Home Blog Page 29

প্রাচীন নির্মাণ কলার টেকসই আধুনিক রূপ

কব (Cob )

কব হলো এক ধরনের প্রাচীন নির্মাণ উপকরণ যা কাদা সমৃদ্ধ মাটি, খড় এবং পানির মিশ্রণে তৈরি হয়। এটি সহজলভ্য, টেকসই এবং প্রাকৃতিক, যা প্রাচীনকাল থেকে মানুষের বাসস্থান নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে।

কবের উপাদান ও প্রকৃতি:

কবের প্রধান উপাদানগুলো খুবই সহজলভ্য। মাটি এবং খড়ের মিশ্রণ পানি দিয়ে তৈরি করা হয়। এটি পরিবেশবান্ধব এবং প্রাকৃতিকভাবে শক্তিশালী কাঠামো নির্মাণে সহায়তা করে।

প্রাচীন ব্যবহার ও ইতিহাস:

কব পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন নির্মাণ উপকরণগুলোর মধ্যে একটি। প্রায় ৭০০০–৮০০০ বছর আগে মানুষ এই উপকরণ ব্যবহার শুরু করেছিল। বিশেষ করে ইউরোপ, আফ্রিকা এবং এশিয়ার গ্রামাঞ্চলের মানুষরা তাদের ঘর, গোডাউন এবং প্রাথমিক সমাজিক কাঠামো নির্মাণে কব ব্যবহার করত। ইউরোপের ইংল্যান্ড, ফ্রান্স এবং জার্মানির গ্রামীণ এলাকায় এখনও অনেক প্রাচীন কবের ঘর রয়েছে, যেগুলো শত শত বছরেও টিকে আছে। আফ্রিকায় বিশেষ করে মরুভূমি অঞ্চলে, স্থানীয় জনগণ কব ব্যবহার করে ঘর ও মাটির গম্বুজের তৈরি স্থাপনা করত। এশিয়ার গ্রামাঞ্চলেও কৃষক সমাজ মূলত নিজেদের পরিবারের জন্য ঘর বানাতে কব ব্যবহার করত, যা স্থানীয় পরিবেশ ও আবহাওয়ার সঙ্গে সম্পূর্ণ মানানসই ছিল। এই ইতিহাস প্রমাণ করে কব শুধুমাত্র নির্মাণ উপকরণ নয়, বরং মানুষের প্রাথমিক সমাজ ও জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত এক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।

বৈশিষ্ট্য:
কব দীর্ঘস্থায়ী এবং পরিবেশের প্রভাবের সঙ্গে মানিয়ে চলে। এটি উষ্ণ ও শীত প্রতিরোধী, এবং প্রাকৃতিকভাবে সুরক্ষিত। এছাড়া এটি সহজেই সংস্কারযোগ্য।

আধুনিক পুনরুজ্জীবন:
সাম্প্রতিক সময়ে স্থপতি ও ডিজাইনাররা কবকে পুনরায় ব্যবহার করছেন। কারণ এটি কম কার্বন নির্গমনের কারণে পরিবেশবান্ধব এবং টেকসই নির্মাণের জন্য আদর্শ প্রমাণিত হয়েছে।

নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন:
গবেষকরা নতুন পদ্ধতিতে কব ব্যবহার করে কাঠামো নির্মাণের চেষ্টা করছেন। এটি আধুনিক ডিজাইন অনুযায়ী কাস্টমাইজ করা সম্ভব এবং দ্রুত নির্মাণেও সহায়তা করে।

পরিবেশগত গুরুত্ব:
কব ব্যবহারে কংক্রিট বা ইস্পাতের তুলনায় পরিবেশের ওপর প্রভাব অনেক কম। স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করে নির্মাণ খরচও কম হয়, ফলে এটি টেকসই ও অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর।

স্থাপত্যিক আবেদন:
কবের মিশ্রণ প্রাকৃতিক রং ও নকশা গ্রহণ করতে পারে। ফলে এটি আধুনিক ও ঐতিহ্যবাহী উভয় ধরনের স্থাপত্যে মানিয়ে যায়।

বৈশ্বিক ব্যবহার:
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আবারও কবের ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি আবারও ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার গ্রামাঞ্চলে এটি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।আধুনিক স্থাপত্যেও গবেষকরা নতুনভাবে কব ব্যবহার করছেন। কব হলো প্রাচীন নির্মাণ কলার সঙ্গে আধুনিক স্থাপত্যের এক সেতুবন্ধন। এটি পরিবেশবান্ধব, টেকসই এবং ভবিষ্যতের নির্মাণের জন্য সম্ভাবনাময় উপকরণ।

আধুনিক ফরাসি কবিতা ও চিত্রকল্পের জগতে – বোদলেয়ারের সিম্বলিজম

ফরাসি কবি শার্ল বোদলেয়ার (Charles Baudelaire) কেবল উনিশ শতকের একজন কবি নন, বরং আধুনিক কবিতার এক নতুন দিগন্তের উন্মোচক। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘লে ফ্ল্যুর দ্যু মাল’ (Les Fleurs du Mal) আধুনিক সাহিত্যের ইতিহাসে এক বিপ্লবী পদক্ষেপ। রোমান্টিকতার উচ্ছ্বাস এবং বাস্তববাদের নীরস বর্ণনাকে অতিক্রম করে বোদলেয়ার এক নতুন কাব্যভাষা তৈরি করেন, যা পরবর্তীকালে সিম্বলিস্ট আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপন করে।

বোদলেয়ারের সাহিত্যকর্ম বোঝার জন্য প্রতীকবাদের মূল ধারণাটি বোঝা জরুরি। প্রতীকবাদীরা বিশ্বাস করতেন যে বাস্তব জগৎ কেবল চোখের দেখা নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক গভীর আধ্যাত্মিক এবং রহস্যময় জগৎ। তাঁদের মতে, একজন কবির কাজ হলো এই অদৃশ্য জগতের সঙ্গে দৃশ্যমান জগতের যোগসূত্র স্থাপন করা। প্রতীক হলো সেই মাধ্যম, যা এই দুই জগতের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করে।

বোদলেয়ারের এই দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর বিখ্যাত সনেট ‘Correspondances’-এ স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। তিনি বলেন, “প্রকৃতি হলো একটি মন্দির, যার জীবন্ত স্তম্ভগুলো কখনও কখনও অস্পষ্ট শব্দ উচ্চারণ করে; মানুষ সেই বনের মধ্য দিয়ে যায় যেখানে প্রতীকগুলো তাকে পর্যবেক্ষণ করে।” এই পঙক্তিটি প্রতীকবাদের মূলমন্ত্র। প্রকৃতিতে যা কিছু আছে ফুল, সাপ, সমুদ্র, বন সবই এক একটি প্রতীক, যা আমাদের ইন্দ্রিয়ের অতীত কোনো সত্যকে নির্দেশ করে।

