Home Blog Page 31

মুঘলরা বিদেশি নয়, ভারতীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন : ইতিহাসবিদ রিচার্ড ইটন

ভারতে ইদানীং প্রায়ই মুঘল সাম্রাজ্যকে ‘বিদেশি’ শক্তি হিসেবে চিত্রিত করা হয়। সমালোচকদের মতে, পাঠ্যবই সংশোধনের মাধ্যমে ভারতের বহুত্ববাদী অতীতকে মুছে ফেলে একটি হিন্দুত্ববাদী বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছে বর্তমান বিজেপি সরকার।

এর অংশ হিসেবে দ্বাদশ শ্রেণির ইতিহাস বই থেকে মুঘল দরবারের ৩০ পৃষ্ঠার পুরো অধ্যায় মুছে ফেলা হয়। মুঘলদের চিত্রিত করা হয় ‘শোষক ও বর্বর’ হিসেবে। মহীশুরের টিপু সুলতানকে আখ্যা দেওয়া হয় ‘হিন্দুদের গণহত্যাকারী’ হিসেবে।

মুঘলদেরকে শত্রু হিসেবে হাজির করা নতুন এই বয়ানের সঙ্গে একমত নন মার্কিন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক রিচার্ড এম ইটন। ভারতের মধ্যযুগের ইতিহাস নিয়ে গবেষণার জন্য খ্যাতিমান এই অধ্যাপকের মতে—মুঘলরা বিদেশি নয়, বরং পুরোপুরিভাবে ভারতীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা এই দেশের মাটি-সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল।

সম্প্রতি ভারতের সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়্যার’-কে দেওয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে এই অভিমত ব্যক্ত করেন যুক্তরাষ্ট্রের আরিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক।

ইটনের ভাষ্য—ষোড়শ শতকে যখন মুঘলরা ক্ষমতায় আসে, তখন ‘দেশি’ ও ‘বিদেশি’ সংজ্ঞা বা আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের অস্তিত্বই ছিল না। তিনি বলেন, ‘সময়টা জাতিরাষ্ট্রের ছিল না। প্রজাদের আনুগত্য ছিল ব্যক্তির প্রতি; রাজা বা তার বংশের প্রতি।’ তাই আধুনিক মানদণ্ডে মুঘলদের বিদেশি হিসেবে বিচার করা ‘ঐতিহাসিক ভুল’ বলে মনে করেন তিনি।

উজবেকিস্তানের ফারগানা থেকে রাজ্য জয়ে আসা জহির উদ্দিন মুহাম্মদ বাবর প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্য সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কীভাবে ‘ভারতীয়’ হয়ে উঠেছিল, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইটন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির সঙ্গে মুঘলদের মৌলিক পার্থক্যও তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, ‘মুঘলরা তাদের সম্পদ ভারতেই বিনিয়োগ করেছেন। তারা তাদের স্থাপত্য এখানে তৈরি করেছেন। তাদের সমাধিও এখানেই। ভারতই ছিল তাদের স্বদেশ।’ এর বিপরীতে ব্রিটিশদের ভূমিকা সম্পর্কে তিনি বলেন, ব্রিটিশরা ভারতের সম্পদ শোষণ করে ইংল্যান্ডে পাচার করেছে। এটাই হলো মৌলিক পার্থক্য।

অধ্যাপক ইটনের বক্তব্য—মুঘলরা শুধুমাত্র শাসনই করেনি, বরং এদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন। তারা রাজপুতদের মতো স্থানীয় শক্তিগুলোর সঙ্গে বৈবাহিক ও সামরিক জোট তৈরি করে একটি স্থিতিশীল ও দীর্ঘস্থায়ী সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। এর মাধ্যমে রাজপুতরা মুঘল সাম্রাজ্যের ‘সহ-অংশীদার’ হয়ে ওঠেন।

একইসঙ্গে মুঘলরা এদেশের শিল্প, স্থাপত্য, সংগীত ও সাহিত্যের বড় পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। এর ফলে একটি অনন্য মিশ্র সংস্কৃতির জন্ম হয়, যা তাদের ভারতীয় পরিচয়কেই শক্তিশালী করে।

‘মুঘলদের বিচার তাদের জন্ম-পরিচয় দিয়ে নয়, বরং উপমহাদেশে তাদের তিন শতাব্দীরও বেশি সময়ের শাসন, সাম্রাজ্যের বিনির্মাণ ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার দিয়ে করা উচিত,’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ভারতে যখন মুঘল শাসকদের ‘অত্যাচারী বিদেশি’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, তখন রিচার্ড ইটনের এই বিশ্লেষণ নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

(সূত্র : দ্য ডেইলি স্টার)

আবেগ ও যুক্তির দ্বন্দ্বে, আপনার সিদ্ধান্তের পিছনে লুকানো লড়াই

মানব জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আমরা ছোট থেকে বড়, সাধারণ থেকে জটিল নানা রকম সিদ্ধান্ত নিই । কেউ হয়তো ভাবতে পারেন, এই সিদ্ধান্তগুলো সম্পূর্ণ যুক্তি ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে নেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। আমাদের মস্তিষ্কে আবেগ এবং যুক্তি প্রায়ই সংঘাত করে এবং এই দ্বন্দ্বই প্রায়শই আমাদের আচরণ এবং সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। সাইকোলজির পরিসরে এই দ্বন্দ্বকে “এমোশনাল-কগনিটিভ কনফ্লিক্ট” বলা হয়।

মস্তিষ্কের কাঠামো বিবেচনা করলে এই দ্বন্দ্ব সহজেই বোঝা যায়। মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা আবেগ ও আতঙ্কের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। এটি আমাদের জীবনে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে সাহায্য করে—উদাহরণস্বরূপ, হঠাৎ বিপদে আমাদের শরীরের ‘ফ্লাইট বা ফাইট’ প্রতিক্রিয়া। অন্যদিকে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স যুক্তি, পরিকল্পনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র। এটি আমাদের আবেগের প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাখে, বিশ্লেষণ করতে সাহায্য করে এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে প্ররোচিত করে।

কিন্তু সমস্যাটি তখন আসে যখন এই দুটি কেন্দ্র একমত হতে পারে না। ধরুন আপনি কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অ্যামিগডালা হয়তো উদ্বেগ, চাপ বা ভয় দ্বারা আপনাকে ভয় দেখাচ্ছে “এটা তুমি করতে পারবে না”। সেই সাথে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স যুক্তি করে, “যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করো, সাফল্য সম্ভব।” এই মুহূর্তে আমাদের মস্তিষ্ক দুটি বিপরীত সংকেত পাচ্ছে, এবং সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় দ্বন্দ্ব তৈরি হচ্ছে।

