Home Blog Page 43

যে ১০টি মাউস বদলে দিয়েছে কম্পিউটার চালানোর অভিজ্ঞতা

১. Xerox Alto Mouse (১৯৭৩)
আমরা যেটাকে আজ ‘মাউস’ বলি, তার পূর্বপুরুষ হলো Xerox Alto-এর এই কাঠের বডিওয়ালা, বাক্স আকৃতির প্রথম কম্পিউটার মাউস। দেখতে ছিল একেবারে গোঁড়া, টানা তার দিয়ে কম্পিউটারের সঙ্গে যুক্ত, আর ছিল দুটি বোতাম। তবে এই ছোট্ট যন্ত্রই আমাদের স্ক্রিনে হাত চালানো শিখিয়েছে। এতে ছিল বল সেন্সর এবং মেকানিক্যাল রোলার দিয়ে কার্সর চালানো যেত। এটিই প্রথমবারের মতো গ্রাফিকাল ইউজার ইন্টারফেসের জন্য তৈরি মাউস। Xerox PARC-এর ল্যাবে এর জন্ম হয়।

২. Apple Lisa Mouse (১৯৮৩)
Xerox-এর ভাবনাকে বাণিজ্যিকভাবে জনপ্রিয় করে তোলে অ্যাপল। Lisa কম্পিউটারের জন্য তারা তৈরি করেছিল এক বোতামের প্লাস্টিক বডি যুক্ত সাদা রঙের মাউস। এটি দেখতে ছিল একেবারে সহজ, কিন্তু ডিজাইন ছিল যথেষ্ট সাহসী। বডির ভিতরে ছিল একটি বল সেন্সর, আর ডিভাইসটি ছিল হাতের মুঠোয় ধরার উপযোগী। এটি ছিল অ্যাপলের ডিজাইন দার্শনিকতা “জটিলতাকে সরলভাবে উপস্থাপন”—এর বাস্তব রূপ।

৩. Logitech C7 (১৯৮৫)
এই মডেল দিয়ে Logitech মাউস বাজারে প্রবেশ করে। প্রথম সুইস ডিজাইন, প্লাস্টিকের গায়ে ছিল হালকা ধূসর টোন এবং একটু বাঁকা আকার, যাতে হাতের তালু স্বাচ্ছন্দ্য পায়। এটি বলচালিত, দুটি বোতামের সাধারণ কাঠামো বজায় রেখেও সময়োপযোগী ছিল। C7 আসলে ‘কম্পিউটার ব্যবহারকে আরও মানবিক’ করার চেষ্টার অংশ।

৪. Microsoft IntelliMouse (১৯৯৬)
এই মাউস ইন্ডাস্ট্রির খেলাটা বদলে দেয়। প্রথম বড় ইনোভেশন স্ক্রল হুইল। অফিস ইউজারদের জন্য স্বপ্নের মতো ছিল এটি। IntelliMouse অপটিক্যাল নয়, তখনও বলচালিত ছিল, কিন্তু এর কাস্টম গ্রিপ আর ওয়ার্কফ্লো সহায়ক বাটন ম্যাপিং সিস্টেম নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। ডিজাইনের দিক থেকে ছিল গাঢ় ধূসর প্লাস্টিক বডি, ergonomic ডিজাইন।

৫. Apple Pro Mouse (২০০০)
এটি Apple-এর “বাটনহীন মাউস”। স্বচ্ছ উপরের কভার, ভিতরে কালো কার্ভড বডি এ যেন ডিজাইন ও প্রযুক্তির বিবাহ। বডির একেক অংশ ছিল একেক রকমের ফাংশনের জন্য চাপ-সংবেদী। প্লাস্টিক ও ফাইবারগ্লাসের মিশেলে তৈরি এই মাউস ছিল প্রযুক্তি পণ্যের শিল্পকর্ম হয়ে ওঠার প্রথম নিদর্শনগুলোর একটি।

৬. Razer Diamondback (২০০৪)
গেমারদের মনের মতো মাউস। LED লাইটে ঘেরা, খুব হালকা এবং ambidextrous ডিজাইন (দু’হাতেই ব্যবহারযোগ্য)। এর বডি ছিল ফাইবার প্লাস্টিকের, স্লিম এবং হালকা কার্ভচালিত। DPI ছিল তখনকার সময়ের তুলনায় অত্যন্ত বেশি, প্রায় ১৬০০ DPI। গেমিং জগতে এই মাউস এক নতুন “স্পেস” তৈরি করে, যেখানে নান্দনিকতা, গতি ও প্রযুক্তি মিলেমিশে যায়।

৭. Logitech MX Revolution (২০০৬)
এটি ছিল productivity freak-দের জন্য এক বিপ্লব। সবচেয়ে আলোচিত ফিচার ছিল এর “SmartShift” স্ক্রল হুইল, যা নিজে নিজেই মোড পরিবর্তন করত। বডি ডিজাইনে ব্যবহৃত হয়েছিল ম্যাট প্লাস্টিক এবং রাবার গ্রিপিং। এতে অতিরিক্ত থাম্ব বাটন, হাই-প্রিসিশন সেন্সর এবং লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি ছিল। আর হ্যাঁ, এটি ছিল ওয়্যারলেস।

৮. Apple Magic Mouse (২০০৯)
যেখানে বাকিরা বাটনের সংখ্যা বাড়াচ্ছে, অ্যাপল মুছে দিল সব বাটন। আনল গ্লাস টপ, মাল্টি-টাচ সারফেস! Magic Mouse-এর ভিতরে ছিল Apple-এর নিজস্ব লেজার ট্র্যাকিং প্রযুক্তি। ডিজাইন একেবারে ফিউচারিস্টিক, সাদা ও অ্যালুমিনিয়ামের সংমিশ্রণ, লম্বাটে আকৃতি। হাতের তালু নয়, আঙুলের ছোঁয়া এই মাউস চালাত।

৯. Logitech MX Master Series (২০১৫–বর্তমান)
এটি বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত প্রোডাকটিভিটি মাউস। এর ডিজাইন একেবারে হাতের আরাম অনুযায়ী—নিচের দিকে ঢালু, রাবার গ্রিপ এবং অনেকগুলো কাস্টমাইজেবল বাটন। স্ক্রল হুইলে আছে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক স্মার্টশিফট, যা গতি বুঝে স্ক্রল করে। এতে আছে ৪০০০ DPI সেন্সর, যা যেকোনো পৃষ্ঠেই কাজ করে। অফিস, এডিটিং, কোডিং সব কাজে অনন্য।

নাসিরউদ্দিন শাহ থেকে আরুন্ধতী রায় – চিন্তার স্বাধীনতা যখন রাষ্ট্রের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়

ভারতের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক পরিসরে বুদ্ধিজীবী সমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্ববহ। তারা শুধু সাহিত্য, দর্শন বা বিজ্ঞান জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্রই নয়, বরং সময়ে সময়ে রাষ্ট্র ও সমাজের নীতি-নৈতিকতা, গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা নিয়ে তীক্ষ্ণ বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু থেকেছে। নাসিরউদ্দিন শাহ থেকে শুরু করে আরুন্ধতী রায় দুটি সময়ের দু’জনই তাঁদের নিজ নিজ প্রেক্ষাপটে ভারতীয় রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত ও দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে গিয়েছেন।

নাসিরউদ্দিন শাহ (১৯৪৯-২০২১) ভারতীয় থিয়েটার ও সিনেমার একজন কিংবদন্তি অভিনেতা ও চিন্তাবিদ ছিলেন। তিনি মূলত একজন শিল্পী হলেও, তার কাজ ও ভাষণে বুদ্ধিজীবীদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অবস্থান স্পষ্টরূপে ফুটে উঠেছে। তিনি ভারতীয় সংস্কৃতির বহুমাত্রিকতা ও ঐতিহ্যের একজন গর্বিত প্রতিনিধি।

শাহের চিন্তাধারা ছিল পরিমিত ও ঐতিহ্যনিষ্ঠ। রাষ্ট্রের প্রতি তার শ্রদ্ধা এবং সামাজিক শৃঙ্খলার গুরুত্ব ছিল স্পষ্ট। তিনি ভারতের ইতিহাস, সমাজ ও সংস্কৃতির গভীরে বিশ্বাসী ছিলেন এবং রাষ্ট্রের নিয়মনীতি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে অবস্থান নেন। তাঁর কর্মকাণ্ড ও বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, নাসিরউদ্দিন শাহের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচয় ছিল একটি “জাতীয় ঐক্যের ধারণা” যেটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। রাষ্ট্রকে তিনি একটি ঐক্যবদ্ধ কাঠামো হিসেবে দেখতেন, যেখানে বুদ্ধিজীবীরা জাতির মূল ধারার অংশ হতে হবে।

আরুন্ধতী রায় সমকালীন ভারতের একজন সর্বাধিক বিতর্কিত লেখক ও বুদ্ধিজীবী, যিনি তাঁর সাহসী ও স্বাধীনমনা মতামতের জন্য পরিচিত। তিনি রাষ্ট্রের ওপর গভীর সন্দেহ ও সমালোচনা করেন এবং মানবাধিকার, সমাজবিচ্যুতি, নৃগোষ্ঠীয় অধিকারসহ নানা বিষয়ে রুখে দাঁড়ান।

