পিটার : টেপ রেকর্ডার ব্যবহার করলে আপনি কেমন বোধ করবেন?
মার্কেজ : সমস্যা হলো, যখনই জানবেন সাক্ষাৎকার রেকর্ড করা হচ্ছে তখনই ভাবভঙ্গি বদলে যাবে। আমার বেলায় আমি সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিরক্ষামূলক মনোভাব দাঁড় করিয়ে দিই। সাংবাদিক হিসেবে সাক্ষাৎকারের সময় টেপ রেকর্ডারের ব্যবহার এখনো আমরা শিখিনি বলে আমার ধারণা।আমি মনে করি, সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে কোনো ধরনের নোট না নিয়ে দীর্ঘ কথোপকথন চালিয়ে যাওয়া। তারপর কথোপকথনের স্মৃতি থেকে এটাকে লিখে ফেলা, হুবহু একইরকম শব্দে প্রকাশ করতে হবে এমন নয় – যে-ধারণার সৃষ্টি হয়েছে তা প্রকাশ করা। আরেকটি উপকারি পদ্ধতি হচ্ছে নোট নেওয়া আর সাক্ষাৎকারদাতার প্রতি অনুগত থেকে এর ব্যাখ্যা করা। যা আপনাকে ফাঁসিয়ে দেবে তা হচ্ছে যন্ত্রটি সাক্ষাৎকারদাতার প্রতি অনুগত নয়, আপনি যখন সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে বোকামি করে ফেলবেন টেপ রেকর্ডার তাও ধারণ করে ফেলবে। সেজন্যে যখন টেপ রেকর্ডার থাকে আমি সচেতন হয়ে যাই যে, আমার সাক্ষাৎকার নেওয়া হচ্ছে; আর যখন যন্ত্রটি থাকে না আমি অবচেতনে এবং সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে কথা বলে যাই।
পিটার : সাক্ষাৎকার নিতে আপনি কখনো টেপ রেকর্ডার ব্যবহার করেননি?
মার্কেজ : সাংবাদিক হিসেবে আমি কখনো ব্যবহার করিনি। আমার খুব চমৎকার একটি টেপ রেকর্ডার আছে, এটা কেবল গান শুনতে ব্যবহার করি। তবে সাংবাদিক হিসেবে আমি কখনো সাক্ষাৎকার নিইনি। আমি রিপোর্ট করেছি, প্রশ্ন আর উত্তরের সাক্ষাৎকার কখনো নয়।
পিটার : আপনার কাছে মহৎ সাংবাদিকতার কাজ কোনটি?
মার্কেজ : জন হার্সের হিরোশিমা একটি অসাধারণ কাজ।
পিটার : এখনকার এমন কোনো কাহিনি কি আছে যা নিয়ে কাজ করতে আপনি বিশেষভাবে পছন্দ করবেন?
মার্কেজ : এমন অনেক রয়েছে, অনেকগুলো নিয়ে আমি লিখেছিও। আমি পর্তুগাল, কিউবা, অ্যাঙ্গোলা এবং ভিয়েতনাম নিয়ে লিখেছি। আমি পোল্যান্ড নিয়ে লিখতে চাই। আমার ধারণা এখন সেখানে যা ঘটছে আমি হুবহু বর্ণনা করে যেতে পারব। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা হতো। পোল্যান্ডে এখন প্রচন্ড শীত, কিন্তু আমি যে আরামপ্রিয় সাংবাদিক।
পিটার : আপনি কি মনে করেন উপন্যাস এমন কিছু করতে পারে যা সাংবাদিকতা করতে পারে না?
মার্কেজ : একটুও না, আমি মনে করি একটু পার্থক্যও নেই। উভয়ের উৎস এক, রসদ এক, সম্পদ ও ভাষা এক। ড্যানিয়েল ডেফোর দ্য জার্নাল অব দ্য প্লেগ ইয়ার একটি মহান উপন্যাস আর হিরোশিমা সাংবাদিকতার একটি শ্রেষ্ঠ কাজ।
পিটার : সত্য বনাম কল্পনার ভারসাম্য রক্ষা করতে সাংবাদিক ও ঔপন্যাসিকের ভিন্ন ভিন্ন দায়িত্ব রয়েছে কি?
