“Fight Club” সিনেমা হলিউডের ‘Death Wish’-এর পর সবচেয়ে স্পষ্টভাবে এবং আনন্দের সাথে ফ্যাসিবাদী মনোভাব প্রকাশ করা বড় তারকাবহুল ছবি। এই ছবিতে সহিংসতা উদযাপন করা হয়েছে, যেখানে নায়কেরা নিজেদের ইচ্ছেমতো মদ খায়, ধূমপান করে, যৌন সম্পর্ক করে আর একে অপরকে পেটাতে থাকে।
মাঝেমধ্যে ভিন্নতা আনার জন্য তারা নিজেদেরও মারধর করে। এটা এক ধরনের ‘মাচো পর্ন’, যৌনতার বদলে পুরুষদের লকার রুমের মতো লড়াইকে কেন্দ্র করে তৈরি সিনেমা। নারী দর্শকরা যারা ছেলেদের এই ‘ছোটো ছেলে’ টাইপ আচরণ দেখতে অভ্যস্ত, তারা সহজেই এই সিনেমার ভেতরের বিষয়গুলো বুঝে ফেলবে। কিন্তু পুরুষ দর্শকদের জন্য এই ছবি হতে পারে টেস্টোস্টেরন-ভরা এক উত্তেজনার উৎস। সিনেমাটি ভালো বানানো এবং এর প্রথম অংশ দারুণ হওয়ায় দর্শক বিভ্রান্তও হতে পারে।
এডওয়ার্ড নর্টন অভিনয় করেছেন এক বিষণ্ন, একাকী শহুরে চরিত্র হিসেবে, যার ভেতরে হতাশা থই থই করছে। সে নিজের দুনিয়াকে বর্ণনা করে বিদ্রুপাত্মক ও ব্যঙ্গমিশ্রিত কথোপকথনে। তার জীবন ও চাকরি তাকে পাগল করে তুলছে। যন্ত্রণা সামলাতে সে বিভিন্ন ১২-স্টেপ সহানুভূতিশীল গোষ্ঠীতে যায়—যেখানে সে দুর্ভাগা মানুষদের জড়িয়ে ধরে নিজে কিছুটা মুক্তি পায়। মজার বিষয় হলো, সে যে প্রথম সভায় যায়, তা হচ্ছে অণ্ডকোষ ক্যান্সারের পরে বেঁচে থাকা পুরুষদের সভা, আর পুরো ছবির থিমটাই মূলত পুরুষদের ‘পুরুষত্ব হারানোর’ ভয়কে ঘিরে।
এই প্রারম্ভিক অংশগুলো বেশ চাতুর্যময় ও মজার। নর্টনের কণ্ঠে এই বর্ণনা শুনতে নাথানিয়েল ওয়েস্টের ‘Miss Lonelyhearts’ বইয়ের ভঙ্গিমা মনে করায়। তার নামও সিনেমায় “Narrator”—অর্থাৎ বর্ণনাকারী, যার অর্থ শেষদিকে বোঝা যাবে। সভাগুলো তার জন্য ঘুমের ওষুধের মতো কাজ করছিল, কিন্তু হঠাৎই সে মারলা (হেলেনা বোনহ্যাম কার্টার) নামের এক নারীকে দেখতে পায়, যে সেও আসলে কোনো রোগী নয়, শুধু সভায় আসাটাকেই অভ্যাস করে ফেলেছে। এই মেয়েটি তার অভিজ্ঞতা নষ্ট করে দেয়। কারণ সে জানে সে নিজে ভণ্ড, কিন্তু চায় অন্যদের যন্ত্রণা সত্য হোক।
এরপর এক বিমানে তার দেখা হয় টাইলার ডার্ডেনের (ব্র্যাড পিট) সঙ্গে—একজন আত্মবিশ্বাসী, তীক্ষ্ণ মনের লোক, যে খুব সহজেই নর্টনের অন্তর দেখতে পায়। কিছুসময় পরেই নর্টনের অ্যাপার্টমেন্ট বিস্ফোরণে উড়ে গেলে, সে আশ্রয়ের জন্য টাইলারের কাছে যায়, কিন্তু পায় তার থেকেও বেশি। সে “Fight Club” নামের এক গোপন সংগঠনের সদস্য হয়, যেখানে পুরুষেরা একে অপরকে পেটাতে পেটাতে খুঁজে বেড়ায় মুক্তি ও আত্ম-উপলব্ধি।
এই মুহূর্ত থেকে সিনেমাটি বুদ্ধিদীপ্ত ও ব্যঙ্গাত্মক হওয়া ছেড়ে দিয়ে সহিংসতায় ভরপুর হয়ে ওঠে। বাস্তব জীবনে হাতে ঘুষি মারলে হাড় ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, কিন্তু এই সিনেমার চরিত্রদের যেন হাত পাথরের তৈরি। আর সাউন্ড ইফেক্ট? সে তো এমন, যেন পিং-পং ব্যাট দিয়ে সোফার ওপর পেটানো হচ্ছে! সিনেমার একপর্যায়ে আসে আরেকটি মোড়। অনেক নতুন সিনেমার মতো এটিও শেষে এমন কিছু দেখায়, যা দর্শকের সামনে গোটা ছবির বাস্তবতাকে নতুনভাবে তুলে ধরে, একধরনের ‘Keyser Soze সিনড্রোম’ বলা যেতে পারে।
তাহলে এইসব কিছুর মানে কী? ডার্ডেন বলছে, এটা হলো আধুনিক জীবনের দাসত্ব থেকে মুক্তির উপায়। আধুনিক জীবন পুরুষদের বন্দি ও দুর্বল করে তোলে। আর সেই শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পেতে হলে নিজের দেহ ও মনকে কষ্ট দেওয়া, এমনকি মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া দরকার। “Crash” (১৯৯৭) টাইপের সিনেমাগুলো ডার্ডেনের কাছে হাস্যকর মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক।
