Home Blog Page 95

ডার্ক কমেট ও সৌরজগতের শ্রেণিগত অনিশ্চয়তা

২০১৬ সালের এক সন্ধ্যায়, নাসার সেন্টার ফর নিয়ার-অর্থ অবজেক্ট স্টাডিজের গবেষক ডাভিদে ফার্নোক্কিয়া একটি অস্বাভাবিক ঘটনা লক্ষ্য করেন যা তার দীর্ঘদিনের গবেষণার ধারাকে এক নতুন মোড় দেয়। ফার্নোক্কিয়া তার নিজস্ব সফটওয়্যার ব্যবহার করে সৌরজগতের কাছাকাছি ঘুরে বেড়ানো গ্রহাণু ও ধূমকেতুদের গতিবিধি নিরীক্ষণ করে ২০০৩ আরএম নামের একটি গ্রহাণুর অস্বাভাবিক কক্ষপথের পরিবর্তন দেখতে পান। এই পরিবর্তন কেবলমাত্র মহাকর্ষীয় শক্তি বা সূর্যালোকের ক্ষুদ্র প্রভাব ইয়র্কোভস্কি ইফেক্ট দ্বারা ব্যাখ্যা করা যাচ্ছিল না।

ফার্নোক্কিয়া ও তার দল যখন এই গ্রহাণুর গতিবিধি বিশ্লেষণ করছিলেন, তখন তারা লক্ষ্য করেন ২০০৩ আরএম নিজের ইচ্ছামতো চলাফেরা করছে।সাধারণত ধূমকেতুরা সূর্যের কাছাকাছি এলে বরফ বাষ্পীভবনের মাধ্যমে গ্যাস ও ধূলা নির্গত করে, যা তাদের গতি পরিবর্তনে সাহায্য করে। কিন্তু ২০০৩ আরএম-এর ক্ষেত্রে কোনো গ্যাস বা ধূলার ছায়া পাওয়া যাচ্ছিল না। এটি ছিল এক ধরনের ‘অদৃশ্য জেট’ যা এক রহস্যের জন্ম দেয়।

২০১৭ সালের অক্টোবরে এই রহস্যময় গ্রহাণুর আলোচনার মধ্যেই হাওয়াইয়ের একটি টেলিস্কোপ প্রথমবারের মতো সৌরজগতের বাইরে থেকে আসা একটি বস্তু আবিষ্কার করে। এর নামকরণ করা হয় ‘ওউমুয়ামুয়া’, যার অর্থ “দূর থেকে আগত প্রথম দূত”। এটি ছিল প্রথম ধরা পড়া আন্তঃনক্ষত্রীয় বস্তু, যা সৌরজগতের মধ্য দিয়ে এসে দ্রুতগতিতে চলে যায়।

‘ওউমুয়ামুয়া’র গতি সূর্যের চারপাশে ঘুরে যাওয়ার পর হঠাৎ বেড়ে যায়, যা কেবল মহাকর্ষীয় বল দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। এর গতি বৃদ্ধি এমন এক ধরণের অদৃশ্য শক্তির কারণে ঘটেছে বলে বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন, কিন্তু সেই শক্তির প্রকৃতি আজও অনিশ্চিত।

ফার্নোক্কিয়া ও তার সহকর্মীরা বুঝতে পারেন ২০০৩ আরএম ও ‘ওউমুয়ামুয়া’র মতো বস্তুগুলো সৌরজগতের মধ্যে এমন এক শ্রেণির বস্তু, যাদের গতি ধূমকেতুর মতো কিন্তু তারা দেখতে গ্রহাণুর মতো। এই বস্তুগুলো থেকে কোনো গ্যাস বা ধূলার ছায়া পাওয়া যায় না, ফলে তারা ‘ডার্ক কমেট’ নামে পরিচিতি পায়। মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির প্ল্যানেটারি সায়েন্টিস্ট ড্যারিল সেলিগম্যান এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, “এই বস্তুগুলোর আচরণ র‍্যান্ডম নয়, তাদের গতি পরিবর্তনের পেছনে অবশ্যই কোনো অজানা প্রক্রিয়া কাজ করছে।”

ডার্ক কমেটগুলো শুধুমাত্র মহাকাশ বিজ্ঞানীদের কৌতূহলই জাগায় না, বরং তারা পৃথিবীর জল ও জীবনের উৎস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীরা অনুসন্ধান করে আসছেন, পৃথিবীর মহাসাগরের জল কোথা থেকে এসেছে। এক সম্ভাবনা হলো প্রাচীনকালে এই ধরনের ধূমকেতু ও গ্রহাণুগুলো থেকে জল পৃথিবীতে এসেছে। যদি ডার্ক কমেটগুলো বরফযুক্ত হয় এবং অতীতে জল নিয়ে আসে, তবে তারা আমাদের জলবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞানের জন্য এক নতুন অধ্যায় খুলে দিতে পারে।

গ্রহাণু ও ধূমকেতুদের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও, ডার্ক কমেটগুলো এই দুইয়ের মধ্যবর্তী একটি ধরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তারা দেখতে গ্রহাণুর মতো হলেও তাদের গতি ধূমকেতুর মতো, যা আমাদের সৌরজগতের গঠন ও গতিবিধি সম্পর্কে পূর্ব ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। এই বস্তুগুলো আমাদের শেখায়, সৌরজগতের বস্তুগুলো এককভাবে শ্রেণীবদ্ধ করা কঠিন এবং তারা একটি ধারাবাহিকতার অংশ।

বর্তমানে উন্নত টেলিস্কোপ ও মহাকাশযানগুলো এই ডার্ক কমেটগুলোর গঠন ও আচরণ সম্পর্কে গভীর তথ্য সংগ্রহের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষ করে জাপানের একটি মহাকাশযান ইতিমধ্যেই একটি ডার্ক কমেটের কাছে পৌঁছানোর পথে রয়েছে। এই মহাকাশযান থেকে পাওয়া তথ্য ভবিষ্যতে এই রহস্যময় বস্তুগুলোর প্রকৃতি ও গতিবিধি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেবে।

ডার্ক কমেটগুলোর গতিবিধি ও প্রকৃতি বোঝা অত্যন্ত জরুরি, কারণ যদি এই ধরনের বস্তুগুলো পৃথিবীর দিকে আসতে থাকে, তবে তাদের সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হবে। এছাড়া এই গবেষণা সৌরজগতের গঠন, জলবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান এবং মহাকাশ নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ডাভিদে ফার্নোক্কিয়া ও তার সহকর্মীদের আবিষ্কার করা “ডার্ক কমেট” ধারণা আমাদের সৌরজগতের জটিলতা ও অজানা দিকগুলোকে সামনে এনেছে। এই বস্তুগুলো আমাদের পূর্বধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে এবং মহাকাশ বিজ্ঞানের নতুন প্রশ্ন ও অনুসন্ধানের পথ খুলে দিয়েছে। ‘ওউমুয়ামুয়া’র মতো আন্তঃনক্ষত্রীয় বস্তু ও সৌরজগতের ডার্ক কমেটগুলো আমাদের মহাকাশের গভীর রহস্য উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আগামী দিনে আধুনিক প্রযুক্তি ও মহাকাশযানের মাধ্যমে এই রহস্যের উত্তর পাওয়া সম্ভব হবে, যা আমাদের সৌরজগতের ইতিহাস, গঠন ও জীবনের উৎস সম্পর্কে গভীর অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করবে। তাই এই গবেষণা শুধুমাত্র মহাকাশ বিজ্ঞান নয়, মানবজাতির অস্তিত্ব ও ভবিষ্যতের জন্যও অপরিহার্য।

AI ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লব – কি হতে যাচ্ছে আগামী সমাজের ভবিষ্যৎ ?

একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকের শেষভাগে এসে আমরা এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি কেবল শিল্প ও অর্থনীতির রূপ বদলে দিচ্ছে না, বরং মানুষের জীবনের মূল কাঠামো, পরিচয় ও আত্মবোধকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) বিস্তার একদিকে যেমন কর্মদক্ষতা ও উদ্ভাবন বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে মানবসমাজে গভীর বিভাজন, আতঙ্ক এবং সৃজনশীলতার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

২০২৫ সালের প্রথমার্ধে মাইক্রোসফট, ম্যাচ গ্রুপসহ একাধিক আন্তর্জাতিক টেক জায়ান্ট ঘোষণা করেছে, তারা AI প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মী ছাঁটাই করছে। এই সিদ্ধান্তগুলো এমন এক সময় এসেছে যখন বিশ্বজুড়ে বেকারত্ব, কর্মসংস্থান নিরাপত্তাহীনতা ও অর্থনৈতিক বৈষম্য বেড়ে চলেছে।

এই ছাঁটাই কেবল চাকরি হারানোর পরিসংখ্যান নয়—এটি একটি সামাজিক বার্তা। এটি বলে দিচ্ছে যে ভবিষ্যতের শ্রমবাজার আর আগের মতো থাকবে না। যারা প্রথাগত দক্ষতায় দক্ষ, তারা হয়ত এই প্রযুক্তি-নির্ভর পরিবেশে নিজেদের স্থান খুঁজে পাচ্ছেন না। এখানে কেবল প্রযুক্তির দক্ষতা নয়, বরং ‘প্রযুক্তি সহযোগিতাপূর্ণ মানসিকতা’ই হয়ে উঠছে টিকে থাকার পূর্বশর্ত।

এই পরিস্থিতি একটি ভয়াবহ প্রশ্ন —”কোন শ্রেণির মানুষ টিকে থাকবে?” যদি স্বল্প বা মাঝারি দক্ষতাসম্পন্ন চাকরিগুলো AI দখল করে নেয়, তবে মধ্যবিত্ত শ্রেণি একরকম অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে। এর মানে দাঁড়ায়, সমাজে এক নতুন শ্রেণি-সংগ্রাম শুরু হয়েছে—যেখানে মানুষের কর্মক্ষমতা নয়, বরং তার প্রযুক্তিসম্পৃক্ততা-ই শ্রেণির সূচক হয়ে উঠছে।

অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা, নিজেকে প্রযুক্তির সঙ্গে তুলনা করার চাপ, এবং “অপ্রয়োজনীয় মানুষ” হয়ে পড়ার ভয়—এই তিনটি উপাদান আজকের সমাজে এক নতুন মানসিক রোগতত্ত্বের জন্ম দিচ্ছে। গবেষণা বলছে, AI ও অটোমেশনের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে তরুণদের মধ্যে অনাস্থা, নিঃসঙ্গতা ও কর্মহীনতাজনিত বিষণ্নতা বাড়ছে।

Hotmail-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা সাবির ভাটিয়া সম্প্রতি প্রশ্ন তুলেছেন—যখন AI কবিতা লিখে, প্রবন্ধ তৈরি করে, এমনকি দর্শনের যুক্তিও তৈরি করে ফেলতে পারে, তখন মানুষ করবে কী?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে তাকাতে হয় মানবিকতার দিকে। একটি যন্ত্র নিখুঁত তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে, কোড লিখতে পারে, এমনকি “অনুকরণে” সৃজনশীলতা দেখাতেও পারে—কিন্তু তার মধ্যে আত্মজিজ্ঞাসা নেই, নেই দুঃখ, প্রেম, বা বিবেক। সাবির ভাটিয়া তাই বলেন, ভবিষ্যতের পৃথিবীতে মানুষ যদি কেবল প্রযুক্তির দাসে পরিণত হয়, তাহলে মানসিক স্বাস্থ্য, সৃজনশীলতা, ও মানবিক অনুভবের স্থান কোথায় থাকবে?

তিনি এমন এক শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন, যেখানে শুধুমাত্র টেকনো-দক্ষতা নয়, বরং ‘মৌলিক চিন্তা’, ‘সমালোচনামূলক বোধ’, ও ‘সৃজনক্ষমতা’ কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।

বাংলাদেশ, ভারত, নাইজেরিয়া বা অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশে AI বিপ্লব এসেছে উন্নত বিশ্বের ছাঁচে গড়া কাঠামো নিয়ে—যেখানে শ্রমসাশ্রয়ী অটোমেশন মানে কর্মসংস্থান হ্রাস। এসব দেশে যেখানে এখনও শিক্ষার মান, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ এবং ডিজিটাল অবকাঠামো দুর্বল, সেখানে AI হয়ে উঠতে পারে এক ভয়ঙ্কর বৈষম্যজন্মদাতা।

গার্মেন্টস বা কল-সেন্টারভিত্তিক শিল্প যদি অটোমেশনের কারণে মানুষের বদলে যন্ত্র ব্যবহার শুরু করে, তাহলে কয়েক লাখ মানুষ এক রাতেই কর্মহীন হতে পারে। এই বিপদ উন্নত দেশে প্রযুক্তির রূপান্তর হলেও, উন্নয়নশীল দেশে তা হয়ে দাঁড়াতে পারে ‘সামাজিক রসদ হারানোর’ আর্থিক ও নৈতিক বিপর্যয়।

এই সংকটময় চিত্রের মাঝে একটি আশার আলোও রয়েছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (WEF) ২০২৫ সালে নতুন তিনটি “চতুর্থ শিল্প বিপ্লব কেন্দ্র” প্রতিষ্ঠা করেছে। এই কেন্দ্রগুলো মানবকেন্দ্রিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নৈতিক প্রযুক্তি ব্যবহারের রূপরেখা তৈরিতে কাজ করবে।

এই পদক্ষেপটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি স্বীকার করে—প্রযুক্তি মানেই উন্নয়ন নয়, যদি সেটি মানুষকে বাদ দিয়ে এগোয়। এখানে প্রশ্ন প্রযুক্তির নয়, বরং প্রযুক্তির পরিচালনার। কে পরিচালনা করবে এই বুদ্ধিমত্তাকে লোভ না নৈতিকতা?

বিশেষত নারীদের, গ্রামীণ জনগোষ্ঠী ও সংখ্যালঘুদের প্রযুক্তিগত অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতের প্রযুক্তি সমাজকে আরও বিচ্ছিন্ন করে তুলবে। WEF-এর নীতিমালা তাই সমাজকে নতুনভাবে চিনতে ও গড়তে শেখায়, যেখানে প্রযুক্তির গতি নয়, মানুষের গুণই হবে মূল সূচক।

এই অবস্থার প্রেক্ষিতে আমাদের সমাজের সামনে কিছু মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে,মানুষ কি কেবল কর্মক্ষমতা দিয়ে মূল্যায়িত হবে? আমরা কি এমন এক ভবিষ্যতের দিকে যাচ্ছি যেখানে মানুষ তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে প্রযুক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে বাধ্য? উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য কি পৃথক নীতিনির্ধারণ জরুরি নয়?

