গুয়ারা: “স্টকার” শব্দটার মানে কী?
তারকোভস্কি: এই শব্দটা এসেছে ইংরেজি “to stalk” ক্রিয়াটি থেকে, যার মানে গোপনে, নিঃশব্দে কারো পেছনে যাওয়া। আমাদের ছবিতে ‘স্টকার’ বলতে এমন একজন পেশাদারকে বোঝায়, যে একটি নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ করে নির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্যে। ঠিক যেন একজন গ্যাংস্টার, পাচারকারী বা চোরাকারবারির মতো। এটি এক ধরনের উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত পেশা।
আমার মনে হয়, দর্শকদের এমনকি ভাবা উচিত, আদৌ অন্য কোনো স্টকার আছে কিনা, বা সত্যিই এমন কোনো ‘জোন’ আছে কিনা। হতে পারে, যেখানে ইচ্ছেপূরণ হয় এমন কোনো কক্ষ (room) আদৌ নেই সেটা হয়তো একটা রূপকথা, একটা ঠাট্টা, অথবা পুরোপুরি স্টকারের কল্পনা। এসব প্রশ্নের উত্তর ইচ্ছাকৃতভাবে ছবিতে স্পষ্ট করা হয়নি।
এ ছবিতে ‘রুম’ নামের যে জায়গায় মানুষ তাদের গোপন আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারে তা আসলে শুধু একটি বাহানা। মূলত এটা তিনটি চরিত্রের ভেতরের জগত উন্মোচনের মাধ্যম।
আপনার স্টকার চরিত্রটা কেমন?
তিনি একজন একদম সৎ মানুষ, নির্মল এবং বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে নিষ্পাপ। তাঁর স্ত্রী তাকে আশীর্বাদধন্য বলে। তিনি মানুষকে জোনে নিয়ে যান “তাদের সুখী করার জন্য” এটাই তাঁর বিশ্বাস। নিঃস্বার্থভাবে নিজেকে পুরোপুরি এই দায়িত্বে সঁপে দেন তিনি। মনে করেন, এটাই মানুষের সুখের একমাত্র পথ। তিনি এক অর্থে শেষ আদর্শবাদীর মতো যিনি বিশ্বাস করেন যে মানুষের ইচ্ছাশক্তি বা প্রয়াস ছাড়াও প্রকৃত সুখ পাওয়া সম্ভব। এই পেশাই তাঁর জীবনের একমাত্র মানে।
একজন পুরোহিত যেমন উপাসনালয়ে লোকজনকে নিয়ে যান, স্টকার তেমনি করে মানুষকে জোনে নিয়ে যান যাতে তারা সুখী হতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই পথযাত্রায়, যাঁদের তিনি পথ দেখান, তাঁদের প্রভাবে তিনি নিজেই নিজের বিশ্বাস হারান।
তিনি আর বিশ্বাস রাখতে পারেন না যে সত্যিই কেউ সুখী হয়, বা কেউ সত্যিকারের বিশ্বাস নিয়ে ‘রুম’-এর মুখোমুখি হয়। শেষ পর্যন্ত, তিনি ফিরে যান সেই একটিমাত্র বিশ্বাসে,সুখের ধারণা মানুষের নিঃস্বার্থ আস্থা দিয়ে পাওয়া ।
এই ছবির ধারণা কীভাবে এলো?
এই প্রশ্নটা অনেকেই করেন। কিন্তু বলতে গেলে, আমার ছবির ধারণা আসাটা খুবই সাধারণ, একঘেয়ে, ধাপে ধাপে ঘটে। কোনো নাটকীয়তা নেই, কোনো রোমাঞ্চকর মুহূর্ত নেই। ইংমার বার্গম্যান একবার বলেছিলেন, একটা রশ্মি মেঝেতে পড়তে দেখে হঠাৎ এক সিনেমার ভাবনা এসেছিল তাঁর মাথায়। আমার ক্ষেত্রে তা হয়নি। হয়তো কোনো ছবি হঠাৎ আসে, কিন্তু সময়ের সঙ্গে তা বদলে যায় স্বপ্নের মতোই। শেষে একদম অচেনা, ভিন্ন কিছুতে রূপ নেয়।
তাহলে “স্টকার”-এর পেছনে কোনো গল্প আছে?
