যত্নশীলতা, সহানুভূতি, আত্মত্যাগ এমন সব আচরণ ‘মা-সূলভতা’ বলে বোঝানো হয়। ঐতিহাসিকভাবে নারীকে এই ভূমিকার সাথে প্রকৃতি ও জীববিজ্ঞানের মাধ্যমে যুক্ত করা হলেও সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো থেকে জানা যায় এ ধরনের আচরণ সবসময় বায়োলজিক্যাল নয়; বরং দীর্ঘদিনের সামাজিকীকরণ (socialization) ও সাংস্কৃতিক প্রত্যাশার ফল।
নারীর দেহে অন্তঃস্রাবিত হরমোন, বিশেষত অক্সিটোসিন (Oxytocin) এবং প্রোল্যাক্টিন (Prolactin), মা হওয়ার সময় এবং সন্তানের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অক্সিটোসিনকে ‘bonding hormone’ বলা হয়। প্রসবকালীন ও দুধপানকালীন এই হরমোন বৃদ্ধির ফলে মায়ের সাথে সন্তানের গভীর সংযোগ তৈরি হয়।
Feldman (2012) এর গবেষণায় দেখা যায়, শিশু জন্মের পর পিতামাতার উভয়ের মধ্যেই অক্সিটোসিন বৃদ্ধি পায় এটা কেবল নারীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একইভাবে Abraham et al. (2014) দেখান, পিতারাও সন্তানের সাথে নিয়মিত সংস্পর্শের মাধ্যমে ঠিক একই মাত্রার অক্সিটোসিন উৎপন্ন করতে সক্ষম।
অর্থাৎ বায়োলজিক্যাল উপাদান থাকলেও সেটি লিঙ্গনির্ভর নয়; বরং অভ্যাস ও আচরণ-নির্ভর।
Margaret Mead (1935) তাঁর নৃতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখিয়েছেন সব সমাজেই নারীর আচরণ একরকম নয়। নিউ গিনির তিনটি জাতিগোষ্ঠীতে তিনি দেখতে পান কোথাও নারীরা যত্নশীল, কোথাও কঠোর এবং কোথাও আবার পুরুষরা বেশি সংবেদনশীল।
এছাড়া Nancy Chodorow (1978) বলেন নারী ও পুরুষের মধ্যে যত্নবোধের পার্থক্য সামাজিকীকরণের ফল। ছোটবেলা থেকেই মেয়েদেরকে পুতুল খেলার মাধ্যমে ‘মাতৃত্ব’ শেখানো হয় এবং ছেলেদের শক্তি ও স্বাধীনতার মূল্যবোধ শেখানো হয়।
Carol Gilligan (1982)–এর মতে, নারী-পুরুষের নৈতিক চিন্তা ধরণা গঠনের পেছনেও লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক প্রত্যাশা কাজ করে। নারীদের কাছ থেকে সমাজ বেশি ‘care ethics’ বা পরিচর্যার নৈতিকতা প্রত্যাশা করে, যা তাদের আচরণে প্রতিফলিত হয়।
নিউরোসায়েন্স প্রমাণ করেছে Neuroplasticity-এর ফলে মানুষের মস্তিষ্ক অভ্যাস ও পরিবেশ অনুযায়ী নিজেকে রূপান্তরিত করে। Kim et al. (2010)–এর গবেষণায় বলা হয়েছে, পিতামাতার ভূমিকা পালনকারী পুরুষদের ব্রেইনে ঠিক তেমনি নিউরাল পরিবর্তন দেখা যায় যেটা মায়েদের ক্ষেত্রে হয়।
এর মানে যত্নশীলতা শুধুমাত্র নারীর বায়োলজিক্যাল গুণ নয়; বরং পরিবেশ ও ভূমিকার উপর নির্ভর করে পুরুষরাও অনুরূপ আচরণ রপ্ত করতে পারেন।
নারীর মধ্যে মা-সূলভ আচরণকে ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে দেখানোর পিছনে পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। Deborah Cameron (2007) বলেন—এ ধরনের লিঙ্গভিত্তিক আচরণিক প্রত্যাশা সমাজের পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোকে টিকিয়ে রাখে, কারণ এতে নারীরা বিনা প্রশ্নে যত্নশীল ভূমিকা পালন করে।
এছাড়া Judith Butler (1990)–এর ‘Gender Performativity’ তত্ত্ব বলছে—নারী-পুরুষের আচরণ আসলে বারবার পুনরাবৃত্তিমূলক ভূমিকা পালন (role performance)-এর ফল। ফলে ‘মা-সূলভ’ আচরণ নারীর স্বভাব নয়; সামাজিক অনুশীলনের ফলাফল।
Scandinavian Gender Equality Model (Sweden, Norway, Denmark)-এ দেখা গেছে—পিতাদের সন্তান পালনের সমান সুযোগ (paternity leave) ও ছেলে-মেয়ে উভয়কে সমান যত্নশীলতা শেখানো হয়। গবেষণায় উঠে এসেছে এতে পিতামাতার মধ্যে যত্নবোধের পার্থক্য কমে আসে এবং পুরুষরাও সমানভাবে ‘মা-সূলভ’ আচরণ করেন।
Haas & Rostgaard (2011) এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদে এটি নারী-পুরুষ উভয়ের আচরণে ভারসাম্য আনে।
উপরের আলোচনাগুলো থেকে স্পষ্ট হয়—নারীদের মধ্যে ‘মা-সূলভতা’র অস্তিত্ব বায়োলজিক্যাল ও সামাজিক দুই উপাদান থেকেই আসে। তবে সামাজিক নির্মাণ ও ভূমিকা শেখানোর ভূমিকা তুলনামূলকভাবে বেশি শক্তিশালী ও বিস্তৃত।
এই বিষয়টির পুনর্বিবেচনা জরুরি, কারণ এতে লিঙ্গভিত্তিক কাজের বিভাজন হ্রাস পাবে, পুরুষও সমানভাবে যত্নশীল ভূমিকা নিতে উৎসাহিত হবে এবং নারীদের উপর একচেটিয়া পরিচর্যার চাপ কমবে।
বস্তুত যত্নশীলতা কোনো লিঙ্গনির্ভর গুণ নয়; বরং মানবিক গুণ যেটি পরিবেশ ও অভ্যাস দ্বারা রপ্ত হয়।