ধীরে ধীরে টাইলার ডার্ডেনের বড় পরিকল্পনার রূপরেখা স্পষ্ট হয়। সে কি সত্যিই একজন দার্শনিক নেতা? “সবকিছু হারানোর পরেই আমরা আসলে কিছু করার স্বাধীনতা পাই” এই কথা শুনলে মনে হয় যেন সে কোথাও একটা বইয়ের তাক থেকে নিটশেকে পড়ে গিয়েছিল। আমার মতে, তার কোনো সত্যিকারের বক্তব্য নেই। সে আসলে একজন দমনকারী Werner Erhard-এর সঙ্গে BDSM-এর মিশ্রণ; এক ধরনের চামড়ার ক্লাব চালায়, সাজসজ্জা বাদ দিয়ে। “Fight Club”-এর সদস্যদের কেউই এর দ্বারা মুক্ত বা শক্তিশালী হয় না বরং তারা এক ধরনের করুণ ‘কাল্ট’ সদস্যে পরিণত হয়। তাদের হাতে কালো শার্ট ধরিয়ে দিলে তারা সহজেই স্কিনহেডে পরিণত হতে পারে। টাইলার ডার্ডেন পুরুষ সত্তার গোপন দিকগুলোর প্রতীক কি না, সে প্রশ্ন ছবিটি করে বটে, কিন্তু নিজেই তার উত্তর দিতে পারে না কারণ এই সিনেমা মূলত নিজের বক্তব্য নয়, বরং নিজের সহিংসতাকেই উপস্থাপন করে।
অবশ্য, “Fight Club” সরাসরি ডার্ডেনের দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন করে না। হয়তো এটা তার বিরুদ্ধে একটা সতর্কবার্তা। এক সমালোচক বলেছিলেন, সিনেমাটি দেখায় কিভাবে মানুষের ভেতরের পশুত্ব আর দৈনন্দিন জীবনের যন্ত্রণায় মানুষ উন্মাদ হতে পারে। কিন্তু আমি মনে করি এই ধরনের সিনেমাগুলোই মানুষকে উন্মাদ করে তোলে। যদিও কেউ কেউ যুক্তি দিয়ে বলবে, ছবিটি যে সহিংসতা দেখাচ্ছে, তা থেকে দর্শককে সাবধান করতেই করছে।তবুও বাস্তবতা হলো, দর্শক মূলত সহিংসতাটাই উপভোগ করবে। তারা সিনেমা দেখে বেরিয়ে তর্কে না গিয়ে বরং মারামারিতে জড়াবে।
তবে অভিনেতারা তাঁদের সর্বোচ্চ দিয়েছেন, নর্টন ও পিট যে শারীরিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গেছেন, তা ‘G.I. Jane’-এ ডেমি মুরের কষ্টের সমতুল্য। আর হেলেনা বোনহ্যাম কার্টার দারুণভাবে এক চেইন-স্মোকিং, ক্ষুব্ধ, বিদ্রুপাত্মক নারী চরিত্র উপস্থাপন করেছেন। সে যেন এতটাই ক্ষেপে আছে কারণ কেউ তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ককেও ভাঙা নাকের মতো রোমাঞ্চকর মনে করে না।
ডেভিড ফিঞ্চার পরিচালিত এই ছবিটি, চাক পলানিকের উপন্যাস অবলম্বনে জিম উলসের চিত্রনাট্যে নির্মিত। অনেক দিক থেকে এটি ফিঞ্চারের “The Game” (১৯৯৭)-এর মতো—তবে সহিংসতা অনেক বেশি, যেন কিশোর ছেলেদের জন্য বানানো হয়েছে। সেই সিনেমাটি আসলেই নিজের থিমকে নিয়ে ছিল, কিন্তু “Fight Club”-এর বার্তাগুলো যেন কিছু ছেঁড়া ‘সামাজিক শিক্ষা’র মতো, যা বিশৃঙ্খল জনতার সামনে ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছে।
ফিঞ্চার একজন ভালো পরিচালক (“Alien 3” আর “Seven” তারই প্রমাণ)। কিন্তু এই সিনেমায় মনে হচ্ছে, সে নিজেকে চ্যালেঞ্জ দিয়েছে, দেখি কতদূর বাড়াবাড়ি করা যায়! ছবিটি ভীষণ শারীরিক, কঠিন এবং নানা স্তরের ব্যঙ্গ-রস ও প্রতীকিতা এতে আছে। যদি পুরো সিনেমা প্রথম অংশের মতো হতো, তাহলে হয়তো এটি একটি দারুণ সিনেমা হতে পারত। কিন্তু দ্বিতীয় অংশটা দর্শককে খুশি করতে বানানো, আর তৃতীয়টা ছলনা; ফিঞ্চার যেটাকে বার্তা ভাবছেন, দর্শকেরা তা ধরতে পারবে না। “Fight Club” এক ধরনের থ্রিল-রাইড যেটা দর্শন ছদ্মবেশে এসেছে, আর সেখানে কেউ বমি করে, কেউ আবার বারবার উঠতে চায়।


