ব্রাজিলে নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পরও অন্যায়ভাবে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টার অভিযোগে বিচার চলছে সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর। এই বিচারকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ আখ্যা দিয়ে তা বন্ধের দাবি জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর এই দাবি আদায়ে তিনি ব্রাজিলের বিরুদ্ধে ৫০% পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন।
লুলা দা সিলভার কাছে হেরে যাওয়ার পর ২০২৩ সালের ৮ জানুয়ারি বলসোনারোর সমর্থকেরা ব্রাজিলের কংগ্রেস, প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ ও সুপ্রিম কোর্টে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করেন। ব্রাজিলে বলসোনারোর সমর্থকদের হামলার ঠিক দুই বছর আগে একই কায়দায় যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল হিলে হামলা চালিয়েছিলেন ট্রাম্প-সমর্থকরা।
বলসোনারো ক্ষমতায় থাকাকালে ট্রাম্পের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। এখন সেই বন্ধুকে আইনি বিপদ থেকে বাঁচাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল প্রভাবকে ব্যবহার করে ব্রাজিলকে চাপে ফেলার কৌশল নিয়েছেন ট্রাম্প।
শুল্ক আরোপের পেছনে বাণিজ্য ঘাটতিকে অজুহাত হিসেবে দেখাচ্ছেন ট্রাম্প। তার যুক্তি অনুযায়ী, যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রে বেশি পণ্য রপ্তানি করে, কিন্তু সেই তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে কম আমদানি করে–সেসব দেশের ওপর শুল্ক আরোপ করছেন। তবে অন্তত ব্রাজিলের ক্ষেত্রে এই যুক্তি একেবারেই খাটে না। ব্রাজিলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি তো নেই-ই, বরং ওয়াশিংটনের প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত রয়েছে।
এতে এটাই প্রমাণিত হয় যে–এই শুল্ক আরোপের পেছনে মূল উদ্দেশ্য হলো, অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে একটি সার্বভৌম দেশের বিচারিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করা এবং নিজের রাজনৈতিক মিত্রকে সুবিধা দেওয়া।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য শুল্ককে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি নতুন কিছু নয়। ২০১৭ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর তিনি চীনের ওপর শুল্ক আরোপের জন্য ফেন্টানিলের মতো মাদক পাচারকে অজুহাত হিসেবে খাড়া করেছিলেন।
ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী প্রতিষ্ঠিত বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার ওপর একটি বড় আঘাত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। যুক্তরাষ্ট্র নিজেই বিশ্ববাণিজ্যের এই নিয়ম গড়ে তোলায় নেতৃত্ব দিয়েছিল। এর ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বা ডব্লিউটিও। এই সংস্থাটি তৈরির মূল উদ্দেশ্য ছিল শুল্কের মতো বিষয়কে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা।
এ প্রসঙ্গে গত ৮ জুলাই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বার্ষিক বৈঠকের উদ্বোধনী ভাষণে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন–‘শুল্ক, রপ্তানি সীমাবদ্ধতা এবং বিনিয়োগে প্রতিবন্ধকতা এখন ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ধারালো অস্ত্র।’ তিনি ‘বিশ্বকে প্রভাব বলয়ে ভাগ করার ধারণা’ প্রত্যাখ্যান করার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশের ওপর আরোপিত ৩৫% শুল্ক কমানোর আলোচনাতেও বাংলাদেশকে চীনের কাছ থেকে আমদানি কমানোর চাপ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তারা বাংলাদেশের শুল্কব্যবস্থাকেও তাদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার আহ্বান জানিয়েছে। আলোচনায় শুধু বাণিজ্য নয়, যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা ও চীনের বিনিয়োগ বৃদ্ধি সংক্রান্ত বিষয়ও এনেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন–বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে এই শুল্ক হুমকি চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর কৌশলের অংশ।


