Home Blog Page 30

ডিজাইনের ঔপনিবেশিক প্রভাব আমাদের স্বীকার করতে হবে : সেলিন সেমান

“গত ৫০০ বছর ধরে ডিজাইন ক্ষেত্রটি সেই উপনিবেশবাদী ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সেবা করেছে, যা ন্যায়ের চেয়ে সৌন্দর্যকে, যত্নের চেয়ে দক্ষতাকে এবং পারস্পরিক সম্পর্কের চেয়ে শোষণকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে। এটি জমি, শ্রম এবং কাঁচামালের সীমাহীন ব্যবহারের ধারণা দেয়, যা বিজয়, দাসত্ব এবং সম্পদ লুন্ঠনের মাধ্যমে সম্ভব হয়েছিল। শিল্প ডিজাইন কোনো নিরীহ বিষয় ছিল না, বা প্রগতির চালিকাশক্তিও ছিল না বরং এটি সাম্রাজ্যের সহচর হিসেবে কাজ করেছিল।”

“এর সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণগুলোর মধ্যে একটি হলো বেতের চেয়ার। এটি তার হালকা ও মার্জিত নকশার জন্য প্রশংসিত, কিন্তু এর পেছনের বেত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ঔপনিবেশিক শোষণের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়েছিল।

“অথবা বাউহাউস (Bauhaus) এবং সুইস মডার্নিজমের (Swiss modernism) পরিচ্ছন্ন, ‘যৌক্তিক’ নকশাগুলো। এগুলি ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির সাথে সম্পর্কিত অলংকরণকে প্রত্যাখ্যান করে একটি সর্বজনীন নান্দনিকতার পক্ষে ছিল, যা শ্বেতাঙ্গ, ইউরোপীয় এবং ‘সভ্য’ হিসেবে গণ্য হতো।”

“পুঁজিবাদ অসীম বৃদ্ধির তাগিদে সমৃদ্ধি খুঁজে। কিন্তু উপনিবেশবাদ তা সম্ভব করেছে বৈশ্বিক শোষণ ও আধিপত্যের কাঠামো তৈরি করে। এমন কাঠামো যা ডিজাইন দৃশ্যমান, ভৌত ও স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

যদি ডিজাইন মুক্তির একটি হাতিয়ার হতে চায়, তবে শুরুতে রাজনৈতিক শিক্ষার সঙ্গে শুরু করতে হবে। এর মধ্যে ডিজাইন স্কুলে উপনিবেশিক ইতিহাস শেখানোও অন্তর্ভুক্ত। এর মানে হলো ডিজাইনারের ভূমিকা পুনর্বিবেচনা করা— কেবল জিনিসপত্রের নির্মাতা থেকে ন্যায়বিচারের ডিজাইনারে রূপান্তরিত হওয়া। “

রঙ কিভাবে আমাদের আবেগ, চাপ ও মানসিক শান্তিতে প্রভাব ফেলতে পারে

রঙ মানুষের জীবনের সর্বক্ষেত্রে উপস্থিত। আমরা সচেতন বা অচেতনভাবে রঙের প্রভাব অনুভব করি। এটি শুধু চোখের জন্য নয়, রঙ আমাদের মন, মেজাজ এবং আচরণেও প্রভাব ফেলে। মানসিক স্বাস্থ্য গবেষণায় রঙের প্রভাব নিয়ে বহু গবেষণা হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে রঙ কেবল পরিবেশকে সুন্দর বা আকর্ষণীয় করে না, বরং এটি মানুষের আবেগ ও মানসিক অবস্থাকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে। আমাদের চারপাশের রঙের সংমিশ্রণ মানসিক চাপ, আনন্দ বা উদ্দীপনার মাত্রা বাড়াতে বা কমাতে সক্ষম।

এই গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের মেজাজ, আবেগ, এবং মানসিক অবস্থার উপর বিভিন্ন রঙের প্রত্যক্ষ প্রভাব কতটুকু তা নির্ধারণ করা। বিশেষত ঘরের ভেতরের রঙের পরিবর্তন মানুষের মানসিক চাপ, উত্তেজনা এবং শান্ত থাকার ক্ষমতার ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলে, তা পর্যবেক্ষণ করা। এই গবেষণাটি শুধুমাত্র তাত্ত্বিক আলোচনার পরিবর্তে বাস্তবসম্মত পরীক্ষার মাধ্যমে এই সম্পর্ক প্রমাণ করতে চেয়েছিল।

গবেষণায় মোট ৩০ জন স্বেচ্ছাসেবীকে অংশগ্রহণকারী করা হয়। তাদের তিনটি সমান গ্রুপে ভাগ করা হয় এবং প্রতিটি গ্রুপকে আলাদা রঙের ঘরে বসানো হয়। ঘরগুলোর রঙ ছিল লাল, নীল এবং সবুজ। গবেষণার আগে স্ট্যান্ডার্ড সার্ভে এবং স্কেল ব্যবহার করে অংশগ্রহণকারীদের মানসিক অবস্থা ও আবেগের মাত্রা যাচাই করা হয়।

উষ্ণ ও তীব্র রঙ হিসেবে লাল রঙ প্রায়শই উত্তেজনা এবং উদ্দীপনা বাড়ায় বলে পরিচিত। এটি প্রায়শই খাদ্য বা খেলা সংক্রান্ত বিজ্ঞাপনেও ব্যবহৃত হয়, কারণ এটি দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং উদ্দীপনা বাড়ায়।

নীল রঙ মানসিক শান্তি এবং স্থিতিশীলতা বাড়ায়। এটি চোখকে স্বস্তি দেয় এবং চাপ কমাতে সাহায্য করে বলে ধরা হয়। অফিস বা ক্লিনিকের ঘরে নীল রঙের ব্যবহার সাধারণ।

সবুজ রঙ প্রাকৃতিক ও সামঞ্জস্যপূর্ণ রঙ হিসেবে পরিচিত। এটি মানসিক ভারসাম্য এবং সুস্থতার অনুভূতি বৃদ্ধি করতে পারে। উদ্যান বা প্রাকৃতিক দৃশ্যের সঙ্গে যুক্ত সবুজ রঙ মানুষের মনকে আরামদায়ক করে।

প্রতিটি অংশগ্রহণকারীকে ঘরে ১৫ মিনিট বসতে দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে তাদের মানসিক অবস্থা পুনঃমূল্যায়ন করা হয়। গবেষণায় মূল ফোকাস ছিল আবেগের মাত্রা, চঞ্চলতা, উদ্বেগ এবং শান্তি।

গবেষণার ফলাফল একটি স্পষ্ট প্যাটার্ন দেখিয়েছে। লাল রঙের ঘরে বসা অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে উত্তেজনা এবং চঞ্চলতার মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা স্বীকার করেছেন যে, ঘরের লাল রঙ তাদের মানসিক চাপ এবং উদ্দীপনা উভয়কেই বাড়িয়েছে। কিছু অংশগ্রহণকারী অতিরিক্ত উত্তেজনা এবং অস্বস্তি অনুভব করেছে।

নীল রঙের ঘরে বসা অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে শান্তি এবং মানসিক স্থিতিশীলতা বেশি লক্ষ্য করা গেছে। তাদের স্ট্রেস লেভেল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে এবং তারা নিজেদের অনেক বেশি মনোনিবেশ এবং স্থিতিশীল অনুভব করেছে। বিশেষ করে, যারা সাধারণভাবে উদ্বেগপ্রবণ ছিলেন, তাদের মধ্যে নীল রঙের প্রভাব সবচেয়ে বেশি।