গবেষণা দেখায় আবেগ ও যুক্তির সংঘাত আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ছোট-বড় অনেক সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। ড্যানিয়েল কাহনেম্যানের “Thinking, Fast and Slow” বইতে বলা হয়েছে, আমাদের মস্তিষ্ক দুই ধরনের চিন্তা ব্যবস্থার দ্বারা কাজ করে। “সিস্টেম ১” দ্রুত, স্বয়ংক্রিয়, আবেগনির্ভর। “সিস্টেম ২” ধীর, বিশ্লেষণমুখী এবং যুক্তিনির্ভর। যখন সিস্টেম ১ এবং সিস্টেম ২ দ্বন্দ্বে আসে, তখন সিদ্ধান্ত গ্রহণ জটিল হয়ে ওঠে। কোনো মানুষ হঠাৎ কাউকে আক্রমণমূলক আচরণ করতে দেখলে তার প্রথম প্রতিক্রিয়া (সিস্টেম ১) হতে পারে ক্ষেপে যাওয়া, কিন্তু প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের বিশ্লেষণ (সিস্টেম ২) তাকে ভাবতে প্ররোচিত করতে পারে “এটি হয়তো শুধুমাত্র ভুল বোঝাবুঝি।”

আমাদের আবেগ এবং যুক্তির দ্বন্দ্ব কেবল ব্যক্তিগত জীবনে নয়, বরং সামাজিক এবং পেশাগত জীবনেরও বড় প্রভাব ফেলে। সিদ্ধান্ত নেবার সময় মানুষের সংবেদনশীলতা, চাপ, সামাজিক প্রতিক্রিয়া এই সব বিষয়গুলো আবেগকে প্রভাবিত করে। কোনো কর্মকর্তা বা নেতা যখন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, আবেগের প্রভাব—ভয়, অহংকার বা চাপ—ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তবে যুক্তি ও বিশ্লেষণের সাহায্যে এই আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

গবেষণায় দেখা গেছে, আবেগ কখনো আমাদের ক্ষতি নয়, বরং সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ার একটি অপরিহার্য অংশ। আবেগ আমাদের সতর্ক করে, উদ্দীপনা দেয় এবং মানসিক শক্তি প্রদান করে। তবে সমস্যা তখন হয় যখন আবেগের মাত্রা অতিরিক্ত হয়ে যায়। অত্যধিক ভয়, রাগ বা উত্তেজনা আমাদের যুক্তি এবং বিবেচনাকে ক্ষুণ্ণ করে, যা ফলাফলকে প্রভাবিত করে। তাই আবেগ এবং যুক্তি উভয়েরই সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ।

আজকের মনোবিজ্ঞানের চর্চায় মাইন্ডফুলনেস, কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (CBT), এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের কৌশলগুলি এই দ্বন্দ্ব মোকাবেলায় ব্যবহৃত হয়। CBT আমাদের শেখায় কীভাবে আবেগের প্রভাব চিহ্নিত করে তা যুক্তিসম্মত বিশ্লেষণে রূপান্তরিত করা যায়। মাইন্ডফুলনেস আমাদের বর্তমান মুহূর্তে সচেতন হতে শেখায়, আবেগের অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণে আনে এবং আমাদের সিদ্ধান্তকে আরও স্থির ও সুসংগত করে।

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এই দ্বন্দ্বে সচেতন থাকা মানে নিজেকে আরও ভালোভাবে বোঝা এবং মানসিক সুস্থতা বজায় রাখা। যখন আমরা আমাদের আবেগ এবং যুক্তি উভয়কেই পর্যবেক্ষণ করি, তখন আমরা impulse-driven আচরণ কমাতে পারি এবং দীর্ঘমেয়াদি, সুসংগত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হই। এটি কেবল মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যই নয়, বরং সামাজিক সম্পর্ক, পেশাগত জীবন এবং ব্যক্তিগত উন্নয়নের জন্যও অপরিহার্য।

সর্বশেষে বলা যায় আমাদের মস্তিষ্কে আবেগ ও যুক্তির দ্বন্দ্ব একটি স্বাভাবিক এবং জটিল প্রক্রিয়া। এই দ্বন্দ্বকে শত্রু মনে না করে আমরা যদি তা সচেতনভাবে বুঝে ও পরিচালনা করি, তাহলে এটি আমাদের ব্যক্তিগত বিকাশ এবং মানসিক সুস্থতার জন্য শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে। আবেগ আমাদের মানবিকতা দেয় এবং যুক্তি আমাদের সেই মানবিকতাকে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে পরিচালনা করার ক্ষমতা। দ্বন্দ্বই আমাদের আরও সচেতন, সংবেদনশীল এবং বিচক্ষণ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।

ট্রাম্পের ৫০% শুল্কে বিপর্যস্ত ব্রাজিলের মৎস্যশিল্প

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর শুল্কের কারণে ব্রাজিলের মৎস শিল্প গুরুতর ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ব্রাজিলের মাছের উপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে, যা দেশটির মৎস খাতের জন্য একটি বড় ধাক্কা। ব্রাজিলের ৬০ শতাংশ মাছ আমেরিকায় রপ্তানি হয়, তাই এই শুল্কের প্রভাব সুদূরপ্রসারী।

ব্রাজিলের তেলাপিয়া রপ্তানিকারকদের মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম সংস্থা ফিডার পেসকাডোস, সাও পাওলোতে ৪০০টি মাছের পুকুর পরিচালনা করে। তাদের বার্ষিক উৎপাদন ৯ হাজার ৬০০ টন তেলাপিয়ার প্রায় ৪০ শতাংশ পূর্বে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হতো। নতুন শুল্ক আরোপের পর এই রপ্তানি ইতিমধ্যেই এক-তৃতীয়াংশ কমে গেছে, যা কোম্পানির কার্যক্রমকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে।

কোম্পানির পরিচালক জুলিয়ানো কুবিৎসা এএফপিকে জানান, মাছের উৎপাদন মুরগি উৎপাদনের মতো দ্রুত নয়; ডিম ফুটে তেলাপিয়া সুপারমার্কেটে পৌঁছাতে প্রায় আট মাস সময় লাগে। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়া শুল্ক পরিবর্তনের সাথে দ্রুত মানিয়ে নেওয়া কঠিন করে তুলেছে। ফিডার পেসকাডোসের কর্মীরা তাঁদের চাকরি হারানোর প্রবল আশঙ্কার মধ্যে রয়েছেন। ব্রাজিলিয়ান ফিশ ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন সতর্ক করেছে যে, প্রায় ২০ হাজার কর্মী ছাঁটাই বা কর্মঘণ্টা কমানোর শিকার হতে পারেন।

ফিডার পেসকাডোস বর্তমানে নতুন বাজারের সন্ধান করছে, তবে কুবিৎসা স্বীকার করেছেন কাজটি কঠিন হবে, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের মতো এত তেলাপিয়া অন্য কোনো দেশ গ্রহণ করে না। রপ্তানি কমে যাওয়ায় কোম্পানিকে কিছু পণ্য হিমায়িত করতে হচ্ছে, যা তাজা মাছের রপ্তানির চেয়ে কম লাভজনক।স্বল্পমেয়াদে কোম্পানিটি ঘরোয়া বাজারে উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে, তবে সেখানে দাম কম হওয়ায় লাভের পরিমাণ কম হবে। এই পরিস্থিতিতে ফিডার পেসকাডোস তাদের ৩৫ শতাংশ উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে। এই শুল্ক কেবল লাভই নয়, অসংখ্য কর্মীর জীবিকাও হুমকির মুখে ফেলেছে।

কিভাবে রাতের সুস্থ ঘুম আপনার মস্তিষ্ক, আবেগ ও মনকে গড়ে তোলে?

