একটি পুরনো কাঠের বাক্স, তার ভেতরে অদ্ভুত জিনিসপত্র, আর তাকে ঘিরে রচিত এক রহস্যময় ও ভয়ঙ্কর গল্প— এটি হলো ‘ডিববাক বক্স’ (The Dybbuk Box)। ২০০৩ সালে ই-বে (eBay) নিলামে বিক্রি হওয়া এই বাক্সটি শীঘ্রই ইন্টারনেটের মাধ্যমে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। এটি শুধু একটি ভৌতিক বস্তু নয় বরং ইহুদি লোককাহিনী, আধুনিক মিডিয়া এবং পপ কালচারের এক অদ্ভুত মিশেল। কিন্তু এই গল্পের পেছনের সত্য কী? এটি কি সত্যিই কোনো অলৌকিক শক্তিধর বস্তু, নাকি শুধুই একটি সৃষ্ট গল্প?
‘ডিববাক’ (Dybbuk) শব্দটি হিব্রু শব্দ ডিবুক থেকে এসেছে, যার অর্থ “আটকে থাকা আত্মা”। ইহুদি রহস্যবাদ বা কাব্বালাহ (Kabbalah) অনুসারে, ডিববাক হলো এমন একটি আত্মা, যা মৃত্যুর পর পৃথিবীতে আটকে থাকে। এর কারণ হতে পারে অপূর্ণ ইচ্ছা, পাপ বা কোনো অসম্পূর্ণ কাজ। এই আত্মা জীবিত মানুষের দেহে প্রবেশ করে এবং তাকে নানাভাবে কষ্ট দেয়।
ইহুদি লোককাহিনীতে ডিববাকের ধারণা ১৬-১৭ শতকের পূর্ব ইউরোপে বিশেষভাবে প্রচলিত ছিল। অনেক গল্পে বর্ণিত আছে যে, রাব্বিরা বিশেষ প্রার্থনা ও আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই আত্মাকে তাড়াতেন। তবে ঐতিহ্যগত ইহুদি বিশ্বাসে ‘ডিববাক বক্স’ নামে কোনো নির্দিষ্ট বস্তুর উল্লেখ নেই। এটি সম্পূর্ণ আধুনিক কাল্পনিক ধারণা।
২০০৩ সালে আমেরিকার ওরেগনের এক ব্যবসায়ী কেভিন ম্যানিস (Kevin Mannis) ই-বে-তে একটি পুরনো ওয়াইন ক্যাবিনেট বিক্রি করেন। তিনি দাবি করেন, এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পোল্যান্ড থেকে একজন ইহুদি নারী আমেরিকায় নিয়ে এসেছিলেন। সেই নারীর মৃত্যুর পর বাক্সটি তার হাতে আসে।
বাক্সটির ভেতরে পাওয়া যায়, ১৯২০ সালের দুটি পয়সা, একটি সোনালি চুলের ক্লিপ, শুকনো গোলাপ, একটি ছোট মোমবাতি, কাব্বালাহ-সম্পর্কিত একটি মুদ্রা, একটি ক্ষুদ্র কাগজের স্ক্রল, কিন্তু সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দাবি ছিল— এই বাক্সে একটি ডিববাক আটকে আছে!
