Home Blog Page 42

“সুলতানার স্বপ্নের সেই লেডিল্যান্ডে নারীর ক্ষমতা হলো ভালোবাসা, সত্য ও সময়ের প্রতি শ্রদ্ধার প্রতীক” : সালওয়াহ চৌধুরী, লেখিকা, মিডিয়াম

বেগম রোকেয়ার “সুলতানার স্বপ্ন” ২০শ শতকের শুরুর দিকে লেখা, এটি এমন একটি মাতৃশাসিত সমাজের কথা বলে যেখানে নারীরা যেকোনো পটভূমির হয়ে থাকুক না কেন, তারা স্বাধীন ও সম্মানিত। গল্পটি বেশ কয়েকবার পড়ার পর আমি নিজেকে প্রশ্ন করেছিলাম, এই সাহিত্যকর্মটি কি সত্যিই কোনো স্বপ্নের বর্ণনা, নাকি এটা সুলতানার সেই জায়গার বাসনার প্রতিফলন, যেখানে শুধু নারীরা শাসন করবে? এমন এক দেশ যেখানে নারীরা পার্দার আড়ালে নয়, মুক্ত ও স্বাধীন!

গল্পে যে কাল্পনিক জায়গাটির নাম ‘লেডিল্যান্ড’, তা থেকেই স্পষ্ট যে নারীর ক্ষমতায়ন সেখানে বিরাজমান। গল্পে সমানাধিকারের বা উভয় লিঙ্গের সমান অধিকারের কথা বিশেষ ভাবে বলা হয়নি। বরং নারীরা সেখানে শাসক এবং পুরুষরা বন্দী। যেমন বাক্যগুলো—‘পুরুষরা তাদের নিজের জায়গায় থাকা উচিত’, ‘যতক্ষণ রাস্তায় পুরুষ থাকবে ততক্ষণ নিরাপদ নয়…’—এই ধরনের বাক্য পড়ে বোঝা যায়, এটি নারী শক্তির উল্টোদিকে পুরুষ দমনকেই তুলে ধরেছে।আমার মতে এখানে নারীবাদের শক্তিশালী দৃষ্টিভঙ্গি নয়, বরং লিঙ্গের ভূমিকা পাল্টে যাওয়ার গল্প বলা হয়েছে যেখানে নারীরা শাসন করছে আর পুরুষরা বাড়ির ভিতর আটকে।

নারীবাদ মূলত নারী-পুরুষ উভয়ের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমানাধিকারের কথা বলে, কিন্তু “সুলতানার স্বপ্ন” এ বেগম রোকেয়া দেখিয়েছেন কিভাবে পুরুষদের ধীরেধীরে ঘরের মধ্যে আটকে রাখা হলো এবং তারা ঘরকন্না কাজ করলো। গল্পের সিসর সারা পুরুষদের পাগল হিসেবে তুলনা করেছেন, হাতি ও সিংহের উদাহরণ দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে শুধুমাত্র শারীরিক শক্তি সবকিছু নয়, যা পুরুষেরা সবচেয়ে বেশি ধারণ করে। তবে লেডিল্যান্ডে পুরুষেরা সামরিক কৌশলে ব্যর্থ হওয়ায় নারীরাই সেই দায়িত্ব নিলেন তাদের জাদুকরী ইউটোপিয়া রক্ষার।

নারীদের শাসনের আকাঙ্ক্ষা প্রতিটি সংলাপে প্রকাশ পেয়েছে। বারবার সিসর সারা বলেছে পুরুষরা কাজের কিছুই পারে না, তাদের দরকার নেই, এমনকি সূচ-সুতা কাজেও তাদের বিশ্বাস নেই, কারণ তারা ধৈর্যশীল নয়।

১৯০৫ সালে লেখা এই গল্পটি নারীদের জন্য একটি আশাব্যঞ্জক দৃষ্টিভঙ্গি। সেই যুগে একজন নারী লেখক হিসেবে পুরুষদের ঘরের ভিতরে সীমাবদ্ধ করে রাখার মতো বিষয় লেখা খুবই সাহসী সিদ্ধান্ত ছিল এবং হয়তো এটি তখন বিতর্ক ও আলোচনা সৃষ্টি করেছিল। একজন ক্ষমতাবান নারী হিসেবে আমি মনে করি, এই গল্পটি পুরুষদের ওপর একটু কঠোর। বাংলাদেশে যেখানে অনেক বড় নেত্রী আছেন, রাজনৈতিক কিংবা ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে, সেখানে এই গল্প হাস্যরসের সঙ্গে পুরুষদের বুদ্ধিমত্তা ও যোগ্যতাকে হালকা করে উপস্থাপন করেছে।

গল্পের বিজ্ঞানের দিকটিও অত্যন্ত প্রতীকী। যেহেতু পুরুষরা রাস্তায় বেরোতে পারছিল না, তাই পুরো এলাকা একটি বিশাল উদ্যানের মতো ছিল, যেখানে ভবিষ্যতের পরিবেশ বান্ধব যানবাহন চলাচল করতো। শেষাংশে বলা হয়েছে, লেডিল্যান্ডের সবাই প্রকৃতির প্রদত্ত জিনিস নিয়ে সন্তুষ্ট ছিল, যা তাদের নিরস্ত্র ও অহিংস করে তোলে। সেখানে বিজ্ঞানাগার ও জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণাগার স্থাপিত হয়েছে, যা প্রমাণ করে নারীরাও যেকোনো ক্ষেত্রে সফল হতে পারে হোক সেটা যুদ্ধ জয় করা, মনোমুগ্ধকর সূচিকর্ম বা সর্বত্র বিজ্ঞানে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন। কারণ তাদের রয়েছে ভালোবাসা ও সত্যের ধর্ম এবং সময়ের মূল্যবোধ, যা পুরুষদের নেই।

সারাংশে বলতে গেলে, এই সাহিত্যকর্মের কিছু অংশ আজও প্রাসঙ্গিক। হয়তো এটি আমাদের প্রিয় বেগম রোকেয়ার সেই দূরদৃষ্টির ফল, যা আমাদের এমন এক জগতের দিকে নিয়ে এসেছে যেখানে নারীরা ছোট ছোট আকারে সুলতানার স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

সমুদ্রের চিনি ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করবে নিজেকেই

সমুদ্রের চিনিতে নতুন আবিষ্কার

চাইনিজ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস-এর ইনস্টিটিউট অফ ওসানোলজির গবেষক ড. চাওমিন সানের নেতৃত্বে গবেষকরা EPS3.9 নামের একটি বিশেষ চিনি বিশুদ্ধ করেন, যা ‘পাইরোপটোসিস’ নামে একটি আগুনতুল্য প্রদাহজনিত কোষ-মৃত্যু প্রক্রিয়া শুরু করে এবং ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করে।

EPS3.9 কীভাবে কাজ করে?