মানুষের জীবনে ঘুম কেবল শারীরিক বিশ্রামের মাধ্যম নয়; এটি আমাদের মানসিক ও আবেগগত স্থিতিশীলতার জন্য এক অপরিহার্য প্রক্রিয়া। আধুনিক জীবনের অস্থিরতা, প্রযুক্তি ব্যবহার, কাজের চাপ এবং সামাজিক প্রতিযোগিতা মানুষের ঘুমের ধরণ ও মানকে প্রভাবিত করছে। গবেষণায় দেখা গেছে নিদ্রাহীনতা (insomnia), স্বপ্নের অস্বাভাবিকতা এবং ঘুমের চক্রের ব্যাঘাত, এগুলো সরাসরি মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য ও মস্তিষ্কের কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত।

মানুষের ঘুম মূলত দুটি পর্যায়ে বিভক্ত, REM (Rapid Eye Movement) এবং Non-REM। Non-REM পর্যায়ে দেহের পুনর্নির্মাণ, কোষের মেরামত এবং শক্তি পুনরায় অর্জনের প্রক্রিয়া ঘটে। অন্যদিকে REM ঘুম মূলত মস্তিষ্কের মানসিক প্রক্রিয়া ও আবেগ প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে যুক্ত। এই পর্যায়ে স্বপ্ন দেখা হয় এবং আমাদের আবেগ, স্মৃতি এবং শিখন প্রক্রিয়ার স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, REM ঘুমের অভাব মানুষের আবেগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা তৈরি করে।

যারা দীর্ঘ সময় REM ঘুম হারান, তারা সহজেই উদ্বেগ, দুঃখ বা ক্রোধের শিকার হতে পারেন। ঘুমের অভাব কেবল মানসিক চাপ বৃদ্ধি করে না বরং এটি প্রতিবিম্বের মানসিক রোগ বিষণ্নতা ও উদ্বেগজনিত রোগ এর ঝুঁকি বাড়ায়।

আর Insomnia একটি সাধারণ ঘুমের সমস্যা, যা কেবল ঘুম আসা বা ঘুম ধরে রাখা সমস্যা নয়, বরং এটি মনস্তাত্ত্বিক অবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। গবেষণা অনুযায়ী, যারা নিয়মিতভাবে ৬ ঘণ্টার কম ঘুমান, তাদের মধ্যে ডিপ্রেশন, উদ্বেগ এবং আবেগগত স্থিতিশীলতার অভাব দেখা যায়।নিদ্রাহীনতার শিকার ব্যক্তি প্রায়ই আবেগগত সংবেদনশীলতা বেশি অনুভব করেন এবং তারা ক্ষুদ্র ঘটনাকে অতিমূল্যায়ন করে মানসিক চাপের মধ্যে পড়ে যান।

একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিদ্রাহীনতা এবং বিষণ্নতার মধ্যে দ্বিমুখী সম্পর্ক। নিদ্রাহীনতা মানসিক রোগের ঝুঁকি বাড়ায়, আবার মানসিক রোগও ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। এটি বায়োলজিক্যাল ফিডব্যাক লুপ তৈরি করে, যেখানে মানসিক চাপ এবং ঘুমের অভাব একে অপরকে বাড়িয়ে তোলে।

স্বপ্নকে প্রায়শই শুধুমাত্র দৈনন্দিন জীবনের প্রতিফলন মনে করা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা দেখিয়েছে, স্বপ্ন আবেগ প্রক্রিয়াকরণ এবং স্মৃতি সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। REM ঘুমে দেখা স্বপ্ন মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা, আবেগ এবং সমস্যার সঙ্গে যুক্ত থাকে। একজন ব্যক্তি যদি দিনের মধ্যে উচ্চ মানসিক চাপের মধ্যে থাকে, REM ঘুমে তার স্বপ্ন সেই চাপের প্রতিফলন দেখাতে পারে।

স্বপ্নের এই প্রক্রিয়া মানুষের মানসিক রোগ প্রতিরোধে সহায়ক। এটি আবেগগত চাপ হ্রাস করে, স্মৃতিকে পুনর্বিন্যস্ত করে এবং মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। তবে REM ঘুমের অভাব বা স্বপ্নের ব্যাঘাত যেমন অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা এবং মানসিক অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এছাড়াও যাদের ঘুম অস্থির বা বিভ্রান্ত স্বপ্নপূর্ণ হয়, তাদের মধ্যে PTSD বা উদ্বেগজনিত সমস্যার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়।

বহু গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে ঘুমের ঘাটতি (Sleep Deprivation) এবং বিভিন্ন মানসিক রোগ যেমন ডিপ্রেশন, উদ্বেগ, PTSD (Post-Traumatic Stress Disorder) এবং বায়োপোলার ডিজঅর্ডার-এর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ঘুমের অভাব মস্তিষ্কের Amygdala অংশকে অতিসক্রিয় করে, যা আবেগ এবং ভয় প্রতিক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ। একই সময়ে Prefrontal Cortex এর কার্যকারিতা কমে যায়, যার ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সমস্যা সমাধান এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়।

শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্র সম্পর্কিত চাপও ঘুমের মানকে প্রভাবিত করে। যারা অতিরিক্ত ওভারটাইম কাজ করেন, তাদের ঘুমের সময় হ্রাস পায়, যা দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগ, একাকিত্ব এবং মানসিক ক্লান্তি তৈরি করতে পারে। ঘুমের ঘাটতি শিশুরা এবং কিশোরদের মধ্যে শিক্ষাগত দক্ষতা ও আবেগগত স্থিতিশীলতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

আজকের সমাজে প্রযুক্তির আধিপত্য, রাতের দীর্ঘ কাজ, ফোন বা কম্পিউটারের নীল আলো এবং সামাজিক চাপ মানুষের ঘুমকে প্রভাবিত করছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মে নিদ্রাহীনতা, ঘুমের অনিয়ম এবং স্বপ্নের ব্যাঘাত অত্যন্ত সাধারণ সমস্যা। এই সমস্যাগুলো মানসিক চাপ এবং উদ্বেগকে আরও তীব্র করে তোলে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অতিরিক্ত সক্রিয় থাকা, রাতের নীল আলো এবং অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস ঘুমের ঘাটতি আরও বৃদ্ধি করছে।

গবেষকরা ঘুম এবং মানসিক স্বাস্থ্যকে সমন্বিতভাবে উন্নত করার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি প্রস্তাব করেছেন, ঘুমের নিয়মিত সময়সূচি বজায় রাখা।নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো ও জাগার অভ্যাস মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি সুসংহত রাখে। বাতি এবং প্রযুক্তি ব্যবহার কমানো। নীল আলো মেলাটোনিন উৎপাদন কমায়, যা ঘুমের প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। সক্রিয় জীবনযাপন এবং নিয়মিত ব্যায়াম করা ঘুমের মান উন্নত করে এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।

এই পদক্ষেপগুলো শুধুমাত্র ঘুমের মান বাড়ায় না, বরং মানসিক রোগ প্রতিরোধ এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণেও সাহায্য করে। ঘুম, নিদ্রাহীনতা, স্বপ্ন এবং মানসিক রোগের সম্পর্ক কেবল শারীরিক নয়, বরং গভীরভাবে মনস্তাত্ত্বিক। নিদ্রাহীনতা এবং ঘুমের ব্যাঘাত আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে, তবে সঠিক ঘুমের অভ্যাস, নিয়মিত REM ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এটি প্রতিরোধযোগ্য। আধুনিক জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়, ঘুমের গুরুত্বকে সঠিকভাবে বোঝা এবং মানসিক স্বাস্থ্যকে সমান্তরালভাবে উন্নত করা একান্ত প্রয়োজন।

উচ্চমূল্যের সার-বীজ, ফসল উৎপাদন বাড়লেও লাভ পাচ্ছেন না কৃষক

কয়েক বছর ধরে সার, কীটনাশক এবং জ্বালানি তেলসহ কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি কৃষিক্ষেত্রে গভীর প্রভাব ফেলেছে। কৃষকরা ফসল উৎপাদন বাড়ালেও ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। হিমাগারের অভাব ও সঠিক সংরক্ষণের সুযোগ না থাকায় অনেক কৃষককে মৌসুম চলাকালেই কম দামে ফসল বিক্রি করতে হচ্ছে।এর ফলে মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ীরা লাভবান হলেও মূল উৎপাদকরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, কয়েক বছর ধরে সার কীটনাশক ও যন্ত্রপাতির দাম বেড়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ডিএপি সারের দাম গত মে মাসে টনপ্রতি ৬৬৯ ডলার থেকে জুলাইয়ে ৭৩৬ ডলারে পৌঁছেছে। ২০২৪ সালের একই সময়ে দাম ছিল ৫৩৭ ডলার। টিএসপি সার, ইউরিয়া এবং পটাশিয়াম ক্লোরাইডের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। যদিও ফসফেট রকের দাম গত তিন মাসে স্থিতিশীল রয়েছে। এছাড়া অ্যালুমিনিয়াম, কপার এবং জিংকের বাজারে দাম ওঠানামা করেছে, যা সরাসরি কৃষি উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি ও উৎপাদন খরচে প্রভাব ফেলেছে।

রংপুরের কৃষক জমির উদ্দিন বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে সার ও কীটনাশকের দাম বাড়ছে। ধান, আলু ও সবজি উৎপাদন করলেও আমরা ন্যায্যমূল্য পাই না।বোরো মৌসুমে ভালো ফলন হলেও মিল মালিকরা কম দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করছে। আমরা সেই লাভ পাইনি।’

নীলফামারীর আব্দুর রহিম জানান, বেসরকারি বীজ কোম্পানিগুলো কৃষকদের বাধ্য করছে তাদের বীজ ব্যবহার করতে। প্রতি বছর ইচ্ছামতো দাম বৃদ্ধি হচ্ছে। তিনি মনে করেন, সরকার যদি বাজার মনিটরিং বৃদ্ধি করে এবং কীটনাশক ও বীজে ভর্তুকি দেয়, তাহলে কৃষকের ক্ষতি কমানো সম্ভব। চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের আব্দুল মালেক বলেন, ‘মাথার ঘাম মাটিতে ফেলে ফসল উৎপাদন করি, কিন্তু লাভ পাই না। বাজারে সবজিসহ পণ্যের দাম চড়া। আলুর উৎপাদন বেশি হওয়ায় আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। পেঁয়াজের দাম বেশি কারণ সরবরাহ কম। সার ও বীজের দাম বেড়ে গেলে আমাদের লাভের সুযোগ আরও কমে।’

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কৃষিপণ্য বাজারজাত ও ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি রয়েছে। কিছু ফসলের দাম কম হওয়ার কারণ উৎপাদনের উচ্চতা, আবার অন্য পণ্যের দাম বেশি থাকার কারণ সরবরাহ সীমিত। শ্রমিক ও পরিবহন খরচের পাশাপাশি সরকারি ভর্তুকির অভাবও দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। সরকার বর্তমানে উৎপাদন খরচের মাত্র ১০ শতাংশ প্রফিট দিচ্ছে; বিশেষজ্ঞরা মনে করেন এটি ২০ শতাংশ হওয়া উচিত। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেমন বন্যা ও ভারি বৃষ্টি, কৃষকের ক্ষতি আরও বাড়িয়েছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, ‘সার, কীটনাশক ও কৃষি শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে। ধানের দাম সরকার নির্ধারণ করেছে ৩৬ টাকা, কিন্তু মাঠে কৃষক পাচ্ছেন ৩০–৩২ টাকা। অন্যান্য ফসলেও একই অবস্থা। শসা বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকায়, কিন্তু কৃষক পান ৩০ টাকা। উৎপাদন খরচ এবং বিক্রির অনুপাতে কৃষকের লাভ নেই।’

কৃষি উপকরণের দাম কমাতে বিশেষজ্ঞরা সুপারিশ করছেন আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর। ন্যাশনাল এগ্রিকেয়ার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কেএসএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সরকার কৃষক ও ব্যবসায়ীর সঙ্গে সমন্বয় করে ক্রয়, বিপণন ও বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন করলে সমস্যার সমাধান সম্ভব।’

সরকারি দিক থেকে প্রয়োজন, সর্বনিম্ন মূল্য নির্ধারণ, ঋণ প্রদান ও স্টোরেজ সুবিধা নিশ্চিত করা। সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনা এবং ভর্তুকি বৃদ্ধির মাধ্যমে কৃষককে উৎপাদনের খরচ মেটাতে সহায়তা করা সম্ভব। এর ফলে শুধু কৃষকের ক্ষতি কমবে না, বাজারে পণ্যের সঠিক মূল্য ও সরবরাহও নিশ্চিত হবে।