বোদলেয়ার তাঁর কবিতায় প্রচলিত বস্তুকে নতুন অর্থ দিয়ে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ‘লে ফ্ল্যুর দ্যু মাল’-এর নামেই ফুলের উল্লেখ আছে, যার অর্থ ‘মন্দের ফুল’। এখানে ফুল কেবল সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, বরং পাপ, ক্ষয় এবং মৃত্যুর প্রতীক। তিনি দেখিয়েছেন সৌন্দর্যের মধ্যে যেমন পবিত্রতা থাকে, তেমনি পঙ্কিলতাও বিদ্যমান। যেমন, ‘A Carcass’ কবিতায় পচনশীল মৃতদেহকে তিনি এক ভয়াবহ সৌন্দর্যের রূপ দিয়েছেন। সাপ সেখানে কেবল একটি সরীসৃপ নয়, বরং শয়তান, প্রলোভন এবং আদি পাপের প্রতীক। বোদলেয়ারের কবিতায় সাপ প্রায়শই মানুষের নৈতিক পতনের চিত্র তুলে ধরে।একইভাবে সমুদ্র তাঁর কাছে একদিকে যেমন অনন্ত জীবনের প্রতীক, তেমনি একাকীত্ব এবং বিষাদেরও প্রতীক। ‘The Man and the Sea’ কবিতায় তিনি সমুদ্র ও মানুষের হৃদয়ের মধ্যে এক গভীর মিল খুঁজে পান। উভয়ই রহস্যময়, অস্থির এবং সীমাহীন।

বোদলেয়ারের কবিতায় প্যারিস এক নতুন প্রতীকী রূপে ধরা দিয়েছে। এটি কেবল একটি শহর নয়, বরং আধুনিক মানুষের বিচ্ছিন্নতা, ভিড়, যন্ত্রণা এবং বিষণ্ণতার (Spleen) প্রতীক। তিনি প্যারিসের গলি, ভিড় এবং আধুনিক জীবনের কৃত্রিমতাকে এমনভাবে বর্ণনা করেছেন, যা পরবর্তীকালের লেখকদের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।

বোদলেয়ারের কাব্যভাষা এতটাই শক্তিশালী যে তিনি পাঠকের মনে জীবন্ত চিত্র তৈরি করতে পারেন। তাঁর চিত্রকল্পগুলো কেবল চোখে দেখা ছবি নয়, বরং তা পাঠককে এক মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নিয়ে যায়। তিনি প্রায়শই বিপরীতধর্মী চিত্রকল্পের ব্যবহার করতেন, যেমন আলো ও অন্ধকারের মিশ্রণ, সৌন্দর্য ও বীভৎসতার সহাবস্থান।

সংবেদনশীলতা হলো এমন একটি সাহিত্যিক কৌশল যেখানে একটি ইন্দ্রিয়ের অনুভূতি অন্য ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। এটি প্রতীকবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। বোদলেয়ার তাঁর কবিতায় এর সফল প্রয়োগ ঘটিয়েছেন।

বোদলেয়ারের এই প্রতীকবাদী শৈলী পরবর্তী ফরাসি কবিদের, যেমন আর্থার রিমবড (Arthur Rimbaud), পল ভের্লেন (Paul Verlaine) এবং স্তেফান মালার্মে (Stéphane Mallarmé)-কে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তাঁরা বোদলেয়ারের দেখানো পথ ধরে প্রতীকবাদকে আরও এগিয়ে নিয়ে যান।এর প্রভাব শুধু ফ্রান্সে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং সমগ্র ইউরোপ ও বিশ্বসাহিত্যে ছড়িয়ে পড়ে। টি. এস. এলিয়ট (T. S. Eliot), এজরা পাউন্ড (Ezra Pound) এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো আধুনিক কবিরাও বোদলেয়ারের কাব্যিক ভাবনার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন।

বোদলেয়ারের প্রতীকবাদী কাব্যভাষা কেবল একটি শৈলী নয়, বরং আধুনিক মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা এবং অস্তিত্বের সংকট বোঝার একটি মাধ্যম। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন যে কবিতা কেবল সুন্দর শব্দের সমষ্টি নয়, বরং জীবনের গভীর রহস্য এবং অদৃশ্য সত্যের অনুসন্ধান। প্রতীক, চিত্রকল্প এবং সংবেদনশীলতার মাধ্যমে তিনি এক নতুন কাব্যিক ভাষা তৈরি করেছেন। বোদলেয়ারের হাত ধরে আধুনিক প্রতীকবাদের যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজো সাহিত্যের মূল স্রোতধারায় বহমান।

রেইনফরেস্টে নীরব বিপর্যয়, বিশ্বব্যাপী সাদা হয়ে যাচ্ছে প্রবালপ্রাচীর

সমুদ্রের রেইনফরেস্ট হিসেবে পরিচিত প্রবালপ্রাচীর বর্তমানে এক ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ২০২৩ সাল থেকে শুরু হয়েছে এক ভয়ংকর প্রবাল ব্লিচিং ইভেন্ট। এই ঘটনাকে বিজ্ঞানীরা চতুর্থ বৈশ্বিক ব্লিচিং ইভেন্ট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

প্রবাল হলো ক্ষুদ্র সামুদ্রিক জীব যা পলিপ নামে পরিচিত। এরা সাধারণত এক ধরনের শৈবালের (জুক্সান্থেলি) সাথে মিথোজীবী সম্পর্ক গড়ে তোলে। এই শৈবাল প্রবালের টিস্যুর মধ্যে থাকে এবং সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে প্রবালের জন্য পুষ্টি ও রঙ সরবরাহ করে। যখন সমুদ্রের তাপমাত্রা বা অন্যান্য পরিবেশগত চাপ বা যেমন দূষণ বৃদ্ধি পায়, তখন প্রবাল স্ট্রেস অনুভব করে এবং শৈবালকে বের করে দেয়। শৈবাল চলে গেলে প্রবাল তার রঙ হারায় এবং তার সাদা কঙ্কাল বেরিয়ে আসে, যা প্রবাল ব্লিচিং নামে পরিচিত।

সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী সমুদ্রের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি বেড়েছে। এর প্রধান কারণ হলো জলবায়ু পরিবর্তন এবং এল নিনো-এর মতো প্রাকৃতিক জলবায়ু প্যাটার্নের প্রভাব। এই অতিরিক্ত তাপের ফলে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি মহাসাগরেই প্রবাল ব্লিচিং দেখা গেছে। অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ থেকে শুরু করে ক্যারিবিয়ান সাগর, ভারত মহাসাগর এবং প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত, কোনো অঞ্চলই এই বিপর্যয় থেকে রক্ষা পায়নি। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যার ফলে অনেক প্রবাল পুরোপুরি মারা যাচ্ছে, আর কিছু প্রবাল ধীরে ধীরে সুস্থ হওয়ার চেষ্টা করছে।

