Home Blog Page 107

doppelgänger – ছায়ার দ্বিতীয় সত্তা

কখনও ভেবেছেন, এই বিশাল পৃথিবীর কোথাও আপনার আরেকটি অবিকল মুখও বিদ্যমান? অথবা এমন কাউকে দেখেছেন যিনি আপনাকে চিনেন না, অথচ দেখলে মনে হয় আপনি নিজের ছায়াকে দেখছেন?

Doppelgänger, এক জার্মান শব্দ, যার বাংলা প্রতিশব্দ “দ্বিতীয় আত্মা” অথবা “অপর সত্তার ছায়া”। এই ধারণা শুধু শারীরিক সদৃশতা নয়; এতে রয়েছে অতিপ্রাকৃত ইঙ্গিত, অস্তিত্ববাদী সংকট এবং মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা।

ডপেলগ্যাঙ্গার (Doppelgänger) শব্দটি গঠিত হয়েছে দুটি জার্মান শব্দ থেকে— doppel (দ্বি) এবং gänger (চলমান ব্যক্তি)। অর্থাৎ, “যে ব্যক্তি দ্বিগুণ রূপে চলে বেড়ায়”। ১৮শ শতকের দিকে এই ধারণা ইউরোপীয় মিস্টিসিজম ও রোমান্টিক সাহিত্যে প্রবেশ করে।

জার্মান ও নর্স (Scandinavian) পুরাণ অনুসারে, doppelgänger-কে “spirit double” বা “evil twin” বলা হতো। বিশ্বাস ছিল, যদি কেউ নিজের doppelgänger-কে দেখে, সেটি মৃত্যুর পূর্বলক্ষণ বা বড় দুর্ভাগ্যের সংকেত। এতে ধারণা ছিল— এক ব্যক্তির শারীরিক উপস্থিতির বাইরে একটি আত্মিক সত্তাও বিদ্যমান, যেটি কখনও তার বিরুদ্ধে কাজ করে।

doppelgänger ধারণাটি সাহিত্য ও শিল্পে দারুণ প্রভাব রেখেছে, বিশেষ করে অস্তিত্ববাদ, রহস্য এবং মনস্তত্ত্বভিত্তিক থিম-এ।

কিছু উল্লেখযোগ্য উদাহরণ:
Edgar Allan Poe, ‘William Wilson’ গল্পে নায়ক নিজের নৈতিক দিকের প্রতিফলন হিসেবে doppelgänger-এর মুখোমুখি হয়।
Fyodor Dostoevsky-র উপন্যাস The Double-এ প্রধান চরিত্র Yakov তার সদৃশ ব্যক্তির দ্বারা ক্রমশ মানসিক সংকটে পতিত হয়।
Robert Louis Stevenson-এর The Strange Case of Dr. Jekyll and Mr. Hyde-এ doppelgänger ধারণা দেহ-মন দ্বৈততার উপমা।
আধুনিক সিনেমা Jordan Peele-এর Us (২০১৯)-এ সমগ্র সমাজের ‘ভুলে যাওয়া ছায়া-মানুষদের’ ওপর ভিত্তি করে নির্মিত।

এগুলো থেকে বোঝা যায়, doppelgänger শুধু রহস্যের অনুষঙ্গ নয়— বরং এটি আমাদের নিজের ভেতরের চেপে রাখা, অস্বীকারকৃত সত্তার প্রতীকও।

বিশ্বখ্যাত মনোবিদ Carl Jung doppelgänger-এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন Shadow Archetype হিসেবে। তাঁর মতে প্রত্যেক মানুষের অবচেতনে এমন একটি অংশ থাকে যা সমাজ, মূল্যবোধ বা নিজের চাওয়াপাওয়ার কারণে চেপে রাখা হয়। এই ‘Shadow’ বা ছায়াটি কখনও কখনও মনের গহীনে ‘অন্য আমি’ রূপে প্রকাশ পায়— যা আমাদের নিজেরই অপছন্দের গুণাবলি ধারণ করে।

যখন কোনো ব্যক্তি এই ছায়া-সত্তার মুখোমুখি হয়, তখন তা doppelgänger-এর মতই একটি ‘অপর সত্তা’-র অনুভূতি তৈরি করে। Jung-র ভাষায়, “Until you make the unconscious conscious, it will direct your life and you will call it fate.” অর্থাৎ অবচেতন চেতনায় না আনলে তা নিয়তি হয়ে যাবে।

আজকের বিজ্ঞান doppelgänger-এর অলৌকিক দিককে না মেনে এটিকে ব্যাখ্যা করে “Unrelated Look-alikes” হিসেবে। ২০১৫ সালে জার্নাল Cell Reports–এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, যাদের চেহারায় মিল, তাদের জেনেটিক প্রোফাইলে উল্লেখযোগ্য মিল থাকে।

অর্থাৎ দুনিয়ার ৮ বিলিয়ন মানুষের মধ্যে জেনেটিক কম্বিনেশনের পুনরাবৃত্তির ফলে কারও চেহারার সদৃশ আরেকজন থাকতেই পারে।
এছাড়া আধুনিক facial recognition AI-এর সাহায্যে আজ মানুষ তাদের doppelgänger খুঁজতে পারছে। যেমন, TwinStrangers.net প্ল্যাটফর্ম।

বাংলা সংস্কৃতি ও doppelgänger

আমাদের বাংলা লোককথায়ও doppelgänger-এর মতই কিছু ধারণা বিদ্যমান—
আপন ভূত: এক ধরনের বিশ্বাস, যেখানে নিজের ছায়ার মত ভূত দেখা যায়।
ছায়া-মানুষ: রাত্রিকালীন ছায়াসদৃশ কোনো অদ্ভুত উপস্থিতি।
প্রেতাত্মার প্রতিচ্ছবি: মৃত্যুপূর্ব আত্মার ছায়া-আত্মা দেখা যায়— যা মৃত্যুর পূর্বাভাস বলে বিবেচিত।
এ ছাড়াও, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্প “অপরিচিতা” ও “দ্বৈতপুরুষ”-এ ব্যক্তিত্বের দ্বৈততার দার্শনিক প্রতিফলন doppelgänger-এর নিকটবর্তী।

বিশ্বখ্যাত দার্শনিক Søren Kierkegaard ও Jean-Paul Sartre-এর লেখায় আমরা দেখতে পাই— মানুষ নিজের অস্তিত্ব নিয়ে যখন সংকটে পড়ে, তখন সে ‘অন্য আমি’-এর মুখোমুখি হয়। doppelgänger এখানে আত্মপরিচয় সংকটের প্রতীক— কে আমি? আমি আসলেই একজন তো? নাকি আমার একাধিক সত্তা?

