Home Blog Page 108

ইহুদি লোককাহিনীর অভিশপ্ত ‘ডিববাক’ বাক্সের রহস্য

একটি পুরনো কাঠের বাক্স, তার ভেতরে অদ্ভুত জিনিসপত্র, আর তাকে ঘিরে রচিত এক রহস্যময় ও ভয়ঙ্কর গল্প— এটি হলো ‘ডিববাক বক্স’ (The Dybbuk Box)। ২০০৩ সালে ই-বে (eBay) নিলামে বিক্রি হওয়া এই বাক্সটি শীঘ্রই ইন্টারনেটের মাধ্যমে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। এটি শুধু একটি ভৌতিক বস্তু নয় বরং ইহুদি লোককাহিনী, আধুনিক মিডিয়া এবং পপ কালচারের এক অদ্ভুত মিশেল। কিন্তু এই গল্পের পেছনের সত্য কী? এটি কি সত্যিই কোনো অলৌকিক শক্তিধর বস্তু, নাকি শুধুই একটি সৃষ্ট গল্প?

‘ডিববাক’ (Dybbuk) শব্দটি হিব্রু শব্দ ডিবুক থেকে এসেছে, যার অর্থ “আটকে থাকা আত্মা”। ইহুদি রহস্যবাদ বা কাব্বালাহ (Kabbalah) অনুসারে, ডিববাক হলো এমন একটি আত্মা, যা মৃত্যুর পর পৃথিবীতে আটকে থাকে। এর কারণ হতে পারে অপূর্ণ ইচ্ছা, পাপ বা কোনো অসম্পূর্ণ কাজ। এই আত্মা জীবিত মানুষের দেহে প্রবেশ করে এবং তাকে নানাভাবে কষ্ট দেয়।

ইহুদি লোককাহিনীতে ডিববাকের ধারণা ১৬-১৭ শতকের পূর্ব ইউরোপে বিশেষভাবে প্রচলিত ছিল। অনেক গল্পে বর্ণিত আছে যে, রাব্বিরা বিশেষ প্রার্থনা ও আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই আত্মাকে তাড়াতেন। তবে ঐতিহ্যগত ইহুদি বিশ্বাসে ‘ডিববাক বক্স’ নামে কোনো নির্দিষ্ট বস্তুর উল্লেখ নেই। এটি সম্পূর্ণ আধুনিক কাল্পনিক ধারণা।

২০০৩ সালে আমেরিকার ওরেগনের এক ব্যবসায়ী কেভিন ম্যানিস (Kevin Mannis) ই-বে-তে একটি পুরনো ওয়াইন ক্যাবিনেট বিক্রি করেন। তিনি দাবি করেন, এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পোল্যান্ড থেকে একজন ইহুদি নারী আমেরিকায় নিয়ে এসেছিলেন। সেই নারীর মৃত্যুর পর বাক্সটি তার হাতে আসে।

বাক্সটির ভেতরে পাওয়া যায়, ১৯২০ সালের দুটি পয়সা, একটি সোনালি চুলের ক্লিপ, শুকনো গোলাপ, একটি ছোট মোমবাতি, কাব্বালাহ-সম্পর্কিত একটি মুদ্রা, একটি ক্ষুদ্র কাগজের স্ক্রল, কিন্তু সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দাবি ছিল— এই বাক্সে একটি ডিববাক আটকে আছে!

ম্যানিসের মতে, বাক্সটি খোলার পর থেকেই তিনি ও তার আশেপাশের মানুষরা অদ্ভুত ঘটনার সম্মুখীন হয়েছেন। রাতে দুঃস্বপ্ন দেখা, অদ্ভুত গন্ধ অনুভব করা, দোকানে অদৃশ্য আওয়াজ শোনা, বাড়ির বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম নিজে থেকে চালু-বন্ধ হওয়া।

ভয়ে তিনি বাক্সটি বিক্রি করে দেন। এরপর এটি একাধিকবার হাতবদল হয় এবং প্রতিটি মালিকই একই রকম ভৌতিক অভিজ্ঞতার কথা বলেন। এই গল্প ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে এবং ডিববাক বক্স ‘বিশ্বের সবচেয়ে অভিশপ্ত বস্তু’ হিসেবে পরিচিতি পায়।

ডিববাক বক্সের গল্পটি শীঘ্রই হলিউডের নজরে আসে। ২০১২ সালে The Possession নামে একটি হরর মুভি মুক্তি পায়, যা এই বক্সের গল্প থেকে অনুপ্রাণিত। মুভিটি বক্স অফিসে সফল হয় এবং ডিববাক বক্সের কিংবদন্তিকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে।

২০১৮ সালে বিখ্যাত প্যারানরমাল ইনভেস্টিগেটর Travel Channel-এর জনপ্রিয় শো Ghost Adventures-এর মুখ্য ব্যক্তিত্ব জ্যাক ব্যাগান্স ডিববাক বক্সটিকে কেনেন। তিনি সেটিকে লাস ভেগাসে অবস্থিত তার নিজস্ব The Haunted Museum-এ স্থাপন করেন। তিনি দাবি করেন, এই বাক্সের সংস্পর্শে এলে অনেক দর্শক ও তদন্তকারীরা অস্বস্তি, দুশ্চিন্তা, শারীরিক দুর্বলতা, এমনকি অলৌকিক ঘটনা অনুভব করেছেন।

Ghost Adventures-এর বিশেষ পর্ব “The Dybbuk Box: True Story of Chris Chambers”–এ ডিববাক বক্স নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান চালানো হয়, যা এই ধারণাটিকে পপ-কালচারে আরও জনপ্রিয়তা দেয়।

Zak Bagans-এর কথায়, এলভিস প্রেসলির কন্যা Lisa Marie Presley-ও বক্সটি দেখতে এসেছিলেন এবং সেটির কাছাকাছি এসে অস্বস্তিকর ও আবেগঘন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। এ ছাড়াও অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি যেমন Post Malone (র‍্যাপার ও গায়ক) বক্সটির সংস্পর্শে আসার পর অস্বাভাবিক ঘটনা ও দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।

২০১৮ সালে Post Malone-এর সাথে একটি ঘটনার ভিডিও প্রকাশিত হয়, যেখানে দেখা যায়, Bagans ডিববাক বক্সের ঢাকনা ছাড়িয়ে দিলে Post Malone আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং পরবর্তী মাসগুলোতে তিনি একাধিক দুর্ঘটনা, বিমান বিভ্রাট ও ডাকাতির শিকার হন বলে জানান।

যদিও এগুলোর কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই এবং অনেকে এগুলোকে “manufactured folklore” বা “contemporary legend” বলে থাকেন, তবুও ডিববাক বক্স আধুনিক প্যারানরমাল কালচারে এক বিশেষ আইকন হয়ে উঠেছে।