ডিজাইন যেখানে আমাদের সংস্কৃতি ও পরিচয়

বর্তমানে ডিজাইন শুধুমাত্র ব্যবহারিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি আমাদের সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং পরিচয় তুলে ধরার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছে। কালচারাল বা থিমেটিক ডিজাইন এই ধারণাটির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, যেখানে নকশা কেবল একটি পণ্য বা স্থান তৈরি করে না, বরং একটি গল্প বলে, একটি অভিজ্ঞতা প্রদান করে এবং মানুষের সাথে আবেগিকভাবে সংযোগ স্থাপন করে।

‘আইডেন্টিটি মিউজিয়াম’ বা স্থানীয় সাংস্কৃতিক পরিচয় প্রদর্শনের ডিজাইন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে কোনো বিশেষ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক পরিচয়, ঐতিহ্য এবং ইতিহাসকে একটি স্থানের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। এই ধরনের জাদুঘর বা প্রদর্শনী শুধু নির্জীব বস্তু প্রদর্শন করে না, বরং এটি একটি জীবন্ত আখ্যান তৈরি করে যা দর্শককে তার নিজস্ব শিকড়ের সাথে সংযুক্ত করে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো একটি সম্প্রদায়ের collective memory বা সম্মিলিত স্মৃতিকে সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করা।

এই ধরনের ডিজাইনে স্থানিক বিন্যাস, আলোর ব্যবহার, টেক্সচার এবং গ্রাফিক্সের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী আবেগিক পরিবেশ তৈরি করা হয়। একটি গ্রামীন জীবনযাত্রার জাদুঘরে মাটির দেয়াল, ছনের ছাউনি এবং হস্তনির্মিত সামগ্রী ব্যবহার করে সেই সময়ের অনুভূতিকে পুনরুজ্জীবিত করা যেতে পারে।এক্ষেত্রে নকশা একটি নিছক প্রদর্শনী স্থান নয়, বরং একটি সময়-যাত্রার প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে। এই ডিজাইনে দর্শকদের অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়, যেমন interactive display, হাতে-কলমে কাজ করার ব্যবস্থা বা oral history recordings। এর ফলে দর্শকরা কেবল দর্শক হিসেবে থাকে না, বরং অভিজ্ঞতার অংশীদার হয়ে ওঠে।

ফেস্ট্রিভাল ডিজাইন হলো এমন একটি শৈল্পিক প্রক্রিয়া, যা উৎসবের মেজাজ, অনুভূতি এবং আনন্দকে দৃশ্যমান করে তোলে। এটি শুধু সাজসজ্জা নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য একটি ইমারসিভ (immersive) পরিবেশ তৈরি করে। রঙ, আলো, শব্দ এবং স্থাপনার সঠিক সমন্বয়ের মাধ্যমে ডিজাইন একটি উৎসবের মূল বার্তা বা থিমকে ফুটিয়ে তোলে।

দুর্গাপূজার মণ্ডপ ডিজাইন যেখানে প্রতিবছর নতুন নতুন থিম ব্যবহার করা হয়। কখনো তা পরিবেশ সচেতনতার বার্তা দেয়, আবার কখনো কোনো লোককাহিনীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। এখানে আলোর ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আলোর মাধ্যমে একটি মণ্ডপে রহস্যময়, স্বর্গীয় বা আনন্দময় পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়। রঙিন কাপড়, ফুল, এবং শিল্পকর্মের মাধ্যমে একটি সাধারণ স্থানকে একটি শৈল্পিক ক্যানভাস-এ রূপান্তরিত করা হয়।

এই ডিজাইনের মূল লক্ষ্য হলো মানুষের জন্য একটি আনন্দময় এবং স্মরণীয় অভিজ্ঞতা তৈরি করা। এর মাধ্যমে মানুষের মধ্যে এক ধরনের সাম্প্রদায়িক বন্ধন গড়ে ওঠে, যেখানে সবাই একই আবেগ এবং আনন্দ ভাগ করে নেয়। তাই ফেস্ট্রিভাল ডিজাইন শুধু সৌন্দর্যবর্ধন নয়, এটি সামাজিক মিথস্ক্রিয়া এবং আবেগিক সংযোগের একটি মাধ্যম।

মিথোলজি ও ফোকলোর-অনুপ্রাণিত ডিজাইন হলো এমন শৈল্পিক ধারা, যেখানে প্রাচীন পুরাণ, কিংবদন্তি এবং লোককথাকে সমসাময়িক ডিজাইনের মাধ্যমে নতুন রূপ দেওয়া হয়। এটি শুধু অতীতের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো নয়, বরং এটিকে বর্তমান প্রজন্মের কাছে প্রাসঙ্গিক করে তোলা। এই ধরনের ডিজাইন লোককথার চরিত্র, প্রতীক এবং আখ্যানকে আধুনিক নান্দনিকতার সাথে মিশিয়ে একটি নতুন শৈলী তৈরি করে।

কোনো অলংকার বা পোশাকের ডিজাইনে পৌরাণিক কাহিনীর মোটিফ ব্যবহার করা যেতে পারে। কোনো দেবী বা পৌরাণিক প্রাণীর প্রতীককে জ্যামিতিক আকারে আধুনিক রূপ দেওয়া। এই ধরনের ডিজাইন ঐতিহ্যের সাথে আধুনিকতার একটি সুন্দর সেতুবন্ধন তৈরি করে। বাংলাদেশের নকশী কাঁথা, পটচিত্র বা মঙ্গল শোভাযাত্রার মোটিফগুলো এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এখানে প্রতিটি মোটিফের পেছনে একটি গল্প বা প্রতীকী অর্থ লুকিয়ে থাকে, যা ডিজাইনের গভীরতা বাড়িয়ে তোলে।

এই ডিজাইনের মাধ্যমে আমরা আমাদের সাংস্কৃতিক heritage বা ঐতিহ্যকে শুধু সংরক্ষণই করি না, বরং এটিকে একটি নতুন মাধ্যমে প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরতে পারি। এটি আমাদের ঐতিহাসিক পরিচয়কে বর্তমানের সাথে সংযুক্ত করে এবং একটি জাতির সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতাকে বজায় রাখে।

কালচারাল বা থিমেটিক ডিজাইন একটি শক্তিশালী মাধ্যম, যা আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়, ঐতিহ্য এবং অভিজ্ঞতাকে দৃশ্যমান করে তোলে। আইডেন্টিটি মিউজিয়াম আমাদের শিকড়ের সাথে সংযুক্ত করে, ফেস্ট্রিভাল ডিজাইন মানুষের মধ্যে আনন্দ ও সামাজিক বন্ধন গড়ে তোলে এবং মিথোলজি ও ফোকলোর-ভিত্তিক ডিজাইন আমাদের প্রাচীন ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলে। এই তিনটি ক্ষেত্রই প্রমাণ করে ডিজাইন শুধুমাত্র ব্যবহারিকতার জন্য নয়, এটি মানুষের আবেগ, সংস্কৃতি এবং পরিচয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি আমাদের অস্তিত্বের গল্প বলে, যা আমরা দেখতে, অনুভব করতে এবং ভাগ করে নিতে পারি।