রায়ের লেখালেখি ও বক্তব্যে মূলত দেখা যায় রাষ্ট্রের কর্তৃত্ববাদী দিক এবং ক্ষমতার অপব্যবহারকে চ্যালেঞ্জ করার স্পষ্ট প্রবণতা। তিনি বুদ্ধিজীবী সমাজকে “রাষ্ট্রের নীতিবিরোধী” হওয়ার দায়িত্ব দিয়েছেন, অর্থাৎ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি স্বাধীন, সমালোচনামূলক মনোভাব বজায় রাখতে হবে। তাঁর ‘দ্য ডকুমেন্টস অব ইন্ডিয়া’ বা ‘দ্য ইনজুরি’ এর মতো লেখাগুলো ভারতীয় রাষ্ট্রের ভিতরে লুকিয়ে থাকা অন্যায় ও শোষণের চিত্র উপস্থাপন করে। রায়ের মতে, সত্যের স্বার্থে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো বুদ্ধিজীবীদের কর্তব্য।

নাসিরউদ্দিন শাহ ও আরুন্ধতী রায় এই দুইয়ের মধ্যে যে বুদ্ধিজীবী ও রাষ্ট্রের সম্পর্কের ভিন্নতা রয়েছে, তা একদিকে ভারতের পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির প্রতিফলন, অন্যদিকে বুদ্ধিজীবীদের দৃষ্টিভঙ্গির মূল পার্থক্য। নাসিরউদ্দিন শাহের আত্মচিন্তা রাষ্ট্র ও জাতীয় ঐক্যের প্রতি নিবদ্ধ, যেখানে সমাজের স্থিতিশীলতা ও ঐতিহ্যের সম্মান অগ্রাধিকার পায়।

আরুন্ধতী রায়ের আত্মচিন্তা মূলত রাষ্ট্রের কর্তৃত্ববাদী ও শোষণমূলক দিকের বিরুদ্ধে রূঢ় প্রতিবাদ। বুদ্ধিজীবীদের তিনি রাষ্ট্রের বিচারক ও সংশোধনকর্তা হিসেবে দেখেন, যারা রাষ্ট্রের অন্যায় প্রকাশ ও সমালোচনা করতে বাধ্য। এই দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য ভারতীয় বুদ্ধিজীবী সমাজের একটি বড় অংশের প্রতিফলন।

নাসিরউদ্দিন শাহের সময় ভারত ছিল স্বাধীন হয়েছে মাত্র কয়েক দশক, যেখানে জাতীয় ঐক্য ও সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনীয়তা ছিল বিরাট।১৯৬০-৮০-এর দশকে ভারতীয় বুদ্ধিজীবীরা রাজনৈতিক দিক থেকে অপেক্ষাকৃত সংহত এবং জাতীয়তাবাদের প্রতি সম্মানসূচক ছিল। অন্যদিকে, আরুন্ধতী রায়ের কর্মকাল চলেছে ভারতীয় গণতন্ত্রের একটি ক্রমবর্ধমান বহুত্ববাদের যুগে, যেখানে রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাস অনেকাংশে কমেছে। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোর অন্ধ অনুসারিতা ও সংবিধানের ব্যঙ্গ বিস্তার ঘটায় বুদ্ধিজীবীরা রাষ্ট্রের প্রতি সংশয়ী ও সমালোচনামূলক। তাছাড়া নাসিরউদ্দিন শাহ প্রথাগত সাংস্কৃতিক ধারায় বিশ্বাসী ছিলেন, যেখানে রাষ্ট্র ও সমাজ একত্রে উন্নতির পথ অনুসরণ করবে; আর রায় সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেন, যেখানে রাষ্ট্র প্রায়শই সত্ত্বাধিকারী বা নিপীড়ক।

দর্শনের আলোকে বলতে গেলে, নাসিরউদ্দিন শাহের চিন্তাধারায় “সমাজের স্থিতিশীলতা ও ঐক্যের” নৈতিক আদর্শ ছিল, যেখানে বুদ্ধিজীবী ‘নৈতিকতা ও দায়িত্বের’ রক্ষাকারী। রাষ্ট্রের স্বার্থে তারা ‘নিয়ম ও শৃঙ্খলা’ বজায় রাখার পথ প্রশস্ত করে। অপরদিকে আরুন্ধতী রায়ের ভাবনায় “নৈতিকতা ও স্বচ্ছতার” চূড়ান্ত মূল্যবোধ ছিল। তিনি রাষ্ট্রকে শোষণ ও কর্তৃত্ববাদী হিসেবে দেখেন, যেখানে বুদ্ধিজীবী ‘নৈতিক সংশোধক’ ও বিচারক হিসেবে কাজ করবেন। এই চিন্তা বহুসংস্কৃতির, বহুস্বরের একটি রাজনৈতিক দর্শন।

নাসিরউদ্দিন শাহ থেকে আরুন্ধতী রায় দুই যুগের দুই বুদ্ধিজীবী, দুই ভিন্ন দর্শন ও রাজনীতির আঙ্গিক। তাদের আত্মচিন্তার পার্থক্য আমাদের শেখায় ভারতীয় বুদ্ধিজীবী সমাজ কখনো একক নয়, বরং বহুস্তর ও বৈচিত্র্যময়। রাষ্ট্র ও বুদ্ধিজীবীর দ্বন্দ্ব আজও অব্যাহত। জাতীয় ঐক্য ও সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষার সঙ্গে মুক্ত চিন্তার সাংঘর্ষিকতা ভারতীয় গণতন্ত্রের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

রেট্রো থেকে স্মার্ট, ফ্রিজ ডিজাইনের ১০ অধ্যায়

ফ্রিজ আধুনিক গৃহস্থালির অপরিহার্য যন্ত্র। কিন্তু শুধু খাদ্য সংরক্ষণ নয়, সময়ের সঙ্গে ফ্রিজের ডিজাইন ও প্রযুক্তি এক অসাধারণ বিবর্তনের সাক্ষী। আজ আমরা দেখব ১০টি আইকনিক ফ্রিজ ডিজাইন, যেগুলো তাদের বডি বিল্ডিং, প্রযুক্তি ও ব্র্যান্ডের কারণে স্মরণীয় হয়ে আছে।

১. General Electric Monitor Top Refrigerator (১৯৩০-এর দশক)

প্রথম আধুনিক ফ্রিজগুলোর মধ্যে এই মডেলটি অন্যতম। এর গম্বুজাকৃত ‘মনিটর’ আকৃতির কম্প্রেসর ফ্রিজের উপরে বসানো ছিল, যা তখনকার দিনগুলোর অন্যতম বড় প্রযুক্তিগত অগ্রগতি। এই বিশেষ ডিজাইন শুধু কার্যকরই নয়, বরং এক যুগের আইকনিক স্টাইল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বডি ছিল ভারী মেটাল দিয়ে তৈরি, যার কারণে স্থায়িত্ব ছিল অপরিসীম। General Electric ব্র্যান্ড হিসেবে তখন প্রযুক্তিতে অগ্রণী, তাদের এই ফ্রিজ গৃহস্থালির প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় বিপ্লব এনেছিল।

২. Smeg FAB28 (১৯৫০-এর দশকের রেট্রো স্টাইল)

ইতালিয়ান ব্র্যান্ড Smeg-এর এই মডেল আজও পছন্দের কারণ হলো এর রেট্রো, রঙিন, এবং বৃত্তাকার কোণযুক্ত বডি বিল্ডিং। এটি ৫০-এর দশকের আমেরিকান ফ্রিজ থেকে অনুপ্রাণিত, কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি যোগ করে। কারিগরি দিক থেকে, এই ফ্রিজটি শক্তিশালী ইনসুলেশন এবং উচ্চ কার্যক্ষম কম্প্রেসর নিয়ে তৈরি। Smeg ব্র্যান্ডের মধ্যে এই মডেলটি শুধু কাজেই নয়, বাড়ির সাজসজ্জায়ও নতুনত্ব আনে।

৩. Viking Professional Series (১৯৯০-এর দশক থেকে বর্তমান)

রেস্তোরাঁর উচ্চমানের ফ্রিজের অনুকরণে তৈরি এই Viking সিরিজ ফ্রিজের বডি সম্পূর্ণ রস্টফ্রি স্টিল দিয়ে তৈরি, যা দীর্ঘস্থায়ী এবং মজবুত। তাদের কারিগরি বৈশিষ্ট্য যেমন উন্নত তাপ নিয়ন্ত্রণ, শক্তিশালী কম্প্রেসর, এবং পরিস্রুত ফ্যান সিস্টেম তাদের বাজারে শীর্ষে রাখে। বিলাসবহুল ঘরগুলোর জন্য এই ব্র্যান্ডের ফ্রিজ একটি স্ট্যাটাস সিম্বল।

৪. Samsung Family Hub (২০১৬)

টেকনোলজি আর ডিজাইনের এক দারুণ মেলবন্ধন। Samsung-এর এই স্মার্ট ফ্রিজে আছে বিশাল টাচস্ক্রিন, যা ঘরের অন্যান্য স্মার্ট ডিভাইসের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। বডি বিল্ডিং আধুনিক, স্লিম এবং এলুমিনিয়াম ফ্রেমের মাধ্যমে শক্তিশালী করা হয়েছে। কারিগরি দিক থেকে এতে রয়েছে ইন-বিল্ট ক্যামেরা, ভয়েস কন্ট্রোল এবং ইন্টারনেট ব্রাউজার, যা ফ্রিজকে শুধু খাবার সংরক্ষকের চেয়ে বেশি আধুনিক জীবনযাত্রার অংশে পরিণত করেছে।

৫. Sub-Zero Classic Built-In Refrigerator (১৯৮০-এর দশক)

উচ্চমানের বিল্ট-ইন ফ্রিজের এক আইকন। Sub-Zero-এর এই সিরিজের ফ্রিজগুলো ইনবিল্ট হওয়ার কারণে ঘরের ডিজাইনের সঙ্গে মানানসই হয়। এর বডি মজবুত স্টেইনলেস স্টিল দিয়ে তৈরি, যেটা দীর্ঘদিন ধরে টিকে থাকে। কারিগরি দিক থেকে, দ্বৈত কম্প্রেসর এবং আলাদা তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এর অন্যতম প্রধান ফিচার, যা খাবার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে আসে।