সবুজ রঙের ঘরে বসা অংশগ্রহণকারীরা মধ্যম মানসিক অবস্থার পরিবর্তন দেখিয়েছে। তারা বলেছে যে ঘরের সবুজ রঙ তাদের মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করেছে এবং সাধারণভাবে আরামদায়ক অনুভূতি দিয়েছে। সবুজ রঙ উদ্বেগ হ্রাসে সহায়ক হলেও এটি নীল রঙের মতো শক্তিশালী শান্তি প্রদান করেনি; বরং এটি একটি সুষম এবং স্থিতিশীল অনুভূতি দেয়।

এই ফলাফলগুলো রঙ এবং আবেগের মধ্যে সরাসরি সম্পর্কের প্রমাণ প্রদান করে। রঙ মানুষের অবচেতন মানসিক প্রক্রিয়ার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। লাল রঙ উত্তেজনা এবং উদ্দীপনা বৃদ্ধি করতে পারে, যা কখনও কখনও চাপও বাড়াতে পারে। নীল রঙ মানসিক শান্তি বৃদ্ধি করে, যা মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় সহায়ক। সবুজ রঙ সমন্বয় এবং স্থিতিশীলতার অনুভূতি দেয়।

মানসিক স্বাস্থ্য প্রয়োগের ক্ষেত্রে এই ফলাফলগুলো গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, উদ্বেগ বা স্ট্রেসযুক্ত মানুষদের জন্য নীল বা সবুজ রঙের পরিবেশ তৈরি করা মানসিক চাপ হ্রাস করতে সহায়ক হতে পারে। অন্যদিকে কর্মক্ষমতা এবং উদ্দীপনা বৃদ্ধির জন্য লাল রঙ ব্যবহার করা যেতে পারে। স্কুল, অফিস বা মানসিক স্বাস্থ্য ক্লিনিকে রঙের ব্যবহারকে পরিকল্পিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

গবেষণা ফলাফল যথেষ্ট প্রমাণযোগ্য হলেও সীমাবদ্ধ কিছু দিকও রয়েছে। প্রথমত অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা সীমিত হওয়ায় বৃহৎ জনসংখ্যায় এই ফলাফল প্রয়োগ করা কঠিন। দ্বিতীয়ত মানসিক অবস্থা নিরীক্ষণের সময় অংশগ্রহণকারীর পূর্ব অভিজ্ঞতা এবং ব্যক্তিগত প্রেফারেন্সও প্রভাব ফেলতে পারে।

এই গবেষণা প্রমাণ করে যে রঙ মানুষের মেজাজ এবং মানসিক অবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। মানুষ সচেতন বা অচেতনভাবে রঙের প্রভাব অনুভব করে এবং সঠিক রঙের ব্যবহার জীবনযাত্রা ও মানসিক সুস্থতার উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে।

ভোজ্যতেল বাজারে শৃঙ্খলা ভাঙার অভিযোগ, মানা হচ্ছে না নির্ধারিত দাম

বাজারে ভোজ্যতেলের বিপণন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা না থাকা এবং সরকারি নির্ধারিত পরিমাপক ও মূল্য অমান্য করার অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের স্থানীয় বাজারদর-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লিটারে বিক্রির নির্দেশনা থাকলেও অনেক দোকানে তা মানা হচ্ছে না।বিশেষ করে পাম অয়েল সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে লিটারে ৫ টাকা বেশি বিক্রি হচ্ছে।

বাণিজ্যনীতি বিভাগের উপপ্রধান মো. মাহমুদুল হাসান স্বাক্ষরিত এই প্রতিবেদন সম্প্রতি বাণিজ্য সচিব বরাবর পাঠানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে তিনটি মূল পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

সরকার ৩ আগস্ট বোতলজাত ও খোলা সয়াবিন তেল এবং পাম অয়েলের দাম পুনর্নির্ধারণ করেছে। বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ১৮৯ টাকা ও পাঁচ লিটারের জন্য ৯২২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ১৬৯ টাকা এবং পাম অয়েলের দাম ১৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়।তবে স্থানীয় পর্যায়ে এই দাম যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা তা যাচাই করতে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন মাঠ পর্যায়ে মনিটরিং চালায়।

মাঠ পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, অনেক দোকানে ভোজ্যতেল লিটারের পরিবর্তে কেজি হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে। পাম অয়েলের ক্ষেত্রে সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে লিটারে ৫ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। প্রতিবেদনে এই অসংগতি দূর করার জন্য তিনটি সুপারিশ করা হয়েছে। প্রথমত খোলা ভোজ্যতেল বিক্রিতে লিটারকে একক হিসেবে বাধ্যতামূলক করা। দ্বিতীয়ত, পাম অয়েলের ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত মূল্য কার্যকর করতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের তৎপরতা বৃদ্ধি করা। তৃতীয়ত, মিলগেট, পরিবেশক, পাইকার এবং খুচরা বিক্রেতাদের ওপর মনিটরিং কার্যক্রম জোরদার করে ভোজ্যতেলের সরকারি দাম বজায় রাখা।

ভোক্তা অধিকার আন্দোলনের কর্মীরা বলছেন, ভোজ্যতেলের দাম সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী না থাকলে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সামান্য দাম বৃদ্ধিও তাদের দৈনন্দিন জীবনে চাপ সৃষ্টি করে। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা যুক্তি দেখাচ্ছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম ওঠানামার কারণে স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি দাম মেনে চলা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। তবে ভোক্তা সংগঠনগুলো মনে করেন, ব্যবসায়ীরা ইচ্ছাকৃতভাবে নানা অজুহাত দেখিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করছেন।

নির্বাচন নিয়ে অনেকের বক্তব্য জনমনে জিজ্ঞাসার জন্ম দিয়েছে : তারেক রহমান

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্প্রতি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আসন্ন জাতীয় নির্বাচন নিয়ে মন্তব্য করেছেন, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের ঘোষণার পর কিছু রাজনৈতিক নেতার বক্তব্য জনমনে নানা প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসা সৃষ্টি করেছে।

জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের ৪৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত আলোচনা সভায় ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তারেক রহমান বলেন, দেশে ফ্যাসিবাদ রোধে সংবিধান বা বিধি-বিধানের কোনো বিকল্প নেই। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে ফ্যাসিবাদ ঠেকাতে হলে জনগণকে রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী করার বিকল্প নেই।

তারেক রহমান আরও বলেন, সরাসরি ভোটের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন যার মাধ্যমে জনগণ রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়, তা হচ্ছে গণতন্ত্রের মূল মাধ্যম। তিনি উল্লেখ করেন, যদি জনগণ শক্তিশালী না হয়, তবে রাষ্ট্র ও সরকারও শক্তিশালী হতে পারে না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রতিটি নাগরিকের ভোট এবং রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে জনগণকে শক্তিশালী করা সম্ভব।

নেতা নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও জনগণের সচেতনতার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, “নির্ধারিত সময় নির্বাচন অনুষ্ঠান ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে আমাদের রাজপথের সহকর্মী যোদ্ধাদের কিছু রাজনৈতিক দলের বক্তব্য জনমনে জিজ্ঞাসা সৃষ্টি করেছে।”

