বিজ্ঞান ও কল্পনাশক্তির অন্তরঙ্গতা

মানবজ্ঞান ও মানবপ্রকৃতির গভীরে দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের গভীর দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। একদিকে কঠোর যুক্তি ও পরীক্ষণভিত্তিক বিজ্ঞান, অন্যদিকে শিল্প, সাহিত্য ও ধর্মের আবেগনির্ভর মানবিকতা। শিক্ষা, সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতিটি স্তরে এই বিভাজন দৃঢ়ভাবে প্রোথিত। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় ‘STEM’ (Science, Technology, Engineering, Mathematics)-ভিত্তিক বিষয়গুলোতে যুক্তিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, আর মানবিক শাখাগুলোতে অনুভব, মূল্যবোধ ও নৈতিকতার চর্চা। ফলে দীর্ঘকাল ধরে এমন ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে যে, বিজ্ঞান ও মানবিকতা দুইটি স্বতন্ত্র ও প্রায় বিপরীত জগৎ।

কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে তথ্যের বিস্ফোরণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আন্তঃশাখাগত গবেষণার প্রসারে আমরা বাধ্য হচ্ছি এই সীমারেখা পুনর্বিবেচনা করতে। কল্পনাশক্তি এতদিন নিছক শিল্প-সাহিত্য ও সৃজনশীলতার বিষয় বলে বিবেচিত হত—এখন জানা যাচ্ছে, তা কেবল শিল্প নয়; বরং বিজ্ঞানেরও মূল চালিকাশক্তি।

যুক্তি বনাম অনুভব –

পশ্চিমা জ্ঞানের ইতিহাসে রেনে দেকার্ত (René Descartes) থেকে শুরু করে অগাস্ট কম্ত (Auguste Comte)-এর পজিটিভিজম পর্যন্ত মানবিকতা ও বিজ্ঞানের বিচ্ছেদ সুপ্রতিষ্ঠিত। দেকার্তের “Cogito, ergo sum”—“আমি চিন্তা করি, অতএব আমি আছি”—মন্তব্যটি মানসিক ক্রিয়াকে যুক্তি ও আত্মপর্যবেক্ষণে আবদ্ধ করে দেয়। ফলে মন ও দেহকে দুই পৃথক সত্তা হিসেবে দেখা শুরু হয়। পরবর্তীতে শিল্প-সাহিত্য ও ধর্মকেও যুক্তির পরীক্ষণের বাইরে রাখার চেষ্টা চলে। বিংশ শতাব্দীতে Logical Positivism ও Analytic Philosophy এই বিচ্ছেদকে আরও গভীর করে। ফলে শিক্ষাব্যবস্থায় বিজ্ঞান ও মানবিকতা আলাদা বিভাগে পরিণত হয়।

অথচ ইতিহাসের অনেক দার্শনিক, বিশেষত ডেভিড হিউম, নিৎসে ও সিগমুন্ড ফ্রয়েড দেখিয়েছেন—আমাদের চিন্তা-চেতনা আবেগ, ইচ্ছা ও কল্পনার গভীর ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে। বাংলার বাঙালি দার্শনিকদের মধ্যেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘সহজপাঠ’-এ বলেছিলেন—“চোখের পানে চাই না কেন?” অর্থাৎ, বাস্তব পর্যবেক্ষণ ও কল্পনা একসাথে না চললে সত্য উপলব্ধি অসম্পূর্ণ। সুতরাং বিজ্ঞান-মানবিকতার বিচ্ছেদ নিছক একাডেমিক বিভাজন, বাস্তবজগতে তা এত কঠোর নয়।