২০২১ সালে কেভিন ম্যানিস একটি মজার তথ্য প্রকাশ করেন— ডিববাক বক্সের গল্পটি সম্পূর্ণ তার বানানো! তিনি স্বীকার করেন যে, এটি একটি সমসাময়িক লোককাহিনী (urban legend) তৈরি করার চেষ্টা ছিল, যেখানে ইহুদি রহস্যবাদ এবং আধুনিক ভৌতিক গল্প মিশে আছে।

ইহুদি কাব্বালাহ ও লোককাহিনীতে ডিববাকের ধারণা থাকলেও, ‘ডিববাক বক্স’ নামে কোনো বস্তুর উল্লেখ নেই। এটি সম্পূর্ণ আধুনিক কাল্পনিক গল্প। সমস্যা হলো পশ্চিমা মিডিয়া ও বিনোদন শিল্প প্রায়ই বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উপাদানকে বিকৃত করে ভৌতিক গল্পে পরিণত করে।

ডিববাক বক্সের গল্প আমাদের দেখায় কিভাবে একটি সাধারণ বস্তুকে ঘিরে পুরো একটি কিংবদন্তি তৈরি করা যায়। এটি লোককাহিনীর শক্তির প্রমাণ, যেখানে সত্য ও কল্পনা মিশে একটি নতুন গল্পের জন্ম দেয়।

‘স্মার্টওয়াচ’ ব্যান্ড থেকে শরীরে , প্রবেশ করছে বিষাক্ত রাসায়নিক

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় প্রকাশিত হয়েছে স্মার্টওয়াচ এবং ফিটনেস ট্র্যাকার ব্যান্ড থেকে মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে বিপজ্জনক রাসায়নিক, যেগুলো আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদে গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। গবেষণাটি Environmental Science & Technology Letters নামক বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষকরা জানিয়েছেন, এসব স্মার্টওয়াচ ব্যান্ড সাধারণত fluoroelastomers নামক সিনথেটিক রাবার দিয়ে তৈরি হয়। এই পদার্থের মধ্যে উচ্চমাত্রায় perfluorohexanoic acid (PFHxA) নামক রাসায়নিক পাওয়া গেছে, যা per- and polyfluoroalkyl substances (PFAS) নামে পরিচিত একটি বৃহৎ শিল্পজাত রাসায়নিক গোষ্ঠীর অংশ। PFAS-কে সাধারণত “চিরস্থায়ী রাসায়নিক” (Forever Chemicals) বলা হয়, কারণ এগুলো পরিবেশ এবং মানবদেহ উভয় ক্ষেত্রেই দীর্ঘস্থায়ীভাবে থেকে যায় এবং সহজে বিচ্ছিন্ন হয় না।

গবেষণায় বলা হয়েছে, PFAS-এর মতো রাসায়নিক দীর্ঘকাল ব্যবহৃত হয়ে আসছে বিভিন্ন ভোক্তা পণ্যে, যেমন নন-স্টিক রান্নার পাত্র, জলরোধী কাপড় এবং অগ্নিনির্বাপণ ফোম। তবে স্মার্টওয়াচ ব্যান্ডে এত বেশি পরিমাণে PFHxA থাকার তথ্য গবেষকদেরও বিস্মিত করেছে। ২২টি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের স্মার্টওয়াচ ব্যান্ড বিশ্লেষণ করে তারা দেখেছেন, সবচেয়ে বেশি মাত্রায় শনাক্ত হওয়া যৌগটি ছিল এই perfluorohexanoic acid।

PFAS-এর স্বাস্থ্যের ঝুঁকিগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্যানসার, উচ্চ রক্তচাপ, বন্ধ্যাত্ব, হরমোনজনিত সমস্যা এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস। বিশেষ করে এই রাসায়নিকটি ত্বকের মাধ্যমে শোষিত হতে পারে—যা আরও উদ্বেগজনক। যখন কেউ শারীরিক ব্যায়াম করেন, তখন ঘাম এবং রক্তপ্রবাহ বৃদ্ধি পায়, ফলে ত্বকের ছিদ্র উন্মুক্ত হয়ে রাসায়নিক শোষণের হার বাড়িয়ে দেয়। অতএব যারা নিয়মিত স্মার্টওয়াচ বা ফিটনেস ট্র্যাকার পরে ব্যায়াম করেন, তাদের জন্য ঝুঁকির মাত্রা আরও বেড়ে যেতে পারে।

গবেষকরা পরামর্শ দিয়েছেন, গ্রাহকরা চাইলে এই ঝুঁকি এড়াতে fluoroelastomer-এ তৈরি ব্যান্ড পরিহার করতে পারেন। পরিবর্তে সিলিকন, কাপড় বা চামড়ার মতো অন্যান্য বিকল্প উপাদানের ব্যান্ড বেছে নেওয়া যেতে পারে যেগুলো PFAS-মুক্ত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্মার্ট গ্যাজেট ব্যবহারকারীদের ব্যবহৃত উপাদান সম্পর্কে সচেতন থাকা উচিত, কারণ দৈনন্দিন ব্যবহারের পণ্যের মাধ্যমে দেহে রাসায়নিক প্রবেশের বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদে বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে।

এই গবেষণা স্মার্টওয়াচ শিল্পের জন্য একটি সতর্কবার্তা, যেখানে প্রযুক্তিগত সুবিধার পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকেও মনোযোগ দেওয়া জরুরি। বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা ও নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে কড়া নজরদারি প্রয়োজন, যাতে এই ধরনের রাসায়নিক ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা যায় এবং নিরাপদ বিকল্প উপকরণ ব্যবহারের পথ তৈরি হয়।

সুযোগ-সুবিধা নিয়ে সমালোচনার মুখে : ইউনূস

0

প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ক্ষমতায় থাকাকালীন বিশেষ সুবিধা নেয়ায় নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস সম্প্রতি সমালোচনার মুখে পড়েছেন। ২০২৪ সালের ৮ই অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হন। এরপর তার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ গ্রুপের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দ্রুত সরকারি অনুমোদন ও বিশেষ সুবিধা পায়। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকা শহরে গ্রামীণ ইউনিভার্সিটির অনুমোদন, গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেসের জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স, গ্রামীণ টেলিকমের ডিজিটাল ওয়ালেট চালুর অনুমতি।

