Home Blog Page 96

শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা বাড়াতে , সাহায্য করে যেসব খাবার –

শরীরের প্রতিটি কোষকে সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখতে দরকার পর্যাপ্ত অক্সিজেন। অক্সিজেন শুধু নিঃশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করলেই যথেষ্ট নয়; আমাদের রক্তপ্রবাহ, কোষের কার্যকারিতা এবং ইমিউন সিস্টেম ঠিকভাবে কাজ করতে, শরীরের ভেতরেও অক্সিজেনের পর্যাপ্ত মাত্রা বজায় রাখা জরুরি। এই অক্সিজেন সরবরাহে সাহায্য করতে পারে কিছু নির্দিষ্ট প্রাকৃতিক খাবার, যেগুলো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন ও গুরুত্বপূর্ণ এনজাইমে পরিপূর্ণ।

রসুন, খেজুর, কলা ও গাজর অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ খাবার হিসেবে পরিচিত, যেগুলো শরীরের কোষগুলোকে সজীব রাখে এবং রক্তে অক্সিজেনের ঘনমাত্রা বাড়াতে সহায়তা করে। কিন্তু এই তালিকায় আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাবার আছে যেগুলো নিয়মিত গ্রহণ করলে শরীরের অভ্যন্তরীণ অক্সিজেনের মাত্রা দৃশ্যমানভাবে বাড়ে।

প্রথমেই বলা যায় লেবুর কথা। লেবু কেবল ভিটামিন সি নয়, বরং লিভারকে বিষমুক্ত করতে এবং দেহ থেকে বর্জ্য পদার্থ দূর করতেও কার্যকর। প্রতিদিন সকালে খালি পেটে এক গ্লাস উষ্ণ লেবু পানি পান করলে শরীরের অক্সিজেন গ্রহণক্ষমতা বাড়ে, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা জোরদার হয় এবং হজমক্রিয়া উন্নত হয়।

হলুদ একটি চমৎকার প্রাকৃতিক উপাদান যা শরীরে নাইট্রিক অক্সাইড উৎপাদনে সাহায্য করে। নাইট্রিক অক্সাইড রক্তনালিকে প্রশস্ত করে, ফলে রক্তপ্রবাহ বাড়ে এবং কোষগুলোতে বেশি পরিমাণ অক্সিজেন পৌঁছাতে পারে। এটি শরীরের প্রতিরোধক্ষমতাও বাড়ায়।

পালংশাকসহ সবুজ পাতাযুক্ত শাকসবজি নাইট্রেটের প্রাকৃতিক উৎস। এই নাইট্রেট শরীরে রূপান্তরিত হয়ে নাইট্রিক অক্সাইডে পরিণত হয়, যা ধমনি প্রসারিত করে ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে। এর ফলে শরীরের সর্বত্র অক্সিজেন সহজেই পৌঁছাতে পারে। আঙুর বিশেষত গাঢ় বেগুনি রঙের আঙুরে রয়েছে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা রক্ত সঞ্চালনের মান উন্নত করে। এটি হরমোন ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে এমন এনজাইমও সরবরাহ করে, ফলে শরীরে শক্তি ও অক্সিজেন সরবরাহ বেড়ে যায়।

অ্যাভোকাডো এমন একটি ফল যাতে রয়েছে ভিটামিন এ, বি৩, বি৬, বি১২, কোলিন, ফোলেট ও স্বাস্থ্যকর চর্বি। এই উপাদানগুলো কেবল অক্সিজেন সরবরাহ নয়, বরং কোলেস্টেরল কমানো, হৃদযন্ত্রের কার্যকারিতা উন্নত করা এবং ডিএনএ সুরক্ষার ক্ষেত্রেও কার্যকর। অ্যাভোকাডো সালাদ বা স্মুদি হিসেবে খাওয়া যায়।

সবশেষে বাদাম—যেমন আমন্ড, কাজু, আখরোট ইত্যাদি অত্যন্ত কার্যকর প্রাকৃতিক শক্তির উৎস। এগুলো রক্তনালির স্বাস্থ্য রক্ষা করে এবং সঠিক রক্তপ্রবাহ নিশ্চিত করে, ফলে কোষে অক্সিজেন সরবরাহ উন্নত হয়। এই প্রাকৃতিক খাবারগুলোকে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হলে শরীরের ভেতরের অক্সিজেন ঘাটতি সহজেই দূর করা সম্ভব। ভালো শ্বাসপ্রশ্বাস ও স্বাস্থ্যকর কোষ মানেই শক্তিশালী, সক্রিয় ও দীর্ঘমেয়াদি সুস্থ জীবন।

স্থলপথে বাংলাদেশি পণ্য আমদানি বন্ধ , ভারতের মিডিয়া কী বলছে ?

সব স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক-সহ অন্যান্য বহু পণ্যের আমদানি বন্ধে ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ভারতের বেশির ভাগ মূলধারার সংবাদমাধ্যম সেটিকে একটি ‘রেসিপ্রোকাল মুভ’ বা ‘পাল্টা পদক্ষেপ’ হিসেবেই বর্ণনা করছে।

তাদের দাবি, সম্প্রতি ঢাকা ভারতের রফতানিতে যেসব অশুল্ক বাধা (নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার) আরোপ করেছে, তার জবাবেই দিল্লির এই সিদ্ধান্ত – ভারত নিজে থেকে এটি নেয়নি।

বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই সব নিত্যনতুন কড়াকড়ি যে দুই দেশের মধ্যেকার কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্রমাবনতিরই প্রতিফলন, তা নিয়েও ভারতের প্রধান খবরের কাগজ বা টিভি চ্যানেলগুলোর মধ্যে কোনও দ্বিমত নেই।

ভারতীয় সংবাদপত্র ‘দ্য হিন্দু’-র খবরে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক চীন সফরে মুহাম্মদ ইউনূসের করা মন্তব্যের পটভূমিতে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারকে ‘একটি বার্তা দিতেই’ এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সরকারি সূত্রে পত্রিকাটিকে জানানো হয়েছে।

‘দ্য হিন্দু’কে সরকারের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেছেন, সম্প্রতি ভারত থেকে কটন ইয়ার্ন আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক কড়াকড়ি চালু করেছে – স্থলবন্দরগুলোতে এই সুবিধা বন্ধ করে দিয়ে শুধু সমুদ্রবন্দর দিয়ে আমদানি করতে দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, তা ছাড়া ভারতের পণ্যবাহী ট্রাকগুলোকে বাংলাদেশের দিকে ‘অ্যাগ্রেসিভ ইনস্পেকশন’ বা কড়া তল্লাসির মুখে পড়তে হচ্ছে বলেও দিল্লি লক্ষ্য করেছে। এর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবেই ভারত শনিবারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে ওই কর্মকর্তা দাবি করেন।

ভারতের প্রথম সারির চ্যানেল এনডিটিভি বলছে, ভারতের অ্যাপারেল বা তৈরি পোশাক রফতানিকারীরা বহুদিন ধরেই সরকারের কাছে আর্জি জানিয়ে আসছিলেন বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক আমদানির ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করা হোক।