৬. Whirlpool Gold Series (১৯৯০-এর দশক)

Whirlpool-এর এই সিরিজ ছিল বেশ জনপ্রিয় এবং সাশ্রয়ী। এর বডি বিল্ডিং একটু সহজ এবং ব্যবহার বান্ধব হলেও কার্যকারিতা কম ছিল না। উন্নত ইনসুলেশন, শক্তিশালী ফ্রিজার সেকশন এবং সঠিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এটিকে বাড়ির জন্য আদর্শ করেছিল। Whirlpool ব্র্যান্ড হিসেবে বিশ্বস্ত এবং গ্রাহক সন্তুষ্টির জন্য পরিচিত।

৭. Electrolux Kelvinator (১৯৩০-৪০-এর দশক)

Electrolux-এর এই ফ্রিজগুলো ছিল সেক্ষেত্রে প্রযুক্তির এক অগ্রগামী। তাদের বডি ছিল ভারী ধাতু ও কাঠ দিয়ে তৈরি, যা স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতো। কারিগরি দিক থেকে আধুনিক কম্প্রেসর প্রযুক্তি এবং ফ্রিজিং সিস্টেমের ব্যবহার তাদের বাজারে অগ্রগামী করেছিল।

৮. Liebherr BioFresh Refrigerator (২০০০-এর দশক)

খাদ্যের সংরক্ষণে নতুন প্রযুক্তি নিয়ে এসেছে Liebherr-এর এই মডেল। BioFresh প্রযুক্তি থাকে যা তাজা খাবার দীর্ঘদিন ধরে নতুনের মতো রাখতে সাহায্য করে। এর বডি সাধারণত স্টেইনলেস স্টিল বা কালো গ্লাস ফিনিশে আসে, যা দেখতে আধুনিক এবং মার্জিত। কারিগরি দিক থেকে বিশেষ হিউমিডিটি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং আলাদা তাপমাত্রা সেকশন থাকায় এটি একদম ভিন্ন।

৯. Fisher & Paykel ActiveSmart (২০০০-এর দশক)

নিউ জিল্যান্ডের এই ব্র্যান্ডের ফ্রিজগুলো এনার্জি সেভিং প্রযুক্তি নিয়ে বাজারে এসেছে। ActiveSmart কুলিং সিস্টেম ফ্রিজের প্রতিটি অংশে সমান তাপমাত্রা বজায় রাখে। বডি বিল্ডিং হালকা কিন্তু মজবুত, আধুনিক লুক এবং স্লিম ডিজাইন এটিকে ছোট থেকে বড় সব ধরণের বাড়ির জন্য উপযোগী করেছে।

১০. Bosch Serie 6 (২০১০-এর দশক)

জার্মান প্রকৌশল ও নির্ভরতার প্রতীক Bosch-এর Serie 6 ফ্রিজগুলো শক্তিশালী স্টেইনলেস স্টিল বডি এবং উন্নত ফ্রিজিং প্রযুক্তিতে সজ্জিত। এর অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল কোটিং এবং উচ্চ কার্যক্ষমতা এটিকে ইউরোপের বাজারে এক বিশেষ স্থান দিয়েছে।

‘Fight Club’ আসলে দর্শনের মুখোশ পরা এক থ্রিল-রাইড! এমন এক যাত্রা, যেখানে কেউ কেউ বমি করে ফেলে, আর অন্যরা বারবার এর স্বাদ নিতে চায় : রজার এবার্ট, মার্কিন চলচ্চিত্র সমালোচক ও লেখক

“Fight Club” সিনেমা হলিউডের ‘Death Wish’-এর পর সবচেয়ে স্পষ্টভাবে এবং আনন্দের সাথে ফ্যাসিবাদী মনোভাব প্রকাশ করা বড় তারকাবহুল ছবি। এই ছবিতে সহিংসতা উদযাপন করা হয়েছে, যেখানে নায়কেরা নিজেদের ইচ্ছেমতো মদ খায়, ধূমপান করে, যৌন সম্পর্ক করে আর একে অপরকে পেটাতে থাকে।

মাঝেমধ্যে ভিন্নতা আনার জন্য তারা নিজেদেরও মারধর করে। এটা এক ধরনের ‘মাচো পর্ন’, যৌনতার বদলে পুরুষদের লকার রুমের মতো লড়াইকে কেন্দ্র করে তৈরি সিনেমা। নারী দর্শকরা যারা ছেলেদের এই ‘ছোটো ছেলে’ টাইপ আচরণ দেখতে অভ্যস্ত, তারা সহজেই এই সিনেমার ভেতরের বিষয়গুলো বুঝে ফেলবে। কিন্তু পুরুষ দর্শকদের জন্য এই ছবি হতে পারে টেস্টোস্টেরন-ভরা এক উত্তেজনার উৎস। সিনেমাটি ভালো বানানো এবং এর প্রথম অংশ দারুণ হওয়ায় দর্শক বিভ্রান্তও হতে পারে।

এডওয়ার্ড নর্টন অভিনয় করেছেন এক বিষণ্ন, একাকী শহুরে চরিত্র হিসেবে, যার ভেতরে হতাশা থই থই করছে। সে নিজের দুনিয়াকে বর্ণনা করে বিদ্রুপাত্মক ও ব্যঙ্গমিশ্রিত কথোপকথনে। তার জীবন ও চাকরি তাকে পাগল করে তুলছে। যন্ত্রণা সামলাতে সে বিভিন্ন ১২-স্টেপ সহানুভূতিশীল গোষ্ঠীতে যায়—যেখানে সে দুর্ভাগা মানুষদের জড়িয়ে ধরে নিজে কিছুটা মুক্তি পায়। মজার বিষয় হলো, সে যে প্রথম সভায় যায়, তা হচ্ছে অণ্ডকোষ ক্যান্সারের পরে বেঁচে থাকা পুরুষদের সভা, আর পুরো ছবির থিমটাই মূলত পুরুষদের ‘পুরুষত্ব হারানোর’ ভয়কে ঘিরে।

এই প্রারম্ভিক অংশগুলো বেশ চাতুর্যময় ও মজার। নর্টনের কণ্ঠে এই বর্ণনা শুনতে নাথানিয়েল ওয়েস্টের ‘Miss Lonelyhearts’ বইয়ের ভঙ্গিমা মনে করায়। তার নামও সিনেমায় “Narrator”—অর্থাৎ বর্ণনাকারী, যার অর্থ শেষদিকে বোঝা যাবে। সভাগুলো তার জন্য ঘুমের ওষুধের মতো কাজ করছিল, কিন্তু হঠাৎই সে মারলা (হেলেনা বোনহ্যাম কার্টার) নামের এক নারীকে দেখতে পায়, যে সেও আসলে কোনো রোগী নয়, শুধু সভায় আসাটাকেই অভ্যাস করে ফেলেছে। এই মেয়েটি তার অভিজ্ঞতা নষ্ট করে দেয়। কারণ সে জানে সে নিজে ভণ্ড, কিন্তু চায় অন্যদের যন্ত্রণা সত্য হোক।

এরপর এক বিমানে তার দেখা হয় টাইলার ডার্ডেনের (ব্র্যাড পিট) সঙ্গে—একজন আত্মবিশ্বাসী, তীক্ষ্ণ মনের লোক, যে খুব সহজেই নর্টনের অন্তর দেখতে পায়। কিছুসময় পরেই নর্টনের অ্যাপার্টমেন্ট বিস্ফোরণে উড়ে গেলে, সে আশ্রয়ের জন্য টাইলারের কাছে যায়, কিন্তু পায় তার থেকেও বেশি। সে “Fight Club” নামের এক গোপন সংগঠনের সদস্য হয়, যেখানে পুরুষেরা একে অপরকে পেটাতে পেটাতে খুঁজে বেড়ায় মুক্তি ও আত্ম-উপলব্ধি।

এই মুহূর্ত থেকে সিনেমাটি বুদ্ধিদীপ্ত ও ব্যঙ্গাত্মক হওয়া ছেড়ে দিয়ে সহিংসতায় ভরপুর হয়ে ওঠে। বাস্তব জীবনে হাতে ঘুষি মারলে হাড় ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, কিন্তু এই সিনেমার চরিত্রদের যেন হাত পাথরের তৈরি। আর সাউন্ড ইফেক্ট? সে তো এমন, যেন পিং-পং ব্যাট দিয়ে সোফার ওপর পেটানো হচ্ছে! সিনেমার একপর্যায়ে আসে আরেকটি মোড়। অনেক নতুন সিনেমার মতো এটিও শেষে এমন কিছু দেখায়, যা দর্শকের সামনে গোটা ছবির বাস্তবতাকে নতুনভাবে তুলে ধরে, একধরনের ‘Keyser Soze সিনড্রোম’ বলা যেতে পারে।

তাহলে এইসব কিছুর মানে কী? ডার্ডেন বলছে, এটা হলো আধুনিক জীবনের দাসত্ব থেকে মুক্তির উপায়। আধুনিক জীবন পুরুষদের বন্দি ও দুর্বল করে তোলে। আর সেই শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পেতে হলে নিজের দেহ ও মনকে কষ্ট দেওয়া, এমনকি মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া দরকার। “Crash” (১৯৯৭) টাইপের সিনেমাগুলো ডার্ডেনের কাছে হাস্যকর মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক।