প্রবাল ব্লিচিংয়ের পরিণতি সুদূরপ্রসারী এবং ভয়াবহ। প্রথমত, প্রবালপ্রাচীর হাজার হাজার সামুদ্রিক প্রজাতির আশ্রয়স্থল। মাছ, সামুদ্রিক কচ্ছপ, এবং অন্যান্য প্রাণীর বাসস্থান ও খাদ্যের উৎস এই প্রবালপ্রাচীর। এটি ধ্বংস হলে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং বহু প্রজাতির অস্তিত্ব সংকটে পড়ে।
দ্বিতীয়ত, প্রবালপ্রাচীর উপকূলীয় অঞ্চলের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এরা ঢেউ এবং ঝড়ের শক্তি কমিয়ে উপকূলকে ক্ষয় থেকে রক্ষা করে। প্রবালপ্রাচীর ধ্বংস হলে উপকূলীয় অঞ্চল আরও অরক্ষিত হয়ে পড়ে, যা ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।
তৃতীয়ত, প্রবালপ্রাচীর পর্যটন এবং স্থানীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। অনেক উপকূলীয় সম্প্রদায়ের জীবিকা সরাসরি প্রবালপ্রাচীরের উপর নির্ভরশীল। প্রবাল ব্লিচিংয়ের কারণে পর্যটন শিল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা হাজার হাজার মানুষের জীবিকা বিপন্ন করে তোলে।

এই সংকট মোকাবিলায় আমাদের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বৈশ্বিক উষ্ণতা কমাতে কার্বন নির্গমন কমানোর জন্য সম্মিলিত আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা অপরিহার্য। নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্রে প্লাস্টিক বর্জ্য, কৃষি রাসায়নিক এবং শিল্পবর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে। এছাড়াও দায়িত্বশীল পর্যটন অনুশীলন নিশ্চিত করা উচিত যাতে প্রবালপ্রাচীরের উপর অপ্রয়োজনীয় চাপ না পড়ে।

ডিজাইন ও স্থাপত্যের জন্য নতুন ভাষা প্রয়োজন : কেটি ট্রেগিডেন

“ভাষা আক্ষরিক অর্থেই আমাদের চারপাশের বিশ্বকে দেখার ধারণাকে রূপ দেয়। যদি শব্দের গুরুত্ব থাকে, তবে আমাদের ভাষার প্রতি যত্নশীল হতে হবে।নকশা, স্থাপত্য এবং নির্মিত পরিবেশের আমাদের বর্ণনাগুলো কেবল আমাদের ধারণাকেই প্রভাবিত করে না, বরং কীভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং আমরা যে স্থানগুলো তৈরি করি সেখানে কারা স্বাগত বোধ করে, সেটিও প্রভাবিত করে।

“কিছু শব্দ ইতিমধ্যেই পরিবর্তন হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ‘প্রাইমারি বেডরুম’ আগে ‘মাস্টার বেডরুম’ নামে পরিচিত ছিল। ‘মাস্টার’ শব্দের উৎপত্তি ল্যাটিন ‘ম্যাজিস্টার’ থেকে, যার অর্থ প্রধান, শিক্ষক বা পরিচালক। কিন্তু ‘মাস্টার অফ দ্য হাউসহোল্ড’ থেকে শুরু করে দাসদের ‘মালিক’ পর্যন্ত ইতিহাসে এটি শক্তিশালী অবস্থানে থাকা পুরুষদের বোঝাতে ব্যবহার হয়ে এসেছে।

“এই ধরনের শ্রেণিবিন্যাসমূলক, লিঙ্গবৈষম্যমূলক এবং বর্ণবৈষম্যমূলক অর্থ ধারণ করার কারণে, বেডরুমের ক্ষেত্রে শব্দটি পরিবর্তিত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবুও স্থাপত্যে আমরা এখনও ‘মাস্টারপ্ল্যান’ শব্দটি ব্যবহার করি, যা ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত একটি বোঝাপড়া বহন করে।

“নকশা ও স্থাপত্যের একটি নতুন শব্দভাণ্ডার প্রয়োজন। ভাষা আমাদের প্রক্রিয়া ও অগ্রাধিকারের মধ্যে অনুমানকে প্রবেশ করিয়ে দেয়। এটি কেবল আমরা কী দেখি তা নয়, বরং আমরা কীভাবে কাজ করি সেটিও রূপ দেয়। যখন আমরা নকশা ও স্থাপত্য নিয়ে কথা বলার পদ্ধতি পরিবর্তন করি, তখন আমরা নকশা ও স্থাপত্য করার পদ্ধতিও পরিবর্তন করতে শুরু করি। আমরা ভাষাকে কেবল বর্ণনার একটি হাতিয়ার হিসেবে নয়, পরিবর্তনের একটি হাতিয়ার হিসেবে পুনরুদ্ধার করি।

যদি আমরা আমাদের শিল্পকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই এবং ন্যায়সঙ্গত করতে চাই, তবে আমাদের শব্দগুলোর প্রতি যত্নশীল হওয়ার মাধ্যমে শুরু করতে পারি।

জুলাই মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৩৮০, ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ প্রাণহানি

সাম্প্রতিক সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশের সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে দেশে মোট ৪২৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ৩৮০ জন। আহত হয়েছে আরও ৫৪২ জন। অন্যদিকে সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে ৪৪৩টি দুর্ঘটনায় ৪১৮ জন নিহত এবং ৮৫৬ জন আহত হয়েছেন। দুই সংস্থার তথ্যের পার্থক্য কিছুটা হলেও সড়ক দুর্ঘটনার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে।

বিআরটিএর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দেশের বিভিন্ন বিভাগে দুর্ঘটনার ঘনত্ব ভিন্ন। ঢাকা বিভাগে জুলাই মাসে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে মোট ১১৩টি, যেখানে ১১৩ জন নিহত হয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগে ১০০টি দুর্ঘটনায় ৮৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। রাজশাহী বিভাগে ৪৯ দুর্ঘটনায় ৫৩ জন, খুলনা বিভাগে ৪৪ দুর্ঘটনায় ৪৩ জন, বরিশাল বিভাগে ২৫ দুর্ঘটনায় ১৪ জন, সিলেট বিভাগে ৩০ দুর্ঘটনায় ২৬ জন এবং রংপুর বিভাগে ৪৩ দুর্ঘটনায় ৩৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ঘটেছে ময়মনসিংহ বিভাগে, যেখানে ২৩টি দুর্ঘটনায় ১৪ জন নিহত হয়েছেন। এই তথ্য দেখায়, সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যার সঙ্গে মৃত্যুর সংখ্যা সরাসরি সম্পর্কিত না হলেও, দুর্ঘটনার ঘনত্ব প্রধান শহর এবং যানবাহনের চলাচলের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

দুর্ঘটনার ধরন অনুযায়ী মৃত্যুর পরিসংখ্যানও উদ্বেগজনক। জুলাই মাসে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ৮৩ জন, যা মোট মৃত্যুর ২১.৮৪ শতাংশ। ট্রাক বা কাভার্ড ভ্যান দুর্ঘটনায় প্রাণহানি হয়েছে ৪৮ জনের, বাস বা মিনিবাসে ৪৭ জনের, অটোরিকশায় ২৮ জনের। এছাড়া মাইক্রোবাস দুর্ঘটনায় ১৯ জন, পিকআপে ১৮ জন, ভ্যানে ১৭ জন, ব্যাটারিচালিত রিকশায় ১৬ জন, ইজিবাইকে ১৫ জন এবং মোটরকার বা জিপ দুর্ঘটনায় ৩ জন মারা গেছেন। অন্যান্য হিসাবে চিহ্নিত দুর্ঘটনায় ৮৫ জন নিহত হয়েছেন, যা মোট মৃত্যুর ২২.৩৭ শতাংশ। এই তথ্য প্রমাণ করে, দুই বা তিন চাকার যানবাহন সড়ক দুর্ঘটনায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।

