“দ্য গডফাদার” সিনেমার সম্পূর্ণ গল্পটাই এক বন্ধ, সীমাবদ্ধ জগতের ভেতরে আবদ্ধ। আর ঠিক সেই কারণেই আমরা এমন সব চরিত্রের প্রতি সহানুভূতি অনুভব করি, যারা মূলত অপরাধজগতের লোক এবং নীতিগতভাবে খারাপ। মারিও পিউজো ও ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলার রচনায় এক অসাধারণ জাদুকরী কৌশল আছে, যেখানে মাফিয়াদেরকে আমরা বিচার করি তাদের নিজেদের নিয়ম অনুযায়ী।
ডন ভিটো কর্লিওনে (মার্লন ব্র্যান্ডো) আমাদের কাছে এক সহানুভূতিশীল ও প্রশংসনীয় চরিত্রে পরিণত হন। সারা সিনেমা জুড়ে তিনি একজন আজীবন অপরাধী হওয়া সত্ত্বেও এমন কিছু করেন না যা দর্শকের দৃষ্টিতে স্পষ্টতই নিন্দনীয়।
এই চলচ্চিত্রে আমরা সংগঠিত অপরাধের কোন নাগরিক শিকারকে দেখতে পাই না। নাই কোনো নারীকে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করার দৃশ্য, নাই কোন জুয়া বা চাঁদাবাজিতে ধ্বংস হওয়া জীবন। একমাত্র যে পুলিশ অফিসার মুখ্যভাবে কথা বলেন, তিনিও একজন দুর্নীতিগ্রস্ত।
এই গল্পটা মাফিয়া জগতকে ভেতর থেকে তুলে ধরে। সেটাই এর মোহ, এর আকর্ষণ, এর চরম বাস্তবতাবোধ এবং সম্ভবত এটাই মাফিয়াদের নিয়ে জনমনে আজও প্রচলিত ধারণার মূল ভিত্তি। এখানে বাইরের দুনিয়ার পরিবর্তে একটি পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতাকাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে ন্যায়বিচার ও কর্তৃত্ব সবই আসে “গডফাদার”-এর হাত ধরে। এখানে একমাত্র “দুষ্ট” মানুষ হল বিশ্বাসভঙ্গকারী। মাইকেল (আল পাচিনো) একটি মূল কথা বলেন: “কখনও পরিবারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিও না।”
সিনেমার প্রথম দৃশ্যেই আমরা একটি অন্ধকার, জানালাবদ্ধ ঘরের ভেতর প্রবেশ করি। ভিটো কর্লিওনের মেয়ের বিয়ের দিন এবং সিসিলীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী এমন দিনে ডনকে যে কোনো যুক্তিসঙ্গত অনুরোধ পূরণ করতে হয়। এক ব্যক্তি এসেছেন তাঁর মেয়ের ধর্ষকের শাস্তির আবেদন নিয়ে। ডন তাকে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি প্রথমে পুলিশের কাছে গেলেন কেন। লোকটি বলে, “আমি একজন ভালো আমেরিকানের মতোই পুলিশের কাছে গিয়েছিলাম।” ডনের উত্তরে আমরা পুরো ছবির নৈতিক কাঠামো পেয়ে যাই: “তুমি আমার কাছে আগে কেন আসো নি? আমি কখনো কি তোমার সঙ্গে অবিচার করেছি যে তুমি আমাকে এতটা অসম্মান দেখালে? তুমি যদি বন্ধুর মতো আমার কাছে আসতে, তাহলে তোমার মেয়েকে ধ্বংসকারী ওই লোকটা আজই কষ্ট পেত। আর যদি হঠাৎ করে একজন সৎ মানুষের শত্রু তৈরি হয়… তবে তারা আমার শত্রুও হবে। তখন তারা তোমাকে ভয় পাবে।”
