অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয় গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ওই সভায় বলেছিলেন, ‘এখন থেকে মেগা প্রকল্প না নিয়ে জনগুরুত্বপূর্ণ ছোট প্রকল্প নেয়া হবে।’ পরে বিভিন্ন সময় পরিকল্পনা উপদেষ্টা, অর্থ উপদেষ্টাসহ সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও বড় প্রকল্প না নেয়ার পক্ষে মতামত দিয়েছেন।
অথচ গত ২০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত একনেক সভায় অনুমোদন দেয়া হয়েছে ১৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকার ‘বে টার্মিনাল মেরিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (বিটিএমআইডিপি)’। চট্টগ্রামে বঙ্গোপসাগরের পাড়ঘেঁষে হালিশহরের পাশে বিশাল আকারের এ বে টার্মিনাল হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ নেয়া হচ্ছে ৯ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা। বাকি ৪ হাজার ১৯২ কোটি ৫৭ লাখ টাকা খরচ হবে সরকারি তহবিল থেকে।
মাস ছয়েক আগেই (২ সেপ্টেম্বর) পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘ঋণ করে অবকাঠামো নির্মাণ সক্ষমতার প্রমাণ নয়। আমরা একের পর এক বড় বড় অবকাঠামোগত প্রকল্প করে যাচ্ছি। এগুলো ঋণের মাধ্যমে করা হচ্ছে। গত তিন বছরে আমাদের বৈদেশিক ঋণ ৫০ বিলিয়ন থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। আগামী দু-তিন বছরের মধ্যে ঋণ ফেরত দিতে হবে বছরে ৫ বিলিয়ন ডলার। আমরা যদি ভবিষ্যতে আরো ঋণ নিতে থাকি তাহলে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ আরো বেড়ে যাবে। এজন্য লাভ-ক্ষতি বিবেচনা করে আমাদের বড় অবকাঠামো প্রকল্প নিতে হবে।’
বে টার্মিনালের পর এবার ভোলা-বরিশালে ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণের আরেকটি প্রকল্প নিতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। প্রস্তাবিত এ সেতু নির্মাণে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ১৭ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা। সম্প্রতি প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. শেখ মইনউদ্দিন। সেখানে অনুষ্ঠিত এক সভায় জানানো হয়, আগামী জানুয়ারিতে ভোলা-বরিশাল সেতুর কাজ শুরু হতে পারে।
পিপিপি (সরকারি বেসরকারি অংশীদারত্ব) পদ্ধতিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে। গত মার্চে বিষয়টি নিয়ে জাপানের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের একটি প্রস্তাব দিয়েছে সরকার।
ভোলা-বরিশাল সেতু ছাড়াও ভাঙ্গা-বরিশাল-পটুয়াখালী সড়কটি চার লেন করা হবে বলে ৭ মে একনেক-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে জানান পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। মহাসড়কটির উন্নয়নকাজের জন্য বর্তমানে ১ হাজার ৮৬৭ কোটি টাকার জমি অধিগ্রহণ প্রকল্প চলমান রয়েছে।
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের দ্বিতীয় একনেক সভায় অনুমোদন দেয়া হয় ১১ হাজার ৫৬০ কোটি টাকার কালুরঘাট রেল কাম রোড সেতু নির্মাণ প্রকল্প। এর জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার কাছ থেকে ৮১ কোটি ৪৯ লাখ ১০ হাজার ডলার ঋণ নিচ্ছে বাংলাদেশ।
এছাড়া ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকার মোংলা বন্দরের সুবিধাদি সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন প্রকল্প, ৩ হাজার ৯২১ কোটি টাকার চট্টগ্রাম পানি সরবরাহ উন্নয়ন প্রকল্প, ২ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকার চট্টগ্রাম মহানগরীর উত্তর কাট্টলী ক্যাচমেন্ট স্যানিটেশন প্রকল্পসহ বেশকিছু প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার, যেগুলোর প্রতিটির ব্যয় ২ হাজার কোটি টাকার বেশি।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘যেসব প্রকল্প সরকার নিচ্ছে এবং নিতে যাচ্ছে, এগুলোর বাস্তবায়ন এ সরকারের মেয়াদকালে হবে না। তাহলে কেন এ প্রকল্পগুলো তারা নিচ্ছে তা আমার কাছে বোধগম্য নয়।’
পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বণিক বার্তাকে এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘মোটামুটিভাবে আমরা মেগা প্রকল্প হাতে নিচ্ছি না। আরো অনেক মেগা প্রকল্প ছিল, সেগুলো নিচ্ছি না। নতুন মেগা প্রকল্প যেগুলোর কথা বলা হচ্ছে, দূরদর্শী দু-একটা প্রকল্প নিয়েছি।’
ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপের (ইআরজি) নির্বাহী পরিচালক সাজ্জাদ জহির এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়, অন্তর্বর্তী সরকার চট্টগ্রাম বন্দর ও বন্দরকেন্দ্রিক যে অবকাঠামোগুলো রয়েছে, সেগুলোকে মেগা হাব হিসেবে চিহ্নিত করছে। সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলোয় একটা বিষয় উঠে আসছে যে, বাইরে থেকে দেশে বিনিয়োগ আনতে হলে উপযোগী অবকাঠামো দরকার। সে কারণে হয়তো চট্টগ্রাম বন্দর উন্নয়ন, কালুরঘাট সেতু নির্মাণ প্রকল্পগুলোকে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।’