বিআরটিএ জানিয়েছে, তারা দেশের সকল বিভাগীয় অফিসের মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান সংগ্রহ করে। এই তথ্য শেয়ার করা মূল উদ্দেশ্য হলো, সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থা সড়ক নিরাপত্তা নীতি এবং সচেতনতা বৃদ্ধি কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারে। দুর্ঘটনার উচ্চ হার এবং মৃত্যুর সংখ্যা আমাদেরকে সতর্ক করে, সড়ক নিরাপত্তার জন্য অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

পরিসংখ্যান ও তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে দুর্ঘটনার সংখ্যা বেশি, যা যানজট, যানবাহনের ঘনত্ব ও ট্রাফিক নিয়মের শৃঙ্খলা কম থাকার কারণে হতে পারে। এছাড়া মোটরসাইকেল ও ছোট যানবাহন ব্যবহারকারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে শিক্ষামূলক প্রচার, ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং যানবাহনের মান নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রাশিয়ার সাহিত্য ও জনসংস্কৃতির পুনর্গঠনে মাক্সিম গোর্কির যাত্রা

মাক্সিম গোর্কি, যাঁর আসল নাম আলেক্সেই ম্যাক্সিমোভিচ পেশকভ, শুধুমাত্র একজন বিখ্যাত সাহিত্যিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর রাশিয়ার সাংস্কৃতিক পুনর্গঠনের একজন প্রধান স্থপতি। গোর্কির সাহিত্যকর্ম এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলন বিশেষত তাঁর সম্পাদিত জার্নাল ও সামাজিক ভূমিকা—এক নতুন সাহিত্যচেতনার জন্ম দিয়েছিল যা সে সময়ের সমাজ ও রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। তাঁর জীবন ও কর্মের মাধ্যমে আমরা দেখতে পাই, কীভাবে একজন লেখক শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সৃষ্টিশীলতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, বৃহত্তর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারেন।

গোর্কির উত্থান এমন এক সময়ে হয়েছিল যখন জার-শাসিত রাশিয়ার সমাজ ছিল গভীর সংকটে। শিল্পবিপ্লবের ফলে সৃষ্ট শ্রমিকশ্রেণির দুর্দশা এবং সমাজের অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল প্রকট। গোরকি নিজেও এই দরিদ্র ও শোষিত শ্রেণির একজন ছিলেন। তাঁর শৈশব কেটেছে চরম দারিদ্র্য ও কষ্টের মধ্যে। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে সাধারণ মানুষের জীবন ও সংগ্রামের প্রতি গভীর সংবেদনশীলতা দিয়েছিল। তাঁর প্রথম দিকের গল্প, যেমন “চেলকাশ” বা “টোয়েন্টি-সিক্স মেন অ্যান্ড আ গার্ল”, এই দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের জীবনকে তুলে ধরে। গোরকি কোনো কৃত্রিম রোমান্টিসিজম বা কল্পনার আশ্রয় নেননি, বরং বাস্তবতাকে তার রুক্ষ ও কঠিন রূপে উপস্থাপন করেছেন। এই বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁর লেখার মূল শক্তি। তিনি দেখিয়েছিলেন, কীভাবে সমাজের নিম্নস্তরের মানুষেরা টিকে থাকার জন্য লড়াই করে এবং তাদের মধ্যেও লুকিয়ে আছে এক অমিত মানবীয় শক্তি ও মর্যাদা।

গোর্কি বিশ্বাস করতেন সাহিত্য শুধুমাত্র বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি সমাজের পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। তাঁর লেখার মধ্য দিয়ে তিনি যে ধারার জন্ম দিয়েছিলেন, তা পরবর্তীকালে ‘সোশ্যালিস্ট রিয়ালিজম’ (সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদ) নামে পরিচিতি লাভ করে। যদিও এই ধারা পরবর্তী সোভিয়েত যুগে রাষ্ট্রীয় মতাদর্শ হিসেবে কঠোরভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, গোর্কির মূল উদ্দেশ্য ছিল সমাজের নিপীড়িত শ্রেণির সংগ্রাম ও স্বপ্নকে সাহিত্যের মূল বিষয়বস্তু করা। তাঁর উপন্যাস ‘মা’ (The Mother) এই আদর্শের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই উপন্যাসে এক সাধারণ মা কীভাবে তার ছেলের বিপ্লবী আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেও আন্দোলনে যোগ দেন, তা দেখানো হয়েছে। এটি কোনো কাল্পনিক চরিত্র নয়, বরং রাশিয়ার শত শত শ্রমজীবী মানুষের প্রতিচ্ছবি। এই উপন্যাসের মাধ্যমে গোর্কি দেখিয়েছিলেন, কীভাবে ব্যক্তিগত জাগরণ রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপান্তরিত হতে পারে।

গোর্কি কেবল লেখক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সক্রিয় সাংস্কৃতিক সংগঠক। তাঁর সম্পাদিত বিভিন্ন জার্নাল ও প্রকাশনা রাশিয়ার সাহিত্য ও বুদ্ধিজীবী মহলে এক নতুন প্রাণসঞ্চার করেছিল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন শুধুমাত্র উপন্যাস বা গল্প লিখে পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়, একটি সামগ্রিক সাংস্কৃতিক আন্দোলন প্রয়োজন। এই আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার ছিল তাঁর সম্পাদিত সাহিত্য পত্রিকাগুলো।

১৯০৫ সালের বিপ্লবের পর, যখন রাশিয়ায় কিছুটা রাজনৈতিক শিথিলতা আসে, গোর্কি তখন বিভিন্ন প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি ‘নোভায়া ঝিজন’ (Novaya Zhizn – নতুন জীবন) নামে একটি বলশেভিক পত্রিকার সম্পাদনা করতেন। এই পত্রিকায় ভ্লাদিমির লেনিনের মতো নেতারাও লেখা প্রকাশ করতেন। গোর্কি এই পত্রিকার মাধ্যমে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করতেন, যা সে সময়ের জন্য ছিল অত্যন্ত দুঃসাহসিক কাজ। তিনি তরুণ লেখকদের উৎসাহিত করতেন এবং তাদের লেখা প্রকাশের সুযোগ করে দিতেন।

সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠার পর, গোর্কি আরও বড় পরিসরে সাংস্কৃতিক পুনর্গঠনের দায়িত্ব নেন। তিনি ‘ভার্ল্ড লিটারেচার’ (Vsemirnaya Literatura) প্রকাশনা সংস্থার প্রধান ছিলেন। এই সংস্থার মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বের সেরা সাহিত্যকর্মগুলোকে রাশিয়ান ভাষায় অনুবাদ করে দেশের সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। গোর্কি বিশ্বাস করতেন বিশ্ব সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় দেশের মানুষের মনকে আরও উন্নত করবে এবং তাদের সাংস্কৃতিক বোধকে সমৃদ্ধ করবে। এটি ছিল এক বিশাল সাংস্কৃতিক প্রকল্প, যা দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক মানকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। এছাড়াও তিনি ‘কমিশন ফর দ্য ইম্প্রুভমেন্ট অফ সায়েন্টিস্টস’ লাইফ’-এর মতো বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই সংস্থাগুলোর মাধ্যমে বিজ্ঞানী, লেখক ও শিল্পীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কাজ করতেন। গোর্কি বুঝতে পেরেছিলেন যে একটি সুস্থ ও সৃজনশীল সমাজ গড়ে তুলতে হলে তার বুদ্ধিজীবী শ্রেণির শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা অপরিহার্য।

গোর্কির কর্মকাণ্ডের ফলস্বরূপ রাশিয়ায় একটি নতুন সাহিত্যচেতনার সূচনা হয়েছিল। এই চেতনা কোনো বিমূর্ত ধারণা ছিল না, বরং তা ছিল বাস্তব ও কার্যকর। গোর্কি সাহিত্যের elitism-এর বিরুদ্ধে ছিলেন। তিনি সাহিত্যকে সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। তাঁর লেখা ছিল সহজবোধ্য এবং সাধারণ মানুষের জীবনকেন্দ্রিক। তিনি শুধুমাত্র বাস্তবতাকে তুলে ধরেননি, বরং দেখিয়েছেন যে এই বাস্তবতাকে কীভাবে একটি নতুন সমাজতান্ত্রিক আদর্শের মাধ্যমে পরিবর্তন করা যায়। এটি কেবল পর্যবেক্ষণ নয়, বরং পরিবর্তনের একটি রূপরেখা। গোর্কি দেখিয়েছেন লেখক সমাজের একজন দায়বদ্ধ নাগরিক। একজন লেখক কেবল লেখার জন্য লেখেন না, বরং সমাজের প্রতি তার দায়িত্ব রয়েছে। তিনি তাঁর কলমকে মানুষের মুক্তি ও কল্যাণের জন্য ব্যবহার করেন। বিভিন্ন প্রকাশনা এবং সংস্থার মাধ্যমে তিনি লেখকদের মধ্যে একটি সংহতি তৈরি করতে পেরেছিলেন, যা একটি শক্তিশালী সাহিত্যিক আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিল।

গোর্কির এই অবদানকে শুধু রাশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি ছিল একটি গভীর সাংস্কৃতিক বিপ্লব, যা রাশিয়ার সাহিত্যকে কেবল দেশীয় সীমানার মধ্যে আবদ্ধ রাখেনি, বরং বিশ্বমঞ্চে এক নতুন পরিচয়ে তুলে ধরেছিল। তাঁর জীবন ও কর্ম প্রমাণ করে একজন লেখক যদি সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ হন, তাহলে তাঁর কলম একটি পুরো জাতিকে আলোকিত করতে পারে। গোর্কি আমাদের শিখিয়েছেন সাহিত্য শুধু ভাষার কারুকার্য নয়, এটি মানবজীবনের একটি গভীর প্রতিচ্ছবি এবং পরিবর্তনের এক শক্তিশালী অনুঘটক।

Bobo Doll Experiment – শিশুদের আগ্রাসী আচরণে সামাজিক শিক্ষার প্রভাব

মনোবিজ্ঞানের ইতিহাসে বেশ কিছু যুগান্তকারী গবেষণা রয়েছে যা মানুষের আচরণ এবং মানসিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে নতুন পথে চালিত করেছে। এর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি গবেষণা হলো ‘বোবো ডল পরীক্ষা’ (Bobo Doll Experiment), এটি বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী আলবার্ট বান্দুরা (Albert Bandura) ১৯৬১ সালে পরিচালনা করেন। এই পরীক্ষাটি মূলত Social Learning Theory একটি শক্তিশালী প্রমাণ উপস্থাপন করে এবং শিশুদের আগ্রাসী আচরণ বিকাশে পরিবেশ ও পর্যবেক্ষণের ভূমিকার উপর আলোকপাত করে।

বান্দুরা বিশ্বাস করতেন শিশুরা কেবল প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই শেখে না, বরং অন্যদের পর্যবেক্ষণ এবং অনুকরণ করার মাধ্যমেও জ্ঞান ও আচরণ অর্জন করে। এই ধারণাটি তৎকালীন আচরণবাদী (Behaviorist) তত্ত্বের মূল ধারণার বিপরীত ছিল, যেখানে মনে করা হতো আচরণ মূলত পুরস্কার ও শাস্তির ফলস্বরূপ গঠিত হয়। বান্দুরার বোবো ডল পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য ছিল যাচাই করা যে শিশুরা প্রাপ্তবয়স্কদের আগ্রাসী আচরণ পর্যবেক্ষণ করে তা অনুকরণ করে কিনা এবং যদি করে তবে এর প্রক্রিয়া কী।

এই গবেষণায় স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭২ জন শিশুকে (ছেলে ও মেয়ে উভয়েই) অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যাদের বয়স ৩ থেকে ৬ বছরের মধ্যে ছিল।

শিশুদের তিনটি দলে ভাগ করা হয়:
Aggressive Model Group : এই দলের শিশুরা একজন প্রাপ্তবয়স্ককে (পুরুষ বা মহিলা) একটি বোবো ডলের (একটি বায়ুপূর্ণ পুতুল) সাথে আগ্রাসী আচরণ করতে দেখে। প্রাপ্তবয়স্ক মডেলটি পুতুলটিকে লাথি মারতে, ঘুষি মারতে এবং খেলনা হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করতে থাকে এবং বিভিন্ন আগ্রাসী মন্তব্য করতে থাকে।

Non-Aggressive Model Group : এই দলের শিশুরা একজন প্রাপ্তবয়স্ককে বোবো ডলের সাথে শান্ত ও বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করতে দেখে। মডেলটি পুতুলের সাথে খেলে কিন্তু কোনো প্রকার আগ্রাসী কার্যকলাপ প্রদর্শন করে না।

Control Group : এই দলের শিশুরা কোনো মডেলকে বোবো ডলের সাথে কোনো রকম আচরণ করতে দেখেনি।

পরীক্ষার প্রথম পর্যায়ে প্রতিটি শিশুকে তাদের নির্দিষ্ট মডেলের সাথে ১০ মিনিটের জন্য একটি খেলার ঘরে রাখা হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে শিশুদের অন্য একটি ঘরে নিয়ে যাওয়া হয় যেখানে আকর্ষণীয় কিছু খেলনা ছিল, কিন্তু গবেষকরা খুব দ্রুতই তাদের সেই খেলনাগুলো থেকে বঞ্চিত করেন। এর ফলে শিশুদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা (Frustration) সৃষ্টি করা হয়, যা তাদের আগ্রাসী প্রবণতাকে উস্কে দিতে পারে বলে ধারণা করা হয়।