EPS3.9 ক্যান্সার কোষের ঝিল্লির পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ ফসফোলিপিডকে আক্রমণ করে। এতে কোষগুলো ফুলে ওঠে, ফেটে যায় এবং এক ধরনের সংকেত ছাড়ে যা শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় করে তোলে।

দ্বৈত প্রভাবযুক্ত চিকিৎসা পদ্ধতি

এই সামুদ্রিক চিনি সরাসরি ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করে এবং একই সঙ্গে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে উদ্দীপিত করে। এটি প্রাকৃতিক, কার্বোহাইড্রেট-ভিত্তিক ক্যান্সার চিকিৎসা হিসেবে সম্ভাবনাময়, যার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া প্রচলিত ওষুধের চেয়ে অনেক কম হতে পারে।

গবেষণাগারে প্রমাণিত কার্যকারিতা
লিউকেমিয়া ও লিভার ক্যান্সারের কোষে পরীক্ষায় দেখা গেছে EPS3.9 টিউমারের বৃদ্ধি স্পষ্টভাবে কমিয়েছে, কিন্তু সুস্থ কোষের ক্ষতি করেনি। এটি একসঙ্গে নিরাপদ ও কার্যকর ক্যান্সার বিরোধী সম্ভাবনা দেখিয়েছে।

ভবিষ্যতের ক্যান্সার চিকিৎসার লক্ষ্

বিজ্ঞানীরা EPS3.9 থেকে কার্যকর ক্যান্সার প্রতিষেধক তৈরিতে কাজ করছেন, যা সমুদ্রের জীববৈচিত্র্যকে কাজে লাগিয়ে নিরাপদ ও লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসা দিতে পারবে। একদিকে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করবে, অন্যদিকে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে।

ফর্ম, ফাংশন ও ফিউচারিজমে জাহা হাদিদের স্থাপত্যদর্শন

স্থাপত্য কি শুধুই দেয়াল, ছাদ আর দরজার সমাহার? নাকি এটি একধরনের চিন্তার শরীর? আধুনিক স্থাপত্যের এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের জাহা হাদিদের দিকে ফিরে তাকাতেই হয়। ইরাকি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ স্থপতি জাহা হাদিদ স্থাপত্যে গতি, তরলতা এবং ভবিষ্যতের এক নতুন ব্যাকরণ রচনা করেন। তিনি শুধু ডিজাইন করেননি, তিনি চ্যালেঞ্জ করেছেন স্থাপত্যের মূল দর্শন, সময়ের অনুভব এবং স্থানের ধারণাকেও।

১. Heydar Aliyev Center (আজারবাইজান, ২০১২)
বাকু শহরের এই ভবনটি যেন এক তরল ফর্ম, যেখানে কংক্রিটও বয়ে চলে। এতে কোনও কোণ নেই, নেই কাঠামোগত কড়াকড়ি। এই স্থাপনাটি প্রতীকীভাবে আধুনিক আজারবাইজানের পরিচয় বহন করে। জাহা এখানে পশ্চিমা র‍্যাশনালিজম ও ইন্টারন্যাশনাল স্টাইলের রূঢ় কাঠামো ভেঙে দিয়েছেন। ভবনের ছাদ এবং মেঝে একে অপরের সঙ্গে এমনভাবে মিশে আছে যেন স্থাপত্য নয় ভাসমান অনুভূতি।

২. MAXXI Museum (ইতালি, ২০০৯)
“ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ ২১সেঞ্চুরি আর্টস” এই ভবন একসঙ্গে জাদুঘর এবং চিন্তার পথ। এখানে অভ্যন্তরীণ চলাচলের পথগুলো সরল নয়, বরং দর্শক হাঁটার সঙ্গে সঙ্গে গ্যালারির প্রবাহও বদলায়। একে বলা যেতে পারে একরকম আর্কিটেকচারাল সিনেমাটোগ্রাফি। ভবনের অভ্যন্তরে আলো ও ছায়ার নাটকীয় খেলা একধরনের মিথস্ক্রিয়ামূলক দর্শক অভিজ্ঞতা তৈরি করে।

৩. London Aquatics Centre (যুক্তরাজ্য, ২০১১)
২০১২ অলিম্পিকের জন্য নির্মিত এই ভবনটি একটি সাঁতার কেন্দ্র হলেও, সেটি এক বিশাল তরঙ্গের মতো। ছাদের ডিজাইন জলের ঢেউ অনুকরণ করে। ক্রীড়া স্থাপত্যে গতিশীলতা এবং সৌন্দর্য কিভাবে মিশে যেতে পারে, তার এক নিখুঁত দৃষ্টান্ত। জাহা এখানে জল ও স্থানের মধ্যে এক ধরনের কাব্যিক সংলাপ গড়ে তুলেছেন।

৪. Guangzhou Opera House (চীন, ২০১০)
এই অপেরা হাউস চীনের সাংস্কৃতিক রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। জাহা এখানে নদীর পাথরের মতো দুটি খণ্ড তৈরি করেছেন, যা প্রকৃতির অনুকরণে কিন্তু ভবিষ্যতের কাঠামো হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। আলোর প্রতিফলন, অপ্রত্যাশিত কোণ এবং ভাঙা পৃষ্ঠ—সব মিলিয়ে এটি আধুনিক সাংস্কৃতিক আর্কিটেকচারের নতুন ভাষা।

৫. Bridge Pavilion (স্পেন, ২০০৮)
একটি ভবন এবং একটি সেতু, দুইয়ের মিলনে তৈরি হয়েছে এই অস্থায়ী প্রদর্শনীকেন্দ্র। এখানে জাহা ডিজাইনকে শুধু গঠন নয়, অভিজ্ঞতা বানিয়েছেন। দর্শকরা এর ভেতর দিয়ে হাঁটলে বদলায় দৃষ্টিভঙ্গি, আলো, ছায়া এবং জায়গার বোধ। আর্কিটেকচার এখানে একধরনের চলন্ত ভিজ্যুয়াল স্ক্রিপ্ট।

৬. Galaxy SOHO (চীন, ২০১২)
বেইজিংয়ের এই ভবনটি চারটি গোলাকার ইউনিট দিয়ে গঠিত, একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত। চীনা ঐতিহ্য ও ভবিষ্যত চিন্তার মিলন এখানে স্পষ্ট। ভলিউম ও শূন্যস্থান, চলাচলের পথ এবং প্রাকৃতিক আলোর ব্যবহার—সব মিলিয়ে ভবনটি হয়ে উঠেছে urban organism।

৭. Vitra Fire Station (জার্মানি, ১৯৯৩)
এটি ছিল জাহার প্রথম নির্মিত স্থাপত্য, যেটি তার তাত্ত্বিক চিন্তার বাস্তব অনুবাদ। এই ডিজাইন সরল নয়, এটি একটি বক্র রেখার বিপরীতে এক সুনির্দিষ্ট প্রতিবাদ। সোজাসাপ্টা আকার নয়, ভাঙা পৃষ্ঠ, খোলা প্রান্ত এবং ঝুঁকে থাকা দেয়ালের মধ্য দিয়ে জাহা যেন তৈরি করেছেন এক টেনশন। যা স্থির নয়, বরং চলমান।

৮. Dongdaemun Design Plaza (দক্ষিণ কোরিয়া, ২০১৪)
সিওলের কেন্দ্রে একটি বিশাল ডিজাইন ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। ৪৫,০০০+ অ্যালুমিনিয়াম প্যানেল দিয়ে তৈরি এ ভবন, ভবিষ্যত কল্পনার মতো দেখতে।এটি শুধু ডিজাইন কেন্দ্র নয়—স্থাপত্য, প্রযুক্তি ও নগর সংস্কৃতির এক intersection।

আকাঙ্ক্ষার পরে – কাম্যুর শিল্প ও দর্শনের দুই চাবিকাঠি : নাসরুল্লাহ মাম্ব্রোল, লেখক, গবেষক ও সাহিত্য সমালোচক

আলবেয়ার কামু (১৯১৩-১৯৬০) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর ফরাসি ভাষার অন্যতম প্রতিভাবান ও প্রভাবশালী লেখক এবং দার্শনিক। ১৯৫৭ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। কামুর জন্ম আলজেরিয়ার মন্ডোভিতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানদের ফ্রান্স দখলের সময় রচিত “দ্য প্লেগ” উপন্যাসে আলজেরিয়ার ওরান শহরে বুবোনিক প্লেগের প্রাদুর্ভাব কীভাবে জনজীবনকে গ্রাস করে, তা পরীক্ষা করা হয়েছে। উত্তর আফ্রিকার সমুদ্র উপকূলের এই শহরটি রহস্যজনকভাবে হাজার হাজার ইঁদুরের দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, যা নাগরিকদের জন্য মারাত্মক মহামারী নিয়ে আসে। এটি ড্যানিয়েল ডেফোয়ের আঠারো শতকের “আ জার্নাল অব দ্য প্লেগ ইয়ার”-এর কামু-কৃত আধুনিক সংস্করণ। “দ্য প্লেগ” জার্মান বাহিনীর ইউরোপ আক্রমণের কামুর রূপক ব্যবহারও বটে।