ধীরে ধীরে টাইলার ডার্ডেনের বড় পরিকল্পনার রূপরেখা স্পষ্ট হয়। সে কি সত্যিই একজন দার্শনিক নেতা? “সবকিছু হারানোর পরেই আমরা আসলে কিছু করার স্বাধীনতা পাই” এই কথা শুনলে মনে হয় যেন সে কোথাও একটা বইয়ের তাক থেকে নিটশেকে পড়ে গিয়েছিল। আমার মতে, তার কোনো সত্যিকারের বক্তব্য নেই। সে আসলে একজন দমনকারী Werner Erhard-এর সঙ্গে BDSM-এর মিশ্রণ; এক ধরনের চামড়ার ক্লাব চালায়, সাজসজ্জা বাদ দিয়ে। “Fight Club”-এর সদস্যদের কেউই এর দ্বারা মুক্ত বা শক্তিশালী হয় না বরং তারা এক ধরনের করুণ ‘কাল্ট’ সদস্যে পরিণত হয়। তাদের হাতে কালো শার্ট ধরিয়ে দিলে তারা সহজেই স্কিনহেডে পরিণত হতে পারে। টাইলার ডার্ডেন পুরুষ সত্তার গোপন দিকগুলোর প্রতীক কি না, সে প্রশ্ন ছবিটি করে বটে, কিন্তু নিজেই তার উত্তর দিতে পারে না কারণ এই সিনেমা মূলত নিজের বক্তব্য নয়, বরং নিজের সহিংসতাকেই উপস্থাপন করে।

অবশ্য, “Fight Club” সরাসরি ডার্ডেনের দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন করে না। হয়তো এটা তার বিরুদ্ধে একটা সতর্কবার্তা। এক সমালোচক বলেছিলেন, সিনেমাটি দেখায় কিভাবে মানুষের ভেতরের পশুত্ব আর দৈনন্দিন জীবনের যন্ত্রণায় মানুষ উন্মাদ হতে পারে। কিন্তু আমি মনে করি এই ধরনের সিনেমাগুলোই মানুষকে উন্মাদ করে তোলে। যদিও কেউ কেউ যুক্তি দিয়ে বলবে, ছবিটি যে সহিংসতা দেখাচ্ছে, তা থেকে দর্শককে সাবধান করতেই করছে।তবুও বাস্তবতা হলো, দর্শক মূলত সহিংসতাটাই উপভোগ করবে। তারা সিনেমা দেখে বেরিয়ে তর্কে না গিয়ে বরং মারামারিতে জড়াবে।

তবে অভিনেতারা তাঁদের সর্বোচ্চ দিয়েছেন, নর্টন ও পিট যে শারীরিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গেছেন, তা ‘G.I. Jane’-এ ডেমি মুরের কষ্টের সমতুল্য। আর হেলেনা বোনহ্যাম কার্টার দারুণভাবে এক চেইন-স্মোকিং, ক্ষুব্ধ, বিদ্রুপাত্মক নারী চরিত্র উপস্থাপন করেছেন। সে যেন এতটাই ক্ষেপে আছে কারণ কেউ তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ককেও ভাঙা নাকের মতো রোমাঞ্চকর মনে করে না।

ডেভিড ফিঞ্চার পরিচালিত এই ছবিটি, চাক পলানিকের উপন্যাস অবলম্বনে জিম উলসের চিত্রনাট্যে নির্মিত। অনেক দিক থেকে এটি ফিঞ্চারের “The Game” (১৯৯৭)-এর মতো—তবে সহিংসতা অনেক বেশি, যেন কিশোর ছেলেদের জন্য বানানো হয়েছে। সেই সিনেমাটি আসলেই নিজের থিমকে নিয়ে ছিল, কিন্তু “Fight Club”-এর বার্তাগুলো যেন কিছু ছেঁড়া ‘সামাজিক শিক্ষা’র মতো, যা বিশৃঙ্খল জনতার সামনে ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছে।

ফিঞ্চার একজন ভালো পরিচালক (“Alien 3” আর “Seven” তারই প্রমাণ)। কিন্তু এই সিনেমায় মনে হচ্ছে, সে নিজেকে চ্যালেঞ্জ দিয়েছে, দেখি কতদূর বাড়াবাড়ি করা যায়! ছবিটি ভীষণ শারীরিক, কঠিন এবং নানা স্তরের ব্যঙ্গ-রস ও প্রতীকিতা এতে আছে। যদি পুরো সিনেমা প্রথম অংশের মতো হতো, তাহলে হয়তো এটি একটি দারুণ সিনেমা হতে পারত। কিন্তু দ্বিতীয় অংশটা দর্শককে খুশি করতে বানানো, আর তৃতীয়টা ছলনা; ফিঞ্চার যেটাকে বার্তা ভাবছেন, দর্শকেরা তা ধরতে পারবে না। “Fight Club” এক ধরনের থ্রিল-রাইড যেটা দর্শন ছদ্মবেশে এসেছে, আর সেখানে কেউ বমি করে, কেউ আবার বারবার উঠতে চায়।

সেলফ-হিলিং কংক্রিট – জীবিত ব্যাকটেরিয়ার সাহায্যে ফাটল সারায় নিজেই

টেক্সাস এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক উদ্ভাবন, নিজেই নিজের মেরামত করছে কংক্রিট।
ড. জিন ও তাঁর দল টেক্সাস এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয়ে এক যুগান্তকারী সেলফ-হিলিং কংক্রিট তৈরি করেছেন, যা প্রাকৃতিক লাইকেন থেকে অনুপ্রাণিত। এই জীবন্ত উপাদানটি ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফাটল সারায়, বিশ্বজুড়ে অবকাঠামোর টেকসই রক্ষণাবেক্ষণে এটি এক নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত খুলে দিয়েছে।

প্রকৃতির অনুপ্রেরণায় এই উদ্ভাবনের শক্তি কৃত্রিম লাইকেন

লাইকেন হলো ছত্রাক ও সায়ানোব্যাকটেরিয়ার সহাবস্থানের এক বিস্ময়, যা কঠিন পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে। এই ধারণা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে গবেষকেরা কংক্রিটের ভেতর এই জীবাণুগুলো বসিয়ে দিয়েছেন। যা বাতাস, আলো ও পানির সাহায্যে নিজেই ফাটল সারাতে পারে।

কীভাবে কাজ করে?
জীবাণুরা ভেতর থেকেই কংক্রিট মেরামত করে, ফাটল দেখা দিলেই পানির সংস্পর্শে সক্রিয় হয় জীবাণুগুলো। সায়ানোব্যাকটেরিয়া সূর্যালোক ব্যবহার করে ফটোসিনথেসিসের মাধ্যমে শক্তি তৈরি করে, যা ছত্রাককে সহায়তা করে। ছত্রাক তখন ক্যালসিয়াম কার্বোনেট উৎপাদন করে, যা ফাটল ভরে দিয়ে কংক্রিটের শক্তি ফিরিয়ে আনে।

কেন এটা গুরুত্বপূর্ণ?

কার্বন নির্গমন কমানো এবং খরচ বাঁচানো, দামি ম্যানুয়াল মেরামত বা রাসায়নিক প্রক্রিয়া প্রয়োজন না থাকায়, এই সেলফ-হিলিং কংক্রিট অবকাঠামোর আয়ু বাড়ায়, রক্ষণাবেক্ষণের খরচ কমায় এবং নির্মাণে কার্বন নির্গমন কমায়, এসব টেকসই নির্মাণের দিকে এক বিশাল পদক্ষেপ।

ভবিষ্যতের অবকাঠামো

স্মার্ট, টেকসই এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ, এই বিপ্লবী উপাদান বিশ্বজুড়ে সেতু, সড়ক ও ভবনগুলোকে করে তুলবে আরও মজবুত ও দীর্ঘস্থায়ী। ড. জিনের দল এখন জনসাধারণের আস্থা ও নৈতিক দিকগুলোও খতিয়ে দেখছে, যাতে এই জীবন্ত প্রযুক্তি সমাজের জন্য দায়িত্বশীলভাবে উপকারে আসে।

খ্যাতির চূড়া থেকে উপহাসের গহ্বরে দস্তইয়েভস্কি মাত্র ১৫ দিনে হাস্যকর হয়ে উঠেছিলেন : ড্যানিয়েল কালডার, স্কটিশ লেখক ও সাংবাদিক

আমার প্রিয় রাশিয়ান লেখক হলেন ফিওদর দস্তইয়েভস্কি। তাঁর সেরা বইগুলো শুধু আত্মার গভীর অনুসন্ধান নয়, ওগুলো তীক্ষ্ণ, হিংস্র, বিদ্রুপাত্মক, বিষাদে ভরা, আর কখনো কখনো ভীষণ মজারও। সম্প্রতি আমি হেনরি ত্রোয়ায়তের Firebrand বইটা পড়তে শুরু করেছি, দস্তইয়েভস্কির জীবন নিয়ে লেখা এক পুরোনো ধাঁচের উপন্যাসসুলভ জীবনী। এতটাই ভালো লেগেছে যে সেই আনন্দের তরঙ্গে ভেসে আমি দস্তইয়েভস্কির আরও কিছু “ভারী” বই পড়তে শুরু করেছি, যেমন তাঁর নির্বাচিত পত্রাবলি আর কনস্তান্তিন মোচুলস্কির কঠোর ও শুষ্ক জীবনচরিত। (জোসেফ ফ্র্যাঙ্কের পাঁচ খণ্ডে লেখা মহাকাব্যিক জীবনীটা পরে রাখছি।)