doppelgänger শুধু এক অলৌকিক গল্প নয়— এটি আমাদের চেতনা, অস্তিত্ব, ও সামাজিক চরিত্রের গভীর প্রশ্ন। বিজ্ঞান যাই বলুক, শিল্প-সাহিত্য-দর্শন বলছে— আমরা প্রত্যেকেই হয়তো নিজের ভিতরে একাধিক সত্তা ধারণ করি। আর কোনো এক ঘোরলাগা বিকেলে, শহরের ভিড়ে, হয়তো আমরা হঠাৎই মুখোমুখি হয়ে যাবো নিজেরই অপর সত্তার সাথে।

doppelgänger শুধু এক অলৌকিক গল্প নয়— এটি আমাদের চেতনা, অস্তিত্ব, ও সামাজিক চরিত্রের গভীর প্রশ্ন। বিজ্ঞান যাই বলুক, শিল্প-সাহিত্য-দর্শন বলছে— আমরা প্রত্যেকেই হয়তো নিজের ভিতরে একাধিক সত্তা ধারণ করি। আর কোনো এক ঘোরলাগা বিকেলে, শহরের ভিড়ে, হয়তো আমরা হঠাৎই মুখোমুখি হয়ে যাবো নিজেরই অপর সত্তার সাথে।

গ্রীষ্মে ত্বক রক্ষার জন্য , সঠিক পোশাক নির্বাচন

গ্রীষ্মকাল হল বছরের সবচেয়ে গরম এবং আর্দ্র সময়। এই সময়ে ত্বকের শুষ্কতা, রোদে পোড়া, র‍্যাশ, বা অতিরিক্ত ঘাম সহ নানা সমস্যা হতে পারে। তাই সঠিক পোশাক নির্বাচন করা এবং ত্বকের যথাযথ যত্ন নেওয়া প্রয়োজন। এখানে কিছু টিপস দেওয়া হলো যা আপনার ত্বক রক্ষার জন্য সঠিক পোশাক বাছতে সহায়ক হতে পারে।

গ্রীষ্মে ত্বককে সুরক্ষিত রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল শ্বাসপ্রশ্বাসযোগ্য কাপড় পরা। বাতাস চলাচলের জন্য উপযুক্ত কাপড় ত্বককে ঠান্ডা রাখে এবং অতিরিক্ত ঘাম শুষে নেয়, যা ত্বকে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। সুতরাং জামা-কাপড়ে এমন কাপড় বেছে নিন যা প্রাকৃতিক ফাইবার থেকে তৈরি, যেমন: কটন (পাট) বা লিনেন (পাটির কাপড়)। এগুলি ত্বকে ঘর্ষণ কমিয়ে এনে শ্বাসপ্রশ্বাসে সাহায্য করে এবং শরীরকে ঠান্ডা রাখে। কটন কাপড় ত্বক থেকে ঘাম শুষে নেয় এবং পকেট ফাংশনালিটির জন্য খুবই সুবিধাজনক।

গ্রীষ্মের রোদে গাঢ় রঙের পোশাক পরা ত্বকের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, কারণ গাঢ়ড় রং সূর্যের তাপ শোষণ করে এবং শরীরকে অতিরিক্ত গরম করে তোলে। তাই গ্রীষ্মে হালকা রঙের পোশাক পরার পরামর্শ দেওয়া হয়। হালকা রঙের পোশাক যেমন সাদা, পেস্টেল শেডস বা আকাশী রঙ সূর্যের তাপ প্রতিফলিত করতে সহায়ক হয় এবং ত্বককে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে।

গ্রীষ্মকালে মুখ এবং গলার ত্বককে সূর্যের তেজ থেকে রক্ষা করতে একটি বড় হ্যাট বা টুপি পরা উপকারী হতে পারে। এটি শুধু ত্বককে সুরক্ষা দেয় না, বরং চোখকে সরাসরি রোদের তেজ থেকেও রক্ষা করে। হ্যাটের ব্রিম যত বেশি বড় হবে, তত বেশি রক্ষা পাওয়া যাবে।

পোশাকের পাশাপাশি সানস্ক্রীন ব্যবহার করাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। যদিও সঠিক পোশাক ত্বককে রক্ষা করতে সাহায্য করে, তবুও সানস্ক্রীন ত্বককে অতিবেগুনী রশ্মির ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। SPF 30 বা তার বেশি রেটিং সহ একটি ভালো সানস্ক্রীন ব্যবহার করুন এবং প্রতি ২-৩ ঘণ্টা পর পর পুনরায় প্রয়োগ করুন।

গ্রীষ্মের পোশাকের কাটিং এবং ডিজাইনও ত্বকের সুরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সুইমিং স্যুট, শর্ট, স্কার্ট বা ট্রাউজার যেমন ড্যামেজ বা টাইট না হয়ে সঠিকভাবে সঠিক সাইজে পরা উচিত। টাইট পোশাক শরীরের ত্বকে ঘর্ষণ তৈরি করতে পারে, যা ত্বকে জ্বালা সৃষ্টি করতে পারে। তাই এমন পোশাক পরুন যা আপনার শরীরের সাথে স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ এবং হাঁটাচলা করার জন্য আরামদায়ক।

গ্রীষ্মকালে ত্বকে বিভিন্ন ধরনের এলার্জি হতে পারে। কিছু বিশেষ কাপড় যেমন “অ্যালার্জি-প্রুফ” পোশাক ত্বককে সুরক্ষিত রাখতে সহায়ক। এই ধরনের কাপড়ে প্রাকৃতিক ফাইবার ব্যবহার করা হয়, যা ত্বকে জ্বালা সৃষ্টি বা এলার্জি হওয়ার ঝুঁকি কমায়।

গ্রীষ্মের তাপ থেকে শরীরে অতিরিক্ত ঘাম হতে পারে, যা ত্বকের উপর নোংরা এবং ব্যাকটেরিয়া জমতে পারে। এজন্য সুতি বা লিনেন কাপড়ের পোশাক পরলে ঘামের সমস্যা অনেকটা কমে যায় এবং ত্বক শুষ্ক থাকে।

গ্রীষ্মের পোশাক সঠিকভাবে নির্বাচন করা ত্বকের সুস্থতা বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শ্বাসপ্রশ্বাসযোগ্য, হালকা রঙের এবং সঠিকভাবে ফিটিং কাপড় পরা ত্বককে সুরক্ষিত রাখতে সহায়ক। পাশাপাশি সানস্ক্রীন ব্যবহার এবং হালকা সুরক্ষা পোশাক নির্বাচন করলে গ্রীষ্মের তাপ থেকে ত্বককে নিরাপদে রাখা সম্ভব। তাই এইসব পরামর্শ অনুসরণ করে গ্রীষ্মকাল উপভোগ করুন এবং ত্বককে সুস্থ রাখুন।

সমান্তরাল মহাবিশ্ব তত্ত্ব – বিজ্ঞানের সীমা ছাড়িয়ে দর্শন ও সাহিত্যের অন্তর্দৃষ্টি