সেই সাথে আছে, গ্রামীণ ব্যাংকের কর মওকুফ ও সরকারিভাবে ব্যাংকে শেয়ারের পরিমাণ ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা। ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে থাকা শ্রম আইন লঙ্ঘন ও অর্থপাচারের মামলা দ্রুত খারিজ হয়ে যাওয়ায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশিষ্টজনেরা বলছেন, এভাবে নিজ প্রতিষ্ঠানের সুবিধা পাওয়া এবং মামলা খারিজ হওয়া স্বার্থের সংঘর্ষ তৈরি করে এবং জন আস্থা হারানোর ঝুঁকি বাড়ায়। ইউনূসপন্থিরা দাবি করছেন, এসব সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে আগে আটকে ছিল, এখন নিয়ম মেনেই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে বিভিন্ন মহল মনে করছে, প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং স্বার্থের দ্বন্দ্বের বিষয়টি খোলাসা না হওয়ায় বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদন – ভারতকে ‘নিরাপদ বিনিয়োগ গন্তব্য’ , ভাবার পথে বাধা হবে পাকিস্তান-সংঘাত

মঙ্গলবার (৬ মে) ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যুক্তরাজ্যের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক বাণিজ্যচুক্তি ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নয়টি তথাকথিত ‘সন্ত্রাসী অবকাঠামো’ লক্ষ্য করে পাকিস্তান ও পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে হামলার দাবি করে দিল্লি। একদিকে ভারতের বৈশ্বিক বাণিজ্য কেন্দ্র হয়ে ওঠার কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার এই চিত্র এক অস্বস্তিকর দ্বৈততা তৈরি করেছে।

বিশ্ব সরবরাহ ব্যবস্থায় চীনের অংশ কমিয়ে এনে ভারতকে বিকল্প হিসেবে দাঁড় করানোর যে পরিকল্পনা, সেটিকে এ ধরনের উত্তেজনা বাধাগ্রস্ত করতে পারে। সম্প্রতি অ্যাপল ২০২৬ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির জন্য অধিকাংশ আইফোন ভারতে তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে কার্যকর বিশ্বনিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করতে পারছে না এবং সেখানে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা থাকায় ভারত-পাকিস্তান সংঘাত আরও সহজে বেড়ে যেতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ভারতই। যদিও দেশটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করতে কিছু অগ্রগতি করেছে, তবুও এটি এখনো অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত, জটিল ও অকার্যকর বাজার হিসেবে রয়ে গেছে, যেখানে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ জিডিপির তুলনায় হ্রাস পাচ্ছে।

চলতি বছর ভারতের পুঁজিবাজার থেকে বৈশ্বিক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ প্রত্যাহারও তা প্রমাণ করে। এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের সঙ্গে উত্তেজনা, ভারতের সম্ভাব্য ‘নিরাপদ বিনিয়োগ গন্তব্য’ ভাবনার পথে আরেকটি বাধা তৈরি করলো।

বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র শিশুদের ‘হত্যা’ করছেন মাস্ক : গেটস

এক ঘোষণায় বিল গেটস জানিয়েছেন, ২০৪৫ সালের মধ্যে তার দাতব্য ফাউন্ডেশন থেকে ২০০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হবে। একইসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র শিশুদের হত্যা করছেন ইলন মাস্ক’, কারণ তার নেতৃত্বে মার্কিন বিদেশি সহায়তা বাজেটে বড় কাটছাঁট হয়েছে। ৬৯ বছর বয়সি মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বৃহস্পতিবার (৮ মে) জানান, তিনি তার সম্পদের প্রায় পুরোটাই দ্রুত দান করতে চান এবং গেটস ফাউন্ডেশন ২০৪৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যেই বন্ধ করে দেওয়া হবে—যা পূর্বঘোষিত সময়ের চেয়ে অনেক আগে। গেটস আশা করছেন, এই অর্থ দিয়ে পোলিও ও ম্যালেরিয়া নির্মূল, মা ও শিশুমৃত্যু হ্রাস এবং দারিদ্র্য কমানোর মতো উদ্যোগে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব হবে।

ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গেটস বলেন, ‘বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি যখন সবচেয়ে দরিদ্র শিশুদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেন, সেটি খুবই দুঃখজনক।’ এই মন্তব্যের পেছনে রয়েছে বিদেশি সহায়তা বাজেট কমানোর সিদ্ধান্ত, যা শুরু হয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসনে। এখন তা এগিয়ে নিচ্ছে মাস্কের নেতৃত্বাধীন ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি (ডিওজিই)।

২০২৩ সালে ইউএসএআইডি বিশ্বজুড়ে ৪৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করলেও, বাজেট কমানোর কারণে সংস্থার ৮০ শতাংশ কর্মসূচি বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে। রয়টার্সকে গেটস বলেন, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী চার থেকে ছয় বছরে বিশ্বজুড়ে মৃত্যু হার আবার বেড়ে যেতে পারে। ‘মৃত্যুর সংখ্যা এবার প্রথমবারের মতো বাড়বে… লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যাবে শুধু সম্পদের অভাবে,’ বলেন তিনি।

গেটস ফাউন্ডেশনের বাজেট ২০২৬ সালের মধ্যে ৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে এবং এরপর প্রতি বছর ১০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হবে। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, দাতব্য সংস্থাগুলো কখনো সরকারের ঘাটতি পূরণ করতে পারবে না। বিল গেটস বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, সরকারগুলো আবার শিশুদের বাঁচানোর বিষয়টি গুরুত্ব দেবে।’

এক সময় গেটস ও মাস্ক মানবকল্যাণে অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে একমত হলেও, সাম্প্রতিক সময়ে তাদের সম্পর্কে টানাপড়েন দেখা গিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক ভিডিও পোস্টে মাস্ক গেটসকে ‘বড় মাপের মিথ্যাবাদী’ বলেন। তবে এ বিষয়ে মাস্কের মুখপাত্রদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নিজের ওয়েবসাইটে গেটস লেখেন, ‘মানুষের উপকারে লাগানো যায় — এমন সম্পদ আমি নিজের কাছে রেখে দিতে পারি না, যখন এত জরুরি সমস্যা সমাধানের অপেক্ষায় রয়েছে।’ তবে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘বিশ্বের ধনী দেশগুলো আদৌ দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়াবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।’

বিজ্ঞান ও কল্পনাশক্তির অন্তরঙ্গতা

মানবজ্ঞান ও মানবপ্রকৃতির গভীরে দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের গভীর দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। একদিকে কঠোর যুক্তি ও পরীক্ষণভিত্তিক বিজ্ঞান, অন্যদিকে শিল্প, সাহিত্য ও ধর্মের আবেগনির্ভর মানবিকতা। শিক্ষা, সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতিটি স্তরে এই বিভাজন দৃঢ়ভাবে প্রোথিত। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় ‘STEM’ (Science, Technology, Engineering, Mathematics)-ভিত্তিক বিষয়গুলোতে যুক্তিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, আর মানবিক শাখাগুলোতে অনুভব, মূল্যবোধ ও নৈতিকতার চর্চা। ফলে দীর্ঘকাল ধরে এমন ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে যে, বিজ্ঞান ও মানবিকতা দুইটি স্বতন্ত্র ও প্রায় বিপরীত জগৎ।

কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে তথ্যের বিস্ফোরণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আন্তঃশাখাগত গবেষণার প্রসারে আমরা বাধ্য হচ্ছি এই সীমারেখা পুনর্বিবেচনা করতে। কল্পনাশক্তি এতদিন নিছক শিল্প-সাহিত্য ও সৃজনশীলতার বিষয় বলে বিবেচিত হত—এখন জানা যাচ্ছে, তা কেবল শিল্প নয়; বরং বিজ্ঞানেরও মূল চালিকাশক্তি।

যুক্তি বনাম অনুভব –

পশ্চিমা জ্ঞানের ইতিহাসে রেনে দেকার্ত (René Descartes) থেকে শুরু করে অগাস্ট কম্ত (Auguste Comte)-এর পজিটিভিজম পর্যন্ত মানবিকতা ও বিজ্ঞানের বিচ্ছেদ সুপ্রতিষ্ঠিত। দেকার্তের “Cogito, ergo sum”—“আমি চিন্তা করি, অতএব আমি আছি”—মন্তব্যটি মানসিক ক্রিয়াকে যুক্তি ও আত্মপর্যবেক্ষণে আবদ্ধ করে দেয়। ফলে মন ও দেহকে দুই পৃথক সত্তা হিসেবে দেখা শুরু হয়। পরবর্তীতে শিল্প-সাহিত্য ও ধর্মকেও যুক্তির পরীক্ষণের বাইরে রাখার চেষ্টা চলে। বিংশ শতাব্দীতে Logical Positivism ও Analytic Philosophy এই বিচ্ছেদকে আরও গভীর করে। ফলে শিক্ষাব্যবস্থায় বিজ্ঞান ও মানবিকতা আলাদা বিভাগে পরিণত হয়।

অথচ ইতিহাসের অনেক দার্শনিক, বিশেষত ডেভিড হিউম, নিৎসে ও সিগমুন্ড ফ্রয়েড দেখিয়েছেন—আমাদের চিন্তা-চেতনা আবেগ, ইচ্ছা ও কল্পনার গভীর ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে। বাংলার বাঙালি দার্শনিকদের মধ্যেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘সহজপাঠ’-এ বলেছিলেন—“চোখের পানে চাই না কেন?” অর্থাৎ, বাস্তব পর্যবেক্ষণ ও কল্পনা একসাথে না চললে সত্য উপলব্ধি অসম্পূর্ণ। সুতরাং বিজ্ঞান-মানবিকতার বিচ্ছেদ নিছক একাডেমিক বিভাজন, বাস্তবজগতে তা এত কঠোর নয়।

কল্পনাশক্তি অর্থ নিছক কল্পনা বা স্বপ্ন নয়, বরং এটি আমাদের মস্তিষ্কের এমন এক প্রক্রিয়া, যেখানে যুক্তি, অনুভূতি, অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশা মিশে এক নতুন বাস্তবতার রূপ দেয়। নিউরোসায়েন্সের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে—আমাদের হিপোক্যাম্পাস (Hippocampus), যেটি স্মৃতি সংরক্ষণের সাথে যুক্ত সেটিই ভবিষ্যৎ কল্পনা (prospective imagination)-এর ক্ষেত্রেও সক্রিয় হয়। অর্থাৎ স্মৃতি ও কল্পনা একই নিউরাল ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে আছে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক Raymond Tallis ‘neuromania’ ধারণার সমালোচনা করে দেখান—মানুষের গল্পকথন, চিত্রকল্প ও শিল্পানুভব আসলে আমাদের নিউরাল প্লাস্টিসিটি ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক অভ্যাসের সমন্বিত ফল। এখানে কল্পনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কাজী নজরুল ইসলাম ও জীবনানন্দ দাশের কবিতায় দেখা যায় প্রকৃতিকে ব্যাখ্যা করতে বিজ্ঞানসম্মত ভাষা ও কল্পনাপ্রসূত চিত্রকল্প একসাথে ব্যবহার হয়েছে। এটি আমাদের সংস্কৃতিতে বিজ্ঞান-মানবিকতার ঐক্যের প্রাচীন উদাহরণ।

শিশুদের চিত্রাঙ্কন পর্যবেক্ষণ করে মনোবিজ্ঞানীরা (Kellogg, 1969) দেখিয়েছেন শুরুতে শিশুরা আকৃতি আঁকে, তারপর ক্রমান্বয়ে গল্প ও চরিত্র নির্মাণে আগ্রহী হয়। কল্পনা এখানে তাদের মস্তিষ্কের সংকেত-প্রক্রিয়াকরণ সহজতর করে। কিন্তু বর্তমান পরীক্ষানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থায় ভাষাকেন্দ্রিকতা ও তথ্যভিত্তিকতা বেশি গুরুত্ব পেলে শিশুরা এই চিত্রভাষা ও কল্পনাশক্তি হারিয়ে ফেলে। ফলে কিশোর বয়সের পর তাদের নতুন ধারনা তৈরির ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে।

সুইডেনের বিজ্ঞানমনস্ক লেখক Tor Nørretranders বলেন—‘The user illusion’ অর্থাৎ আমরা যা বুঝি, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি তথ্য আমাদের মস্তিষ্কের অচেতন স্তরে প্রক্রিয়া হয়। কল্পনাশক্তি এই অচেতন স্তরের সাথে যুক্তি ও ভাষার সংযোগ ঘটায়। ফলে শিক্ষা ও গবেষণায় কল্পনার গুরুত্ব অপরিহার্য।

আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন, “Imagination is more important than knowledge. For knowledge is limited, whereas imagination embraces the entire world.” আসলে বিজ্ঞানের বড় বড় আবিষ্কারগুলো কেবল যুক্তি দিয়ে হয়নি; বরং কল্পনাপ্রসূত মানসিক চিত্র ও গল্প—মডেল ও ভাবনার আকার নিয়েছে।

ডিএনএ-এর গঠন আবিষ্কারে ওয়াটসন ও ক্রিক যে দ্বি-সর্পিল মডেল ব্যবহার করেছিলেন, তা ছিল নিছক তথ্য নয়, বরং কল্পনার ফসল। নিউটনের আপেলের গল্প, ফারাডের বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের রেখাচিত্র, ডারউইনের বিবর্তনমূলক ‘ট্রি অফ লাইফ’ সবই কল্পনার দৃষ্টান্ত। এমনকি তথ্যপ্রযুক্তির দুনিয়ায় কম্পিউটার প্রোগ্রামিং ও ডিজাইন থিঙ্কিং-এও কল্পনা অপরিহার্য।