প্রথমে তৃতীয় দেশে রফতানির জন্য ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল করে এবং তারপর স্থলবন্দর বন্ধ করে দিয়ে সরকার তাদের দাবিই কার্যত মেনে নিল বলে এনডিটিভি-র প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে। টেক্সটাইল খাতে ভারত ও বাংলাদেশকে পরস্পরের ‘বড় প্রতিদ্বন্দ্বী’ বলেও বর্ণনা করা হয়েছে।

চীনের মাটিতে দাঁড়িয়ে ‘সেভেন সিস্টার্স’ নিয়ে মুহাম্মদ ইউনূসের মন্তব্যও ভারত ভালভাবে নেয়নি, সে কথাও উল্লেখ করেছে এনডিটিভি। ভারতের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিক টাইমস অব ইন্ডিয়া এই সিদ্ধান্তকে ‘ব্লো টু বাংলাদেশ’ (বাংলাদেশের জন্য বড় আঘাত) বলে বর্ণনা করেছে।

দিল্লিতে একজন সরকারি কর্মকর্তা পত্রিকাটিকে বলেছেন, “দ্বিপাক্ষিক এনগেজমেন্টের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিজের সুবিধামতো ‘চেরি-পিক’ করবে (মানে শুধু নিজের পছন্দেরটা বেছে নেবে) কিংবা ভারতের বাজারে অ্যাকসেস পাওয়া যাবেই বলে ধরে নেবে – এটা মেনে নেওয়া যায় না।”

তবে ওই কর্মকর্তা এটাও জানিয়েছেন যে ভারত এই সব ইস্যু নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত – কিন্তু “পরিবেশে যাতে কোনও তিক্ততা না থাকে সেটা নিশ্চিত করা বাংলাদেশেরই দায়িত্ব।”

দ্য ইকোনমিক টাইমস পত্রিকা বাণিজ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘জিটিআরআই’-এর একটি রিপোর্ট উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, “ঢাকার ‘ডিপ্লোম্যাটিক পিভট’ বা কূটনৈতিক ভারসাম্য যে চীনের দিকে ঝুঁকছে – ভারতের এই সব বিধিনিষেধ তারই উত্তর বলে মনে করা যেতে পারে।”

ভারতের প্রথম সারির আর একটি দৈনিক দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস গত বছরের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের অপসারণের পর এই সিদ্ধান্তকে ঢাকার বিরুদ্ধে দিল্লির সবচেয়ে শক্তিশালী ‘পুশব্যাক’ (ধাক্কা)-গুলোর অন্যতম বলে বর্ণনা করেছে।

বেইজিং-এর মাটিতে দাঁড়িয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতকে মুহাম্মদ ইউনূসের ‘স্থলবেষ্টিত’ বলে বর্ণনা করার মাত্র মাসদেড়েকের মধ্যেই যে এই সিদ্ধান্ত এল, সেটাও মনে করিয়ে দিয়েছে ওই পত্রিকাটি। “চীনের অর্থনীতির সম্প্রসারণের পটভূমিতেই” যে অধ্যাপক ইউনূস ওই মন্তব্য করেছিলেন, সে কথাও তারা উল্লেখ করেছে।

রাশিয়া থেকে গ্যাস আমদানি , পুরোপুরি বন্ধ করতে চায় – ইউরোপ

ইউরোপীয় কমিশন আগামী মাসে এমন একটি প্রস্তাব আনতে চলেছে, যার লক্ষ্য ২০২৭ সালের মধ্যে ইইউভুক্ত দেশসমূহে রাশিয়া থেকে গ্যাস আমদানি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা এবং চলতি বছরের মধ্যেই মস্কোর সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি গ্যাস চুক্তিও নিষিদ্ধ করা।

রাশিয়ান প্রাকৃতিক গ্যাস ও তরলীকৃত গ্যাস (এলএনজি) নিষিদ্ধ করার সবচেয়ে সরল আইনি পথ হচ্ছে নিষেধাজ্ঞা। তবে এজন্য ইইউ-র ২৭টি সদস্য দেশের সর্বসম্মতির প্রয়োজন হওয়ায় এটি বাস্তবায়ন করাটা কঠিন।

হাঙ্গেরি ও স্লোভাকিয়া, যারা রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, তারা গ্যাস নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাবটি আটকে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই দুই দেশ টার্কস্ট্রিম পাইপলাইন দিয়ে রাশিয়ান গ্যাস আমদানি করে এবং তাদের মতে, বিকল্প ব্যবস্থায় গেলে জ্বালানি খরচ বেড়ে যাবে।

ইইউ কূটনীতিকদের মতে, সম্প্রতি এক গোপন বৈঠকে হাঙ্গেরি ও স্লোভাকিয়া বাদে ইইউভুক্ত সব দেশ রাশিয়ান গ্যাস নিষিদ্ধের পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়েছে। যদিও কেউ কেউ এর আইনি ভিত্তি ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।

২০২৩ সালে রাশিয়া ইউরোপের গ্যাস আমদানির ১৯% সরবরাহ করেছে, যা ২০২২ সালের আগের ৪৫% থেকে অনেক কম। ২০২৪ সালের শেষে ইউক্রেনীয় পাইপলাইন দিয়ে রাশিয়ান গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর – ২০২৫ সালে এই হার ১৩%-তে নেমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইউরোপে রাশিয়ান গ্যাস আমদানির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ হয় দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায়, যেগুলো ২০২৭ সালের মধ্যে বাতিল করার পরিকল্পনা আছে। বাকি অংশ আসে স্বল্পমেয়াদি বা স্পট মার্কেট থেকে ক্রয়ের মাধ্যমে।

ইইউ সরাসরি নিষেধাজ্ঞার পথে যেতে না পারলেও বিকল্প আইনগত পন্থা, শুল্ক আরোপ ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ধাপে ধাপে রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমাতে চায়। ২০২৭ সালের মধ্যে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথেই ইউরোপ এগিয়ে যাচ্ছে।

মানুষ নিজের জিন , ইচ্ছামতো সাজাতে পারবে !