তিনি আরও সতর্ক করেন, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দূরত্ব তৈরি হলে পতিত ফ্যাসিস্ট চক্র পুনরায় সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পাবে। তাই সারা দেশে গণতন্ত্রকামী জনগণকে সতর্ক ও সচেতন থাকার আহ্বান জানান।

তারেক রহমান বলেন, যদি জনগণের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে নানা রকম বাধা সৃষ্টি করা হয়, তাহলে গণতন্ত্রের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে।তিনি স্মরণ করান, স্বৈরাচারী শাসনের সময় কোনো রাজনীতিক বা তাদের পরিবার নিরাপদে ছিল না।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আরও বলেন, জনগণের সরাসরি ভোটের মাধ্যমে সরকারের দায়িত্ব নেওয়া হলে দেশ ও জনগণের কল্যাণে বিএনপির পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, জনগণের মনে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকতে হবে। তিনি মনে করিয়ে দেন, জনশক্তি ও জনবলই বিএনপির মূল শক্তি। এই বক্তব্যে তারেক রহমান নির্বাচনী প্রস্তুতি, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও রাজনৈতিক সচেতনতার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন এবং দলের নেতাকর্মীদের সতর্ক ও দায়িত্বশীল থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

ইস্তানবুলের বহুবর্ণ ইতিহাস ও নিঃসঙ্গতার স্মৃতিতে – ওরহান পামুক

বিশ্বসাহিত্যে এমন কিছু লেখক আছেন যাদের রচনা শুধু গল্প নয়, বরং ইতিহাস, দর্শন ও শহরের আত্মাকে ধারণ করে রাখে। তুরস্কের নোবেলজয়ী সাহিত্যিক ওরহান পামুক তাঁদের একজন। তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ “Istanbul: Memories and the City” কেবল ব্যক্তিগত স্মৃতির ভান্ডার নয়; এটি একই সঙ্গে একটি শহরের বহুবর্ণ ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং একান্ত ব্যক্তিগত নিঃসঙ্গতার দলিল। ইস্তাম্বুলকে ঘিরে পামুকের এই রচনা আধুনিক সাহিত্য পাঠকের জন্য হয়ে উঠেছে পরিচয়ের অনুসন্ধান, অতীতের উত্তরাধিকার এবং স্মৃতির বহমান প্রবাহ নিয়ে গভীর এক প্রতিফলন।

পামুকের কাছে ইস্তাম্বুল শুধু জন্মশহর নয়, বরং এক স্থায়ী আবেশ। শহরটি ইউরোপ ও এশিয়ার সীমানায় দাঁড়িয়ে, যেখানে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের ঐশ্বর্য, অটোমান সাম্রাজ্যের ঐতিহ্য এবং আধুনিক তুরস্কের রাজনৈতিক রূপান্তর মিলেমিশে আছে। এই অতীত ও বর্তমান, গৌরব ও পতন, পশ্চিম ও পূর্ব দ্বৈততা পামুকের লেখনীতে প্রতিনিয়ত প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি লিখেছেন, শহরের প্রতিটি অলিগলি যেন ইতিহাসের ভগ্নাংশ বহন করে, কিন্তু সেই ইতিহাস একই সঙ্গে বেদনার ছায়ায় আচ্ছন্ন।

“Istanbul”-এ পামুক একটি বিশেষ শব্দ ব্যবহার করেছেন—হুজুন (Hüzün)। এটি আরবি উৎস থেকে আসা, যার অর্থ একধরনের গভীর বিষণ্নতা। তবে ব্যক্তিগত বিষণ্নতা নয়, বরং এক সমষ্টিগত অনুভূতি। ইস্তাম্বুলের মানুষ তাদের প্রাক্তন গৌরবময় সাম্রাজ্যের পতনের পর যে শূন্যতা ও বেদনা বয়ে বেড়ায়, সেই হুজুনই শহরের আত্মাকে সংজ্ঞায়িত করে। পামুক মনে করেন, এই হুজুনই তাঁকে একজন লেখক হিসেবে গড়ে তুলেছে। একদিকে তিনি শহরের সৌন্দর্যে মোহিত হয়েছেন, অন্যদিকে পতনের নিদর্শন তাঁকে চিরস্থায়ী দুঃখবোধে আবদ্ধ করেছে।

এই বইয়ে পামুক তাঁর শৈশব, পরিবার, প্রেম ও নিঃসঙ্গতার কথা বলেছেন। তবে তা কেবল ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ নয়; বরং তাঁর জীবনের টুকরোগুলো শহরের বৃহত্তর স্মৃতির সঙ্গে মিশে গেছে। পরিবারের পতনোন্মুখ সম্পদ, ঘরোয়া দ্বন্দ্ব কিংবা দমবন্ধ করা সামাজিক প্রত্যাশা সবকিছু মিশে গেছে ইস্তাম্বুলের রাস্তাঘাট, ভগ্নপ্রাসাদ ও বসফরাস নদীর প্রতীকে। ফলে পাঠক একসঙ্গে লেখকের আত্মজীবনী ও একটি শহরের আত্মজীবনী পড়তে থাকে।

পামুক মূলত লেখক হলেও শৈশবে তিনি চিত্রশিল্পী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। তাঁর আত্মজীবনীতে চিত্রকলা, ইউরোপীয় শিল্প ও আলোকচিত্রের প্রভাব গভীরভাবে আলোচিত। বইটিতে প্রচুর সাদা-কালো ছবি ব্যবহার করা হয়েছে, যা পাঠককে কেবল পাঠ্য অভিজ্ঞতা দেয় না, বরং দৃষ্টির স্তরে শহরটিকে অনুভব করায়। তিনি ইস্তাম্বুলের ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাসাদ, জলপ্রাসাদ ও গলির ছবি দিয়ে দেখিয়েছেন কিভাবে দৃশ্যমান বস্তু আসলে অদৃশ্য ইতিহাস বহন করে।

“Istanbul”-এ একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পশ্চিমা ভ্রমণকারীদের চোখে ইস্তাম্বুল। পামুক এডওয়ার্ড সাঈদের ওরিয়েন্টালিজম-এর আলোকে দেখিয়েছেন, কিভাবে ইউরোপীয় লেখকরা ইস্তাম্বুলকে প্রাচ্য রহস্যের নগরী হিসেবে দেখেছেন, যেখানে অজানা ও অদ্ভুততাই মুখ্য। কিন্তু একজন স্থানীয় নাগরিক হিসেবে পামুক এই দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রশ্ন করেছেন। তিনি বুঝিয়েছেন, শহরকে বোঝার জন্য বাইরের চোখ যথেষ্ট নয়; দরকার ভেতরের মানুষের অভিজ্ঞতা ও স্মৃতি।

তুরস্কের সমাজ যেমন একদিকে আধুনিকীকরণের চাপে, অন্যদিকে ইসলামি ঐতিহ্যের শিকড়ে বাঁধা।তাই পামুকের আত্মজীবনেও সেই টানাপোড়েন উপস্থিত।তাঁর পরিবার আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও, শহরের ভগ্নপ্রাসাদে ঘুরে বেড়াতে গিয়ে তিনি বারবার ইতিহাসের দিকে টান অনুভব করেছেন। এই দ্বন্দ্বই আসলে তুরস্কের আধুনিক পরিচয়ের প্রতিচ্ছবি, যা পামুক নিজের জীবনের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন।

