পেতে দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন আবার নারী তাঁর নিজের কাজে ফিরে গেছেন। তাঁর সেই পুরুষালি প্রয়োজনটা নেই। অন্যদিকে পুরুষালি প্রবণতাটা সমাজে খুবই বিদ্যমান, সে নারীকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়।

… আমি চাই, দেশের প্রত্যেকটা মানুষ দেশের মালিক হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। জনতার শক্তিশালী অবস্থান দেখতে চাই। আমি চাই, রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান মানুষের পক্ষে কাজ করবে। ক্ষমতায় যারা যাবে, তারা মানুষকে ভয় পাবে; মানুষের হাতে ভোটাধিকার ফিরে আসবে। সুষ্ঠু বিচারব্যবস্থা চাই; জনবান্ধব প্রশাসন চাই; নারীরা এগিয়ে যাবেন, সেটা চাই; অপরাধীদের বিচার হবে, সেটা চাই; ধর্ষণকারীদের জন্য দেশটা জাহান্নাম হবে, সেটা চাই। “

(দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত সংগীতশিল্পী ফারজানা ওয়াহিদ সায়ান-এর সাক্ষাৎকার থেকে সংকলিত)

পিকাসোর জগৎ – দৃষ্টের বয়ান অদৃষ্টের বসন : হাসান হাবিব, চিত্রশিল্পী ও শিল্প ও সাহিত্য সমালোচক

গুহাবাসীরা এঁকেছিল শরীর
দেবতারা খুঁজল পাথর …

কোনো অভিব্যক্তির শৈল্পিক সৌন্দর্যকে শিল্প বলা যায়। শৈল্পিক সৌন্দর্য উপস্থাপনে শিল্পী যেভাবে অন্তরের মূর্ছনায় কায়া-কান্তময় করে তুলতে পারেন, তাঁর শিল্পপ্রয়াসের অনুভূতি ও অনুতৃপ্তি ততটুকুই সসীম ও পরিব্যাপ্ত হয়ে উঠবে। আসলে উপস্থাপন নির্ভর করে শিল্পীর চৈতন্যবোধ, যাপিত জগৎ ও শিল্পকৌশলের বিনির্মাণ-সমগ্রতার ওপর। এ-কারণে অনেকে শিল্পকে জীবন ও জগতের প্রতিরূপ বলতে চেয়েছেন। তবে ললিতকলা বা চারুশিল্পের ভাষায় শিল্প হলো সৃজন বা সৃষ্টিশীল।

পাবলো রুইজ ই পিকাসো ১৮৮১ সালের ২৫ অক্টোবর স্পেনের মালাগা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। পিকাসোর বাবার নাম হোসে রুইজ ব্লাসকো এবং মায়ের নাম মারিয়া পিকাসো লোপেজ। পাবলো মায়ের নামাঙ্কিত ‘পিকাসো’কে সারাবিশ্বে আলোর মূর্ছনায় ছড়িয়ে দিয়েছেন। পাবলো পিকাসো মাত্র দশ বছর বয়সে শিল্পকর্মের জন্য খ্যাতি অর্জন করেন! ওই বয়সেই স্প্যানিশ ফ্রান্সিসকো ডি জোয়ারবেরন, ফ্রান্সিসকো গয়া, জকুইন সঁরল্লা, জোয়ান গ্রিস, জোয়ান মিরো, সালভাদর দালির মতো খ্যাতিমান শিল্পীর নামের পাশে তাঁর নাম স্থান করে নেয় এবং সুনাম অর্জন করে। তাঁর মতো এত অল্প বয়সে সে-সময় ইউরোপে শিল্পকর্মের জন্য বিখ্যাত হওয়ার দৃষ্টান্ত অতিনগণ্য।

মাত্র ১৬ বছর বয়সে বার্সেলোনা শহরে তাঁর চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয়। তবে পাবলো পিকাসোর চিত্রকর্ম শুরু থেকে মধ্যযুগীয় চার্চের চিন্তাজগৎ ও ধর্মানুরাগের বাইরে বেশ ভালো করেই মুক্তচিন্তার আবহে প্রস্ফুটিত ও সম্ভারিত হয়। তাঁর চিত্রকর্ম গির্জা-অনুরাগ ও দেবদেবীর সদৃশমণ্ডিত পিউরিটান কল্পজগৎকে অতিক্রম করে মানবতাবাদ বা humanism-এর দৃকপাত অর্জনে সমর্থ হয়। প্রসঙ্গক্রমে এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ইউরোপে মধ্যযুগীয় চিন্তাচেতনা থেকে বেরিয়ে আসার আন্দোলন শুরু হয় মূলত ষোড়শ শতাব্দীতে। এ-সময় থেকে মানুষ তার ভাবনায় গেঁথে ফেলে – ‘প্রতিভা কোনো দৈবলব্ধ দান নয়।’ এই পরিবর্তনকে ইউরোপীয় রেনেসাঁস বলা হয়। ইউরোপীয় এই রেনেসাঁসে Sir Thomas More-এর ‘Utopia’ এবং Bacon-এর ‘Novum Organum’-এর প্রভাবের কথা উল্লেখ করা যায়।

ষোড়শ শতাব্দীতে শুরু হওয়া রেনেসাঁস আন্দোলনের ঢেউ পুরো ইউরোপের শিল্প, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক বোধে আমূল পরিবর্তন এনে দেয়। এ সময় বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অগ্রগতি সাধিত হয়। বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে মানুষ গ্রামোফোন, টেলিফোন, বেতার, চলচ্চিত্র, বাইসাইকেল, মোটরগাড়ি, অ্যারোপ্লেন ইত্যাদি লাভ করে। অন্যদিকে সমাজতন্ত্র ও মানবতাবাদের আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে। মানুষের রাজনৈতিক চিন্তায় পরিবর্তন সাধিত হয়।পাবলো পিকাসো ছিলেন মূলত একজন সচেতন ও পরিবর্তিত সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে থাকা পরিবারের সন্তান। তাঁর শিল্পকর্মের আভিজাত্যের অভিব্যক্তিতে খুব অল্প সময়ে ইমপ্রেশনিজম ও এক্সপ্রেশনিজমের কালোত্তীর্ণ কৌশলগুলো সহজে ধরা দেয়। তিনি শিল্পকর্মের চিন্তাধারায় নিজের অভিব্যক্তিকে চলমান ব্যঞ্জনার সঙ্গে চ্যালেঞ্জ করে ‘চিত্রকর্মের নিজস্ব জীবন’ প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়েছিলেন।

১৯০৪ সালে স্পেনের মালাগা ছেড়ে প্যারিসে আগমন ছিল তাঁর জীবনে শিল্পজগতের গৌরব বহনের মাইলফলক। এখানে বলে রাখা ভালো, তিনি শিল্প-সাহিত্যের ‘মিউজিয়াম’খ্যাত প্যারিসে স্থায়ী হওয়ার আগেই ইমপ্রেশনিস্ট পদ্ধতি আয়ত্ত করেন এবং বিখ্যাত তুলুস লুৎরেকের শিল্পভঙ্গির সঙ্গে এক্সপ্রেশনিস্ট শিল্পভঙ্গির মিশ্রণ ঘটাতে সমর্থ হন। তিনি শিল্পভঙ্গি ও ইল্যুশনের মাত্রায় ১৯০৭ সালে কিউবিজমের উদ্ভাবন ঘটান। পিকাসো কঙ্গো ও আইভরি কোস্টের নিগ্রোদের মুখোশ, হিংস্রতা, বীভৎসতা, আদিমতা ও বন্যতায় কিউবিজমের ব্যবহারে ‘barbaric sense’-এর ধারণায় এক নতুন মাত্রা প্রতিষ্ঠা করেন। আদিমতা ও বন্যতা মানবেতিহাসের পরাবাস্তবতাকে প্রমাণ করে। এ-আদিমতার আকর্ষণকে শিল্পী যেমন তাঁর শিল্পসৌকর্য-সৌষ্ঠবের আঁচড়ে নন্দিত ও গৌরবান্বিত করেছেন, তেমনি সংগীত ও কাব্যে মূর্ছনা ও নির্মিতির বহুমাত্রিকতা আমরা লক্ষ করি। এ-আদিম সজীবতার ধ্যানে মানুষ বিপর্যস্ত ও কাঙ্ক্ষার অনলে যন্ত্রণাদগ্ধ হয়েছে আবার পুলকিত হয়েছে – তার বর্ণাঢ্যতা আমরা দেখতে পাই টি.এস এলিয়টের কাব্যে ও রুশোর শিল্পকর্মে। তবে শিল্পবিন্যাসে আদিমতার এক্সপ্রেশনে যে-সত্তার উপস্থিতি শিল্পরসিক ও দর্শক-বীক্ষক উপলব্ধি করেন, তার পার্থক্যটি দৃষ্টির বৈভবের মধ্য দিয়ে সংঘটিত হয়। সে-কারণে এক্সপ্রেশনের বৈশিষ্ট্যে ‘ভার্টিক্যালে’র একটা প্রশ্ন থাকে। পিকাসো বন্যজীবনে আদিমতার নিরীক্ষায় ঐতিহাসিক সংগতশক্তির আশ্রয় নিয়েছিলেন, স্থৈর্যহীন রং ও রেখার প্রাবল্য এড়িয়ে। ফলে তাঁর চিত্রের ক্যানভাস একটি সৌষম্য ও সিনথেসিস বার্তা এনে দেয়। আবার তাঁর চিত্রে আদিমতার ভয়ংকর রূপের বিবেচনা আগ্রহ ও অপ্রয়োজনীয় প্রমাণ হয়ে পড়ে। ফলে আদিমতা নন্দনতত্ত্বের ঐশ্বর্য অর্জন করে ফভবাদকে (Fauvism) অতিক্রম করে। আর এখানেই মাতিস থেকে পিকাসো ভিন্ন।