উপন্যাসের মূল ফোকাস প্লেগের ভয়াবহতার চেয়েও বরং প্রাণঘাতী রোগের প্রতি জনসাধারণের প্রতিক্রিয়ার উপর। প্রথমে শহরের অনেক ডাক্তার ও নেতা প্লেগের অস্তিত্ব অস্বীকার করেন। তারা এই মিথ্যা আশার উপর ভরসা করেন যে, মানুষের মৃত্যুর উৎস বুবোনিক প্লেগ নাও হতে পারে। কিন্তু মৃতের সংখ্যা বাড়তে শুরু করলে, নাগরিকরা বুঝতে শুরু করে যে একটি মহামারী তাদের শত্রুতে পরিণত হয়েছে। রোগটি হিস্টিরিয়া ও ভয় তৈরি করে। মানুষ একে অপরকে এড়িয়ে চলে এবং নিজেদের বাড়িতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। শীঘ্রই সংবাদপত্রগুলো দ্রুত পদক্ষেপের জন্য সোচ্চার হয়। প্লেগের ভয়াবহতা অবশেষে শহরের আমলাদের ওরানে কঠোর কোয়ারেন্টাইন আরোপের নির্দেশ দিতে বাধ্য করে, যার ফলে নাগরিকরা শহরের ফটকের ভিতরে আটকা পড়ে এবং বাকি বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

“দ্য প্লেগ” অস্তিত্বের অযৌক্তিক অবস্থার প্রতি একটি সামাজিক প্রতিক্রিয়া তুলে ধরে, যা কামুর পূর্ববর্তী উপন্যাস “দ্য স্ট্রেঞ্জার”-এ ব্যক্তির প্রতিক্রিয়া হিসাবে তুলে ধরা হয়েছিল। কামু অযৌক্তিকতাকে এমন জীবন হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেন যেখানে ঈশ্বর নেই এবং যা ক্রমাগত মন্দ শক্তির মুখোমুখি হয়, যার কোনো চূড়ান্ত যৌক্তিক অর্থ নেই। ওরানের বাসিন্দারা অবশেষে দেখতে পায় যে, শুধুমাত্র মৃতদেহ পোড়ানো এবং কঠোর স্যানিটেশন অনুশীলন করার মতো ব্যবস্থা ছাড়া তারা প্লেগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে বা এর মারাত্মক পরিণতি ঠেকাতে পারে না। এই ছোটখাটো মানবিক প্রতিক্রিয়া সত্ত্বেও, প্লেগ তার ধ্বংসাত্মক গতিপথ চালিয়ে যায়। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র ড. রিও, এমন একটি রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করেন যার কোনো নিরাময় নেই এবং একটি উদাসীন সমাজের বিরুদ্ধেও কিছু করার নেই। তিনি দ্রুত উপলব্ধি করেন মানবিক হস্তক্ষেপ কেবল সামান্য স্বস্তি আনতে পারে।

ওরান শহরের মানুষ যন্ত্রণাদায়ক ও বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পড়ে থাকে। কিন্তু কামুর গল্পটি শহরের সম্মিলিত প্রতিক্রিয়া এবং ড. রিও-এর মাধ্যমে ব্যক্তির প্রতিক্রিয়া উভয়কেই অন্বেষণ করে, যা প্লেগের মতো অপ্রতিরোধ্য এবং অযৌক্তিক শক্তির বিরুদ্ধে। কামুর অযৌক্তিকতার দর্শনে একমাত্র সম্ভবপর প্রতিক্রিয়া আসে ড. রিও-এর মাধ্যমে। কামুর অযৌক্তিক নায়ক একটি উদাসীন বিশ্বের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিদ্রোহ অর্জন করেন যৌক্তিক শৃঙ্খলার বিভ্রম অস্বীকার করে এবং একই সাথে সম্পূর্ণ হতাশার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করে। তিনি ধর্ম এবং অন্যান্য সামাজিক অবলম্বন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন এবং মানব ইচ্ছার দ্বারা নকশা করা একটি উপায় খোঁজেন যা সম্প্রদায়কে শক্তিশালী করবে। শহরের সম্মিলিত প্রতিক্রিয়া থেরাপিউটিক হয়ে ওঠে, যদিও এটি কেবল একটি মহৎ উপায়ে, কারণ কর্মের ঐক্য প্লেগের শারীরিক প্রকাশকে দমন করে না। কয়েক মাস ধরে কোয়ারেন্টাইন চলার পর, ওরানের অনেক বাসিন্দা ব্যক্তিগত দুঃখের প্রতি তাদের স্বার্থপর আচ্ছন্নতা ত্যাগ করে। প্লেগকে একটি সম্মিলিত শত্রু হিসাবে দেখা হয় যা সবাইকে প্রভাবিত করে। তারা তাদের সামাজিক দায়িত্ব স্বীকার করে এবং প্লেগের বিরুদ্ধে প্রচেষ্টা চালায়।

ড. রিও-এর অস্তিত্ববাদী প্রতিক্রিয়া কামুর বহুল আলোচিত প্রবন্ধ “দ্য মিথ অফ সিসিফাস”-এ গ্রীক পৌরাণিক কাহিনী সিজিফাসের কামু-কৃত পুনরুক্তিকে উপন্যাসের আকারে তুলে ধরে। গ্রীক দেবতারা সিসিফাসকে তার অপরাধের জন্য একটি পাথরকে অনন্তকাল ধরে একটি পাহাড়ের চূড়ায় ঠেলে তোলার শাস্তি দিয়েছেন। যখন অভিশপ্ত লোকটি শিখরের কাছাকাছি আসে, তখন পাথরটি নিজের ওজনে ঢাল বেয়ে গড়িয়ে নিচে পড়ে যায়, কেবল সিসিফাসকে আবার তার অনিবার্য বোঝা তুলে নিতে হয়। কিন্তু কামু মনে করেন যে সিসিফাসকে সুখী মনে করা উচিত কারণ সে বিশ্বের অযৌক্তিক শক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। কামু কল্পনা করেন অযৌক্তিক নায়ককে, তার দুঃখজনক নিয়তি সত্ত্বেও, চেতনায় বিদ্রোহী এবং দেবতাদের দ্বারা অবিচ্ছিন্ন। “দ্য মিথ অফ সিসিফাস”-এ গ্রীক দেবতাদের বিমূর্ত শক্তি ব্যবহার করে, কামু “দ্য প্লেগ”-এ ইঁদুর দ্বারা আক্রান্ত প্লেগের আরও সুনির্দিষ্ট, রূপক, ব্যবহার করেছেন ইউরোপের বেশিরভাগ অংশ দখলকারী জার্মান বাহিনীর জন্য।

“দ্য প্লেগ”-এ কামু যুক্তি দেন দুঃখ ও মৃত্যুর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শেষ পর্যন্ত নিষ্ফলতায় শেষ হয়। এমনকি সাধারণ জীবনেও মৃত্যু শেষ পর্যন্ত জয়ী হয় ।উপন্যাসটি এই ধারণাকেও জোর দেয় যে অযৌক্তিক বিশ্বের প্রতি মানুষের defiance এই প্রতিরোধের অনিবার্য পরাজয় সত্ত্বেও একটি মহৎ সুর সৃষ্টি করে। “দ্য প্লেগ” গভীরতম হতাশা এবং অর্থহীনতার মুহূর্তে কামুর মানবতাবাদী আশাবাদকে তুলে ধরে। অস্তিত্ববাদী পরিভাষায়, এই ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সংহতি একাই ব্যক্তিকে সংজ্ঞায়িত করে, জন্মগত বা আধ্যাত্মিক সত্তা নয়। “দ্য প্লেগ” হল তিনটি সাহিত্যকর্মের একটি সেট যা কামু “দ্য অ্যাবসার্ডস” নামে অভিহিত করেছিলেন। অন্য দুটি কাজ হল উপন্যাস “দ্য স্ট্রেঞ্জার” এবং দার্শনিক প্রবন্ধ “দ্য মিথ অফ সিসিফাস”। “দ্য প্লেগ” এই তিনটি কাজের মধ্যে দীর্ঘতম এবং সবচেয়ে উন্নত।