কল্পনাশক্তি আর নিছক শিল্প-সাহিত্যের বিষয় নয়। এটি মানবজ্ঞান, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির কেন্দ্রে অবস্থিত। বিজ্ঞান ও মানবিকতার মধ্যে কল্পনা এমন এক সেতু, যা আমাদের মন, দেহ ও সমাজের মধ্যে অর্থপূর্ণ সংযোগ ঘটায়। তাই নতুন শতাব্দীর শিক্ষা ও গবেষণায় কল্পনাশক্তি অধ্যয়ন অপরিহার্য—যেখানে যুক্তি ও অনুভব, তথ্য ও গল্প, পরীক্ষা ও শিল্প একত্রিত হয়ে মানবসম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। বাংলার সাহিত্যিক ঐতিহ্য ও বৈজ্ঞানিক কল্পনার মেলবন্ধনে এদেশও নেতৃত্ব দিতে পারে এই নতুন জ্ঞানচর্চায়।

ক্লাসিক ও এলিট দ্বন্দে শিক্ষাব্যবস্থতার টানাপোড়েন

১৯শ শতাব্দীর ইংরেজ লেখক থমাস হার্ডির Jude the Obscure (১৮৯৫) উপন্যাসে একটি করুণ দৃশ্য রয়েছে। দরিদ্র পাথর কাটার শ্রমিক জুড ফওলি গ্রামের ধানের গুদামে মই বেয়ে ওঠে এবং দূর থেকে ক্রাইস্টমিনস্টার শহরের স্বর্ণাভ চূড়া, গম্বুজ আর মিনারগুলোর দিকে তাকায়। সেই স্থাপত্যের সৌন্দর্য, যেটা টোপাজ পাথরের মতো ঝলমল করে, তার দৃষ্টিতে একাধারে মোহ ও বেদনার প্রতীক হয়ে ওঠে। এই টোপাজের মতো শক্ত সমাজব্যবস্থার দেয়ালে ধাক্কা খেতে খেতে জুডের দেহ ও মন ভেঙে পড়ে। কারণ শিক্ষার দ্বারপথ এবং উচ্চতর সংস্কৃতির জগৎ তার মতো নিম্নবর্গীয়দের জন্য অলঙ্ঘনীয় প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়। এই প্রতীক শুধু জুডের নয়, ব্রিটিশ সাহিত্যে ক্লাসিক্স তথা গ্রিক ও রোমান সংস্কৃতির প্রতি নিম্নবর্গীয়দের প্রবেশাধিকারের বঞ্চনার বহুল চর্চিত প্রতিচ্ছবি।

‘ক্লাসিক্স’ শব্দটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে শ্রেণিগত বিভাজনের ভাষা। ল্যাটিন শব্দ ‘classis’ থেকে উদ্ভূত ‘class’ শব্দটি মূলত প্রাচীন রোমান কর-শ্রেণি নির্দেশ করত। ব্রিটিশ উচ্চবিত্তদের অভিধানে সাধারণ মানুষ ‘hoi polloi’ (গ্রীক: ‘the many’ অর্থাৎ গণতান্ত্রিক সংখ্যাগরিষ্ঠ), ‘plebeians’ বা সরলভাবে ‘plebs’ নামে অভিহিত হত। অথচ এই ক্লাসিক্যাল সামগ্রী, ভাষা ও ইতিহাস সম্পর্কে জানার আকাঙ্ক্ষা শুধুমাত্র অভিজাত শ্রেণির সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৭শ শতক থেকে ১৯শ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত অসংখ্য শ্রমজীবী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী নানা উপায়ে গ্রিক-রোমান জ্ঞানভাণ্ডারে প্রবেশের চেষ্টা করেছেন।

ক্লাসিক্সের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা দীর্ঘদিন ধরে কেবলই বিত্তশালীদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। গ্লোরিয়াস রেভোলিউশনের (১৬৮৮) পর যখন টোরি অভিজাত ও হুইগ বুর্জোয়া শ্রেণির মধ্যে নতুন ক্ষমতাসম্পন্ন মিত্রতা গড়ে ওঠে, তখন এই নতুন শাসক শ্রেণিকে ‘জেন্টলম্যানলি’ সংস্কৃতিতে দীক্ষিত করার মাধ্যম হয়ে ওঠে ক্লাসিক্যাল কারিকুলাম। অক্সফোর্ড-কেমব্রিজ প্রবেশের টিকিট হিসেবে গ্রিক ও ল্যাটিন ভাষাজ্ঞান অপরিহার্য ছিল, যা পেতেন প্রধানত ধনী পরিবারের ছেলেরা। তদুপরি ১৮শ শতকে বিস্তারলাভকারী ‘প্রাইভেট স্কুল’গুলোর অধিকাংশই অ্যাংলিকান পুরোহিত দ্বারা পরিচালিত হত এবং সেখানে মূলত ক্লাসিক্যাল পাঠ দেওয়া হত।

কিন্তু এই প্রবেশদ্বারের বাইরে শ্রমিকশ্রেণির মধ্যে গড়ে ওঠে বিকল্প পাঠচর্চা সংস্কৃতি। চার্টিস্ট আন্দোলনের নায়ক এক দর্জি শ্রমিক আলটন লক (১৮৫০) স্বশিক্ষিত হয়ে নিজ অবস্থানের উন্নতি করেন। আবার র‌্যাডিক্যাল সাংবাদিক, শ্রমিক নেতারা এবং লেবার পার্টির প্রতিষ্ঠাতারা প্রাচীন ইতিহাসকে নিজেদের দৃষ্টিকোণ থেকে পুনরায় লিখে ফেলেন। প্লুটার্ক, লিভি, হেরোডোটাস, থুসিডিডিসের রচনাসমূহ তাঁদের পাঠ্যতালিকায় শোভা পেত। প্রাচীন গ্রিস-রোমের দাস বিদ্রোহী স্পার্টাকাস, ভূমিসংস্কারকারী গ্রাখি ভাইয়েরা কিংবা ঋণ-মুক্তিদাতা সোলন—এরা শ্রমিকশ্রেণির কাছে নায়ক হয়ে ওঠেন।

এই বিকল্প শিক্ষার বৃত্ত গড়ে ওঠে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে—ডিসেন্টিং একাডেমি, ননকনফর্মিস্ট সানডে স্কুল, মেথডিস্ট ধর্মপ্রচারক প্রশিক্ষণ, মিউচুয়াল ইমপ্রুভমেন্ট সোসাইটি, মেকানিক্স ইনস্টিটিউট, ট্রেড ইউনিয়ন, ইউনিভার্সিটি এক্সটেনশন স্কিম ও ওয়ার্কার্স এডুকেশনাল অ্যাসোসিয়েশন। এসব প্রতিষ্ঠান ক্লাসিক্যাল ইতিহাস, রেটরিক্স ও সাহিত্য পাঠের সুযোগ করে দেয়। ১৮৭০ ও ১৮৮০ সালের প্রাথমিক শিক্ষা আইন আসার অনেক আগে থেকেই এই স্বশিক্ষা আন্দোলন সক্রিয় ছিল।