মানব সভ্যতার ইতিহাসে চিকিৎসা ও জিনতত্ত্ব এমন দুটি ক্ষেত্র, যেখানে প্রযুক্তির অগ্রগতি সভ্যতার ধারাকে আমূল রূপান্তর করেছে। ইদানীংকালে যে আবিষ্কারটি সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা ও বিতর্ক সৃষ্টি করেছে, তা হলো CRISPR-Cas9 প্রযুক্তি। এটি একটি জিন সম্পাদনার পদ্ধতি যা জীবন্ত কোষের ডিএনএ-তে নির্দিষ্ট ও নিখুঁত পরিবর্তন সাধনে সক্ষম।

CRISPR শব্দটির পূর্ণরূপ হলো Clustered Regularly Interspaced Short Palindromic Repeats। এটি একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যা ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য বিদ্যমান। এই ব্যবস্থা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বিজ্ঞানীরা এমন এক কৌশল উদ্ভাবন করেন, যার মাধ্যমে ডিএনএ-র নির্দিষ্ট অংশ কেটে ফেলা, পরিবর্তন বা প্রতিস্থাপন করা সম্ভব।

২০১২ সালে Jennifer Doudna এবং Emmanuelle Charpentier প্রথম মানব কোষে CRISPR-Cas9 প্রয়োগযোগ্য করে তোলেন। এই প্রযুক্তির মূল শক্তি হলো তার নির্ভুলতা, দ্রুততা এবং তুলনামূলকভাবে কম খরচ। এর ফলে জিনগত রোগের চিকিৎসা থেকে শুরু করে কৃষি ও প্রাণিবিজ্ঞান পর্যন্ত বিস্তৃত ক্ষেত্রে এটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে।

মানুষের জিনোমে প্রায় ২০,০০০ থেকে ২৫,০০০ জিন রয়েছে, যেগুলো আমাদের শারীরিক গঠন, রোগপ্রবণতা ও আচরণগত বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে। জিনতত্ত্বগত ত্রুটির কারণে বহু গুরুতর রোগ— যেমন থ্যালাসেমিয়া, সিকল সেল অ্যানিমিয়া, সিস্টিক ফাইব্রোসিস, হান্টিংটন ডিজিজ ইত্যাদি— দেখা দেয়। CRISPR এই ত্রুটিপূর্ণ অংশকে কাটিয়ে সেখানে সঠিক সিকোয়েন্স বসাতে সক্ষম।

ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণা কেন্দ্রে ক্লিনিকাল ট্রায়াল শুরু হয়েছে, যেখানে জিন সম্পাদনার মাধ্যমে এইসব রোগের চিকিৎসা করা হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। ২০২০ সালে চীনের বিজ্ঞানী হে জিয়ানকুই মানব ভ্রূণে জিন সম্পাদনা করে যমজ শিশুর জন্ম দেন, যারা এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকিমুক্ত ছিল। যদিও এই গবেষণাটি নৈতিকতার প্রশ্নে ব্যাপক সমালোচিত হয় এবং বিজ্ঞানীকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়।

CRISPR প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এক নতুন ও বিতর্কিত ধারণার জন্ম হয়েছে— “Designer Baby”। এর অর্থ জন্মের পূর্বেই সন্তানের শারীরিক গঠন, বুদ্ধিমত্তা, আচরণ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ইচ্ছেমতো নির্ধারণ করা। এই প্রযুক্তি একদিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য আশীর্বাদ হলেও, অন্যদিকে এটি সমাজে বৈষম্য, শ্রেণিভিত্তিক বংশগঠন এবং জিনগত শ্রেষ্ঠতাবাদের জন্ম দিতে পারে।

এর ফলে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে, জিন সম্পাদনার সীমা কোথায়? কবে এটি চিকিৎসার প্রয়োজনে থেমে যাবে এবং কবে তা শোভনতার ধারণায় প্রবেশ করবে? যদি ধনী পরিবারগুলো উচ্চতর আইকিউ, সৌন্দর্য বা শারীরিক গঠন সম্পন্ন সন্তান নির্বাচন করতে সক্ষম হয়, তবে সমাজে একটি নতুন ধরণের জৈবিক বৈষম্য তৈরি হবে কি না, তা নিয়েও বিতর্ক চলমান।

নৈতিক বিতর্ক প্রবল হলেও চিকিৎসাক্ষেত্রে CRISPR প্রযুক্তির ব্যবহার অনস্বীকার্য সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে। Somatic Cell Editing এর মাধ্যমে শুধুমাত্র ব্যক্তির শরীরের কোষে পরিবর্তন আনা হয়, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মে সঞ্চারিত হয় না। এটি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ এবং ইতোমধ্যে কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়েছে। যেমন— সিকল সেল অ্যানিমিয়া ও ক্যান্সারের নির্দিষ্ট ধরনের চিকিৎসায় এটি ব্যবহৃত হচ্ছে।

যেসব রোগ পূর্বে কেবল নিয়ন্ত্রণযোগ্য ছিল, সেগুলোর জন্য এখন স্থায়ী নিরাময়ের পথ খুলছে। হিমোগ্লোবিন সংক্রান্ত জিনে পরিবর্তন এনে থ্যালাসেমিয়ার নিরাময় সম্ভব হচ্ছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি বড় অগ্রগতি ।

CRISPR প্রযুক্তি যেহেতু ভবিষ্যতের মানবজীবন ও সমাজকে মৌলিকভাবে প্রভাবিত করতে পারে, তাই আন্তর্জাতিক নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য। জাতিসংঘ, UNESCO, WHO ইতোমধ্যে এই প্রযুক্তি ব্যবহারে কিছু নীতিমালা তৈরি করেছে। তবে জাতীয় পর্যায়ে আইন ও গবেষণা নীতিমালা তৈরি করাও জরুরি, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য, যাতে এ প্রযুক্তি সঠিকভাবে প্রয়োগ হয় এবং অপব্যবহার রোধ করা যায়।

CRISPR প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে একটি প্রশ্ন উঠেছে— মানুষ কি এখন নিজের প্রকৃতি পুনর্গঠনের ক্ষমতা অর্জন করেছে? যদি মানব জিন সম্পাদনা করে ভবিষ্যতের মানুষকে গঠন করা হয়, তবে “প্রাকৃতিক” ও “নির্মিত” মানুষের মধ্যে ব্যবধান কোথায়? এই প্রশ্ন শুধু বিজ্ঞান নয়, সমাজতত্ত্ব, নৈতিকতা ও দর্শনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

CRISPR প্রযুক্তি নিঃসন্দেহে একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম বৈপ্লবিক আবিষ্কার। এটি চিকিৎসা, কৃষি, প্রাণিবিজ্ঞানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। তবে এর ব্যবহারে যে নৈতিক, সামাজিক ও দার্শনিক সংকট দেখা দিয়েছে, তা উপেক্ষা করার উপায় নেই।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী , ব্রিটেনের আবাসন সংকট

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ব্রিটেনে আবাসন সংকট একটি দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। যুদ্ধ-পরবর্তী সময় থেকে বর্তমান পর্যন্ত ব্রিটেন ক্রমবর্ধমান বাড়ির দামের চাপ ও ঘাটতির মুখোমুখি। অথচ ১৯৩০-এর দশকে দেশটি এক নজিরবিহীন গৃহনির্মাণ বুম দেখেছিল। কীভাবে এই সংকট তৈরি হলো, কেন নীতিনির্ধারকদের নানা উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় ব্রিটেন কেন পিছিয়ে পড়ল-এসব প্রশ্নের উত্তর বিশ্লেষণ করা জরুরি।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় শ্রমিকরা সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ায় গৃহনির্মাণ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। ফলে শিল্পাঞ্চলে বাড়ি সংকট ও ভাড়া বৃদ্ধি ঘটে, যা ১৯১৫ সালে গ্লাসগোতে আট মাসের ভাড়া ধর্মঘটে রূপ নেয়। সরকার বাধ্য হয়ে ভাড়া ও মর্টগেজের হার যুদ্ধ-পূর্ব স্তরে স্থির করে দেয়। এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিম্নবিত্ত ভাড়াটিয়া বাড়িগুলোর বিনিয়োগ কমিয়ে দেয়।