মুঘল দরবারে সুফিবাদ, আকবরের উদারতা থেকে আওরঙ্গজেবের গোঁড়ামি

দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে মুঘল শাসনকাল (১৫২৬–১৮৫৭) শুধু রাজনৈতিক বা সামরিক ইতিহাস নয়, বরং একটি বৃহৎ সংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক পরীক্ষাগার। মুঘল সম্রাটদের রাজনীতি ও ধর্মের মধ্যেকার সম্পর্ক ছিল এক জটিল কাহিনী। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সুফিবাদের ভূমিকা ও তার রাজনৈতিক প্রভাব। সুফিবাদের অসাম্প্রদায়িক দর্শন, মানবতাবাদী চিন্তাধারা, এবং আধ্যাত্মিক মানসিকতার সঙ্গে রাজনীতির সংঘর্ষ ও সমঝোতা এই দ্বন্দ্বের ছায়া মুঘল দরবারের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে ছড়িয়ে রয়েছে।

মুঘল সম্রাট আকবর (১৫৫৬–১৬০৫) ছিলেন ইতিহাসের একজন অত্যন্ত আধুনিক রাজা, যিনি রাজ্যের বহুধর্মীয় বৈচিত্র্যকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মুলধন মনে করতেন। তিনি বুঝেছিলেন কেবল কঠোর ইসলামিক শরিয়া শাসন দিয়ে বহুধর্মী জনগোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। আকবরের কাছ থেকে সুফিবাদের মূল গুণাবলী প্রেম, সংলাপ, ও অসাম্প্রদায়িকতা রাজনীতিতে প্রবাহিত হলো। তিনি সুফি পীরদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন, বিশেষত চিশতিয়া ও কাদিরিয়া ঘরানার পীরদের সঙ্গে।

১৫৮২ সালে আকবর ঘোষণা করেন ‘দীন-ই-ইলাহী’, যেখানে তিনি বিভিন্ন ধর্মের মৌলিক নীতিগুলোকে একত্রিত করার চেষ্টা করেন। যদিও এটি একটি ধর্ম নয়, বরং রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক আদর্শের সমাহার ছিল। দীন-ই-ইলাহী মূলত শান্তি, সহিষ্ণুতা এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নেওয়া এক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল। আকবরের এই উদ্যোগে সুফিবাদের প্রভাব স্পষ্ট, কারণ সুফিবাদ ধর্মের বাইরেও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের ওপর জোর দেয়।

সুফিবাদের মূল বাণী হলো আত্মশুদ্ধি ও ঈশ্বরপ্রেম। তারা মনে করতেন, ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা বা জাতপাত নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষের মধ্যে ঈশ্বরের প্রতিচ্ছবি নিহিত। এই দর্শন অসাম্প্রদায়িক, যার ফলে সুফিদের দরবারে হিন্দু, মুসলিম, নিম্নবর্ণ সকলেই সমান।

আকবরের পরবর্তী রাজা জাহাঙ্গীর (১৬০৫–১৬২৭) ও শাহজাহান (১৬২৮–১৬৫৮) সুফিদের পৃষ্ঠপোষকতা চালিয়ে যান, তবে তাদের রাজনীতি ততটা উদার ছিল না। জাহাঙ্গীর সুফিবাদকে অনুমোদন করলেও, তাদের রাজনৈতিক প্রভাবকে মাঝে মাঝে হুমকি হিসেবে দেখতেন। সুফিদের স্বাধীনতা সেসময় কিছুটা সঙ্কুচিত হয়। শাহজাহানের শাসনামলে ইসলামি ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণের প্রচেষ্টা বৃদ্ধি পায়। সুফিদের কিছু অংশ রাজনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও কট্টরপন্থী ধর্মীয় অনুশাসন বেড়ে যায়, যা সুফিবাদের অবস্থানকে প্রভাবিত করে।

আওরঙ্গজেব (১৬৫৮–১৭০৭) ছিলেন মুঘল শাসকদের মধ্যে সবচেয়ে কট্টর ধর্মনিষ্ঠ। তার শাসনে শরিয়া আইন সর্বোচ্চ প্রাধান্য পায়। এই সময় সুফিবাদের স্বাধীনতা অনেকাংশে হ্রাস হয়, তাদের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক প্রকাশ সীমিত হয়। আওরঙ্গজেবের কঠোরতা সুফিদের মুক্তচিন্তা ও অসাম্প্রদায়িক দর্শনের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রবেশ করে। বহু সুফি পীর ও খানকাহ বন্ধ বা ধ্বংস হয়। সুফিদের সংগীত ও নৃত্য নিষিদ্ধ করা হয়, যা রাজ্যের সাংস্কৃতিক পরিবেশকে একরকম গোঁড়ামি ও ভয়ালায় আচ্ছন্ন করে।

রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কর্তৃত্ব বৃদ্ধির বিরুদ্ধে সুফি কবিদের প্রতিবাদে ওঠে। বাংলার লালন ফকির, বুল্লে শাহ, শাহ হাসান তাহির, এবং অন্যান্যরা তাদের গান ও কাব্যে ধর্ম ও রাজনীতির নানান অপব্যবহারকে কঠোর সমালোচনা করেন। বুল্লে শাহের বাণীতে প্রকাশ পায় ধর্মের আসল অর্থ হলো প্রেম ও অন্তরের বিশুদ্ধতা, যা কখনোই রাজনৈতিক শাসনের হাতিয়ার হতে পারে না। এই কবিরা ধর্মীয় গোঁড়ামি ও রাজনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে মানবিক ও আধ্যাত্মিক মুক্তির পথ দেখিয়েছেন, যা মুঘল সম্রাটদের রাজনীতির বিপরীতে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ হিসেবে বিবেচিত।

মুঘল যুগে সুফিবাদের অসাম্প্রদায়িক ও প্রেমময় দর্শন রাজনীতিকে এক মানবিক দিক দেখাতে চেয়েছিল। আকবরের দীন-ই-ইলাহী ছিল সেই প্রচেষ্টার সুস্পষ্ট উদাহরণ। কিন্তু যখন রাজনীতিতে ধর্ম কঠোর ও একনায়কতান্ত্রিক হয়ে ওঠে, তখন সুফি দর্শনের স্থান সংকুচিত হয়।

সুতরাং প্রশ্ন থেকে যায়— দর্শন কি রাজনীতিকে শান্ত করতে পেরেছিল?

উত্তর জটিল। সাধারণ মানুষের মধ্যে সুফিবাদের দর্শন শান্তি ও সহিষ্ণুতা প্রচারে কার্যকর ছিল। তবে রাজনীতির কঠোর শাসন ও ক্ষমতার লালসায় সুফিবাদের প্রভাব সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু সুফিরা হারেনি, কারণ আজও সমানে তাদের দর্শন মানবতার, প্রেমের ও অন্তরের গভীর আলো হিসেবে সমকালীন সমাজে প্রভাব বিস্তার করছে।

রাজনীতি যদি ধর্মের নামে ক্ষমতা চালায় সেখানে দার্শনিক শান্তির জন্য জায়গা কমে যায়। সুফিরা সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেও রাজনীতিকে পুরোপুরি বদলাতে না পারলেও, তারা একটি মানবিক বোধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা রেখে গেছেন যা আজও আমাদের জন্য দিশারি।

মেটাভার্স – ইন্টারনেটের ভবিষ্যৎ না কি ডিজিটাল বিভ্রম?