প্রযুক্তি কখনোই সমাজের বাইরের কোনো শক্তি নয় বরং এটি আমাদের চাহিদা, দৃষ্টিভঙ্গি ও নীতির প্রতিফলন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের সমাজে যে পরিবর্তন আনছে, তা কেবল প্রযুক্তিগত নয়, নৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং অস্তিত্বগতও। আমরা চাইলে AI-কে এমন এক শক্তিতে রূপ দিতে পারি, যা সমাজে অন্তর্ভুক্তি ও সমতা আনে, আবার এটিকে এমন এক অস্ত্রও বানাতে পারি, যা মানুষকে অপ্রাসঙ্গিক করে তোলে। প্রশ্নটা তাই প্রযুক্তির নয়, আমাদের ইচ্ছার।

প্রথমবারের মতো জলবায়ু-কেন্দ্রিক , বাজেট ঘোষণা করেছে – পাকিস্তান

বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। বন্যা, খরা, হিমবাহ গলন, খাদ্য সংকট, রোগের বিস্তারসহ নানা দুর্যোগ বিশ্বজুড়ে জীবন ও জীবিকাকে প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে ফেলছে। এমন সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ পাকিস্তান ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে প্রথমবারের মতো “জলবায়ু-কেন্দ্রিক বাজেট” ঘোষণা করেছে। এটি শুধুমাত্র একটি বাজেটীয় পরিকল্পনা নয়, বরং টেকসই উন্নয়নের পথে পাকিস্তানের নতুন যাত্রার সূচনা।

এই বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, দেশের ৩০ শতাংশ পাবলিক ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পকে Climate Public Investment Management Assessment (CPIMA) এর আওতায় আনা হবে। অর্থাৎ কোনো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে তা জলবায়ু ও পরিবেশের ওপর কী প্রভাব ফেলবে তা পূর্বেই মূল্যায়ন করা হবে। এটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন নয়, বরং একটি রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের প্রতিফলন।

পাকিস্তানের জলবায়ু ও পরিবেশবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শেজরা মানসাব আলী খান খারাল জানান, “এই বাজেটের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় জলবায়ু বিবেচনা একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাচ্ছে।” এটি পাকিস্তানের জন্য এক বড় ধরনের নীতিগত ও প্রশাসনিক অগ্রগতি।

কেন এই উদ্যোগ জরুরি?

পাকিস্তান বিগত দশকে একের পর এক জলবায়ুজনিত বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় দেশের এক-তৃতীয়াংশ পানির নিচে তলিয়ে যায়, প্রায় দুই কোটি মানুষ গৃহহীন হয়। কৃষি, পানি সরবরাহ, স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামো খাতগুলিতে জলবায়ু পরিবর্তনের নানা সংকটের শিকার।

ভারতের সঙ্গে ইন্দাস পানি চুক্তি কার্যত স্থগিত হওয়ায় পাকিস্তানে পানি সংকট তীব্রতর হয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এর কৃচ্ছ্রতা কর্মসূচির চাপে পড়ে দেশটির উন্নয়ন ব্যয় সীমিত হয়ে গেছে। এসব প্রেক্ষাপটে জলবায়ুকেন্দ্রিক বাজেট প্রণয়ন একটি সময়োচিত এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।

এই বাজেটের মাধ্যমে বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে যেগুলো জলবায়ু অভিযোজন ও প্রশমনকে এগিয়ে নেবে:
পাকিস্তান ক্লাইমেট চেঞ্জ অথরিটি-কে সক্রিয় করা হয়েছে, যাতে জলবায়ুবান্ধব নীতি বাস্তবায়ন সহজ হয়।
জাতীয় ক্লাইমেট ফাইন্যান্স স্ট্র্যাটেজি প্রণয়নের মাধ্যমে বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়ন পাওয়া ও বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
“জেন্ডার ও ক্লাইমেট বাজেট ট্যাগিং” যুক্ত করে বাজেট ব্যবস্থায় আরও সমতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ফ্যান ও ই-বাইকের জন্য আলাদা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
বাজেটের ৭.৭% সিভিল গভর্নমেন্ট ফান্ড এবং ১৫.৩% পাবলিক সেক্টর ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম ফান্ড জলবায়ু-সংবেদনশীল খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে।

এই বাজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে পাকিস্তানের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো আরও টেকসই ও পরিবেশবান্ধব হবে। বিশেষ করে কৃষি, পানি ও জ্বালানি খাতে জলবায়ু সহনশীলতা বাড়বে। ফলে শুধু যে জনগণের জীবনমান উন্নত হবে তা নয়, বরং আর্থিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক সহযোগিতা অর্জনের পথও সুগম হবে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নে পাকিস্তানের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।

পাকিস্তানের এই জলবায়ু-কেন্দ্রিক বাজেট এক ধরনের দৃষ্টান্ত। এটি শুধু পাকিস্তান নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের জন্যও অনুসরণযোগ্য মডেল হতে পারে। বিশ্ব যখন জলবায়ু বিপর্যয়ের মুখে, তখন এমন উদ্যোগই হতে পারে মানবজাতির ভবিষ্যতের রক্ষাকবচ।

লক্ষ্য ডিসেম্বরে নির্বাচন আদায় , সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে চায় – বিএনপি

0

দৈনিক প্রথম আলো জানিয়েছে — নির্বাচন ইস্যুতে সরকারের ওপর এখন থেকে মাঠের চাপ তৈরির নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। ঈদুল আজহার পর বিভিন্ন ইস্যুতে এই চাপ আরও বাড়ানো হবে।

সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রের তথ্য মতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল নেতা শাহরিয়ার আলম সাম্য হত্যার বিচার এবং ইশরাক হোসেনকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে শপথ পড়ানোর দাবিতে যে আন্দোলন চলছে, সেটি সরকারের ওপর চাপ তৈরির কৌশলেরই অংশ।

এ দুটি ইস্যুতে আন্দোলন আরও জোরদার করতে বুধবার থেকে দুই কর্মসূচিতে জনসমাগম আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে দলীয় ফোরামে।

গত সোমবার রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সভায় দেশের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন নেতারা। সভায় কয়েকজন সদস্য অভিমত প্রকাশ করেন যে — সরকার নতুন নতুন ইস্যু তৈরি করছে, তাতে নির্বাচন নিয়ে জনমনে নানা আশঙ্কা ঘনীভূত হচ্ছে।

কথা বলে জানা গেছে, ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের দাবিতে সরকারের ওপর মাঠের চাপ তৈরির সিদ্ধান্ত নিলেও যাতে কোনো সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকবে বিএনপি। কারণ, সরকারকে বিপদে ফেলে নয়, বরং চাপে রেখে বিএনপির নীতিনির্ধারকেরা যথাসময়ে নির্বাচন আদায় করতে চান।

ইতিমধ্যে পতিত আওয়ামী লীগের লোকজন হঠাৎ হঠাৎ রাজপথে মিছিল করছে, আবার নানা পক্ষ ইস্যু সৃষ্টি করে রাস্তায় নামছে। এর মধ্য দিয়ে তারা সরকারকে বিপদে ফেলতে এবং দেশকে অস্থিতিশীল করতে চাইছে বলে বিএনপির সন্দেহ।

বিএনপির দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে — রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ, বর্তমান সংবিধান বাতিল, গণভোট অনুষ্ঠান, জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন এ বিষয়গুলো সামনে এনে জাতীয় নাগরিক কমিটিসহ (এনসিপি) কোনো কোনো পক্ষ নতুন করে বিতর্কের প্রেক্ষাপট তৈরি করতে পারে। বাস্তবে এ ধরনের কিছু হলে তখন সরকার কী ভূমিকা নেবে, পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেবে, সেটি নিয়ে চিন্তিত বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব।

ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য টানাপোড়েন , কমাতে চায় বাংলাদেশ

0

সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও উভয় দেশের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ভারতের সঙ্গে চলমান টানাপোড়েন আর বাড়াতে চায় না বাংলাদেশ। মঙ্গলবার সচিবালয়ে কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের সচিবদের সঙ্গে ব্যবসায়ী নেতাদের বৈঠক শেষে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন — ‘আমরা কোনো ধরনের পাল্টা পদক্ষেপ নেব না, আমাদের প্রচেষ্টা থাকবে যাতে আর কোনো উত্তেজনা না বাড়ে।’

তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই বাণিজ্য সচিব-পর্যায়ের বৈঠকের অনুরোধ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারতীয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠিয়েছে। ভারত সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ শুধু বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদেরই নয়, তাদের ব্যবসায়ীদেরও প্রভাবিত করছে। ‘তাই, আমরা একসঙ্গে বসে একটি সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করব,’ বলেন মাহবুবুর রহমান।

গত ৯ এপ্রিল ভারত সরকার বাংলাদেশি গার্মেন্টস পণ্যের জন্য ভারতীয় বিমানবন্দর ব্যবহারের ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা স্থগিত করে। বাংলাদেশ ১৩ এপ্রিল ৪টি স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে সুতা আমদানি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত জানায়। এরপর ১৭ মে ভারত স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশ থেকে পোশাক, কৃষি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, আসবাবপত্রসহ কিছু পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

বৈঠকে একটি শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্য সংস্থার প্রতিনিধি সরকারকে সর্বোচ্চ স্তর থেকে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক আলোচনা শুরু করার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, বাণিজ্য সচিব-পর্যায়ের বৈঠক ভারতের মানসিকতা বুঝতে সাহায্য করবে। দ্রুততম সময়ে বাণিজ্য বাধা অপসারণ না হলে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। চীনের পর ভারত থেকেই সবচেয়ে বেশি পণ্য আমদানি করে বাংলাদেশ।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে এই দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ছিল ১০.৫৬ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ ১.৫৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে এবং ৯ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি করেছে। বাংলাদেশ ভারত থেকে শিল্প কাঁচামাল, গার্মেন্টস সামগ্রী, কাপড়, খাদ্য, তুলা, রাসায়নিক, যন্ত্রপাতি, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, কৃষি পণ্য, চাল, প্রোটিন সামগ্রী এবং শাক-সবজি আমদানি করে। একইভাবে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত বাংলাদেশের জন্য একটি প্রধান রপ্তানি গন্তব্যে পরিণত হয়েছে, বিশেষত পোশাক সামগ্রী ও কৃষি পণ্যের জন্য। ২০১১ সাল থেকে বাংলাদেশ সার্কের দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির অধীনে শুল্কমুক্ত সুবিধা উপভোগ করে আসছিল।

চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে আসলে কি হচ্ছে ?

চট্টগ্রাম বন্দরের মোট ৪টি টার্মিনাল রয়েছে। চিটাগাং কন্টেইনার টার্মিনাল (সিসিটি), নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি), জেনারেল কার্গো বার্থ-জিসিবি(কন্টেইনার ও বাল্ক) এবং পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল (পিসিটি)। এরমধ্যে জিসিবি প্রধানত চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনায় চলে। এর ৬টি জেটি পৃথকভাবে পরিচালনা করছে বেসরকারি ৬ বার্থ অপারেটর প্রতিষ্ঠান। এনসিটি ও সিসিটি এই দুটি টার্মিনালই ২০০৯ সাল থেকে পরিচালনা করে আসছে বেসরকারি সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড। সদ্য চালু হওয়া পিসিটি পরিচালনার দায়িত্ব ২০২৪ সালে সৌদি আরব ভিত্তিক ‘রেড সি গেইটওয়ে’-কে ২২ বছর মেয়াদি পিপিপি চুক্তিতে দেয়া হয়েছে।

৪টি জাহাজ ভেড়ানোর সক্ষমতা থাকা এনসিটি বছরে ৪৪%, ২টি জাহাজের সক্ষমতা সম্পন্ন সিসিটি ১৯% এবং ৩টি জাহাজ ভেড়ানোর সক্ষমতায় জিসিবি ৩৭% কনটেইনার হ্যান্ডলিং করছে। পিসিটি-তে যন্ত্রপাতি যোগ না হওয়ায় এখনো পুরোদমে কার্যক্রম শুরু হয়নি।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ২০২৪ সালে ৩২ লাখ ৭৫ হাজার একক (প্রতিটি ২০ ফুট দীর্ঘ হিসাবে) কন্টেইনার উঠানামা করেছে ও ১২ কোটি টন বাল্ক পণ্য হ্যান্ডেল করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি ও সিসিটির যে সক্ষমতা, সেটি ইতোমধ্যেই পূর্ণ হয়ে গেছে। এনসিটিতে বছরে ১১ লাখ একক কন্টেইনার উঠানামার সক্ষমতা আছে। এখন হচ্ছে পৌনে ১৩ লাখ একক।

বন্দর সম্প্রসারণের বিষয়টি মাথায় রেখে ও বেশি ড্রাফটের বড় জাহাজ (মাদার ভ্যাসেল) ভেড়ানোর লক্ষ্যে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত এলাকায় ‘বে-টার্মিনাল’ প্রকল্প করার কাজ ২০১৪ সালে হাতে নেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। হালিশহরের উপকূলীয় এলাকার ৯৩৯ একর ভূমিসহ সাগর ভরাট করে গড়ে তোলা প্রায় আড়াই হাজার একর জমিতে বে টার্মিনাল গড়ে তোলার মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী ১ হাজার ২২৫ মিটার দীর্ঘ ২টি কনটেইনার টার্মিনাল, ১ হাজার ৫০০ মিটার দীর্ঘ ১টি মাল্টিপারপাস টার্মিনালসহ মোট ৪টি টার্মিনাল তৈরির কথা রয়েছে। যেখানে ১২ মিটার ড্রাফটের (জাহাজের পানির নিচের অংশের গভীরতা) এবং ৩০০ মিটার দৈর্ঘ্যের জাহাজ ভেড়ানো সম্ভব হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্প হলো লালদিয়া বহুমুখী টার্মিনাল। চট্টগ্রাম বন্দরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, লালদিয়ার চর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা। বহির্নোঙরের কাছাকাছি এবং কোনো বাঁক না থাকায় এই স্থানটি বন্দরের বিদ্যমান জেটিগুলোর তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর একটি টার্মিনাল হবে। চট্টগ্রাম বন্দরের মূল জেটি থেকে ভাটির দিকে নির্মিত পিসিটিতে ইতোমধ্যে ১০ মিটার ড্রাফট এবং ২০০ মিটার লম্বা জাহাজ ভিড়ানো সম্ভব হয়েছে। লালদিয়া টার্মিনালেও একই আকৃতির জাহাজ ভিড়ানো যাবে।

প্রস্তাবিত বে টার্মিনাল প্রকল্পের প্রথম দুটি টার্মিনাল নির্মাণে প্রতিটির জন্য ১৫০ কোটি ডলার করে মোট ৩শ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে সিঙ্গাপুরের পিএসএ ইন্টারন্যাশনাল (সিঙ্গাপুর পোর্ট) এবং আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ড বা দুবাই পোর্ট। এছাড়া আবুধাবি পোর্টস ১০০ কোটি ডলার বিনিয়োগে চট্টগ্রাম বন্দরের সাথে যৌথভাবে মাল্টিপারপাস টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে।

এছাড়া প্রস্তাবিত লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার চুক্তির আলোচনা হচ্ছে ডেনমার্কের এপি-মুলার মায়েরস্কের সঙ্গে। তারা ৮০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে এই টার্মিনাল নির্মাণ করবে। পিপিপি চুক্তির আওতায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই বিনিয়োগ করে নতুন টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনা করবে। এই ‘বিল্ড, অপারেট এণ্ড ট্রান্সফার’ (বিওটি) মডেলে নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে টার্মিনালটি হস্তান্তর করবে চট্টগ্রাম বন্দরকে। কন্টেইনার প্রতি নির্দিষ্ট অর্থ তারা বন্দরকে দেবে।