ঢাকা ওয়াসার প্রকল্পে বড় অনিয়মের অভিযোগ, তদন্ত করবে আইএমইডি

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) ঢাকা ওয়াসার ‘ঢাকা এনভায়রনমেন্টালি সাসটেইনেবল ওয়াটার সাপ্লাই’ প্রকল্পে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা তদন্ত করবে। গতকাল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ এ কথা জানিয়েছেন। সভায় ভূ-উপরিস্থ পানি পরিশোধন করে তা সরবরাহের এ প্রকল্পের ব্যয় ৩৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাবে সরকার সায় দিয়েছে।

প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে একনেক সভায় ৯ হাজার ৩৬১ কোটি ৯২ লাখ টাকার ১১টি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৬ হাজার ৬৭৭ কোটি টাকা, প্রকল্প ঋণ ২ হাজার ৪২৮ কোটি ৪ লাখ টাকা ও সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ২৫৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা।

ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘ঢাকা ওয়াসার একটি বড় প্রকল্প ২০১৩ সাল থেকে শুরু হয়েছে। কিন্তু এখন আবারো প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।এখন বলা হচ্ছে চতুর্থ সংশোধনীতে এসে ২০২৯ সালে শেষ হবে। এটা খুবই প্রয়োজনীয় একটি প্রকল্প কিন্তু এতবার কেন সংশোধন করতে হচ্ছে, কেন এত সময়ক্ষেপণ হচ্ছে। আমাদের ধারণা এখানে অনিয়ম হয়েছে। পরিকল্পনার অভাব রয়েছেই, না হলে এতদিন কেন সময় লাগবে। এ প্রকল্পে কোনো সমন্বয়হীনতা আছে কিনা সেটা দেখতে আইএমইডিকে এটি কেসস্টাডি হিসেবে নিয়ে তদন্ত করতে বলা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘অতীতের ভুল দেখে লাভ নেই। এখন যে অনুমোদন দেয়া হয়েছে সেটা যেন অন্ততপক্ষে ভালোভাবে চলে। আর যেন কোনো অসুবিধা না হয়।’

২০১৩ সালের অক্টোবরে ৫ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পটি শুরু হয়। দুই দফা মেয়াদ বাড়ানোর পরও কাজ শেষ করতে না পারায় গতকাল একনেকে তৃতীয়বারের মতো ২ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

সভায় অনুমোদিত অন্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কৃষি মন্ত্রণালয়ের আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রংপুর অঞ্চলে টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প; বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যমান শিল্প এলাকার ৩৩/১১ কেভি উপকেন্দ্রের আধুনিকায়ন ও ক্ষমতাবর্ধন প্রকল্প; শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ স্থাপন; এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পাঁচটি মেডিকেল কলেজে বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট স্থাপন।

রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্পের অনুমোদন দিলেও সরকার শর্ত দিয়েছে যে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা যাবে না। পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের নাম অনুসারে এ বিশ্ববিদ্যালয়টি কোনো আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয় না হয়ে গুণগত মানে যেন এগিয়ে যেতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘শর্ত মেনে পরিবেশের কোনো ক্ষতি না করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে।’

উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারতীয় ইংরেজি সাহিত্যে সমাজ, ইতিহাস ও পরিচয়ের পুনর্লিখন

উপনিবেশ-পরবর্তী ভারতবর্ষের সাহিত্য এক জটিল এবং বহুমাত্রিক প্রতিচ্ছবি। ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর, ভারতীয় লেখকেরা ইংরেজিকে নিজেদের অভিব্যক্তি প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেন। এটি কেবল ভাষাগত পরিবর্তন ছিল না, বরং রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক নতুন দিক উন্মোচন করেছিল। উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারতীয় ইংরেজি সাহিত্য সেই সময়ের জটিলতা, আশা এবং দ্বন্দ্বকে ধারণ করে, যেখানে ঔপনিবেশিকতা এবং আধুনিকতার মধ্যে এক নতুন সংলাপ শুরু হয়। এই ধারার তিন বিশিষ্ট লেখক সালমান রুশদি, অরুন্ধতী রায় এবং ঝুম্পা লাহিড়ী, তাদের নিজস্ব লেখার শৈলী এবং বিষয়বস্তুর মাধ্যমে এই সাহিত্যের দিগন্তকে প্রসারিত করেছেন।

সালমান রুশদি উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী লেখকদের একজন। তার লেখা ঔপনিবেশিক শাসনের উত্তরাধিকার, স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতবর্ষের বিভাজন এবং রাজনৈতিক জটিলতাকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে। তার সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস মিডনাইট’স চিলড্রেন (১৯৮১) ভারতীয় স্বাধীনতা ও বিভাজনকে কেন্দ্র করে রচিত এক মহাকাব্যিক আখ্যান। এই উপন্যাসে তিনি জাদুবাস্তববাদ (magical realism) ব্যবহার করে ইতিহাসকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেন।

উপন্যাসের নায়ক সেলিম সিনাই যিনি ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট মধ্যরাতে জন্মগ্রহণ করেন, সেই সময়ের ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে তার জীবনের ঘটনাগুলো অলৌকিকভাবে যুক্ত। রুশদি দেখিয়েছেন কীভাবে ব্যক্তিগত জীবন এবং জাতীয় ইতিহাস একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।

রুশদির লেখার মূল বৈশিষ্ট্য হলো এর ভাষা এবং শৈলী। তিনি ইংরেজিকে ভারতীয় উপমহাদেশের সংস্কৃতি, ভাষা এবং উপকথার সঙ্গে মিশিয়ে এক নতুন সাহিত্যিক ভাষা তৈরি করেন। তার গদ্য অত্যন্ত প্রাণবন্ত, যা রূপক, উপমা এবং লোককথার জাদুকরী মিশ্রণে পাঠকের মন জয় করে। তার লেখায় ঔপনিবেশিকতা, ধর্মীয় সংঘাত এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে। রুশদির সাহিত্য কেবল ভারতীয় ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করে না, বরং আধুনিক বিশ্বে পরিচয়, স্মৃতি এবং সত্যের অনুসন্ধানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তার লেখার ধরন এবং বিষয়বস্তু উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্যের সংজ্ঞা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

অরুন্ধতী রায় বুকার পুরস্কার বিজয়ী উপন্যাস দ্য গড অফ স্মল থিংস (১৯৯৭) দিয়ে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি লাভ করেন, তার লেখায় রাজনৈতিক এবং সামাজিক সচেতনতা অত্যন্ত স্পষ্ট। রুশদির জাদুকরী ভাষার বিপরীতে, রায়ের লেখার মূল সুর হলো প্রতিবাদ এবং বাস্তবতার তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ। তার উপন্যাসে কেরালার এক খ্রিস্টান পরিবারের গল্প বলা হয়েছে, যেখানে ঔপনিবেশিকতার প্রভাব, জাতপাত এবং সামাজিক নিয়ম-কানুন কীভাবে মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে তা দেখানো হয়েছে। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে প্রেম, শ্রেণি, এবং জাতপাতের মতো বিষয়গুলো ভারতের সামাজিক কাঠামোয় এক জটিল জাল তৈরি করে।