২০১২ সালের উইম্বলডন ফাইনালে অ্যান্ডি মারে যখন রজার ফেদেরারের বিরুদ্ধে অপ্রত্যাশিতভাবে শক্তিশালী অবস্থান শুরু করেন, তখন ডেইলি টেলিগ্রাফের কলামিস্ট ম্যাথিউ নরম্যান এই ঘটনাকে ‘ডক্টর হু’র সমান্তরাল মহাবিশ্বের মতো ব্যাখ্যা করেন। এক বছর পর মারে শিরোপা জিতে এই ধারণাটি আরও প্রবল হয়-দুটি টেনিস চ্যাম্পিয়ন একই খেলার ভেতরেও যেন ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতায় বাস করছেন। এই ‘সমান্তরাল মহাবিশ্ব’ ধারণা শুধু ক্রীড়া সাংবাদিকতার রসদ নয়, বরং বিজ্ঞান, দর্শন ও সাহিত্য জুড়ে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে।

বিজ্ঞানী এবং দার্শনিকরা দীর্ঘদিন ধরেই মহাবিশ্বের প্রকৃতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ১৯৩৫ সালে এরউইন শ্রডিঙারের বিখ্যাত ‘বিড়াল-পরীক্ষা’ কোয়ান্টাম অনিশ্চয়তার একটি প্রতীকী রূপ। বিড়ালটি একই সময়ে জীবিত ও মৃত-অর্থাৎ, বাস্তবতা একাধিক সম্ভাবনার সমষ্টি। ১৯৫৭ সালে হিউ এভারেট ‘Many Worlds Interpretation’ প্রস্তাব করেন, যেখানে কোয়ান্টাম পর্যবেক্ষণ একটি মহাবিশ্বকে বিভক্ত করে অসংখ্য বিকল্প মহাবিশ্বে। এই তত্ত্ব অনুসারে, আমাদের প্রত্যেক সিদ্ধান্ত এবং ঘটনা নতুন একটি মহাবিশ্বের জন্ম দেয়, যেখানে ভিন্ন ফলাফল বাস্তবায়িত হয়।

রিচার্ড ফাইনম্যানের ‘Path Integral’ তত্ত্ব আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়, আলো একটি বিন্দু থেকে অন্য বিন্দুতে যাওয়ার জন্য সম্ভাব্য সব পথ অনুসরণ করে, কিন্তু আমরা শুধুমাত্র সবচেয়ে কার্যকরী পথটিই দেখতে পাই। স্টিফেন হকিং ‘The Universe in a Nutshell’ বইয়ে ‘cosmic casino’ রূপক ব্যবহার করে বলেন, আমাদের দেখা মহাবিশ্বের বাইরে অসংখ্য সম্ভাব্য মহাবিশ্ব রয়েছে, যেখানে প্রতিটি সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হয়।

প্রাচীন গ্রিক দর্শনে আমাদের আধুনিক ধারণাগুলোর শিকড় অনেক গভীরে। ডেমোক্রিটাসের ‘অণু তত্ত্ব’ অনুসারে, বিশ্ব অসীম পরমাণুর সমষ্টি, যা বিভিন্নভাবে মিলিত হয়ে অসংখ্য সম্ভাব্য জগত তৈরি করে। এপিকিউরাস আরও এগিয়ে গিয়ে ‘swerve’ ধারণা দেন, যা বলে যে পরমাণুগুলো হঠাৎ করেই দিক পরিবর্তন করতে পারে, ফলে ভবিষ্যৎ পূর্বনির্ধারিত নয়, বরং সম্ভাবনার সমাহার।

রোমান দার্শনিক লুক্রেটিয়াস এবং সিসেরো এ ধারণাকে মানব ইতিহাসের প্রসঙ্গে প্রয়োগ করেন। সিসেরো লিখেছেন, “আমাদের মতো অসংখ্য মানুষ একই সময়ে একই বিষয়ে আলোচনা করছে, একই নাম, সম্মান ও বুদ্ধিমত্তা নিয়ে।” এই চিন্তা ইতিহাসকে একরৈখিক নয়, বরং বহুমুখী বিকল্প পথের সমষ্টি হিসেবে দেখে।

বিকল্প ইতিহাস এবং ‘What If?’ প্রশ্নের গুরুত্ব –

ইতিহাসের বিকল্প সম্ভাবনা নিয়ে চিন্তা করা প্রাচীন কাল থেকে বিদ্যমান। রোমান ইতিহাসবিদ লাইভি Alexander the Great-এর ইতালিতে আক্রমণ না করার ‘What if?’ প্রশ্ন তোলেন। মধ্যযুগীয় ও আধুনিক খ্রিস্টীয় ইতিহাসবিদেরা এই প্রশ্ন থেকে দূরে থাকলেও, আধুনিক বিকল্প ইতিহাসের সাহিত্যে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফিলিপ রথের ‘The Plot Against America’ বা ফিলিপ কে ডিকের ‘The Man in the High Castle’ এই ধারার আধুনিক উদাহরণ।

খ্রিস্টীয় দর্শনে ইতিহাস ঈশ্বরের পরিকল্পনার অধীন, যেখানে সবকিছু পূর্বনির্ধারিত। শেক্সপিয়রের ‘হ্যামলেট’-এ যেমন বলা হয়েছে, “There’s a divinity that shapes our ends,” অর্থাৎ মানুষের ইচ্ছার বাইরে একটি উচ্চতর শক্তি ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণ করে। এর বিপরীতে, এপিকিউরিয়ান দর্শন মানব ইতিহাসকে দৈবচয়নের ফলাফল হিসেবে দেখায়, যেখানে সম্ভাবনার অসংখ্য পথ খোলা।

১৭শ শতকের গটফ্রিড লাইবনিজ ‘বেস্ট অফ অল পসিবল ওয়ার্ল্ডস’ তত্ত্বে বলেন, ঈশ্বর সব সম্ভাব্য জগতের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম জগত বেছে নিয়েছেন। যদিও এই ধারণা ঈশ্বরের সর্বশক্তিমত্তার প্রতি বিশ্বাসকে ধরে রাখে, তবুও এটি বিকল্প বাস্তবতার ধারণাকে দর্শনীয় মাত্রা দেয়।

জর্জ লুইস বোর্হেসের ‘The Library of Babel’ গল্পে অসীম সম্ভাবনার একটি গ্রন্থাগার বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে সমস্ত সম্ভাব্য বই রয়েছে, কিন্তু অর্থপূর্ণ তথ্য পাওয়া কঠিন। এটি মাল্টিভার্সের একটি প্রতীকী রূপ, যেখানে সম্ভাবনার সমষ্টি অবিরাম বিস্তৃত।

আধুনিক চলচ্চিত্র ও সাহিত্যে মাল্টিভার্স ধারণা ব্যাপক জনপ্রিয়। ‘Sliding Doors’ এবং ‘The Matrix’ এর মতো সিনেমা আমাদের দেখায়, কিভাবে একটিমাত্র মুহূর্তের পরিবর্তন জীবনের সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা সৃষ্টি করতে পারে। এই ধারনা আমাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ও ইতিহাসের বহুমুখী সম্ভাবনার প্রতি সচেতন করে তোলে।