ইতোমধ্যে বন্দরের প্রকল্পে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের জন্য ট্রানজেকশন অ্যাডভাইজার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বিশ্ব ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আইএফসিকে। তারা কি কি শর্তে টার্মিনালগুলো বিদেশি অপারেটরকে দেওয়া যায় তা নিয়ে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ এবং প্রয়োজনীয় গবেষণা করে রিপোর্ট প্রদান করবে।

এদিকে, চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে আয়বর্ধক ও বড় টার্মিনাল নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল-এনসিটিও পরিচালনার জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) ডিপি ওয়ার্ল্ড প্রস্তাব দিয়েছে। গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই এই নিয়ে উদ্যোগ শুরু হয়েছিল, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও বিদেশি অপারেটর দিয়ে এনসিটি পরিচালনার বিষয়টি ইতিবাচক ভাবে দেখছে।

তবে এনসিটির বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি। ২৪ এপ্রিল ২০২৫ সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান লিখিত বক্তব্যে বলেন, নিউমুরিং টার্মিনালটি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ টার্মিনাল। এ টার্মিনালটি পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটর নিয়োগের বিষয়টি চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য লাভজনক হবে কি না এবং বাংলাদেশের বন্দর পরিচালনার জন্য দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে কি না, তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে পিপিপি কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় জানিয়েছে, এ নিয়ে একটি সমীক্ষা এখন চলছে। “নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনালটি পিপিপি পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের বিষয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কাজ চলমান রয়েছে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় প্রাপ্ত সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে,” লিখিত জবাবে সংস্থাটি জানিয়েছে।

নির্মাণ ও যন্ত্রপাতিসহ সব মিলিয়ে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে (এনসিটি) চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ফলে বড় বিনিয়োগ হয়ে যাওয়ার পর চালু এ টার্মিনাল বিদেশী কোম্পানির হাতে ছেড়ে দেয়ার উদ্যোগ নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। অবশ্য বর্তমানে টার্মিনালটি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আছে একটি দেশী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।

সমালোচকরা বলছেন, মূলত কোনো বন্দরে বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে আনা হয় দুটো কারণে। এর একটি হলো বিনিয়োগ পাওয়া, আর অন্যটি হলো দক্ষতা বৃদ্ধি।
কিন্তু নিউমুরিং টার্মিনালে নতুন করে বিনিয়োগের সুযোগ তেমন নেই, পাশেই নৌঘাঁটি থাকায় এটি সম্প্রসারণেরও সুযোগ নেই। তারা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি টার্মিনাল পরিচালনায় বিদেশি অপারেটর এলে বন্দরের রাজস্বের সিংহভাগ চলে যাবে বিদেশে। এছাড়া বিদেশি অপারেটর এলে এনসিটির পণ্য ওঠানামার খরচ বাড়বে বলে মনে করেন তারা।

বে টার্মিনাল ও লালদিয়ার চরে প্রস্তাবিত নতুন টার্মিনালের কাজ বিদেশিদের দেয়া নিয়ে কেউ আপত্তি করছে না। এর কারণ হলো সেখানে জেটি নির্মাণ, ইকুইপমেন্ট ক্রয়সহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ ও সুপার স্ট্রাকচার আনার সুযোগ আছে। একই কারণে পতেঙ্গা টার্মিনালের দায়িত্ব সৌদি প্রতিষ্ঠানকে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও কোনো কথা ওঠেনি।

অন্যদিকে বলা হচ্ছে, বন্দর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অভিজ্ঞ ও দক্ষ বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দেয়া এখন বৈশ্বিক ট্রেন্ড বা প্রবণতা। পাবলিক–প্রাইভেট পার্টনারশিপ পৃথিবীব্যাপী স্বীকৃত একটি পদ্ধতি। বিদেশী অপারেটররা সারা বিশ্বে বিভিন্ন বন্দরে কার্যক্রম পরিচালনা করে। এপি মোলার ৩৬টি দেশে ৬৫টি পোর্ট পরিচালনা করে, ডিপি ওয়ার্ল্ড ১৫০টি ইউনিটে কাজ করে, আর পোর্ট অফ সিঙ্গাপুর অথোরিটি ৪৫টি দেশে ৭৩টি টার্মিনাল পরিচালনা করে।

বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ে ৪গুণ বড় প্রস্তাবিত বে টার্মিনাল বিদেশি বিনিয়োগ ছাড়া নির্মাণ বা পরিচালনা করার মতো অবস্থা বন্দরের নেই। অথচ টার্মিনালটি দ্রুত নির্মিত হওয়া জরুরি। আমদানি–রপ্তানি বাণিজ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বিদ্যমান বন্দর আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশের চাহিদা পূরণ করার সক্ষমতা হারাবে। তার আগে যদি বে টার্মিনাল অপারেশনে না আসে তাহলে চড়া মূল্য দিতে হবে। একটি বিষয়ে সবাই প্রায় একমত, তা হচ্ছে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকা দরকার।দেশের স্বার্থ নিয়ে দর-কষাকষির ব্যাপারে যোগ্যতা ও আন্তরিকতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

স্নেক গডেসের সাম্রাজ্য – মিনোয়ান সভ্যতা

ইতিহাসের অতল গহ্বরে লুকিয়ে থাকা এক বিস্ময়কর সভ্যতা মিনোয়ান সভ্যতা, যার অস্তিত্ব খ্রিস্টপূর্ব ২৭০০ থেকে ১৪৫০ অবধি গ্রিসের ক্রিট দ্বীপে বিস্তৃত ছিল। আধুনিক ইউরোপীয় ইতিহাসচর্চায় এটি প্রায়শই উপেক্ষিত হলেও, মিনোয়ানরা একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ, সাংস্কৃতিকভাবে বিকশিত এবং বিষ্ময়করভাবে নারীকেন্দ্রিক সমাজের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সভ্যতা শুধু প্রাসাদের জটিল নকশা বা শিল্পকলার জন্য নয়, বরং তাদের ধর্ম, নারী ভূমিকা, সমাজব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক দর্শনের জন্য আজও গবেষকদের কৌতূহলের উৎস।

মিনোয়ান ধর্মবিশ্বাস ছিল মূলত মাতৃকেন্দ্রিক। তাদের ধর্মীয় চর্চায় নারী ছিল কেন্দ্রীয় চরিত্র। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে পাওয়া বিভিন্ন ছোট-বড় মূর্তি ও শিল্পকর্মে দেখা যায়—তারা নারী দেবীকে কেন্দ্র করে পূজাচর্চা করত। বিশেষত স্নেক গডেস বা সাপধারী দেবীর মূর্তি একদিকে মাতৃত্ব ও উর্বরতার প্রতীক, অন্যদিকে শক্তি ও রহস্যময়তার প্রতিনিধিত্ব করে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানেও নারীর ভূমিকা ছিল প্রভাবশালী। পুরোহিত, আচারানুষ্ঠানের নেত্রী, এমনকি উৎসবের প্রতীক হিসেবে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এই দিক থেকে বোঝা যায় মিনোয়ান সমাজে নারী শুধুমাত্র লিঙ্গ নয়, বরং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ক্ষমতার ধারক।