বিয়ের দিনটির সময় এই অন্ধকার অফিসঘরে আরও দু’টি দৃশ্য ঘটে, যেগুলোকে বাইরের আলোকোজ্জ্বল বিয়ের অনুষ্ঠানের সঙ্গে কাটিয়ে দেখানো হয়। এই দৃশ্যগুলোর মধ্য দিয়ে আমরা প্রায় সব মুখ্য চরিত্রদের চিনে ফেলি এবং তাদের স্বভাব সম্পর্কে জরুরি ধারণা পাই। কপোলা এই দৃশ্য নির্মাণে এমন কৌশলী দক্ষতা দেখান যে দর্শকরা অবলীলায় কর্লিওনে পরিবারের জগতে ঢুকে পড়ে।
এই সিনেমার চিত্রনাট্যে কোনো প্রচলিত হলিউড ফর্মুলা নেই, বরং প্রাচীন গ্রিক ট্র্যাজেডির মতো প্রজন্মের মধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তরের রূপকাঠামো অনুসরণ করে। পুরো সিনেমা জুড়ে যত ছোট ছোট দৃশ্য আছে, সেগুলো পরে বড় ঘটনাকে পরিণত করার জন্য নিখুঁতভাবে সাজানো। যেমন ধরুন: জনি ফন্টেইন নামক এক মলিন গায়ক যখন ডনের কাছে এসে কাঁদে, তখন হয়তো আমরা অবাক হই না। কিন্তু পরে যখন হলিউড প্রযোজক ঘুম থেকে উঠে দেখে তাঁর বিছানায় ঘোড়ার কাটা মাথা পড়ে আছে, তখন বুঝি এই কান্নার পেছনে কি নির্মম পরিকল্পনা লুকিয়ে ছিল। কিংবা যে মৃতদেহকে সাজিয়ে দিতে বলা হয়েছিল, সেই অনুরোধটাও ছিল এক সময়কার ঋণ শোধের রূপ—কিন্তু তা সহিংস নয়, বরং একজন পিতার আকুতি—তাঁর স্ত্রীর যেন তাঁদের মৃত ছেলেকে বিকৃত অবস্থায় দেখতে না হয়।
আর সনি (জেমস কান) যেভাবে এক নারীর ভুল ফোনকলের ফাঁদে পড়ে খুন হয়, সেই ঘটনাটাও এত সূক্ষ্মভাবে সাজানো যে তা বুঝতে হলে দর্শককে আবার সিনেমার প্রথম দিকে ফিরে যেতে হয়।
এবার প্রশ্ন, ভিটো কর্লিওনের স্ত্রীর নাম কী? তাঁর চরিত্রটি পুরো সিনেমায় প্রায় অনুপস্থিত। তিনি শুধুমাত্র ছবি তোলার সময় পাশে দাঁড়ানো এক সিসিলিয়ান দাদি, ঘরের কোনো আলোচনায়, কোনো সিদ্ধান্তে তাঁর অংশ নেই। “দ্য গডফাদার”-এ নারীদের জন্য তেমন কোনো জায়গা নেই। সনি নারীদের ব্যবহার করে ফেলে দেয়। নিজের স্ত্রীকেও গুরুত্ব দেয় না। ডনের মেয়ে কনি (তালিয়া শায়ার)-এর স্বামীকেও পরিবারের ব্যবসায় ঢুকতে দেওয়া হয় না। শেষে সেই লোকটি মারা গেলে, মাইকেল ঠান্ডা মাথায় তাঁর বোনকে মিথ্যে বলে।
টাইটেলের সবচেয়ে বড় ব্যঙ্গাত্মক দিক হলো এটি যে কেবল বাবাকেই বোঝায় না, বরং শেষমেশ ছেলেকে বোঝায়। মাইকেল প্রথমে পারিবারিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল না। সে একজন ‘আমেরিকান মেয়ে’ কেই (ডায়ান কিটন)-কে বিয়ে করতে চেয়েছিল। কিন্তু বাবার জীবন বাঁচাতে গিয়ে হাসপাতালে তাঁর বিছানা সরিয়ে রেখে সে যখন বলে “আমি এখন তোমার সঙ্গে আছি”, তখনই তাঁর জীবনের বাঁক বদলে যায়।