পরিস্থিতি সামাল দিতে ১৯১৯-১৯২৪ সালের মধ্যে সরকার স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে ভর্তুকি দিয়ে বড় আকারে পাবলিক হাউজিং নির্মাণ শুরু করে। ১৯২০-১৯৩৮ সালের মধ্যে প্রতি বছর গড়ে ৬০,০০০ সরকারি বাড়ি নির্মিত হয়, যা শহরের স্লাম ক্লিয়ারেন্স ও নতুন সবুজ এলাকায় নতুন হাউজিং এস্টেট গড়ে তুলতে সহায়ক হয়। এই সময়েই লন্ডনের বিখ্যাত বেকনট্রি এস্টেট এবং ম্যানচেস্টারের উইদেনশো এস্টেটের মতো প্রকল্প গড়ে ওঠে।

১৯৩১ সালে ব্রিটেন স্বর্ণ মান ত্যাগ করলে সুদের হার কমে যায়, ঋণ সহজলভ্য হয় এবং ন্যূনতম পরিকল্পনা নিয়ন্ত্রণের কারণে ব্যক্তিগত নির্মাণ ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। ১৯৩২-১৯৩৪ সালের মধ্যে ব্যক্তিগত বাড়ি নির্মাণ ১,৪২,০০০ থেকে ২,৮৬,০০০-এ পৌঁছে যায়। এই সময় শহরের বাইরে নতুন উপশহর গড়ে ওঠে।

তবে এই দ্রুত নগর সম্প্রসারণ ‘আরবান স্প্রল’ নিয়ে শহরতলির বাসিন্দাদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ায়। আর্কিটেক্ট ও নগর পরিকল্পনাবিদদের নেতৃত্বে ১৯২৬ সালে গড়ে ওঠে ‘কাউন্সিল ফর দ্য প্রোটেকশন অফ রুরাল ইংল্যান্ড’ (CPRE)। তারা গ্রামীণ এলাকার সংরক্ষণ ও শহরের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার ঠেকাতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ১৯৩৫ সালে ‘রিবন ডেভেলপমেন্ট’ নিষিদ্ধ হয় এবং ১৯৩৭ সালে প্রধানমন্ত্রী নেভিল চেম্বারলিন CPRE-র নেতা প্যাট্রিক অ্যাবারক্রম্বিকে পরিকল্পনা কমিশনে যুক্ত করেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ব্রিটেনের গৃহনির্মাণ কার্যত স্তব্ধ করে দেয়; ৪,৫০,০০০ বাড়ি ধ্বংস হয় এবং ৬ বছরে মাত্র ১,৯০,০০০ বাড়ি নির্মিত হয়। যুদ্ধ-পরবর্তী লেবার সরকার ১৯৪৭ সালে ‘টাউন অ্যান্ড কান্ট্রি প্ল্যানিং অ্যাক্ট’ পাস করে, যা ব্যক্তিগত নির্মাণ কার্যত নিষিদ্ধ করে এবং সরকারি উদ্যোগে ‘নিউ টাউন’ নির্মাণের ওপর জোর দেয়। লন্ডনের চারপাশে গ্রিন বেল্ট (সবুজ বেষ্টনী) গড়ে তোলা হয়, যেখানে নতুন বাড়ি নির্মাণ প্রায় পুরোপুরি নিষিদ্ধ ছিল।

নিউ টাউনস অ্যাক্টের মাধ্যমে লন্ডনের আশেপাশে দশটি নতুন শহর (যেমন: বাসিলডন, স্লাউ, ক্রলি, স্টিভেনেজ) গড়ে তোলা হয়। ১৯৭০ সালের মধ্যে এসব শহরে ৪,৭০,০০০ মানুষ বাস করত। তবে নতুন শহরের বাসিন্দাদের মধ্যে স্থানীয় বিরোধিতা দেখা দেয়। গ্রিন বেল্টের কারণে শহরগুলোর আশেপাশে জমি সংকুচিত হয়ে পড়ে এবং নতুন নির্মাণের সুযোগ কমে যায়। ১৯৫৫ সালের পর গ্রিন বেল্টের পরিধি ৯ মাইল থেকে ৩৫ মাইল পর্যন্ত বাড়ানো হয়, ফলে গ্রামীণ কাউন্টিগুলো কার্যত নতুন বাড়ি নির্মাণে ভেটো পাওয়ার সুযোগ পায়।

১৯৬০-এর দশকে দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ড ও মিডল্যান্ডসে জনসংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। সরকার ১৯৬২ সালে ৪ লাখ এবং ১৯৬৫ সালে ৫ লাখ নতুন বাড়ি নির্মাণের লক্ষ্য নির্ধারণ করে, কিন্তু জমি বরাদ্দ ও স্থানীয় পরিকল্পনা নিয়ন্ত্রণের কারণে তা অর্জিত হয়নি। যদিও বাড়ি মালিকানায় কর ছাড় ও মর্টগেজ ভর্তুকি দেওয়া হয়, জমি সংকটের কারণে এসব ভর্তুকি মূলত বাড়ির দাম বাড়িয়ে দেয়।

পশ্চিম ইউরোপের অধিকাংশ দেশ যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে গৃহনির্মাণে ব্রিটেনের তুলনায় বেশি সফল হয়। ইউরোপে সরকারি ও ব্যক্তিগত নির্মাণে সরাসরি ভর্তুকি এবং নমনীয় পরিকল্পনা নিয়ন্ত্রণ ছিল। ব্রিটেনে অতিরিক্ত পরিকল্পনা নিয়ন্ত্রণ, গ্রিন বেল্ট এবং স্থানীয় বিরোধিতার কারণে গৃহনির্মাণ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম হয়েছে। ফলে ১৯৭০-এর দশকের পর সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, ফিনল্যান্ডসহ অনেক দেশ মাথাপিছু বাড়ির সংখ্যায় ব্রিটেনকে ছাড়িয়ে যায়।

ব্রিটেনের গৃহনির্মাণ সংকট ইতিহাস, নীতিনির্ধারণ এবং স্থানীয় রাজনীতির জটিল মিশ্রণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত, কঠোর পরিকল্পনা আইন, গ্রিন বেল্ট, এবং স্থানীয় বিরোধিতা মিলিয়ে সংকট আরও গভীর হয়েছে। ইউরোপের তুলনায় ব্রিটেন পিছিয়ে পড়েছে মূলত নীতিগত সীমাবদ্ধতার কারণে। ভবিষ্যতে এই সংকট সমাধানে প্রয়োজন বাস্তববাদী, নমনীয় ও স্থানীয় স্বার্থের সঙ্গে সমন্বিত নীতিমালা।