তৃতীয় এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে, প্রতিটি শিশুকে একটি ঘরে একা রাখা হয় যেখানে একটি বোবো ডল, খেলনা হাতুড়ি এবং অন্যান্য খেলনা ছিল। গবেষকরা লুকানো ক্যামেরা এবং একমুখী আয়নার মাধ্যমে শিশুদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন। তারা মূলত শিশুদের বোবো ডলের প্রতি আগ্রাসী আচরণ, মডেলের আগ্রাসী মন্তব্যগুলোর পুনরাবৃত্তি এবং নতুন কোনো আগ্রাসী কার্যকলাপ প্রদর্শন করছে কিনা তা লক্ষ্য করেন।

গবেষণার ফলাফল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। দেখা যায় আগ্রাসী মডেল দলের শিশুরা অ-আগ্রাসী মডেল দলের এবং নিয়ন্ত্রণ দলের শিশুদের তুলনায় বোবো ডলের প্রতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি আগ্রাসী আচরণ প্রদর্শন করেছে। তারা মডেলের দেখানো লাথি মারা, ঘুষি মারা এবং হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করার মতো আচরণগুলো অনুকরণ করেছে। এমনকি অনেক শিশু মডেলের ব্যবহৃত আগ্রাসী মন্তব্যগুলোও পুনরাবৃত্তি করেছে।

অন্যদিকে অ-আগ্রাসী মডেল দলের শিশুরা বোবো ডলের প্রতি খুব কম আগ্রাসী আচরণ দেখিয়েছে এবং নিয়ন্ত্রণ দলের শিশুদের মধ্যেও আগ্রাসী আচরণের প্রবণতা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে ছেলেরা মেয়েদের তুলনায় শারীরিক আগ্রাসন বেশি দেখিয়েছে, বিশেষ করে যখন তারা পুরুষ মডেলের আগ্রাসী আচরণ পর্যবেক্ষণ করেছিল।

বোবো ডল পরীক্ষা বান্দুরার সামাজিক শিক্ষা তত্ত্বের একটি শক্তিশালী সমর্থন জোগায়। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, শিশুরা অন্যদের পর্যবেক্ষণ করে এবং তাদের আচরণের পরিণতি দেখে শেখে। যদি শিশুরা কোনো আগ্রাসী আচরণকারীকে পুরস্কৃত হতে দেখে, যেমন অন্যদের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে দেখে, তবে তারা সেই আচরণটি অনুকরণ করার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

এই পরীক্ষায় শিশুরা যেহেতু প্রাপ্তবয়স্ক মডেলকে কোনো প্রকার শাস্তির সম্মুখীন হতে দেখেনি, বরং তাদের আগ্রাসী আচরণ প্রদর্শনের পরেই তাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, তাই শিশুরা সেই আচরণটিকে গ্রহণযোগ্য বা অন্ততপক্ষে ক্ষতিকর নয় বলে ধরে নেয় এবং তা অনুকরণ করে।

বান্দুরা আরও উল্লেখ করেন যে সামাজিক শিক্ষা প্রক্রিয়ায় কিছু প্রধান উপাদান কাজ করে। শিশুরা সেইসব মডেলের প্রতি বেশি মনোযোগ দেয় যাদের তারা আকর্ষণীয়, ক্ষমতাশালী বা নিজেদের মতো মনে করে। তারা মডেলের আচরণকে স্মৃতিতে ধরে রাখে, যা পরবর্তীতে সেই আচরণটি পুনরাবৃত্তি করতে সাহায্য করে। একইসাথে পূর্বে দেখা আচরণটি শারীরিক ও মানসিকভাবে পুনরায় করার চেষ্টা করে।

বোবো ডল পরীক্ষার ফলাফল মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। এটি স্পষ্টভাবে দেখায় শিশুদের পারিপার্শ্বিক পরিবেশ এবং তারা যা দেখে ও শেখে, তা তাদের আচরণ এবং মানসিক বিকাশে কতটা শক্তিশালী ভূমিকা রাখে।

শিশুরা তাদের পরিবারের সদস্যদের আচরণ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। যদি পরিবারের সদস্যরা আগ্রাসী হন বা মারামারি-ঝগড়ার মধ্যে লিপ্ত থাকেন, তবে শিশুরা সেই আচরণকে স্বাভাবিক এবং অনুকরণযোগ্য বলে মনে করতে পারে। টেলিভিশন, সিনেমা, ভিডিও গেমস এবং অন্যান্য গণমাধ্যমে প্রচারিত সহিংসতা শিশুদের আগ্রাসী আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে। তারা যখন পর্দায় কোনো চরিত্রকে সহিংস কার্যকলাপের মাধ্যমে সফলতা অর্জন করতে দেখে, তখন তারা সেই আচরণ অনুকরণ করার সম্ভাবনা অনুভব করতে পারে।

স্কুলে বুলিং এবং অন্যান্য প্রকার আগ্রাসী আচরণ শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। যারা আগ্রাসনের শিকার হয় তারা যেমন মানসিক কষ্টে ভোগে, তেমনি যারা আগ্রাসী আচরণ দেখে তারাও প্রভাবিত হতে পারে।

বোবো ডল পরীক্ষা সামাজিক শিক্ষা তত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি স্থাপন করলেও এর কিছু সীমাবদ্ধতা এবং সমালোচনা রয়েছে। সমালোচকদের মধ্যে কেউ কেউ মনে করেন যে পরীক্ষাগারের কৃত্রিম পরিবেশে শিশুদের আচরণ পর্যবেক্ষণ বাস্তব জীবনের পরিস্থিতিকে পুরোপুরি প্রতিফলিত করে না।বোবো ডল একটি নির্জীব বস্তু হওয়ায় এর প্রতি আগ্রাসী আচরণ দেখানো স্বাভাবিক খেলার অংশ হতে পারে এবং এটিকে সরাসরি মানুষের প্রতি আগ্রাসনের সাথে তুলনা করা হয়তো ঠিক নয়।

এই গবেষণার সবচেয়ে বড় নৈতিক বিতর্কটি হলো এর মাধ্যমে শিশুদের মধ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে আগ্রাসী আচরণ প্ররোচিত করা হয়েছিল। যদিও গবেষকরা শিশুদের কোনো দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি হয়নি বলে দাবি করেন, তবুও এটি প্রশ্ন তোলে একটি গবেষণার ফলাফল পাওয়ার জন্য শিশুদের আচরণকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করা কতটা নৈতিক। এই বিতর্কের ফলস্বরূপ, পরবর্তীতে শিশুদের নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে কঠোর নৈতিক নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়, যাতে তাদের নিরাপত্তা ও সুস্থ মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করা যায়।