গোয়ের্নিকা শিল্পকলার মধ্যযুগীয় গির্জা সিসটিন মিমেসিস ও রেনেসাঁসের ‘পরিপ্রেক্ষিত নাটকীয়তা’ ভাঙার একটি নবনির্মিতির ‘কনটেম্পরার’।গোয়ের্নিকার শক্তি মানবতার এমন এক বিবর্তন, যা হাজার বছরের শিল্পকীর্তির ‘প্রিমি লুমি’কে অতিক্রমণের বিস্ময়কর প্রমাণ বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরে। এ-শিল্পকর্মটি যুদ্ধের বিরুদ্ধে একটি সমন্বিত প্রতিবাদ, বিরুদ্ধতা ও বিক্ষোভের অধিধ্যান ও প্রতিমূর্তিকে প্রকাশ করে। গোয়ের্নিকার পিকাসো ও পিকাসোর গোয়ের্নিকায় রয়েছে যুদ্ধ ও অশান্তির বিরুদ্ধে ‘বলীবর্দের হুংকার’ ও অনুস্মারক।

গোয়ের্নিকা স্পেনের একটি শহর। ১৯৩৭ সালে স্পেনে গৃহযুদ্ধ চলছিল। ২৬ এপ্রিল জার্মানির নাৎসির সহযোগিতা ও গৃহযুদ্ধ গোয়ের্নিকা শহরটিকে ধ্বংস করে দেয়। নির্মম বোমার আক্রমণে শত শত মানুষ ও প্রাণী নিহত হয়। পিকাসো এ-যুদ্ধের পৈশাচিকতা ও নৃশংসতায় ক্ষুব্ধ ও বেদনার্ত হয়ে সেটি গোয়ের্নিকায় রূপ দিতে অনুপ্রাণিত হন। গোয়ের্নিকার ধ্বংসস্তূপ থেকে দুঃখ ও যন্ত্রণার বোহেমিয়ান, কালো ও ধূসর রঙে উঠে আসে। পিকাসোর ১৩৭.৪ বাই ৩০৫.৫ ইঞ্চি আকারের এ-চিত্রকর্মটি বিশ্ববাসীর কাছে শুধু যুদ্ধ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদই নয়, চিত্রকর্মটি যুগে যুগে মানুষকে ‘যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই’ – বাক্যটিকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

তবে পিকাসোর বিশ্বখ্যাত ‘গোয়ের্নিকা’ দিয়ে তাঁর চিন্তাচেতনার পরিব্যাপ্তি ও সমগ্রতাকে নির্ণয় করা সম্ভব নয়। একটি ধ্বংস ও প্রতিবাদচিত্র তাঁকে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি এনে দিলেও তাঁর ‘লেই দেমোয়াজেল দে’তিনিয়োঁ’, ‘দ্য উইপিং উইম্যান’, ‘দ্য ব্লু রুম’, ‘ওল্ড গিটারিস্ট’, ‘ল্য মুঁল্যা দ্য লা গালেৎ’, ‘টু নুডস’, ‘সেল্ফ-পোর্ট্রেট’, ‘মডেল অ্যান্ড ফিশবৌল’, ‘থ্রি মিউজিশিয়ানস্’ ও ‘উইমেন অব আলজিয়ার্স’ – নামোল্লিখিত শিল্পকর্মগুলো তাঁকে চিরস্মরণীয় করে রাখবে।

ADHD – মনোযোগের সমস্যা থেকে সামাজিক সচেতনতা

আপনি কি কখনো এমন কাউকে চেনেন, যে একসাথে দশটা কাজ শুরু করলেও একটাও শেষ করতে পারে না? কিংবা এমন শিশু, যাকে আপনি এক মিনিটের জন্যও শান্তভাবে বসাতে পারেন না? এমন মানুষদের ঘিরে আমাদের সমাজে একটা ধারণা গড়ে উঠেছে “ও খুব দুষ্ট”, “মন বসে না”, “মনোযোগের অভাব”। কিন্তু এই আচরণগুলো কখনো কখনো মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত একটি বৈজ্ঞানিক সমস্যার অংশ হতে পারে, যার নাম ADHD (Attention Deficit Hyperactivity Disorder) বা মনোযোগ ঘাটতি ও অতিসক্রিয়তা ব্যাধি।

ADHD কী?

ADHD হলো এক ধরনের নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার, অর্থাৎ মস্তিষ্কের বিকাশগত একটি সমস্যা। এটি সাধারণত শৈশবে শুরু হয়, কিন্তু অনেক সময় প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও এর লক্ষণ রয়ে যায়। এই সমস্যা প্রধানত তিন ধরনের আচরণগত বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে প্রকাশ পায়, মনোযোগে ঘাটতি (Inattention), অতিসক্রিয়তা (Hyperactivity) ও আচরণগত উচ্ছৃঙ্খলতা (Impulsivity)।

ADHD থাকা মানেই কেউ “অসফল” বা “বিচ্ছিন্ন” নয়। বরং সঠিক বুঝে এবং সহায়তায় ADHD ব্যক্তিরা নিজেদের জীবনে অসাধারণ কিছু করে দেখাতে পারে। তবে তার আগে আমাদের দরকার বোঝা এই অবস্থার শিকড় ঠিক কোথায়?

ADHD নতুন কোনো রোগ নয়। ১৯০২ সালে ব্রিটিশ চিকিৎসক Sir George Still প্রথম এই ধরণের আচরণকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করেন। তবে তখনও এটিকে নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হতো। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে DSM (Diagnostic and Statistical Manual of Mental Disorders)-এর মাধ্যমে ADHD একটি স্বীকৃত মানসিক ব্যাধি হিসেবে পরিচিতি পায়। বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) সহ আন্তর্জাতিক মানসিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো ADHD-কে একটি বৈধ ও গবেষণাভিত্তিক নিউরোলজিকাল সমস্যা হিসেবে গ্রহণ করেছে।

শিশুদের মধ্যে ADHD:

. মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা

. নিয়মিত জিনিসপত্র হারিয়ে ফেলা

. শিক্ষক বা বড়দের কথা মাঝপথে কেটে দেওয়া

. অতিরিক্ত দৌড়াদৌড়ি বা নড়াচড়া

. অপেক্ষা করার ধৈর্য না থাকা

. প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ADHD:

. অনেক কাজ শুরু করে কোনোটা শেষ না করা

. সময় ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা

. সম্পর্ক বা পেশাগত জীবনে স্থিরতা না থাকা

. আত্ম-আলোচনা বা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা

. খুব স্বাভাবিক বিষয়ে নার্ভাস ফিল করা

. সারাক্ষণ সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা

ADHD হওয়ার পেছনে জেনেটিক (genetic) এবং নিউরোকেমিক্যাল (neurochemical) কারণই মূলত দায়ী। গবেষণায় দেখা গেছে, ADHD রোগীদের মস্তিষ্কের ডোপামিন এবং নরএপিনেফ্রিন নামক নিউরোট্রান্সমিটারের ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়। এদের প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স (যা পরিকল্পনা, মনোযোগ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের জন্য দায়ী) যথাযথভাবে কাজ করে না। পারিবারিক ইতিহাস, গর্ভাবস্থায় ধূমপান/মাদক সেবন, কম জন্ম ওজন এবং নির্দিষ্ট পরিবেশগত বিষক্রিয়া ADHD হওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

আমাদের সমাজে ADHD নিয়ে অনেক ভুল ব্যাখ্যা চালু আছে, যেমন:
“এটা অলসতার অজুহাত।”

“শিশুরা বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে।”

“ADHD মানেই মানসিক রোগী।”

“চিন্তাভাবনার সমস্যা নয়, অভ্যাসের সমস্যা।”

