বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা আবারও বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর তালিকায় শীর্ষ দশের মধ্যে উঠে এসেছে। রবিবার সকাল ৯টা ২০ মিনিটে শহরের বায়ুমান সূচক (Air Quality Index—AQI) ছিল ১২৯, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ‘‘সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর’’ (Unhealthy for Sensitive Groups) বলে বিবেচিত।
বিশ্বের বিভিন্ন শহরের মধ্যে পাকিস্তানের লাহোর (AQI ১৭৯), ভারতের দিল্লি (AQI ১৫৯) ও চিলির সান্তিয়াগো (AQI ১৫৬) যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে। ঢাকার অবস্থান ষষ্ঠ, তবে গতকাল সকালে ঢাকার AQI ছিল ১৫২, যা সরাসরি ‘‘অস্বাস্থ্যকর’’ শ্রেণিভুক্ত ছিল। দুই দিনের তুলনায় কিছুটা উন্নতি হলেও সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য সতর্ক সংকেত থেকেই যাচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, বায়ুদূষণ বৈশ্বিকভাবে প্রতি বছর প্রায় ৭০ লাখ মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী। প্রধানত স্ট্রোক, হৃদরোগ, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্ট (COPD), ফুসফুস ক্যান্সার এবং তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ এই মৃত্যুর কারণ।
বাংলাদেশের পরিবেশ অধিদফতর ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর তথ্য অনুসারে, দেশের বায়ুমান সূচক (AQI) পাঁচটি প্রধান দূষক উপাদানের উপর নির্ভরশীল— পার্টিকুলেট ম্যাটার (PM10 ও PM2.5), নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড (NO2), কার্বন মনোক্সাইড (CO), সালফার ডাইঅক্সাইড (SO2) এবং ওজোন (O3)। বিশেষ করে সূক্ষ্ম ধূলিকণা (PM2.5) ঢাকার বায়ুদূষণের সবচেয়ে বড় কারণ, যা মানুষের ফুসফুসে প্রবেশ করে দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যখন AQI সূচক ৫০ থেকে ১০০-এর মধ্যে থাকে, তখন বায়ুর মানকে ‘মধ্যম’ বলা হয়। তবে AQI ১০১ থেকে ১৫০ হলে তা ‘‘সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর’’ এবং ১৫১ থেকে ২০০ হলে সরাসরি ‘‘অস্বাস্থ্যকর’’ হিসেবে গণ্য হয়। সূচক ২০১ থেকে ৩০০ হলে তা ‘‘খুব বেশি অস্বাস্থ্যকর’’ এবং ৩০১-এর ওপরে গেলে ‘‘ঝুঁকিপূর্ণ’’ বা ‘‘hazardous’’ বলে চিহ্নিত হয়, যা সকল নাগরিকের স্বাস্থ্যের জন্য সরাসরি বিপদ ডেকে আনে।
ঢাকার ক্ষেত্রে শীত মৌসুমে বায়ুর মান আরও খারাপ হয়ে যায়। এই সময়ে বাতাসে আর্দ্রতা কমে যাওয়ায় এবং গাড়ি, ইটভাটা ও নির্মাণকাজের ধুলা-ময়লা শহরের বায়ুতে জমা হতে থাকে। বর্ষাকালে বৃষ্টির কারণে বায়ু কিছুটা বিশুদ্ধ হয়। তবে স্থায়ী সমাধান বা দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা অভাব এখনও প্রকট।
পরিবেশ অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক ড. সেলিম মাহমুদ বলেন, ‘‘ঢাকার বায়ুদূষণের মূল কারণ তিনটি— যানবাহনের কালো ধোঁয়া, নির্মাণকাজের অনিয়ন্ত্রিত ধুলিকণা এবং পাশের জেলা ও দেশের ইটভাটা। এগুলো নিয়ন্ত্রণ না করলে শহরবাসীর শ্বাস নেওয়ার স্বাধীনতা প্রতিদিন সংকুচিত হবে।’’
বিশ্বব্যাপী WHO-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতি ঘনমিটারে PM2.5-এর আদর্শ সীমা হলো ৫ মাইক্রোগ্রাম। অথচ ঢাকায় এই মাত্রা শীতকালে কখনও কখনও ১০০-এর বেশি হয়ে যায়, যা নিরাপদ সীমার ২০ গুণেরও বেশি।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী ও শ্বাসতন্ত্রজনিত রোগীদের বাইরে দীর্ঘ সময় না থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। একইসঙ্গে সাধারণ নাগরিকদের জন্য মাস্ক ব্যবহার, ঘরবন্দী থাকা এবং ধূলিকণা ও ধোঁয়া এড়িয়ে চলার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
এদিকে নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, বায়ুদূষণ প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও আইনের কঠোর বাস্তবায়ন জরুরি। নির্মাণস্থলে ধুলা নিয়ন্ত্রণ, যানবাহনে আধুনিক ইঞ্জিন প্রযুক্তি ও ইটভাটা নিয়ন্ত্রণবিধি কার্যকর করা ছাড়া বিকল্প নেই।