শুধু পাঠ্যপুস্তক নয় ব্রিটিশ জাদুঘর ও অন্যান্য মিউজিয়ামও নিম্নবর্গীয়দের গ্রিক-রোমান শিল্পকলা ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের অভিজ্ঞতা দিত। ১৭৮২ সালে এক প্রুশিয়ান পর্যটক বিস্মিত হয়ে লেখেন যে ব্রিটিশ জাদুঘরে ‘সর্বনিম্ন শ্রেণির’ নারী-পুরুষ সমানভাবে প্রবেশাধিকার পেতেন। মিউনিসিপ্যাল মিউজিয়ামে থাকা পার্থেনন-ফ্রিজ বা ভেনাস দ্য মিলো-র প্লাস্টার রেপ্লিকা, ক্যাসেলের Popular Educator, Society for the Diffusion of Useful Knowledge–এর সুলভ গ্রন্থাবলী শ্রমজীবীদের কাছে সহজলভ্য হয়ে ওঠে।

যদিও উচ্চবিত্তরা গ্রিক-ল্যাটিন মূল ভাষায় পাঠকে শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড মনে করত, তবুও অনুবাদ-ভিত্তিক পাঠ হয়ে ওঠে শ্রমিকশ্রেণির প্রধান প্রবেশপথ। জন ড্রাইডেন ও আলেকজান্ডার পোপের অনুবাদিত হোমার জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। স্কটিশ স্থপতি হিউ মিলার শৈশবে পোপের হোমার পাঠ থেকেই সাহিত্যের প্রতি আকৃষ্ট হন। এসব অনুবাদ খুব দ্রুত সেকেন্ডহ্যান্ড বইয়ের বাজারে পৌঁছে যেত, যেখান থেকে শ্রমিকরা সংগ্রহ করতেন।

পাবলিক লাইব্রেরি ও ওয়ার্কার্স রিডিং রুম-এ একটি পত্রিকা ২৫ জন পাঠকের হাতে পৌঁছাত বলে ১৮২৯ সালে অনুমান করা হয়। কখনও কখনও একজন পঠনক্ষম শ্রমিক বাকিদের জন্য পাঠ করতেন—যেমন ১৯শ শতকের পিবলস শহরের তাম ফ্লেক, যিনি রজার লি’স্ট্রেঞ্জের The Wars of the Jews পড়ে শুনিয়ে শহরবাসীকে রোম-ইহুদি যুদ্ধের কাহিনি শোনাতেন।

১৮৯৯ সালে উত্তর ইংল্যান্ডের অ্যাশিংটন খনিশ্রমিকের পকেটে থুসিডিডিসের অনুবাদ পাওয়া যায়, পৃষ্ঠাটি ছিল পেরিক্লিসের শোকভাষণের অংশে। এমনকি ১৯০৬ সালে সমাজতান্ত্রিক শিক্ষাবিদ ফ্রেডেরিক গোল্ডের The Children’s Plutarch ও Pages for Young Socialists–এও প্রাচীন উৎস থেকে শ্রমিকশ্রেণির নৈতিক শিক্ষা প্রদান করা হয়। তিনি প্লুটার্ক, হেরোডোটাস, জেনোফন, পেট্রোনিয়াসের চরিত্র ও গল্পকে খ্রিস্টীয় নৈতিকতার বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করেন।

বিশ শতকের সূচনালগ্নে স্যার জন লাবকের প্রস্তাবিত শ্রমিকদের ‘শত বইয়ের তালিকা’-তেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ক্লাসিক্যাল গ্রন্থ অন্তর্ভুক্ত ছিল।ক্লাসিক্স শুধু এলিট সংস্কৃতির বাহক নয়; বরং ব্রিটিশ শ্রমিকশ্রেণির স্বশিক্ষা, আত্মমর্যাদা ও রাজনৈতিক চেতনার নির্মাতা এক গোপন সেতুবন্ধ। গ্রিক-রোমান ইতিহাস ও সাহিত্য পড়া তাদের কাছে নিছক কৌতূহল নয়, বরং শ্রেণিবৈষম্য ভাঙার অস্ত্র।

ইলেকট্রা প্রযুক্তি – ইস্পাত শিল্পে শূন্য-কার্বন বিপ্লব

বিশ্বজুড়ে শিল্প কারখানা ও নির্মাণ খাতে ইস্পাত অন্যতম প্রধান উপাদান। তবে এই অপরিহার্য ধাতুটি তৈরির পেছনে রয়েছে পরিবেশের জন্য এক অদৃশ্য সংকট। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA)-এর তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂) নিঃসরণের প্রায় ৮% থেকে ৯% কেবলমাত্র ইস্পাত উৎপাদন খাত থেকে আসে। আশ্চর্যের বিষয় এই খাতের কার্বন ফ্লুটপ্রিন্ট ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট বার্ষিক নিঃসরণের থেকেও বেশি।

এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো রাজ্যের বোল্ডার-ভিত্তিক স্টার্টআপ Electra (ইলেকট্রা) এমন একটি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে, যা ইস্পাত উৎপাদন খাতে শূন্য-কার্বন বিপ্লবের সম্ভাবনা জাগিয়েছে।

বর্তমানে ইস্পাত উৎপাদনের জন্য দুইটি পদ্ধতি বেশি প্রচলিত, ব্লাস্ট ফার্নেস (Blast Furnace) — যেখানে কয়লা (কোক) দিয়ে উচ্চতাপমাত্রায় লোহা আকরিক গলানো হয় (প্রায় ১৫০০°C)। ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস (Electric Arc Furnace) — যেখানে পুনর্ব্যবহৃত লোহা বা স্ক্র্যাপ গলানো হয়, যদিও এখানে কয়লার ওপর নির্ভরতা কিছুটা কম। উভয় পদ্ধতিতেই বড় মাত্রায় কার্বন নিঃসরণ ঘটে, কারণ তাপশক্তি উৎপাদন ও রাসায়নিক বিক্রিয়ায় CO₂ নির্গত হয়।

ইলেকট্রার প্রযুক্তি মূলত ইলেকট্রোকেমিক্যাল রিডাকশন (Electrochemical Reduction) পদ্ধতিনির্ভর। এখানে নিম্ন-গ্রেড লোহা আকরিক (Fe₂O₃) একটি বিশেষ ইলেকট্রোলাইট সলিউশনে রাখা হয় এবং মাত্র ১৪০°F (প্রায় ৬০°C) এ বৈদ্যুতিক প্রবাহের মাধ্যমে বিশুদ্ধ লোহা উৎপাদিত হয়।