দ্রুত গলছে হিমালয় –

সম্প্রতি একাধিক গবেষণা ও এয়ার সার্ভে থেকে জানা গেছে, হিমালয়ের উচ্চশৃঙ্গ থেকে তুষার ও হিমবাহ অত্যন্ত দ্রুত গতিতে গলে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনকে জলবায়ু পরিবর্তনের একটি অশনিসংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই গলনের ফলে শুধু পরিবেশগত ভারসাম্যই বিপন্ন হচ্ছে না, বরং দক্ষিণ এশিয়ার কোটি কোটি মানুষের পানীয় জল, কৃষি ও জীবিকা উপরও মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে।

গবেষণায় উঠে এসেছে হিমালয়ের তুষারপাত ও হিমবাহের দ্রুত গলনের পেছনে শুধু গ্লোবাল ওয়ার্মিং নয়, বরং বায়ুমণ্ডলে ছড়ানো ধূলিকণারও বড় ভূমিকা রয়েছে। ধূলিকণা বরফের উপর জমে তার উজ্জ্বলতা কমিয়ে দেয়, ফলে সুর্যের বিকিরণ বরফ থেকে প্রতিফলিত না হয়ে বরং শোষিত হয়, যা তুষার গলনের গতি বাড়ায়। এই ধূলিকণা মানুষের কর্মকাণ্ড যেমন বন ধ্বংস, কৃষিকাজে জমির অতিরিক্ত ব্যবহার ও অবকাঠামো নির্মাণের ফলে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তা দূরবর্তী হিমালয় পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে।

অন্যদিকে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে হিমালয়ের তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত ৩০-৪০ বছরে হিমালয়ের তাপমাত্রা অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি বেড়েছে, যার ফলে তুষারপাতের পরিমাণ কমে গেছে এবং গলনের হার বেড়েছে। তুষারপাতের কম হওয়া এবং গলনের দ্রুততা মিলিয়ে হিমবাহের মেয়াদ কমে যাচ্ছে।

হিমালয়ের হিমবাহ ও তুষার গলনের দ্রুততা দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ২০০ কোটি মানুষের পানীয় জল সরবরাহের জন্য বড় হুমকি। কারণ এই হিমবাহগুলো গ্রীষ্মকালে গলে নদ-নদীর জল সরবরাহ করে থাকে, যা কৃষি, শিল্প ও দৈনন্দিন জীবনের জন্য অপরিহার্য। হিমবাহের দ্রুত গলনের ফলে নদীগুলোর জল প্রবাহ অনিয়মিত হয়ে পড়ছে, যা বন্যা, খরা এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, হিমালয়ের তুষারপাতের স্থায়িত্বকাল কমে যাওয়া মানে তুষার খরার মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জল সরবরাহে সংকট সৃষ্টি করবে। তাছাড়া অতিরিক্ত গলনের ফলে বন্যার ঝুঁকিও বেড়ে যাচ্ছে, যেমন উত্তরাখণ্ডে সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যার ঘটনা।

বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্লোবাল ওয়ার্মিংকে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা গেলে হিমবাহের দুই-তৃতীয়াংশ সংরক্ষণ সম্ভব হতে পারে। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে বন সংরক্ষণ, ধূলিকণা কমানো, এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি ও অবকাঠামো উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। উন্নত পর্যবেক্ষণ ও পূর্বাভাস প্রযুক্তি ব্যবহার করে দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রস্তুতি বাড়ানোও অপরিহার্য।

হিমালয়ে তুষারপাতের দ্রুত গলন জলবায়ু পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট ও উদ্বেগজনক সংকেত। এটি শুধু প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য নয়, দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের জীবন ও অর্থনীতির জন্যও বড় হুমকি। তাই বিশ্ব ও স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে, এই সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করবে। বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা অনুযায়ী এখনই সময় হিমালয়ের পরিবেশ রক্ষায় সক্রিয় হওয়ার।

বাংলাদেশে আত্মপ্রকাশ করল , উর্দুভাষীদের অধিকার আন্দোলন

0

ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করল “বাংলাদেশ উর্দুভাষী অধিকার আন্দোলন” নামে একটি নতুন সংগঠন, যেটা বাংলাদেশে বসবাসকারী উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর নাগরিক অধিকার ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করবে।

গত সোমবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক আলোচনা সভার মাধ্যমে এই সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি মাজিদ ইকবাল। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অর্থনীতিবিদ আনু মোহাম্মদ, গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সংগঠক সুজিত চৌধুরী, ইউএসপিওয়াইআরএম-এর সভাপতি সাদাকাত খান ফাক্কু, ব্লাস্টের প্রতিনিধি আহমেদ ইব্রাহিম, রিবের অ্যাডভোকেট রুহি নাজ, এবং এএলআরডির অ্যাডভোকেট রফিক আহমেদ সিরাজী।

সভায় সভাপতির সঙ্গে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মেহনাজ আক্তার যৌথভাবে সংগঠনটির ঘোষণাপত্র ও দাবিনামা তুলে ধরেন। ঘোষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়, ২০০৮ সালে হাইকোর্টের রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশে বসবাসকারী উর্দুভাষীদের নাগরিক মর্যাদা স্বীকৃত হয়। এই স্বীকৃতির ফলে তারা জাতীয় পরিচয়পত্র ও ভোটাধিকার পায়, যা তারা স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনে প্রয়োগ করে আসছে। তবে বাস্তবতা বলছে, দেশে প্রায় তিন লাখ উর্দুভাষী ঢাকাসহ ৯টি জেলার ১১৬টি ক্যাম্পে অমানবিক পরিবেশে বসবাস করছে। এসব ক্যাম্পে পরিধি ও সুবিধার ঘাটতির কারণে এক কক্ষে বহু প্রজন্মকে বসবাস করতে হয়। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পয়োনিষ্কাশন, এবং পুনর্বাসন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে অপর্যাপ্ত।

অর্থনীতিবিদ আনু মোহাম্মদ সভায় বলেন, “উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর অধিকার অবহেলা করে বৈষম্যহীন সমাজ গড়া অসম্ভব। সংবিধান যেভাবে শোভন জীবনযাপনের প্রতিশ্রুতি দেয়, উর্দুভাষীরা তা থেকে বঞ্চিত। শাসকগোষ্ঠী বাঙালি-বিহারি বিভাজনের সুযোগ নিয়ে লুটপাটের কৌশল বাস্তবায়ন করেছে, যার নির্মম শিকার হয়েছে এই জনগোষ্ঠী।”

সংগঠনটি আট দফা দাবিনামা উপস্থাপন করে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর সম্মানজনক পুনর্বাসন এবং মৌলিক মানবিক অধিকার নিশ্চিত করা। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—ক্যাম্প উচ্ছেদ বন্ধ, সরকারি চাকরি ও শিক্ষায় প্রবেশাধিকার, নিরাপদ পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির অন্তর্ভুক্তি এবং ক্যাম্প এলাকায় বিশেষ শিক্ষার ব্যবস্থা।