“Istanbul: Memories and the City” কেবল পামুকের গল্প নয়; বরং এটি আধুনিক মানুষের একাকীত্ব, স্মৃতি ও ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন তোলে। শহরকে ভালোবাসলেও তিনি বারবার এক অদৃশ্য বিচ্ছিন্নতা অনুভব করেছেন। এই অভিজ্ঞতা বিশ্বব্যাপী পাঠকের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে, কারণ নগরজীবনের মানুষ প্রায় সবাই কোনো না কোনোভাবে এই নিঃসঙ্গ ও বিচ্ছিন্ন।

পামুকের এই গ্রন্থে ভাষা কখনো কাব্যময়, কখনো বিশ্লেষণধর্মী। তিনি নিজের স্মৃতিকে ইতিহাস, স্থাপত্য ও দার্শনিক ভাবনার সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন।ফলে বইটি কেবল আত্মজীবনী নয়; এটি সাহিত্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক মিশ্র দলিল হয়ে উঠেছে। পাঠক বইটি পড়ে কেবল একজন লেখকের বেড়ে ওঠা জানে না, বরং ইস্তাম্বুল নামের বহুমাত্রিক শহরের আত্মার সঙ্গেও পরিচিত হয়।

ওরহান পামুকের “Istanbul: Memories and the City” আধুনিক সাহিত্যে একটি অনন্য দলিল। এখানে ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত স্মৃতি, ইতিহাস ও আধুনিকতা, হুজুন ও সৌন্দর্য একত্রে মিশেছে। পামুকের কলমে ইস্তাম্বুল হয়ে উঠেছে এক বহুবর্ণ বাস্তবতা, যেখানে পতনের ছায়া যেমন আছে, তেমনি আছে আশা ও পুনর্জন্মের সম্ভাবনা। ফলে এই বই কেবল আত্মজীবনী নয়; এটি এক শহরের জীবন্ত প্রতিকৃতি।

কেন রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাস চলনবিলে?

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার বুড়িপোতাজিয়ায় চলন বিলের শেষ প্রান্তে এসে মিলিত হয়েছে শতাধিক খাল, জলাভূমি এবং বড়ালসহ পঞ্চাশটিরও বেশি নদী। এসবের সম্মিলিত জলধারা মিলিত হয়েছে যমুনা নদীতে। এই জলপ্রবাহের পথ আটকে সেখানেই একটি স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

পরিবেশ ও পানি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এমন জলপ্রবাহের পথে কংক্রিটের কাঠামো তৈরি করা হলে একদিকে তা চলন বিলের জলজ বাস্তুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করবে এবং অন্যদিকে এই শক্তিশালী স্রোত বাধাগ্রস্ত হওয়ায় আশেপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা ও বন্যার প্রকোপ বাড়বে।

২০১৬ সালে একটি আইনের মাধ্যমে সিরাজগঞ্জে প্রতিষ্ঠিত হয় রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়। ২০১৮ সালের এপ্রিল থেকে এখানে ক্লাস শুরু হয়। বর্তমানে পাঁচটি বিভাগে মোট ১,২০০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। শিক্ষক রয়েছেন ৩৪ জন এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন ১৬১ জন। গত সাত বছর ধরে শাহজাদপুর শহরের আটটি ভাড়া করা ভবনে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম চলছে।

শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে, স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য শাহজাদপুর শহর থেকে প্রায় ১১ কিলোমিটার দূরে বুড়িপোতাজিয়ায় ১০০ একর জমি বরাদ্দ করা হয়। ক্যাম্পাসের নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদনের দাবিতে শিক্ষার্থীরা একাধিকবার সড়ক অবরোধও করেছেন।

একটি সরকারি সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত জায়গাটি প্রতি বছর চার মাস পানির নিচে থাকে। এটিকে ৯ থেকে ১৪ মিটার উঁচু করে ভরাট করতে ৩,৬৬১,৬৩০ ঘনমিটার বালুর প্রয়োজন হবে। ক্যাম্পাসে যাওয়ার জন্য একটি সড়ক ও একটি সেতু এবং ঢেউ থেকে রক্ষার জন্য বাঁধও নির্মাণ করতে হবে। শুধু এই কাজেরই আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৪.৪৮ বিলিয়ন টাকা।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, এরই মধ্যে চার একর জমি ভরাট করা হয়েছে, যা বড়াল নদীর প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে। যদি বাকি ৯৬ একর জমি ভরাট করা হয়, তাহলে বর্ষাকালে চলন বিল এবং বড়ালের জলপ্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। শুকনো মৌসুমে এই এলাকাটি গোচারণভূমি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্মাণকাজ হলে এই গোচারণভূমি কমে যাবে এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি তৈরি হবে।

বুড়িপোতাজিয়ায় ক্যাম্পাস নির্মাণের মোট আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৯.৬৭ বিলিয়ন টাকা, এর মধ্যে ৫.১৯ বিলিয়ন ক্যাম্পাস নির্মাণে এবং ৪.৪৮ বিলিয়ন জমি ভরাট, সেতু ও বাঁধ নির্মাণে। কেউ কেউ পরামর্শ দিয়েছেন এর পরিবর্তে ক্যাম্পাসটি সিরাজগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলে নির্মাণ করা যেতে পারে।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইট অনুসারে, এই অঞ্চলটি সিরাজগঞ্জ শহরের দক্ষিণ-পূর্বে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং এখানে ১,১৫৬ একর জমি রয়েছে।

রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এস এম হাসান তালুকদার প্রথম আলোকে বলেন, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী এটি এমন একটি স্থানে স্থাপন করতে হবে যা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতির সঙ্গে জড়িত। তিনি বলেন, “যথাযথ বিবেচনার পর এই স্থানটি ক্যাম্পাসের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “চলন বিলের জলপ্রবাহ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু আমরা প্রমাণ করেছি যে, শাহজাদপুর চলন বিলের নয়টি উপজেলার মধ্যে পড়ে না। প্রকল্পের স্থানটি চলন বিলের কেন্দ্র থেকে ৬৮ কিলোমিটার দূরে এবং ভূমিটি সরকারিভাবে জলাভূমি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ নয়। পরিবেশ অধিদপ্তর ইতিমধ্যে ২০১৯ সালে এই স্থানটির অনুমোদন দিয়েছে এই শর্তে যে ৩৩ একর জমিতে বনায়ন করা হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরামর্শ অনুযায়ী, প্রকল্পের নকশায় দুটি হ্রদ এবং তিনটি পুকুর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে”।

তবে চলন বিল রক্ষা আন্দোলনের সদস্য সচিব এস এম মিজানুর রহমান বলেন, “আমরাও একটি স্থায়ী ক্যাম্পাস চাই। কিন্তু অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ড ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চলন বিল এরই মধ্যে অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। যদি বুড়িপোতাজিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করা হয় তাহলে এটি হবে কফিনের শেষ পেরেক।”