প্রক্রিয়াটি তিনটি মূল দিক থেকে বৈপ্লবিক: উচ্চতাপের প্রয়োজন নেই, ফলে কয়লার দরকার হয় না। নিম্ন-গ্রেড আকরিকও ব্যবহৃত হয়, যা খরচ কমায়। সম্পূর্ণভাবে বিদ্যুৎচালিত যদি পুনর্নবীকরণযোগ্য বিদ্যুৎ (সৌর বা বায়ু) ব্যবহার হয়, নিঃসরণ প্রায় শূন্য।

ইলেকট্রার সহ-প্রতিষ্ঠাতা সানদীপ নিজহাওয়ান বলেন, “আমরা ইস্পাত উৎপাদনের ধারাটাই পাল্টে দিচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে গ্রিন ইলেকট্রিসিটি ব্যবহার করে কার্বন-নেগেটিভ ইস্পাত উৎপাদন।”

ইলেকট্রা সম্প্রতি কলোরাডোতে তাদের ডেমো প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য ৮ মিলিয়ন ডলার ট্যাক্স ক্রেডিট পেয়েছে। নিউকোর (যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম ইস্পাত নির্মাতা), খনি জায়ান্ট বিএইচপি এবং অ্যামাজন ইতিমধ্যেই এই প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করছে। কলোরাডো এনার্জি অফিসের নির্বাহী পরিচালক উইল টুর বলেন, “এই প্রযুক্তি আমাদের শিল্প খাতে কার্বন নিঃসরণ কমাতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।”

কেন কার্বন নিঃসরণ কমানো জরুরি?

ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (IEA)-এর মতে, প্যারিস চুক্তির ২০৫০ সালের লক্ষ্য পূরণ করতে হলে ইস্পাত শিল্পের বার্ষিক নিঃসরণ ৭৫% কমাতে হবে। ইলেকট্রার মতো প্রযুক্তি এ লক্ষ্যে কার্যকর হাতিয়ার। বাংলাদেশের ইস্পাত খাত দ্রুত বিকাশমান। দেশে বছরে প্রায় ৮-৯ মিলিয়ন মেট্রিক টন ইস্পাত উৎপাদিত হয়, যার ৪০% আসে পুনর্ব্যবহৃত স্ক্র্যাপ থেকে এবং ৬০% আমদানিকৃত লোহা আকরিক থেকে।

চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও সীতাকুণ্ডে অবস্থিত বড় ইস্পাত কারখানাগুলো এখনো উচ্চতাপমাত্রার ব্লাস্ট ফার্নেস পদ্ধতি ও গ্যাসচালিত প্রযুক্তি ব্যবহার করে। যদি ইলেকট্রার প্রযুক্তি বাংলাদেশে আমদানি হয় এবং পুনর্নবীকরণযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, তাহলে দেশের শিল্প খাতে কার্বন নিঃসরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। এ ছাড়া, নিম্ন-গ্রেড আকরিক ব্যবহারের সুবিধা থাকায় খরচও কমবে, যা স্থানীয় উৎপাদনকে প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।

ইলেকট্রার উদ্ভাবনী প্রযুক্তি বৈশ্বিক ইস্পাত শিল্পে এক বিপ্লবের সূচনা করেছে। এটি পরিবেশগত, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত—তিন দিক থেকেই সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর সামনে সুযোগ রয়েছে এই প্রযুক্তিকে দ্রুত গ্রহণ করে টেকসই শিল্পায়নের পথে এগিয়ে যাওয়ার। শুধু কার্বন নিঃসরণ কমানো নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী গড়তে এমন প্রযুক্তিই হতে পারে সময়ের শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ।

জুলাই হত্যাকান্ডে দল হিসেবে , আওয়ামী লীগের দায় ও বিচার প্রসঙ্গ : কল্লোল মোস্তফা , লেখক, প্রকৌশলী

0

“জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সবচেয়ে বেশি হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে সম্ভবত ৪ আগস্ট ২০২৪ তারিখ। ঐ দিন সরকার পতনের এক দফা দাবীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অসহযোগ কর্মসূচি চলছিল। ঐ কর্মসূচিকে ঘিরে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে রাজধানী ঢাকাসহ ২০টি জেলা-মহানগরে ৯৮ জন নিহত হন।

প্রথম আলোর সংবাদ থেকে দেখা যাচ্ছে, বেশির ভাগ জায়গায় বিক্ষোভকারীদের উপর হামলা চালান মূলত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও দলটির সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। লাঠিসোঁটা ও দেশি অস্ত্রের পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে আন্দোলনকারীদের প্রতিরোধে রাস্তায় নেমেছিলেন তারা। তাঁদের অনেকের হাতে পিস্তল, শটগান, বন্দুক, কাটা রাইফেলের মতো আগ্নেয়াস্ত্র দেখা গেছে বলে জানিয়েছিলেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।

আগের দিনগুলোতে বিক্ষোভকারীদের হত্যায় সরকারের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায় থাকলেও ৪ আগষ্টের হত্যাকান্ডের মূল দায় ছিল আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের। কারণ প্রথম আলোর রিপোর্ট অনুসারে ঐদিন বেশির ভাগ স্থানে সংঘর্ষের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সেভাবে দেখা যায়নি। তাঁরা মূলত সরকারি স্থাপনা রক্ষায় বেশি মনোযোগী ছিলেন। (সূত্র: সারা দেশে ব্যাপক সংঘর্ষ, নিহত ৯৮, প্রথম আলো, ৫ আগস্ট ২০২৫)

এখন প্রশ্ন হলো, এই যে ৪ আগস্ট আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা অস্ত্রসস্ত্র সহ সারা দেশে বিক্ষোভকারীদের উপর হামলা চালিয়েছিলো, এটা কি নেতাকর্মীদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে হয়েছিল নাকি সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নিয়েই তারা এই হত্যাকান্ডে লিপ্ত হয়েছিলো?