আলোচনা সভার অন্যান্য বক্তারাও উর্দুভাষীদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, নাগরিক অধিকার থেকে কার্যত বিচ্ছিন্নতা এবং সামাজিক বৈষম্যের বিষয়গুলো তুলে ধরেন। সংগঠনটি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তারা শান্তিপূর্ণ ও সাংবিধানিক পন্থায় নাগরিক অধিকার আদায়ের জন্য কাজ করবে।

বাংলাদেশ উর্দুভাষী অধিকার আন্দোলনের আত্মপ্রকাশ, দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ জনসম্প্রদায়ের দাবিকে সামনে নিয়ে এসেছে, যাদের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের জটিল ইতিহাস জড়িয়ে থাকলেও, বর্তমানে তাদের অধিকারের প্রশ্নকে আলাদাভাবে দেখার আহ্বান জানানো হয়েছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, তারা দেশের অন্যান্য মানবাধিকার সংগঠন ও নাগরিক সমাজের সহযোগিতা নিয়ে ভবিষ্যতে এই ইস্যুতে জনমত গঠন ও নীতিগত পরিবর্তনের জন্য কাজ চালিয়ে যাবে।

হরপ্পা থেকে বাংলার পাল বংশ , উপমহাদেশের প্রাচীন মৃৎশিল্প

মাটির পাত্র বা মৃৎশিল্প (Pottery) হলো মানব সভ্যতার অন্যতম প্রাচীন শিল্পকলা, যা শুধু দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয়তা পূরণ করেনি, বরং সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ইতিহাসের স্বরূপ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। উপমহাদেশের মৃৎশিল্পের ইতিহাস প্রায় পাঁচ হাজার বছর পেছন থেকে শুরু হলেও তার গভীরতা ও বিস্তার অসম্ভব বিশাল। বিশেষ করে হরপ্পা সভ্যতার আরম্ভ থেকে বাংলার পাল বংশ পর্যন্ত এই শিল্পের বিবর্তন ও তার প্রতিফলন সভ্যতার নানা স্তরকে ছুঁয়ে গেছে। এ হরপ্পা সভ্যতা (প্রায় ২৬০০ খ্রিষ্টপূর্ব থেকে ১৯০০ খ্রিষ্টপূর্ব) উপমহাদেশের প্রথম বড় জনবসতি ও শহর সংস্কৃতির অন্যতম নিদর্শন। এই সভ্যতার নিদর্শন থেকে পাওয়া মাটির পাত্রগুলি শুধু ব্যবহারিক ছিল না, এগুলোতে সামাজিক ও ধর্মীয় অর্থপূর্ণ চিত্রাকরণ ও নিদর্শন ছিল।

হরপ্পা মৃৎশিল্পের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল তার সুগঠিত ও মসৃণ নির্মাণ পদ্ধতি। হুইল-থ্রোন পদ্ধতিতে তৈরি মাটির পাত্রগুলি আকর্ষণীয় নকশা ও জ্যামিতিক অলঙ্করণে সজ্জিত ছিল। বিশেষ করে পশুপাখির ছবি, মানুষের প্রতিকৃতি, ফুলের ডিজাইন ইত্যাদি ছিল হরপ্পার কুমারশিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এর মাধ্যমে দেখা যায়, শিল্পীরা শুধুমাত্র ব্যবহারিক পাত্র নির্মাণের বাইরে তাদের নিজস্ব কল্পনা ও ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। তাছাড়া হরপ্পার মৃৎশিল্পে ‘স্ট্যাম্প সিল’ বা মুদ্রিত ছাপের ব্যবহার ছিল। এটি ছিল ঐতিহাসিক তথ্য ও ধর্মীয় অর্থবহ প্রতীক বহনকারী একটি মাধ্যম। মাটির পাত্রের মাধ্যমে মানুষের সাংস্কৃতিক স্তর, শ্রেণীবিন্যাস, পুজো-পাঠ ও দৈনন্দিন জীবনযাপনের দিকগুলো প্রতিফলিত হয়েছে।

হরপ্পার পর থেকে অনেকগুলো সভ্যতা উপমহাদেশে উদ্ভূত হয়েছে, তাদের মধ্যে বাংলার পাল বংশের সময়কাল (৮ম শতাব্দী থেকে ১২শ শতাব্দী) বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পাল বংশের শাসনামলে মৃৎশিল্প সংস্কৃতিতে এক নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। এই সময়কালকে বাংলা ইতিহাসে ‘স্বর্ণযুগ’ বলা হয়, কারণ শিল্পকলা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশ এই সময় প্রকট।

পাল যুগের মৃৎশিল্পের বৈশিষ্ট্য ছিল তার ধর্মীয় ও নান্দনিকতা। বৌদ্ধ ধর্মের প্রসারে পাল বংশ আমলে মাটির মূর্তি ও পাত্রে বৌদ্ধ ধর্মীয় প্রতীকাবলী নির্মিত হয়। পাত্রগুলোর অলঙ্করণে ছিল বৌদ্ধ চিহ্ন, পদ্মফুল, চক্র ও বুদ্ধের মূর্তি। এই সময়ের মৃৎশিল্প থেকে বোঝা যায় যে শিল্পীরা ধর্মীয় ভাবনাকে তাদের শিল্পকলায় সমৃদ্ধ করেছেন। পাল যুগের মৃৎশিল্পের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো কালি দিয়ে লেখা ‘পটলিপুত্র’ নামে পরিচিত মৃৎপাত্রে সৃষ্ট সুনিপুণ চিত্র ও লেখা। এগুলো শুধু ব্যবহারিক নয়, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক কাজে ব্যবহৃত হতো।

হরপ্পা ও পাল যুগের মৃৎশিল্পে বহু মিল ও বৈষম্য রয়েছে। মিল গুলোর দিকে তাকালে, উভয় যুগেই মৃৎশিল্প ছিল দৈনন্দিন জীবন ও ধর্মীয় প্রয়োজনে অপরিহার্য। নকশায় জ্যামিতিক, প্রাণী ও ফুলের মোটিফের ব্যবহার লক্ষ্যণীয়। ধর্মীয় ভাবনা মৃৎশিল্পে প্রকাশিত হয়েছে, যদিও হরপ্পায় তা ছিল বহুজাতিক ও বহুধর্মীয়, পাল যুগে প্রধানত বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব। বৈষম্য গুলো হচ্ছে, হরপ্পার মৃৎশিল্প ছিল অধিকতর প্রাকৃতিক ও বহুজাতিক অর্থে, পাল যুগের মৃৎশিল্প ধর্মীয় ও বৌদ্ধ শিল্পে নিবদ্ধ। পাল যুগে মৃৎশিল্পে লেখার ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে, যা হরপ্পায় অপ্রচলিত ছিল। প্রযুক্তিগত দিক থেকে পাল যুগের মাটির পাত্রে গ্লেজিং বা চকচকে আবরণ ব্যবহৃত হলেও হরপ্পার পাত্র ছিল প্রাথমিক ও গলিত।