ম্যানিসের মতে, বাক্সটি খোলার পর থেকেই তিনি ও তার আশেপাশের মানুষরা অদ্ভুত ঘটনার সম্মুখীন হয়েছেন। রাতে দুঃস্বপ্ন দেখা, অদ্ভুত গন্ধ অনুভব করা, দোকানে অদৃশ্য আওয়াজ শোনা, বাড়ির বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম নিজে থেকে চালু-বন্ধ হওয়া।
ভয়ে তিনি বাক্সটি বিক্রি করে দেন। এরপর এটি একাধিকবার হাতবদল হয় এবং প্রতিটি মালিকই একই রকম ভৌতিক অভিজ্ঞতার কথা বলেন। এই গল্প ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে এবং ডিববাক বক্স ‘বিশ্বের সবচেয়ে অভিশপ্ত বস্তু’ হিসেবে পরিচিতি পায়।
ডিববাক বক্সের গল্পটি শীঘ্রই হলিউডের নজরে আসে। ২০১২ সালে The Possession নামে একটি হরর মুভি মুক্তি পায়, যা এই বক্সের গল্প থেকে অনুপ্রাণিত। মুভিটি বক্স অফিসে সফল হয় এবং ডিববাক বক্সের কিংবদন্তিকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে।
২০১৮ সালে বিখ্যাত প্যারানরমাল ইনভেস্টিগেটর Travel Channel-এর জনপ্রিয় শো Ghost Adventures-এর মুখ্য ব্যক্তিত্ব জ্যাক ব্যাগান্স ডিববাক বক্সটিকে কেনেন। তিনি সেটিকে লাস ভেগাসে অবস্থিত তার নিজস্ব The Haunted Museum-এ স্থাপন করেন। তিনি দাবি করেন, এই বাক্সের সংস্পর্শে এলে অনেক দর্শক ও তদন্তকারীরা অস্বস্তি, দুশ্চিন্তা, শারীরিক দুর্বলতা, এমনকি অলৌকিক ঘটনা অনুভব করেছেন।
Ghost Adventures-এর বিশেষ পর্ব “The Dybbuk Box: True Story of Chris Chambers”–এ ডিববাক বক্স নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান চালানো হয়, যা এই ধারণাটিকে পপ-কালচারে আরও জনপ্রিয়তা দেয়।
Zak Bagans-এর কথায়, এলভিস প্রেসলির কন্যা Lisa Marie Presley-ও বক্সটি দেখতে এসেছিলেন এবং সেটির কাছাকাছি এসে অস্বস্তিকর ও আবেগঘন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। এ ছাড়াও অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি যেমন Post Malone (র্যাপার ও গায়ক) বক্সটির সংস্পর্শে আসার পর অস্বাভাবিক ঘটনা ও দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
২০১৮ সালে Post Malone-এর সাথে একটি ঘটনার ভিডিও প্রকাশিত হয়, যেখানে দেখা যায়, Bagans ডিববাক বক্সের ঢাকনা ছাড়িয়ে দিলে Post Malone আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং পরবর্তী মাসগুলোতে তিনি একাধিক দুর্ঘটনা, বিমান বিভ্রাট ও ডাকাতির শিকার হন বলে জানান।
যদিও এগুলোর কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই এবং অনেকে এগুলোকে “manufactured folklore” বা “contemporary legend” বলে থাকেন, তবুও ডিববাক বক্স আধুনিক প্যারানরমাল কালচারে এক বিশেষ আইকন হয়ে উঠেছে।
২০২১ সালে কেভিন ম্যানিস একটি মজার তথ্য প্রকাশ করেন— ডিববাক বক্সের গল্পটি সম্পূর্ণ তার বানানো! তিনি স্বীকার করেন যে, এটি একটি সমসাময়িক লোককাহিনী (urban legend) তৈরি করার চেষ্টা ছিল, যেখানে ইহুদি রহস্যবাদ এবং আধুনিক ভৌতিক গল্প মিশে আছে।
ইহুদি কাব্বালাহ ও লোককাহিনীতে ডিববাকের ধারণা থাকলেও, ‘ডিববাক বক্স’ নামে কোনো বস্তুর উল্লেখ নেই। এটি সম্পূর্ণ আধুনিক কাল্পনিক গল্প। সমস্যা হলো পশ্চিমা মিডিয়া ও বিনোদন শিল্প প্রায়ই বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উপাদানকে বিকৃত করে ভৌতিক গল্পে পরিণত করে।
ডিববাক বক্সের গল্প আমাদের দেখায় কিভাবে একটি সাধারণ বস্তুকে ঘিরে পুরো একটি কিংবদন্তি তৈরি করা যায়। এটি লোককাহিনীর শক্তির প্রমাণ, যেখানে সত্য ও কল্পনা মিশে একটি নতুন গল্পের জন্ম দেয়।