ক্রিট দ্বীপে অবস্থিত Knossos রাজপ্রাসাদ মিনোয়ান সভ্যতার অনন্য নিদর্শন। এটি ছিল জটিল গঠনের, বহু কক্ষবিশিষ্ট, অলিন্দ ও অভ্যন্তরীণ অঙ্গন ঘেরা এক বিস্ময়কর স্থাপত্য। শুধু রাজপরিবার নয়, ছিল প্রশাসনিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। এই প্রাসাদে নেই প্রতিরক্ষা প্রাচীর, নেই যুদ্ধের চিহ্ন। আছে নান্দনিক দেয়ালচিত্র, খোলা ছাদ, সুন্দর পাথর-কাটা সিঁড়ি। মিনোয়ানদের স্থাপত্যশৈলী সহাবস্থান, শৃঙ্খলা ও পরিবেশবান্ধব নকশার প্রতিফলন বহন করে। এ থেকে বোঝা যায়, তারা ছিল এক শান্তিপ্রবণ, সুশৃঙ্খল ও রুচিশীল সমাজ।

মিনোয়ান সমাজ ছিল মাতৃতান্ত্রিক প্রভাবসম্পন্ন, যেখানে নারীরা রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক জগতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। নারীদের পোশাক, সাজসজ্জা ও চিত্রকলায় তাদের মর্যাদা স্পষ্ট। প্রাচীন গ্রীক লেখকগণ মিনোয়ানদের রীতিনীতি দেখে বিস্মিত হয়ে তাদের “রমণীময় সভ্যতা” বলেছিলেন। পুরুষরাও এ সমাজে উপেক্ষিত ছিলেন না। বরং ধর্মীয় অনুষ্ঠানে, উৎসবে বা খেলাধুলায় নারী-পুরুষ সমভাবে অংশগ্রহণ করতেন। এই সভ্যতা ছিল লিঙ্গসমতার এক প্রাচীন উদাহরণ।

মিনোয়ানদের অর্থনীতি গড়ে উঠেছিল কৃষিকাজ, মৎস্য শিকার ও সামুদ্রিক বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে। তারা ছিল দক্ষ নাবিক এবং ব্যবসায়ী। ক্রিট দ্বীপ থেকে সিরিয়া, মিশর, আনাতোলিয়া (আধুনিক তুরস্ক) পর্যন্ত তাদের বাণিজ্য নেটওয়ার্ক বিস্তৃত ছিল। তারা রপ্তানি করত অলিভ তেল, মৃৎপাত্র, ধাতব সামগ্রী ও কাপড়। মিনোয়ানদের উন্মুক্ত, শান্তিপূর্ণ বাণিজ্যিক নীতি তাদের সভ্যতাকে অর্থনৈতিকভাবে সুসংগঠিত করে তুলেছিল।

মিনোয়ান সভ্যতার অন্যতম আকর্ষণ তাদের লিপি—Linear A। এটি এখনো সম্পূর্ণরূপে পাঠোদ্ধার হয়নি। এই লিপি আজও ইতিহাসবিদ ও ভাষাবিজ্ঞানীদের কাছে একটি রহস্য হয়ে আছে । এটি মূলত প্রশাসনিক ও ধর্মীয় কাজে ব্যবহৃত হতো বলে ধারণা করা হয়। Linear A’র রহস্য উদঘাটন হলে হয়তো মিনোয়ানদের বিশ্বাস, রাজনীতি এবং দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানে বিপ্লব ঘটবে।

মিনোয়ান শিল্পকলায় ধর্ম, উৎসব ও প্রকৃতির এক আশ্চর্য সমন্বয় দেখা যায়। দেয়ালচিত্রে ফুটে ওঠে—ডলফিন, ফুল, নারী-পুরুষের নৃত্য, ষাঁড়-নাচ (Bull-leaping)। এই শিল্পে নেই যুদ্ধের দৃশ্য, নেই সহিংসতা—বরং আছে আনন্দ, জীবন, শরীরের নান্দনিকতা। ষাঁড়কে তারা পূজিত করত শক্তির প্রতীক হিসেবে, তবে পুরুষতান্ত্রিক নয়, এটি ছিল দেবীমাতার এক সহচর প্রতীক।

মিনোয়ান সভ্যতার পতন এক রহস্য। খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ১৪৫০ সালে হঠাৎ করেই তাদের বিস্তৃতি থেমে যায়। একটি তত্ত্ব বলে সান্তোরিনি আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত এক বিশাল সুনামি সৃষ্টি করে, যা তাদের সমাজকে ধ্বংস করে। অন্যরা মনে করেন মাইসেনীয় গ্রীকদের আগ্রাসনই মিনোয়ানদের পতনের মূল কারণ। তবে আরও একটি তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা হল তাদের শান্তিপূর্ণ, প্রতিরক্ষা-হীন সমাজ কাঠামোই তাদের দুর্বল করে তোলে।

মিনোয়ান সভ্যতা সরাসরি ধ্বংস হলেও, তাদের প্রভাব পরবর্তী মাইসেনীয় ও প্রাচীন গ্রিক সংস্কৃতিতে প্রবাহিত হয়। মন্দির নকশা, দেবীমাতার উপাসনা, বাণিজ্যপদ্ধতি ও কাহিনিচিত্রে মিনোয়ান ছাপ রয়ে গেছে। আধুনিক নারীবাদী, সাংস্কৃতিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে মিনোয়ান সভ্যতা আজও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। একে অনেকে ইউরোপের প্রথম নারীবান্ধব সভ্যতা হিসেবে গণ্য করেন।

মিনোয়ান সভ্যতা কেবল প্রাচীন ইউরোপের এক নিদর্শন নয়, বরং একটি বিকল্প ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতীক। যেখানে নারীত্ব, শান্তি, নান্দনিকতা এবং সহাবস্থানের মধ্যে সভ্যতার প্রকৃত সৌন্দর্য খুঁজে পাওয়া যায়। ইতিহাসের সাধারণত রাজা, যুদ্ধ ও পিতৃতন্ত্রের গল্প বললেও, মিনোয়ান সভ্যতা প্রমাণ করে সভ্যতা গড়ে ওঠে নারী নেতৃত্বেও, শক্তির উৎস হতে পারে কোমলতাও। এই অনুচ্চারিত ইতিহাস আজও আমাদের নতুন করে ভাবায়, আমরা কোন সমাজের উত্তরসূরি হতে চাই?

বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র আন্দোলন , তুরস্কের পিকেকে হঠাৎ অস্ত্র ত্যাগ করছে কেন : সিনান উলগেন , ইস্তাম্বুলভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইডামের পরিচালক

” … তুরস্ক সরকারের বিরুদ্ধে প্রথম হামলার প্রায় ৪ দশক পর কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি (পিকেকে) তাদের সংগঠন ভেঙে দেওয়ার এবং অস্ত্র পরিত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে শুধু তুরস্ক নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোচড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে আবদুল্লাহ ওজালানের নেতৃত্বে পিকেকে প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি এখন কারাগারে রয়েছেন। সংগঠনটি শুরু থেকেই একটি স্বাধীন কুর্দি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছিল। পাশাপাশি তুরস্কে বসবাসকারী কুর্দিদের রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করাও তাদের উদ্দেশ্যের অংশ ছিল।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের কিছু অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি পিকেকের নেতাদের সহিংসতা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। প্রথমে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে তাকানো যাক।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান ইতিমধ্যেই দুটি মেয়াদ শেষ করেছেন এবং তিনি তৃতীয় মেয়াদের জন্য নির্বাচনে অংশ নিতে চান। এ জন্য তাঁকে তুরস্কের সংবিধান সংশোধন করতে হবে অথবা পার্লামেন্টকে আগাম নির্বাচনের জন্য রাজি করাতে হবে। এই দুটি পথেই তাঁর সরকারের অতিরিক্ত রাজনৈতিক সমর্থন দরকার।

এই সমর্থন বর্তমান ক্ষমতাসীন জোট—জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি) এবং কট্টর জাতীয়তাবাদী দল ন্যাশনালিস্ট মুভমেন্ট পার্টি (এমএইচপি) দিতে পারছে না। সমর্থনের এই ঘাটতি পূরণ করতে পারে তুরস্কের তৃতীয় বৃহত্তম দল পিপলস ইকুয়ালিটি অ্যান্ড ডেমোক্রেসি পার্টি (ডিইএম)। দলটি কুর্দিপন্থী।

আন্তর্জাতিক পটভূমিও পিকেকের এই আত্মবিলুপ্তির সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রেখেছে।…আসাদ সরকারকে উৎখাত করে সিরিয়ায় এখন যে নতুন সরকার এসেছে, তারা পিকেকের প্রতি আসাদের মতো সহানুভূতিশীল নয়। পিকেকের ঘনিষ্ঠ সহযোগী যে সংগঠনগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র এত দিন মদদ দিয়ে এসেছে, তাদের কাছ থেকেও যুক্তরাষ্ট্র এখন ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। পিকেকের সহযোগী সংগঠনগুলো একসময় ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল।

… আরেকটি বিষয়, যেটি খুব একটা আলোচিত হয় না; কিন্তু পিকেকের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে, সেটি হলো তুরস্কের সীমান্ত নিরাপত্তা বাড়ানোর লক্ষ্যে ড্রোনপ্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার। বিশেষ করে, এই ড্রোন দিয়ে তুরস্ক পিকেকের শীর্ষ নেতাদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে, এমনকি ইরাকের গভীর অঞ্চলেও।

এর ফলে পিকেকের সামরিক ও কৌশলগত কার্যক্ষমতা অনেকটাই দুর্বল হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতি হয়তো তাদের বাধ্য করেছে পুরো বিদ্রোহী আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে চিন্তা করতে। এসব কারণ মিলিয়ে তুরস্কের জন্য একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে, যার মাধ্যমে সহিংসতার পথ ছাড়াই কুর্দি সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান করা যেতে পারে।

তবে অস্ত্রের যুগ থেকে শান্তি ও সংহতির যুগে সফলভাবে প্রবেশ করতে হলে এরদোয়ানের সরকারকে…তুরস্কের গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। এই প্রচেষ্টা শুধু তুরস্কের জন্য নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে পারে। এটি দেখাতে পারে যে — রাজনৈতিক বিদ্রোহ বা সহিংসতা বন্ধ হলে তা দীর্ঘস্থায়ী ও অংশগ্রহণমূলক শান্তির পথ তৈরি করতে পারে। “

বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাক কম দামে কিনে , কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি

বিশ্বব্যাপী ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশি পোশাক ৩ ডলারে কিনে তা বিক্রি করছে ৩ থেকে ৪ গুণ বেশি দামে। তারপরও তারা পণ্যের দাম কমাতে কারখানাগুলোকে ক্রমাগত চাপ দিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে ৫ ডলার দামের একটি শার্ট ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকায় অন্তত ২৮ ডলারে বিক্রি হয়। জাহাজীকরণ, গুদাম, শুল্ক ও অন্যান্য পরিচালন খরচ যোগ করলে তা ১৬ ডলার হয়। বিদেশি খুচরা বিক্রেতারা শার্টপ্রতি প্রায় ১২ ডলার মুনাফা করতে পারে।

বাংলাদেশে উৎপাদিত জ্যাকেট ও আউটারওয়্যার বিদেশি ব্র্যান্ডগুলোর কাছে বিক্রি হয় ২০ থেকে ২৫ ডলারে। পরে তারা তা খুচরা ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করেন ১০০ থেকে ১১০ ডলারে।

পশ্চিমের খুচরা বিক্রেতা ও ব্র্যান্ডগুলো প্রায়শই জাহাজের খরচ, গুদাম খরচ, ক্ষতিপূরণ ও বিজ্ঞাপনসহ অন্যান্য খরচের কথা বলে পণ্যের দাম কমানোর বিষয়ে তাদের দাবিকে যৌক্তিক করার চেষ্টা করেন।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) তথ্য বলছে, একই ধরনের পণ্যের জন্য এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ সব সময়ই কম দাম পায়। ২০২২ সালে ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড সেন্টারের (আইটিসি) এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পোশাকের দাম কমানোর বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি করা পুরুষদের প্রতি পিস ট্রাউজারের দাম ৭ ডলার শূন্য এক সেন্ট। বৈশ্বিক গড় দাম ৭ ডলার ৭২ সেন্টের তুলনায় তা ৯ দশমিক ২ শতাংশ কম। একই পণ্যে ভিয়েতনাম পেয়েছিল ১০ ডলার ৭৬ সেন্ট এবং শ্রীলঙ্কা ও ভারত পেয়েছিল ৮ ডলার ৪১ সেন্ট।

মাত্র দুটি বাংলাদেশি পণ্য—নারীদের সুতির ট্রাউজার ও পুরুষদের সুতির টি-শার্ট বৈশ্বিক গড় দামের তুলনায় সামান্য বেশি দামে বিক্রি হয়েছিল।সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে পণ্যের মানের উন্নতি হলেও দর কষাকষির দক্ষতা কম।

বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মধ্যস্থতাকারী বা তৃতীয় পক্ষ পরিচালন করে। পণ্য দোকানে পৌঁছার আগেই তারা তাদের ভাগ নিয়ে নেয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইউরোপীয় খুচরা বিক্রেতা জানান, পোশাক সরবরাহ ব্যবস্থায় একজন ইউরোপীয় খুচরা বিক্রেতাকে পণ্য রাখার জন্য বড় গুদাম ভাড়া নিতে হয়। তা অনেক ব্যয়বহুল। খুচরা বিক্রেতা ও ব্র্যান্ডগুলো একটি চালানের সর্বাধিক ৭০ শতাংশ পণ্য বিক্রি করতে পারে। শেষ পর্যন্ত, ইউরোপীয় খুচরা বিক্রেতারা বার্ষিক ১০ শতাংশেরও কম মুনাফা করে।

আইটিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—ডিজাইন, লজিস্টিকস ও ব্র্যান্ডিংয়ের সঙ্গে জড়িত পোশাক উৎপাদন ব্যবস্থা আরও জটিল হয়ে উঠেছে। তবে বাংলাদেশের মতো যেসব দেশ শুধু কাপড় কাটে ও সেলাই করে সেসব দেশগুলো কম দাম পায়।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বাংলাদেশের মতো একই এইচএস কোড শেয়ার করলেও চীন ও ভিয়েতনাম কাপড়ের বৈচিত্র্যময় উদ্ভাবনী ডিজাইনের কারণে তাদের পোশাকের বেশি দাম পাচ্ছে।’

তার মতে, বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি মাত্র ৫ বা ৬টি পণ্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এটি বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৭০ শতাংশ। এর ফলে অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। এ কারণে এ দেশের রপ্তানিকারকদের পণ্যের দাম কমাতে হয়।

তার মতে, তুলার ওপর পোশাক শিল্পের অতিমাত্রায় নির্ভরতা ও কৃত্রিম সুতার সীমিত ব্যবহারও পণ্যের ভালো দাম না পাওয়ার কারণ। সিপিডি গবেষণা পরিচালক আরও বলেন, ‘আরও বেশি বিদেশি বিনিয়োগ আনা কার্যকর সমাধান হতে পারে। কারণ বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত দামি ক্রেতা ও উন্নত প্রযুক্তির সুবিধা পান।’