চলন বিল ছয়টি জেলার ৪১টি উপজেলা জুড়ে ১,০০০ বর্গ কিলোমিটার বিস্তৃত। ঐতিহাসিক নথি অনুসারে, একসময় ৪৭টি নদী চলন বিলে প্রবাহিত হতো, সঙ্গে ছিল ৩০০টিরও বেশি খাল। এছাড়াও ১,২০,০০০ মাছের পুকুর অবৈধভাবে খনন করা হয়েছে, যা প্রাকৃতিক জলপ্রবাহকে আরও ব্যাহত করেছে। এই বিলে ১০৫ প্রজাতির দেশীয় মাছ, ২৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, সাত প্রজাতির উভচর প্রাণী, ৩৪ প্রজাতির পাখি এবং অসংখ্য জলজ উদ্ভিদ রয়েছে।

ঢাকা-পাবনা মহাসড়কে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ী নদী বন্দর থেকে একটি সরু পাকা সড়ক বাম দিকে মোড় নেয়। প্রায় এক কিলোমিটার ইটের রাস্তা পেরিয়ে, যা গৃহহীনদের আশ্রয়কেন্দ্র দিয়ে ঘেরা, তারপর আসে লাউতারা স্লুইস গেট। সেখান থেকে নৌকায় আরও ১৫ মিনিট লাগে।

মাঝখানে একটি দ্বীপের মতো জমির টুকরো বুড়িপোতাজিয়া। এখানে ভেড়া, ছাগল ও ঘোড়া চরে। এই জায়গাটিতে প্রস্তাবিত রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সাইনবোর্ড দাঁড়িয়ে আছে।

শুক্রবার বিকেলে সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, চারপাশে পানি এবং মাঝখানে একটি সাইনবোর্ড রয়েছে যেখানে লেখা: রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের স্থায়ী ক্যাম্পাসের স্থান। জমির পরিমাণ: ১০০ একর।

চলন বিল রক্ষা কমিটি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার কাছে ক্যাম্পাস স্থানান্তরের অনুরোধ জানিয়ে একটি চিঠি জমা দিয়েছে। মঙ্গলবার কমিটি পাবনার চাটমোহর প্রেসক্লাবে একটি সংবাদ সম্মেলনও করেছে, যেখানে তারা নির্বাচিত স্থানটির প্রতি আপত্তি জানিয়েছে।

মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে সদস্য সচিব এস এম মিজানুর রহমান লিখেছেন, “পদ্মা, আত্রাই, বড়াল, নন্দকুজা এবং গুমানী নদী, সমস্ত খাল ও জলাভূমি চলন বিলের পানির উৎস। এই বিশাল জলপ্রবাহের যমুনায় মিশে যাওয়ার একমাত্র পথ শাহজাদপুরের বুড়িপোতাজিয়ায়। তবুও এখানেই রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবিত স্থানটি বেছে নেওয়া হয়েছে। বালু দিয়ে জমি ভরাট করার কারণে বিলের এই প্রবেশপথটি এরই মধ্যে সরু হয়ে গেছে। যদি এই বিশাল জলাভূমির প্রবেশমুখে বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থাপন করা হয়, তাহলে এটি এক হাজার বর্গ কিলোমিটার জুড়ে চলন বিলে জলাবদ্ধতা ও দুর্যোগের কারণ হবে।”

নৌকায় করে আসা সুমন হোসেন বলেন, তিনি শুনেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সেখানে মাটি ফেলা হয়েছে। “বছরের অর্ধেক সময় এই এলাকা পানির নিচে থাকে। শিক্ষার্থীরা এখানে নৌকা করে খেলতে আসে। শুকনো মৌসুমে তারা হেঁটে আসে।”

বুড়িপোতাজিয়ার কাছেই লাউতারা বাজারে এক মুদি দোকানি বলেন, “আমরা শুনি বিলের ভেতরে বিশ্ববিদ্যালয় হবে। কিন্তু কোনো ভালো রাস্তা নেই। বছরের অর্ধেক সময় পানির নিচে থাকে। কীভাবে এটা হবে, জানি না।”

বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি সম্পদ প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আতাউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, “আমাদের পানি আইনে স্পষ্ট বলা আছে যে, নদী ও জলপ্রবাহের পথ বাধাগ্রস্ত করে এমন কোনো কাজ করা যাবে না। কোনো প্রকল্প বা নির্মাণকাজ হাতে নেওয়ার আগে সম্ভাব্যতা যাচাই এবং পরিবেশগত মূল্যায়ন অবশ্যই করতে হবে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় মানেই পরিবহন, আবাসন এবং অবকাঠামো। এর পরিবেশগত প্রভাব জলজ জীবনের ওপর, বাস্তুতন্ত্রের ওপর একটি যোগ্য প্রতিষ্ঠান দিয়ে সঠিকভাবে গবেষণা করা উচিত।”

ভারত-চীন কূটনৈতিক সম্পর্কের ধারাবাহিক অগ্রগতি নিয়ে আশাবাদী মোদি

দীর্ঘদিনের উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কের পর ভারত ও চীনের সম্পর্ক ক্রমাগত উন্নতির দিকে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সম্প্রতি চীনের শীর্ষ কূটনীতিক ওয়াং ই-এর সঙ্গে বৈঠকে তিনি এই আশা প্রকাশ করেন। এটি এমন এক সময়ে ঘটছে যখন ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতির কারণে বিশ্ব অর্থনীতির প্রেক্ষাপট বদলে যাচ্ছে এবং এশিয়ার এই দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের সম্পর্ক নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর সঙ্গে দিল্লিতে বৈঠকের পর মোদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি ভারত ও চীনের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট ও সংবেদনশীল বিষয়ে সম্মান প্রদর্শনের কথা উল্লেখ করেন। অন্যদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে যে, দুই দেশ এখন ‘স্থিতিশীল উন্নয়নের পথে’ প্রবেশ করেছে এবং তাদের একে অপরের প্রতি ‘বিশ্বাস ও সমর্থন’ থাকা উচিত।

ওয়াং গত সোমবার ভারতে পৌঁছান এবং তিনি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গেও বৈঠক করেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দোভালের সঙ্গে বৈঠকে ‘উত্তেজনা কমানো, সীমারেখা নির্ধারণ এবং সীমান্ত-সংক্রান্ত বিষয়’ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

২০২০ সালের আন্তসীমান্ত সংঘাতের পর দুই দেশের সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায়। ওই সংঘর্ষে ২০ ভারতীয় সেনা এবং চার চীনা সেনা নিহত হয়েছিলেন, যা কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক সংঘাত ছিল। এই ঘটনার পর উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগ স্থগিত হয়ে যায়। সম্প্রতি ওয়াং বলেন যে, ‘গত কয়েক বছরে আমরা যে সমস্যাগুলো দেখেছি, তা আমাদের দুই দেশের মানুষের স্বার্থে ছিল না।’ তিনি সীমান্তে ফিরে আসা স্থিতিশীলতা দেখে আনন্দ প্রকাশ করেন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মোদি সীমান্তে শান্তি বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন এবং সীমান্ত প্রশ্নে ‘ন্যায্য, যুক্তিসংগত ও পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য সমাধান’ নিশ্চিত করতে ভারতের প্রতিশ্রুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

ভারত ও চীনের মধ্যে সম্পর্কের এই উন্নতি এমন এক সময়ে হচ্ছে যখন নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটনের মধ্যে টানাপোড়েন চলছে। রাশিয়া থেকে ভারতের তেল কেনা চালিয়ে যাওয়ার কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করার পর এই তিক্ততা দেখা দেয়।