সবচেয়ে মজার বিষয় হলো এই উত্তেজনাময় আর শুষ্ক দুই রকম লেখাই একই উৎস থেকে তৈরি, অথচ কী ভিন্ন রঙে উপস্থাপিত! দস্তইয়েভস্কির প্রথম উপন্যাস Poor Folk ছাপার আগে সেই যুগের এক বিখ্যাত সমালোচক ও দাম্ভিক ব্যক্তি ভিসারিওন বেলিনস্কির হাতে যায়। তিনি পড়ে সঙ্গে সঙ্গেই ঘোষণা করেন, দস্তইয়েভস্কি হচ্ছেন গোগলের উত্তরাধিকারী। সম্পূর্ণ বাড়াবাড়ি। Poor Folk মূলত এক আবেগঘন কাহিনি, এটা হয়তো ভুলেই যেত মানুষ, যদি সেই একই ব্যক্তি পরবর্তীতে Crime and Punishment–এর মতো বই না লিখতেন। তবু মাত্র ২৪ বছর বয়সে দস্তইয়েভস্কি হয়ে ওঠেন সেন্ট পিটার্সবার্গের নতুন সাহিত্যিক জাদুকর। তাঁর মাথা ঘুরে যায় এবং তিনি এতটাই অসহ্য হয়ে ওঠেন যে নতুন প্রাপ্ত বন্ধুরা একে একে মুখ ফিরিয়ে নেয়।

এই বন্ধুরাই তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস The Double প্রকাশের পর ভয়ানক প্রতিশোধ নেয়। শুধু সমালোচনাই করেনি তারা, বরং এই বই নিয়ে প্রকাশ্যে বিদ্রূপ শুরু করে দেয়। দস্তইয়েভস্কি হয়ে ওঠেন এক হাস্যকর চরিত্র। যা আমি এতদিন জানতাম না, তা হলো এই উত্থান ও পতনের মাঝে সময়টা কতটা সংক্ষিপ্ত ছিল! সেই সময়কার লেখকরা আজকের চেয়ে অনেক দ্রুত লিখতেন। বিশাল বিশাল ১৯ শতকের উপন্যাসগুলো লেখা হতো কয়েক মাসেই। তো ভাবো একবার, তখনকার সেই উচ্ছ্বাসের সময়কাল কতটা দীর্ঘ ছিল? এক বছর? নয় মাস? ছয়? তিন? মাত্র ১৫ দিন।

Poor Folk প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৪৬ সালের ১৫ জানুয়ারি। আর The Double এসেছিল ৩০ জানুয়ারি। আর সেই সঙ্গেই দস্তইয়েভস্কির খ্যাতির ধ্বংস।এই তো রেকর্ড। এরপর নির্বাসন থেকে ফিরে এসে তিনি House of the Dead–এর মাধ্যমে আবার আত্মপ্রকাশ করেন তাও ১৩ বছর পর। তবে মোচুলস্কির মতে, দস্তইয়েভস্কি আত্মবিশ্বাস আর কখনোই ফিরে পাননি। এমনকি যখন তিনি বিশ্বসাহিত্যের সেরা উপন্যাসগুলো লিখছেন, তখনও নিজের খ্যাতি নিয়ে উৎকণ্ঠায় ভুগছেন।

এখান থেকেই আমার মনে প্রশ্ন জাগল, আর কেউ কি এত দ্রুত পতনের শিকার হয়েছেন, যেমনটা দস্তইয়েভস্কি হলেন ১৮৪৬ সালের জানুয়ারিতে? (তবে ওরকম পুনর্জন্ম তো আর কেউ পেয়েছেন বলে মনে হয় না।) আমার মাথায় প্রথম যিনি এলেন, তিনি মার্টিন অ্যামিস। শুরুতে তাঁর বইগুলো নিয়ে সমালোচকেরা মাতামাতি করলেও, এখন তাঁকে আক্রমণ করা যেন এক জাতীয় খেলা হয়ে উঠেছে। তবু, এটা হতে দশকের পর দশক লেগেছে। আর অ্যামিস নিজেকে ভবিষ্যতের মহান লেখক ভাবেন।

অনেকে মৃত্যুর পর দ্রুত বিস্মৃত হন। যেমন সমারসেট মম এক সময় যার বই ঘরে ঘরে ছিল, আজ তিনি প্রায় অনুপস্থিত। সত্তর আশি এমনকি নব্বই দশকেও যিনি ছিলেন নিয়মিত পত্রিকায়, তাঁকে নিয়েও এখন কেউ তেমন ভাবে না। আর A Clockwork Orange না থাকলে আরেক অ্যান্টনির (বার্জেস) ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যেত।

সব মিলিয়ে দেখি এই সাহিত্যিক “যুদ্ধক্ষেত্র” জুড়ে পড়ে আছে যত পরিত্যক্ত নাম, তাতে দস্তইয়েভস্কির অভিজ্ঞতার সবচেয়ে কাছাকাছি যিনি আসেন, তিনি গৌতম মালকানি, Londonstani–এর লেখক। বই প্রকাশের আগে হাইপ, ৩ লাখ ৮০ হাজার পাউন্ড অগ্রিম আর তারপর প্রায় শূন্য বিক্রি। দ্বিতীয় বই তো লেখাই হয়নি, এর মাঝেই মানুষ তাঁকে ভুলে গেছে। তাঁর ওয়েবসাইট ২০০৭ সালের পর আর আপডেট হয়নি। আমিও বইটা পড়িনি, তাই ভালো-মন্দ বলতে পারি না। তবে মনে হয় তিনি একদমই “অবশ্যই ব্যর্থ হতেই হবে” ধরনের এক হাইপের শিকার, যেখানে পাবলিশার ও মিডিয়া লোকেরা নতুন এক Brick Lane বা White Teeth তৈরির ধান্দায় ভুল করে ফেলেছিল।

তবে এটাকে কি খ্যাতির পতন বলা যায়? নাকি কেবল একটা বুদবুদের ফেটে যাওয়া? আদৌ কি কখনো প্রকৃত খ্যাতি ছিল? দস্তইয়েভস্কির ক্ষেত্রে ছিল Poor Folk প্রকাশের আগেই সমালোচক বেলিনস্কি তাঁকে “প্রতিভা” বলেছিলেন। তবু, মালকানি অন্তত এটুকু শান্তি পেতে পারেন যে তাঁর সেই মোটা অগ্রিম টাকা কেউ ফেরত চাইবে না, আর তাঁকে কেউ বন্দুকের সামনে দাঁড় করিয়ে সাইবেরিয়ায় পাঠায়নি যা কিনা দস্তইয়েভস্কির ক্ষেত্রে হয়েছিল। এবং শেষ পর্যন্ত সেই অভিজ্ঞতাই দস্তইয়েভস্কির সাহিত্যিক পুনর্জন্মের পথ খুলে দিয়েছিল।

বঙ্কিম, তিলক ও বিবেকানন্দের দর্শনে হিন্দু জাতীয়তাবাদের ভিত্তি যেভাবে গঠিত হয়েছিল

ভারতের আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসে হিন্দু জাতীয়তাবাদ একটি বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত ধারণা। অনেকের চোখে এটি একবিংশ শতাব্দীর রাজনৈতিক চালচিত্র হিসেবে মনে হলেও কিন্তু এর বীজ বপন হয়েছিল ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগেই। এবং এই বীজ বপনের প্রধান কারিগর ছিলেন তিনজন দার্শনিক-মনস্বী বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বাল গঙ্গাধর তিলক ও স্বামী বিবেকানন্দ। তাঁরা তিনজনেই নিজ নিজ উপায়ে ভারতীয় ধর্ম-দর্শনের মধ্য দিয়ে এক জাতীয় চেতনার পুনর্গঠন করতে চেয়েছিলেন। তবে প্রশ্ন হলো এই চেতনা কি কেবল মুক্তির বা আত্মজাগরণের পথ, নাকি এর মধ্যেই ছিল এক বিশেষধর্মী জাতীয়তাবাদের সংকেত?

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮–১৮৯৪) ছিলেন উপনিবেশিক ভারতের প্রথম সাহিত্যিক যিনি “জাতীয়তা” শব্দটিকে ধর্মীয় রূপকে রূপান্তরিত করেন। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস আনন্দমঠ যেখানে “বন্দে মাতরম্” গানটি প্রথম ব্যবহৃত হয় ও একটি কাল্পনিক সন্ন্যাসী বিদ্রোহের মাধ্যমে এক ‘দেবী-মাতৃ’ ভারতের চিত্র তুলে ধরে। এখানে ‘ভারত’ আর নিছক ভৌগোলিক সত্তা নয়, বরং এক পূজনীয় মাতৃমূর্তি, যাঁর মুক্তির জন্য আত্মত্যাগ আবশ্যক।

এই মাতৃমূর্তি একাধারে দুর্গা, ভারতভূমি ও জাতিসত্তা তিনে মিলে এক। ফলে প্রশ্ন উঠেছে বঙ্কিম ধর্মীয় প্রতীকে জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা করলেন, নাকি জাতীয়তাবাদকে ধর্মের আড়ালে উপস্থাপন করলেন? বঙ্কিমের চিন্তায় হিন্দুধর্ম ছিল শূন্য নয়, বরং সামাজিক পুনর্জাগরণের মাধ্যম। কিন্তু এই পুনর্জাগরণে মুসলিম ও অন্যান্য অনধিকারভুক্ত জনগোষ্ঠী কোথায় দাঁড়ায়, তা নিয়ে স্পষ্ট দ্বিধা দেখা যায়।