এসব ভুল ধারণা ADHD রোগীদের প্রতি সহানুভূতির পরিবর্তে বিরূপ মনোভাব তৈরি করে। ফলে শিশুরা অবহেলার শিকার হয়, প্রাপ্তবয়স্করা চাকরি বা সম্পর্কে সমস্যায় পড়ে।

ADHD নির্ণয়ের জন্য নির্দিষ্ট কোনো একক পরীক্ষা নেই। মূলত DSM-5 গাইডলাইনের ভিত্তিতে চিকিৎসকরা ইতিহাস, আচরণ পর্যবেক্ষণ এবং অভিভাবক বা শিক্ষকের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে রোগ নির্ণয় করেন।

চিকিৎসা সাধারণত তিনটি ভাগে বিভক্ত :

ঔষধ (Medication): যেমন: মেথাইলফেনিডেট, অ্যামফেটামিন, যা মস্তিষ্কে ডোপামিনের মাত্রা স্বাভাবিক করতে সহায়তা করে।

বিহেভিয়ার থেরাপি: বিশেষত শিশুদের জন্য কার্যকর। এর মাধ্যমে আচরণ নিয়ন্ত্রণ শেখানো হয়।

শিক্ষা ও পারিবারিক সহায়তা: ADHD সম্পর্কে বাবা-মা ও শিক্ষকদের সঠিক জ্ঞান থাকা অত্যন্ত জরুরি।

বাংলাদেশে ADHD নিয়ে সচেতনতা অত্যন্ত সীমিত। বেশিরভাগ অভিভাবক এটিকে “দুষ্টামি”, “শাসনের অভাব” বা “পড়ালেখায় অমনোযোগিতা” হিসেবে দেখেন। ফলে শিশুদের অবস্থা আরও জটিল হয়। ঢাকা শহরের কিছু মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ADHD সংক্রান্ত নির্ণয় ও থেরাপি চালু থাকলেও তা অধিকাংশ অঞ্চলে নেই। স্কুল পর্যায়ে ADHD নিয়ে কোনো প্রশিক্ষণ বা নীতিমালা নেই। ফলে অনেক শিশু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে ছিটকে পড়ে।

একটি ADHD-যুক্ত ব্যক্তি শুধুমাত্র একটি “problem case” নয়, বরং তারা একেকজন divergent thinker যারা সঠিক সহায়তায় ভিন্নরকম সমাধান খুঁজে পেতে পারে। এমন বহু উদাহরণ আছে যেখানে ADHD-যুক্ত ব্যক্তিরা সফল উদ্যোক্তা, শিল্পী, উদ্ভাবক হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছেন।সমাজ যদি ADHD-কে “ব্যতিক্রমী মস্তিষ্ক” হিসেবে বুঝে, তাহলে সে সমাজ আরও সহানুভূতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও উদ্ভাবনী হতে পারে।

ADHD কোনো অলসতা নয়, কোনো দুষ্টামিও নয় এটা এক ধরনের বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত নিউরো-বৈচিত্র্য। তাই প্রশ্ন উঠছে, ADHD-কে আর “বাজে অভ্যাস” না বলে, একটি বৈধ পার্থক্য হিসেবে দেখতে আমরা কি প্রস্তুত?

দেশে শিল্পোৎপাদন ও রপ্তানি বেড়েছে, কিন্তু চাকরি বাড়ছে না কেন?

দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছে–গত এক দশকে দেশে একের পর এক শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে এবং উৎপাদনও নিয়মিতভাবে বেড়েছে। কিন্তু উৎপাদন বাড়লেও, এসব কারখানায় নতুন কর্মসংস্থান তেমন একটা তৈরি হয়নি।

২০১৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এই বৈপরীত্যটি স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। অর্থনীতিবিদেরা একে বলছেন “চাকরিবিহীন প্রবৃদ্ধি”—এক ধরণের অর্থনৈতিক ধাঁধা।

২০২৫ সালে শিল্প খাত বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩৪.৮১% জোগান দেয়, যা ২০০৯-১০ অর্থবছরে ছিল ২৭.৫৫%। এ সময়ে প্রতি বছর কারখানাগুলোর উৎপাদন ১০ থেকে ২০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।

তবে, এ সময়ের মধ্যে উৎপাদন খাতে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা কমেছে—২০১৩ সালে যেখানে শ্রমিক সংখ্যা ছিল ১ কোটি ২১ লাখ, ২০২৪ সালে তা নেমে আসে ১ কোটি ২০ লাখে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই শিল্প প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি ছিল বৃহৎ আকারের আধুনিক এবং স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিনির্ভর কারখানা। এসব উৎপাদন লাইনে অনেক কম সংখ্যক শ্রমিকের প্রয়োজন হয়।

এই ধরনের দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পগুলো তুলনামূলকভাবে কম শ্রমিক নিয়েও বেশি মূল্য সংযোজন করতে পেরেছে। যার ফলে, তারা জিডিপিতে বড় অবদান রাখলেও, চাকরি সৃষ্টি হয়নি তেমন।

এ ছাড়া আরও কিছু বিষয়ও ভূমিকা রেখেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন—যদি দেশ সময়মতো জনশক্তি প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং সঠিক পরিকল্পনায় বিনিয়োগ না করে, তাহলে শিল্প প্রবৃদ্ধির সঙ্গে চাকরি বৃদ্ধির সম্ভাবনা হাতছাড়া হয়ে যাবে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক কেএএস মুর্শিদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন–চাকরির সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে সেবা খাতে, কৃষিভিত্তিক নয় এমন গ্রামীণ কার্যক্রমে এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে—কিন্তু আনুষ্ঠানিক শিল্প খাতে তা বাড়ছে না।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ‘অর্থনৈতিক কৌশল পুনর্গঠন’ টাস্কফোর্সের প্রধান এই অর্থনীতিবিদ বলেন — এই সমস্যার এক অংশ স্বয়ংক্রিয়তায়, আরেক অংশ শ্রমের চাহিদা ও যোগানের অসামঞ্জস্যে নিহিত।

“শুধু বড় জনসংখ্যা থাকলেই আর কর্মসংস্থান তৈরি হয় না। আগের মতো অদক্ষ শ্রমিকের চাহিদা এখন আর নেই। আমাদের প্রয়োজন আধা-দক্ষ, দক্ষ এবং প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনশক্তি—সেই জায়গাতেই আমাদের ঘাটতি,” বলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, “বিশ্বের উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সবার দিকেই যাত্রা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ভিত্তিক প্রযুক্তির দিকে। আর আমরা এখনও সেই প্রস্তুতি নিতে পারিনি।”

শ্রমনীতি বিশেষজ্ঞ নাজমুল হোসেন আভি বলেন, “যদি আমরা শিল্প খাতে আরও আনুষ্ঠানিক চাকরি তৈরি না করি, তাহলে দেশে ‘মানসম্মত চাকরি’ বা ‘শোভন কাজ’-এর ঘাটতি বাড়তেই থাকবে।”

তিনি আরও বলেন, “স্বয়ংক্রিয়তা ও নতুন প্রযুক্তির বিষয়টি থাকলেও, আমাদের শিল্পভিত্তিক বৈচিত্র্যের অভাবও কর্মসংস্থান বাড়াতে বাধা সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশ শুধু সহজ বিকল্পগুলোর ওপরেই নির্ভর করছে।”

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) জেনেভা অফিসের সাবেক বিশেষ উপদেষ্টা রিজওয়ানুল ইসলাম বলেন, “সেবা খাত কখনোই উৎপাদন খাতের চাকরির বিকল্প হতে পারে না। সেবা খাতের অনেক চাকরি কম উৎপাদনশীলতা ও কম আয়ের, যা মানুষকে টিকে থাকতে সাহায্য করতে পারে বটে, তবে তা দারিদ্র্য থেকে টেকসই মুক্তি দেয় না।”

(দ্য ডেইলি স্টার থেকে সংক্ষেপিত)

রুয়ান্ডার গণহত্যা – জাতিগত পরিচয় যেভাবে ধ্বংসের পরোয়ানায় রূপ নেয়

রুয়ান্ডার গৃহযুদ্ধ (১৯৯৪) মানব ইতিহাসের এক কলঙ্কময় অধ্যায়, এটি আধুনিক বিশ্বের অন্যতম নৃশংস গণহত্যায় পর্যবসিত হয়েছিল। এই যুদ্ধ কেবল দুটি জাতিগোষ্ঠীর (হুতু ও তুতসি) সংঘাত ছিল না, বরং ঔপনিবেশিক শক্তির বিভাজন নীতি, রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিষ্ক্রিয়তার এক করুণ পরিণতি ছিল। রুয়ান্ডার এই ট্র্যাজেডি কেবল আফ্রিকার ইতিহাসেই নয়, সমগ্র বিশ্বের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে বিশ্বকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছিল।