২০২০ সালের লাদাখ সীমান্তে সংঘর্ষের পর দুই পক্ষই বিপুল সংখ্যক সেনা মোতায়েন করেছিল, যার প্রভাব পড়েছিল বাণিজ্য, কূটনীতি এবং উড়োজাহাজ চলাচলের ওপর। তবে গত বছর দুই দেশের মধ্যে সীমান্তে টহল এবং কিছু এলাকা থেকে অতিরিক্ত সেনা সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে চুক্তি হয়েছে।

সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে সরকারি পর্যায়ের সফর বেড়েছে এবং কিছু বাণিজ্যিক ও যাতায়াত সংক্রান্ত বিধিনিষেধ শিথিল করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।গত মাসে বেইজিং ভারতীয় তীর্থযাত্রীদের তিব্বতে ধর্মীয় স্থান পরিদর্শনের অনুমতি দিয়েছে এবং দুই দেশ সরাসরি ফ্লাইট চালুর চেষ্টা করছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, উভয় দেশ তাদের ৩ হাজার ৪৮৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তে তিনটি পয়েন্ট দিয়ে বাণিজ্য পুনরায় চালু করার বিষয়ে আলোচনা করছে। পর্যবেক্ষক রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ফেলো মনোজ যোশী মনে করেন, দুই দেশের সীমান্ত সমস্যার সমাধান করতে হলে সর্বোচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক সমঝোতা প্রয়োজন।

ডিজাইন থেকে লিজেন্ড কিংবদন্তি গাড়ির লোগো

গাড়ির লোগো শুধু একটি সিম্বল নয়; এটি একটি ব্র্যান্ডের ইতিহাস, দর্শন ও আবেগের সংমিশ্রণ। বিশ্বের নামকরা গাড়ি কোম্পানিগুলি তাদের লোগোর মাধ্যমে কেবল পরিচয়ই প্রতিষ্ঠা করে না, বরং নির্দিষ্ট মূল্যবোধ ও ভিজ্যুয়াল কাহিনীও প্রকাশ করে।

আইকনিক লোগো ডিজাইন কেবল ব্র্যান্ডের পরিচয় নয়; এটি একটি ভিজ্যুয়াল গল্প, যা ব্যবহারকারীর সঙ্গে আবেগের সংযোগ স্থাপন করে। ফোর্ড থেকে জগুয়ার পর্যন্ত এই লোগোগুলো বিভিন্ন ভিজ্যুয়াল কৌশল ব্যবহার করে ব্র্যান্ডের ইতিহাস, দর্শন ও মূল্যবোধকে প্রকাশ করেছে। আধুনিক ডিজাইন শিক্ষার্থী বা ক্রিয়েটিভ প্রফেশনালের জন্য এটি একটি প্রমাণ যে, লোগো ডিজাইন কেবল চেহারার বিষয় নয়, বরং শক্তিশালী কমিউনিকেশন ও ব্র্যান্ড স্টোরিটেলিং-এর মাধ্যম।

ফোর্ড (Ford)
ফোর্ডের লোগো হল সাদা বর্ণের লেখা নীল ওভালে। হেনরি ফোর্ডের ব্র্যান্ডের ঐতিহ্য এবং বিশ্বস্ততার ধারণা এই লোগোতে প্রতিফলিত। ওভাল আকারটি দৃঢ়তা ও স্থায়িত্বের প্রতীক, আর নীল রঙ বিশ্বাসযোগ্যতা ও পেশাদারিত্বকে ফুটিয়ে তোলে। ফোর্ডের লোগোতে টাইপোগ্রাফির সরলতা ব্র্যান্ডের প্রায়শই ‘সবাই ব্যবহার করতে পারে এমন’ দর্শনকে প্রকাশ করে।

মার্সেডিজ-বেঞ্জ (Mercedes-Benz)
তিন প্রান্তবিশিষ্ট তারকা এ লোগো বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এই তারকা আকাশ, ভূমি ও জল সব পরিবহন মাধ্যমের নিয়ন্ত্রণের প্রতীক হিসেবে তৈরি। মার্সেডিজের লোগোতে সিমেট্রি এবং জ্যামিতিক নিখুঁততা প্রিমিয়াম এবং শাশ্বত মানের বার্তা দেয়। এটি দেখায় কিভাবে লোগোতে জ্যামিতি ব্র্যান্ডের সিগনেচার বৈশিষ্ট্য হতে পারে।

বিএমডাব্লিউ (BMW)
বিএমডাব্লিউ লোগোতে কেন্দ্রীয় অংশে নীল ও সাদা চেকারড প্যাটার্ন রয়েছে, যা বাভারিয়ার পতাকার রঙ থেকে অনুপ্রাণিত। এটি শুধু কোম্পানির উৎপত্তিস্থলকে চিহ্নিত করে না, বরং ‘উড়ন্ত হুইল’ হিসেবে প্রাথমিক বিমান ইঞ্জিন তৈরির ইতিহাসের রেফারেন্সও রাখে। লোগোর ডিজাইন রাউন্ড আকার এবং ক্লিন লাইনস দিয়ে গতিশীলতা ও নির্ভরযোগ্যতার বার্তা দেয়।

টয়োটা (Toyota)
টয়োটার তিনটি ওভাল একে অপরের মধ্যে সমন্বিত। কেন্দ্রের ওভাল গ্রাহক এবং ব্র্যান্ডের সম্পর্ককে বোঝায়, আর বাইরের দুটি ওভাল বিশ্বমানের কৌশল ও প্রযুক্তির প্রতীক। লোগো ডিজাইন করলে যে জ্যামিতিক ভারসাম্য ও নিখুঁততা আসে, তা টয়োটার ‘কোয়ালিটি এবং নির্ভরযোগ্যতা’ ইমেজকে শক্তিশালী করে।

ফেরারি (Ferrari) – ফেরারির লোগোতে একটি কালো ঘোড়া হলুদ ব্যাকগ্রাউন্ডে স্থাপিত। ঘোড়ার প্রাণবন্ত পোজ এবং স্পোর্টস কারের দ্রুততা এক সঙ্গে ফুটে ওঠে। হলুদ রঙ মিলান শহরের সরকারি রঙের সম্মান প্রকাশ করে। এটি দেখায় কিভাবে রঙ এবং প্রতীক মিলিয়ে লোগোতে শক্তিশালী ব্র্যান্ড স্টোরি বলা যায়।

ল্যাম্বোরগিনি (Lamborghini)
ল্যাম্বোরগিনির লোগোতে সোনালী ষাঁড় একটি কালো শিল্ডের মধ্যে অবস্থান করছে। ষাঁড় সাহস, শক্তি এবং গাড়ির আগ্রাসী পারফরম্যান্সের প্রতীক।লোগো ডিজাইনে শক্তিশালী কনট্রাস্ট এবং রূপকতা ব্যবহার করে ব্র্যান্ডের এক ধরণের অ্যাটিটিউড তৈরি হয় যা দর্শককে অবিলম্বে আকৃষ্ট করে।

পোরশে (Porsche)
পোরশে লোগোতে স্টুটগার্ট শহরের কোডিনেটেড ভিজ্যুয়াল দিয়ে ট্র্যাডিশনাল শিল্ড আকার ব্যবহার করা হয়েছে। হরিণ এবং হরিণের শিকড় থেকে অনুপ্রাণিত এই লোগো শহরের এবং কোম্পানির ঐতিহ্য তুলে ধরে। এতে রঙ, শিল্ড এবং বিশদ প্রতীকগুলোর সমন্বয় ব্র্যান্ডের বিলাসিতা ও শক্তি নির্দেশ করে।