মাল্টিভার্সের ভবিষ্যত

বিজ্ঞানীরা যেমন হিউ এভারেট, রিচার্ড ফাইনম্যান ও স্টিফেন হকিং মাল্টিভার্স তত্ত্বকে সমর্থন করেছেন, তেমনি দর্শন ও সাহিত্যও এই ধারণাকে সমৃদ্ধ করেছে। মাল্টিভার্স কেবল একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব নয়, এটি আমাদের অস্তিত্ব, স্বাধীনতা, এবং বাস্তবতার প্রকৃতি সম্পর্কে গভীর প্রশ্ন তোলে।

বর্তমান কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা, মহাবিশ্ববিজ্ঞান ও তথ্যতত্ত্বের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মাল্টিভার্সের ধারণা আরও জটিল ও বিস্তৃত হচ্ছে। গবেষকরা এখন প্রশ্ন করছেন, এই অসংখ্য মহাবিশ্বের মধ্যে আমাদের অবস্থান কী, এবং আমরা কীভাবে এই বিকল্প বাস্তবতাগুলোর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারি।

সমান্তরাল মহাবিশ্বের ধারণা আমাদের চিন্তার জগতকে বিস্তৃত করেছে-বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য ও ইতিহাসের সীমানা পেরিয়ে। এটি আমাদের শেখায়, বাস্তবতা একক নয়, বরং সম্ভাবনার অসংখ্য পথের সমষ্টি। আমাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রত্যেকটি মুহূর্ত নতুন একটি বিশ্ব সৃষ্টি করে। এই অন্তহীন বিকল্পের মাঝে আমরা নিজেকে খুঁজে পাই-একই সঙ্গে অসীম সম্ভাবনার অংশ, একই সঙ্গে একটি অনন্য বাস্তবতার অধিকারী।

সম্ভবত আমাদের জীবনের প্রতিটি ‘কি হতো যদি’ প্রশ্নের উত্তর অন্য কোনো মহাবিশ্বে অপেক্ষা করছে-যেখানে আমাদের বিকল্প আত্মারা ভিন্ন গল্প বুনছে। এই চিন্তা আমাদের কেবল কৌতূহলী করে না, বরং আমাদের অস্তিত্বের গভীরতম রহস্যের সন্ধানে নিয়ে যায়। সমান্তরাল মহাবিশ্বের এই জটিল ও রহস্যময় ধারণা আজকের বিজ্ঞান ও মানবজীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ঢাকার বাতাস আজ , বিশ্বে ষষ্ঠ দূষিততম

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা আবারও বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর তালিকায় শীর্ষ দশের মধ্যে উঠে এসেছে। রবিবার সকাল ৯টা ২০ মিনিটে শহরের বায়ুমান সূচক (Air Quality Index—AQI) ছিল ১২৯, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ‘‘সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর’’ (Unhealthy for Sensitive Groups) বলে বিবেচিত।

বিশ্বের বিভিন্ন শহরের মধ্যে পাকিস্তানের লাহোর (AQI ১৭৯), ভারতের দিল্লি (AQI ১৫৯) ও চিলির সান্তিয়াগো (AQI ১৫৬) যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে। ঢাকার অবস্থান ষষ্ঠ, তবে গতকাল সকালে ঢাকার AQI ছিল ১৫২, যা সরাসরি ‘‘অস্বাস্থ্যকর’’ শ্রেণিভুক্ত ছিল। দুই দিনের তুলনায় কিছুটা উন্নতি হলেও সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য সতর্ক সংকেত থেকেই যাচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, বায়ুদূষণ বৈশ্বিকভাবে প্রতি বছর প্রায় ৭০ লাখ মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী। প্রধানত স্ট্রোক, হৃদরোগ, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্ট (COPD), ফুসফুস ক্যান্সার এবং তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ এই মৃত্যুর কারণ।

বাংলাদেশের পরিবেশ অধিদফতর ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর তথ্য অনুসারে, দেশের বায়ুমান সূচক (AQI) পাঁচটি প্রধান দূষক উপাদানের উপর নির্ভরশীল— পার্টিকুলেট ম্যাটার (PM10 ও PM2.5), নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড (NO2), কার্বন মনোক্সাইড (CO), সালফার ডাইঅক্সাইড (SO2) এবং ওজোন (O3)। বিশেষ করে সূক্ষ্ম ধূলিকণা (PM2.5) ঢাকার বায়ুদূষণের সবচেয়ে বড় কারণ, যা মানুষের ফুসফুসে প্রবেশ করে দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যখন AQI সূচক ৫০ থেকে ১০০-এর মধ্যে থাকে, তখন বায়ুর মানকে ‘মধ্যম’ বলা হয়। তবে AQI ১০১ থেকে ১৫০ হলে তা ‘‘সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর’’ এবং ১৫১ থেকে ২০০ হলে সরাসরি ‘‘অস্বাস্থ্যকর’’ হিসেবে গণ্য হয়। সূচক ২০১ থেকে ৩০০ হলে তা ‘‘খুব বেশি অস্বাস্থ্যকর’’ এবং ৩০১-এর ওপরে গেলে ‘‘ঝুঁকিপূর্ণ’’ বা ‘‘hazardous’’ বলে চিহ্নিত হয়, যা সকল নাগরিকের স্বাস্থ্যের জন্য সরাসরি বিপদ ডেকে আনে।

ঢাকার ক্ষেত্রে শীত মৌসুমে বায়ুর মান আরও খারাপ হয়ে যায়। এই সময়ে বাতাসে আর্দ্রতা কমে যাওয়ায় এবং গাড়ি, ইটভাটা ও নির্মাণকাজের ধুলা-ময়লা শহরের বায়ুতে জমা হতে থাকে। বর্ষাকালে বৃষ্টির কারণে বায়ু কিছুটা বিশুদ্ধ হয়। তবে স্থায়ী সমাধান বা দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা অভাব এখনও প্রকট।

পরিবেশ অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক ড. সেলিম মাহমুদ বলেন, ‘‘ঢাকার বায়ুদূষণের মূল কারণ তিনটি— যানবাহনের কালো ধোঁয়া, নির্মাণকাজের অনিয়ন্ত্রিত ধুলিকণা এবং পাশের জেলা ও দেশের ইটভাটা। এগুলো নিয়ন্ত্রণ না করলে শহরবাসীর শ্বাস নেওয়ার স্বাধীনতা প্রতিদিন সংকুচিত হবে।’’

বিশ্বব্যাপী WHO-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতি ঘনমিটারে PM2.5-এর আদর্শ সীমা হলো ৫ মাইক্রোগ্রাম। অথচ ঢাকায় এই মাত্রা শীতকালে কখনও কখনও ১০০-এর বেশি হয়ে যায়, যা নিরাপদ সীমার ২০ গুণেরও বেশি।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী ও শ্বাসতন্ত্রজনিত রোগীদের বাইরে দীর্ঘ সময় না থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। একইসঙ্গে সাধারণ নাগরিকদের জন্য মাস্ক ব্যবহার, ঘরবন্দী থাকা এবং ধূলিকণা ও ধোঁয়া এড়িয়ে চলার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।

