কয়েক বছর ধরে সার, কীটনাশক এবং জ্বালানি তেলসহ কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি কৃষিক্ষেত্রে গভীর প্রভাব ফেলেছে। কৃষকরা ফসল উৎপাদন বাড়ালেও ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। হিমাগারের অভাব ও সঠিক সংরক্ষণের সুযোগ না থাকায় অনেক কৃষককে মৌসুম চলাকালেই কম দামে ফসল বিক্রি করতে হচ্ছে।এর ফলে মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ীরা লাভবান হলেও মূল উৎপাদকরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, কয়েক বছর ধরে সার কীটনাশক ও যন্ত্রপাতির দাম বেড়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ডিএপি সারের দাম গত মে মাসে টনপ্রতি ৬৬৯ ডলার থেকে জুলাইয়ে ৭৩৬ ডলারে পৌঁছেছে। ২০২৪ সালের একই সময়ে দাম ছিল ৫৩৭ ডলার। টিএসপি সার, ইউরিয়া এবং পটাশিয়াম ক্লোরাইডের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। যদিও ফসফেট রকের দাম গত তিন মাসে স্থিতিশীল রয়েছে। এছাড়া অ্যালুমিনিয়াম, কপার এবং জিংকের বাজারে দাম ওঠানামা করেছে, যা সরাসরি কৃষি উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি ও উৎপাদন খরচে প্রভাব ফেলেছে।
রংপুরের কৃষক জমির উদ্দিন বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে সার ও কীটনাশকের দাম বাড়ছে। ধান, আলু ও সবজি উৎপাদন করলেও আমরা ন্যায্যমূল্য পাই না।বোরো মৌসুমে ভালো ফলন হলেও মিল মালিকরা কম দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করছে। আমরা সেই লাভ পাইনি।’
নীলফামারীর আব্দুর রহিম জানান, বেসরকারি বীজ কোম্পানিগুলো কৃষকদের বাধ্য করছে তাদের বীজ ব্যবহার করতে। প্রতি বছর ইচ্ছামতো দাম বৃদ্ধি হচ্ছে। তিনি মনে করেন, সরকার যদি বাজার মনিটরিং বৃদ্ধি করে এবং কীটনাশক ও বীজে ভর্তুকি দেয়, তাহলে কৃষকের ক্ষতি কমানো সম্ভব। চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের আব্দুল মালেক বলেন, ‘মাথার ঘাম মাটিতে ফেলে ফসল উৎপাদন করি, কিন্তু লাভ পাই না। বাজারে সবজিসহ পণ্যের দাম চড়া। আলুর উৎপাদন বেশি হওয়ায় আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। পেঁয়াজের দাম বেশি কারণ সরবরাহ কম। সার ও বীজের দাম বেড়ে গেলে আমাদের লাভের সুযোগ আরও কমে।’
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কৃষিপণ্য বাজারজাত ও ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি রয়েছে। কিছু ফসলের দাম কম হওয়ার কারণ উৎপাদনের উচ্চতা, আবার অন্য পণ্যের দাম বেশি থাকার কারণ সরবরাহ সীমিত। শ্রমিক ও পরিবহন খরচের পাশাপাশি সরকারি ভর্তুকির অভাবও দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। সরকার বর্তমানে উৎপাদন খরচের মাত্র ১০ শতাংশ প্রফিট দিচ্ছে; বিশেষজ্ঞরা মনে করেন এটি ২০ শতাংশ হওয়া উচিত। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেমন বন্যা ও ভারি বৃষ্টি, কৃষকের ক্ষতি আরও বাড়িয়েছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, ‘সার, কীটনাশক ও কৃষি শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে। ধানের দাম সরকার নির্ধারণ করেছে ৩৬ টাকা, কিন্তু মাঠে কৃষক পাচ্ছেন ৩০–৩২ টাকা। অন্যান্য ফসলেও একই অবস্থা। শসা বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকায়, কিন্তু কৃষক পান ৩০ টাকা। উৎপাদন খরচ এবং বিক্রির অনুপাতে কৃষকের লাভ নেই।’
কৃষি উপকরণের দাম কমাতে বিশেষজ্ঞরা সুপারিশ করছেন আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর। ন্যাশনাল এগ্রিকেয়ার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কেএসএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সরকার কৃষক ও ব্যবসায়ীর সঙ্গে সমন্বয় করে ক্রয়, বিপণন ও বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন করলে সমস্যার সমাধান সম্ভব।’
সরকারি দিক থেকে প্রয়োজন, সর্বনিম্ন মূল্য নির্ধারণ, ঋণ প্রদান ও স্টোরেজ সুবিধা নিশ্চিত করা। সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনা এবং ভর্তুকি বৃদ্ধির মাধ্যমে কৃষককে উৎপাদনের খরচ মেটাতে সহায়তা করা সম্ভব। এর ফলে শুধু কৃষকের ক্ষতি কমবে না, বাজারে পণ্যের সঠিক মূল্য ও সরবরাহও নিশ্চিত হবে।