মার্কেজ : সাংবাদিকতায় একটি ঘটনা যদি মিথ্যে হয় তাহলে তা সমস্ত কাজটিকে প্রভাবিত করবে। পক্ষান্তরে উপন্যাসের একটি একক ঘটনা যদি সত্যি হয় তাহলে তা গোটা কাজটিকে বৈধতা প্রদান করবে। পার্থক্য সেখানেই, তার তা লেখকের প্রতিশ্রুতিতে নিহিত। যতক্ষণ মানুষকে বিশ্বাস করিয়ে যেতে পারে একজন ঔপন্যাসিক, ততক্ষণ যা চান লিখে যেতে পারেন।
পিটার : কবছর আগে একটি সাক্ষাৎকারে মনে হয়েছে, আপনি বিস্ময়ের সঙ্গে আপনার পেছনের সাংবাদিক-জীবনের দিকে তাকিয়েছেন – তখন এত দ্রুততার সঙ্গে কাজ করতে পারতেন?
মার্কেজ : উপন্যাসই হোক কি সাংবাদিকতা, আগের মতো লিখে যাওয়া আমার জন্য খুব কষ্টকর। আমি যখন সংবাদপত্রে কাজ করতাম, যা লিখেছি তাতে প্রতিটি শব্দ নিয়ে তেমন সচেতন ছিলাম না, কিন্তু এখন সচেতন। আমি যখন বোগোটায় এল স্পেকতাদর পত্রিকায় কাজ করতাম, আমাকে সপ্তাহে অন্তত তিনটা বড় লেখা দিতে হতো। প্রতিদিন দু-তিনটে সম্পাদকীয় নোট, এছাড়া আমি চলচ্চিত্র-সমালোচনা লিখতাম। রাতে সবাই যখন চলে যেত, আমি রয়ে যেতাম আর উপন্যাস নিয়ে বসতাম। ছাপাখানার লাইনোটাইপ মেশিনের শব্দ আমার ভালো লাগত, বৃষ্টির শব্দের মতো মনে হতো। মেশিন থেমে গেলে আমি নৈঃশব্দ্যের মধ্যে পড়ে থাকতাম, আমি আর কাজ করতে পারতাম না। এখন সে-তুলনায় আমার লেখালেখি অনেক কম। এখন কাজের দিনগুলোতে সকাল নটা থেকে দুপুর দুটো বা তিনটে পর্যন্ত কাজ করে লিখতে পারি বড়জোর চার পাঁচ লাইনের একটি ছোট অনুচ্ছেদ। পরদিন দেখা যায় এটা আবার ছিঁড়ে ফেলছি।
পিটার : এই পরিবর্তন কেন এলো, আপনার লেখা উচ্চপ্রশংসিত সে-কারণে, না কোনো রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি থেকে?
মার্কেজ : দুটো থেকেই। আমার মনে হয়, আমার কল্পনারও বাইরে এমন বিপুলসংখ্যক পাঠকের জন্য লিখছি – এই ধারণা আমার ওপর এক ধরনের সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ববোধের সৃষ্টি করে। এর সঙ্গে অহঙ্কাকারও যোগ হয় – এ-লেখার মান যেন আগের লেখার চেয়ে কমে না যায়।
পিটার : প্রথমদিকে আপনাকে প্রভাবিত করেছেন এমন কজনের নাম বলবেন কি?