নিয়ম ভাঙার ধর্ম – ক্যাওস ম্যাজিক ও আধুনিক জাদু

প্রথাগত যেকোনো ধর্ম বা ম্যাজিক সিস্টেম যেখানে সুনির্দিষ্ট নিয়ম, দেবতা বা তান্ত্রিক কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল, সেখানে ক্যাওস ম্যাজিক এক সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী বাস্তবতা। এটি এমন এক ম্যাজিকাল দর্শন যেখানে বিশ্বাস নিজেই স্থায়ী নয়, পরিবর্তনশীল এবং ইচ্ছামতো ব্যবহারযোগ্য।যেকোনো পূর্বনির্ধারিত সত্য বা ঈশ্বরত্বকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায় বলে একে অনেক সময় বলা হয় “postmodern magic” ।

ক্যাওস ম্যাজিকের সূচনা হয় বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে, ১৯৭০–৮০ দশকে যুক্তরাজ্যে। তবে এর শিকড় খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হয় Austin Osman Spare-এর (১৮৮৬–১৯৫৬) কাছে—একজন ব্রিটিশ শিল্পী ও গোপন তান্ত্রিক চিন্তাবিদ যাঁর কাজ ক্যাওস ম্যাজিকের ভিত্তি রচনা করে।

Spare লন্ডনের দরিদ্র অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন এবং অল্প বয়সেই Royal College of Art-এ পড়াকালীন ম্যাজিক ও চিত্রশিল্পে তাঁর মৌলিক দর্শনের বিকাশ ঘটে। কিছুদিন তিনি Aleister Crowley-এর Thelemic Order-এ যুক্ত থাকলেও খুব শিগগিরই এর জটিল ধর্মীয় কাঠামো থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে আনেন। তাঁর চোখে ম্যাজিক ছিল একান্তই ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও অবচেতনার গভীরে ডুবে থাকার এক উপায়।

Spare-এর মূল দর্শন ছিল, “The Self is the ultimate temple.” তাঁর মতে, মানুষ নিজের অবচেতনকে ব্যবহার করেই বাস্তবতার গঠন প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করতে পারে। এই দর্শন থেকে জন্ম নেয় Sigil Magic—Spare-এর এক অনন্য আবিষ্কার, যা ক্যাওস ম্যাজিকেরই প্রাণ।

Sigil বা সিগিল হলো একটি ইচ্ছা বা কামনার প্রতীকীকরণ, যা অবচেতন মনে সঞ্চালিত হয়ে বাস্তবতায় রূপ নিতে পারে। এটা কোনো প্রথাগত মন্ত্র নয় বরং, নিজেরই তৈরি করা একটি চিহ্ন, যাতে কোনো দেবতা বা বাহ্যিক শক্তির প্রয়োজন পড়ে না। Spare বিশ্বাস করতেন অবচেতন মনই আসল ঈশ্বর এবং সেই মনকে নিয়ন্ত্রণে আনাই সত্যিকারের ম্যাজিক।

এই তত্ত্বকে ভিত্তি করে ১৯৭০-এর দশকে Peter J. Carroll ও Ray Sherwin ক্যাওস ম্যাজিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। Carroll-এর লেখা “Liber Null & Psychonaut” এই আন্দোলনের মূল টেক্সট হয়ে ওঠে। তাতে বলা হয় “Belief is a tool.” অর্থাৎ বিশ্বাসকে সত্য মনে করতে হবে না, শুধু ব্যবহার করতে হবে।

ক্যাওস ম্যাজিকের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো এতে নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম নেই। চর্চাকারী নিজের ম্যাজিক নিজেই তৈরি করে। কেউ চাইলে নর্স মাইথলজি, ভুডু, থেলেমা, এমনকি হিন্দু দেবতাদেরও একত্রে ব্যবহার করতে পারে। এখানে মূল কথা হলো—ম্যাজিক কাজ করুক, বাস্তবতায় প্রতিফলিত হোক।

ব্যবহারিকভাবে চর্চাকারীরা সিগিল ম্যাজিক, অটোমেটিক রাইটিং, ট্রান্স অবস্থা, ধ্যান এবং কাল্পনিক দেবতা বা “servitor” নির্মাণের মাধ্যমে বাস্তবতা প্রভাবিত করতে চেষ্টা করে। অনেকে ‘gnosis’ বা গভীর অন্তর্জাগরণের মুহূর্তে তাদের ম্যাজিকাল ইচ্ছা অবচেতনে স্থাপন করে।

একজন ক্যাওস ম্যাজিশিয়ানের কাছে সত্য মানে সেই বিশ্বাস যা সে বর্তমানে গ্রহণ করেছে। আজ সে “Set” নামের মিশরীয় দেবতার সহায়তায় ম্যাজিক করছে, কাল সে টুলপা বা সম্পূর্ণ কাল্পনিক সত্তার মাধ্যমে ইচ্ছাপূরণ করছে। এই বহুমাত্রিক বিশ্বাসব্যবস্থা একদিকে যেমন বিশৃঙ্খলার, অন্যদিকে একে অনেকে দেখে আধুনিক মানসিক নমনীয়তার প্রতীক হিসেবে।

ক্যাওস ম্যাজিক শুধু জাদুবিদ্যা নয়, একধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক প্রতিনির্মাণও। আধুনিক মনোবিজ্ঞান, বিশেষ করে Freud ও Jung-এর অবচেতন মন বিষয়ক তত্ত্বগুলোর সঙ্গে এর গভীর মিল রয়েছে। Sigil-তত্ত্ব কার্যত ‘subliminal programming’-এর একটি রূপ। এমনকি অনেক সমসাময়িক ক্যাওস ম্যাজিশিয়ান বিশ্বাস করেন, এটি একধরনের applied psychology—যেখানে মনকে কৌশলে প্রোগ্রাম করে বাস্তব পরিবর্তন ঘটানো হয়।

ঐতিহ্যবাহী ম্যাজিক যেমন Wicca, Golden Dawn, বা থেলেমা একাধিক স্তরের দীক্ষা, প্রার্থনা, দেবতা বা চক্র-ভিত্তিক পদ্ধতির উপর নির্ভরশীল। ক্যাওস ম্যাজিক সেই কাঠামোকে ভেঙে দেয়। এখানে না আছে কোনো দীক্ষা, না আছে কোনো কর্তৃপক্ষ। ক্যাওস ম্যাজিশিয়ান নিজেই তার ম্যাজিক, তার ধর্ম, এবং তার ঈশ্বর। কেউ চাইলে পাঁচ মিনিটের জন্য একটা দেবতার অস্তিত্বে বিশ্বাস করে সেটিকে ব্যবহার করতে পারে, আবার পরক্ষণেই তাকে পরিত্যাগ করে নতুন এক ধারণা গ্রহণ করতে পারে।

অনেকে ক্যাওস ম্যাজিককে সন্দেহের চোখে দেখে। তাদের মতে এটি আসলে ম্যাজিক নয়, বরং একধরনের আত্ম-প্রবঞ্চনা বা wishful thinking। অন্যদিকে কিছু মনোবিজ্ঞানী এটিকে দেখে Creative Visualization বা Cognitive Programming-এর মতোই একটি মানসিক উপায় হিসেবে, যা আত্মবিশ্বাস, দৃষ্টিভঙ্গি ও মনঃসংযোগ বাড়াতে সহায়ক।

তবে ক্যাওস ম্যাজিক চর্চাকারীদের জন্য এটি বাস্তবেরই বিকল্প নির্মাণ। বাস্তবতা, অস্তিত্ব ও ইচ্ছার গঠনপদ্ধতি এখানে নিরন্তর প্রশ্নবিদ্ধ হয়। যেখানে ম্যাজিক মানে অলৌকিকতা নয়, বরং মন ও জগৎকে পুনর্নির্মাণের সাহস।