রুয়ান্ডার জাতিগত বিভাজন বহু শতাব্দী ধরে চলে এলেও, ঔপনিবেশিক শক্তি প্রথমে জার্মান, পরবর্তীতে বেলজিয়াম এই বিভাজনকে আরও গভীর করে তোলে। ১৯১৬ সালে বেলজিয়ানরা রুয়ান্ডায় প্রবেশ করে এবং তাদের শাসনকালে হুতু ও তুতসিদের মধ্যে কৃত্রিম বিভাজন তৈরি করে। তারা নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য এবং সামাজিক স্তরবিন্যাসের উপর ভিত্তি করে তুতসিদের উচ্চতর এবং শাসকগোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করে, এ ঘটনা সংখ্যাগরিষ্ঠ হুতু সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি করে।
পরিচয়পত্র প্রবর্তন করে জাতিগত পরিচয় বাধ্যতামূলক করা হয়, যা ভবিষ্যতে গণহত্যার পথ প্রশস্ত করে। তুতসিরা শিক্ষায় এবং সরকারি চাকরিতে তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পেত, এতে হুতুদের মনে বৈষম্যের জন্ম দেয়। এই বৈষম্যমূলক নীতিই ছিল ভবিষ্যতের সংঘাতের মূল ভিত্তি। বেলজিয়ানরা মূলত তুতসিদের মাধ্যমে শাসনকার্য পরিচালনা হুতুদের মনে ঔপনিবেশিক শাসন এবং তুতসিদের বিরুদ্ধে এক গভীর অসন্তোষ তৈরি করে। এই ঔপনিবেশিক বিভাজন নীতির দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী, যা স্বাধীনতা লাভের পরেও জাতিগত মেরুকরণকে টিকিয়ে রেখেছিল।

১৯৫৯ সালে রুয়ান্ডায় “হুতু বিপ্লব” তুতসিদের দীর্ঘদিনের আধিপত্যের অবসান ঘটায়। এই বিপ্লবের সময় হাজার হাজার তুতসি প্রতিবেশী দেশগুলোতে, বিশেষ করে উগান্ডা, বুরুন্ডি, তানজানিয়া এবং জায়ারে (বর্তমান কঙ্গো প্রজাতন্ত্র) পালিয়ে যায়। ১৯৬২ সালে রুয়ান্ডা স্বাধীনতা লাভ করে এবং হুতু নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসে। তবে এই স্বাধীনতা জাতিগত বিভেদকে কমাতে পারেনি, বরং আরও বাড়িয়ে তোলে। রুয়ান্ডা স্বাধীন হলেও, জাতিগত বিভাজন রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়। হুতু সরকার তুতসিদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক নীতি অব্যাহত রাখে, যার ফলে প্রায়শই জাতিগত সহিংসতা দেখা দিত। পালিয়ে যাওয়া তুতসিরা রুয়ান্ডা প্যাট্রিয়টিক ফ্রন্ট (আরপিএফ) নামে একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী গঠন করে, যার লক্ষ্য ছিল রুয়ান্ডায় ফিরে এসে তাদের অধিকার পুনরুদ্ধার করা এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। এই গোষ্ঠী প্রাথমিকভাবে সামরিক প্রশিক্ষণে মনোনিবেশ করে এবং উগান্ডার গৃহযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করে।

১৯৯০ সালের ১ অক্টোবর আরপিএফ উগান্ডা থেকে রুয়ান্ডায় আক্রমণ চালায়। এই আক্রমণ রুয়ান্ডার গৃহযুদ্ধের সূচনা করে। রুয়ান্ডা সরকার আরপিএফ-এর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য ফরাসি সহায়তার উপর নির্ভর করে। এই সময়ে হুতু চরমপন্থীরা তুতসিদের এবং মধ্যপন্থী হুতুদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াতে শুরু করে। সরকার-নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম, বিশেষ করে রেডিও টেলিভিসন লিবার দে মিল কোলাইনস (RTLM), তুতসিদের “তেলাপোকা” (Inyenzi) এবং “শত্রু” হিসেবে চিত্রিত করে তাদের নির্মূলের আহ্বান জানায়। এই প্রচার মাধ্যমগুলো গণহত্যায় প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে, যা ঘৃণা ও সহিংসতাকে জনমানসে গভীরভাবে প্রোথিত করে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই সময়ে চলমান সংঘাত নিরসনে কার্যকর কোনো ভূমিকা পালন করেনি, এটি পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তোলে এবং সম্ভাব্য বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এবং বিশ্লেষকরা বারবার সতর্ক করলেও, তাদের সতর্কবার্তাগুলো উপেক্ষিত হয়।

১৯৯৩ সালে রুয়ান্ডা সরকার এবং আরপিএফের মধ্যে তানজানিয়ার আরুশাতে একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন এবং ক্ষমতা ভাগাভাগি করে একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শুরু করা। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন (UNAMIR) এই চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য মোতায়েন করা হয়। কিন্তু এই চুক্তি হুতু চরমপন্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না, যারা এটিকে হুতু শাসনের অবসান এবং তুতসিদের ক্ষমতার প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখছিল। তারা গোপনে গণহত্যার পরিকল্পনা শুরু করে এবং ইন্টারহামওয়ে (Interahamwe) ও ইম্পুযামুগাম্বি (Impuzamugambi) নামে দুটি হুতু মিলিশিয়া বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিতে থাকে। ১৯৯৪ সালের ৬ এপ্রিল রুয়ান্ডার প্রেসিডেন্ট জুভেনাল হাবিয়ারিমনার বিমানটিকে গুলি করে ভূপাতিত করা হয়, সেখানেই তার মৃত্যু হয়। এই ঘটনাটি ছিল গণহত্যার জন্য চূড়ান্ত অনুঘটক। এই হামলার জন্য আরপিএফকে দায়ী করা হলেও এর আসল অপরাধী আজও বিতর্কিত এবং অনেক বিশ্লেষক মনে করেন এটি হুতু চরমপন্থীদেরই কাজ ছিল যাতে তারা গণহত্যার জন্য একটি অজুহাত তৈরি করতে পারে।

প্রেসিডেন্টের মৃত্যুর পর, হুতু চরমপন্থীরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে তুতসি এবং মধ্যপন্থী হুতুদের বিরুদ্ধে গণহত্যা শুরু করে। মিলিটারি, প্রেসিডেন্সিয়াল গার্ড এবং ইন্টেরাহামওয়ে মিলিশিয়ারা সারা দেশে তুতসিদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করতে শুরু করে। গির্জা, স্কুল এবং হাসপাতালগুলো যেখানে তুতসিরা আশ্রয় নিয়েছিল, সেগুলোও আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়। মাত্র ১০০ দিনের মধ্যে প্রায় ৮০০,০০০ থেকে ১,০০০,০০০ মানুষ নির্মমভাবে নিহত হয়। এই গণহত্যা ছিল অবিশ্বাস্যরকম সংগঠিত এবং দ্রুত। মানুষ হাতুড়ি, ছুরি, দা, লাঠি যা হাতের কাছে পেয়েছে তা দিয়েই হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষক, ডাক্তার এবং এমনকি ধর্মীয় নেতারাও এই হত্যাযজ্ঞে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয় ও সমর্থন করে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই সময়ে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা গণহত্যার তীব্রতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীরও যারা সেখানে ছিল তাদের হাতে গণহত্যার প্রতিরোধের জন্য পর্যাপ্ত ক্ষমতা বা নির্দেশনা ছিল না।

গণহত্যার পর আরপিএফ রুয়ান্ডার নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং জুলাই ১৯৯৪ সালে তাদের সামরিক অভিযান শেষ হয়। আরপিএফের নেতা পল কাগামে ছিলেন, রুয়ান্ডার নতুন প্রেসিডেন্ট হন। গণহত্যার পর রুয়ান্ডা একটি দীর্ঘ ও কঠিন পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হয়। জাতিগত বিভাজন কমানোর জন্য সরকার “জাতীয় ঐক্য” এবং “পুনর্মিলন” এর উপর জোর দেয়। গণহত্যার সাথে জড়িতদের বিচারের জন্য রুয়ান্ডায় “গাচাচা” নামে ঐতিহ্যবাহী আদালত ব্যবস্থা চালু করা হয়, তারা স্থানীয়ভাবে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে।

এই গণহত্যার সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যর্থতা। জাতিসংঘ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স এবং অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলো গণহত্যার সময় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়। এই নিষ্ক্রিয়তা বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার শিকার হয় এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়।