একটা সময় ছিল যখন ইন্টারনেট মানেই ছিল ওয়েবসাইটে ঢুকে লেখা পড়া বা ভিডিও দেখা। তারপর এল স্মার্টফোন, অ্যাপস, সোশ্যাল মিডিয়া। এখন সামনে দাঁড়িয়ে এক নতুন অধ্যায় মেটাভার্স। অনেকে বলছেন, মেটাভার্স হবে ইন্টারনেটের ভবিষ্যৎ। কেউ আবার ভাবছেন, এটা এক প্রযুক্তিগত কল্পনা, যার বাস্তবতা এখনো দূরের কথা। কিন্তু আসলে মেটাভার্স কী? কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ? আমরা কতটা প্রস্তুত এই পরিবর্তনের জন্য?

মেটাভার্স আসলে কী?
“মেটাভার্স” শব্দটা এসেছে Meta (অর্থাৎ “beyond” বা “পরবর্তী”) এবং Universe (বিশ্ব) দুইটি শব্দ মিলে। সহজ ভাষায় এটা হচ্ছে এক ধরনের ভার্চুয়াল জগৎ, যেখানে আপনি, আমি আমাদের ডিজিটাল রূপে চলাফেরা করতে পারি, কথা বলতে পারি, অফিস করতে পারি, এমনকি জমি কিনে ঘর বানিয়ে ফেলতে পারি। এটা কোনো একক অ্যাপ বা গেম নয়, বরং বিভিন্ন ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মের সম্মিলিত একটি বাস্তবতাজাত ইকোসিস্টেম, যেখানে ইন্টারনেট এখন শুধু দেখা বা পড়ার জায়গা না, বরং বাস করার জায়গা হয়ে উঠছে।

কোথা থেকে শুরু হলো?
১৯৯২ সালে লেখক নিল স্টেফেনসন তার কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস Snow Crash-এ প্রথম “Metaverse” শব্দটি ব্যবহার করেন। সেখানে মানুষ বাস্তব জগতে দারিদ্র্য ও বিশৃঙ্খলার মাঝে একটি ভার্চুয়াল দুনিয়ায় বাস করে। কিন্তু বাস্তব দুনিয়ায় এর ভিত্তি শক্ত হয় ২০২১ সালে, যখন Facebook নিজের নাম বদলে রাখে Meta। মার্ক জুকারবার্গ বলেন “The metaverse is the next frontier in connecting people.” এর মানে ছিল, ফেসবুক শুধু সোশ্যাল মিডিয়া না, বরং ভার্চুয়াল জগত গড়ে তুলবে যেখানে মানুষ কাজ করবে, খেলবে, শিখবে।

কোন কোন প্রযুক্তি গড়ে তুলছে মেটাভার্সকে?

মেটাভার্স নিজে নিজে গড়ে ওঠেনি। এর পেছনে রয়েছে একগুচ্ছ প্রযুক্তির সমন্বিত শক্তি:

Virtual Reality (VR): এক ধরনের হেডসেট পড়ে আপনি সম্পূর্ণভাবে প্রবেশ করেন এক কল্পিত ৩-ডি জগতে।

Augmented Reality (AR): বাস্তব জগতের ওপরে ডিজিটাল তথ্য বসিয়ে দেয় (যেমন AR গেম Pokémon Go)।

Blockchain এবং NFTs: মেটাভার্সে আপনার ডিজিটাল সম্পত্তি আপনি কিনতে, রাখতে ও বিক্রি করতে পারবেন নিরাপদভাবে।

Artificial Intelligence (AI): ভিন্ন ভিন্ন প্ল্যাটফর্মে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভাষা অনুবাদ, কন্টেন্ট তৈরি এবং ভার্চুয়াল চরিত্রের ইন্টেলিজেন্স প্রদান করে।

5G এবং Cloud Computing: লাইভ ইন্টারঅ্যাকশন, হাই-রেজোলিউশনের গ্রাফিকস সব সম্ভব হচ্ছে দ্রুতগতির ইন্টারনেট আর ক্লাউড প্রযুক্তির মাধ্যমে।

অনেকের ধারণা মেটাভার্স কেবল গেমিং প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু এর ব্যবহারিক ক্ষেত্র অনেক গভীর ও বিস্তৃত। ভার্চুয়াল ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীরা ইতিহাস ঘুরে দেখতে পারছে, সায়েন্স ল্যাবে এক্সপেরিমেন্ট করতে পারছে। মানসিক চিকিৎসায় immersive therapy ব্যবহার হচ্ছে। সার্জনরা VR সিমুলেশনে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। মেটাভার্সে অফিস স্পেস তৈরি করে মিটিং, দলগত কাজ, প্রেজেন্টেশন সবই হচ্ছে বাস্তবের মতো। ভার্চুয়াল দোকানে পণ্য দেখে কিনতে পারছেন, এমনকি “try before buy” সুবিধাও মিলছে। ডিজিটাল আর্ট, NFT বই, ভার্চুয়াল থিয়েটার মিলে সৃষ্টিশীলতার নতুন মাধ্যম তৈরি হচ্ছে।

মেটাভার্সের মধ্যে রয়েছে একটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল অর্থনীতি, যেখানে ব্যবহারকারীরা কাজ করছে, ডিজিটাল সম্পত্তি কিনছে, NFT আর্ট বিক্রি করছে।এখানে ক্রিপ্টোকারেন্সি দিয়ে লেনদেন হয়। আপনি যদি মেটাভার্সে একটি ডিজিটাল পোশাক ডিজাইন করেন, তা কেউ NFT হিসেবে কিনে নিতে পারে। এভাবে তৈরি হচ্ছে ক্রিয়েটর ইকোনমি। অনেকে এখন Metaverse Land কিনছেন Decentraland বা The Sandbox এর মতো প্ল্যাটফর্মে। ভবিষ্যতে এই জমিতে ভার্চুয়াল দোকান, প্রদর্শনী, অফিস তৈরি করা যাবে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সবই কি ইতিবাচক?

না, মেটাভার্সের সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ ও চ্যালেঞ্জ। VR-AR প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যবহারকারীর চোখের মুভমেন্ট, বডি ল্যাংগুয়েজ এমনকি আবেগও ট্র্যাক করা সম্ভব, এটা কি আদৌ নিরাপদ? উন্নত ডিভাইস বা ইন্টারনেট অনেকের কাছে এখনো সহজলভ্য নয়। ভার্চুয়াল বাস্তবতায় বেশি সময় কাটালে বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ভার্চুয়াল হ্যারাসমেন্ট, ডিজিটাল চুরি এসব নিয়ে এখনও স্পষ্ট কোনো নীতিমালা নেই।

তাহলে সামনে কী?

বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান Meta, Microsoft, Apple, Google, Nvidia সবাই এখন মেটাভার্স নিয়ে কাজ করছে। কেউ বলছে এটা হবে ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজার, আবার কেউ সন্দেহ করছে এটা এক বুদবুদের মতো ফেটে যাবে। এখনো এর বাস্তবায়ন প্রাথমিক পর্যায়ে, তবু স্পষ্ট হচ্ছে মেটাভার্স শুধু প্রযুক্তি না, বরং সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির নতুন ভৌগোলিকতা।

মেটাভার্স আমাদের সামনে এক সম্ভাবনার দুনিয়া খুলে দিচ্ছে, যেখানে আমরা নতুনভাবে কাজ করতে পারি, শিখতে পারি, তৈরি করতে পারি। তবে এই দুনিয়ায় প্রবেশ করার আগে দরকার সচেতনতা, নীতিমালা, প্রযুক্তিগত সমতা এবং মানসিক প্রস্তুতি। একটি ভার্চুয়াল বাস্তবতা তখনই বাস্তব হয়ে ওঠে, যখন আমরা তাকে যুক্তিযুক্তভাবে গ্রহণ করি। মেটাভার্স এখনো নির্মাণাধীন। আমরা ঠিক করবো এটা রঙিন ভবিষ্যতের প্রতীক হবে নাকি নতুন বিভ্রমের ফাঁদ হবে ।