এদিকে নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, বায়ুদূষণ প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও আইনের কঠোর বাস্তবায়ন জরুরি। নির্মাণস্থলে ধুলা নিয়ন্ত্রণ, যানবাহনে আধুনিক ইঞ্জিন প্রযুক্তি ও ইটভাটা নিয়ন্ত্রণবিধি কার্যকর করা ছাড়া বিকল্প নেই।

আগে বিচার, পরে ক্ষমা : আসিফ বিন আলী , পিএইচডি গবেষক ও সাবেক সাংবাদিক

0

“উপদেষ্টা মাহফুজ আলম লিখেছেন, ‘৭১-এর প্রশ্ন মীমাংসা করতেই হবে।’ আমি একমত। তবে দ্বিমত করছি যখন তিনি লেখেন, ‘যুদ্ধাপরাধের সহযোগীদের ক্ষমা চাইতে হবে।’ ১৯৭১ সালে যুদ্ধাপরাধ যাদের বিরুদ্ধে করা হয়েছে, মাহফুজ না তাদের পরিবারের সদস্য, না ভুক্তভোগী। তাকে এই অধিকার কে দিয়েছে জামাতকে ক্ষমা করে দেওয়ার?

ঠিক যেমনভাবে আমি ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের হাতে হওয়া নাগরিক হত্যাকাণ্ডের সঠিক বিচার চাই, সেই একই যুক্তিতে ১৯৭১ সালের গণহত্যার দায়ে জামাতের বিচার চাই। ঠিক যে কারণে আওয়ামী লীগের সংগঠন হিসেবে বিচার হওয়া যায়, ঠিক একই কারণে জামাতেরও সংগঠন হিসেবে বিচার করতে হবে।

তবে মাহফুজ কেন শুধু আওয়ামী লীগের বিচার ও নিষিদ্ধতা চান, কিন্তু জামাতকে ক্ষমা চাইলেই রাজনীতির সুযোগ দিতে চান? বিচার কেন পার্টি ভেদে ভিন্ন হবে? বিচার ও আইন সবার জন্য সমান হতে হবে, তাই নয় কি? যদি বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক রাজনীতি পেতে হয়, তবে ১৯৭১-এর অপরাধের যেমন বিচার ও ক্ষমা জরুরি, তেমন ২০২৪-এর হত্যাকাণ্ডের বিচার ও ক্ষমা জরুরি।

… যে দল বা ব্যক্তি মানবতাবিরোধী অপরাধ করবে, ক্ষমতায় থাকতে অন্ধ হয়ে দেশের নাগরিকদের হত্যা করবে, তাদের একই আইনে বিচার করতে হবে, প্রতীকী অর্থে হলেও শাস্তি দিতে হবে। অতঃপর, যদি তারা অনুতপ্ত হয়, তবে ক্ষমার সুযোগ রাখতে হবে। তবে বিচার না করে শুধু ক্ষমা দিয়ে রাজনীতিতে পুনর্বাসন করা যাবে না, এমনকি তা যদি অপরাধের ৫০ বছর পরও হয়।

এবার আসুন দেখি ৭১-এর যুদ্ধাপরাধী কারা? মূল যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তান আর্মি। তাদের সহযোগী হিসেবে যুদ্ধাপরাধ করেছে জামায়াতে ইসলামি।

… জামাত ও তাদের ছাত্র সংগঠন (শিবিরের পূর্বের দল) সরাসরি পাকিস্তান আর্মিকে সাহায্য করে, সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে। ১৯৭১ সালে যুদ্ধকালীন পাকিস্তান সরকারের অনুগত গভর্নর আব্দুল মুত্তালিব মালিকের অধীনে পূর্ব পাকিস্তানে যে সরকার গঠিত হয়েছিল, সেই সরকারে জামায়াতে ইসলামি দলীয়ভাবে যোগ দিয়েছিল। চারটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিল তারা। অর্থাৎ জামাত গণহত্যাকারী সরকারের অংশ ছিল, শুধু বাইরে থেকে রাজনৈতিক সমর্থন দেয়নি। তখন গোলাম আযম পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের আমির ছিলেন।

গোলাম আযমের নাগরিকত্ব মামলায় (১৯৯৪) 46 DLR (AD) (1994) 192 অ্যাটর্নি জেনারেল আমিনুল হকের সাবমিশন: গোলাম আযম মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে লবিং করেছেন, যাতে তারা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেয়। তিনি হজের সময় বাংলাদেশবিরোধী প্রোপাগান্ডা করেছেন। ১৯৭২ সালে রিয়াদে ইসলামি যুব কনফারেন্সে গিয়ে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন করার দাবি করেছেন, লন্ডনে গিয়ে পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি তৈরি করেছেন। ১৯৭৩ সালে লিবিয়ার বেনগাজিতে মুসলিম পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেওয়ার অনুরোধ করেছেন। ১৯৭৩ এ সৌদির বাদশাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেওয়ার অনুরোধ করেছেন।

… আমি মাহফুজকে সাধুবাদ জানাই, তিনি অন্তত জামাতের প্রশ্ন তুলেছেন। এর জন্য তাকে যথেষ্ট সমালোচনা নিতে হবে, জামাত-শিবির তাকে আক্রমণও করবে। তবে আমার এই লেখার উদ্দেশ্য মাহফুজকে সমালোচনা করা নয়, বরং একটি নৈতিক প্রশ্ন করা।

… আমি আন্তরিকভাবে চাই আওয়ামী লীগ ও জামাতের বিচার হোক। অন্যথায়, আমাদের রাজনীতিতে যে সহিংসতার দুষ্টচক্র রয়েছে, তার থেকে আমরা বের হতে পারব না। বিচার সবার জন্য সমান। আগে বিচার, পরে ক্ষমা।”


দেশে সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল , শিক্ষা ব্যবস্থা এখন কওমি

0

দরিদ্রতার কারণে বিগত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অভিভাবক সন্তানদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে মাদ্রাসাকে বেছে নিয়েছেন। দেশে বর্তমানে মূলধারার মাদ্রাসা রয়েছে দুই ধরনের—আলিয়া ও কওমি।

এর মধ্যে আলিয়া মাদ্রাসাগুলো সাধারণত সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হয়। তাদের শিক্ষাক্রমে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সরকারি কারিকুলাম অন্তর্ভুক্ত থাকে। সেই সঙ্গে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্যও সংরক্ষণ করে বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ‍ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস)।

অপরদিকে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা পরিচালিত হয় সম্পূর্ণ বেসরকারিভাবে এবং শিক্ষাক্রমও পুরোপুরি নিজস্ব পদ্ধতিতে তৈরি। এমনকি এ ধারার প্রতিষ্ঠানগুলোয় কোনো মনিটরিং কিংবা অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের সুস্পষ্ট পরিসংখ্যান সরকারের কাছে নেই।