রুয়ান্ডার গৃহযুদ্ধ এবং গণহত্যা মানবজাতির জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা। এটি স্মরণ করিয়ে দেয় জাতিগত বিভাজন, ঘৃণা এবং রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা কীভাবে মানবতাকে সর্বনিম্ন স্তরে নামিয়ে আনতে পারে। এই ট্র্যাজেডি কেবল একটি দেশের ইতিহাস নয়, বরং মানব সভ্যতার এক সম্মিলিত ব্যর্থতা। এই ইতিহাসকে ভুলে গেলে আমরা একই ভুল পুনরাবৃত্তির ঝুঁকিতে থাকব। রুয়ান্ডা আজ পুনর্গঠনের পথে হাঁটলেও, গণহত্যার ক্ষত আজও দেশটির মানুষের মনে গভীর দাগ কেটে আছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ঘৃণা ও বিভাজনের বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে।

পরিবারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে, পাকিস্তানে ভয়ঙ্কর ‘অনার কিলিং’ ভিডিও ভাইরাল

পাকিস্তানে পরিবারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে করায় এক নারী ও এক পুরুষকে গুলি করে হত্যার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। দেশটির কর্তৃপক্ষ এ ঘটনাকে তথাকথিত ‘ অনার কিলিং বা সম্মান হত্যাকাণ্ড’ বলে অভিহিত করেছে। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

গত মাসে পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিম বেলুচিস্তান প্রদেশে স্থানীয় একটি উপজাতীয় পরিষদের আদেশে ওই দম্পতিকে হত্যা করা হয় বলে জানিয়েছেন প্রাদেশিক কর্মকর্তারা। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর প্রাদেশিক সরকার তদন্ত শুরু করে।

ভিডিওটিতে দেখা যায়–মরুভূমির একটি জায়গায় কয়েকটি পিকআপ ট্রাক ও এসইউভি গাড়ি রয়েছে, যেগুলোতে করে লোকজনকে সেখানে নিয়ে আসা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

নারীটিকে মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআন শরীফ হাতে দেওয়া হয়। এরপর তিনি এক ব্যক্তিকে বলেন, “আমার সঙ্গে সাত কদম হাঁটো, তারপর আমাকে গুলি করতে পারো।”একজন স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তা জানান, নারীটি কান্নাকাটি করেননি বা দয়া চায়নি।

পুরুষটি তার পেছনে হেঁটে এসে বন্দুক তাক করে, যখন নারীটি পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। চাদরে মোড়ানো নারীটি গুলি চালানো পর্যন্ত স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কাছ থেকে গুলির দুটি ফায়ারের পরও তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন, তৃতীয় গুলির পর তিনি মাটিতে পড়ে যান।

এরপর আরও গুলির শব্দ শোনা যায়। ভিডিওতে পরে দেখা যায়, রক্তাক্ত এক পুরুষের মরদেহ নারীটির দেহের কাছাকাছি পড়ে আছে। এরপর একদল পুরুষ উভয় মরদেহের ওপর গুলি চালায়।

পাকিস্তান মানবাধিকার কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে অন্তত ৪০৫টি ‘অনার কিলিং’-এর ঘটনা ঘটেছে। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর মতে, অনার কিলিংয়ের অধিকাংশ ভুক্তভোগী নারী। হত্যাকারীরা সাধারণত পরিবারের সদস্য, যারা পারিবারিক সম্মান রক্ষার দাবি করে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটায়।

পাকিস্তান ও ভারতের বহু রক্ষণশীল পরিবার এখনও তাদের পছন্দের বিরুদ্ধে বিয়েকে মেনে নেয় না।

(সূত্র : রয়টার্স)

রানী ভিক্টোরিয়া – যেভাবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মাদক ব্যবসায়ীতে পরিণত হন

আপনি হয়তো পাবলো এসকোবার বা এল চ্যাপোকে ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত মাদক সম্রাট বলে জানেন। কিন্তু যদি বলি তাদের জন্মের ১০০ বছরেরও বেশি আগে এক নারী ছিলেন, যিনি এমন এক বিশাল এবং অবিশ্বাস্যরকম লাভজনক মাদক সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করতেন যে, তার কাছে এসকোবার আর এল চ্যাপোকে সাধারণ রাস্তার ডিলার মনে হবে? এবং সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, তাকে কোনো প্রত্যন্ত জঙ্গলের আস্তানায় বন্দুকধারী গুন্ডাদের দ্বারা বেষ্টিত হয়ে থাকতে হয়নি, কারণ কেউ তার পিছু ধাওয়া করার সাহস দেখায়নি।

তাকে অবৈধ আয় সরকারি কর সংগ্রাহকদের কাছ থেকে লুকানোরও প্রয়োজন পড়েনি, কারণ তার মাদক ব্যবসার আয় পুরো দেশকে অর্থায়ন করছিল। আর কারাগারে যাওয়ার ভয়ও তার ছিল না, কারণ মাদক অপরাধের বিচার করার ক্ষমতা যাদের ছিল, তারা সবাই তার বেতনভুক্ত কর্মচারী ছিল।
তিনি ছিলেন রানী ভিক্টোরিয়া।

রানী ভিক্টোরিয়া মাদকের প্রতি ভীষণ আসক্ত ছিলেন। একজন রাশভারী রানীর কাছ থেকে এমনটা হয়তো আশা করা যায় না, কিন্তু এটাই একটা জনপ্রিয় ভুল ধারণা। মানুষ রানী ভিক্টোরিয়াকে অত্যন্ত বৃদ্ধা হিসেবেই ভাবে, কিন্তু বাস্তবে সিংহাসনে আরোহণের সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর এবং তিনি নিয়মিত বিভিন্ন ধরনের ঔষধ সেবন উপভোগ করতেন।

আফিম ছিল তার অন্যতম প্রিয়। তবে তিনি এটি পাইপে ধূমপান করতেন না। ১৯ শতকের ব্রিটেনে আফিম সেবনের আরও ফ্যাশনেবল উপায় ছিল লাউডানাম আকারে পান করা। আফিম এবং অ্যালকোহলের এই তীব্র মিশ্রণ যেকোনো ব্যথা বা অস্বস্তি দূর করতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হত। এটি অনেকটা অ্যাসপিরিনের মতো ছিল, অ্যাসপিরিন আবিষ্কারের আগে এমনকি ডাক্তাররাও এটি দাঁত ওঠার সময় শিশুদের জন্য সুপারিশ করতেন। রানী ভিক্টোরিয়া প্রতিদিন সকালে এক বড় চুমুক লাউডানাম পান করতেন, বিশ্বাস করতেন যে এটি একজন রাজকীয় কিশোরীর জন্য তার দিন শুরু করার নিখুঁত উপায়।

কোকেন ছিল তার আরেকটি প্রিয় মাদক। এটি তখনো অবৈধ ছিল না এটি ছিল একদম নতুন, এবং ইউরোপীয়রা মাত্র এটি নিয়ে পরীক্ষা শুরু করছিল। ১৮০০-এর দশকে কোকেন সেবনের অনেক মজার এবং উত্তেজনাপূর্ণ উপায় ছিল, তবে রানী ভিক্টোরিয়ার ব্যক্তিগত পছন্দ ছিল চুইংগাম এবং ওয়াইন। কোকেন চুইংগাম ছিল ১৯ শতকের ভয়াবহ ব্রিটিশ দন্তচিকিৎসার কারণে দাঁত ব্যথা এবং মাড়ির ফোলা উপশমের জন্য উপযুক্ত, উপরন্তু এটি চিবুককে আত্মবিশ্বাসের এক শক্তিশালী ঝলক দিত, যা একজন তরুণ, অনভিজ্ঞ রানীর জন্য একটি শক্তিশালী, দৃঢ় চিত্র তুলে ধরার জন্য দারুণ ছিল।

তিনি আরও কিছু মাদক ব্যবহার করতেন। তার ডাক্তারের নির্দেশ অনুসারে, রানী মাসিক ঋতুস্রাবের লক্ষণগুলি উপশম করতে তরল গাঁজা সেবন করতেন এবং সন্তান প্রসবের যন্ত্রণাদায়ক ব্যথা মোকাবিলায় ভিক্টোরিয়া সানন্দে ক্লোরোফর্ম গ্রহণ করতেন। তিনি ৫৩ মিনিট ধরে একটি ভেজানো রুমাল নিজের মুখে ধরে রেখেছিলেন এবং অভিজ্ঞতাটিকে “অকল্পনীয়ভাবে আনন্দদায়ক” বলে বর্ণনা করেছিলেন। ইতিহাসবিদ ও লেখক টনি ম্যাকমোহন স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিনে যেমনটি সংক্ষিপ্ত করেছেন “রানী ভিক্টোরিয়া, আমার মনে হয় যেকোনো মানদণ্ডেই তিনি তার মাদকাসক্তি ভালোবাসতেন।”