পরে সে সিসিলি পালিয়ে গিয়ে এক সুন্দরী মেয়েকে বিয়ে করে, নাম অ্যাপোলোনিয়া। দুজনের ভাষা আলাদা, কিন্তু প্রেমের ভাষা সেখানে বাঁধা হয় না। কিন্তু এই বিয়েটিও টেকে না। অ্যাপোলোনিয়া মারা যান, আর মাইকেল আমেরিকায় ফিরে এসে আবার কেই-কে খুঁজে বের করে। সে কি কেই-কে অ্যাপোলোনিয়ার কথা বলে? ছবির জন্য তা গুরুত্বপূর্ণ না। গুরুত্বপূর্ণ হলো পরিবারের প্রতি আনুগত্য।
এই সিনেমায় সততা নয়, বরং আনুগত্যই সবচেয়ে বড় মূল্য। মাইকেল এমনকি টম হেগেনকেও বলে না যে, সে অন্য মাফিয়া নেতাদের খুন করতে যাচ্ছে। এই খুনগুলোর মধ্যেই আসে বিখ্যাত “বাপ্তিজম গণহত্যা” দৃশ্য। যেখানে মাইকেল চার্চে গিয়ে এক শিশুর ধর্মগুরুর দায়িত্ব নেন, আর সেই সময়েই ঘটে সবচেয়ে রক্তাক্ত হত্যাকাণ্ডগুলো। একইসাথে সে হয়ে ওঠে দুই অর্থে “গডফাদার”।
ভিটো কর্লিওনে হচ্ছেন সিনেমার নৈতিক কেন্দ্রবিন্দু। তিনি বয়সে প্রবীণ, জ্ঞানী এবং মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে। তাঁর মতে মদ, জুয়া, এমনকি নারীদের নিয়ে ব্যবসা সমাজ মেনে নেয়। কিন্তু মাদক হলো নিচু পর্যায়ের পাপ। মাফিয়া নেতাদের এক বৈঠকে তাঁর যুক্তিপূর্ণ বক্তৃতাটি সিনেমার অন্যতম সেরা দৃশ্য। এই সিনেমা আসলে আমাদের এমনভাবে তৈরি করে যে, ডন মারা গেলে আমরা অনুভব করি এক মহান মানুষ চলে গেলেন।
গর্ডন উইলিসের সিনেমাটোগ্রাফি বিখ্যাত তার অন্ধকার, গাঢ় সৌন্দর্যের জন্য। এই দৃশ্যাবলিতে মুখের রেখা, চোখের গহ্বর এবং স্থবিরতা এমনভাবে ধরা হয় যে তা এক ঘোরতর বাস্তবতা তৈরি করে। যেমন টেসিও চরিত্রে অ্যাবে ভিগোডা এক দানবাকৃতির, মুখে স্থায়ী ছায়া—যিনি প্রথম দেখা দেন একটি ছোট মেয়েকে নাচ শেখাতে শেখাতে। কিন্তু পরে তিনি হয়ে ওঠেন এক ভয়ঙ্কর উপস্থিতি। আর ছবির একদম শেষে, যখন তিনি ধরা পড়েন, তখন প্রথমবারের মতো তাঁকে উজ্জ্বল আলোতে দেখানো হয় একজন কাঁপতে থাকা, প্রাণভিক্ষা করা মানুষ হিসেবে।
ব্র্যান্ডোর অভিনয় সর্বজনস্বীকৃতভাবে কিংবদন্তিতুল্য। তাঁর গাল ফুলিয়ে কথা বলা বা আদুরে বিড়াল নিয়ে বসা এসব কৌশল তিনি ব্যবহার করেছেন ঠিকই, কিন্তু চরিত্রের গভীরতাকে তিনি অভিনয়ের চেয়ে বড় করে তোলেন। যেমন শেষদিকে তিনি যখন বলেন—“যে লোক তোমার সঙ্গে দেখা করার আয়োজন করতে বলবে, সে-ই বিশ্বাসঘাতক,” তখন আমরা তাঁকে একজন বার্ধক্যপ্রাপ্ত, বারে বারে কথা পুনরাবৃত্তি করা মানুষ ভাবি ঠিকই তবু বিশ্বাস করি, তিনি ঠিকই বলছেন।
অন্যদিকে পাচিনো মাইকেল চরিত্রে এমন আত্মসংযমী অভিনয় করেন যে আমরা ভুলে যাই তিনি একজন অভিনেতা। মনে হয় তিনিই সত্যিকারের মাইকেল কর্লিওনে। আর ঠিক এভাবেই, কপোলা আমাদের এত গভীরে নিয়ে যান যে সিনেমার শেষ দৃশ্যে আমাদের মনে হয় সবকিছু হয়তো ভালো হতো, যদি আমরা গডফাদারের কথা শুনতাম।