মৃৎশিল্প শুধুমাত্র ব্যবহারিক নয়, এটি মানুষের বিশ্বাস, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বহিঃপ্রকাশ। মাটির পাত্র ও মূর্তিতে মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে শুরু করে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ভাবনা জড়িয়ে রয়েছে। বিশেষ করে বাংলার ইতিহাসে পাল বংশের মৃৎশিল্প রাজনীতিরও এক বড় আয়তন ছিল, যা প্রজাদের মধ্যে রাজবংশের ভাবমূর্তি সুদৃঢ় করত।

মাটির পাত্র থেকে আমরা মানুষের জীবনধারা, রীতিনীতি ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনকে অনুভব করতে পারি। বাংলার গ্রামীণ এলাকায় আজও কিছু স্থানীয় কুমার সম্প্রদায় এই ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে। এই শিল্প সংস্কৃতি শুধু ইতিহাস নয়, সামাজিক সংহতির মাধ্যম হিসেবেও কাজ করে।

আধুনিকায়ন ও শিল্পায়নের যুগে প্রাচীন মৃৎশিল্পের ঐতিহ্যকে রক্ষা ও পুনর্জীবিত করা প্রয়োজন। বাংলায় বর্তমানে গ্রামীণ ও শহুরে পর্যায়ে নতুন নতুন কুমারশিল্পী মিশ্র প্রযুক্তি ও নকশায় কাজ করছেন।

হরপ্পা থেকে বাংলার পাল বংশ পর্যন্ত উপমহাদেশের মৃৎশিল্প শুধু শিল্প নয়, এটি ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী। মাটির পাত্রের মাধ্যমে আমরা দেখতে পাই মানব সভ্যতার বিবর্তন, ধর্মীয় ও সামাজিক চেতনা, এবং শিল্পী ও ব্যবহারকারীর অন্তর্নিহিত চিন্তাধারা। এই দীর্ঘ ঐতিহ্যের ধারাকে সংরক্ষণ ও উন্নয়নের মাধ্যমে আমরা শুধু অতীতের সাথে সংযুক্ত থাকছি না, ভবিষ্যতের শিল্প ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করছি।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিমান ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ বৃত্তান্ত –

ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যে সফরের সময় ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’-এর ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা আলোচনা চলছিল। এই ঐতিহাসিক উড়োজাহাজের অভ্যন্তরীণ অংশ অচিরেই বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখে পড়তে পারে। এমনকি সম্ভাবনা রয়েছে এর জায়গায় নতুন একটি ‘আকাশের রাজপ্রাসাদ’ আসার—যা কাতারের পক্ষ থেকে ট্রাম্পকে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এটি গ্রহণ করলে সেটিই হবে যুক্তরাষ্ট্রের কোনও প্রেসিডেন্টের পাওয়া সবচেয়ে বড় বিদেশি উপহার।

টেকনিক্যালি “এয়ার ফোর্স ওয়ান” মূলত একটি রেডিও সংকেতের নাম। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট যখন উড়োজাহাজে ভ্রমণ করেন তখন এই সংকেত ব্যবহার করা হয়।

তবে অধিকাংশ মানুষের কল্পনায় যে উড়োজাহাজটি “এয়ার ফোর্স ওয়ান” হিসেবে ভেসে ওঠে, সেটি হলো বোয়িং ৭৪৭-২০০বি। এর গায়ে পান্না নীল, স্টিলি নীল ও সাদা রঙের সমন্বয়ে একটি রুচিশীল রঙের স্কিম রয়েছে, যা প্রথম ফার্স্ট লেডি জ্যাকি কেনেডি ১৯৬২ সালে নির্বাচন করেছিলেন।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর বহরে এমন দুটি বোয়িং ৭৪৭ রয়েছে, যেগুলো ১৯৯০ সাল থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এই দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে প্রযুক্তি ও উড়োজাহাজের ডিজাইনে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। এই উড়োজাহাজ দুটি কিছুটা আপগ্রেড করা হয়েছে। এতে কাঠামো ও ইঞ্জিন রক্ষণাবেক্ষণের খরচ দিন দিন বাড়ছে। ফলে উড়োজাহাজের বয়স বেশ স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে।

এই বিষয়টি বর্তমান প্রেসিডেন্টের কাছে বেশ বিরক্তিকর মনে হচ্ছে। তিনিই একমাত্র প্রেসিডেন্ট, যিনি দায়িত্ব গ্রহণের আগে নিজস্ব একটি উড়োজাহাজ ও এমনকি একটি উড়োজাহাজ সংস্থার মালিক ছিলেন।

গত বৃহস্পতিবার আবুধাবিতে একটি শিল্প সংক্রান্ত ব্রিফিংয়ে তিনি বলেছিলেন, “আমি এখন একটি ৪২ বছর পুরনো বোয়িংয়ে চড়ি। তবে নতুন বিমান আসছে।” তিনি বোয়িংয়ের বয়সটা কিছুটা বাড়িয়ে বলেছেন।

ট্রাম্পের কাছে এই নতুন উড়োজাহাজ আসার প্রক্রিয়া খুব ধীর মনে হচ্ছে। তার প্রথম মেয়াদকালেই তিনি বোয়িংয়ের তৈরি একটি নতুন উড়োজাহাজের পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন।

প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল, নতুন উড়োজাহাজ দুটি ২০২১ সালের মধ্যেই সরবরাহ করা হবে। কিন্তু প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের নির্মাণ প্রকল্পে দেরি ও খরচ বেড়ে যাওয়ার ফলে এখন মনে করা হচ্ছে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বেশির ভাগ সময়েও এই দুটি নতুন উড়োজাহাজ ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত হবে না।

আর এজন্যই প্রেসিডেন্ট হঠাৎ কাতারের প্রস্তাবিত একটি সহজ ও দ্রুত সমাধানের দিকে ঝুঁকেছেন। কারণ এটি তার আকাশপথের সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান হয়ে উঠতে পারে।

গত সপ্তাহে কাতারের দেওয়া বিলাসবহুল ৪০০ মিলিয়ন ডলারের ৭৪৭-৮ উড়োজাহাজ উপহারের খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয়। কিন্তু বাস্তবে এই উপহারের বিষয়টি গত কয়েক মাস ধরেই পরিকল্পনায় ছিল।

তবে এত বড় একটি উপহার গ্রহণ নিয়ে আইনি ও নৈতিক প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকরা এবং প্রেসিডেন্টের কিছু ঘনিষ্ঠ সহযোগীও এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি একটি বিদেশি ৭৪৭ উড়োজাহাজকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করতে গেলে অনেক ধরনের কারিগরি চ্যালেঞ্জ দেখা দেয়।

এই উড়োজাহাজে মাঝআকাশে জ্বালানি নেবার ব্যবস্থা করতে হবে এবং উন্নতমানের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম সংযোজন করতে হবে। বর্তমান এয়ার ফোর্স ওয়ান উড়োজাহাজ এমনভাবে নির্মিত, যাতে পারমাণবিক বিস্ফোরণের ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক পালসেও সেগুলো সচল থাকে।