জগুয়ার (Jaguar) – জগুয়ার লোগোতে ঝাঁপ দিচ্ছে এমন একটি বাঘের ছবি রয়েছে। এটি গতিশীলতা, স্পোর্টস পারফরম্যান্স এবং বিলাসিতার সঙ্গে সম্পর্কিত। লোগোটি তীক্ষ্ণ লাইন ও ডাইনামিক পোজ ব্যবহার করে ব্র্যান্ডের অ্যাটিটিউডকে প্রকাশ করে।

অস্তিত্বের অস্থিরতা থেকে সামষ্টিক রাজনীতির আখ্যানে : শহীদুল জহির

শহীদুল জহির বাংলা সাহিত্যের এক ব্যতিক্রমী ও বিস্ময়কর প্রতিভা। তাঁর লেখনী প্রচলিত ধারার বাইরে পাঠককে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতার জগতে টেনে নিয়ে যায়। গল্পে অতি-বাস্তবতার মিশেল, সময় ও স্থানের বিচিত্র ব্যবহার এবং চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। তাঁর সাহিত্যকর্মের মূল উপজীব্য বিষয়গুলোর মধ্যে অস্তিত্ববাদী বেদনা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এই দুটি ধারণা তাঁর গল্পের পরতে পরতে এমনভাবে মিশে আছে যে, একটিকে অন্যটি থেকে আলাদা করা কঠিন।

শহীদুল জহিরের গল্পে অস্তিত্ববাদী বেদনা কোনো বিমূর্ত দার্শনিক ধারণা নয়, বরং তা আমাদের প্রতিদিনকার জীবনের এক নির্মম বাস্তবতা।অস্তিত্ববাদীরা মানুষের জীবনের অর্থহীনতা, একাকিত্ব এবং স্বাধীন ইচ্ছার ওপর জোর দেন। জহিরের চরিত্রগুলো প্রায়শই এই অস্তিত্ববাদী সংকটে ভোগে। তারা নিজেদের জীবনের অর্থ খুঁজে ফেরে, কিন্তু সমাজ, পরিবার এবং রাষ্ট্রের চাপে পিষ্ট হয়ে অবশেষে এক গভীর শূন্যতায় ডুবে যায়। “কাঠের কাজ” গল্পে রিকশাচালক মান্নান বা “ডুমুর খেলা”-র চরিত্রদের দিকে তাকালে এই বেদনা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাদের জীবন যেন এক অনন্ত যন্ত্রণা, যেখানে বেঁচে থাকাটা কেবলই এক যান্ত্রিক প্রক্রিয়া। এই চরিত্রগুলোর মধ্যে আমরা নিজেদের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই, যারা প্রতিদিন নিজেদের অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে। তাদের ক্ষুদ্র জীবন, ছোট চাওয়া-পাওয়া, এবং ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে জহির আমাদের এক বৃহত্তর জীবনের অর্থহীনতার সামনে দাঁড় করিয়ে দেন। এই বেদনা শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং তা সমাজের এক সামগ্রিক প্রতিচ্ছবি।

অন্যদিকে শহীদুল জহিরের গল্পে রাজনৈতিক বাস্তবতা কোনো সরাসরি রাজনৈতিক স্লোগান বা আন্দোলনের বর্ণনা নয়। বরং তা সমাজের গভীরে প্রবহমান এক অদৃশ্য শক্তি, যা মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই রাজনীতি কখনো রাজনৈতিক দলের ছদ্মবেশে আসে না, তা ক্ষমতার সম্পর্ক, সামাজিক বৈষম্য এবং ইতিহাসের নির্মম দিকগুলোর মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়। “ডুমুর খেলা” গল্পে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার সময়ের স্মৃতি, “আবু ইব্রাহীমের মৃত্যু”তে সমাজের ক্ষমতাবানদের দাপট, এবং “আমাদের কুটির”-এ পুরনো ঢাকার সংকীর্ণ গলিতে লুকিয়ে থাকা রাজনৈতিক ক্ষমতার জটিল সমীকরণ – এই সবই তাঁর গল্পের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে তুলে ধরে। জহির দেখান, কীভাবে ক্ষমতা মানুষের মানবিকতাকে গ্রাস করে, কীভাবে সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক খেলার ঘুঁটি হয়ে যায়। তাঁর গল্পে ইতিহাস এবং বর্তমান একাকার হয়ে যায় এবং আমরা দেখি ইতিহাস কোনো অতীত ঘটনা নয়, বরং তা বর্তমানের ওপর এক নিরন্তর প্রভাব।

শহীদুল জহিরের গল্পে অস্তিত্ববাদী বেদনা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা পরস্পরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং সমাজের কাঠামোগত বৈষম্যই মানুষের অস্তিত্ববাদী সংকটের জন্ম দেয়। যখন কোনো মানুষ বা সম্প্রদায় তার স্বাধীনতা হারায়, যখন তার জীবনের লক্ষ্য নির্ধারিত হয় অপরের দ্বারা, তখন তার জীবনে অর্থহীনতার সৃষ্টি হয়। “জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা” গল্পের নামই এই সংযোগের ইঙ্গিত দেয়। এই গল্পে আমরা দেখি, রাজনৈতিক অস্থিরতা কীভাবে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে ওলটপালট করে দেয়, কীভাবে একটি পরিবারের সুখ-শান্তি কেড়ে নেয়।চরিত্রগুলো নিজেদের জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং অসহায় হয়ে পড়ে। এই অসহায়ত্ব থেকেই জন্ম নেয় গভীর অস্তিত্ববাদী শূন্যতা।

জহির এই দুটি বিষয়কে অসাধারণ শিল্পকুশলতায় একত্রিত করেন। তিনি কেবল রাজনৈতিক সমস্যা বা ব্যক্তিগত দুঃখের কথা বলেন না, দেখান কীভাবে একটি আরেকটির জন্ম দেয়। তাঁর লেখনী এই জটিল আন্তঃসম্পর্ককে এমনভাবে তুলে ধরে যে, পাঠক নিজেদের চারপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর দিকে নতুন চোখে তাকাতে বাধ্য হন। তিনি প্রচলিত কথাসাহিত্যের বাইরে গিয়ে এক নতুন ভাষা ও শৈলী তৈরি করেন। তাঁর গল্পের নির্মাণশৈলী প্রায়শই রৈখিক নয়, বরং তা সময় ও স্থানের সীমারেখাকে ভেঙে দেয়। এটি তাঁর গল্পের এক অন্যতম শক্তি, যা পাঠককে গভীরে যেতে এবং নতুন নতুন অর্থ খুঁজে বের করতে উৎসাহিত করে।

শহীদুল জহিরের সাহিত্য কেবল কিছু গল্প বা ঘটনা নয়, বরং তা মানুষের অস্তিত্ব, সমাজ এবং ইতিহাসের এক গভীর পাঠ। তাঁর গল্পে যে বেদনা ও বাস্তবতা ফুটে ওঠে, তা চিরন্তন এবং সর্বজনীন। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন, আমাদের চারপাশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং আমাদের ব্যক্তিগত অস্তিত্ব একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। শহীদুল জহিরের সাহিত্য পাঠ করা মানে নিজের ভেতরের শূন্যতা এবং বাইরের পৃথিবীর জটিলতার মুখোমুখি হওয়া। তাঁর গল্প আজও সমান প্রাসঙ্গিক, তিনি এমন কিছু বিষয় নিয়ে লিখেছেন যা মানুষ হিসেবে আমাদের চিরন্তন প্রশ্নগুলোর সাথে জড়িত। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, কীভাবে ক্ষুদ্র জীবনের মধ্যেও বৃহৎ সত্য লুকিয়ে থাকে।