Neuralink – স্নায়ুবিজ্ঞানের নতুন অধ্যায়, চিন্তার মাধ্যমে করা যাবে প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ

প্রযুক্তি কেবল আমাদের বাহ্যিক জীবনকে রূপান্তর করছে না, এটি এখন মানুষের অন্তর্গত ক্ষমতাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে, যেখানে চিন্তা, স্মৃতি, সিদ্ধান্ত ও স্নায়বিক কার্যকলাপও প্রযুক্তির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হচ্ছে। এই রূপান্তরের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ হতে পারে Neuralink, এলন মাস্ক প্রতিষ্ঠিত এক নিউরোটেকনোলজি কোম্পানি, যারা সরাসরি মানুষের মস্তিষ্কে চিপ বসিয়ে মানব–কম্পিউটার ইন্টারফেস (BCI) তৈরির পথে এগোচ্ছে।২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রতিষ্ঠানটি ঘোষণা করে যে তারা ইতিমধ্যে নবম ব্যক্তির মস্তিষ্কে চিপ ইমপ্লান্ট করেছে। এটি শুধু প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নয়, বরং মানব-চেতনা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সীমারেখা ঘোলাটে করে দিচ্ছে।

Neuralink-এর এই চিপের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো মস্তিষ্কের নিউরনের বৈদ্যুতিক সংকেত ধারণ, বিশ্লেষণ ও প্রক্রিয়াকরণ করা। এই চিপটির মূল বৈশিষ্ট্য এটি একটি ছোট ও পাতলা ইলেকট্রোডযুক্ত ডিভাইস, যেটি মস্তিষ্কের কর্টেক্সে ইমপ্লান্ট করা হয়। চিপটি মস্তিষ্কের নিউরনাল অ্যাক্টিভিটি সংগ্রহ করে এবং সেই সংকেত একটি বাহ্যিক কম্পিউটারে পাঠায়। পরবর্তী ধাপে, AI-নির্ভর সফটওয়্যার সেই সংকেতকে ইনপুট হিসেবে গ্রহণ করে এবং ব্যবহারকারীর চিন্তার সঙ্গে মিল রেখে নির্দেশ তৈরি করে। যেমন—স্ক্রিনে মাউস চালানো, টাইপ করা, বা একটি রোবট পরিচালনা করা।

এই প্রযুক্তি সর্বপ্রথম যাদের জন্য পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি আনে, তারা হলো শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা। যারা স্পাইনাল কর্ড ইনজুরির কারণে চলাফেরা করতে পারেন না। ALS বা পক্ষাঘাতের শিকার হয়ে জীবনযাপনে সীমাবদ্ধ ও কথা বলতে বা হাত ব্যবহার করতে অক্ষম। তাদের জন্য এই চিপ হতে পারে একটি স্বাধীনতার হাতিয়ার, কারণ এটি চিন্তা দিয়ে ডিভাইস চালানোকে সম্ভব করে তোলে। Neuralink বলছে, এই চিপ “যেন মনে যা আসে, তাই প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রকাশ করার পথ করে দেবে”।

Neuralink-এর এই অগ্রগতি যেমন প্রশংসাযোগ্য, তেমনি প্রশ্নবিদ্ধও। প্রযুক্তিগত দিক ছাড়াও এটির রয়েছে কিছু গভীর নৈতিক ও মানবিক দিক।মস্তিষ্কে চিপ বসানো কতটা নিরাপদ? দীর্ঘমেয়াদে কি এটি স্নায়বিক ক্ষতি করতে পারে? ব্যবহারকারীর চিন্তা যদি বাইরের সফটওয়্যারের মাধ্যমে পড়া যায়, তবে গোপনীয়তা কোথায় থাকবে? ভবিষ্যতে যদি এই প্রযুক্তি শুধুই চিকিৎসার বাইরে গিয়ে সামরিক, রাজনৈতিক বা কর্পোরেট উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়, তখন কী হবে? এই প্রশ্নগুলো এখনই গবেষণা, আইন ও সমাজবিজ্ঞানের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।

বর্তমানে FDA-এর অনুমোদিত পরীক্ষামূলক ধাপে Neuralink মানবদেহে ইমপ্লান্ট শুরু করেছে। প্রথম ব্যবহারকারী একটি আংশিক পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তি, যিনি চিপ ব্যবহার করে স্ক্রিনে টাইপ করতে সক্ষম হয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, তারা ভবিষ্যতে আরও উন্নত চিপ নিয়ে আসবে যেগুলো স্মৃতিকে সংরক্ষণ ও পুনরায় স্মরণ করাতে পারবে। দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিতে সাহায্য করতে পারে ও এমনকি মানুষের মস্তিষ্কে কৃত্রিম ইন্টেলিজেন্স সংযোগ ঘটিয়ে তাকে সুপারহিউম্যান ক্ষমতা প্রদান করতে পারে

Neuralink যেন এমন এক ক্ষেত্র যেখানে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সায়েন্স ফিকশন একে অপরের সীমানা মুছে দিচ্ছে। যা একসময় “The Matrix” বা “Black Mirror”-এ দেখা যেত, আজ তা মেডিকেল ট্রায়ালের বাস্তবতায় রূপ নিচ্ছে। এই প্রকল্প আমাদের সামনে এক নতুন যুগের দিগন্ত উন্মোচন করছে যেখানে মস্তিষ্কের চিন্তা একদিন হয়ে উঠতে পারে ইন্টারফেস, অস্ত্র, শিল্প, বা এমনকি রাজনৈতিক শক্তির রূপ। ভবিষ্যত আমাদের কতটুকু প্রস্তুত দেখতে চায়, তারই পরীক্ষার নাম হতে পারে Neuralink।

জহির রায়হানের স্বপ্ন ‘জীবন থেকে নেয়া’ : রাজীব চৌধুরী, পশ্চিমবঙ্গের কবি ও সমালোচক

মাত্র ৩৬ বছরের জীবনে জহির রায়হান দেশের জন্য লড়াই করে গিয়েছেন, দেশকে ভালোবেসে, দেশের মুক্তির জন্য স্বপ্ন ও স্বাধীনতার বীজ বুনে গিয়েছেন। তীব্র যন্ত্রণা এবং আপসহীন লড়াই জারিত সৃষ্টিশীলতার কথা জানলে মন ভরে যায়। মাথা নত হয়ে আসে। তাঁর সৃষ্টির পরতে পরতে দেশের মাটির কথা, পরাধীন দেশের মানুষের জীবনের কথা। নিজের এবং নিজেদের জীবন থেকে নেওয়া গল্প, সাবলীল বুনে যাওয়া লেখালেখি এবং চলচ্চিত্র মাধ্যমে সেসব কথা বলে গিয়েছেন।

১৯৭০ সালে মুক্তিযুদ্ধের ঠিক এক বছর আগে মুক্তি পায় জহির রায়হানের রচনায় ও পরিচালনায় চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’। আর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ঠিক দেড় মাস পরে ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি হারিয়ে যাওয়া ভাই শহীদুল্লা কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে চিরতরে নিখোঁজ হয়ে যান তিনি। সৃষ্টিশীল মানুষ—এই দুই ভাই দেশকে ভালোবেসে প্রাণ দিয়েছেন।

‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রে স্বনামে অভিনেতা আনোয়ার হোসেনকে আমরা দেখতে পাই, সাথি ও বীথির দাদার চরিত্রে, যিনি দেশ অন্তঃপ্রাণ। তাঁর প্রতিটি সংলাপে শুধু দেশ আর দেশ। এই সংলাপ শরীরে কাঁটা দেয়। চোখে জল নিয়ে আসে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন তাঁকে আত্মহারা করে। পরাধীন দেশের প্রতিটি লড়াই-আন্দোলনে তিনি শামিল। অগ্রপথের পথিক। দেশের জন্য মাঝেমধ্যে জেলে যেতে হয়।