মার্কেজ : ছোটগল্পের প্রতি আমার যে বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি সেখান থেকে আমাকে যারা বের করে নিয়ে এসেছিলেন, তারা হচ্ছেন আমেরিকার লস্ট জেনারেশনের লেখক। আমি অনুধাবন করি, তাদের সাহিত্যের সঙ্গে জীবনের সম্পর্ক রয়েছে, যা আমার ছোটগল্পে নেই। তারপর এমন একটি ঘটনা ঘটে যা এই মনোভাবের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ৯ এপ্রিল ১৯৪৮ এটা ছিল বোগোতাজো, রাজনৈতিক নেতা গেইতান গুলিবিদ্ধ হন এবং মানুষ উন্মত্তের মতো বোগোটার রাস্তায় নেমে আসে। যখন খবরটা আমার কানে আসে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ডিং হাউজে আমি দুপুরের খাবারের জন্য তৈরি হচ্ছি। আমি দৌড়ে সেখানে যাই। ততক্ষণে গেইতানকে ট্র্যাক্সিতে তুলে হাসপাতালের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমি যখন বোর্ডিং হাউজে ফিরে আসি, রাস্তায় নামা লোকজন তখন বিক্ষোভ শুরু করেছে, দোকানপাট লুট করছে, ভবনে আগুন দিচ্ছে। আমিও তাদের সঙ্গে যোগ দিই। সেদিন বিকেল ও সন্ধ্যায় আমার বোধোদয় হয়, কোন ধরনের দেশে আমি বসবাস করছি আর এর মোকাবেলায় আমার ছোটগল্প তুচ্ছ। পরবর্তীকালে যখন আমাকে জোর করে, আমি যেখানে আমার শৈশব কাটিয়েছি, সেই ক্যারিবীয় অঞ্চলের বারানকুইলায় পাঠানো হয়। আমি বুঝতে পারি, এ-জীবনই আমি যাপন করেছি, এ-জীবনই আমার চেনা, আর আমি এ নিয়েই লিখতে চাই।
পিটার : ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অব সলিচিউডের অনিদ্রা মহামারির উৎস কী?
মার্কেজ : ইডিপাস দিয়ে শুরু, প্লেগ নিয়ে আমি সবসময়ই আগ্রহী ছিলাম। মধ্যযুগের প্লেগ নিয়ে আমি অনেক পড়াশোনা করেছি। আমার প্রিয় একটি বই ড্যানিয়েল ডেফোর দ্য জার্নাল অব দ্য প্লেগ ইয়ার্স – অনেকগুলো কারণের একটি হচ্ছে ডেফো ছিলেন একজন সাংবাদিক, যার লেখা পড়ে মনে হয় তিনি কল্পলোকের কাহিনি বলছেন। অনেক বছর ধরে আমার মনে হয়েছে, ডেফো লন্ডনে প্লেগ যেভাবে দেখেছেন সেভাবেই বর্ণনা করেছেন। কিন্তু আমি দেখলাম এটি আসলে একটি উপন্যাস, কারণ লন্ডনে যখন প্লেগের প্রাদুর্ভাব হয় তখন ড্যানিয়েল ডেফোর বয়স সাত বছরেরও কম। প্লেগ বরাবরই আমার কাছে ফিরে ফিরে আসা একটি বিষয় – বিভিন্ন অকরণে। ইভিল আওয়ারে পুস্তিকাগুলো প্লেগ। অনেক বছর ধরে আমি ভেবেছি, কলম্বিয়ার রাজনৈতিক সহিংসতার অধিবিদ্যার ধরন প্লেগের মতোই। ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অব সলিচিউড লেখার আগে ‘ওয়ান ডে আফটার স্যাটারডে’ নামের একটি গল্পে আমি সব পাখি মেরে ফেলার জন্য প্লেগের আশ্রয় নিয়েছিলাম। ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অব সলিচিউডে ইনসমনিয়া প্লেগ – অনিদ্রা মহামারি সাহিত্যের একটি চাতুরী হিসেবে ব্যবহার করেছিলাম – এটা নিদ্রা মহামারির ঠিক উল্টোপিঠ। শেষ পর্যন্ত সাহিত্য ছুতারগিরি ছাড়া আর কিছু নয়।
পিটার : আপনি প্রায়ই নির্জনতার শক্তির থিম ব্যবহার করে থাকেন।
মার্কেজ : আপনার যত বেশি ক্ষমতা থাকবে, কে আপনার কাজে মিথ্যে বলছে এবং কে বলছে না, তা বের করা তত কঠিন হয়ে উঠবে। আপনার ক্ষমতা যখন নিরঙ্কুশ হবে বাস্তবতার সঙ্গে আপনার আর কোনো সম্পর্ক থাকবে না – আর এটাই হচ্ছে সবচেয়ে জঘন্য নির্জনতা। একজন শক্তিশালী ব্যক্তি, যিনি একনায়ক, তাকে ঘিরে রাখে বিভিন্ন ধরনের স্বার্থ এবং এমনসব মানুষ যাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য তাকে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করা; সবকিছুই সংঘবদ্ধভাবে তাকে বিচ্ছিন্ন করতেই করা হয়। (সংক্ষেপিত)