আশ্রয়ের বদলে যখন ঘর হয়ে ওঠে আতঙ্কের ঠিকানা

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (ASK) প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বছর প্রতি মাসে গড়ে ১৯ জন নারী স্বামীর হাতে নিহত হয়েছেন।

গত ১৩ আগস্ট রাতে রাজধানীর শেওড়াপাড়ায় মাত্র ২৫ বছর বয়সী চার সন্তানের মা সায়েদা ফাহমিদা তাহসিন কেয়া নিহত হন। পরিবারের অভিযোগ তাঁকে হত্যা করেছেন স্বামী সিফাত আলী। প্রথমে বিষয়টিকে আত্মহত্যা হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন তিনি। কেয়ার বাবা-মায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, সেদিন রাতে তিনি রান্নাঘরে মাংস রান্না করছিলেন। “আধা মাংস চুলায় দেওয়া ছিল, বাকিটা এখনো রাখা। এমন অবস্থায় হঠাৎ করে কীভাবে আত্মহত্যা সম্ভব?”—প্রশ্ন তোলেন তাঁরা।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, কেয়ার বড় মেয়ে জানিয়েছে সেদিন সিফাত বাসায় ফিরে মায়ের সঙ্গে ঝগড়ায় জড়িয়ে তাঁকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করেন। পরে ঘরের দরজা বন্ধ করে দেন। কিছু সময় পর কেয়ার পরিবারকে ফোন করে জানান তিনি অসুস্থ। কিন্তু হাসপাতালে ছুটে গিয়ে পরিবার জানতে পারে কেয়া মারা গেছেন। এরপর সিফাত লাশ ফেলে রেখে পালিয়ে যায়, সন্তানদের দিয়ে যায় তাঁর বোনের কাছে।

এর ঠিক এক সপ্তাহ আগেই গাজীপুরের কাশিমপুরে আরেক তরুণী মা দুই সন্তানের জননী ১৯ বছরের জেমি স্বামী রাকিব হাসানের হাতে বালিশ চাপা দিয়ে খুন হন বলে অভিযোগ ওঠে।

এই ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তবে অধিকারকর্মীদের মতে, স্বামীর হাতে স্ত্রী খুন হওয়া বাংলাদেশে নিত্যদিনের বাস্তবতা। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ৩৬৩টি গৃহহিংসার ঘটনা রেকর্ড হয়েছে, যেখানে ৩২২ জন নারী নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৩৩ জনকে হত্যা করেছে তাঁদের স্বামী, ৪২ জনকে শ্বশুরবাড়ির লোকজন, আর ৩৩ জনকে নিজের পরিবারের সদস্যরা। অর্থাৎ চলতি বছরে প্রতি মাসে গড়ে ১৯ জন নারী স্বামীর হাতে খুন হয়েছেন।

জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সহিংসতার বিষয়ে ১৭,৩৪১টি কল এসেছে, এর মধ্যে স্বামীর নির্যাতনের অভিযোগ ৯,৩৯৪টি। একই সময়ে জাতীয় মহিলা ও শিশু নির্যাতন নিরসন সেল (১০৯)-এ ২৯,১৬১টি শারীরিক নির্যাতন ও ১৯,৫৮৪টি মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ রেকর্ড হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ ‘ভায়োলেন্স এগেইনস্ট উইমেন সার্ভে ২০২৪’-এ আরও ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ২৭,৪৭৬ নারীর মধ্যে ৭০ শতাংশ জানিয়েছেন, জীবনে অন্তত একবার কোনো না কোনো ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁদের ৫৪ শতাংশ বলেছেন, স্বামী থেকেই তাঁরা শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। কিন্তু এর বিপরীতে ৬৪ শতাংশ নারী এসব ঘটনা কাউকে জানান না, আর মাত্র ৭.৪ শতাংশ আইনি পদক্ষেপ নেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নীরবতার মূল কারণ হলো পারিবারিক সুনামের ভয়, সন্তানদের ভবিষ্যৎ চিন্তা এবং সমাজে নির্যাতনের স্বাভাবিকীকরণ।মানবাধিকারকর্মী শাহীন আনাম বলেন, “যদি স্বামী হাত তোলে এবং বড় কোনো আঘাত না হয়, অনেক সময় পরিবার এটিকে প্রতিবাদযোগ্য বলে মনে করে না। গরিব পরিবারের মেয়েরা আরও বেশি অসহায় কারণ বাবা-মা সমাজের ভয়ে ও আর্থিক অক্ষমতায় মেয়েকে ফিরিয়ে নিতে চান না।”

বাংলাদেশ ১৯৭৯ সালে সিডও (CEDAW) এবং ১৯৮৯ সালে শিশুর অধিকার সনদে সই করেছে। এসব প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে সরকার ২০১০ সালে “গৃহহিংসা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন” প্রণয়ন করে। আইনে সুরক্ষা আদেশ, বসবাসের অধিকার, ক্ষতিপূরণ এবং সন্তানের হেফাজতের মতো বিধান রয়েছে। কিন্তু এর কার্যকর প্রয়োগ খুবই দুর্বল। ২০২০ সালে ঢাবির আইন বিভাগের অধ্যাপক তসলিমা ইয়াসমিনের নেতৃত্বে পরিচালিত অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের এক গবেষণায় দেখা যায়, আইনটি সম্পর্কে ভুক্তভোগী, স্থানীয় প্রশাসন এমনকি অনেক এনজিওকর্মীরও সচেতনতা নেই। অধিকাংশ নারীই আইনটির নাম শোনেননি।

অপর এক বড় বাধা হলো আশ্রয়কেন্দ্র ও পুনর্বাসনের অভাব। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্যমতে, বাংলাদেশে মাত্র ১৩টি সরকারি দীর্ঘমেয়াদি আশ্রয়কেন্দ্র এবং কিছু স্বল্পমেয়াদি ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার আছে। কয়েকটি এনজিওর আশ্রয়কেন্দ্র মিলিয়েও মোট সংখ্যা ৩৬-এর বেশি নয়। অথচ দেশে প্রায় ৮ কোটি নারী ও ৬ কোটি শিশু রয়েছে।

শাহীন আনাম বলেন, “আমি এক নারীর কাছে জানতে চেয়েছিলাম কেন মামলা করলেন না। তিনি বললেন, ‘স্বামীকে গ্রেপ্তার করলে সন্তানদের খাওয়াবো কী দিয়ে?’” অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা ভুক্তভোগীদের আইনি পথে না যেতে বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম মনে করেন, নারীদের নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতায়ন জরুরি। “সমাজকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যেখানে নারীর প্রতি সহিংসতার কোনো জায়গা থাকবে না,” বলেন তিনি।

সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলো শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত গৃহহিংসার প্রতিফলন। আইন থাকলেও তার প্রয়োগ দুর্বল, আশ্রয়কেন্দ্র ও পুনর্বাসন সেবা অপর্যাপ্ত। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।