১৮৩৭ সালে মুকুট পরার মুহূর্ত থেকেই, এই তরুণী রানী একটি বিশাল সমস্যা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন, ব্রিটিশরা খুব বেশি চা পান করত। এটা সমস্যা হত না, যদি চা চীন থেকে না আসত। লন্ডনবাসীরা তাদের আয়ের ৫% চীনা চায়ের জন্য খরচ করত, কিন্তু ব্রিটেনের চীনের সাথে বিনিময়ের মতো কিছুই ছিল না। চীন ধনী হচ্ছিল, এবং ব্রিটেন বিরক্ত হয়ে উঠছিল। ব্রিটিশরা মরিয়া হয়ে এমন কিছু খুঁজছিল, যেকোনো কিছু যা চীনা জনগণ চাইত।

আফিম সব শর্ত পূরণ করত। ব্রিটিশদের কাছে প্রচুর পরিমাণে আফিম ছিল কারণ এটি ভারতে প্রচুর উৎপাদিত হত এবং শক্তিশালী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভারতীয় অর্থনীতির উপর আধিপত্যের কারণে ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এটি ছিল আশ্চর্যজনকভাবে কার্যকর একটি ব্যথানাশক, যার জন্য চীনারা অবিশ্বাস্যরকম বেশি দাম দিতেও ইচ্ছুক ছিল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এটি ছিল অত্যন্ত আসক্তিযুক্ত; যারা আফিম ব্যবহার করত, তারা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আসক্ত হয়ে পড়ত, যার কারণে ব্রিটিশরা দাম আরও বাড়াতে পারত। ব্রিটেন বহু বছর ধরে চীনে আফিম পাঠাচ্ছিল, কিন্তু রানী ভিক্টোরিয়া সিংহাসনে আরোহণের পর এর পরিমাণ জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পায়।

আফিমের অলৌকিকতার কারণে, বাণিজ্য ভারসাম্য রাতারাতি উল্টে গেল। চীনকে ব্রিটিশদের চায়ের জন্য খরচ করা সমস্ত রূপা ফেরত দিতে বাধ্য করা হল এবং আরও অনেক বেশি বাড়তিও! এবার ব্রিটেন নয়, চীনই ভয়াবহ বাণিজ্য ঘাটতিতে পড়ছিল। চীন মরিয়া হয়ে আফিম বাণিজ্য বন্ধ করার চেষ্টা করেছিল। চীনে আফিম তখনো অবৈধ ছিল, কিন্তু আইন খুব কমই কার্যকর করা হত, তাই চীনা সরকার কঠোরভাবে দমন-পীড়ন শুরু করল।

চীনের সম্রাট তার সেরা লোককে এই কাজের জন্য নিযুক্ত করলেন। লোকটির নাম ছিল লিন জেক্সু, এবং তিনি ছিলেন একজন পণ্ডিত, দার্শনিক, ভাইসরয় এবং সবদিক থেকেই শিক্ষকদের প্রিয় ছাত্র। তার লক্ষ্য ছিল যেকোনো মূল্যে আফিমের প্রবাহ বন্ধ করা। তিনি কূটনীতি চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তা কাজ করেনি। তিনি রানী ভিক্টোরিয়াকে একটি চিঠি লিখেছিলেন, বিনীতভাবে তার কাজের অনৈতিকতা তুলে ধরেছিলেন: চীন ব্রিটেনকে উপকারী এবং ব্যবহারযোগ্য পণ্য যেমন চা, রেশম এবং মৃৎশিল্প পাঠাচ্ছিল তাহলে কেন ব্রিটেন লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ মানুষকে আফিম আসক্তিতে পরিণত করা বিষাক্ত মাদক চীনে পাঠাচ্ছে?

কিন্তু ব্রিটিশ সাম্রাজ্য তাদের লাভজনক মাদক ব্যবসা ছেড়ে দিতে রাজি ছিল না। ততদিনে আফিম বিক্রি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মোট বার্ষিক আয়ের ১৫ থেকে ২০% এর জন্য দায়ী ছিল। রানী চিঠিটি পড়ারও প্রয়োজন মনে করেননি। এর অর্থ ছিল যে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ লিন জেক্সুকে তার মনোযোগ আকর্ষণের জন্য অন্য উপায় খুঁজে বের করতে হয়েছিল । তাই ১৮৩৯ সালের বসন্তে, তিনি ব্রিটিশ জাহাজের একটি বহর আটক করেন, আফিমের একটি বিশাল চালান জব্দ করেন এবং তার সৈন্যদের এটি সব দক্ষিণ চীন সাগরে ফেলে দেওয়ার নির্দেশ দেন।

এবার রানী লক্ষ্য করলেন।, তার বয়স তখন মাত্র ২০ বছর ছিল এবং তিনি সবকিছু তার ইচ্ছামতো হতে অভ্যস্ত ছিলেন। তাই যখন লিন জেক্সু এবং তার লোকেরা ২৫ লাখ পাউন্ড ব্রিটিশ আফিম সমুদ্রে ফেলে দিল, তখন তিনি যেকোনো সর্বশক্তিমান সাম্রাজ্যবাদী কিশোরীর মতো প্রতিক্রিয়া দেখালেন: তিনি চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন, এটিই প্রথম আফিম যুদ্ধ নামে পরিচিত।

ব্রিটিশ বাহিনী চীনা সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করে দিল এবং হাজার হাজার চীনা নাগরিককে হত্যা করল। সম্রাটের আত্মসমর্পন করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। তিনি একটি নির্লজ্জভাবে একতরফা তথাকথিত শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করলেন যা হংকংকে ব্রিটিশদের হাতে তুলে দিল, দেশে আরও আফিম প্রবেশের জন্য আরও বন্দর খুলে দিল এবং চীনে বসবাসকারী ব্রিটিশ নাগরিকদের অনাক্রম্যতা প্রদান করল।

আরও খারাপ ব্যাপার হলো, পুরো বিশ্ব এটি ঘটতে দেখেছিল। চীনা সাম্রাজ্য দীর্ঘদিন ধরে ভয়ঙ্কর এবং অদম্য হিসাবে বিবেচিত ছিল, কিন্তু এখন আর নয়। একজন উদ্ধত কিশোরী রানী বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে চীনকে পরাজিত করা যেতে পারে এবং বেশ সহজেই। এভাবেই চীনের “শতাব্দীর অপমান” হিসাবে উল্লিখিত সে সময়কাল শুরু হয়েছিল।

আর একজন উৎপীড়ক কিশোরী একটি সম্মানিত প্রাচীন সভ্যতাকে মাদক দিয়ে নতজানু করেছিল। তরুণী রানীর কাছে রূপা আসতে থাকলে তবে পৃথিবীর অপর প্রান্তে অগণিত বিদেশীরা মারা গেলেও কিছু আসে যায় না। এই নির্দয় নির্লজ্জ আত্মস্বার্থই তাকে সর্বকালের সবচেয়ে সফল মাদক সম্রাজ্ঞী করে তুলেছিল।

শুল্ক কমাতে দরকষাকষি, যুক্তরাষ্ট্রকে খুশি করার আর্থিক ক্ষমতা বাংলাদেশের নেই

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গেলেও এক্ষেত্রে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়েছে কেন? এমন প্রশ্নে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দরকষাকষিতে প্রভাব খাটানোর মতো অর্থনৈতিক সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে বাংলাদেশের। এ বাস্তবতার পাশাপাশি রয়েছে দরকষাকষিতে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় কৌশল ও প্রস্তুতিগত ঘাটতি।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সব দেশে চীনের প্রভাব রয়েছে। এ অঞ্চলে ইন্দোনেশিয়া অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিবেচনায় অনেক বড় দেশ। মালয়েশিয়ার রফতানির আকার ২৫০ বিলিয়ন ডলারের। দেশটি চাইলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে অনেক কিছু আমদানি করতে পারে। এসব প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একদমই আকর্ষণীয় কোনো পক্ষ নয়। তাদের আকৃষ্ট করতে বড় ধরনের লেভারেজ (প্রভাব খাটানোর অর্থনৈতিক সক্ষমতা) বাংলাদেশের নেই। ট্রাম্প জোর দিচ্ছেন সামরিক সরঞ্জাম কিনতে, যা অনেক বেশি দামি এবং সেগুলো ক্রয়ের সক্ষমতায় বাংলাদেশের ঘাটতি রয়েছে।

আবার সক্ষমতার পাশাপাশি এখানে কৌশলগত বিষয়ও রয়েছে। ট্রাম্প তার প্রস্তাবে বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি পরিমাণে গম কিনতে হবে। বাংলাদেশ অনেক গম কিনতে শুরু করলেও তা যুক্তরাষ্ট্রের বিক্রয় প্রত্যাশার কাছাকাছি হবে না। আবার এলএনজি আমদানিতে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে আসতে বলা হচ্ছে। কিন্তু সেটা বাংলাদেশের জন্য লাভজনক হবে না। কারণ এলএনজি বৈশ্বিক বাজার থেকে কিনলে অনেক কম দামে পাওয়া যাবে।