অরুন্ধতী রায় কেবল একজন ঔপন্যাসিক নন, বরং একজন বিশিষ্ট রাজনৈতিক প্রবন্ধকার এবং মানবাধিকার কর্মী। তার সাহিত্যিক কাজের পাশাপাশি তিনি পরিবেশবাদ, নর্মদা বাঁধের বিরুদ্ধে আন্দোলন এবং পুঁজিবাদের সমালোচনা করে অসংখ্য প্রবন্ধ লিখেছেন। তার লেখা প্রায়শই বিতর্কিত, সমাজের প্রান্তিক মানুষের দুর্দশা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী কণ্ঠস্বর। রায় তার লেখার মাধ্যমে দেখিয়েছেন সাহিত্য কেবল গল্প বলার মাধ্যম নয়, বরং সামাজিক পরিবর্তনের এক শক্তিশালী হাতিয়ার। তার লেখা উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্যের সেই দিককে তুলে ধরে, যা রাজনৈতিক সচেতনতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য লড়াইকে গুরুত্ব দেয়।

ঝুম্পা লাহিড়ী তার লেখা দিয়ে উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্যের অনন্য এক দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। তিনি তার গল্পে ভারতীয় অভিবাসীদের জীবন, তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় সংকট এবং দ্বিতীয় প্রজন্মের অভিবাসীদের দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে লেখেন। তার বিখ্যাত ছোটগল্প সংকলন ইন্টারপ্রিটার অফ ম্যালোডিস (১৯৯৯) এবং উপন্যাস দ্য নেমসেক (২০০৩) বিশ্বজুড়ে পাঠকের হৃদয় জয় করেছে। লাহিড়ীর লেখার মূল বৈশিষ্ট্য হলো এর সরলতা এবং গভীর সংবেদনশীলতা। তিনি খুব সাধারণ জীবনের ঘটনা, যেমন পরিবার, সম্পর্ক এবং স্মৃতিকে কেন্দ্র করে অসাধারণ গল্প তৈরি করেন। লাহিড়ীর লেখায় কোনো জাদুবাস্তববাদ নেই, কোনো রাজনৈতিক স্লোগানও নেই। তার লেখার বিষয়বস্তু হলো মানুষের ভেতরের নীরব সংগ্রাম। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে ভারতীয় প্রবাসীরা দুটি সংস্কৃতির মধ্যে বাস করে, একটি তাদের জন্মভূমি, অন্যটি তাদের নতুন দেশ। এই দুই সংস্কৃতির মধ্যে যে টানাপোড়েন, তা তিনি সূক্ষ্মভাবে ফুটিয়ে তোলেন। তার লেখার মাধ্যমে তিনি পরিচয়, belonging, এবং home-এর মতো মৌলিক প্রশ্নগুলো তুলে ধরেন। লাহিড়ীর সাহিত্যিক অবদান হলো, তিনি উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারতীয় ইংরেজি সাহিত্যকে কেবল ঔপনিবেশিক ইতিহাস থেকে সরিয়ে এনে অভিবাসী এবং diasporic জীবনের দিকে নিয়ে গেছেন যা সমসাময়িক বিশ্বে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

সালমান রুশদি, অরুন্ধতী রায় এবং ঝুম্পা লাহিড়ী, তিনজনই ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারতীয় ইংরেজি সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। রুশদি জাদুকরী গদ্যে ইতিহাসকে পুনর্গঠন করেছেন, রায় তার লেখায় রাজনৈতিক প্রতিবাদকে তুলে ধরেছেন এবং লাহিড়ী অভিবাসী জীবনের সূক্ষ্ম সংবেদনশীলতা ফুটিয়ে তুলেছেন। তাদের সম্মিলিত কাজ ঔপনিবেশিকতার উত্তরাধিকার, জাতিগত বিভাজন, সামাজিক অবিচার এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মতো জটিল বিষয়গুলোকে তুলে ধরে। এই লেখকদের মাধ্যমে উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারতীয় ইংরেজি সাহিত্য কেবল ভারতের ইতিহাস নিয়ে কথা বলে না, বরং আধুনিক বিশ্বের বহুত্ববাদ, বিশ্বায়ন এবং মানবিক অস্তিত্বের মৌলিক প্রশ্নগুলো নিয়ে আলোচনা করে। তাদের লেখা প্রমাণ করে ইংরেজি কেবল ব্রিটিশদের ভাষা নয়, বরং ভারতীয় লেখকদের হাতে এটি এক নতুন জীবন ও অর্থ পেয়েছে।

রয়টার্স-এর গবেষণা, চরম তাপে বিশ্বব্যাপী জীবনঝুঁকিতে আছে পোশাকশিল্পের শ্রমিকরা

পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড, প্রায় ৪০ লক্ষাধিক শ্রমিকের জীবন ধারণের একমাত্র উপায়। কিন্তু এই শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্র, বিশেষত গ্রীষ্মকালে অতিরিক্ত তাপমাত্রা এক নীরব ঘাতকের রূপ ধারণ করে। সাম্প্রতিক গবেষণা ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম এবং পাকিস্তানের মতো প্রধান পোশাক উৎপাদনকারী দেশগুলোতে অস্বাস্থ্যকর তাপমাত্রার দিন উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০০৫-০৯ সালের তুলনায় ২০২০-২৪ সালে এই প্রবণতা অনেক বেশি প্রকট। এই তাপমাত্রা কেবল শ্রমিকদের শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্যই হুমকি নয়, বরং এটি সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা এবং টেকসই উন্নয়নের পথেও এক বড় বাধা।