বাল গঙ্গাধর তিলক (১৮৫৬–১৯২০) ছিলেন ধর্মীয় ও রাজনীতির এমন এক মিলনের প্রতীক, যিনি সরাসরি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধর্মকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি “স্বরাজ আমার জন্মসিদ্ধ অধিকার” একদিকে রাজনৈতিক দাবির ভাষা, অন্যদিকে ধর্মীয় কর্তব্যের উচ্চারণ।

তিলকের গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় অবদান ছিল গীতা-র ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে ‘কর্মযোগ’-কে জাতীয় কর্তব্যে রূপান্তরিত করা। তিনি যুদ্ধ-প্রস্তুতির নৈতিক বৈধতা হিসেবে গীতার কুর্মদর্শনকে ব্যবহার করেন যেখানে “ধর্ম” মানে আত্মিক মুক্তি নয়, বরং রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্য সংঘর্ষ। তাঁর গণেশ পূজা ও শিবাজী উৎসব ছিল জন-আন্দোলনের সাংস্কৃতিক মুখোশ। এগুলো হিন্দু প্রতীককে রাজনৈতিক চেতনায় রূপান্তরিত করে। এইভাবে তিলকের দর্শনে “হিন্দু” পরিচয়টি একটি সংগ্রামী, পুরুষতান্ত্রিক ও একাত্ম জাতির প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে, যেখানে ‘অপর’ মানেই মুসলিম বা বিদেশী শাসক। তাঁর চিন্তায় ধর্ম ছিল একতা নয়,এক বিভাজনের হাতিয়ার।

স্বামী বিবেকানন্দ (১৮৬৩–১৯০২) আন্তর্জাতিকভাবে হিন্দুধর্মের মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত হলেও তাঁর দর্শন ছিল মূলত আত্মপরিচয় ও জাতীয় চেতনার অভ্যন্তরীণ অন্বেষণ। তিনি “মানুষের সেবা মানেই ঈশ্বরের সেবা” দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিও এক পর্যায়ে একটি শক্তিশালী জাতি নির্মাণের প্রচেষ্টায় রূপ নেয়।

“আমরা হিন্দু, আমাদের গর্বিত হওয়া উচিত” এই উক্তির মাঝে বিবেকানন্দ জাতিগত আত্মসম্মানের আবেগকে জাগ্রত করতে চেয়েছেন। কিন্তু এই আত্মসম্মান কাকে কেন্দ্র করে? এখানে “হিন্দু” পরিচয় একটি সাংস্কৃতিক জাতিসত্তার মূল ভিত্তি হিসেবে দাঁড়ায়। বিবেকানন্দ একটি প্রাচীন ও গৌরবময় জাতির আত্মপরিচয় তুলে ধরতে ‘বেদান্ত’ ও ‘যোগ’ দর্শনকে ব্যবহার করেন, যা ঔপনিবেশিক আধিপত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করেনি। কিন্তু এই আত্মপরিচয় কতটা “সমন্বয়বাদী” আর কতটা “বর্জনবাদী” তা আজও বিতর্কের বিষয়।

বঙ্কিম, তিলক ও বিবেকানন্দ তাঁরা কেউ রাজনৈতিক নেতার ভূমিকায় ছিলেন না, কিন্তু তাঁদের চিন্তা একটি ধর্মনির্ভর রাজনৈতিক আদর্শ গড়ে তোলে। এই তিনটি ভাবধারার সম্মিলনে যে “হিন্দু জাতীয়তাবাদ” গঠিত হয়, তা ছিল বঙ্কিমের হাত ধরে ধর্মীয় প্রতীকে আবেগ জাগানো, তিলকের চিন্তায় ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার করা, আর বিবেকানন্দের আধ্যাত্মিক জাতিসত্তা নির্মাণ।

এই জাতীয়তাবাদ প্রথমে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের হাতিয়ার হলেও কিন্তু পরবর্তীকালে তা হয়ে ওঠে সাংস্কৃতিক আধিপত্যের একরৈখিক প্রচেষ্টা, যেখানে বহুত্ববাদী সমাজের অন্য সম্প্রদায়ের স্থান সীমিত হতে থাকে।

দর্শন নাকি আদর্শিক মোড়ক?
আজকের ভারতবর্ষে হিন্দু জাতীয়তাবাদ একটি রাজনৈতিক সত্য। কিন্তু এর শিকড় যে কত গভীরে, তা বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হয় বঙ্কিম, তিলক ও বিবেকানন্দের দর্শনের দিকেও। তাঁরা কি সচেতনভাবে একটি বিশেষধর্মী রাষ্ট্রের ভাবনা দিয়েছিলেন? নাকি তাঁদের দর্শন পরে একরৈখিক ব্যাখ্যায় ব্যবহার করা হয়েছে?

একথা বলা যায় এই তিনজনই উপনিবেশিক চেতনার বিরুদ্ধে এক বিকল্প ভারতীয় আত্মপরিচয়ের সন্ধান করেছিলেন। তবে সেই সন্ধান ধর্মীয় সত্তায় এতটাই আবদ্ধ ছিল, যে তা একপ্রকার দার্শনিক সমন্বয়ের বদলে, আদর্শিক ছাঁকনি হয়ে ওঠে। দর্শনের ভাষায় বললে এ ছিল এক ontological collapse, যেখানে নিদিষ্ট ধর্মীয় চেতনাকে জাতিসত্তার একমাত্র উৎস ভাবা হয়েছে এবং তাতেই রচিত হয়েছে এক শ্রেণির জাতীয়তাবাদের দার্শনিক ভিত্তি।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব টিকে থাকার লড়াই

মানব ইতিহাসে শিল্পবিপ্লব এসেছে চার ধাপে। প্রথমে ছিল বাষ্পীয় যন্ত্রের যুগ, এরপর বিদ্যুৎ ও উৎপাদন, তৃতীয় ধাপে এসেছে কম্পিউটার ও অটোমেশন। আর এখন আমরা দাঁড়িয়ে আছি চতুর্থ শিল্পবিপ্লব (Fourth Industrial Revolution)-এর দোরগোড়ায়, যেখানে প্রযুক্তি শুধু কাজ নয়, মানবজীবন, সমাজব্যবস্থা, অর্থনীতি এমনকি আমাদের চিন্তাধারাকেও রূপান্তর করছে।

এই চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের মূলে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), রোবটিক্স, ইন্টারনেট অফ থিংস (IoT), বিগ ডেটা, ব্লকচেইন, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, বায়োটেকনোলজি, 3D প্রিন্টিং এবং জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং।

এর মূল বৈশিষ্ট্য হলো সিস্টেমগুলো এখন স্বয়ংক্রিয়, বুদ্ধিমান এবং একে অপরের সাথে সংযুক্ত। প্রযুক্তি এখন শুধু টুল নয়, নিজে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম একধরনের নতুন সত্তা।

এআই এখন আর শুধু সিনেমার বিষয় নয় এটা আপনার ফোনের ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট, গুগলের সার্চ এলগরিদম, ব্যাংকের ফ্রড ডিটেকশন, এমনকি হাসপাতালের রোগ নির্ণয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে। রোবট এখন উৎপাদনশিল্পে শুধু নয়, চিকিৎসা, কৃষি ও ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবেও কাজে লাগছে। IoT-এর মাধ্যমে ফ্রিজ, গাড়ি, এমনকি ঘরের বাতিও এখন ইন্টারনেটের সাথে সংযুক্ত। স্মার্ট হাউজ নিজের মত করে ভাবতে শিখছে।

সব মিলিয়ে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এমন একটি সময় নিয়ে এসেছে, যেখানে কাজের সংজ্ঞাই বদলে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে অনেক প্রচলিত পেশা বিলুপ্ত হবে, আবার নতুন নতুন পেশার জন্ম হবে যেগুলোর নাম আমরা এখনো জানি না।

বিশ্বব্যাপী স্কিল গ্যাপ তৈরি হচ্ছে, প্রচলিত শিক্ষা বা দক্ষতা আর যথেষ্ট নয়, এখন প্রয়োজন ডিজিটাল লিটারেসি, ডেটা এনালিটিক্স, কোডিং এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা।

বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ডিজিটাল রূপান্তরের পথে এগোচ্ছে। “ডিজিটাল বাংলাদেশ” উদ্যোগ, হাইটেক পার্ক নির্মাণ, তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রযুক্তিতে যুক্ত করা সবই এর ইঙ্গিত। তবে সমস্যা হলো আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো এই বিপ্লবের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। অনেকেই এখনো জানে না AI কীভাবে কাজ করে, বা IoT কেন গুরুত্বপূর্ণ।

শ্রমশক্তির বড় অংশ এখনও অদক্ষ বা আধা-দক্ষ, ফলে যন্ত্র বিপ্লব যতই হোক, তার সুফল তারা পাচ্ছে না। এটি সমাজে নতুন বৈষম্যও তৈরি করতে পারে।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব যেমন অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে পারে, তেমনি বাড়াতে পারে বেকারত্ব। যেমন, একটি AI সফটওয়্যার একসাথে হাজার হাজার ডেটা এনালিস্টের কাজ করতে পারে। তবে এটা মানেই এই নয় যে চাকরি হারিয়ে যাবে বরং চাকরি ধাঁচ বদলাবে। যারা প্রস্তুত তারা সামনের সুযোগগুলো কাজে লাগাবে, যারা প্রস্তুত না তারা পিছিয়ে পড়বে।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মানে শুধু প্রযুক্তি নয়, এটি এক সামগ্রিক মানব-রূপান্তরের সময়। এখনই প্রয়োজন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিকল্পনা, যাতে মানুষ প্রযুক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হয়ে প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে।