সাথি ও বীথির চরিত্রে মিষ্টি দুই বোন সুচন্দা ও রোজী সামাদ; পরিচারক মধুকে নিয়ে তাঁর সংসার। মধু গোটা পরিবারকে আগলে রাখেন। মধু চরিত্রে আমজাদ হোসেন। এই চলচ্চিত্রের মর্মস্পর্শী প্রতিটি সংলাপ আবার এই আমজাদ হোসেনের রচিত। মধু প্রথম দিকে ঘর, সংসার, পরিবার ছেড়ে আনোয়ার ভাইয়ের শুধু দেশ নিয়ে পড়ে থাকা প্রতিটি কথার সমালোচনা করলেও, একসময় নিজেও মানুষের বাঁচার লড়াই-আন্দোলনে, মিছিলের মুখ হয়ে ওঠেন।পাকিস্তানি ঘাতক শাসকদের নির্বিচারে হত্যা-গুলিতে প্রাণ দেন।

সাথির সঙ্গে অন্য এক পরিবারের বড় ভাই আনিসের বিয়ে ঠিক হয়। এই চরিত্রে অভিনয় করেন শওকত আকবর, পেশায় উকিল। সেই পরিবারের ছোট ছেলে ফারুক চরিত্রে অভিনয় করেন রাজ্জাক। যিনি দেশের জন্য লড়াই করেন। ফারুকের সঙ্গে অবশ্য সাথির ছোট বোন বীথির আগে থেকেই কলেজে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। আনিস আর ফারুকের বাড়ির কর্ত্রী বড় দিদি রওশন জামিল। চরিত্রটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বড় দিদির ভয়ে তাঁর স্বামী থেকে শুরু করে দুই ভাই, বাড়ির চাকর পর্যন্ত সবার পায়ের তলায় মাটি কাঁপে। সবাই ভয়ে অস্থির। তিনি স্বৈরাচারী একনায়কতান্ত্রিক পরিবার চালান। নিজে যা বলবেন, সেটাই শেষ কথা। পান থেকে চুন খসলে, নাকের ওপর মাছি উড়লেও কামান দাগেন। একটি ঘরের শাসকের মাধ্যমে গোটা পরাধীন দেশের শাসনব্যবস্থাকে ফুটিয়ে তোলেন পরিচালক।

এই বড়দির নিরীহ গোবেচারা স্বামী পেশায় উকিল হলেও গানপাগল একজন মানুষ। অভিনয়ে খান আতাউর রহমান। বাস্তবে এই চলচ্চিত্রের সুর ও সংগীত পরিচালনা করেছেন বিশিষ্ট এই অভিনেতা ও সংগীত পরিচালক। দেশের জন্য প্রতিটি গান অনবদ্য, হৃদয়ের একূল-অকূল জাগিয়ে দেয়। একুশের প্রভাতফেরির আবহমান কালের চিরন্তন সেই গান, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কী ভুলিতে পারি..’ ব্যথিত উদার, শোককাতর চিত্তে পায়ে-পায়ে আমাদের মনের মিনারে নিয়ে যায়। ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি..’ পরাধীন দেশে প্রথম চলচ্চিত্রায়িত হয়।

‘কারার ঐ লৌহ কপাট ভেঙে ফেল কররে লোপাট’, জেলখানার রাজবন্দীদের কণ্ঠে আন্দোলিত হয়। অন্য গানগুলোও সুন্দর, যথাযথ মূল্যায়িত হয়েছে। কণ্ঠ দিয়েছেন অজিত রায়, মাহমুদুন নবী, সাবিনা ইয়াসমীন, নীলুফার ইয়াসমীন, খন্দকার ফারুক আহমেদ ও খান আতাউর রহমান নিজে। চলচ্চিত্রের গল্পে যাচ্ছি না। আমাদের মা-ঠাকুমার শাড়ির আঁচলে চিরকালীন যে চাবির গোছা থাকে, সেই চাবির গোছাকে এই চলচ্চিত্রে অসাধারণ রূপকল্পে ব্যবহার করা হয়েছে। একটি পরিবারের চাবির গোছা কার হাত থেকে কার হাতে যাবে? শেষ পর্যন্ত দেশের চাবি দেশের মানুষের হাতে আসবে কি না, তার প্রতিযোগিতা, সংঘাত, অন্তঃকলহ, রাজনীতি এবং পরিণতি গল্পে এগিয়ে যায়।

ঘরকে স্বৈরাচারী শাসন থেকে মুক্ত করতে হলেও লড়াই দরকার। দেশকে মুক্ত করতে হলেও অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা ও রক্ত দরকার। দেশের মাটিকে বুকে জড়িয়ে ধরে রাখতে হয়। আনোয়ার হোসেনের চোখমুখের সংলাপ এই চলচ্চিত্রের প্রতিপাদ্য। আমাদের আবেগতাড়িত করে। জহির রায়হান বেশ মজার এবং রসিক মানুষ ছিলেন যে তা এই চলচ্চিত্রের কৌতুক উদ্দীপক দৃশ্য দেখেই বোঝা যায়। দেশের স্বাধীনতার জন্য ব্যাকুল, কঠোর, কঠিন, পরমব্রতী ছিলেন।পাকিস্তানি আমলে বসে তাঁর সব সৃষ্টিকর্ম। কম বয়সে নিজে নিখোঁজ হয়ে গিয়েও তাই আমাদের জন্য অনন্য সৃষ্টিসম্ভারের খোঁজ রেখে গেছেন।

টেকসই ভবিষ্যৎ – ক্যাকটাসের রস দিয়ে তৈরি হলো এমন এক প্লাস্টিক, যা ব্যবহার শেষে আবার প্রকৃতিতে মিশে যায়

উদ্ভাবক ও প্রেরণ

মেক্সিকোর ইউনিভার্সিটি অব দ্য ভ্যালি অব অ্যাটেমাজ্যাক–এর কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার সান্দ্রা পাসকো ওর্তিজ ২০১৩ সালে এমন এক পরিবেশবান্ধব প্লাস্টিক তৈরিতে কাজ শুরু করেন, যা পেট্রোলিয়াম-নির্ভর প্লাস্টিকের বিকল্প হতে পারে। তিনি “নোপাল” নামক ক্যাকটাসের রস ব্যবহার করেন।

প্রক্রিয়া ও উপাদান

ক্যাকটাসের রসে থাকা প্রাকৃতিক চিনি ও আঠাল গাম (বায়োপলিমার) সংগ্রহ করে তা গ্লিসারিন, প্রোটিন, মোম ও রঙের সঙ্গে মিশিয়ে শুকানো হয়। এর ফলেই তৈরি হয় এমন এক নমনীয় পাতলা প্লাস্টিক যা দেখতে ও ছুঁতে সাধারণ প্লাস্টিকের মতো।

পরিবেশগত সুবিধা

এই ক্যাকটাস প্লাস্টিক পুনরায় জন্মায়, পাতা কেটে নিলে আবার গজায়, এটি কার্বন নিরপেক্ষ, বিষমুক্ত এবং এমনকি খাওয়ার উপযোগী। এটি মাটিতে ২-৩ মাসের মধ্যে এবং পানিতে বা কম্পোস্টে মাত্র ৭ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণরূপে মিশে যায়, কোনো ক্ষতিকর আবর্জনা রেখে যায় না।

বর্তমান অবস্থা ও ব্যবহার

প্রতিটি ব্যাচ তৈরি হতে লাগে ১০ দিন এবং এখন পর্যন্ত এটি কেবল ওর্তিজের গবেষণাগারেই তৈরি হয়। তিনি বর্তমানে উৎপাদন বাড়ানোর পদ্ধতি ও এর ব্যবহার নিয়ে কাজ করছেন। যেমন খেলনা, ব্যাগ এবং ৩০০-র বেশি মেক্সিকান নোপাল ক্যাকটাস প্রজাতি থেকে তৈরি অন্যান্য প্লাস্টিক সামগ্রী।