দেশে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা কার্যক্রম বর্তমানে ছয়টি বৃহৎসহ অল্প কিছু ছোট বোর্ডের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বোর্ড ধরা হয় বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশকে (বেফাক)। এটির অধীনে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত তিন বছরে পরীক্ষার্থী বেড়েছে প্রায় ৫৫%।

বেফাকের ২০২২ সালের পরীক্ষায় মোট ২ লাখ ২৫ হাজার ৬৩১ শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল। সেখানে চলতি বছর ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৭৭৬ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় বসে। সে হিসাবে তিন বছরের ব্যবধানে পরীক্ষার্থী বেড়েছে ১ লাখ ২৪ হাজার ৪১৫ জন। এর মধ্যে মেয়ে পরীক্ষার্থীর অংশগ্রহণ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেফাকের এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে এ বোর্ডের অধীনে সারা দেশে প্রায় ২৯ হাজার মাদ্রাসা রয়েছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত প্রায় ৫০ লাখ শিক্ষার্থী। এদের মধ্যে ১৭ হাজার ৩৬২টি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী এবার কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে।

সাধারণ শিক্ষায় যদিও এর ঠিক উল্টো চিত্র, প্রতিনিয়তই কমছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। শিক্ষাবিদরা বলছেন, মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার দিন দিনই বাড়ছে। আবার অনেক শিক্ষার্থী চলে যাচ্ছে কওমি মাদ্রাসায়। ধর্মীয় চিন্তার পাশাপাশি করোনা-পরবর্তী সময়ে দরিদ্রতা কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী বাড়ার অন্যতম কারণ।

এসব প্রতিষ্ঠানে মানসম্মত শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরের জন্য এ ধারাকে সরকারি নীতিমালার আওতায় নিয়ে আসাটাও জরুরি বলে মনে করছেন তারা। কেননা দেশে এখন সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল শিক্ষা ব্যবস্থা কওমি।

বেশির ভাগ কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে পড়ানোর সুযোগ থাকে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোয় রয়েছে আবাসিক সুবিধাও। বড় অংশ দরিদ্র মানুষদের পক্ষে সন্তানকে সাধারণ বিদ্যালয়ে পড়ানো কষ্টসাধ্য। এছাড়া শ্রমজীবী নারীদের পক্ষে কাজের পাশাপাশি সন্তানের দেখভালও কষ্টসাধ্য। ফলে তারা সন্তানের জন্য এসব প্রতিষ্ঠানকেই বেছে নিচ্ছেন।

এছাড়া শিক্ষা কারিকুলামে বারবার পরিবর্তন, দীর্ঘ করোনাকালে সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ—এমন আরো বেশকিছু বিষয়ও মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে।

কওমি মূলত ভারতের উত্তর প্রদেশের দেওবন্দ মাদ্রাসার আলোকে প্রণীত শিক্ষা ব্যবস্থা। এখানে কোরআন-হাদিসের মূল ধারার শিক্ষার ওপর বেশি জোর দেয়া হয়। আর কওমি ধারায় সর্বোচ্চ পরীক্ষা ‘দাওরায়ে হাদিস’। যদিও এ স্তরে ওঠার আগেই শিক্ষাজীবন শেষ করেন শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগ। আওয়ামী লীগ সরকার দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স সমতুল্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

ব্যানবেইস সর্বশেষ ২০১৫ সালে কওমি মাদ্রাসায় একটি জরিপ পরিচালনা করে। তাতে মোট ১৩ হাজার ৯০২টি মাদ্রাসা এবং মোট ১৩ লাখ ৯৮ হাজার ২৫২ শিক্ষার্থীর তথ্য উঠে আসে। যদিও শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওই জরিপে দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের অনেক মাদ্রাসার তথ্যই অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তাছাড়া প্রতি বছরই বাড়ছে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা।

আমাদের আদি মাতা – মাইটোকন্ড্রিয়াল ইভ

মানবজাতির ইতিহাসে সবচেয়ে বিস্ময়কর আবিষ্কারগুলোর মধ্যে একটি হলো “মাইটোকন্ড্রিয়াল ইভ”-এর সন্ধান। তিনি আমাদের সবার আদি মা, যার রক্ত ও জিন আজকের প্রতিটি মানুষের শরীরে প্রবাহিত হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন যে আজ থেকে প্রায় ২লক্ষ বছর আগে আফ্রিকায় এক নারী বাস করতেন, যার মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ (mtDNA) বংশপরম্পরায় টিকে আছে এবং বর্তমান বিশ্বের সকল মানুষের মধ্যে বিদ্যমান। অর্থাৎ আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে তার সন্তান।

মাইটোকন্ড্রিয়াল ইভ হলেন সেই নারী, যার মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ (mtDNA) আজকের সকল মানুষের মধ্যে বিদ্যমান। মাইটোকন্ড্রিয়া কোষের শক্তি উৎপাদনকারী অংশ এবং এর নিজস্ব জিনোম রয়েছে, যা শুধুমাত্র মাতৃপরম্পরায় সন্তানদের মধ্যে প্রবাহিত হয়। অর্থাৎ একজন মানুষের মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ তার মা, দাদী, পরদাদী—এইভাবে অতীতের দিকে চলে যায় এবং একসময় মাইটোকন্ড্রিয়াল ইভের সাথে মিলিত হয়। তবে এটি গুরুত্বপূর্ণ যে, মাইটোকন্ড্রিয়াল ইভ একমাত্র নারী ছিলেন না যিনি সেই সময় বেঁচে ছিলেন। বরং তিনি এমন একজন নারী যার মাইটোকন্ড্রিয়াল বংশধারা আজ অবধি টিকে আছে। অন্যান্য নারীদের বংশধররা হয়তো সময়ের সাথে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা আধুনিক জিনতত্ত্বের পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। তারা বিভিন্ন মানুষের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে তাদের মাইটোকন্ড্রিয়াল জিনোমের তুলনা করেছেন। জিনোমের মিল-অমিল বিশ্লেষণ করে তারা দুজন মানুষের মধ্যে কতটা সম্পর্ক রয়েছে তা বের করেছেন। মাইটোকন্ড্রিয়াল জিনোমে একটি “হাইপারভেরিয়েবল রিজিয়ন” থাকে, যা দ্রুত পরিবর্তিত হয়। এই পরিবর্তনের হার একটি “আণবিক ঘড়ি” হিসেবে কাজ করে, যা বিজ্ঞানীদেরকে জিনগত পরিবর্তনের সময়কাল নির্ণয় করতে সাহায্য করে।
গবেষণার সহ-লেখক ও পোল্যান্ডের সাইলেসিয়ান ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির ইনফরম্যাটিক্স ইনস্টিটিউটের ভাইস হেড ক্রিজটফ সাইরান বলেন, “জিন সিকোয়েন্সের পার্থক্যকে সময়ের সাথে বিবর্তনের প্রক্রিয়ায় রূপান্তর করতে হয়। এজন্য আমরা বিবর্তনের বিভিন্ন মডেল ব্যবহার করি, যেমন—জিন মিউটেশনের হার, জিনেটিক ড্রিফ্ট (জিনগত বৈচিত্র্যের আকস্মিক হারানো) ইত্যাদি।” এই গবেষণা শুধুমাত্র মানবজাতির উৎস সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান বৃদ্ধি করে না, বরং এটি জিনগত রোগ, মিউটেশন এবং প্রাকৃতিক নির্বাচন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়। অধ্যাপক কিমেল বলেন, “জিনগত পরিবর্তনের ধারা বোঝা চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