কল্পনাশক্তি অর্থ নিছক কল্পনা বা স্বপ্ন নয়, বরং এটি আমাদের মস্তিষ্কের এমন এক প্রক্রিয়া, যেখানে যুক্তি, অনুভূতি, অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশা মিশে এক নতুন বাস্তবতার রূপ দেয়। নিউরোসায়েন্সের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে—আমাদের হিপোক্যাম্পাস (Hippocampus), যেটি স্মৃতি সংরক্ষণের সাথে যুক্ত সেটিই ভবিষ্যৎ কল্পনা (prospective imagination)-এর ক্ষেত্রেও সক্রিয় হয়। অর্থাৎ স্মৃতি ও কল্পনা একই নিউরাল ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে আছে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক Raymond Tallis ‘neuromania’ ধারণার সমালোচনা করে দেখান—মানুষের গল্পকথন, চিত্রকল্প ও শিল্পানুভব আসলে আমাদের নিউরাল প্লাস্টিসিটি ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক অভ্যাসের সমন্বিত ফল। এখানে কল্পনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কাজী নজরুল ইসলাম ও জীবনানন্দ দাশের কবিতায় দেখা যায় প্রকৃতিকে ব্যাখ্যা করতে বিজ্ঞানসম্মত ভাষা ও কল্পনাপ্রসূত চিত্রকল্প একসাথে ব্যবহার হয়েছে। এটি আমাদের সংস্কৃতিতে বিজ্ঞান-মানবিকতার ঐক্যের প্রাচীন উদাহরণ।

শিশুদের চিত্রাঙ্কন পর্যবেক্ষণ করে মনোবিজ্ঞানীরা (Kellogg, 1969) দেখিয়েছেন শুরুতে শিশুরা আকৃতি আঁকে, তারপর ক্রমান্বয়ে গল্প ও চরিত্র নির্মাণে আগ্রহী হয়। কল্পনা এখানে তাদের মস্তিষ্কের সংকেত-প্রক্রিয়াকরণ সহজতর করে। কিন্তু বর্তমান পরীক্ষানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থায় ভাষাকেন্দ্রিকতা ও তথ্যভিত্তিকতা বেশি গুরুত্ব পেলে শিশুরা এই চিত্রভাষা ও কল্পনাশক্তি হারিয়ে ফেলে। ফলে কিশোর বয়সের পর তাদের নতুন ধারনা তৈরির ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে।

সুইডেনের বিজ্ঞানমনস্ক লেখক Tor Nørretranders বলেন—‘The user illusion’ অর্থাৎ আমরা যা বুঝি, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি তথ্য আমাদের মস্তিষ্কের অচেতন স্তরে প্রক্রিয়া হয়। কল্পনাশক্তি এই অচেতন স্তরের সাথে যুক্তি ও ভাষার সংযোগ ঘটায়। ফলে শিক্ষা ও গবেষণায় কল্পনার গুরুত্ব অপরিহার্য।

আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন, “Imagination is more important than knowledge. For knowledge is limited, whereas imagination embraces the entire world.” আসলে বিজ্ঞানের বড় বড় আবিষ্কারগুলো কেবল যুক্তি দিয়ে হয়নি; বরং কল্পনাপ্রসূত মানসিক চিত্র ও গল্প—মডেল ও ভাবনার আকার নিয়েছে।

ডিএনএ-এর গঠন আবিষ্কারে ওয়াটসন ও ক্রিক যে দ্বি-সর্পিল মডেল ব্যবহার করেছিলেন, তা ছিল নিছক তথ্য নয়, বরং কল্পনার ফসল। নিউটনের আপেলের গল্প, ফারাডের বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের রেখাচিত্র, ডারউইনের বিবর্তনমূলক ‘ট্রি অফ লাইফ’ সবই কল্পনার দৃষ্টান্ত। এমনকি তথ্যপ্রযুক্তির দুনিয়ায় কম্পিউটার প্রোগ্রামিং ও ডিজাইন থিঙ্কিং-এও কল্পনা অপরিহার্য।

কল্পনাশক্তি আর নিছক শিল্প-সাহিত্যের বিষয় নয়। এটি মানবজ্ঞান, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির কেন্দ্রে অবস্থিত। বিজ্ঞান ও মানবিকতার মধ্যে কল্পনা এমন এক সেতু, যা আমাদের মন, দেহ ও সমাজের মধ্যে অর্থপূর্ণ সংযোগ ঘটায়। তাই নতুন শতাব্দীর শিক্ষা ও গবেষণায় কল্পনাশক্তি অধ্যয়ন অপরিহার্য—যেখানে যুক্তি ও অনুভব, তথ্য ও গল্প, পরীক্ষা ও শিল্প একত্রিত হয়ে মানবসম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। বাংলার সাহিত্যিক ঐতিহ্য ও বৈজ্ঞানিক কল্পনার মেলবন্ধনে এদেশও নেতৃত্ব দিতে পারে এই নতুন জ্ঞানচর্চায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন