“উপদেষ্টা মাহফুজ আলম লিখেছেন, ‘৭১-এর প্রশ্ন মীমাংসা করতেই হবে।’ আমি একমত। তবে দ্বিমত করছি যখন তিনি লেখেন, ‘যুদ্ধাপরাধের সহযোগীদের ক্ষমা চাইতে হবে।’ ১৯৭১ সালে যুদ্ধাপরাধ যাদের বিরুদ্ধে করা হয়েছে, মাহফুজ না তাদের পরিবারের সদস্য, না ভুক্তভোগী। তাকে এই অধিকার কে দিয়েছে জামাতকে ক্ষমা করে দেওয়ার?
ঠিক যেমনভাবে আমি ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের হাতে হওয়া নাগরিক হত্যাকাণ্ডের সঠিক বিচার চাই, সেই একই যুক্তিতে ১৯৭১ সালের গণহত্যার দায়ে জামাতের বিচার চাই। ঠিক যে কারণে আওয়ামী লীগের সংগঠন হিসেবে বিচার হওয়া যায়, ঠিক একই কারণে জামাতেরও সংগঠন হিসেবে বিচার করতে হবে।
তবে মাহফুজ কেন শুধু আওয়ামী লীগের বিচার ও নিষিদ্ধতা চান, কিন্তু জামাতকে ক্ষমা চাইলেই রাজনীতির সুযোগ দিতে চান? বিচার কেন পার্টি ভেদে ভিন্ন হবে? বিচার ও আইন সবার জন্য সমান হতে হবে, তাই নয় কি? যদি বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক রাজনীতি পেতে হয়, তবে ১৯৭১-এর অপরাধের যেমন বিচার ও ক্ষমা জরুরি, তেমন ২০২৪-এর হত্যাকাণ্ডের বিচার ও ক্ষমা জরুরি।
… যে দল বা ব্যক্তি মানবতাবিরোধী অপরাধ করবে, ক্ষমতায় থাকতে অন্ধ হয়ে দেশের নাগরিকদের হত্যা করবে, তাদের একই আইনে বিচার করতে হবে, প্রতীকী অর্থে হলেও শাস্তি দিতে হবে। অতঃপর, যদি তারা অনুতপ্ত হয়, তবে ক্ষমার সুযোগ রাখতে হবে। তবে বিচার না করে শুধু ক্ষমা দিয়ে রাজনীতিতে পুনর্বাসন করা যাবে না, এমনকি তা যদি অপরাধের ৫০ বছর পরও হয়।
এবার আসুন দেখি ৭১-এর যুদ্ধাপরাধী কারা? মূল যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তান আর্মি। তাদের সহযোগী হিসেবে যুদ্ধাপরাধ করেছে জামায়াতে ইসলামি।
… জামাত ও তাদের ছাত্র সংগঠন (শিবিরের পূর্বের দল) সরাসরি পাকিস্তান আর্মিকে সাহায্য করে, সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে। ১৯৭১ সালে যুদ্ধকালীন পাকিস্তান সরকারের অনুগত গভর্নর আব্দুল মুত্তালিব মালিকের অধীনে পূর্ব পাকিস্তানে যে সরকার গঠিত হয়েছিল, সেই সরকারে জামায়াতে ইসলামি দলীয়ভাবে যোগ দিয়েছিল। চারটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিল তারা। অর্থাৎ জামাত গণহত্যাকারী সরকারের অংশ ছিল, শুধু বাইরে থেকে রাজনৈতিক সমর্থন দেয়নি। তখন গোলাম আযম পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের আমির ছিলেন।
গোলাম আযমের নাগরিকত্ব মামলায় (১৯৯৪) 46 DLR (AD) (1994) 192 অ্যাটর্নি জেনারেল আমিনুল হকের সাবমিশন: গোলাম আযম মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে লবিং করেছেন, যাতে তারা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেয়। তিনি হজের সময় বাংলাদেশবিরোধী প্রোপাগান্ডা করেছেন। ১৯৭২ সালে রিয়াদে ইসলামি যুব কনফারেন্সে গিয়ে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন করার দাবি করেছেন, লন্ডনে গিয়ে পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি তৈরি করেছেন। ১৯৭৩ সালে লিবিয়ার বেনগাজিতে মুসলিম পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেওয়ার অনুরোধ করেছেন। ১৯৭৩ এ সৌদির বাদশাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেওয়ার অনুরোধ করেছেন।
… আমি মাহফুজকে সাধুবাদ জানাই, তিনি অন্তত জামাতের প্রশ্ন তুলেছেন। এর জন্য তাকে যথেষ্ট সমালোচনা নিতে হবে, জামাত-শিবির তাকে আক্রমণও করবে। তবে আমার এই লেখার উদ্দেশ্য মাহফুজকে সমালোচনা করা নয়, বরং একটি নৈতিক প্রশ্ন করা।
… আমি আন্তরিকভাবে চাই আওয়ামী লীগ ও জামাতের বিচার হোক। অন্যথায়, আমাদের রাজনীতিতে যে সহিংসতার দুষ্টচক্র রয়েছে, তার থেকে আমরা বের হতে পারব না। বিচার সবার জন্য সমান। আগে বিচার, পরে ক্ষমা।”