বোবো ডল পরীক্ষার প্রায় ছয় দশক পরেও এর ফলাফল আধুনিক মনোবিজ্ঞানের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বর্তমানে সাইবার বুলিং, অনলাইন গেমিং-এ সহিংসতা এবং সামাজিক মাধ্যমে নেতিবাচক মডেলের প্রভাব নিয়ে যে গবেষণাগুলো হচ্ছে, তার মূল ভিত্তি এই পরীক্ষাটি। এটি আমাদেরকে মনে করিয়ে দেয় শিশুদের ক্ষেত্রে আচরণ কেবল জিনগত বা জৈবিক কারণে প্রভাবিত হয় না, বরং সামাজিক পরিবেশ এবং পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেও গঠিত হয়।

বান্দুরার এই কাজ সামাজিক শিক্ষা তত্ত্বকে কেবল মনোবিজ্ঞানের একটি শাখা হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং এটিকে সমাজবিজ্ঞান, অপরাধ বিজ্ঞান এবং শিক্ষাবিজ্ঞানের মতো অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রসারিত করেছে। এটি দেখিয়েছে আচরণ পরিবর্তনের জন্য কেবল শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা পুরস্কার যথেষ্ট নয়, বরং ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন এবং সমাজের মধ্যে সুস্থ আচরণের প্রচলন করাও জরুরি।

ইনফ্লুয়েঞ্জার তীব্রতায় দেশে জ্বরের প্রকোপ বাড়ছে

সম্প্রতি সারা দেশে ভাইরাল জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বাড়তি প্রকোপের পেছনে মূল চালক হয়ে উঠছে ইনফ্লুয়েঞ্জা। শিশু থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক—সব বয়সী মানুষই আক্রান্ত হচ্ছেন এই মৌসুমি ফ্লুতে।

ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ (আইইডিসিআর) ও আইসিডিডিআর,বি’র যৌথ পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই মাসে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৭৫ গুণ বেশি ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ মাসে ১৯টি নির্বাচিত হাসপাতালে ২ হাজার ৪৫৫ জন জ্বরের রোগীর মধ্যে ৫৯ দশমিক ২ শতাংশের শরীরে ইনফ্লুয়েঞ্জা পাওয়া গেছে। ২০০৭ সালে দেশে ইনফ্লুয়েঞ্জা পর্যবেক্ষণ শুরুর পর এটাই সর্বোচ্চ হার।

ঢাকার বেসরকারি চাকরিজীবী মো. হাবিব গত ১০ দিন ধরে স্ত্রী ও দুই সন্তানের ফ্লু-সদৃশ জ্বরে আক্রান্ত হওয়ায় ভীষণ ভোগান্তিতে পড়েছেন। প্রথমে তার ছেলে আরহান স্কুল থেকে জ্বর নিয়ে বাসায় ফেরে। পরবর্তীতে তার স্ত্রী ও ছোট মেয়ে একই উপসর্গে আক্রান্ত হন। হাবিব বলেন, “প্রথমে ভেবেছিলাম ডেঙ্গু হতে পারে, কিন্তু টেস্ট নেগেটিভ এসেছে। তবে কী ধরনের জ্বর এটা বুঝতে পারছি না, শুধু দেখছি পরিবারটা ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়েছে।”

হাজার হাজার পরিবার বর্তমানে একই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ডেঙ্গুর পাশাপাশি ফ্লু এবং অন্যান্য ভাইরাসজনিত সংক্রমণ মিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

শুধু ইনফ্লুয়েঞ্জাই নয়, ডেঙ্গুও বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৮ আগস্ট পর্যন্ত দেশে ১০৫ জন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৬ হাজার ৭৫৮ জন। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ৫৫১ জন আক্রান্ত এবং ৭৪ জনের মৃত্যু।

কোথায় হচ্ছে এই পর্যবেক্ষণ?

যে ১৯টি হাসপাতালে আইইডিসিআর ও আইসিডিডিআর,বি যৌথভাবে পর্যবেক্ষণ চালায় তার মধ্যে রয়েছে ঢাকা, রাজশাহী, কুমিল্লা, খুলনা, চট্টগ্রাম ও দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল; কিশোরগঞ্জের জাহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ, সিলেটের জালালাবাদ রাগিব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ, বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ এবং কয়েকটি জেলা সদর হাসপাতাল।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২২ সালের জুলাইয়ে যেখানে সংক্রমণের হার ছিল ২১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ২০২৩ সালে ৩৩ দশমিক ৪ শতাংশ, সেখানে এ বছর তা প্রায় ৬০ শতাংশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।

আইইডিসিআর পরিচালক অধ্যাপক তাহমিনা শিরিন জানান, এ বছর ইনফ্লুয়েঞ্জার সংক্রমণ গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি। তাই এখনই সতর্কতা জরুরি। আইসিডিডিআর,বি’র শ্বাসযন্ত্র বিষয়ক গবেষক তানজির আহমেদ শুভ বলেন, “আমাদের তথ্য বলছে, জুলাই মাসে ফ্লুর প্রকোপ অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। তবে সাধারণত সেপ্টেম্বরের পর সংক্রমণ কমে আসে।”

ঢাকা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ফজলে রাব্বি চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে সাধারণত দুটি মৌসুমে ফ্লু বেশি দেখা যায়, মার্চ–এপ্রিল এবং আগস্ট–সেপ্টেম্বর। এই বছর মার্চ–এপ্রিলের পর সাময়িক বিরতি দিয়ে আগস্টে আবার প্রকোপ বেড়েছে এবং এখনও কমেনি।

তিনি আরও জানান, বর্তমানে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, কোভিড-১৯সহ একাধিক ভাইরাস একসাথে ছড়িয়ে পড়ছে। তবে ইনফ্লুয়েঞ্জাই এখন সবচেয়ে বেশি সংক্রমণের কারণ। এর মধ্যে টাইপ এ এবং টাইপ বি উভয় ধরনের ভাইরাসই শনাক্ত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিরোধই এখানে মূল উপায়। কোভিড-১৯ প্রতিরোধে ব্যবহৃত নিয়মগুলোই ফ্লুর ক্ষেত্রেও কার্যকর—যেমন:

জনসমাগম এড়িয়ে চলা

হাঁচি-কাশির সময় মুখ ঢেকে রাখা

নিয়মিত হাত ধোয়া

অসুস্থ অবস্থায় মাস্ক ব্যবহার করা

স্কুল-কলেজে সংক্রমণ দ্রুত ছড়াচ্ছে। তাই কর্তৃপক্ষকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যেসব শিশু জ্বর, কাশি বা সর্দিতে আক্রান্ত, তাদের অন্তত পাঁচ দিন বাসায় বিশ্রামে রাখতে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, সাধারণ ফ্লুর জন্য আলাদা ওষুধ প্রয়োজন হয় না। তবে যাদের বয়স বেশি বা পূর্ববর্তী শারীরিক জটিলতা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিতে পারে। সেক্ষেত্রে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

দেশ এখন একযোগে ডেঙ্গু ও ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো ভাইরাসজনিত রোগের আক্রমণে ভুগছে। এর মধ্যে ইনফ্লুয়েঞ্জা সবচেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং আক্রান্তের সংখ্যা অভূতপূর্ব হারে বেড়েছে। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ ও সচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