বাংলাদেশ প্রথম দুই দফায় কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা শেষ করে ফিরে এসেছে। চলছে তৃতীয় দফা দরকষাকষিতে যাওয়ার প্রস্তুতি। আলোচনায় বসতে সময় চেয়ে বাংলাদেশ এখন যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরের অপেক্ষায়।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বণিক বার্তাকে জানিয়েছে, চুক্তির বিভিন্ন শর্ত বা দিক নিয়েও রয়ে গেছে উদ্বেগ। কেননা কোনো সার্বভৌম দেশের পক্ষে এ চুক্তির অনেক শর্ত মানা কঠিন। ক্ষেত্রবিশেষে সেগুলো ট্যারিফ হারের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। যেমন চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, সেটা বাংলাদেশকেও অনুসরণ করতে হবে। আবার কোনো একটি দেশের কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হলেও তার সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ বা বাণিজ্য করা যাবে না। কোনো দেশের ওপর যদি অতিরিক্ত কোনো শুল্ক আরোপ করা হয়, বাংলাদেশকেও তা অনুসরণ করতে হবে।

এমনকি নির্দিষ্ট একটি দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও সমরাস্ত্রবিষয়ক কোনো ইস্যুতে বাংলাদেশ জড়াতে পারবে না—এমন শর্তও দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে একটি সূত্র। এ বিষয় নিয়ে ঢাকায় কর্মরত যুক্তরাষ্ট্র সরকারসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও সমরাস্ত্রবিষয়ক কোনো ইস্যুতে বাংলাদেশ যেন সম্পৃক্ত না হয়—এমন কিছু শর্ত থাকতে পারে বলে ধারণা দেয়া হয়েছে।

এছাড়া রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম, সয়াবিন আমদানি বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি আমদানি নিয়ে চুক্তি করা। ক্ষেত্রবিশেষে এসব চুক্তি মেনে চলা বাংলাদেশের জন্য লাভজনক নাও হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

আর্থিক সক্ষমতা ও কৌশলগত বিষয় বিবেচনার পাশাপাশি দরকষাকষিতে বাংলাদেশের প্রস্তুতি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বিশেষজ্ঞদের। তারা বলছেন, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির দরকষাকষির জন্য বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের বিষয়ে সমন্বয়হীনতা দেখিয়েছে। আবার নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট নিয়ে বোঝাপড়ার ঘাটতিতে চুক্তির বিষয়বস্তু নিয়ে ধোঁয়াশা বা বিভ্রান্তি থেকে বের হতে পারেনি।

হাফটোন থেকে ‘সন্দেশ’, উপেন্দ্রকিশোরের প্রযুক্তি যাত্রা

উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী শুধু একজন লেখক, চিত্রশিল্পী কিংবা শিশুসাহিত্যিক নন তিনি ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের বাংলা ভাষাভাষী সমাজে আধুনিক মুদ্রণ প্রযুক্তির একজন পথপ্রদর্শক। উনিশ শতকের শেষভাগে যখন বাংলা মুদ্রণশিল্প প্রধানত কাঠের ব্লক ও ম্যানুয়াল হস্তলিপির উপর নির্ভরশীল ছিল, তখন তিনি ইউরোপীয় প্রযুক্তি, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষা এবং নিজস্ব বিশ্লেষণাত্মক মেধার মাধ্যমে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি স্তরে মুদ্রণশিল্পকে উন্নীত করেন। তবে তাঁর প্রযুক্তিনির্ভর সৃজনপ্রবণতার সঙ্গে সাহিত্যিক অবদানকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা সম্ভব নয়, বরং এই দুটি প্রবাহ তাঁর কাজের ভেতরে একে অপরকে অবলম্বন করে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।

বাংলা শিশুসাহিত্য যখন মূলত নীতিকথা, পৌরাণিক অনুকৃতি ও অতিমানবীয় আদর্শের বন্দি ছিল, তখন উপেন্দ্রকিশোর সেই প্রচল স্রোতের বাইরে এসে বাস্তবতানির্ভর, রসবোধসম্পন্ন এবং কল্পনাশক্তিকে উদ্বুদ্ধকারী গল্প রচনা শুরু করেন। তাঁর “ছেলেদের রামায়ণ” ও “ছেলেদের মহাভারত” কেবল সারসংক্ষেপ নয় পৌরাণিক কাহিনিকে সহজ ভাষা ও শিশুবান্ধব যুক্তিবোধে গড়ে তোলার একটি দৃষ্টান্ত। পৌরাণিক চরিত্রদের মধ্যে নৈতিক দ্বন্দ্ব ও মনস্তাত্ত্বিক স্তর খুঁজে এনে উপেন্দ্রকিশোর গল্পকে ব্যতিক্রম এক কাঠামো দেন।

তাঁর গল্প যেমন “গুপি গাইন বাঘা বাইন” বা “টুনটুনির বই”-তে দেখা যায়, হাস্যরস, চাতুর্য ও সামাজিক পর্যবেক্ষণের এক অনন্য সংমিশ্রণ। এই গল্পগুলোতে প্রাণীচরিত্রেরা কখনও রাজনৈতিক ধাঁধার রূপক হয়ে ওঠে, আবার কখনও ক্ষমতা ও প্রতারণার প্রতীকে পরিণত হয়। ফলে পাঠ শুধু মনোরঞ্জনেই আবদ্ধ থাকে না, বরং এক অন্তর্নিহিত বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গিকেও উস্কে দেয়।

উপেন্দ্রকিশোর বাংলা ভাষায় এমন একটি লেখনশৈলী গড়ে তুলেছিলেন, যা ছিল neither সাধু, nor চলিত বরং শিশুমনের ভাষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়, অথচ শৃঙ্খলিত ও প্রাঞ্জল। তাঁর বাক্য গঠনে ছিল ছন্দ, সংক্ষিপ্ততা এবং হালকা নাটকীয়তা যা শিশুদের পাঠের আগ্রহ ধরে রাখত। তিনি লেখকের কণ্ঠকে পাঠকের সমানুপাতে নমনীয় করে তোলার ক্ষেত্রে সচেতন ছিলেন। এতে দেখা যায়, পাঠকের বয়স বা শ্রেণি বিশেষ হলেও তাঁদের বোধগম্যতার সীমা বিবেচনা করে লেখক তাঁর ভাষা, চিত্র, এবং বক্তব্যের জটিলতা নিয়ন্ত্রণ করেন।

১৮৯৫ সালের দিকে উপেন্দ্রকিশোর যখন শিশুদের জন্য বই প্রকাশের কাজে নিযুক্ত হন, তখন উপলব্ধি করেন বাংলা ভাষায় সঠিক চিত্র-বাহিত ছাপার অভাব রয়েছে। ভারতবর্ষের ছাপাখানাগুলিতে তখনও আধুনিক “হাফটোন ব্লক” প্রযুক্তি কার্যকর হয়নি। এর ফলে গল্পের বইতে ছবির মান ছিল দুর্বল, অস্পষ্ট ও প্রান্তহীন। এই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে তিনি প্রযুক্তির জগতে প্রবেশ করেন।

তাঁর আগ্রহ প্রথমে আলোকচিত্র থেকে শুরু হয়। সেখান থেকেই তিনি পৌঁছান অপটিক্স, হাফটোন ইমেজিং এবং ফটো-লিথোগ্রাফি প্রযুক্তিতে। নিজের অভিজ্ঞতা ও চর্চার ভিত্তিতে তিনি একাধিক আলোকচিত্র, চিত্রাঙ্কন ও ব্লক প্রিন্ট তৈরি করেন। চিত্রশিল্প ও সাহিত্যের পরিপূরক এই চর্চা বাংলা বইয়ের দৃষ্টিনন্দনতা এবং পাঠযোগ্যতা বহুগুণে বাড়িয়ে তোলে।

১৯১০ সালে কলকাতার গারপার রোডে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন নিজস্ব ছাপাখানা “U. Ray and Sons” যা ছিল প্রযুক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আধুনিক মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান। বিদেশ থেকে আমদানিকৃত সর্বাধুনিক জিঙ্কোগ্রাফি, হাফটোন ব্লক তৈরির যন্ত্রপাতি, প্রুফ প্রেস ও ইঙ্ক প্রস্তুতির উপকরণ তাঁর মুদ্রণশালাকে যুগান্তকারী রূপ দেয়। এই ছাপাখানায় উপেন্দ্রকিশোর নিজে হাফটোন ইমেজ প্রক্রিয়ার পরীক্ষাগারে কাজ করতেন।