“The Godfather এক অসাধারণ জাদুকরী নির্মাণ, যে সিনেমা আমাদের মাফিয়াদের নিজস্ব শর্তেই চিন্তা করতে বাধ্য করে” : রজার এবার্ট, লেখক ও চলচ্চিত্র সমালোচক

“দ্য গডফাদার” সিনেমার সম্পূর্ণ গল্পটাই এক বন্ধ, সীমাবদ্ধ জগতের ভেতরে আবদ্ধ। আর ঠিক সেই কারণেই আমরা এমন সব চরিত্রের প্রতি সহানুভূতি অনুভব করি, যারা মূলত অপরাধজগতের লোক এবং নীতিগতভাবে খারাপ। মারিও পিউজো ও ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলার রচনায় এক অসাধারণ জাদুকরী কৌশল আছে, যেখানে মাফিয়াদেরকে আমরা বিচার করি তাদের নিজেদের নিয়ম অনুযায়ী।

ডন ভিটো কর্লিওনে (মার্লন ব্র্যান্ডো) আমাদের কাছে এক সহানুভূতিশীল ও প্রশংসনীয় চরিত্রে পরিণত হন। সারা সিনেমা জুড়ে তিনি একজন আজীবন অপরাধী হওয়া সত্ত্বেও এমন কিছু করেন না যা দর্শকের দৃষ্টিতে স্পষ্টতই নিন্দনীয়।

এই চলচ্চিত্রে আমরা সংগঠিত অপরাধের কোন নাগরিক শিকারকে দেখতে পাই না। নাই কোনো নারীকে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করার দৃশ্য, নাই কোন জুয়া বা চাঁদাবাজিতে ধ্বংস হওয়া জীবন। একমাত্র যে পুলিশ অফিসার মুখ্যভাবে কথা বলেন, তিনিও একজন দুর্নীতিগ্রস্ত।

এই গল্পটা মাফিয়া জগতকে ভেতর থেকে তুলে ধরে। সেটাই এর মোহ, এর আকর্ষণ, এর চরম বাস্তবতাবোধ এবং সম্ভবত এটাই মাফিয়াদের নিয়ে জনমনে আজও প্রচলিত ধারণার মূল ভিত্তি। এখানে বাইরের দুনিয়ার পরিবর্তে একটি পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতাকাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে ন্যায়বিচার ও কর্তৃত্ব সবই আসে “গডফাদার”-এর হাত ধরে। এখানে একমাত্র “দুষ্ট” মানুষ হল বিশ্বাসভঙ্গকারী। মাইকেল (আল পাচিনো) একটি মূল কথা বলেন: “কখনও পরিবারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিও না।”

সিনেমার প্রথম দৃশ্যেই আমরা একটি অন্ধকার, জানালাবদ্ধ ঘরের ভেতর প্রবেশ করি। ভিটো কর্লিওনের মেয়ের বিয়ের দিন এবং সিসিলীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী এমন দিনে ডনকে যে কোনো যুক্তিসঙ্গত অনুরোধ পূরণ করতে হয়। এক ব্যক্তি এসেছেন তাঁর মেয়ের ধর্ষকের শাস্তির আবেদন নিয়ে। ডন তাকে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি প্রথমে পুলিশের কাছে গেলেন কেন। লোকটি বলে, “আমি একজন ভালো আমেরিকানের মতোই পুলিশের কাছে গিয়েছিলাম।” ডনের উত্তরে আমরা পুরো ছবির নৈতিক কাঠামো পেয়ে যাই: “তুমি আমার কাছে আগে কেন আসো নি? আমি কখনো কি তোমার সঙ্গে অবিচার করেছি যে তুমি আমাকে এতটা অসম্মান দেখালে? তুমি যদি বন্ধুর মতো আমার কাছে আসতে, তাহলে তোমার মেয়েকে ধ্বংসকারী ওই লোকটা আজই কষ্ট পেত। আর যদি হঠাৎ করে একজন সৎ মানুষের শত্রু তৈরি হয়… তবে তারা আমার শত্রুও হবে। তখন তারা তোমাকে ভয় পাবে।”

বিয়ের দিনটির সময় এই অন্ধকার অফিসঘরে আরও দু’টি দৃশ্য ঘটে, যেগুলোকে বাইরের আলোকোজ্জ্বল বিয়ের অনুষ্ঠানের সঙ্গে কাটিয়ে দেখানো হয়। এই দৃশ্যগুলোর মধ্য দিয়ে আমরা প্রায় সব মুখ্য চরিত্রদের চিনে ফেলি এবং তাদের স্বভাব সম্পর্কে জরুরি ধারণা পাই। কপোলা এই দৃশ্য নির্মাণে এমন কৌশলী দক্ষতা দেখান যে দর্শকরা অবলীলায় কর্লিওনে পরিবারের জগতে ঢুকে পড়ে।

এই সিনেমার চিত্রনাট্যে কোনো প্রচলিত হলিউড ফর্মুলা নেই, বরং প্রাচীন গ্রিক ট্র্যাজেডির মতো প্রজন্মের মধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তরের রূপকাঠামো অনুসরণ করে। পুরো সিনেমা জুড়ে যত ছোট ছোট দৃশ্য আছে, সেগুলো পরে বড় ঘটনাকে পরিণত করার জন্য নিখুঁতভাবে সাজানো। যেমন ধরুন: জনি ফন্টেইন নামক এক মলিন গায়ক যখন ডনের কাছে এসে কাঁদে, তখন হয়তো আমরা অবাক হই না। কিন্তু পরে যখন হলিউড প্রযোজক ঘুম থেকে উঠে দেখে তাঁর বিছানায় ঘোড়ার কাটা মাথা পড়ে আছে, তখন বুঝি এই কান্নার পেছনে কি নির্মম পরিকল্পনা লুকিয়ে ছিল। কিংবা যে মৃতদেহকে সাজিয়ে দিতে বলা হয়েছিল, সেই অনুরোধটাও ছিল এক সময়কার ঋণ শোধের রূপ—কিন্তু তা সহিংস নয়, বরং একজন পিতার আকুতি—তাঁর স্ত্রীর যেন তাঁদের মৃত ছেলেকে বিকৃত অবস্থায় দেখতে না হয়।

আর সনি (জেমস কান) যেভাবে এক নারীর ভুল ফোনকলের ফাঁদে পড়ে খুন হয়, সেই ঘটনাটাও এত সূক্ষ্মভাবে সাজানো যে তা বুঝতে হলে দর্শককে আবার সিনেমার প্রথম দিকে ফিরে যেতে হয়।

এবার প্রশ্ন, ভিটো কর্লিওনের স্ত্রীর নাম কী? তাঁর চরিত্রটি পুরো সিনেমায় প্রায় অনুপস্থিত। তিনি শুধুমাত্র ছবি তোলার সময় পাশে দাঁড়ানো এক সিসিলিয়ান দাদি, ঘরের কোনো আলোচনায়, কোনো সিদ্ধান্তে তাঁর অংশ নেই। “দ্য গডফাদার”-এ নারীদের জন্য তেমন কোনো জায়গা নেই। সনি নারীদের ব্যবহার করে ফেলে দেয়। নিজের স্ত্রীকেও গুরুত্ব দেয় না। ডনের মেয়ে কনি (তালিয়া শায়ার)-এর স্বামীকেও পরিবারের ব্যবসায় ঢুকতে দেওয়া হয় না। শেষে সেই লোকটি মারা গেলে, মাইকেল ঠান্ডা মাথায় তাঁর বোনকে মিথ্যে বলে।

টাইটেলের সবচেয়ে বড় ব্যঙ্গাত্মক দিক হলো এটি যে কেবল বাবাকেই বোঝায় না, বরং শেষমেশ ছেলেকে বোঝায়। মাইকেল প্রথমে পারিবারিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল না। সে একজন ‘আমেরিকান মেয়ে’ কেই (ডায়ান কিটন)-কে বিয়ে করতে চেয়েছিল। কিন্তু বাবার জীবন বাঁচাতে গিয়ে হাসপাতালে তাঁর বিছানা সরিয়ে রেখে সে যখন বলে “আমি এখন তোমার সঙ্গে আছি”, তখনই তাঁর জীবনের বাঁক বদলে যায়।

পরে সে সিসিলি পালিয়ে গিয়ে এক সুন্দরী মেয়েকে বিয়ে করে, নাম অ্যাপোলোনিয়া। দুজনের ভাষা আলাদা, কিন্তু প্রেমের ভাষা সেখানে বাঁধা হয় না। কিন্তু এই বিয়েটিও টেকে না। অ্যাপোলোনিয়া মারা যান, আর মাইকেল আমেরিকায় ফিরে এসে আবার কেই-কে খুঁজে বের করে। সে কি কেই-কে অ্যাপোলোনিয়ার কথা বলে? ছবির জন্য তা গুরুত্বপূর্ণ না। গুরুত্বপূর্ণ হলো পরিবারের প্রতি আনুগত্য।

এই সিনেমায় সততা নয়, বরং আনুগত্যই সবচেয়ে বড় মূল্য। মাইকেল এমনকি টম হেগেনকেও বলে না যে, সে অন্য মাফিয়া নেতাদের খুন করতে যাচ্ছে। এই খুনগুলোর মধ্যেই আসে বিখ্যাত “বাপ্তিজম গণহত্যা” দৃশ্য। যেখানে মাইকেল চার্চে গিয়ে এক শিশুর ধর্মগুরুর দায়িত্ব নেন, আর সেই সময়েই ঘটে সবচেয়ে রক্তাক্ত হত্যাকাণ্ডগুলো। একইসাথে সে হয়ে ওঠে দুই অর্থে “গডফাদার”।