উদাহরণস্বরূপ ক্যান্সার, জিনগত ব্যাধি বা সংক্রামক রোগের গবেষণায় মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ বিশ্লেষণ সাহায্য করতে পারে। এছাড়াও মানবজাতির বিস্তার ও অভিযোজন সম্পর্কে জানতে এই ধরনের গবেষণা অত্যন্ত সহায়ক। মাইটোকন্ড্রিয়াল ইভের পাশাপাশি বিজ্ঞানীরা “ওয়াই-ক্রোমোজোমাল আদম”-এর কথাও বলেন, যিনি সকল পুরুষের সাধারণ পূর্বপুরুষ। তবে মাইটোকন্ড্রিয়াল ইভ এবং ওয়াই-ক্রোমোজোমাল আদম একই সময়ে বাস করতেন না। গবেষণা অনুযায়ী, আদমের বয়স প্রায় ১২০,০০০ থেকে ১৫৬,০০০ বছর।

কিছু গবেষক মনে করেন, মাইটোকন্ড্রিয়াল ইভের বয়স আরও বেশি হতে পারে। তবে রাইস ইউনিভার্সিটির এই গবেষণা পূর্বের অনিশ্চয়তা দূর করে একটি সুস্পষ্ট সময়রেখা দিয়েছে। ভবিষ্যতে আরও উন্নত জিনোমিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষকরা মানব বিবর্তনের আরও সঠিক চিত্র তুলে ধরতে পারবেন । মাইটোকন্ড্রিয়াল ইভ শুধু একটি বৈজ্ঞানিক ধারণা নয় তিনি আমাদের সবার জিনগত মা। তার ডিএনএ আমাদের শরীরে বহন করছি আমরা প্রত্যেকে। এই গবেষণা আমাদের শেখায় আমরা সবাই একে অপরের সাথে সম্পর্কিত। জাতি, ধর্ম, দেশ—যাই হোক না কেন, জিনগতভাবে আমরা সবাই একই পরিবারের সদস্য।

‘মা-সূলভতা’ কি প্রকৃতি না সংস্কৃতি ?

যত্নশীলতা, সহানুভূতি, আত্মত্যাগ এমন সব আচরণ ‘মা-সূলভতা’ বলে বোঝানো হয়। ঐতিহাসিকভাবে নারীকে এই ভূমিকার সাথে প্রকৃতি ও জীববিজ্ঞানের মাধ্যমে যুক্ত করা হলেও সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো থেকে জানা যায় এ ধরনের আচরণ সবসময় বায়োলজিক্যাল নয়; বরং দীর্ঘদিনের সামাজিকীকরণ (socialization) ও সাংস্কৃতিক প্রত্যাশার ফল।

নারীর দেহে অন্তঃস্রাবিত হরমোন, বিশেষত অক্সিটোসিন (Oxytocin) এবং প্রোল্যাক্টিন (Prolactin), মা হওয়ার সময় এবং সন্তানের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অক্সিটোসিনকে ‘bonding hormone’ বলা হয়। প্রসবকালীন ও দুধপানকালীন এই হরমোন বৃদ্ধির ফলে মায়ের সাথে সন্তানের গভীর সংযোগ তৈরি হয়।

Feldman (2012) এর গবেষণায় দেখা যায়, শিশু জন্মের পর পিতামাতার উভয়ের মধ্যেই অক্সিটোসিন বৃদ্ধি পায় এটা কেবল নারীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একইভাবে Abraham et al. (2014) দেখান, পিতারাও সন্তানের সাথে নিয়মিত সংস্পর্শের মাধ্যমে ঠিক একই মাত্রার অক্সিটোসিন উৎপন্ন করতে সক্ষম।
অর্থাৎ বায়োলজিক্যাল উপাদান থাকলেও সেটি লিঙ্গনির্ভর নয়; বরং অভ্যাস ও আচরণ-নির্ভর।

Margaret Mead (1935) তাঁর নৃতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখিয়েছেন সব সমাজেই নারীর আচরণ একরকম নয়। নিউ গিনির তিনটি জাতিগোষ্ঠীতে তিনি দেখতে পান কোথাও নারীরা যত্নশীল, কোথাও কঠোর এবং কোথাও আবার পুরুষরা বেশি সংবেদনশীল।

এছাড়া Nancy Chodorow (1978) বলেন নারী ও পুরুষের মধ্যে যত্নবোধের পার্থক্য সামাজিকীকরণের ফল। ছোটবেলা থেকেই মেয়েদেরকে পুতুল খেলার মাধ্যমে ‘মাতৃত্ব’ শেখানো হয় এবং ছেলেদের শক্তি ও স্বাধীনতার মূল্যবোধ শেখানো হয়।

Carol Gilligan (1982)–এর মতে, নারী-পুরুষের নৈতিক চিন্তা ধরণা গঠনের পেছনেও লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক প্রত্যাশা কাজ করে। নারীদের কাছ থেকে সমাজ বেশি ‘care ethics’ বা পরিচর্যার নৈতিকতা প্রত্যাশা করে, যা তাদের আচরণে প্রতিফলিত হয়।

নিউরোসায়েন্স প্রমাণ করেছে Neuroplasticity-এর ফলে মানুষের মস্তিষ্ক অভ্যাস ও পরিবেশ অনুযায়ী নিজেকে রূপান্তরিত করে। Kim et al. (2010)–এর গবেষণায় বলা হয়েছে, পিতামাতার ভূমিকা পালনকারী পুরুষদের ব্রেইনে ঠিক তেমনি নিউরাল পরিবর্তন দেখা যায় যেটা মায়েদের ক্ষেত্রে হয়।

এর মানে যত্নশীলতা শুধুমাত্র নারীর বায়োলজিক্যাল গুণ নয়; বরং পরিবেশ ও ভূমিকার উপর নির্ভর করে পুরুষরাও অনুরূপ আচরণ রপ্ত করতে পারেন।

নারীর মধ্যে মা-সূলভ আচরণকে ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে দেখানোর পিছনে পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। Deborah Cameron (2007) বলেন—এ ধরনের লিঙ্গভিত্তিক আচরণিক প্রত্যাশা সমাজের পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোকে টিকিয়ে রাখে, কারণ এতে নারীরা বিনা প্রশ্নে যত্নশীল ভূমিকা পালন করে।