তিনি চিত্রের আলো ও ছায়ার ভারসাম্য, ডট ফ্রিকোয়েন্সি, এক্সপোজার টাইম, নেগেটিভ টোন ও ছাপার কালি কতটা গভীর হলে স্পষ্টতা বজায় থাকে এইসব বিষয়ে নিবিড় গবেষণা চালান। এই গবেষণাগুলো কেবল তাঁর নিজস্ব প্রকাশনায় নয়, বাংলা ছাপার জগতে একটি নতুন মানদণ্ড তৈরি করে দেয়।

উপেন্দ্রকিশোর ছিলেন একমাত্র বাঙালি, যিনি বিখ্যাত ব্রিটিশ মুদ্রণ জার্নাল Penrose Annual-এ গবেষণালব্ধ প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর অন্যতম উল্লেখযোগ্য গবেষণামূলক প্রবন্ধ ছিল—“Photography in Half-tone: Its Difficulties and Solutions”—যেখানে তিনি হাফটোন ফটোগ্রাফির নির্ভুলতা রক্ষায় নিজের উদ্ভাবিত পদ্ধতি ও গাণিতিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন। এই প্রবন্ধে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তাঁর সৃজনশীল প্রযুক্তিচর্চার স্বীকৃতি মেলে।

Penrose Annual-এ উপেন্দ্রকিশোরকে “an exceptionally careful and scientific experimenter” হিসেবে অভিহিত করা হয়েছিল যা প্রমাণ করে, তিনি কেবল লেখক নন, প্রকৃতপক্ষে একজন ফটোমেকানিকাল প্রকৌশলী ছিলেন।

‘সন্দেশ’ পত্রিকার প্রথম সংস্করণ থেকেই এসব প্রযুক্তির সুফল দেখা যায় গল্প ও বিজ্ঞানের উপস্থাপনা যেমন দৃষ্টিনন্দন হয়েছে, তেমনি তার পাঠ-আকর্ষণও বহুগুণে বেড়ে যায়। সন্দেশে ব্যবহৃত চিত্রসমূহ অনেকাংশে উপেন্দ্রকিশোর নিজে আঁকতেন, এরপর তার ব্লক নিজে বানাতেন, ছাপাতেন, প্রুফ দেখতেন, এককথায় শিল্প ও প্রযুক্তির একক সংমিশ্রণ। এই পত্রিকায় সাহিত্যের পাশাপাশি বিজ্ঞান, ভূগোল, যন্ত্রবিদ্যা সবই স্থান পেত, যা শিশুমনকে কেবল গল্পেই নয়, চিন্তায়ও প্রস্তুত করত।

উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী বাংলা মুদ্রণশিল্পকে ইউরোপীয় মানদণ্ডে উন্নীত করেছিলেন, একইসঙ্গে সাহিত্যের জগতে যুক্তিবাদ, রস ও কল্পনার সম্মিলিত ধারা চালু করেছিলেন। তিনি সাহিত্যকে কেবল কাগজে লেখা শব্দের সমষ্টি হিসেবে দেখেননি তাঁর কাছে তা ছিল এক প্রক্রিয়া, যেখানে পাঠকের মন, চোখ ও কল্পনা সমানভাবে অংশ নেয়। প্রযুক্তিকে সেই শিল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে তিনি চিন্তা করেছিলেন। তাঁর এই বৈপ্লবিক প্রযুক্তি-দৃষ্টি এবং সাহিত্য-ভাবনা আজও বাংলার জ্ঞানচর্চা, বই নির্মাণ এবং শিশুসাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে এক অমূল্য দৃষ্টান্ত। এক কথায়, উপেন্দ্রকিশোর ছিলেন এমন এক সাহিত্য-প্রযুক্তি চিন্তক, যাঁর কর্ম আমাদের শুধু অতীত গর্বের নয়—ভবিষ্যতের জন্যও পথনির্দেশক।

মাথাপিছু কার্বন নির্গমনে কাতার কেন বিশ্বে শীর্ষে?

বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণ মারাত্মক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂) নির্গমন বিশ্বব্যাপী গ্লোবাল ওয়ার্মিং ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রধান কারণ। দেশভিত্তিক নির্গমনের মাত্রা বিভিন্ন, আর এর মধ্যে কাতার প্রতি ব্যক্তি কার্বন নির্গমনে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশের অন্যতম।

কাতারের প্রতি ব্যক্তি কার্বন নির্গমন বিশ্বজুড়ে অন্যতম সর্বোচ্চ। আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১-২২ সালের গড় হিসেবে কাতারবাসী প্রতি বছর প্রায় ৪৩.৬ টন CO₂ নির্গমন করে। এটি বিশ্বের গড় নির্গমনের প্রায় ৯ গুণ এবং উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় অনেক বেশি। তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশের প্রতি ব্যক্তি নির্গমন মাত্র প্রায় ০.৭ টন এবং বিশ্বের গড় প্রায় ৪.৮ টন। কাতারের এই উচ্চ নির্গমন মূলত তার তেল ও গ্যাস উৎপাদন ও ব্যবহারের কারণে।

কাতারের প্রতি ব্যক্তি কার্বন নির্গমনের পেছনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ কাজ করে-

প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য: কাতার বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানিকারক দেশ। দেশটির অর্থনীতি পুরোপুরি তেল ও গ্যাস শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। তেল-গ্যাস উত্তোলন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিবহন প্রক্রিয়ায় প্রচুর পরিমাণে জ্বালানি পোড়ানো হয়, যা প্রচণ্ড কার্বন নির্গমন সৃষ্টি করে।

শক্তিশালী শিল্পায়ন ও অবকাঠামো: কাতারে আধুনিক নগরায়ন, বড় বড় নির্মাণ প্রকল্প এবং দ্রুতগতির শিল্পায়নের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা অত্যন্ত বেশি। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যাপক ব্যবহার হয়।

গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া: কাতারের জলবায়ু অত্যন্ত গরম এবং শুষ্ক হওয়ায় সারাবছর এয়ার কন্ডিশনার ও কুলিং ব্যবস্থার চাহিদা থাকে। এই উচ্চ বিদ্যুৎ ব্যবহার কার্বন নির্গমন বাড়ায়।

জনসংখ্যা ও জীবনধারা: কাতারে বেশিরভাগ জনসংখ্যা বিদেশী শ্রমিক ও কর্মী যারা উচ্চ ভোগদখল করে, যার ফলে ব্যক্তিগত পর্যায়ে কার্বন নির্গমন বেড়ে যায়।

কাতার পরিবেশ রক্ষায় পদক্ষেপ নিচ্ছে। নবায়নযোগ্য শক্তি উৎসের উন্নয়ন এবং কার্বন শোষণের প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।

কাতার সরকার ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরশক্তি প্রকল্প অনুমোদন করেছে যা বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য শক্তির অংশ বাড়াবে। ভবিষ্যতে এই পরিমাণ বাড়িয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে অধিকাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য শক্তি থেকে আসার লক্ষ্য রয়েছে।

জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ফলে উৎপন্ন CO₂ গ্যাস পরিবেশে নির্গমনের পরিবর্তে জমা করার জন্য কাতার এই প্রযুক্তি ব্যবহার ও উন্নয়ন করছে।

কাতার আন্তর্জাতিক জলবায়ু পরিবর্তন নীতির মধ্যে সক্রিয় অংশগ্রহণ করছে। জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলন (COP) এ নিয়মিত অংশগ্রহণ এবং প্যারিস চুক্তির আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে CO₂ নির্গমন ২৫% কমানোর লক্ষ্য নিয়েছে। কাতার উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য জলবায়ু অর্থায়ন তহবিলে অবদান রাখছে। জলবায়ু ও পরিবেশ সংরক্ষণের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে অংশীদারিত্বে কাজ করছে। দেশের নীতি ও আইনসমূহ পরিবেশ বান্ধব করার প্রচেষ্টা চলছে।

এছাড়া কাতারের অর্থনীতি প্রায় সম্পূর্ণভাবে তেল ও গ্যাস শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। এই শিল্প কার্বন নির্গমনের প্রধান উৎস।

তবে বর্তমান বিশ্বে টেকসই উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নবায়নযোগ্য শক্তি ও সবুজ প্রযুক্তির দিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

কাতার সরকার বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং শিল্পায়নে পরিবেশ বান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে কাজ করছে।

কাতারের উচ্চ কার্বন নির্গমন বিশ্ব জলবায়ুর জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করে। গ্লোবাল ওয়ার্মিং ও জলবায়ু পরিবর্তনে কাতারের প্রভাব উল্লেখযোগ্য।

কাতার উচ্চ প্রতি ব্যক্তি কার্বন নির্গমনের কারণে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশের মধ্যে হলেও, নবায়নযোগ্য শক্তি ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির গ্রহণে দেশটি ইতিবাচক পদক্ষেপ নিচ্ছে। তবে তেল ও গ্যাস খাতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে টেকসই অর্থনীতির দিকে ঝুঁকতে হবে।