একসময় আমি আমার বন্ধু পরিচালক জর্জি কালাতোজিশভিলিকে “রোডসাইড পিকনিক” উপন্যাসটা পড়ার পরামর্শ দিই। ভাবলাম হয়তো উনি এটা নিয়ে ছবি বানাতে পারবেন। কিন্তু পরে কোনো এক কারণে উনি লেখকদের সঙ্গে বোঝাপড়ায় আসতে পারেননি। তখন উনি কাজটা ছেড়ে দেন। মাঝে মাঝে সেই ধারণাটা আমার মাথায় ফিরে আসতে থাকে। একসময় মনে হতে থাকে, এই উপন্যাস থেকে একটি সংহত, একক স্থান-কাল-কর্মের ভিত্তিতে সিনেমা করা সম্ভব। এই আরিস্টটেলীয় একতাগুলোর মাধ্যমে আমি মনে করতাম, সত্যিকারের সিনেমা সম্ভব। অ্যাকশন বা বাহ্যিক নাটকীয়তা নয়, বরং এই মাধ্যমে সমকালীন বুদ্ধিজীবীর অবস্থান ও দর্শন তুলে ধরা যায়। যদিও ছবির চিত্রনাট্যে “রোডসাইড পিকনিক” থেকে মাত্র দুটি শব্দ নেওয়া হয়েছে “স্টকার” এবং “জোন”।
এই ছবিতে কোনো আত্মজৈবনিক ব্যাপার আছে?
হয়তো “মিরর”-এর চেয়েও বেশি। “স্টকার” এ আমি এমন কিছু অনুভূতি ও স্মৃতি ব্যবহার করেছি যা একান্তই ব্যক্তিগত। যেমন লেখক চরিত্রটির কিছু আচরণে আমার নিজের কথা মনে পড়ে যায়। অভিনেতা সোলোনিৎসিন আমার নির্দেশ খুব মনোযোগ দিয়ে অনুসরণ করেছিলেন। তাঁর কিছু মুখভঙ্গি, কথার ভঙ্গিমা, আচরণে আমি নিজের ছায়া দেখতে পাই। যদিও আমি লেখক চরিত্রটিকে খুব পছন্দ করি না।
আপনি কাকে সবচেয়ে বেশি সহানুভূতি দেখান?
নিশ্চয়ই স্টকারকে। মনে হয় যেন ও আমার ভাই। হয়তো হারিয়ে যাওয়া ভাই, কিন্তু ভাই-ই। আমি ওর মানসিক দ্বন্দ্ব, জীবনের প্রতি ওর অভিমান, সবটা গভীরভাবে অনুভব করি। চিত্রনাট্যে লেখক বা বিজ্ঞানীর মতোই স্টকারও একজন শিক্ষিত, গভীরভাবে সংবেদনশীল মানুষ, যদিও সে এক ধরনের সমাজবহির্ভূত। শুরু থেকেই আমার ইচ্ছে ছিল ছবির শেষে এমন একটা জায়গায় হঠাৎ একটা বিশাল বইয়ের তাক দেখা যাবে যেটা পরিবেশের সঙ্গে একদম অসঙ্গত। এমন একটা বইয়ের তাক আমি নিজে কখনো পাইনি। স্টকার যেভাবে এলোমেলোভাবে বইগুলো রাখে, আমিও সেভাবেই চাই।
“স্টকার”-এর পর নতুন কোনো ছবির কথা ভাবছেন?
হ্যাঁ, আমরা “ভয়েজ টু ইতালি” নামে একটা ছবি করতে চাই। আপনি (গুয়ারা) এ বিষয়ে আমার চেয়ে ভালো বলতে পারবেন। আমরা এমন একটা ছবি বানাতে চাই, যা একঘেয়ে ও বাণিজ্যিক হবে না। এতে হয়তো কিছু পুরনো দর্শক হারাবো, কিন্তু নতুন, ভিন্ন ধরনের দর্শক পাবো।
আপনি কি সিনেমা বানানোর পদ্ধতি বদলাতে চাইছেন?
হ্যাঁ, চাই। যদিও এখনো জানি না কীভাবে। ইচ্ছে করে একদম স্বাধীনভাবে, অপেশাদারদের মতো করে একটা ছবি বানাতে যেখানে বড় বাজেট নেই, কোনো চাপে নেই। শুধু প্রকৃতি আর মানুষকে দেখব, আর তার থেকেই গল্প আসবে। কোনো পূর্ব পরিকল্পনা বা নির্দিষ্ট দৃশ্যের বাধ্যবাধকতা থাকবে না। ছোট ক্যামেরা দিয়ে শুট করা, লাইট বা নির্দিষ্ট অভিনেতার উপর নির্ভরতা ছাড়াই এমন একটি মুক্ত কাজের অভিজ্ঞতা আমাকে হয়তো আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে।