বিএফআরআই’র গবেষণা – পাঁচ বছরে দেশে মাছের উৎপাদন বেড়ে ৭ দশমিক ৪১ লাখ টন

রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষি গবেষণা কাউন্সিলে বুধবার বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) আয়োজিত মৎস্য সপ্তাহের সেমিনারে জানানো হয়, দেশের মাছের উৎপাদন গত পাঁচ বছরে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৮–১৯ অর্থবছরে দেশের মোট মাছের উৎপাদন ছিল ৪২ দশমিক ৭৭ লাখ টন। তবে ২০২৩–২৪ সালে উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ দশমিক ১৮ লাখ টনে, যা পাঁচ বছরে ৭ দশমিক ৪১ লাখ টন বৃদ্ধি নির্দেশ করছে।

সেমিনারের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন বিএফআরআইয়ের মহাপরিচালক অনুরাধা ভদ্র। বিশেষ অতিথি ছিলেন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. তোফাজ্জেল হোসেন। এছাড়া সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান ফারাহ শাম্মী এবং মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবদুর রউফ। অনুষ্ঠানটিতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএফআরআইয়ের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ফরিদা আখতার বলেন, “আমরা প্রাকৃতিকভাবে এমন স্থানে অবস্থান করি, যেখানে মাছ না খেয়ে বাঁচার উপায় নেই। দেশের ৬৪ প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। বিএফআরআইয়ের গবেষণার মাধ্যমে ৪১ প্রজাতির মাছ পুনরায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতে গবেষণা ও সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশের মৎস্যসম্পদ সুরক্ষিত ও সম্প্রসারিত হচ্ছে।

মো. মশিউর রহমান উল্লেখ করেন, দেশে বর্তমানে ৬৬৯টি মৎস্য অভয়াশ্রম রয়েছে, যাদের মোট জমির পরিমাণ ১ হাজার ১৬৯ হেক্টর। তিনি বলেন, এই অভয়াশ্রমগুলোতে মাছের প্রজনন ও সংরক্ষণ কার্যক্রম দেশের মাছ উৎপাদনের বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. তোফাজ্জেল হোসেন জানান, মন্ত্রণালয় এখন থেকে নিজেরাই নতুন অভয়াশ্রম ঘোষণা করতে পারবে। এই উদ্যোগের জন্য প্রয়োজনীয় আইন সংশোধন করা হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, অভয়াশ্রম সম্প্রসারণ ও সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে এবং দেশের মাছ উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। মৎস্য সপ্তাহের এই সেমিনার দেশের মৎস্য খাতের উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও গবেষণার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

গাজায় ইসরায়েলের স্থল অভিযান শুরু, শহর ছেড়ে পালাচ্ছে লক্ষাধিক ফিলিস্তিনি

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী গাজা উপত্যকায় পরিকল্পিত স্থল অভিযানের প্রথম ধাপ শুরু করার পর থেকে বিপুল সংখ্যক ফিলিস্তিনি গাজা সিটি ত্যাগ করছে। টানা কয়েকদিনের তীব্র বোমা হামলা ও গোলাবর্ষণের পর ইসরায়েলি সেনারা শহরের উপকণ্ঠে অবস্থান নিয়েছে, যেখানে প্রায় দশ লাখ ফিলিস্তিনি বসবাস করছে। গাজার পরিস্থিতি ক্রমেই মানবিক সংকটে পরিণত হচ্ছে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস অবিলম্বে নতুন করে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এমন আক্রমণ যা অনিবার্যভাবে মৃত্যু ও ধ্বংসযজ্ঞ ডেকে আনবে, তা এড়ানো প্রয়োজন।

ইসরায়েলের সামরিক মুখপাত্র জানিয়েছেন, অভিযানের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে জেইতুন ও জাবালিয়া এলাকায় সেনারা ইতিমধ্যে অবস্থান নিয়েছে।ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ মঙ্গলবার এই অভিযান অনুমোদন দিয়েছেন। আগামী সেপ্টেম্বরের শুরুতে প্রায় ৬০,০০০ রিজার্ভ সেনা ডাকা হবে, যাতে নিয়মিত সেনারাও অংশ নিতে পারে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, গাজার শেষ সন্ত্রাসী ঘাঁটি দখলের জন্য সময়সীমা কমিয়ে আনা হচ্ছে।

হামাস নেতারা নেতানিয়াহুর এই সিদ্ধান্তকে নিরীহ বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে নৃশংস যুদ্ধ হিসেবে সমালোচনা করেছে। তারা আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের নতুন যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবের প্রতি ইসরায়েলের অবহেলাও তীব্রভাবে অভিযোগ করেছে।

ইসরায়েলের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গাজা সিটির কয়েক লাখ ফিলিস্তিনিকে সরিয়ে নিয়ে দক্ষিণের আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এই পদক্ষেপের ফলে গাজার ২১ লাখ মানুষের জন্য মানবিক পরিস্থিতি আরও সংকটময় হয়ে উঠার সম্ভাবনা রয়েছে।আন্তর্জাতিক কমিটি অব দ্য রেড ক্রস ইতিমধ্যে সতর্ক করেছে, বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি ও সংঘাতের তীব্রতা এই অঞ্চলের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁও সতর্ক করে বলেছেন, এই অভিযান উভয় জাতির জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে এবং পুরো অঞ্চলকে স্থায়ী যুদ্ধের চক্রে ঠেলে দিতে পারে।

ইসরায়েলের আইডিএফের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফি ডেফরিন জানিয়েছেন, হামাস ২২ মাসের দীর্ঘ যুদ্ধের পর ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপর্যস্ত। তিনি বলেন, “গাজা সিটিতে হামাসের আরও বেশি ক্ষতি করা হবে। মাটির ওপরে ও নিচে থাকা সন্ত্রাসী অবকাঠামো ধ্বংস করা হবে এবং জনগণের ওপর হামাসের নির্ভরশীলতা শেষ করা হবে।” তিনি বেসামরিক নাগরিকদের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সতর্কবার্তাও দেয়ার কথা উল্লেখ করেন।

গাজার হামাস-নিয়ন্ত্রিত সিভিল ডিফেন্স এজেন্সির মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল জানিয়েছেন, জেইতুন ও সাবরা এলাকায় পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক।মঙ্গলবার ও বুধবার ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ২৫ জন নিহত হয়েছেন, এদের মধ্যে তিনজন শিশু এবং তাদের বাবা-মাও রয়েছেন।

ডেফরিন আরও জানিয়েছেন, হামাসের হাতে থাকা ৫০ জন জিম্মিকে রক্ষার জন্য আইডিএফ সম্ভাব্য সবকিছু করছে। ধারণা করা হচ্ছে, এদের মধ্যে ২০ জন এখনও জীবিত।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েলি বাহিনী গাজায় হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ পর্যন্ত অন্তত ৬২,১২০ জন নিহত হয়েছে। সংঘাত ও মানবিক সংকট ক্রমেই বাড়ছে।