ভিটো কর্লিওনে হচ্ছেন সিনেমার নৈতিক কেন্দ্রবিন্দু। তিনি বয়সে প্রবীণ, জ্ঞানী এবং মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে। তাঁর মতে মদ, জুয়া, এমনকি নারীদের নিয়ে ব্যবসা সমাজ মেনে নেয়। কিন্তু মাদক হলো নিচু পর্যায়ের পাপ। মাফিয়া নেতাদের এক বৈঠকে তাঁর যুক্তিপূর্ণ বক্তৃতাটি সিনেমার অন্যতম সেরা দৃশ্য। এই সিনেমা আসলে আমাদের এমনভাবে তৈরি করে যে, ডন মারা গেলে আমরা অনুভব করি এক মহান মানুষ চলে গেলেন।

গর্ডন উইলিসের সিনেমাটোগ্রাফি বিখ্যাত তার অন্ধকার, গাঢ় সৌন্দর্যের জন্য। এই দৃশ্যাবলিতে মুখের রেখা, চোখের গহ্বর এবং স্থবিরতা এমনভাবে ধরা হয় যে তা এক ঘোরতর বাস্তবতা তৈরি করে। যেমন টেসিও চরিত্রে অ্যাবে ভিগোডা এক দানবাকৃতির, মুখে স্থায়ী ছায়া—যিনি প্রথম দেখা দেন একটি ছোট মেয়েকে নাচ শেখাতে শেখাতে। কিন্তু পরে তিনি হয়ে ওঠেন এক ভয়ঙ্কর উপস্থিতি। আর ছবির একদম শেষে, যখন তিনি ধরা পড়েন, তখন প্রথমবারের মতো তাঁকে উজ্জ্বল আলোতে দেখানো হয় একজন কাঁপতে থাকা, প্রাণভিক্ষা করা মানুষ হিসেবে।

ব্র্যান্ডোর অভিনয় সর্বজনস্বীকৃতভাবে কিংবদন্তিতুল্য। তাঁর গাল ফুলিয়ে কথা বলা বা আদুরে বিড়াল নিয়ে বসা এসব কৌশল তিনি ব্যবহার করেছেন ঠিকই, কিন্তু চরিত্রের গভীরতাকে তিনি অভিনয়ের চেয়ে বড় করে তোলেন। যেমন শেষদিকে তিনি যখন বলেন—“যে লোক তোমার সঙ্গে দেখা করার আয়োজন করতে বলবে, সে-ই বিশ্বাসঘাতক,” তখন আমরা তাঁকে একজন বার্ধক্যপ্রাপ্ত, বারে বারে কথা পুনরাবৃত্তি করা মানুষ ভাবি ঠিকই তবু বিশ্বাস করি, তিনি ঠিকই বলছেন।

অন্যদিকে পাচিনো মাইকেল চরিত্রে এমন আত্মসংযমী অভিনয় করেন যে আমরা ভুলে যাই তিনি একজন অভিনেতা। মনে হয় তিনিই সত্যিকারের মাইকেল কর্লিওনে। আর ঠিক এভাবেই, কপোলা আমাদের এত গভীরে নিয়ে যান যে সিনেমার শেষ দৃশ্যে আমাদের মনে হয় সবকিছু হয়তো ভালো হতো, যদি আমরা গডফাদারের কথা শুনতাম।

থাই-কাম্বোডিয়া সীমান্তে জাতীয়তাবাদ, সংস্কৃতি ও রাজনীতির সংঘর্ষে পুরনো দ্বন্দ্বের নতুন বিস্ফোরণ

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে যে কয়েকটি সীমান্ত দ্বন্দ্ব অনিরসনযোগ্য রয়ে গেছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার সীমান্ত বিরোধ। এই দ্বন্দ্ব কখনো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের রূপ না পেলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উভয় পক্ষের জাতীয়তাবাদী আবেগ ও ঐতিহাসিক স্মৃতি এই বিরোধকে পুনরুজ্জীবিত করে তুলেছে। আজকের সংঘাত মূলত একটি প্রাচীন মন্দির, বিভ্রান্তিকর উপনিবেশিক মানচিত্র এবং আধুনিক রাজনৈতিক উত্তেজনার সংমিশ্রণ।

এই অঞ্চলটি এক সময় খমের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা ৯ম থেকে ১৫শ শতাব্দীর মধ্যে আধুনিক কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের বিস্তৃত অংশ শাসন করত। খমের সাম্রাজ্যের সাংস্কৃতিক ও স্থাপত্যিক উত্তরাধিকার এখন কম্বোডিয়ার জাতীয় গর্ব, বিশেষ করে অংকরভাট ও অন্যান্য খমের মন্দির। কিন্তু বহু প্রাচীন খমের মন্দির বর্তমানে থাইল্যান্ডের ভূখণ্ডে অবস্থিত, যেটি দীর্ঘদিন ধরে একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের জন্ম দিয়েছে।

বিশ শতকের গোড়ার দিকে যখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া উপনিবেশিক শক্তির কবলে পড়ে, তখন ইন্দোচীন (বর্তমান কেম্বোডিয়া, লাওস ও ভিয়েতনাম) ও থাইল্যান্ডের মধ্যে একাধিক চুক্তির মাধ্যমে সীমান্ত নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু অনেক স্থানেই এই সীমান্তরেখা অস্পষ্ট থেকে যায়। উপনিবেশিক মানচিত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থান, যেমন “তা মিউন থম” মন্দির, “প্রাহ উইহেয়ার” মন্দির ইত্যাদি কখনো একপক্ষ, কখনো অন্য পক্ষের ভূখণ্ড বলে চিহ্নিত হয়।

১৯৬২ সালে প্রাহ উইহেয়ার মন্দির নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালত (ICJ) কেম্বোডিয়ার পক্ষে রায় দেয়, কিন্তু চারপাশের ভূমি অর্থাৎ মন্দির সংলগ্ন জমি নিয়ে বিতর্ক থেকেই যায়। এ বিষয়েই ২০০৮ সালের দিকে দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

২০১১ সালে মিউন থম ও প্রাহ উইহেয়ার এলাকায় আর্টিলারি গুলিবিনিময় করে দুই দেশের মধ্যে সংঘর্ষ চূড়ান্ত রূপ নেয়। অন্তত ১৮ জন নিহত হয় এবং হাজার হাজার মানুষ সীমান্ত অঞ্চল থেকে পালিয়ে যায়। এরপর অস্থায়ীভাবে বিরতি হলেও, সামরিক উপস্থিতি এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলে স্থলমাইন পুঁতে রাখা এই উত্তেজনার ছায়া টিকিয়ে রাখে।

২০২৫ সালের জুলাই মাসে এই দ্বন্দ্ব আবার তীব্র আকার ধারণ করে। থাইল্যান্ড অভিযোগ করে যে, কম্বোডিয়ান সেনাবাহিনী সীমান্ত অতিক্রম করে থাই ভূখণ্ডে হামলা চালায় এবং ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে তাদের একজন সৈন্য গুরুতর আহত হয়। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় থাই বিমান বাহিনী এফ-১৬ যুদ্ধবিমান দিয়ে কেম্বোডিয়ার অবস্থানে বোমা বর্ষণ করে, যার ফলে কয়েকজন কম্বোডিয়ান সৈন্য নিহত হয়।

এই ঘটনার পর উভয় দেশ রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে, কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং সীমান্তে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করে। বাস্তুচ্যুত হয় প্রায় চল্লিশ হাজার মানুষ। স্কুল, হাসপাতাল বন্ধ হয়ে যায়। দুই পক্ষই নিজেদের ‘আত্মরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া’ বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষের জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলো এই সংঘাতকে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করছে। থাইল্যান্ডে সামরিকপন্থী সরকার ও কেম্বোডিয়ার কর্তৃত্ববাদী প্রশাসন উভয়ই নিজেদের দেশের অভ্যন্তরীণ চাপ থেকে দৃষ্টি সরাতে এই সংকটকে জিইয়ে রাখতে পারে। এ অবস্থায় সীমান্ত সংঘর্ষ যদি আরও কয়েক ধাপে উস্কে ওঠে, তাহলে তা একটি পূর্ণাঙ্গ সীমান্ত যুদ্ধের রূপ নিতে পারে।

এই সম্ভাব্য যুদ্ধ কেবল দুই দেশ নয়, বরং পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে। ASEAN এখন পর্যন্ত দৃশ্যত নীরব, তবে সংঘাত বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চীন, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়া মধ্যস্থতায় আগ্রহ দেখাতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তিরাও থাইল্যান্ডের ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘তা মিউন থম’ ও আশেপাশের অঞ্চলকে “সাংস্কৃতিক ও শান্তি অঞ্চল” ঘোষণা দিয়ে উভয় দেশের যৌথ প্রশাসনের অধীনে আনলেই হয়ত উত্তেজনা প্রশমিত হতে পারে। কিন্তু এমন একটি সমাধান তখনই সম্ভব যখন উভয় পক্ষই রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল এবং জনগণের কণ্ঠকে মূল্যায়ন করে।

থাইল্যান্ড–কেম্বোডিয়ার এই সীমান্ত সংঘাত কেবল জমি নিয়ে নয়; এটি ইতিহাস, পরিচয়, জাতীয় অহংকার এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি বহুমাত্রিক দ্বন্দ্ব। যদি তীব্র সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়ে, তবে এটি নিছক সীমান্ত সমস্যা থেকে বেরিয়ে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকটের জন্ম দিতে পারে। একে শুধু অস্ত্র দিয়ে নয়, ইতিহাস, কূটনীতি এবং মানবিক বোধ দিয়ে মোকাবিলা করাই এখন সময়ের দাবি।