এর উত্তর পাওয়া যায় ৫ আগস্ট প্রথম আলোতে প্রকাশিত আরেকটি রিপোর্ট থেকে। “আরও শক্তি দেখাতে চায় আওয়ামী লীগ”- শীরোনামের রিপোর্ট অনুসারে, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এমনকি সেনাবাহিনী নামিয়েও যখন আন্দোলন দমন করা যাচ্ছিল না, ৩ তারিখ শনিবার যখন সরকারের পদত্যাগের এক দফা উঠে, তখন পরিস্থিতি সামাল দিতে ৩ আগস্ট শনিবার আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক বৈঠকে রাজনৈতিক শক্তিপ্রয়োগের মাধ্যমে এ আন্দোলন দমনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই ৩ আগস্ট শনিবার মধ্যরাতে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীরা মাঠে নামার প্রস্তুতি নেন এবং ৪ তারিখ আন্দোলন প্রতিরোধের নামে হত্যাকান্ডগুলো ঘটান। শুধু ৪ তারিখই নয়, সামনে আরো তিন দিন দলের নেতা-কর্মীদের এভাবে শক্তিপ্রদর্শনের নির্দেশনা ছিল বলে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানিয়েছিলেন। (আরও শক্তি দেখাতে চায় আওয়ামী লীগ, প্রথম আলো, ৫ আগস্ট, ২০২৫)

ফলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ যে দল হিসেবে অপরাধে লিপ্ত হয়েছিলো সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে। ফলে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার করে আইন অনুসারে উপযুক্ত সাজা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এই সাজা সংশ্লিষ্ট আইনের বিধান অনুসারে নিবন্ধন বাতিল করা থেকে শুরু করে নিষিদ্ধ করা — যে কোন কিছুই হতে পারে।

একটি কথা স্পষ্ট বলে রাখা ভাল। আমি মনে করি, কোন রাজনৈতিক দল যখন সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে মাস কিলিং এ যুক্ত হয়, তখন সেই দলের আর রাজনীতি করবার অধিকার থাকে না।

যেমন একাত্তরে জামাতে ইসলামি সাংগঠনিক ভাবে মাস কিলিং এ যুক্ত ছিল বলে জামাতে ইসলামির রাজনীতি করবার অধিকার নাই বলে মনে করি, ঠিক একই ভাবে মাস কিলিং এ যুক্ত থাকবার কারণে আওয়ামী লীগেরও রাজনীতি করবার অধিকার নাই বলে মনে করি। জুলাই অভ্যুত্থানে জামাত অংশ নিয়েছিলো বলে তাদের কাফ্ফারা হয়ে গেছে বলে যে তত্ত্ব দেওয়া হয়েছে আমি তার সাথে একমত নই।

তবে দল হিসেবে এসব বিচার যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে স্বাক্ষ প্রমাণের ভিত্তিতেই হওয়া উচিত। নির্বাহি আদেশে জামাতকে নিষিদ্ধ করে যেমন লাভ হয়নি, নির্বাহি আদেশে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেও কোন লাভ হবে না। আরেকটা কথা। হত্যাকান্ডে জড়িত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার চাওয়ার অর্থ এই নয় যে, আওয়ামী লীগের নেতা কর্মী হলেই তাকে মারধর করা বা পুলিশে দেওয়া গ্রহণযোগ্য। বিচার হতে হবে সুনির্দিষ্ট অপরাধের ভিত্তিতে৷

যিনি অর্থনৈতিক অপরাধ করেছেন তার অর্থনৈতিক অপরাধের বিচার করতে হবে। যিনি হত্যাকান্ডে যুক্ত ছিলেন, তার হত্যাকান্ডের অপরাধের বিচার করতে হবে৷ আওয়ামী লীগ সমর্থক হলেই তাকে ঢালাও মামলা দিয়ে জেলে পাঠানো যাবে না। তাহলে জামাত শিবিরের নেতাকর্মীদের যেমন ঢালাও মামলা দিয়ে, গ্রেফতার করে, বিচার বহির্ভূত হত্যা করে মজলুমে পরিণত করা হয়েছে, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ক্ষেত্রেও একই ধরণের ঘটনা ঘটবে এবং তারা জামাতের মতই কয়েক বছর পর জনসহানুভূতি নিয়ে রাজনৈতিক ভাবে পুনর্বাসিত হবে।

তখন যেমন জামাত শিবিরের নেতা কর্মীদের উপর চালানো ঢালাও নিপীড়নের বিরোধীতা করেছিলাম, এখন আওয়ামী লীগের নেতা কর্মী সমর্থকদের উপর ঢালাও নিপীড়নের বিরোধীতা করছি৷ আবারও বলি সুনির্দিষ্ট অপরাধে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও দল হিসেবে আওয়ামী লীগের যথাযথ প্রকৃয়া অনুসরণ করে স্বচ্ছতার সাথে বিচার করতে হবে৷”


‘ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্যে ফাটল ধরাতে চাইছে সরকার’ : তারেক রহমান

0

সরকারের কড়া সমালোচনা করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন — এমন অভিযোগ আছে যে, অন্তর্বর্তী সরকার নানা ইস্যু তৈরি করে ফ্যাসিবাদবিরোধী দলগুলোর ঐক্যে হয়ত ফাটল ধরানোর ক্ষেত্র তৈরি করছে।

শুক্রবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ খ্রিস্টান ফোরাম আয়োজিত ইস্টার পুনর্মিলনী ও শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যোগ দিয়ে এ কথা বলেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘পলাতক স্বৈরাচারের সময়ের একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি বিমানবন্দর দিয়ে চলে গেছেন দেশ ছেড়ে।…কিন্তু এখন বলা হচ্ছে যে অন্তর্বর্তী সরকার নাকি তার এই দেশত্যাগের ব্যাপারে কিছুই জানে না।…প্রত্যেকের মনে প্রশ্ন উঠেছে যে তাহলে অন্তর্বর্তী সরকার কী জানে।

তারেক রহমান বলেন, ‘এমন অভিযোগও উঠেছে সংস্কারের নামে সময়ক্ষেপণ করে অন্তর্বর্তী সরকার একদিকে যেমন হয়ত পলাতক স্বৈরাচার এবং তাদের দোসরদের নিরাপদে দেশত্যাগের সুযোগ করে দিচ্ছে, অপরদিকে অত্যন্ত সুকৌশলে নানা ইস্যু সৃষ্টি করে স্বৈরাচার বা ফ্যাসিবাদবিরোধী যে রাজনৈতিক দলগুলো আমরা যারা মাঠে ছিলাম, সেই দলগুলোর ঐক্যের মধ্যে ফাটল ধরানোর একটা ক্ষেত্র তৈরি করতে চাইছে।’

‘সরকার পলাতক স্বৈরাচারদের সহযোগীদের পুনর্বাসনের ক্ষেত্রও হয়ত তৈরি করতে চাইছে। এই বিষয়গুলো ঘুরে ফিরে মানুষের মনে প্রশ্ন তৈরি করছে,’ যোগ করেন তিনি।

‘বিএনপি প্রতিটি ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি এখনো সহযোগিতা-সমর্থন অব্যাহত রেখেছে’ মন্তব্য করে তারেক বলেন, ‘কিন্তু যদি আমরা খেয়াল করে দেখি, বিভিন্ন কারণে অন্তর্বর্তী সরকার তাদের দায়িত্ব পালনে সক্ষমতার পরিচয় দিতে পারছে কিনা, এ নিয়ে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের মধ্যে ধীরে ধীরে সংশয় সৃষ্টি হচ্ছে।’