এছাড়া Judith Butler (1990)–এর ‘Gender Performativity’ তত্ত্ব বলছে—নারী-পুরুষের আচরণ আসলে বারবার পুনরাবৃত্তিমূলক ভূমিকা পালন (role performance)-এর ফল। ফলে ‘মা-সূলভ’ আচরণ নারীর স্বভাব নয়; সামাজিক অনুশীলনের ফলাফল।

Scandinavian Gender Equality Model (Sweden, Norway, Denmark)-এ দেখা গেছে—পিতাদের সন্তান পালনের সমান সুযোগ (paternity leave) ও ছেলে-মেয়ে উভয়কে সমান যত্নশীলতা শেখানো হয়। গবেষণায় উঠে এসেছে এতে পিতামাতার মধ্যে যত্নবোধের পার্থক্য কমে আসে এবং পুরুষরাও সমানভাবে ‘মা-সূলভ’ আচরণ করেন।

Haas & Rostgaard (2011) এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদে এটি নারী-পুরুষ উভয়ের আচরণে ভারসাম্য আনে।

উপরের আলোচনাগুলো থেকে স্পষ্ট হয়—নারীদের মধ্যে ‘মা-সূলভতা’র অস্তিত্ব বায়োলজিক্যাল ও সামাজিক দুই উপাদান থেকেই আসে। তবে সামাজিক নির্মাণ ও ভূমিকা শেখানোর ভূমিকা তুলনামূলকভাবে বেশি শক্তিশালী ও বিস্তৃত।

এই বিষয়টির পুনর্বিবেচনা জরুরি, কারণ এতে লিঙ্গভিত্তিক কাজের বিভাজন হ্রাস পাবে, পুরুষও সমানভাবে যত্নশীল ভূমিকা নিতে উৎসাহিত হবে এবং নারীদের উপর একচেটিয়া পরিচর্যার চাপ কমবে।
বস্তুত যত্নশীলতা কোনো লিঙ্গনির্ভর গুণ নয়; বরং মানবিক গুণ যেটি পরিবেশ ও অভ্যাস দ্বারা রপ্ত হয়।

নেতানিয়াহুর সাথে যোগাযোগ কেন ছিন্ন করবেন ট্রাম্প ?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। গতকাল শুক্রবার ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যমের খবরে এ তথ্য জানানো হয়েছে। ইসরায়েলি আর্মি রেডিওর সাংবাদিক ইয়ানির কোজিন এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডলে এক পোস্টে লিখেছেন — ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠমহল মনে করছে, নেতানিয়াহু তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা করছেন—এমন সন্দেহ থেকেই ট্রাম্প সম্পর্ক ছিন্ন করার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

কোজিন আরও দাবি করেন — ট্রাম্প এখন নেতানিয়াহুর ওপর নির্ভর না করেই মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে এগিয়ে যেতে চান। এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়, আঞ্চলিক বিষয়ে দুই নেতার দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে এখন স্পষ্ট ফারাক দেখা দিয়েছে। অবশ্য এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল—দুই দেশের কারও পক্ষ থেকেই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করা হয়নি। তবে ‘ইসরায়েল হায়োম’ নামের একটি পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের সঙ্গে কোজিনের বক্তব্য মিলে গেছে। ডানপন্থী এই পত্রিকা নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। দুজনের মধ্যে বাড়তে থাকা হতাশা ও দূরত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

গত বৃহস্পতিবার ইসরায়েল হায়োম পত্রিকা ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ কয়েকটি সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে জানায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বর্তমানে নেতানিয়াহুর ওপর ‘হতাশ’। তিনি ভবিষ্যতে নেতানিয়াহুর অংশগ্রহণ ছাড়াই মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে চান। সূত্র জানায় — ট্রাম্পের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ, বিশেষ করে সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন।

১০ বছরের মধ্যে , বাংলাদেশকে ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে দেখতে চাই : আশিক চৌধুরী

আগামী ১০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হিসেবে দেখতে চান বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী। বৃহস্পতিবার (৮ মে) চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান।

ব্রিফিংয়ে আশিক চৌধুরী বলেন, আমাদের লক্ষ্য বাংলাদেশকে একটা ম্যানুফ্যাকচারিং হাবের মতো গড়তে চাই, ফ্যাক্টরি বানাতে চাই। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, আমাদের দেশের জনসংখ্যার বড় অংশ তরুণ। তারা অর্থনীতির জন্য সম্পদ। তাদের ব্যবসায়ী বানানোর জন্য বিনিয়োগ ব্যবস্থার উন্নতি করতে হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বপ্নকে সাকসেস করতে হলে চট্টগ্রামকে সাকসেস করতে হবে। শিল্পের ৩০-৪০ শতাংশ চট্টগ্রাম থেকে আসে। আমাদের বড় ইকোনমিক জোনগুলো চট্টগ্রামে। বিশেষ করে বড় বড় ইনিশিয়েটিভস, চায়না স্পেশাল ইকোনোমিক জোন হচ্ছে, মীরসরাই ইকোনোমিক জোন রয়েছে। আমরা একটি ফ্রি ট্রেড জোনের কথা বলছি, সেটাও চট্টগ্রামকে ঘিরে। সবগুলোর নেপথ্যে রয়েছে চট্টগ্রামের বন্দরগুলো। বন্দরগুলোকে সাকসেস করতে না পারলে সবগুলো বিনিয়োগই লক্ষ্যভ্রষ্ট হবে। বিনিয়োগকারীদের লজিস্টিক নিশ্চিত করতে হলে বন্দরের সক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়াতে হবে।

আশিক চৌধুরী বলেন, বিশ্বে বন্দর অপারেশনও একটি বড় ইন্ডাস্ট্রি। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত আমাদের লোকজন দিয়ে বৈশ্বিক বন্দর অপারেশন করা। বিশ্বের বন্দরগুলো টেকনোলজিতে অনেক এগিয়ে গেছে। আমাদের বন্দর সংশ্লিষ্টদের দক্ষতা বাড়াতে হবে। আমাদের বন্দরে যে অপারেটর রয়েছেন, শ্রমিক রয়েছেন, তাদের দক্ষ করতে হবে। তারাও যেন বিদেশি পোর্ট অপারেটরদের সঙ্গে কাজ করতে পারেন।

ভিয়েতনামের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, সক্ষমতার দিক থেকে আমরা ভিয়েতনামের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবো না। ভিয়েতনামে ৪৪টি বন্দর রয়েছে। তাদের হ্যান্ডলিং ক্যাপাসিটি বছরে ৪৭ মিলিয়ন টিইইউস। কিন্তু আমাদের এখন হচ্ছে ১ পয়েন্ট ২৯ মিলিয়ন টিইইউস। সেগুলো আমাদের নির্মাণাধীন সবগুলো পোর্টকে অ্যাকটিভ করলেও হবে ৭ দশমিক ৮ মিলিয়ন টিইইউস। এজন্য আমাদের বন্দরকে ইফিসিয়েন্ট করার বিকল্প নেই।