এই ধরনের রিফিটিং বা পুনর্গঠনের কাজ সম্পূর্ণ হতে বহু বছর সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন অ্যারোডায়নামিক অ্যাডভাইজরি নামক সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও উড়োজাহাজ বিশ্লেষক রিচার্ড আবুলাফিয়া। তার মতে, এই কাজ শেষ হতে অন্তত ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

কেন্দ্রীয় কৌশলগত ও আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিভাগের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মার্ক ক্যানসিয়ান জানিয়েছেন, এই রিফিটিংয়ের খরচ সহজেই এক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যেতে পারে। র্তমান বোয়িং ৭৪৭ উড়োজাহাজগুলো অবসরে পাঠানো হলে, তা হবে আমেরিকান ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের অবসান।

বয়স হলেও এয়ার ফোর্স ওয়ান এখনও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ও মর্যাদার অন্যতম প্রতীক। এটি একটি সামরিক উড়োজাহাজ, যার উদ্দেশ্য কেবল বিলাসিতা নয়। রিচার্ড আবুলাফিয়া বলেন, “এটি বিলাসবহুল পার্টি করার জন্য তৈরি নয়। এটি একটি উড়ন্ত কমান্ড পোস্ট। এখানে দায়িত্ব পালন করতেই হয়।”

মেগা প্রকল্প নেবে না বললেও , সে পথেই অন্তর্বর্তী সরকার

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয় গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ওই সভায় বলেছিলেন, ‘‌এখন থেকে মেগা প্রকল্প না নিয়ে জনগুরুত্বপূর্ণ ছোট প্রকল্প নেয়া হবে।’ পরে বিভিন্ন সময় পরিকল্পনা উপদেষ্টা, অর্থ উপদেষ্টাসহ সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও বড় প্রকল্প না নেয়ার পক্ষে মতামত দিয়েছেন।

অথচ গত ২০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত একনেক সভায় অনুমোদন দেয়া হয়েছে ১৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকার ‘‌বে টার্মিনাল মেরিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (বিটিএমআইডিপি)’। চট্টগ্রামে বঙ্গোপসাগরের পাড়ঘেঁষে হালিশহরের পাশে বিশাল আকারের এ বে টার্মিনাল হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ নেয়া হচ্ছে ৯ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা। বাকি ৪ হাজার ১৯২ কোটি ৫৭ লাখ টাকা খরচ হবে সরকারি তহবিল থেকে।

মাস ছয়েক আগেই (২ সেপ্টেম্বর) পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘ঋণ করে অবকাঠামো নির্মাণ সক্ষমতার প্রমাণ নয়। আমরা একের পর এক বড় বড় অবকাঠামোগত প্রকল্প করে যাচ্ছি। এগুলো ঋণের মাধ্যমে করা হচ্ছে। গত তিন বছরে আমাদের বৈদেশিক ঋণ ৫০ বিলিয়ন থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। আগামী দু-তিন বছরের মধ্যে ঋণ ফেরত দিতে হবে বছরে ৫ বিলিয়ন ডলার। আমরা যদি ভবিষ্যতে আরো ঋণ নিতে থাকি তাহলে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ আরো বেড়ে যাবে। এজন্য লাভ-ক্ষতি বিবেচনা করে আমাদের বড় অবকাঠামো প্রকল্প নিতে হবে।’

বে টার্মিনালের পর এবার ভোলা-বরিশালে ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণের আরেকটি প্রকল্প নিতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। প্রস্তাবিত এ সেতু নির্মাণে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ১৭ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা। সম্প্রতি প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. শেখ মইনউদ্দিন। সেখানে অনুষ্ঠিত এক সভায় জানানো হয়, আগামী জানুয়ারিতে ভোলা-বরিশাল সেতুর কাজ শুরু হতে পারে।

পিপিপি (সরকারি বেসরকারি অংশীদারত্ব) পদ্ধতিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে। গত মার্চে বিষয়টি নিয়ে জাপানের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের একটি প্রস্তাব দিয়েছে সরকার।

ভোলা-বরিশাল সেতু ছাড়াও ভাঙ্গা-বরিশাল-পটুয়াখালী সড়কটি চার লেন করা হবে বলে ৭ মে একনেক-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে জানান পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। মহাসড়কটির উন্নয়নকাজের জন্য বর্তমানে ১ হাজার ৮৬৭ কোটি টাকার জমি অধিগ্রহণ প্রকল্প চলমান রয়েছে।

এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের দ্বিতীয় একনেক সভায় অনুমোদন দেয়া হয় ১১ হাজার ৫৬০ কোটি টাকার কালুরঘাট রেল কাম রোড সেতু নির্মাণ প্রকল্প। এর জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার কাছ থেকে ৮১ কোটি ৪৯ লাখ ১০ হাজার ডলার ঋণ নিচ্ছে বাংলাদেশ।

এছাড়া ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকার মোংলা বন্দরের সুবিধাদি সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন প্রকল্প, ৩ হাজার ৯২১ কোটি টাকার চট্টগ্রাম পানি সরবরাহ উন্নয়ন প্রকল্প, ২ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকার চট্টগ্রাম মহানগরীর উত্তর কাট্টলী ক্যাচমেন্ট স্যানিটেশন প্রকল্পসহ বেশকিছু প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার, যেগুলোর প্রতিটির ব্যয় ২ হাজার কোটি টাকার বেশি।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘‌যেসব প্রকল্প সরকার নিচ্ছে এবং নিতে যাচ্ছে, এগুলোর বাস্তবায়ন এ সরকারের মেয়াদকালে হবে না। তাহলে কেন এ প্রকল্পগুলো তারা নিচ্ছে তা আমার কাছে বোধগম্য নয়।’

পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বণিক বার্তাকে এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘মোটামুটিভাবে আমরা মেগা প্রকল্প হাতে নিচ্ছি না। আরো অনেক মেগা প্রকল্প ছিল, সেগুলো নিচ্ছি না। নতুন মেগা প্রকল্প যেগুলোর কথা বলা হচ্ছে, দূরদর্শী দু-একটা প্রকল্প নিয়েছি।’

ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপের (ইআরজি) নির্বাহী পরিচালক সাজ্জাদ জহির এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌আমার কাছে মনে হয়, অন্তর্বর্তী সরকার চট্টগ্রাম বন্দর ও বন্দরকেন্দ্রিক যে অবকাঠামোগুলো রয়েছে, সেগুলোকে মেগা হাব হিসেবে চিহ্নিত করছে। সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলোয় একটা বিষয় উঠে আসছে যে, বাইরে থেকে দেশে বিনিয়োগ আনতে হলে উপযোগী অবকাঠামো দরকার। সে কারণে হয়তো চট্টগ্রাম বন্দর উন্নয়ন, কালুরঘাট সেতু নির্মাণ প্রকল্পগুলোকে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।’