দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গেলেও এক্ষেত্রে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়েছে কেন? এমন প্রশ্নে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দরকষাকষিতে প্রভাব খাটানোর মতো অর্থনৈতিক সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে বাংলাদেশের। এ বাস্তবতার পাশাপাশি রয়েছে দরকষাকষিতে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় কৌশল ও প্রস্তুতিগত ঘাটতি।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সব দেশে চীনের প্রভাব রয়েছে। এ অঞ্চলে ইন্দোনেশিয়া অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিবেচনায় অনেক বড় দেশ। মালয়েশিয়ার রফতানির আকার ২৫০ বিলিয়ন ডলারের। দেশটি চাইলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে অনেক কিছু আমদানি করতে পারে। এসব প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একদমই আকর্ষণীয় কোনো পক্ষ নয়। তাদের আকৃষ্ট করতে বড় ধরনের লেভারেজ (প্রভাব খাটানোর অর্থনৈতিক সক্ষমতা) বাংলাদেশের নেই। ট্রাম্প জোর দিচ্ছেন সামরিক সরঞ্জাম কিনতে, যা অনেক বেশি দামি এবং সেগুলো ক্রয়ের সক্ষমতায় বাংলাদেশের ঘাটতি রয়েছে।
আবার সক্ষমতার পাশাপাশি এখানে কৌশলগত বিষয়ও রয়েছে। ট্রাম্প তার প্রস্তাবে বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি পরিমাণে গম কিনতে হবে। বাংলাদেশ অনেক গম কিনতে শুরু করলেও তা যুক্তরাষ্ট্রের বিক্রয় প্রত্যাশার কাছাকাছি হবে না। আবার এলএনজি আমদানিতে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে আসতে বলা হচ্ছে। কিন্তু সেটা বাংলাদেশের জন্য লাভজনক হবে না। কারণ এলএনজি বৈশ্বিক বাজার থেকে কিনলে অনেক কম দামে পাওয়া যাবে।
বাংলাদেশ প্রথম দুই দফায় কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা শেষ করে ফিরে এসেছে। চলছে তৃতীয় দফা দরকষাকষিতে যাওয়ার প্রস্তুতি। আলোচনায় বসতে সময় চেয়ে বাংলাদেশ এখন যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরের অপেক্ষায়।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বণিক বার্তাকে জানিয়েছে, চুক্তির বিভিন্ন শর্ত বা দিক নিয়েও রয়ে গেছে উদ্বেগ। কেননা কোনো সার্বভৌম দেশের পক্ষে এ চুক্তির অনেক শর্ত মানা কঠিন। ক্ষেত্রবিশেষে সেগুলো ট্যারিফ হারের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। যেমন চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, সেটা বাংলাদেশকেও অনুসরণ করতে হবে। আবার কোনো একটি দেশের কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হলেও তার সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ বা বাণিজ্য করা যাবে না। কোনো দেশের ওপর যদি অতিরিক্ত কোনো শুল্ক আরোপ করা হয়, বাংলাদেশকেও তা অনুসরণ করতে হবে।
এমনকি নির্দিষ্ট একটি দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও সমরাস্ত্রবিষয়ক কোনো ইস্যুতে বাংলাদেশ জড়াতে পারবে না—এমন শর্তও দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে একটি সূত্র। এ বিষয় নিয়ে ঢাকায় কর্মরত যুক্তরাষ্ট্র সরকারসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও সমরাস্ত্রবিষয়ক কোনো ইস্যুতে বাংলাদেশ যেন সম্পৃক্ত না হয়—এমন কিছু শর্ত থাকতে পারে বলে ধারণা দেয়া হয়েছে।
এছাড়া রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম, সয়াবিন আমদানি বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি আমদানি নিয়ে চুক্তি করা। ক্ষেত্রবিশেষে এসব চুক্তি মেনে চলা বাংলাদেশের জন্য লাভজনক নাও হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আর্থিক সক্ষমতা ও কৌশলগত বিষয় বিবেচনার পাশাপাশি দরকষাকষিতে বাংলাদেশের প্রস্তুতি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বিশেষজ্ঞদের। তারা বলছেন, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির দরকষাকষির জন্য বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের বিষয়ে সমন্বয়হীনতা দেখিয়েছে। আবার নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট নিয়ে বোঝাপড়ার ঘাটতিতে চুক্তির বিষয়বস্তু নিয়ে ধোঁয়াশা বা বিভ্রান্তি থেকে বের হতে পারেনি।