কারখানার অভ্যন্তরে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রধান কারণগুলো বহুমাত্রিক। অপর্যাপ্ত বায়ু চলাচল ব্যবস্থা, সঠিক ভেন্টিলেশনের অভাব এবং ঘনবসতিপূর্ণ কর্মপরিবেশ এর অন্যতম মূল কারণ। বহু কারখানায় পুরানো যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়, যা প্রচুর তাপ উৎপন্ন করে। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও এর জন্য দায়ী। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, অস্বাভাবিক গরম এবং আর্দ্রতা শ্রমিকদের জন্য কাজ করা কঠিন করে তুলছে। গবেষণায় দেখা গেছে, তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে গেলে শ্রমিকদের কর্মক্ষমতা এবং মনোযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের আসন্ন Corporate Sustainability Due Diligence Directive (CSDD) আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর উপর এক নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে যা ২০২৭ সাল থেকে কার্যকর হবে । এই নির্দেশিকা অনুযায়ী, ব্র্যান্ডগুলোকে তাদের সরবরাহ চেইনে শ্রমিকদের জন্য যথাযথ স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যার মধ্যে ঠাণ্ডা রাখার ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন এবং অন্যান্য তাপমাত্রাজনিত সুরক্ষা অন্তর্ভুক্ত। এটি কেবল একটি আইন নয়, বরং নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে হাতে গোনা কয়েকটি ব্র্যান্ড—যেমন Nike, Levi’s, এবং VF Corp—শ্রমিকদের তাপমাত্রাজনিত সুরক্ষার জন্য কিছু ব্যবস্থা নিয়েছে। এই ব্র্যান্ডগুলো তাদের সরবরাহকারী কারখানাগুলোকে উন্নত বায়ু চলাচল ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত পানীয় জলের সরবরাহ এবং কর্মঘণ্টার মধ্যে বিরতির সময় বাড়ানোর জন্য উৎসাহিত করছে। কিন্তু অধিকাংশ ব্র্যান্ড এখনও এই বিষয়ে নীরব অথবা তাদের গৃহীত পদক্ষেপ প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি যেমন হিট স্ট্রোক, ডিহাইড্রেশন, কিডনির সমস্যা এবং দীর্ঘমেয়াদী ক্লান্তি বেড়ে যায়। এর ফলে তাদের কর্মদিবস থেকে অনুপস্থিতির হার বৃদ্ধি পায় এবং উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, তাপমাত্রাজনিত অসুস্থতার কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, যা দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শুধু তাই নয়, শ্রমিকদের সুস্থ ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত না হলে তা আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের সুনাম ক্ষুন্ন করতে পারে। ক্রেতারা এমন পণ্য কিনতে চাইবে না, যা মানবিক শোষণ বা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে উৎপাদিত হয়।

এই সমস্যা সমাধানের জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য। কারখানার মালিকদের উচিত আধুনিক বায়ু চলাচল এবং শীতলীকরণ ব্যবস্থা, যেমন এয়ার কুলার বা সঠিক ভেন্টিলেশন সিস্টেম, স্থাপন করা। পর্যাপ্ত পানীয় জলের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং কর্মঘন্টার মাঝে নিয়মিত বিরতি দেওয়া জরুরি।

সরকারের উচিত কারখানার পরিবেশ সংক্রান্ত নীতিমালা আরও কঠোর করা এবং তা যথাযথভাবে প্রয়োগ করা। একই সাথে ব্র্যান্ডগুলোর নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে তাদের সরবরাহকারী কারখানাগুলোকে এই ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা। শ্রমিক সংগঠনগুলোর উচিত এই বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার হওয়া।

তাপমাত্রার এই ঝুঁকি কেবল কারখানার ভেতরের সমস্যা নয়, এটি সামগ্রিকভাবে আমাদের পরিবেশ, অর্থনীতি এবং সমাজের এক প্রতিফলন। তাই টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এবং শ্রমিকদের জীবনমান উন্নত করতে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা আজ সময়ের দাবি। এটি কেবল আইন বা নীতির বিষয় নয়, বরং মানবিকতারও বিষয়।

প্রায় দুই দশক পরে বলিভিয়ায় বামপন্থী শাসনের অবসান

বলিভিয়ায় প্রায় দুই দশকের বামপন্থী শাসনের অবসান ঘটিয়ে প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রপতি নির্বাচন দ্বিতীয় দফায় গড়াতে যাচ্ছে। বামপন্থী দল মুভিমিয়েন্তো আল সোসিয়ালিসমো (মাস)-এর টানা আধিপত্যের পর, এবার দুই ডানপন্থী প্রার্থী রদ্রিগো পাজ পেরেইরা এবং জর্জ “টুটো” কুইরোগা – চূড়ান্ত লড়াইয়ে মুখোমুখি হচ্ছেন।

নির্বাচনের ফলাফল অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত ছিল। ৩২.১% ভোট পেয়ে প্রথম স্থানে থাকা মধ্য-ডানপন্থী সিনেটর রদ্রিগো পাজ পেরেইরা নির্বাচনী প্রচারণার শুরুতে জনমত জরিপে মাত্র ৩% সমর্থন পেয়েছিলেন। তার এই উত্থানের পেছনে অন্যতম কারণ ছিল তার রানিং মেট, প্রাক্তন পুলিশ ক্যাপ্টেন এডমান লারা মন্তানো, যিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার অবস্থানের জন্য ভোটারদের কাছে জনপ্রিয়তা লাভ করেন। পেরেইরা তার সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বলেন, “আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াই করব!”

দ্বিতীয় স্থানে থাকা জর্জ “টুটো” কুইরোগা পেয়েছেন ২৬.৯% ভোট। তিনি ২০০০-এর দশকের শুরুতে বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য দায়িত্ব পালন করেছিলেন। অন্যদিকে মাস দলের প্রার্থীর ভরাডুবি হয়েছে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইস আর্সে-র মনোনীত প্রার্থী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এদুয়ার্দো দেল কাস্তিয়ো মাত্র ৩.১৫% ভোট পেয়েছেন, যা দলের অতীতের জয়ের তুলনায় নগণ্য।

তবে এই সামান্য ভোটের কারণে দলটি তাদের আইনি মর্যাদা রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে। নির্বাচনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো বাতিল (null and void) ভোটের সংখ্যা, যা ছিল ১৯.১%। এটি বলিভিয়ার নির্বাচনের গড় বাতিল ভোটের তুলনায় অনেক বেশি। প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস, যাকে চতুর্থবারের মতো নির্বাচনে লড়তে আদালত বাধা দিয়েছিল, তার সমর্থকদেরকে প্রতিবাদস্বরূপ বাতিল ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এর ফলস্বরূপ তার অনেক সমর্থকই এই ভোট দেন, যা ফলাফলের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে।

অন্যদিকে ব্যবসায়ী স্যামুয়েল দোরিয়া মেদিনা, যিনি প্রচারণার সময় জরিপে এগিয়ে ছিলেন তিনি ১৯.৮৯% ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছেন। তিনি তার পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছেন এবং দ্বিতীয় দফায় পেরেইরাকে সমর্থন দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দোরিয়া মেদিনা এবং কুইরোগার মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ায় পেরেইরা আক্রমণ থেকে মুক্ত ছিলেন, যা তাকে সুবিধা দিয়েছে।

আগামী ১৯ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় দ্বিতীয় দফার নির্বাচনটিও দেশের ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই সংকট গত চার দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বলে বিবেচিত। বলিভিয়ায় ডলার ও জ্বালানির সংকট এবং ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ভোটারদের প্রধান উদ্বেগের কারণ।

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া ভোটদান শান্তিপূর্ণ ছিল। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। দ্বিতীয় দফার এই নির্বাচন বলিভিয়ার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথ নির্ধারণ করবে, যা বামপন্থী শাসনের অবসান ঘটিয়ে ডানপন্থী ধারার সূচনা করতে যাচ্ছে।