প্রভাব ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য

ওর্তিজের তৈরি এই ক্যাকটাস প্লাস্টিক বিশ্বজুড়ে প্লাস্টিক দূষণ কমাতে পারে। আরও গবেষণা ও বিনিয়োগ পেলে এটি শিল্প পর্যায়ে উৎপাদনযোগ্য হয়ে উঠতে পারে, যা পরিবেশবান্ধব ও টেকসই বিকল্প হিসেবে কাজ করবে।

“Zen and the Sword” তরবারি যখন দর্শনের বাহক

জাপানি সামুরাই সংস্কৃতি কেবল যুদ্ধ বা শক্তি প্রদর্শনের নাম নয়। এটি এক গভীর আত্ম-অনুশীলন, দর্শন ও আধ্যাত্মিকতার জটিল সংমিশ্রণ। আর এই সংমিশ্রণের কেন্দ্রে রয়েছে জেন বৌদ্ধ ধর্ম, বিশেষ করে এর “মুশিন” ধারণা, একটি এমন মানসিক অবস্থা যেখানে ‘মন নেই’, ‘চিন্তা নেই’, ‘আসক্তি নেই’। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই শূন্যতা কীভাবে তরবারির আঘাতে রূপ নেয়? কীভাবে “মুশিন”-এর ভিতর দিয়ে একজন যোদ্ধা নিখুঁত আঘাত করতে পারে? ইতিহাস ও দর্শনের ছেদবিন্দুতে দাঁড়িয়ে এই প্রশ্নই আমরা বিশ্লেষণ করব।

জেন বৌদ্ধ ধর্মের উৎপত্তি চীনে, যার মূল ভিত্তি ‘ধ্যান’ বা অন্তর্জাগতিক মনোসংযোগ। এটি পরে জাপানে প্রবেশ করে এবং সামুরাই সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে এক অনন্য রূপ নেয়। জেন ধর্ম বাইরের আচার-অনুষ্ঠানের চেয়ে অভ্যন্তরীণ উপলব্ধি ও মুহূর্তের মধ্যে উপস্থিত থাকার ওপর গুরুত্ব দেয়। এটি বিশ্বাস করে সত্যকে বুঝতে হলে চিন্তা নয়, বরং চেতনার নিস্তব্ধতা দরকার।

জেন দর্শনের একটি কোর ধারণা হলো “মুশিন (無心)”—যার মানে ‘নির্ঝঞ্ঝাট মন’ বা ‘মনহীন মন’। মুশিন মানে এমন এক অবস্থা, যেখানে ব্যক্তি আগাম ভাবনা, আবেগ, ভয় বা দ্বিধা থেকে মুক্ত থাকে। যুদ্ধক্ষেত্রে এই অবস্থাই একজন সামুরাইকে দ্রুততম প্রতিক্রিয়া, নিখুঁত আঘাত এবং অচিন্তনীয় শারীরিক শৃঙ্খলা অর্জনে সহায়তা করে। মুশিন মানে ভুলে যাওয়া নয় বরং সম্পূর্ণরূপে উপস্থিত থাকা। চিন্তাহীন মানে আবেগের দ্বারা প্রভাবিত না হওয়া। সুতরাং যখন একজন যোদ্ধা তরবারি তোলে, সে তখন নিজের অস্তিত্ব ভুলে গিয়ে আঘাতেই পরিণত হয়।

জেন দর্শন জাপানে প্রবেশ করে ১২শ শতাব্দীতে, কিন্তু এটি সামুরাই শ্রেণির মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলে ১৩-১৪শ শতাব্দীতে কামাকুরা ও মুরোমাচি যুগে।এই সময় থেকেই সামুরাইরা ‘শারীরিক দক্ষতা’র পাশাপাশি ‘আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণ’-এর অংশ হিসেবে জেন ধ্যান গ্রহণ করতে থাকে। সামুরাইরা তরবারি অনুশীলন শুধুমাত্র শরীরের জন্য করত না, বরং আত্মার প্রস্তুতির জন্য করত । তরবারির প্রতিটি চাল ছিল একেকটি ধ্যান। অনুশীলনের মূল লক্ষ্য ছিল চিন্তার আগে কাজ, ভাবনার আগে সাড়া। যুদ্ধ তখন কেবল লড়াই নয়, আত্মার নির্জন উপাসনা।

সাধারণভাবে যুদ্ধ মানেই চাপ, ভয় ও প্রতিক্রিয়া। কিন্তু এই প্রতিক্রিয়া ধীর হলে মৃত্যু নিশ্চিত। “মুশিন” একজন যোদ্ধাকে সেই প্রতিক্রিয়ার ঊর্ধ্বে নিয়ে যায়। তিনি ভাবেন না, বিচার করেন না—তিনি কেবল আছে, দেখে, এবং করে।

এই মানসিক অবস্থার কয়েকটি বৈশিষ্ট্য ছিল। “মৃত্যু অনিবার্য” এই উপলব্ধিই ভয়কে হরণ করে। শরীর নিজের নিয়মে কাজ করে, কারণ মন বাধা দেয় না।অতীত নেই, ভবিষ্যৎ নেই—শুধু এই আঘাতই সত্য। এই ফোকাস আদের থাকতো। এই সবই তাকে নিখুঁত প্রতিপক্ষ করে তোলে, যাকে ঠেকাতে শত্রুরা অনেক সময় দিশেহারা হয়ে পড়ত।

মিয়ামোতো মুসাশি জাপানের সবচেয়ে বিখ্যাত রোনিন (ভবঘুরে সামুরাই), “Book of Five Rings” নামক গ্রন্থে নিজের যুদ্ধদর্শনে জেন দর্শনের ছাপ রাখেন। তিনি বলেন, “যোদ্ধা যখন নিজের অস্তিত্ব ভুলে যেতে পারে, তখনই তরবারি নিজেই চালিত হয়”। একইভাবে “ইয়ামামোতো ত্সুনেতোমো”-র “Hagakure” গ্রন্থে বলা হয়, “একজন যোদ্ধা প্রতিদিন নিজের মৃত্যু নিয়ে ধ্যান করে, তাহলেই সে সজীবভাবে বাঁচতে পারে।” এই ধ্যানই ছিল জেন দর্শনের সারাংশ।

ধারণা করা হয়, কেনজুতসু (swordsmanship) অনুশীলনের সময় জেন সন্ন্যাসীরা বারবার এক কথায় মনোনিবেশ করতে বলতেন—যেমন “Mu” (শূন্যতা)। তরবারির চাল এবং ধ্যান একসাথে গড়ে উঠত, —একধরনের “মেডিটেটিভ ফ্লো স্টেট” তৈরি হতো, যা আধুনিক সাইকোলজিতে “Zone” বলে পরিচিত।

মেইজি পুনর্গঠন (১৮৬৮) পরবর্তী সময়ে সামুরাই শ্রেণির বিলুপ্তি ঘটে। কিন্তু বুশিদো ও জেন দর্শনের প্রভাব পুরোপুরি মুছে যায়নি। জাপানের মার্শাল আর্ট যেমন কেনডো, আইকিডো, এমনকি কর্পোরেট সংস্কৃতিতেও “মুশিন” ও “শূন্যতা” ভাবনার ছাপ টিকে আছে। জাপানি কর্মীরা এখনও বিশ্বাস করে মুহূর্তে মনোযোগ দিলে, কাজ নিখুঁত হয়। তরবারি নেই, কিন্তু “আঘাত” রয়ে গেছে, সেটা দর্শনের আঘাত।

“জেন অ্যান্ড দ্য সোর্ড” কোনো কাব্যিক উপমা নয়, এটি এক ঐতিহাসিক সত্য। সামুরাইদের কাছে যুদ্ধ নিছক জয়-পরাজয়ের খেলা ছিল না। এটি ছিল আত্ম-উপলব্ধি, আত্ম-ত্যাগ ও নিঃশব্দ আত্মসমর্পণের পথ।